সিডনী বৃহঃস্পতিবার, ২১শে জানুয়ারী ২০২১, ৮ই মাঘ ১৪২৭

শাল--মহুয়ার দেশ, অরণ্য সুন্দরী ঝাড়গ্রাম : ডঃ সুবীর মণ্ডল


প্রকাশিত:
৬ জানুয়ারী ২০২১ ১৪:৩৮

আপডেট:
২১ জানুয়ারী ২০২১ ২০:৩০

 

লালমাটির দেশ আলোকরা  জলপাইরঙা মেয়ে দামিনীর আমন্ত্রন আসে বর্ষা শেষের সবুজ গন্ধ নিয়ে। কিন্তু নাগরিক জীবনের হাজারো ব্যস্ততা আর সময়ের টানাটানিতে অবসর মেলে না সহজে। তাই মন কেমন করা কোন এক কাকভোরে 'দ্যুত্তেরি' বলে, কেজো জীবনকে গুডবাই জানিয়ে কাঁধের ঝোলাটা তুলে নিয়ে বেরিয়ে পড়লাম শাল- মহুয়া আর পিয়ালের দেশে। শহরের অনর্গল ডিজেল-পেট্টোলের  শ্বাসরোধী কালো ধোঁয়া, নাগরিক জীবনের এই সময়ের উৎকণ্ঠা থেকে বাঁচতে, ফুসফুস ভরে  অক্সিজেন নিয়ে প্রাণশক্তিকে পুনরুজ্জীবিত করতে চাইলে আস্তে হবেই এই লালমাটির স্বপ্নপুরী শাল-পিয়ালের সবুজ উপত্যকার মাঝে।

ঝাড়খণ্ড-ওড়িশা সীমান্তে পশ্চিমবঙ্গের  সবুজ জেলা ঝাড়গ্রাম। অপার সৌন্দর্যের লীলাভূমি। প্রকৃতিতে প্রাধান্য পেয়েছে জঙ্গল। সবাই জঙ্গলমহল রূপে চেনে ও জানে। গাঢ় সবুজ অরণ্য দিগন্তে প্রসারিত, নীচেও  তার সবুজের সমুদ্র। আর লালমাটির কাঁকুড়ে মায়া মাখানো স্বপ্নময় পথ। এই দীর্ঘ সবুজ জঙ্গল ঘিরেই এখানকার প্রান্তভূমির সাধারণ মানুষের জীবন-যাপনের ছন্দ।এক সময় ছিল মল্লরাজাদের শাসিত খাসজঙ্গল। আনুমানিক ১৫০ বছর আগে  ইংরেজরা  মল্লরাজাদের কাছ থেকে অধিগ্রহণ করে এই অঞ্চল। কিছু দিন আগে স্বতন্ত্র জেলার স্বীকৃতি পেয়েছে। আদিবাসী জনগোষ্ঠীর স্বপ্নের গ্রাম দিয়ে ঘেরা  এই জেলা। উপছে পড়া বন্য রূপ নিয়ে দাঁড়িয়ে আছে, বুকে আছে অতীতের না বলা বর্ণময় নীরব ইতিহাস। সেই ইতিহাস ও ঐতিহ্যের খোঁজে আমাদের এই সফর।

