সিডনী বৃহঃস্পতিবার, ২৬শে নভেম্বর ২০২০, ১২ই অগ্রহায়ণ ১৪২৭

মন্দিরনগরী বিষ্ণপুরে : ডঃ সুবীর মণ্ডল


প্রকাশিত:
৯ নভেম্বর ২০২০ ১৫:০৭

আপডেট:
৯ নভেম্বর ২০২০ ১৫:০৭

 

অতীতের বনবিষ্ণুপুর আজ বিষ্ণুপুর, একসময়ে সাহেবরা বলতেন জঙ্গলমহল। উত্তরে খরস্রোতা দ্বারকেশ্বর নদী, দক্ষিণ, পূর্ব, ও পশ্চিমে ঘন শালের জঙ্গলের ঘেরাটোপে বিষ্ণুপুর দূর্গ ছিল  পরিখাবেষ্টিত। ১১ মাইল বিস্তৃত দূর্গের অভ্যন্তরে রাজপ্রাসাদ, দরবার, বসতি, মন্দির , মীনাবাজার নিয়ে আনন্দের এক বর্ণময় জনপদভূমি। বর্তমানে  বিষ্ণপুরের দক্ষিণে  জয়পুরের জঙ্গল ছাড়া সেই গভীর অরণ্যের অস্তিত্ব আজ আর খুঁজে পাওয়া যায় না। দামালনদী, দুর্গম অরণ্য অতিক্রম করে দিল্লির সম্রাটের বাহিনী পর্যন্ত বিষ্ণুপুর আক্রমণ  করতে ভরসা পেতেন না। দূর্গ সুরক্ষার জন্য সাঁওতাল, বাউড়ি, বাগদীদের মতো সাহসী বাঙালি বীর যোদ্ধারা ছিলেন। ধানুকী যোদ্ধাদের বিষাক্ত তীর  প্রতিপক্ষের ভীতির অন্যতম কারণ ছিল।

ষোড়শ শতকের শেষভাগে মল্লরাজ বীর হাম্বীরের রাজত্বকালে (১৫৬৫ খৃস্টপূর্বাব্দ) বিষ্ণপুর ইতিহাসের পাদপ্রদীপের আলোয় আসে। শৈবধর্মের উপাসক  হাম্বীর উত্তরকালে বৈষ্ণব ধর্মে দীক্ষিত হন। শিবের উপাসক মল্লবংশীয়  রাজপ্রতিনিধির ধর্মান্তর সমাজের আমূল পরিবর্তন আনে। হিংসা, অত্যাচার, অকারণে রক্তপাত বন্ধ হয়ে যায়। মল্লরাজের ধর্মান্তরিত হওয়ার কাহিনীটি অত‌্যন্ত লোমহর্ষক। বৃন্দাবন থেকে বৈষ্ণব ধর্মগ্রন্থ আসছিল শ্রীনিবাসন আচার্যের তত্ত্বাবধানে। বিষ্ণুপুরের গভীর অরণ্যে আচার্য এবং সহযাত্রী বৈষ্ণব পণ্ডিতগণের  সর্বস্ব লুঠ করে নয় দস্যুদল। মূল্যবান ধর্মগ্রন্থ গুলিও বাদ যায় না। পাণ্ডুলিপি উদ্ধারের বাসনা নিয়ে রাজদরবারে আসেন চিন্তাক্লিষ্ট  শ্রীনিবাস আচার্য। বৈষ্ণব চূড়ামণির দীপ্ত পুরুষকার ,অগাধ পাণ্ডিত্যে মুগ্ধ হন মল্লরাজ, তাঁর চিত্তে ভাবান্তর হয়। আচার্যের নিকট বৈষ্ণব ধর্মে দীক্ষিত হন। শুরু হয়ে যায় নানান ধরনের মন্দির গড়ার কাজ, দেবালয় প্রতিষ্ঠা।

মন্দিরে নানা রূপে কৃষ্ণ বিগ্রহ, মদনমোহন, মদনগোপাল, কালাচাঁদ, লালজি, রাধাকৃষ্ণ, কেষ্টরাই।

