সিডনী বুধবার, ২৭শে মে ২০২০, ১৪ই জ্যৈষ্ঠ ১৪২৭

বই পড়ার সেকাল-একাল : সৈয়দ আসাদুজ্জামান সুহান


প্রকাশিত:
১১ মে ২০২০ ১৪:৪২

আপডেট:
২৭ মে ২০২০ ১৮:১৭

 

বই পড়ার গুরুত্ব ও প্রয়োজনীয়তা সম্পর্কে আমরা সবাই কমবেশি অবগত আছি। শুধু তাই নয়, বই পড়ার গুরুত্ব ও প্রয়োজনীয়তা নিয়ে আমরা অনেক সুন্দর সুন্দর কথাও বলি। তবে খুব আফসোসের বিষয়টা হলো, বর্তমান সময়ে আমরা বই পড়া থেকে কতটা যে দুরে সরে গেছি, সেটাই উপলব্ধি করতে পারছি না। এর কারণে আমাদের কতোটা যে ক্ষতি হয়ে যাচ্ছে, সেটা যদি এখনই অনুধাবন করতে না পারি, চূড়ান্ত পরিণতির দিকে অচিরেই ধাবিত হতে হবে। আজ থেকে প্রায় আটশো বছর আগে পারস্য কবি ও দার্শনিক ওমর খৈয়াম বলেছিলেন, ‘একদিন রুটি মদ ফুরিয়ে যাবে, প্রিয়ার কালো চোখ ঘোলাটে হয়ে আসবে, কিন্তু বইখানা অনন্ত যৌবনা, যদি তেমন বই হয়।’ এই মহামূল্যবান উক্তিটি আমাদের কাছে খুবই জনপ্রিয় কিন্তু এর আবেদন দিনে দিনে হারাতে বসেছে। অবশ্য এর জন্য ওমর খৈয়ামের কিছু যায় আসে না, আমরাই আমাদের বঞ্চিত করছি। আধুনিকতার ছোঁয়া ও প্রযুক্তির উৎকর্ষতায় আকৃষ্ট হয়ে আমরা সেগুলো এমনভাবে গ্রহণ করছি, যেন জেনেশুনেই প্রতিনিয়ত বিষপান করে যাচ্ছি। ঠিক যেন একজন ধূমপায়ী কিংবা মাদকাসক্তের মতোই বলা যায়। যেটা আমাদের জন্য ক্ষতিকর, সেটার দিকেই আমরা আসক্ত হয়ে যাচ্ছি। সবার হাতে হাতে এখন স্মার্টফোন, সেটায় আছে ইন্টারনেট সংযোগ। যিনি বলেন সময়ের অভাবে বই পড়া হয় না, তিনি-ই একটু অবসর পেলেই ওই স্মার্টফোনে ডুব দেন। তখন হাতের সামনে কোন বই থাকলেও সেটা হাতে তুলে নিবে না। দুটো পৃষ্ঠা উল্টেও বইটির সূচিপত্র দেখবে না। আর তারা বই কেনা তো দূরের কথা, বই উপহার পেলেও বিরক্ত হয়। এমন অবস্থায় সৈয়দ মুজতবা আলীর সেই বিখ্যাত উক্তিটির কথাই মনে পড়ে, ‘বাঙালীর বই কেনার প্রতি বৈরাগ্য দেখে মনে হয়, সে যেন গল্পটা (আরব্যরজনী) জানে, আর মরার ভয়ে বই কেনা, বই পড়া ছেড়ে দিয়েছে।’ একটা সময়, বই চুরি করা খুব একটা স্বাভাবিক ব্যাপার ছিল। বলা হতো, বই চুরি করা শিক্ষিত লোকের কাজ। আমাদের দেশে বিভিন্ন আচার অনুষ্ঠানে একে অপরকে বই উপহার দেয়ার বহুল প্রচলন ছিল। বই উপহার পেয়ে কেউ যতটা খুশি হতো, ভিন্ন কিছুতে ততোটা খুশি হতো না। বর্তমান সময়ে কেউ কাউকে বই উপহার দিলে চরম বিরক্ত হয়। তাই উপহার হিসেবে বই দেয়ার প্রচলন অনেকাংশেই কমে গেছে। কেবলমাত্র কথার কথা হিসেবে আমাদের কাছে প্রচলিত আছে, ‘বই হোক শ্রেষ্ঠ উপহার’ কিংবা ‘প্রিয়জনকে বই উপহার দিন’।