 দীর্ঘদিনের  করোনা আতঙ্ককালে মনের জড়তাও বেড়েছে, কিন্তু দীর্ঘ ঘরবন্দি, দমবন্ধ জীবন থেকে পালিয়ে বিশুদ্ধ প্রকৃতি ও আবহাওয়ার মাঝে যেতে শৃঙ্খলিত মন উড়ু উড়ু করছিল বেশ কিছু দিন ধরে। শৃঙ্খলিত জীবন চাইছে কিছু সময়ের জন্য মুক্তি। হঠাৎ আমাদের একবন্ধু বলল,এখন ভালো পরিবেশ, রোদ ঝলমলে আবহাওয়া, চলুন একটু কাছে কোথাও ঘুরে আসি। আমার মন এটাই চাইছিল কিন্তু কোন সঙ্গী পাচ্ছিলাম না। বলা মাত্রই গত অগাস্টের শেষ রবিবার খুব ভোরে আমরা একটি গাড়ি নিয়ে  রওনা দিলাম অরণ্যসুন্দরী ঝাড়গ্রামের পথে। স্বাস্হবিধি মেনেই ভোর পাঁচটায় যাত্রা। আমাদের শহর থেকে দূরত্ব ৯০ কিলোমিটার। কোলাহল মুখর খাতড়া শহর থেকে সামান্য কিছু দূরে আসতেই পথের দুপাশে পেলাম সদ্য বর্ষায় স্নাত স্নিগ্ধ প্রকৃতি। মাঠের আল জুড়ে শরতের বার্তা নিয়ে জানান দিচ্ছে কাশ ফুল। প্রকৃতির অযাচিত উষ্ণ আহ্বানে মন ভরে গেল। শহর থেকে সামান্য এগিয়ে  বাঁকুড়া-ঝাড়গ্রাম রাজ্য সড়ক ধরলাম। জঙ্গল মহলের মসৃণ রাস্তা দিয়ে আমরা পঞ্চপান্ডব চলেছি  সাময়িক কয়েক ঘন্টার মানসিক চাপ মুক্তির সন্ধানে। ইতিমধ্যেই পূর্ব দিকে সূর্য দেব কাঁচা সোনা রঙ ছড়িয়ে উঁকি দিতে শুরু করে দিয়েছে। এ-এক অন্য ভুবনে বিচরণ করছি। এক মায়াবী  

পরিবেশ। শুধুই মুগ্ধতা। দ্রুত পাল্টে যাচ্ছে জঙ্গলমহলের রূপসী প্রকৃতি।

ছবিঃ লেখক ও তাঁর বন্ধু

গাড়ি দুরন্ত গতিতে এগিয়ে চলেছে,একে একে রানী বাঁধ- ঝিলিমিলি ভোলাভেদা -বাশঁপাহাড়ি অতিক্রম করে একটু চায়ের জন্য বিরতি। সামনে সোজা ঝাড়গ্রামে যাওয়ার স্বপ্নের পথ। ঢেউ খেলানো মসৃণ স্বপ্নের রাজপথ। ল্যাণ্ডস্কেপ অনেকটা মধুপুর-- শিমুলতলার যেন কালার ফটোকপি। স্বল্প বিরতির পর আবার পথ চলা শুরু করলাম। মন জুড়ে সুন্দরী অরণ্যকন্যা ঝাড়গ্রাম। ভাবনায় একটা ছবি এঁকে চলেছি, কাউকে বলতে পারছি না। সীমান্ত বাংলার সবুজ জেলা ঝাড়গ্রাম, রূপে, রসে-বর্ণে অনন্যা। নগরজীবনের কোলাহল মুক্ত এক স্বপ্নরাজ্য। কষ্টকল্পনা বনাম কঠিন কঠোর বাস্তব ভাবনায় বুঁদ হয়ে যাচ্ছি। গাড়ির কাঁচ সরিয়ে দিয়ে অপলক দৃষ্টিতে তাকিয়ে আছি। শাল -মহুয়ার জঙ্গলের ফাঁকে ফাঁকে সদ্য ওঠা  সূর্যের আলোর মায়াবী খেলা।মানস পর্দায় ভেসে উঠছে আমার ভালোবাসার সুবর্ণরেখা-ডুলুং-তারাফেনি নদীর মোহনীয় রূপ।ঘড়িতে৭টা ,আরকিছু বাদেই ঝাড়গ্রামে পৌঁছাবো । ভালো লাগছে, মন আনন্দে  ভরে উঠছে, একটা কথা ভেবেই,'পাহাড় -ঝর্ণা ,জঙ্গল,থ্রি ইন--ওয়ান হলো ঝাড়গ্রাম। গাড়িতে করে বাইরে বেরোলেই  মনের সব শহুরে উদ্বেগ এক লহমায় মুক্তি পেয়ে যায়। চেনা তবু অচেনা এক আজব অনুভূতি মস্তিষ্কের কম্পুযন্ত্রের সব হিসাব নিকেশ তছনছ করে দেয়।রাজ্য রাজনীতি, জাতীয় রাজনীতি ,টেনশন,পে-কমিশন, কোভিড১৯, পরিযায়ী শ্রমিকদের চরম দুর্দশা, ডি,এ- পুজোর বোনাস সব তালগোল পাকিয়ে বাষ্পায়িত ধূসর স্মৃতি। জানলা দিয়ে দেখলাম জঙ্গলমহলের গ্রামীণ প্রকৃতির জীবন্ত চলমান চালচিত্র। আকাশে ভাদ্রের বাদল মেঘের সঙ্গে সোনালী রোদের খুনসুটি। দিগন্তের সরলরেখায়  ধবল বকের দল। প্রকৃতির ক্যানভাসে  রিলিফের কাজ। দোহাই সভ্যতা এটুকু কেড়ে নিও না!! গাড়িতেই প্রাত:রাশের এলাহি ব্যাপার। ইচ্ছা মতো শুরু করলাম খাওয়া। ছুটে চলেছে আমাদের পঙ্খীরাজ। এক সময় ডাকসাইটে  সুন্দরীর মতোই নামডাক ছিল ঝাড়গ্রামের। শাল-পিয়ালে সাজানো প্রকৃতির সাজঘর। ঋতুভেদে বদলঘটে তার রূপে। এখন বাজারি সভ্যতার--সংক্রামক রোগ কিছুটা হলেও গ্রাস করেছে এই অরণ্য তনয়াকে। সকাল৭-৩০ - এ পৌঁছে গেলাম  রাজবাড়ির গেটে।