মল্লরাজের হাত ধরেই বিষ্ণুপুর ক্রমশ হয়ে উঠলো মন্দিরময় নগরী। গঠনশৈলীর এত বৈচিত্র্য সমগ্র দেশের অন্য কোথাও দেখা যায় না। কেবল মন্দির নগর নয়, দরবারি সঙ্গীত চর্চার পীঠস্থান ছিল বিষ্ণুপুর-ঘরণা। অতীতের বিষ্ণুপুরে কি ছিল না! নানা কুটিরশিল্প, ধাতুশিল্পের কারিগর,রেশমের  বস্রশিল্প, রমণীদের  প্রিয় বালুচরী শাড়ি। ছিলেন বিদ্বান গুণীজন,ও স্তাদ সঙ্গীত শিল্পী, রূচিবান ভাস্কর, এমনি কি নৃত্যপটিয়সী বাঈজিরা। অতীতের বিষ্ণুপুর বিদগ্ধ ব্যক্তিত্বের এক পরিপূর্ণ নগর।

এই ধরনের একটি সুপ্রাচীন মন্দির নগরী দেখার সখ ছিল বহুদিনের, কিন্তু সময় হয়ে উঠছিল না। হঠাৎ বিষ্ণুপুর নিবাসী  শিক্ষক দম্পতি সুব্রত মণ্ডলের  আন্তরিক  আহ্বানে  গতবছর ডিসেম্বর মাসে এক বিকেলে বিষ্ণুপুর মেলা উপলক্ষে  গিয়েছিলাম শিল্পরূপময় মন্দির নগরী বিষ্ণুপুরে। দুপুরের খাওয়া পর্ব সেরে আমরা একটি বোলারো গাড়িতে  রওনা দিলাম বিষ্ণুপুরের মল্লরাজার দেশে।যাত্রা শুরু করলাম। খাতড়া মহকুমা শহর থেকে দূরত্ব ৬৫ কি, মিঃ। আড়কামা- হাড়মাসড়া-তালডাংরা হয়ে সাবরাকোণ-বাকাদহ ছুঁয়ে আমরা ২ঘন্টার মধ্যে পৌঁছলাম বিষ্ণুপুর শহরে।বন্ধু সুব্রতর বাড়িতে চা পর্ব সারলাম তারপর বেরিয়ে পড়লাম মেলাপ্রাঙ্গণের দিকে। প্রতিবছর ডিসেম্বর মাসে ৫দিন ধরে বিষ্ণুপুর মেলা অনুষ্ঠিত হয়। দেশ-বিদেশের পর্যটকদের বেশিরভাগ মানুষ এই সময়কেই বেছে নেয়।তিল ধারণের জায়গা থাকেনা শহরের হোটেল গুলোতে। আমরা পঞ্চপান্ডব সৌভাগ্যবান, এবছর সুব্রতর বড় ফ্লাট বাড়িতে একদিনের জন্য থাকার সুযোগ পেয়েছিলাম। মেলা জমজমাট হয় মূলত বিকেল বেলায়।হাতে যেহেতু অফুরান সময়, সেই কারণে  পৌঁছে গেলাম প্রথমেই প্রাচীন দুর্গের কাছে। দুর্গ এখন নেই, আগাছার জঙ্গলের মধ্যে দেখা গেল জীর্ণ দুর্গপ্রাচীরের ধ্বাংসাবশেষ। অতীতের সাক্ষী হয়ে আছে শুষ্ক পরিখা, কাঁকড়মাটির উঁচু প্রাচীর ঘেরা সীমানার অংশ। এই দৃশ্য আমাকে গভীর ভাবে আচ্ছন্ন করলো। নানান ধরনের ভাবনা আমাকে মোহাবিষ্ট করতে লাগলো। আমার মন অতীত ইতিহাসের জগতে বিচরণে ব্যস্ত হয়ে পড়লো। একটা অকথিত বর্ণময় ইতিহাস আর তাকে নিয়ে হাজার জনশ্রুতি এবং কল্পনার বুনন। এখানকার খোলা আকাশের নীচেয় সযত্নে বেড়ে ওঠে বহু কিংবদন্তি ও লোককথার গল্পরা। রাতের অন্ধকারে হেঁটে বেড়ায় ইতিহাসের কল্পকথার অশরীরী চরিত্ররা। বিস্ময়কর এই ধ্বংসপ্রাপ্ত দুর্গের প্রতিটি ইটের খাঁজে খাঁজে ওঁরা বেঁচে আছে জনশ্রুতিতে ও বেঁচে আছে কিংবদন্তির হলুদ পাতায়। খুব যত্নসহকারে দেখলাম মাকড়া পাথরের তৈরি তোরণ,পাথর দরজা অতিক্রম করে রাজদরবারে পৌঁছলাম। বর্তমানে ধু ধু ময়দান।

