সিডনী রবিবার, ৩রা মার্চ ২০২৪, ২০শে ফাল্গুন ১৪৩০

সহায়তা পেলে বিশ্বজয় করবে বাংলাদেশের জুয়েলারি


প্রকাশিত:
৯ ফেব্রুয়ারি ২০২৪ ১৯:৪২

আপডেট:
৩ মার্চ ২০২৪ ১৬:০৭


সোনার দাম কখনো কমে না, একই সঙ্গে বিপদের বন্ধু হিসেবে পাশে দাঁড়ায়। জুয়ালারি শিল্প পুনরুজ্জীবিত হলে বাংলাদেশ থেকে সোনার অলংকার রপ্তানি করা সম্ভব। শুধু প্রয়োজন সরকারের সহায়তা, ভ্যাট-ট্যাক্স কমানো। এতে সোনা রপ্তানির পাশাপাশি সরকারের রাজস্ব আয়ও অনেক বাড়বে।


বৃহস্পতিবার (৮ ফেব্রুয়ারি) রাজধানীর ইন্টারন্যাশনাল কনভেনশন সিটি বসুন্ধরার (আইসিসিবি) নবরাত্রি হলে তৃতীয়বারের মতো বাজুস ফেয়ার-২০২৪ উদ্বোধন করা হয়েছে। প্রধানমন্ত্রী শেখ হাসিনার ভিশন-২০৪১ সফল বাস্তবায়ন এবং দেশের জুয়েলারি শিল্পীদের হাতে গড়া অলংকার দেশে-বিদেশে তুলে ধরতে ও পরিচিতি বাড়াতে এ ফেয়ারের আয়োজন করা হয়েছে। এবারের মেলার প্রতিপাদ্য হলো 'সোনায় বিনিয়োগ, ভবিষ্যতের সঞ্চয়'।

ফিতা কেটে তিন দিনের এই আয়োজনের উদ্বোধন করেন বসুন্ধরা গ্রুপের ব্যবস্থাপনা পরিচালক ও বাংলাদেশ জুয়েলার্স অ্যাসোসিয়েশনের (বাজুস) প্রেসিডেন্ট সায়েম সোবহান আনভীর।


এ সময় উপস্থিত ছিলেন বসুন্ধরা গ্রুপের পরিচালক আহমেদ ইব্রাহিম সোবহান, বাজুসের সাধারণ সম্পাদক বাদল চন্দ্র রায়, ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয় চারুকলা অনুষদের এমেরিটাস প্রফেসর ও চিত্রশিল্পী রফিকুন নবী, ইউনেস্কো আর্টিস্ট ফর পিস ও বিশ্ববরেণ্য ফ্যাশন ডিজাইনার বিবি রাসেল, বাজুসের অ্যাম্বাসেডর ও শিল্পী মমতাজ বেগম, নিউজ২৪ টিভির বার্তা সম্পাদক শাহনাজ মুন্নি, রূপসজ্জা বিশেষজ্ঞ আফরোজা পারভীনসহ বাজুসের নেতৃবৃন্দ।
মূল বক্তব্যে বাজুসের সাধারণ সম্পাদক বাদল চন্দ্র রায় বলেন, সোনার দাম কখনো কমবে না, সব সময় বাড়বে। সোনা এমন একটা ধাতু যেটা মানুষের মধ্যে বন্ধন সৃষ্টি করে। ইমোশনাল ভ্যালু এর মধ্যে যুক্ত।


আপনার কাছে যতো টাকার সম্পদই থাকুক না কেন, সোনাই একমাত্র বন্ধু। যদি রাতে ২টার সময় বিপদে পড়েন, টাকার দরকার হয় হয়, তাহলে আপনি সোনা দিয়ে টাকা নিতে পারবেন। বিপদ থেকে উদ্ধার হতে পারেন। কিন্তু অন্য সম্পদ দিয়ে তা পারবেন না।
তিনি বলেন, আমাদের এখন লক্ষ্য হচ্ছে, কিভাবে এই শিল্পটাকে সুন্দরভাবে গড়ে তুলতে পারি।