আমাদের গন্তব্যস্হল এখন রাজবাড়ি। উঁচু নিচু লাল কাঁকড়ে পথের দুপাশে আকাশছুঁয়ে থাকা শাল-- পিয়াল আর আকাশমণির সারি।এ - যেন প্রকৃতির ' গার্ড ওফ অনার'। অমিতাভ হঠাৎ  গলা ছেড়ে গেয়ে উঠল ----'গ্রাম ছাড়া ওই রাঙামাটির পথ'। ঝাড়গ্রামের রাজবাড়ি চকমিলানো রাজার বাড়ি। খিলেন দেওয়া লম্বা দেউড়ি।শ্বেতপাথরের মেঝে। বহু পুরানো এই রাজপ্রাসাদ।পরতে পরতে বনেদিয়ানার ছাপ। ইতিহাসের নীরব সাক্ষী হয়ে দাঁড়িয়ে আছে। সময়ের পায়ের ছাপ পড়েছে।স্হাপত্য ও নান্দনিক সৌন্দর্যে অসাধারণ। তবু  গঠনশৈলীর জাঁকজমক এখনও অমলিন বনভূমির নির্জনতায় এক অমিত্রাক্ষর বনেদিয়ানা। বর্তমানে একতলায়  রাজ্য পর্যটন দপ্তরের ট্যুরিস্ট লজ।বেশ কিছু সময় কাটানোর পর শহরের কাছাকাছি গুরুত্বপূর্ণ জায়গা ঘুরে দেখতে শুরু করলাম, একেএকে, রাজকলেজ, রবীন্দ্রকানন, আর্ট আকাদেমি, আদিবাসী সংস্কৃতিচর্চা কেন্দ্র, বিদ্যাসাগর বাণীভবন, কদম কানন মৃগদাব, চিড়িয়ানা। বেলা১২নাগাদ রাস্তার পাশে একটি হোটেলে দুপুরের খাওয়া পর্ব সারলাম। সময় নষ্ট না করে পথে পা বাড়ালাম, এবার চিল্কিগড় অভিযান ও কণকদুর্গার মন্দির দর্শন। শহর ছাড়তেই রাঙামাটির জঙ্গলমহলের পথ। মনে পড়ে যায় 'আরণ্যক'এর  সত্যচরণের  জঙ্গলমহল পরিদর্শনের কথা। গাড়ি চলছে, কিছু দূরে যেতেই প্রকৃতি পালটে গেল  মুহূর্তে। উঁচু নিচু ঢেউ খেলানো  ধূলো ওড়াপথে ছুটে চলছে আমাদের আদরের পঙ্খিরাজ। পথের দুপাশে ইউক্যালিপটাস আর শিরীষের পাতায় পাতায় রোদের ঝিকিমিকি। বেশ রোমাঞ্চকর অনুভূতি। সবুজে ঘেরা দশ কিঃমিঃ পথের শেষে এসে পৌঁছলাম চিল্কিগড়ে।ঘন সবুজে মোড়া এক চিলতে পাহাড়ি জমি। অপরূপ তার শোভা। মানুষজনের কোন দেখা মিলল না। প্রকৃতির নির্জন নগ্নতায় বিভোর আমরা কটি আধা শহুরে মন। পিচ রাস্তা ছেড়ে এসে ডানদিকে লাল মাটির রাস্তা দিয়ে চলে গেছে মন্দিরের পথ। রাস্তার দুই পাশে ঘন সবুজ জঙ্গল, আলো-আঁধারিতে ঢাকা বাঁকের পর বাঁক-- গাছছম করে উঠলো আমাদের। এক সময়ে নরবলি হতো এই মন্দিরে, এখনও মহানবমীর দিন ছাগল বলি দেওয়া হয়। ডুলুং নদীর তীরে অবস্থিত মন্দির। অনেক কিংবদন্তি জড়িয়ে আছে মন্দিরের সঙ্গে। কথিত আছে ঝাড়গ্রামের পূর্বতন এক রাজা স্বপ্নাদেশ পেয়ে নির্মাণ করেন মন্দির। শতাব্দী প্রাচীন এই মন্দির। গাড়ি, সামনের মাঠে রেখে আমরা নীচের দিকে নামতে লাগলাম। সামান্য কিছু দূরে যেতেই দেখলাম তির তির করে বয়ে চলেছে ভালোবাসার নদী ডুলুং। শীতে ক্ষীণকায়া হলেও বর্ষায় দেবীর মতোই রুদ্ররূপ  ধারন করে আছে। আমরা তার রুদ্ররূপ দেখলাম। মন্দির ঘিরে রয়েছে অজস্র নামীদামী  গাছপালা ও ভেষজ উদ্ভিদ। পাখির কলরবে মুখরিত জনমানবশূন্য পরিবেশে মুগ্ধ হলাম সবাই। জলাধারে বোটিং এর ব্যবস্হা আছে। সূর্যদেব পশ্চিমে  পাড়িদিতে চলেছেন। তাঁর রক্তিম আলোর ছটা সবুজের আস্তরন ভেদ করে মাটিতে পড়ে লুটোপুটি খাচ্ছে। কানে এলো নীড়মুখী  পাখিদের কলকাকলি। বনভূমির মৌনতা ভেঙে মনে হলো কোন অদৃশ্য শিল্পী যেন ঝিঁঝিটের আলাপে নিমগ্ন। করি গুরুর ফকিরের কথা মনে পড়ে গেল,। - সেই ক্রৌঞ্চদ্বীপ। যেখানে আকাশের রঙ,পাখির রঙ, পাহাড়ের রঙ মিলে সে এক মহাকাণ্ড। আসলে প্রকৃতির যাদুঘরে  ঘুরতেই কখন সন্ধ্যা ঘনিয়ে এলো বুঝে উঠতে পারছিলাম না। ডুলুং নদীর দুপাশের অরণ্যে  সন্ধ্যা নামছে। কী অনাবিল, কী গভীর সৌন্দর্য। মন জুড়ে যেন কিসের আচ্ছন্নতা। এবার ফেরার পালা। ফেরার পথে মনে মনে বলি  ঘুমোও তুমি চিল্কাগড়। আঁধারের নির্জনতাকে  বুকে ধরে তুমি ঘুমোও। একটু দূরে জাগ্রত সাবিত্রী মন্দির দর্শন করতে গেলাম। জীর্ণ মন্দিরের ইঁটের গায়ে কান পাতলেই আজ ও শোনা যাবে রাজকাহিনী। সাবিত্রি মন্দিরকে ঘিরে আছে নানান ধরনের লোককথা ও রোমাঞ্চকর কাহিনী। ইতিহাসের এক নীরব সাক্ষী এই জাগ্রত লোকদেবীর পবিত্র মন্দির। স্হানীয় আদিবাসীদের কাছে এই মন্দিরের অধিষ্ঠাত্রী দেবী জাগ্রত। বনভূমির জৈবিক অভিভাবিকা। দেবীমূর্তি উচ্চতায় দু-ফুটের কাছাকাছি। সোনার পাতে মোড়া। মন্দিরের গৃহে সন্ধ্যার  আঁধারে দেখলাম প্রদীপ জ্বলছে। গর্ভগৃহের দরজার চৌকাঠে বসে আমরা। দক্ষিণেশ্বরের  ঠাকুরের কথা মনে পড়ে গেল। দেবীমৃন্ময়ী নন চিন্ময়ী।প্রাণের মানুষ,মনের মানুষ। সাষ্টাঙ্গে সবাই প্রণাম নিবেদন করলাম। এ-এক অন্য ভুবনে বিচরণ করছি। সারা দিনের অফুরান অভিজ্ঞতার ঝুলি ভরিয়ে  রওনা দিলাম, রাজবাড়ির পথে। পিছনে নির্জন আঁধার গায়ে মেখে পড়ে রইলো চিল্কিগড়, সাবিত্রী মন্দির , ডুলুং নদী আর----- কনক দূর্গার মন্দির।