প্রতিবছরই ডিসেম্বরের শেষ সপ্তাহে উদযাপিত হয় বিষ্ণুপুর উৎসব। সাক্ষ্য বহন করে রাঢ়  সংস্কৃতির। এবার আমাদের গন্তব্যস্হল মেলা প্রাঙ্গণে। জমজমাট মেলা। জগৎ বিখ্যাত এই মেলা।

শুধু মানুষের মাথা আর মাথা। স্টলে স্টলে ঘুরতে লাগলাম।সে এক অনবদ্য দৃশ্য। নানান কুটিরশিল্প, ধাতুশিল্পের সামগ্রী নিয়ে বিক্রেতারা সংসার সাজিয়ে বসে আছেন। একেএকে, শাঁখের শিল্পকর্ম, পাচঁমুড়ারঘোড়া, বিষ্ণিপুরী হ্যারিকেন, রেশমবস্ত্রের বিপণি, দশাবতার তাস, বালুচরী শাড়ির বিপণি কেন্দ্র ঘুরে মুগ্ধ হলাম। উৎসব মুখর মেলা প্রাঙ্গণ। এ উৎসব বিষ্ণুপুরবাসীর মেলবন্ধনের উৎসব। বহু গুণীজনের অংশগ্রহণে সমৃদ্ধ এই উৎসব। বহু বাংলা-মুম্বাইয়ের তারকা শিল্পীদের উপস্থিতিতে জমজমাট। উৎসবের বড় বৈশিষ্ট্য হলো রাঢ় সংস্কৃতির ধারাকে বজায় রাখা।  ধ্রুপদ সঙ্গীত , ঝুমুর, ঝাঁপানখেলা, রাবনকাঁটা নাচ ও আদিবাসী জনগোষ্ঠীর স্বপ্নের লোকনৃত্যের মনোমুগ্ধকর অনুষ্ঠান দেখে মুগ্ধ হলাম সবাই। পাঁচ দিনের এই উৎসবে জমজমাট মন্দির নগরী বিষ্ণুপুর। কোলকাতার শিল্পীদের অংশগ্রহণে সমৃদ্ধ হয়েছিল এই উৎসব। রাঢ় সংস্কৃতির ধারাকে বাঁচিয়ে রাখার জন্য কিছু গ্রামীণ তরুণদের অদম্য প্রয়াস দেখে মুগ্ধ হলাম। মাটির সংস্কৃতিকে রক্ষার এই প্রচেষ্টা নিঃসন্দেহে প্রসংশার দাবি রাখে। দু'টি মঞ্চ  রামানন্দ এবং যদুভট্ট, এই অঞ্চলের দুই কৃতি পুরুষের নামে উদ্যোক্তাদের শ্রদ্ধার্ঘ্য। মন ভরে গেল।

রাত ১২টায় ফিরলাম বন্ধুর ফ্লাটে। রাতের খাবার পর্ব সারলাম। ছোট্ট ব্যালকোণি থেকে উৎসব মুখর রাতের বিষ্ণুপুর শহরকে দু'চোখ ভরে দেখলাম। পরতে পরতে বনেদিয়ানার ছাপ পরিলক্ষিত হচ্ছে। ইতিহাস ও ঐতিহ্য এবং সংস্কৃতির শহর বিষ্ণুপুর। রাত বাড়ছে। আমরা সবাই ঘুমের দেশে পাড়ি দিলাম। কাল সকাল সকাল পথচলা শুরু করতে হবে। পরেরদিন খুব ভোরে পৌঁছলাম জয়পুরে। দূরত্ব মাত্র ২৫ কিমি। দেখার জায়গা দু'টি। গাছগাছালি ভরা সুরধ্বনি পার্ক। নানান ধরনের পাখি কলরব ও নৃত্যরত ময়ূরের