প্রতিবছর বইমেলা উপলক্ষে হাজার হাজার বই প্রকাশিত হয়। অমর একুশে বইমেলাকে বাঙালীর প্রাণের মেলা হিসেবে অভিহিত করা হয়। ফেব্রুয়ারি মাসে সারা দেশেই একুশে বইমেলার আয়োজন করা হয়। বইমেলাকে ঘিরে লোক সমাগম ঘটে দেখা মতো, যেন এক মিলনমেলা। বইমেলায় ভিড় ঠেলে সামনের দিকে এগিয়ে যাওয়া রীতিমতো একটা চ্যালেঞ্জিং ব্যাপার হয়ে ওঠে। তবে এতো মানুষের সমাগমের পরেও বইয়ের কাটতি নেই। এমন দুরবস্থার জন্য অনেক বরেণ্য কবি ও লেখক বই প্রকাশে অনীহা দেখাচ্ছে। ২০১৮ সালে একুশে বইমেলায় বাংলাদেশের অন্যতম কবি আসাদ চৌধুরীর সঙ্গে দেখা হয়। উনার লেখা প্রায় অর্ধশত বই প্রকাশিত হয়েছে। এক সময় বইমেলায় কবি আসাদ চৌধুরীর নতুন বই প্রকাশের প্রথম দিনেই হাজার হাজার কপি বিক্রি হতো। কবিকে জিজ্ঞাসা করেছিলাম, বেশ কয়েক বছর হলো আপনার লেখা নতুন কোন বই প্রকাশ হচ্ছে না, লেখালেখি কী বন্ধ নাকি? তিনি মৃদু হেসে উত্তর দিলেন, ‘কার জন্য বই প্রকাশ করবো, এখন তো বইয়ের পাঠক নেই। যখন ছিল, তখন বই প্রকাশের প্রতি প্রবল আগ্রহ অনুভব করতাম। পাঠকের কাছে লেখকের একটা দায়বদ্ধতা থাকে, সেই তাগিদ থেকেই লিখতাম, বই প্রকাশ করতাম। এখন তো পাঠকই নেই, তাই বই প্রকাশ করলে প্রকাশকের কাছে লজ্জায় পড়তে হবে।’ বাংলাদেশের আরেকজন অন্যতম প্রধান কবি নির্মলেন্দু গুণ খুব হতাশা নিয়ে বলেছিলেন, ‘আমি ভেবে কূল পাই না, পাঠকরা কোথায় হারিয়ে গেল। এখনো আমি কবিতা লিখছি কিন্তু আমার নতুন কবিতা নিয়ে পাঠকদের মাঝে তেমন আগ্রহ দেখি না। তবে কী আগের মতো ভালো কবিতা লিখতে পারছি না! তাই আমার কবিতা থেকে পাঠকরা মুখ ফিরিয়ে নিয়েছে! এখনো দেখি ইউটিউবে বাংলা কবিতাগুলোর মধ্যে আমার লেখা কিছু পুরানো কবিতা টপচার্টে আছে। লাখ লাখ ভিউয়ার কিন্তু নতুন বই প্রকাশের পর তিন হাজার কপি বিক্রি করতেই প্রকাশকের খবর হয়ে যায়।’ বর্তমান সময়ের দেশ বরেণ্য এই দুজন কবির আক্ষেপ ও হতাশা থেকেই সুস্পষ্টভাবে ফুটে উঠেছে, বই পড়া থেকে আমরা কতোটা বিমুখ হয়েছি।