আমাদের প্রেসিডেন্ট সায়েম সোবহান আনভীরের নেতৃত্বে তিন বছরে একটা প্লাটফর্ম গড়ে তুলতে পেরেছি। এটা খুবই প্রসংশনীয়। এর আগে এভাবে কোনো প্লাটফর্ম গড়ে তুলতে পারিনি। সরকারের সহযোগিতায় এবং আমাদের চেষ্টায় এই শিল্পকে রেকর্ড পর্যায়ে নিয়ে যেতে চাচ্ছি। যেখানে লেদার, গার্মেন্টস শিল্প ভালো করছে। সেখানে এই জুয়েলারি শিল্প অনেক পুরোনো শিল্প। এই শিল্পে কেনো আমরা পিছিয়ে আছি। এখান থেকে আমাদের বেরিয়ে আসতে হবে। আজকে আমাদের প্রধানমন্ত্রী স্মার্ট বাংলাদেশের স্বপ্ন দেখছেন। আমরাও আশা করবো এই শিল্পটাকে আমাদের প্রেসিডেন্ট সায়েম সোবহান আনভীরের নেতৃত্বে এই শিল্পকে স্মার্ট শিল্পে নিয়ে যেতে পারি।
তিনি আরও বলেন, আমাদের ভ্যাট, ট্যাক্স যদি সরকার কমায় তাতে আমাদের সুবিধা। সরকার হয়তো ভাবছে ভ্যাট-ট্যাক্স কমালে আমাদের রাজস্ব আয় কমে যাবে। আমি সরকারকে জোর গলায় বলতে পারি, ভ্যাট-ট্যাক্স কমালে সরকারের রাজস্ব বাড়বে।

ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয় চারুকলা অনুষদের এমেরিটাস প্রফেসর ও চিত্রশিল্পী রফিকুন নবী বলেন, অলংকার নিয়ে একটি ইন্সটিটিউট স্থাপনের কথা হচ্ছে। এটাতো প্রাতিষ্ঠানিকভাবে কোথাও নেই। কিন্তু খুচরাভাবে রয়েছে। এইটাকে সংগঠিত করে যদি কিছু করা যায় তাহলে এটা অনেক বড় ঘটনা ঘটে যাবে। সেরকম ঘটনা ঘটাতে চাইলে যদি আপনারা সংঘবদ্ধভাবে চষ্টো করেন, তাহলে এটা সম্ভব। আর এর পেছনে যতো রকমের সাহায্য দরকার, সেটা আমাদের শিক্ষার সাথে জড়িত যারা, শিল্পকলা, চারুকলার সঙ্গে জড়িত যারা সবাই মিলে একটি সাংগঠনিক প্রতিষ্ঠান যদি দাঁড় করানো যায় তাহলে এটাও অনেক বড় ঘটনা ঘটবে।

তিনি বলেন, ট্র্যাডিশনাল জিনিসগুলোকে রক্ষা করতে হবে। স্বর্ণশিল্পে আমাদের নিজস্ব ট্র্যাডিশনাল লুক আছে। যেটা ক্রমশ হারিয়ে যাচ্ছে। পশ্চিমা ডিজাইনের চাপে। অন্য দেশের ট্র্যাডিশনের সঙ্গে আমাদের দেশের ট্র্যাডিশন মিশে যাচ্ছে। সেখান থেকে আমরা যদি স্বর্ণশিল্পের জন্য কোনো ইনস্টিটিউট তৈরি করতে পারি তাহলে ট্র্যাডিশনাল ডিজাইন রক্ষিত হবে। এই শিল্প যদি পুনরুজ্জীবিত হয়, তাহলে আমাদের দেশ থেকে সোনা রপ্তানি করা সম্ভব হতে পারে।

ইউনেস্কো আর্টিস্ট ফর পিস ও বিশ্ববরেণ্য ফ্যাশন ডিজাইনার বিবি রাসেল বলেন, আমি দেশের এক জেলা থেকে আরেক জেলা, এক গ্রাম থেকে আরেক গ্রামে চষে বেড়াই। আমি বলতে চাই, প্রতিটি অঞ্চলে ওদের একটা নিজস্ব ডিজাইন আছে। সোনা পুরো পরিবারের সম্পদ। আজকে গয়না বিক্রি করা আনেক সহজ। বাড়ি, গাড়ি, জমি বিক্রি করতে অনেক রকম ফরমালিটিস আছে, দৌড়াতে হয়। কিন্তু সোনা খুব সহজে বিক্রি করা যায়। আমি আফ্রিকাতেও দেখেছি, যখন কোনো নারী পয়সা বানায়, তখন তিনি সোনা কিনে রেখে দেন। পাশের দেশ যাবেন, এশিয়াতেও আমি কাজ করেছি। সবখানে এটা করা হয়।

তিনি বলেন, আমি বাজুস প্রেসিডেন্টকে বলবো, আমাদের দেশের নিজস্ব কিছু ডিজাইন, সেটাকে সহজ করা। কিছু ডিজাইন আছে যেটা দিয়ে আমরা জিআই করতে পারি।

বাজুসের অ্যাম্বাসেডর ও শিল্পী মমতাজ বেগম বলেন, 'প্রেসিডেন্ট সায়েম সোবহান আনভীরের মতো সঠিক-দক্ষ মানুষের নেতৃত্বে বাজুস এগিয়ে যাচ্ছে। এতে চমৎকার সম্ভাবনা ও ভবিষ্যৎ দেখতে পাচ্ছি। গ্রামে-গঞ্জে আমাদের মতো অনেক শিল্পী আছে, জুয়েলারি শিল্পকে প্রচারের জন্য যদি আমাদের কাজে লাগান তাহলে ভালো হবে। স্বর্ণ নারীদের পছন্দের, তাদের সম্পদ, এই বিষয়টা যখন আমরা তাদের বুঝাইতে পারবো ততো মানুষের আকর্ষণ বাড়বে, দাম যতোই হোক। তাহলে দেখা যাবে, নারীরা তাদের সম্পদ হিসেবে সংগ্রহে রাখার জন্য উৎসাহিত হবেন। প্রচারের জায়গাটা বাড়াবেন। আমাদের লোক দরকার, ডিজাইন দরকার। যেগুলো পুরোনো দিনের ডিজাইন, সেগুলো আমরা নাম শুনেছি। সেগুলোকে নতুন প্রজন্মের সামনে নিয়ে আসতে হবে, তাদের কাছে তুলে ধরতে হবে। তাহলে তারা গহনার প্রতি আকৃষ্ট হবে।

অভিনেত্রী, আবৃত্তিকার ও নির্মাতা রোকেয়া প্রাচী বলেন, 'বাংলাদেশ জুয়েলার্স অ্যাসোসিয়েশন যে স্বপ্ন দেখেছে, যে স্বপ্নের বাস্তবায়ন করছেন, যে একদিন বাংলাদেশের সোনা বিশ্বের কাতারে দাঁড়িয়ে বাংলাদেশের পতাকা ওড়াবে। সেই পদযাত্রায় আপনারা অনেকখানি এগিয়ে আছেন। আজকের আয়োজন দেখে মনে হচ্ছে, এখন যেমন সোনা কিনতে দুবাই বা সিঙ্গাপুরে যায়, হয়তো ভিসা করে শুধুমাত্র বাংলাদেশের ডিজাইন করা সোনা কেনার জন্য বাংলাদেশে আসবে। সেদিন খুব বেশি দূরে নয়। এর সঙ্গে অনেক মানুষ, অনেক শিল্পী, গুণী মানুষ জড়িত আছেন। স্বপ্নটাকে যদি বাস্তবায়ন করার পদ্ধতি নেওয়া যায়, তাহলে এরকম কাজ করা খুব সহজ।

তিনি বলেন, আমাদের মায়েরা, দাদিরা সিন্দুকে স্বর্ণ লুকিয়ে রাখতেন। বাড়িতে যখন কোনো বিপদ আসতো,সেই বাড়ির প্রয়োজন, সংসার ও পরবর্তী প্রজন্মের প্রয়োজনে সেই গহনাগুলো বিনিয়োগ করে গেছেন মা-দাদিরা। এটাই আমাদের বাংলাদেশের ঐতিহ্য ও পরম্পরা। কাজেই বিনিয়োগ আমাদের রক্তে ঐতিহ্যে আছে। এই আয়জনের সঙ্গে অবশ্যই ছোট-বড় বিনিয়োগকারীরা যুক্ত হবে। আর এখন যে বাংলাদেশে আছি, এখানে শুধু আয়োজন করার জন্য উদ্যোক্তা প্রয়োজন। কাউকে সামনে দাঁড়াতে হবে নেতৃত্ব, দিতে হবে, শুরু করতে হবে। দেখবেন আপনি যখন পথ দেখাবেন, আপনার পথ দেখে অনেক মানুষ এগিয়ে যাবে।

মহিলা আওয়ামী লীগের সভাপতি মেহের আফরোজ চুমকি বলেন, 'এটা সবচেয়ে ভালো সময়, জুয়েলারি শিল্পে বিনিয়োগ করার। সোনা আমরা সম্পদ হিসেবে রাখতে পারি। শুধু আমরাই নয়, আমাদের কেন্দ্রীয় ব্যাংকেও সোনা মজুত রাখতে হয়। গার্মেন্ট খাতে সে উন্নতি হয়েছে, আশেপাশের দেশের চেয়ে অনেক দূর এগিয়ে গেছি। তাহলে এই জুয়েলারি শিল্পে আমরা কেনো পিছিয়ে থাকবো? আমাদের যারা কারিগর আছেন, তারা অনেক যোগ্য। তারা দেশের বাইরেও কাজ করছে। নারীরাও এতে কাজ করে যাচ্ছে। অনেক সময় লক্ষ্য করছি, নিজের দেশে গহনা না কিনে দুবাই চলে যাচ্ছি, ভারতে চলে যাচ্ছি। কেনো যাচ্ছি? আমরা কি ডিজাইনের জন্য যাচ্ছি, নাকি দাম কম পাই সেজন্য যাচ্ছি? কী কারণে? দুটিই কিন্তু এর সঙ্গে যুক্ত।