অনেক ক্লান্তি নিয়ে ফিরে দেখি রাজবাড়ির দেউড়িজুড়ে হাজার ঝাড়বাতির মনোমুগ্ধকর মালা। এ যেন রূপকথার স্বপ্নপুরী। এক অন্য জগতে এক অনন্য পরিবেশ। স্বীকার করতে কোন দ্বিধা-দ্বন্দ্ব নেই, সরকারি তত্ত্বাবধানে ঝাড়গ্রামের রাজবাড়ির  অতিথি শালায়  পেলাম আভিজাত্য আর আধুনিকতার এক অপরূপ যুগলবন্দী। রাত ১১টায় রাতের খাবার পর্ব সারলাম।ব্যালকোনিতে সবাই চেয়ার পেতে বসলাম। রাতের ঝাড়গ্রামের সৌন্দর্য উপভোগ করতে লাগলাম। শুধুই মুগ্ধতা। পরিশ্রান্ত দেহ নিয়ে যে যার রূমে চলে গেলাম এবং ঘুমের রাজ্যে পাড়ি দিলাম। পরের দিন সকাল বেলায়,   প্রাতঃরাশ সেরে এক চক্কর ঘুরে এলাম ঝাড়গ্রামের ডিয়ারপার্কে। ভীষণ ভালো লাগলো। সংরক্ষিত বনাঞ্চল। অবাক চোখে তাকিয়ে দেখলাম, ৩০/৪০টা হরিণের দল হলদে আগুন ছড়িয়ে গাছের ফাঁকে ফাঁকে ছুটে বেড়াচ্ছে। ফেরার পথে পড়ল সারদাপীঠ। আশ্রমের অধ্যক্ষা খুবই স্নেহপ্রবণ ও অতিথি পরায়না। আমাদের সাদর অভ্যর্থনা জানাতে কোন  কার্পণ্য করেননি। কোলাহল বর্জিত  শান্ত স্নিগ্ধ, ভাবগম্ভীর পরিবেশে মন, প্রাণ সার্থক করে নিতে আমাদের বেশি সময় লাগলো না। বেলা বাড়তেই  হ্যাভারস্যাকে লাঞ্চ প্যাকেট নিয়ে  রওনা  দিলাম বেলপাহাড়ী, ঘাঘরা আর কাঁকড়াঝোরের  দিকে। সময় সকাল ১১টা। জঙ্গলের হাতছানি এড়িয়ে যাওয়া দায়!! শাল-পিয়াল-মহুয়ার দল ডালপালা ছড়িয়ে সম্মোহনী অভ্যর্থনায় আকূল। হ্যামলিনের বাঁশুরিয়া বোধ হয় গাছ হয়ে জন্মেছে। বনানীর আমন্ত্রণে  আমাদের গাড়ি পঙ্খিরাজ  ছুটে চলল বেলপাহাড়ীর দিকে। পথের দূরত্ব ৪০/৪৫কিমি-এর মতো। আজকের আকাশটা মেঘলা মেঘলা। আকাশ জুড়ে রৌদ্র --ছায়ার লুকোচুরি খেলা দেখছি। শিরশিরে একটা হাওয়া বইছে। হরিণী ভীরু চোখের মতো থিরথির করে কাঁপছে পথের দুপাশে ভিড় করে থাকা গাছ-গাছালির পাতাগুলো। খুব চেনা কোন  মাটির গন্ধে বুক ভরে ওঠে। বেলপাহাড়ী পৌঁছে আদরের গাড়িকে একটুখানি বিশ্রাম দেওয়া হলো। মিনিট ৩০এর মতো ট্রেক করে পৌঁছে গেলাম আরেক স্বপ্নপুরী ঘাঘরায়। পটে আঁকা ছবিরই মতো নিবিড় শান্ত মনোরম অরণ্য উপত্যকা। যাত্রাপথে অনাস্বাদিত রোমাঞ্চকর অনুভূতি পেলাম। অনেকেই এই অঞ্চলকে মিনি কাশ্মীরের  সঙ্গে তুলনা করেন। ভাবাবেগে তাড়িত হয়ে হঠাৎ সুজিত গান গেয়ে ফেললো, "ওরে আগুন লেগেছে বনে বনে'----ঘাঘর, বেলপাহাড়ী, ঢাঙিকুসুম, হাসাডুংরী, শিমুলপাল লালজল পাহাড় । কানাইসর, লাখাইসিনি, বড় পাহাড়--------শালপিয়াল আর ইউক্যালিপটাস, সোনাঝুরির  অমলতাসের বনবাসর। চারপাশে পাহাড়। তার মাঝে এলোমেলো পাথরের গায়ে ধাক্কা খেয়ে তিরতির করে ছুটে চলেছে অনাবিল জলধারা। উপলব্যথিত গতি।যেন এক পাহাড়ী মেয়ে পায়ে নূপুরের আওয়াজ তুলে পাথর ডিঙিয়ে ছুটে চলেছে, মৌন বনভূমির তপোভঙ্গ করে।নুড়ি পাথর আর বালির শরীরে তিরতির করে বয়ে চলেছে ঘাঘরা। তার দু'কুল ছাপিয়ে পরা জঙলী সবুজের প্রেম। সিল্যুয়েটের মতো দাঁড়িয়ে আছে অতীতের যোগসূত্র ভাঙা ব্রিজটা, তার দু'কুল ছোঁয়ার কোন  ইচ্ছাই নেই। স্রোতের ঘুর্ণনে,পাথর ক্ষয়ে ক্ষয়ে কলসীর আকৃতি ধারণ করেছে। এই অঞ্চলের মানুষ নাম দিয়েছে ঘাঘর, তার থেকে ঘাঘরা অর্থাৎ কলসী। এখানকার আদিবাসী জনগোষ্ঠীর  মানুষ দেবতা জ্ঞানে পুজো করেন।  ঘাঘরার মাঝ দিয়ে বয়ে চলেছে তারাফেনি। 