ভিনসেন্ট স্টারেট বলেছিলেন, ‘আমরা যখন বই সংগ্রহ করি, তখন আমরা আনন্দকেই সংগ্রহ করি।’ এই কথাটির মর্মবাণী বই বিমুখ মানুষের কাছে অর্থহীন। সম্ভবত তাদের উদ্দেশ্যেই প্রমথ চৌধুরী বলেছিলেন, ‘বই কিনলেই যে পড়তে হবে, এটি হচ্ছে পাঠকের ভুল। বই লেখা জিনিসটা একটা শখমাত্র হওয়া উচিত নয়, কিন্তু বই কেনাটা শখ ছাড়া আর কিছু হওয়া উচিত নয়।’ তিনি এই কথাটি দিয়ে শখ করে হলেও বই সংগ্রহের পরামর্শ দিয়েছেন। এটা সত্যি যে, শখ করে বই কিনে রেখে দিলেও সেটা কখনো না কখনো পড়তে ইচ্ছে হবেই। ব্যাপার না এমন না যে বইয়ের প্রতি আগ্রহ থেকেই বই পড়বে। আমাদের চারিত্রিক বৈশিষ্ট্যের মধ্যে একটা দিক হচ্ছে, আমরা কোন কিছু অর্থ ব্যয় করে ক্রয় করে থাকলে সেটা ভোগ না করলে অর্থের অপচয় হিসেবে মনে করি। তাই সেটার ভোগ বা সঠিক ব্যবহারের চেষ্টা করি। বইয়ের ভোগ বা সঠিক ব্যবহার করতে হলে সেটা পড়তে হবেই। বই পড়ার প্রতি আগ্রহ না থাকার কারণে অনেকেই বই কেনা নিতান্তই অর্থের অপচয় হিসেবে মনে করে। সৈয়দ মুজতবা আলী বলেছিলেন, ‘বই কিনে কেউ দেউলিয়া হয় না।’ এই কথাটি একদম বাস্তব সত্য কথা। বই কিনে কাউকে দেউলিয়া হওয়ার কথা শোনা যায়নি। বরং যারা যত বেশি বই কিনেছে, তারা নিজের ব্যক্তিত্বের ততোটা উন্নয়ন ঘটাতে সক্ষম হয়েছে। সেই সঙ্গে বই পড়ার মাধ্যমে মানসিক বিকাশ ও জ্ঞান অর্জনের দ্বার উন্মুক্ত করে দেয়। ভিক্টর হুগো বই পড়ার গুরুত্ব বুঝাতে গিয়ে বলেছেন, ‘বই বিশ্বাসের অঙ্গ, বই মানব সমাজকে টিকিয়ে রাখার জন্য জ্ঞান দান করে। অতএব, বই হচ্ছে সভ্যতার রক্ষাকবচ।’ বই পড়ার গুরুত্ব সম্পর্কে এই কথাটি অনুধাবন করতে হয়তো আমরা ব্যর্থ। নয়তো মূর্খের মতো বই হতে বিমুখ হওয়ার প্রশ্নই আসে না। নিজেদের তাগিদ থেকেই বইয়ের সঙ্গে সখ্যতা গড়ে রাখতাম। বই নিয়ে লিও টলস্টয়ের বিখ্যাত উক্তিটি হচ্ছে, ‘জীবনে মাত্র তিনটি জিনিসের প্রয়োজন- বই, বই এবং বই।’ বই পড়া ছাড়া মস্তিষ্ক যেমন অন্ধকারে নিমজ্জিত থাকে, তেমনি মননশীলতার উন্নয়ন ঘটে না। বই আমাদের যেভাবে জ্ঞানের আলোয় আলোকিত করে, তেমনিভাবে বিচারবুদ্ধি ও মানবিক মূল্যবোধ সম্পন্ন একজন মানুষে উন্নীত করে থাকে। বই হচ্ছে সেই বন্ধু, যে একজন মানুষকে তার ভালো মন্দ বিচারের সর্বোত্তম পরামর্শ দিয়ে থাকে। বই সম্পর্কে হেনরি ওয়ার্ড বিশার ঠিকই বলেছেন, ‘বইয়ের মতো ভাল সঙ্গী আর কিছু নেই। বইয়ের সঙ্গে কথা বলা যায়, বই উপদেশ দেয়, কিন্তু কিছু করতে বাধ্য করে না।’