ধ্বনিতে সত্য ই অপরূপা। নামকরণের সংক্ষিপ্ত ইতিহাস অন্বষণে অগ্রসর হলাম। জানলাম, নীল বিদ্রোহের অন্যতম সৈনিক কাটুল গ্রামের সুরধ্বনি বাজের নামে এই উদ্যান।ঢোকার মুখেই আছে বিরসা-মুণ্ডার একটি নান্দনিক মূর্তি। অন্যদিকে উদ্যানটিকে ঘিরে রয়েছে বাঁকুড়ার চার কৃতি মানুষের প্রস্তর মূর্তি। স্বাধীনতা আন্দোলনের প্রবাদপ্রতিম ব্যক্তিত্ব সুরধ্বনি বাজ, সাংবাদিকতার নতুন দিগন্ত সৃষ্টির অগ্রদূত রামানন্দ চট্টোপাধ্যায়, প্রথিতযশা শিল্পী যামিনী রায় এবং রামকিঙ্কর বেজ।দেখে মনে হলো এই উদ্যান সমগ্র বাঁকুড়ারই একটি আদর্শ মডেল। আমাদের স্বাগত জানাল জয়পুরের মনোমুগ্ধকর সমুদ্র বাঁধ। পাখির চোখের মতো কালো-গভীর জলে একটু নৌকাবিহার করলাম। তারপর বেশ কয়েকটি সুপ্রাচীন মন্দির দর্শন করে বিষ্ণুপুরের দিকে রওনা দিলাম।

সকাল সাড়ে নয়টায় পৌঁছলাম বিষ্ণুপুর শহরে। আমাদের পরিকল্পনা ছিলো, সারাদিন ঘুরে বিকেলেই ফিরবো খাতড়া শহরে।খাজুরাহো ও ভুবনেশ্বরের মতো বিষ্ণুপুর ও মন্দিরনগরী। মল্লরাজাদের পৃষ্ঠপোষকতায় গড়ে ওঠা এখানকার টেরাকোটার অসাধারণ শিল্পমণ্ডিত মন্দির গুলো  আজও বাংলার অতীত শিল্পগৌরবকে স্মরণ করায়। মন্দির দর্শন করে ৭টি বাঁধ দেখলাম।লালবাঁধ,কৃষ্ণ,গাঁতাতবাঁধ, কালিন্দী,যমুনা,শ্যাম ও পোকাবাঁধ বা বীরবাঁধ    ইতিহাসের নীরব সাক্ষী লালবাঁধের কাছাকাছি রাসমঞ্চের দক্ষিণে দেখলাম দলমাদল বা দলমর্দন কামান। অনেক ইতিহাস ও কিংবদন্তির নিয়ে ইতিহাসের নীরব সাক্ষী হয়ে আছে। বিষ্ণুপুরের    মন্দিরগুলোকে তিনভাগে ভাগ করে আমরা    দেখার পরিকল্পনা করলাম। প্রথমভাগ রাসমঞ্চ  থেকে কালাচাঁদ মন্দির, দ্বিতীয়ভাগ আচার্য   যোগেশচন্দ্র পুরাকীর্তি ভবন থেকে পাথরের রথ এবং তৃতীয়  ভাগ শহরের বিভিন্ন স্থানে ছড়িয়ে থাকা  অন্যান্য মন্দির। পায়ে হেঁটে চললাম মন্দির  পরিদর্শনে। পুরাকৃতি ভবনের উল্টো দিকে লাল মাটির পথ ধরে কিছুটা এগিয়ে গিয়ে আমরা দেখতে পেলাম  রাধাগোবিন্দ  মন্দির। মন্দিরগাত্রের কারুকার্য নষ্ট হলেও তার সামগ্রিক সৌন্দর্য এখনো অটুট আছে । রাধাগোবিন্দ মন্দিরের উল্টো দিকে রাধামাধব মন্দির।  এটি অসাধারণ শিল্পকর্মের নিদর্শন।এর বিশেষত্ব  মন্দিরগাত্রে  থাকা পঙ্খে অলংকরণে বাংলার দোচালা ধাঁচের  তিন খিলানের  প্রবেশদ্বার । এই মন্দিরের পিছনেই কালাচাঁদ মন্দির। মাকড়া পাথরে নির্মিত এই মন্দিরের গায়ে পঙ্খের  অলংকরণে যেমন কৃৃষ্ণলীলা ঠাই  পেয়েছে তেমনি   নজড় কাড়়ে এই মন্দিরের ভিতরে থাকা খিলান সহ বারান্দাটিও ।লালপাথের তৈরি দেবী ছিন্নমস্তার মন্দির দর্শন করে রাস মঞ্চের দিকে পা বাড়ালাম। তারপর মাকড়াা পাথরে তৈরি নন্দলাল মন্দির দেখলাম। বিষ্ণুপুরের রাসমঞ্চ এক অনুপম সৌধ। দূর থেকে দেখলে মনে হবে ধাপ কাটা একটি নান্দনিক সৌন্দর্যের পিরামিড। শাঁখারি বাজারে অবস্থিত টেরাকোটার অসাধারণ শিল্পমণ্ডিত মন্দির মদনমোহন মন্দির। এটা বিষ্ণুপুরের সুন্দরতম ও বৃহৎতম মন্দির। মুগ্ধ হলাম। মল্লরাজাদের অসাধারণ সৃজনশীল সৃষ্টি।মূলত মল্লরাজ রঘুনাথ সিংহ, গোপাল সিংহ, দুর্জন সিংহ এবং বীর হাম্বীরের রাজত্বকালে মন্দির গুলো নির্মিত হয়েছিল।এরপর পাথরের রথ দেখলাম। পথের পাশেই রয়েছে বিষ্ণুপুরের রাজবাড়ি।ঘুরে ঘুরে দেখলাম। সবশেষে লালবাঁধ দেখে  আচার্য যোগেশচন্দ্র পুরাকীর্তি ভবনে প্রবেশ করলাম। পুরাকীর্তির পাশাপাশি সংগ্রহশালা হিসাবে গুরুত্বপূর্ণ । বিষ্ণুপুরের লোকশিল্প ও সঙ্গীত ঘরনা সম্পর্কের বহু মূল্যবান তথ্য সংরক্ষিত আছে। মল্লরাজাদের  দেড়হাজার বছরের ইতিহাসে হাজার বছরের পুরাতন বিষ্ণুপুর নগরী সমৃদ্ধ হয়েছিল  গৌড়ীয় বৈষ্ণব ধর্ম -সংস্কৃতির পাশাপাশি রাজপুত-আফগান-মুঘল সংস্কৃতির  স্নেহস্পর্শে । আর এই ভিন্ন ভিন্ন সংস্কৃতির  সংমিশ্রণে জন্ম নিয়েছিল  বিষ্ণুপুরের নিজস্ব সভ্যতা, শিল্প, সংস্কৃতি। জন্ম নিয়েছিল বিষ্ণুপুরে ঘরানার মতো শাস্ত্রীয় সঙ্গীতের নয়া মার্গ। গড়ে উঠেছিল অনুপম রাসমঞ্চ। প্রচলন হয়েছিল দশাবতার তাসের। ছোট্ট পরিসরে এত বৈচিত্র্যময় সংস্কৃতির উত্থান ভারতের খুব কম জায়গায় দেখা যায়।