কংসাবতীর জলবন্দি হয়েছে ১০টি লগগেটের মাধ্যমে। ৬০ফুট  উঁচু থেকে নামছে তারাফেনির রূপালী জলরাশি। এই যে অনন্য দৃশ্য।অরণ্য দুহিতা বেলপাহাড়ীকে কেন্দ্র করে গড়ে উঠেছে অসাধারণ কিছু পর্যটন কেন্দ্র। যেগুলো না দেখলে অসম্পূর্ণ থেকে যাবে গোটা ঝাড়গ্রাম  সফর। খাদারানী ঝিল, শাল জঙ্গলে ঘেরা প্রাকৃতিক ঝিল। শীতকালে পরিযায়ী পাখির মেলা বসে। মাঝে মাঝে বুনো হাতির দল জল খেতে আসে। বেলপাহাড়ী ঘুরতে গিয়ে সূর্যাস্ত দেখার একমাত্র জায়গা হলো গড়রাসিনি পাহাড়। চারিদিকে প্রকৃতির অপরূপ ছড়িয়ে আছে। এক অজানা নিস্তব্ধতা বিরাজ করছে।লালজল পাহাড় ও গুহার সৌন্দর্য উপভোগ করলাম। বিকাল বেলায় তখন সূর্যের আলো লালজল পাহাড়ের কালো পাথরের ওপর পড়ে তখন অপরূপ লাগে। দিগন্ত বিস্তৃত সবুজ উপত্যকার মাঝে শান্ত স্নিগ্ধ বেলপাহাড়ী।ঘন সবুজের ঘেরা টোপে ছোট্ট আদিবাসী জনগোষ্ঠীর স্বপ্নের জনপদভূমি। প্রকৃতি যেন তার রঙিন ডানা মেলে রয়েছে। সহজ, সরল আদিবাসী মানুষ গুলোর হৃদয় ওপড়ানো অকৃত্রিম ভালোবাসা প্রকৃতির অপরূপ ক্যানভাসে ঠিক যেন পটে আঁকা ছবি।বেলপাহাড়ীর ঢাঙিকুসুম এক কথায় অনন্য। জায়গাটা কিছুটা হলেও দুর্গম। দুদিকে পাহাড় আর পাহাড়ের কোলে সবুজ ধানক্ষেত। যেন প্রকৃতির সবুজ কার্পেট। এইভাবেই আমাদের স্বাগত জানাল ঢাঙিকুসুম। এখানে  মেঘ যেন গাভীর মতো চরে। শুধু সবুজের সমারোহ। নির্জনতাই ভাষা। অপার বিস্ময় নিয়ে দাঁড়িয়ে আছে সবুজ উপত্যকা। চড়াই-উৎড়াই ছাড়াও ছোটবড় পাথরের সমাবেশ জায়গাটিকে আ্যডভেঞ্চার প্রিয় মানুষের প্রিয় জায়গা করে তুলেছে। ঢাঙিকুসুমের শেষ প্রান্তে ডুংরী ফলস। এই ঝর্ণা বেলপাহাড়ীর লুকানো সম্পদ।বর্ষায় মাঝে মাঝে হড়কাবান আসে। দূর জঙ্গলের মধ্যে চোখে পড়ল হাতের তালুর মতো দু'-একটা সাঁওতালি গ্রাম। খড়ে ছাওয়া মাটির বাড়ি। মাটির দেওয়ালের গায়ে রঙ আঁকা লতাপাতার বিচিত্র ডিজাইন। দারিদ্র্য আর শিল্পবোধের অকৃত্রিম সহাবস্থান। অপলক নয়নে সেই অরণ্য শোভার দিকে তাকিয়ে থাকতে থাকতে মনে হলো প্রকৃতির তুলির টানে অবনঠাকুরের কি রামকিঙ্করের কল্পনার ছোঁয়া। সময় বিকাল ৪টা এবার গন্তব্যস্হল  প্রকৃতির স্বর্গভূমি কাঁকড়াঝোর। বেলপাহাড়ী থেকে দূরত্ব মাত্র ২৫কিমি। তাড়াতাড়ি পৌঁছে গেলাম।৭হাজার হেক্টর জমিতে সবুজ অরণ্য। সৌন্দর্যের লীলাভূমি ও অমরাবতী। একসময়ে মাওবাদীদের ডেরা ছিল। আজ তার শুধুই অতীতের কথকতা। গাড়ি চলছে ধীরে ধীরে। চলার পথে প্রকৃতি পালটে যাচ্ছে। একটু শিহরণ জাগছে। নানান ধরণের গাছে ভরা অরণ্য।