খুব বেশি আগের কথা নয়, যখন ঘরে ঘরে ছিল বইয়ের পাঠক। তখন ছিল না স্যাটেলাইট টিভি চ্যানেল কিংবা স্মার্টফোন। তখন বই-ই ছিল আমাদের বিনোদনের সেরা মাধ্যম। স্মৃতির পাতায় স্পষ্ট মনে আছে বই পড়ার সেই সোনালী দিনের কথা। আমার আব্বা ও আম্মাকে দেখতাম প্রতিদিন সময় করে বই পড়তে। আব্বা প্রতিমাসে নতুন কিছু বই কিনতেন। আবার লাইব্রেরি থেকে নিয়মিত বই সংগ্রহ করে পড়তেন। কখনো দেখেছি, আমার আম্মা গৃহস্থালির কাজ করছেন আর আব্বা কোন একটা উপন্যাস পড়ে আম্মাকে শোনাচ্ছেন। এমন দৃশ্যপট তখন প্রায় সব শিক্ষিত পরিবারেই ছিল। তখন রেডিও কিংবা অডিও ক্যাসেট প্লেয়ারে গান শোনার বাইরে তেমন আর কোন বিনোদনের মাধ্যম ছিল না। তখন যাদের বাসায় টিভি ছিল, তারা বিটিভিতে প্রচারিত রাত আটটার খবর, নির্দিষ্ট দিনে নাটক ও সিনেমা দেখে বিনোদন পেত। এসবের পরেও হাতে পর্যাপ্ত পরিমাণ সময় থাকত, সেই সময়টায় পত্রিকা ও বই পড়াই ছিল অবসর বিনোদন। আমার আব্বা আম্মাকে দেখে আমরা সব ভাইবোন পত্রিকা ও বই পড়ায় উদ্বুদ্ধ হই। লেখাপড়ার চাপ থাকলেও আমরা বই পড়ার মতো সময় পেতাম। তখন আমরা প্রচুর বই কিনতাম, বই উপহার পেতাম ও উপহার দিতাম। লাইব্রেরি থেকে বই সংগ্রহ করেও নিয়মিতভাবে বই পড়তাম। বন্ধু বান্ধবদের কাছ থেকে ধার করে এনে বই পড়া তো আছেই। তখন ঘরে ঘরে পাঠক আর বইয়ের ছোটখাটো লাইব্রেরি ছিল। কার সংগ্রহে কতোটা বই আছে, এটা নিয়ে তখন প্রতিযোগিতা হতো। পরস্পরের সঙ্গে বইয়ের লেনদেনের কারণে একটি সুন্দর সামাজিক বন্ধন গড়ে উঠতো। তখন আড্ডায় গল্পের একটি গুরুত্বপূর্ণ আলোচনা ছিল বই পড়া। কে কতোটা বই পড়েছে, কোন কোন লেখকের বই পড়েছে, কার লেখা কেমন, কোন বইটা খুব ভালো লেগেছে, এসব নিয়ে জমে উঠতো তুমুল আড্ডা। ছোট থেকে বড়, সবাই তখন বই পড়া নিয়ে বুঁদ হয়ে থাকতো।

এখনো স্মৃতির পাতায় স্পষ্ট মনে আছে, কিশোর বয়সে গোয়েন্দা সিরিজের বই সংগ্রহের জন্য আমি টিফিনের টাকা বাঁচিয়ে খুচরো পয়সা সংগ্রহ করে রাখতাম। আব্বা আম্মা গোয়েন্দা সিরিজের বই পড়া পছন্দ করতেন না এবং পড়তে নিষেধ করতেন। তাই নিজের প্রচেষ্টায় মনের খোরাক মেটানোর জন্য এভাবে টাকা জমিয়ে বই কিনতাম। যখন একটি নতুন বই কিনতে পারতাম, তখন নিজেকে রাজা মনে হতো। বন্ধুদের সেটা দেখতাম এবং তাদের সঙ্গে বই বিনিময় করে আরও কিছু গোয়েন্দা সিরিজের বই পড়তাম। তখন নিজেকে ছোটখাটো একজন ডিটেকটিভ মনে করতাম। আমার আব্বা আমাদের জন্য মাসিকভাবে প্রকাশিত শিশু-কিশোর ম্যাগাজিন কিনে দিতেন। ওই ম্যাগাজিন পড়া শেষ হলে সেখান থেকে কিছু প্রশ্ন করে জেনে নিতেন, কে কেমন পড়েছি। এভাবে তিনি বই পড়াতে অনুপ্রাণিত করেছেন। আমাদের বাসায় যখন আমার মামা বেড়াতে আসতেন, তখন তিনি আমাদের জন্য উপহার হিসেবে বই নিয়ে আসতেন। সেই বই উপহার পেয়ে আনন্দে এতটাই আত্মহারা হয়ে থাকতাম যে, একটু পর পর নতুন বইয়ের গন্ধ শুঁকে তৃপ্তি পেতাম। নতুন বইয়ের গন্ধ শুঁকে দেখার মাঝেও দারুণ আনন্দ ছিল। ঈদ এলে যেমন নতুন কাপড় কিনতে হবে, তেমনি বইমেলা এলে নতুন বই অবশ্যই কিনতে হবে। এটা তখন একটা সাধারণ রেওয়াজ ছিল। বই পড়া নিয়ে আমার জীবনে অনেক মজার মজার স্মৃতি আছে। ছোট বেলায় বার্ষিক পরীক্ষার পর নানার বাড়িতে বেড়াতে যেতাম। আম্মা ব্যাগের ভেতর শুধু আমাদের কাপড়-চোপড় গুছিয়ে রাখতেন না, সেই সঙ্গে আমাদের পছন্দের বইগুলোও ব্যাগে গুছিয়ে রাখতেন। একবার ভুলে বই আনা হয়নি, আমাদের তখন কান্নাকাটি অবস্থা। শুধুমাত্র আমাদের মন ভালো করার জন্য পরের সপ্তাহে নানার বাড়িতে এসে আব্বা বইগুলো দিয়ে যান। এই চিত্র যে শুধু আমার জীবনে কিংবা আমাদের পরিবারে ছিল, এটা কিন্তু নয়। আমার সমসাময়িক প্রায় সবার জীবনে বই পড়ার গল্পটা একই রকম। তখন পরিবার থেকেই শিশু কিশোরদের বই পড়ার প্রতি অভিভাবকদের অনুপ্রাণিত করতে দেখেছি। অবশ্য এর পেছনে একটি কারণও ছিল, যেন বাসার বাইরে গিয়ে খেলাধুলা না করে বাসায় বসে বই পড়ে। এভাবেই তখন ক্ষুদে পাঠকদের সৃষ্টি হয়।