ইউনেস্কো বিষ্ণুপুরের মন্দিরগুলোকে world Heritage এর তকমা দিয়েছে। ভারত সরকার ও রাজ্য সরকার  বিষ্ণুপুরকে  Cultural Heritage হিসাবে ঘোষণা করেছে বেশকিছু দিন আগে । বিষ্ণুপুর মেলার জাতীয় মেলার মর্যাদা লাভ। এটা বড় প্রাপ্তি। জোড়বাংলা মন্দিরের গঠন রীতি একদমই আলাদা। দুটি সুবৃহৎ দোচালা সৌধের মাথার ওপর রয়েছে চারচালার একটি মিনার। জোড়বাংলা  গায়ে খোদিত টেরাকোটার প্যানেলগুলি মানুষের চোখ টানতে বাধ্য। বিশেষ করে রামায়ণ ও মহাভারতের বিভিন্ন ঘটনা যেমন টেরাকোটার মাধ্যমে চিত্রিত হয়েছে তেমনি স্হান পেয়েছে সমসাময়িক ঘটনাও। মৃন্ময়ী মন্দিরের পিছনেই রাজবাড়ির ধ্বংসাবশেষ। একটি এলাকাটি ঝোপঝাড়-জঙ্গলে ঢাকা এবং স্হানীয় এক শ্রেণীর মানুষের কাছে ফ্রি-টয়লেট জোন হয়ে গেছে। রাধেশ্যাম মন্দিরের পিছনেই রাধালালজিউ মন্দির। এই মন্দিরের গঠন অনন্য, একরত্ন বিশিষ্ট। সবচেয়ে বড় বৈশিষ্ট্য হল বাংলা ইঁটের তৈরি অদ্ভুত গঠনশৈলীর এক নাটমঞ্চ। মন্দিরের কাছেই রয়েছে মাকড়া পাথরের তৈরি ছোট পাথরের দরজা,বড় পাথরের দরজা এবং পাথরের রথ। শাাঁখারি বাজারের মদনমোহন মন্দির এক অনুপম শিল্পসৃষ্টি। শুধু মুগ্ধতার আবেশ। টেরাকোটা শিল্পের এক অনন্য নিদর্শন।