সূর্য বলছে পূর্ব থেকে পশ্চিমে। ক্রমশ ঘন হচ্ছে জঙ্গল। যাত্রাপথের চারপাশে জমাট বেঁধে আছে অস্বাভাবিক নীরবতা। এ-যেন আমার পৃথিবী নয়, এখানে আমরা অনুপ্রবেশকারী। এবার ফেরার পালা।এখান থেকে আমাদের শহর খাতড়ার দূরত্ব মাত্র ৫০কিমি। দিনান্তের ম্লান আলোয় উঁচু পাহাড়গুলোর মাথা গেরুয়ারঙে মৌন,তপস্বীর মতো সমাহিত। আমরা তখন ফেরার পথে, হঠাৎ কানে ভেসে আসে সাঁওতালি মেঠোসুর। মাদলের চাপা আওয়াজ দ্রিমি দ্রিমী। সে সুর কেমন যেন মাতাল করা। চেয়ে দেখি দূর  পাহাড়ের গায়ে গাছের ফাঁকে ফাঁকে আল পথ বেয়ে চলেছে একদল সাঁওতালি পুরুষ আর রমনী। মেয়েদের মাথায় গোঁজা বনফুল, নাকে নোলক পায়ে মল সহ ঘুঙুর। মাথায় জঙ্গলের ডালপালার বোঝা। দলের শেষে সাঁওতাল যুবকদের হাতে মাদল।যেন অবশ করা ঘুম পাড়ানি বোল। সবকিছু দেখে মনে হলো ঘুঙুর আর মলের শব্দে ঢাকার চেষ্টা করছে অভাব আর জীবনের অপ্রাপ্তির ক্ষত। গাড়ি চলছে দুরন্ত গতিতে। ঝিলিমিলি -বাঁশপাহাড়ী  অতিক্রম করে রানীবাঁধের   ১২মাইল পেরিয়ে চলেছি। ঝিলিমিলি আর রানীবাঁধের পাহাড়ের পিছনে লাল রঙের পূর্ণিমার চাঁদ চুপিসারে উঠেছে, সবুজ অন্ধকারে। আমরা প্রায় বাড়ির কাছাকাছি চলে এসেছি। দুই দিনের প্রাপ্তির স্মৃতি রোমন্থন করতে করতে বিভিন্ন জনপদভূমি অতিক্রম করছি। মন ভারাক্রান্ত। আবার সেই কেজো জীবনে প্রত্যাবর্তন। ঘড়িতে তখন রাত এগারোটা বেজে গেছে। মন জুড়ে একটা মুগ্ধতা ও বিষন্নতা। রাতবাড়ে, পাহাড়, জঙ্গল আর নদীর গান শেষ হয় না। আকাশ ভরা তারায় তারায়  শেষ হলো জঙ্গল জীবনের বর্ণময় এক ভ্রমণের জীবন।