যখন আমাদের দেশে স্যাটেলাইট টিভি চ্যানেলগুলো প্রভাব বিস্তার শুরু করে, তখন থেকেই মূলত বইয়ের পাঠক ধীরে ধীরে কমতে থাকে। বিভিন্ন চ্যানেলের রঙচঙে নানা রকম অনুষ্ঠান, নাটক ও সিনেমা দেখার দিকে আকৃষ্ট হতে থাকে। সাধারণত যে সময়টায় আগে বই পড়া হত, সেই সময়টায় রিমোট হাতে টিভি দেখা শুরু হয়। এভাবে চলে যায় প্রায় এক যুগের বেশি সময়। বই পড়া কিছুটা কমে আসলেও তখনও কমবেশি বইয়ের পাঠক ছিল। বইয়ের প্রতি তখনও আমাদের একটা টান ছিল। যখন ভিসিডি/ডিভিডি প্লেয়ার, কম্পিউটার, ল্যাপটপ ও মোবাইল ফোন এলো, ওসবের প্রতি আকর্ষণের কারণে বইয়ের প্রতি আকর্ষণ আরেক ধাপে হ্রাস পেল। তারপর মোবাইল ফোন ধীরে ধীরে অভূতপূর্ব আধুনিকায়ন হতে থাকে, যার বদৌলতে ধীরে ধীরে আমাদের নিত্যব্যবহার্য অনেক গুরুত্বপূর্ণ জিনিসের গুরুত্ব হারাতে থাকে। কিছু কিছু জিনিস বলতে গেলে প্রায় বিলুপ্ত হয়ে গেছে। মোবাইল ফোনের আধুনিকায়ন ও ইন্টারনেটের উন্নয়নের অবদানে অনলাইনভিত্তিক সামাজিক যোগাযোগ মাধ্যমের পথ উন্মোচন হয়। ধীরে ধীরে এসব মাধ্যমে আমরা নিজেদের শখের বশে জড়িয়ে ফেলি। একদিকে মোবাইল ফোনের আধুনিকায়ন, অন্যদিকে ইন্টারনেটের উন্নয়ন, সেই সাথে পাল্লা দিয়ে সামাজিক যোগাযোগ মাধ্যমগুলো আরও আকর্ষণীয় বিভিন্ন রকম সুযোগ সুবিধা নিয়ে আসতে থাকে। ক্রমান্বয়ে আমরা সামাজিক যোগাযোগ মাধ্যমগুলোর প্রতি অতিরিক্ত আগ্রহ প্রকাশ করতে থাকি। এক সময় এর প্রতি আসক্ত হয়ে যাই। তখন সামান্য পরিমাণে অবসর পেলেই সামাজিক যোগাযোগ মাধ্যমগুলোতে সময় কাটাই। তখন মহামূল্যবান বই পড়ে রইল অযতেœ অবহেলায়। যে মানুষটি এক সময় নিয়মিত বইয়ের পাঠক ছিল, সে এখন আসল বই ছেড়ে সামাজিক যোগাযোগ মাধ্যম ফেসবুকে আসক্ত হয়ে আছে। বইয়ের পাঠকরা এখন ফেসবুকে হুমড়ি খেয়ে পড়ে আছে। এখন অধিকাংশ মানুষের সকল আকর্ষণের কেন্দ্রবিন্দু হচ্ছে ফেসবুক।