বাজুসের পক্ষ থেকে জানানো হয়েছে, দেশের অর্থনীতিতে অনবদ্য ভূমিকা রাখা বাংলাদেশের জুয়েলারি শিল্পের সবচেয়ে বড় আয়োজন বাজুস ফেয়ার ১০ ফেবুরুয়ারি পর্যন্ত চলবে। প্রতিদিন সকাল ১০টা থেকে রাত ৯টা পর্যন্ত বাজুস ফেয়ার ক্রেতা-দর্শনার্থীদের জন্য উম্মুক্ত থাকবে। বাজুস ফেয়ারে প্রবেশ টিকিটের মূল্য জনপ্রতি ১০০ টাকা। তবে পাঁচ বছর বয়স পর্যন্ত শিশুদের টিকিট লাগবে না। একইসঙ্গে জুয়েলারি প্রতিষ্ঠানগুলো ক্রেতাদের মনোযোগ আকর্ষণে বিশেষ অফার দিচ্ছে।

বাজুস ফেয়ার-২০২৪ দেশীয় জুয়েলারি শিল্পকে সমৃদ্ধ করার পাশাপাশি বিশ্ববাজারে একটি নতুন অবস্থান তৈরিতে সহায়ক ভূমিকা রাখবে। দেশের স্বর্ণ শিল্পীদের হাতে গড়া নিত্য নতুন আধুনিক ডিজাইনের অলংকারের পরিচিতি বাড়বে।

এবার বাজুস ফেয়ারে ৯টি প্যাভিলিয়ন, ১৭টি মিনি প্যাভিলিয়ন ও ১৫টি স্টলে দেশের স্বনামধন্য ৪১টি জুয়েলারি প্রতিষ্ঠান অংশগ্রহণ করবে। বাজুস ফেয়ার-২০২৪ এ প্যাভেলিয়নে অংশ নেওয়া ৯টি প্রতিষ্ঠান হলো- ডায়মন্ড ওয়ার্ল্ড লিমিটেড, অলংকার নিকেতন (প্রা.) লিমিটেড, আমিন জুয়েলার্স লিমিটেড, ভেনাস জুয়েলার্স লিমিটেড, কুঞ্জ জুয়েলার্স, রয়েল মালাবার জুয়েলার্স (বিডি) লি., আপন জুয়েলার্স, জড়োয়া হাউজ (প্রা.) লিমিটেড ও রিজভী জুয়েলার্স।

মিনি প্যাভেলিয়নে অংশ নেওয়া ১৭টি প্রতিষ্ঠান হলো- ডায়মন্ড বাজার অ্যান্ড গোল্ড, গৌরব জুয়েলার্স, আলভী জুয়েলার্স, আই. কে জুয়েলার্স লিমিটেড, চৌধুরী গোল্ড, রিয়া জুয়েলার্স, আফতাব জুয়েলার্স, ডায়মন্ড হাউজ, রয়েল ডায়মন্ড, দি ডায়মন্ড স্টোর, ড্রিমজ ইন্সট্রুমেন্ট টেকনোলজি, রাজ জুয়েলার্স লিমিটেড, জারা গোল্ড, জায়া গোল্ড এন্ড ডায়মন্ড, সাস ইন্টারন্যাশনাল, দি পার্ল ওয়েসিস জুয়েলার্স ও ডি ডামাস দি আর্ট অব জুয়েলারি।

স্টলে অংশ নেওয়া ১৫টি প্রতিষ্ঠান হলো- গোল্ডেন ওয়ার্ল্ড জুয়েলার্স, দি আই. কে জুয়েলার্স, গীতাঞ্জলী জুয়েলার্স, আয়াত ডায়মন্ডস, সিরাজ জুয়েলার্স, পাপড়ি জুয়েলার্স, ডায়মন্ড প্যালেস, ডায়মন্ড স্কয়ার, নিউ বসুন্ধরা জুয়েলার্স, রাজঐশ্বরী, ডি গোল্ড প্যাশন, বাংলাদেশ সায়েন্টিফিক ইন্সট্রুরুমেন্ট কোম্পানি, জেমস গ্যালারি এন্ড ডায়মন্ড, খোকন জুয়েলার্স ও আরএন মাইক্রোটেক।

 


বিষয়:


আপনার মূল্যবান মতামত দিন:


Developed with by
Top