কয়েক ঘণ্টা ঘুরে দুপুরের খাওয়া পর্ব সারলাম একটি লজে। তারপর লালবাঁধে বেশ কিছু সময় কাটানোর পর কেনাকাটায় মন দিলাম সবাই ‌। এখানকার বালুচরি শাড়ির আঁচল জগৎখ্যাত‌। সারা বিশ্বের মানুষ এখানকার বালুচরি শাড়ির প্রেমে পাগল। ৫ হাজার থেকে দেড়লক্ষ টাকার শাড়ি পাওয়া যায়।  আমরা  একটি করে বালুচরী শাড়ি কিনলাম।  বিকাল ৩ টে নাগাদ  ফিরে চললাম নিজেদের শহরের উদ্দেশ্যে। পথে পাঁচমুড়া গ্রাম পড়লো। পোড়ামাটির শিল্পের জন্য এই গ্রাম জগৎবিখ্যাত।মন ভরে দেখলাম নানান ধরণের শিল্পসামগ্রী।পথে পেলাম চেঁচুরিয়া ইকোপার্ক। অসাধারণ একটি পিকনিক স্পট। কিছু সময় কাটানোর পর  রওনা দিলাম। পিছনে পড়ে রইলো শিল্প -সুর  আর জীবনের মেলা ।

সূর্য্য দেব ডুবতে চলেছে মুকুটমণিপুরের দিকে।  দু' দিনের মন্দিরনগরীর স্মৃতি রোমন্থন করতে করতে পৌঁছে গেলাম।

পথনির্দেশ:  কোলকাতা থেকে হাওড়া। হাওড়া থেকে  ট্রেনে বিষ্ণুপুর, রুপসী বাংলা (সকাল ৬) ও  শালিমার থেকে সকাল ৮-৩০ আরণ্যক এক্সপ্রেস, রবিবার বাদে।  পুরুলিয়া এক্সপ্রেস বিকেলে  ৪টে প্রতিদিন। রাজ্যরানী এক্সপ্রেস সকাল ৬-৪০ হাওড়া স্টেশন থেকে প্রতিদিন। ধর্মতলা থেকে সরকারি ও বেসরকারি  বাসে বিষ্ণুপুর। দূরত্ব ১৪০ কিমি। রেলওয়ে স্টেশন বিষ্ণুপুর।টোটো করে মূল শহরের বিভিন্ন স্থানে ঘুরতে পারবেন। ইচ্ছা করলে ৭০কিমি দূরে মুকুটমণিপুর, সুতানের সবুজ পাহাড় ও জঙ্গল, একটুখানি দূরে ঝিলিমিলি ঘুরে আসতে পারেন। কাছাকাছি বড় শহর, আরামবাগ, বাঁকুড়া,খাতড়া,ঝাড়গ্রাম ও দুর্গাপুর। যোগাযোগ ব্যবস্থা খুব ভালো।

থাকবেন কোথায়--অসংখ্য ছোট,বড় এবং ভালো মানের লজ, হোটেল এবং গেস্টহাউস আছে। সরকারি লজ বিষ্ণুপুর ট্যুরিস্ট লজ (পশ্চিমবঙ্গ রাজ্য পর্যটন দপ্তরের ট্যুরিস্ট লজ)। বেসরকারি লজ মোনালিসা, উদয়ন, লক্ষীপার্ক। এছাড়াও আছে নানান ধরনের হোটেল। মহকুমা শহর বিষ্ণুপুর। সাজানো গোছানো সুন্দর শহর। পরতে পরতে আভিজাত্যের ছোঁয়া।

 

ডঃ সুবীর মণ্ডল
লোকগবেষক প্রাবন্ধিক, অনুগল্প ও ছোটগল্প এবং ভ্রমণ কাহিনীর লে
বাঁকুড়া, পশ্চিমবঙ্গ, ভারত 

 

এই লেখকের অন্যান্য লেখা



আপনার মূল্যবান মতামত দিন:


Top