আমাদের বর্তমান যে নতুন প্রজন্ম, তারা আমাদের দেখেই শিখে। আমরা যে কাজটি করি, তারাও সেটা অনুকরণ করে। আজকাল বাচ্চাদের হাতেও স্মার্টফোন দেখতে পাওয়া যায়। স্কুল পড়ুয়া ছেলেমেয়েরা ফেসবুক চালায়। আমাদের মতো তাদেরও বইয়ের প্রতি আগ্রহ নেই। তাছাড়া বর্তমান সময়ে শিক্ষা ব্যবস্থার উন্নয়নের নামে স্কুল পর্যায়েই লেখাপড়ার যে পরিমাণ চাপ, এতে করে স্কুলের পড়া শেষ করতেই তারা হিমশিম খাচ্ছে। তাই স্কুলের নির্দিষ্ট কিছু বইয়ের বাইরে অন্য কোন বই পড়ার সময় ও সুযোগ তেমন একটা থাকে না। এখনকার বাচ্চারা ভোরে ঘুম থেকে উঠে হয় স্কুলে যায় আর না হয় গৃহশিক্ষকের কাছে প্রাইভেট পড়ে। স্কুল থেকে ফিরে এসে আবার বইখাতা নিয়ে বসে। হোমওয়ার্ক শেষ করে যতটুকু অবসর পায়, তারা ঘুমিয়ে রেস্ট নেয় আর নয়তো খেলাধুলা করে। তবে তাদের খেলাধুলা মানে মোবাইলে বা কম্পিউটারে বসে ভিডিও গেইস খেলা। সন্ধ্যার পর আবার স্কুলের পড়া শিখতে হয়। রাতের পড়া শেষ করে অল্প কিছু সময় পেলে তারা টিভিতে কার্টুন বা কোন আকর্ষণীয় প্রোগ্রাম দেখতে বসে। স্কুলের নির্দিষ্ট কিছু বইয়ের বাইরে অন্য কোন বইয়ের সঙ্গে তাদের কোন সম্পর্ক নেই। অভিভাবকরাও চায় না তাদের সন্তান স্কুলের বইয়ের বাইরে অন্য কোন বই পড়ুক। এসব কারণে নতুন প্রজন্ম বই পড়া থেকে বঞ্চিত হচ্ছে। তারা খুব ভালো রেজাল্ট করেও মেধাবী হতে পারছে না। আমরা এমনও দেখেছি, মাধ্যমিক পরীক্ষায় গোল্ডেন এ প্লাস পাওয়া শিক্ষার্থী বাংলা নববর্ষ, ভাষা আন্দোলন, স্বাধীনতা দিবস ও বিজয় দিবস সম্পর্কে তাদের ভালো কোন ধারণা নেই। এর জন্য মূলত দায়ী আমাদের শিক্ষা ব্যবস্থা ও অভিভাবকদের মানসিকতা। এভাবে যদি চলতে থাকে, তাহলে অদূর ভবিষ্যতে দূরবীন দিয়ে পাঠক খুঁজে বের করতে হবে। আমাদের নতুন প্রজন্মকে বইয়ের দিকে টানতে হলে সবার আগে আমাদের হাতে বই তুলে নিতে হবে। অভিনয় করে হলেও তাদের সামনে প্রতিদিন এক থেকে দুই ঘণ্টা সময় বই পড়তে হবে। এতে করে আমাদেরও বই পড়ার অভ্যাস গড়ে উঠবে, তেমনিভাবে আমাদের নতুন প্রজন্ম আমাদের দেখে বই পড়ার প্রতি আকৃষ্ট হবে। তাদের বই পড়ার অভ্যাসটা মূলত পরিবার থেকেই দায়িত্ব নিয়ে গড়ে তুলতে হবে। এছাড়াও আমাদের দেশের বর্তমান শিক্ষা ব্যবস্থার একটি গঠনমূলক পরিবর্তন দরকার বলেও মনে করি। স্কুলে অতিরিক্ত পড়ার চাপ মাথায় নিয়ে পাঠ্যপুস্তকের বাইরে ভিন্ন কোন বই পড়া যে কোন শিক্ষার্থীদের পক্ষে অসম্ভব হয়ে উঠে।