পথের নির্দেশঃ 
কোলকাতার হাওড়া থেকে ইস্পাত এক্সপ্রেসে--  ঝাড়গ্রাম স্টেশন। তারপর প্রাইভেট কার অথবা বোলোরো/মারুতি ভ্যান ভাড়া করে ভ্রমণ। এছাড়াও ধর্মতলা থেকে সরকারি বাসে  ঝাড়গ্রাম। প্রচুর থাকার সুযোগ আছে। হোটেল আছে ভালো মানের। আছে বেসরকারি লজ।খাতড়ামহকুমা শহর, বাঁকুড়া, পুরুলিয়া এবং দুর্গাপুর  থেকে সরকারি বাসে ঝাড়গ্রাম স্টেশন। অথবা ভাড়া গাড়িতে সরাসরি যাওয়া চলবে। অনলাইন বুকিং হয় হোটেলের।রাজ্য সরকারের অধীনে পর্যটন নিগমের ওয়েবসাইট থেকে জানা যাবে সব প্রয়োজনীয় তথ্য।  হাতে সময় থাকলে ঘাটশিলা  ঘুরে নেওয়া যেতে পারে। খুব কাছাকাছি ভালো পাহাড় গালুডি- টাটা- জামশেদপুর।

 

ডঃ সুবীর মণ্ডল, গবেষক, প্রাবন্ধিক, ছোটগল্প ও ভ্রমণ কাহিনীর রচয়িতা
বাঁকুড়া, পশ্চিমবঙ্গ, ভারত

 

এই লেখকের অন্যান্য লেখা



আপনার মূল্যবান মতামত দিন:


Top