মার্ক টোয়েন বলেছিলেন, ‘যার বই পড়ার অভ্যাস নেই আর যে পড়তে জানেনা এমন লোকের মধ্যে কোন পার্থক্য নেই।’ শুধুমাত্র শিক্ষা প্রতিষ্ঠানের নির্দিষ্ট কিছু বই পড়ে কেউ সু-শিক্ষিত হতে পারবে না। বই বিমুখ জাতি কখনো জ্ঞান বিজ্ঞানে উন্নতি সাধন করতে পারে না। বই একজন মানুষের মনের অন্ধকার দূর করে দূরদৃষ্টিসম্পন্ন, মানবিক ও আত্মমর্যাদা সম্পন্ন করে তুলে। তাই সবাইকে বই পড়তে হবে এবং আমাদের নতুন প্রজন্মের হাতে বই তুলে দিতে হবে।

সর্বোপরি, আধুনিকতা ও প্রযুক্তির উৎকর্ষতায় নিজেদের আসক্ত মুক্ত করতে হবে এবং একটি নির্দিষ্ট সময় বের করে প্রতিদিন বই পড়তে হবে। ফেসবুকের আসক্তি মহামারী আকার ধারণ করেছে। ফেসবুকের আসক্তি হতে মুক্তির জন্য বিশ্বের কিছু দেশে ফেসবুক আসক্তি নিরাময় কেন্দ্র পর্যন্ত চালু হয়েছে। যেখানে ফেসবুক আসক্তি থেকে বেরিয়ে আসার পরামর্শ দেয়া হয়। সবচেয়ে মজার ব্যাপার হচ্ছে, ফেসবুকের প্রতিষ্ঠাতা মার্ক জুকারবার্গ নিজেও রুটিন করে প্রতিদিন বই পড়েন। তার একটি বক্তব্যে তিনি বলেছিলেন, ‘আমি আমার সব ব্যস্ততার মাঝেও সপ্তাহে দুটি বই পড়তে চেষ্টা করি।’ একটি সংবাদ পত্রে পাওয়া তথ্য থেকে জানা যায়, যারা ফেসবুকে চাকরি করেন, তাদের অনেকেরই ফেসবুক একাউন্ট নেই। এছাড়াও অফিস চলাকালীন সময়ে তাদের ফেসবক ব্যবহার সম্পূর্ণরূপে নিষেধ এবং তারা দিনে কত ঘণ্টা ফেসবুকে সময় কাটায়, সেটাও অনুসন্ধান করে দেখা হয়। এই বিষয়গুলো আমাদের উপলব্ধি করার আছে। মুহম্মদ মনসুর উদ্দিন বলেছেন, ‘একবার যার পড়ার নেশা লেগেছে, সেকি মৃত্যুর আগ মুহূর্ত পর্যন্তও তা ছাড়তে পারবে?’ আমি মনে করি, ফেসবুক আসক্তি থেকে বের হয়ে আসার সহজ উপায় হচ্ছে বই পড়া। আমি নিজে একজন বইপোকা ছিলাম কিন্তু ফেসবুকে আসক্ত হয়ে বই পড়া প্রায় ছেড়েই দিয়ে ছিলাম। একটা সময় ফেসবুকের প্রতি আসক্তি ও বই না পড়ার কুফলতা উপলব্ধি করি। একদিন প্রতিজ্ঞা করে ফেসবুক আইডি সাময়িক বন্ধ করে দিয়ে বলে উঠি, ‘লও তোমার ফেসবুক, ফিরিয়ে দাও বই।’ আবার নতুন করে বই পড়া শুরু করার পর এখন বই পড়ার নেশা আবার ফিরে পেয়েছি। যদিও কিছু দিন পরই ফেসবুকে ফিরে যাই কিন্তু এখন সীমিত সময় ব্যবহার করি। এখন ধ্যানে জ্ঞানে বই আমার নিত্যসঙ্গী। আবারও বই পড়ার সুদিন ফিরে আসবে, এটাই প্রত্যাশা করি।

 

সৈয়দ আসাদুজ্জামান সুহান
কবি, প্রাবন্ধিক ও কলামিস্ট

 

এই লেখকের অন্যান্য লেখা



আপনার মূল্যবান মতামত দিন:


Top