সিডনী রবিবার, ৯ই আগস্ট ২০২০, ২৫শে শ্রাবণ ১৪২৭

করোনায় কোরবানীর পশুর হাট কি হতে পারে? : ওসমান গনি


প্রকাশিত:
২৩ জুলাই ২০২০ ১৪:৫৬

আপডেট:
৯ আগস্ট ২০২০ ০২:৩৮

ফাইল ছবি

 

আর কিছুদিন পর অনুষ্ঠিত হতে যাচ্ছে বিশ্ব মুসলিমদের ধর্মীয় অনুষ্ঠান ঈদুল আজহা। এ উপলক্ষ্যে সারাদেশে গরুর হাট বসানোর জন্য বেশ তোড়জোড় চলছে। আবার দেশের কোথাও কোথাও আগ থেকে গরুর নিয়মিত হাট বসানো আছে। যে গুলোতে সপ্তাহ বা দৈনিক গরু, ছাগল নিয়মিত বেচাকেনা হচ্ছে। তবে দেশের বেশ কিছু জায়গায় প্রতিবছর ঈদুল আজহা আসলে গরুর হাট বসানো হয়। যাতে করে দেশের মানুষ অতি সহজে গরু, ছাগল বেচাকেনা করতে পারে। প্রতি বছরের ন্যায় এবারও এমন কিছু পরিকল্পনা করতেছে একটি মহল। কিন্তু এ বছর করোনাভাইরাসের গরুর হাট বসানোর ওপর আইন আদালতের কিছু নিষেধাজ্ঞা থাকলেও সে আইনের প্রতি দেশের মানুষের ন্যুনতম কোন সম্মান নাই। তারা তাদের গতিতে হাট বসাচ্ছে বা বসানোর চিন্তাভাবনা করছে। যা আমাদের জন্য আত্মঘাতীর শামীল। সারাবিশ্বের ন্যায় বাংলাদেশেও করোনাভাইরাসের প্রার্দুভাব দিন দিন বৃদ্ধি পাচ্ছে। আর সরকারীভাবে তা নিয়ন্ত্রণের চেষ্টা করা হচ্ছে।  দেশের মানুষকে বার বার সতর্ক করা হচ্ছে স্বাস্থ্যবিধি মেনে চলার জন্য। কে শোনছে কার কথা। চলছে নিজেদের ইচ্ছামতো।  যার কারনে করোনাভাইরাসের সংক্রমণ বা নিয়ন্ত্রণের পরিবর্তে দিন দিন প্রকট আকার ধারন করছে। করোনাভাইরাস ছড়িয়ে বিস্তার লাভ করার অন্যতম কারন হলো জনসমাগম।

গত মার্চ মাসের ৮ তারিখে এ ভাইরাসটি বাংলাদেশে হানা দেয়। এর সরকারের পক্ষে হতে তা নিয়ন্ত্রণের জন্য কঠোর বিধিনিষেধ আরোপ করে। সাথে সাথে সারাদেশের গরু ও ছাগলের হাট বাজার বন্ধ করে দেয়। যাতে করে জনসমাগম এরানো যায়। তখন কিছু সময়ের জন্য দেশের অধিকাংশ গরুর হাট বন্ধ রাখা হয়েছিল। পররর্তীতে দেশের অর্থনীতির কথা চিন্তা করে বিধিনিষেধ কিছুটা শিথিল করা হলে আবার আমাদের পূর্ব চেহারা ফিরে আসে। বর্তমানে দেশের হাটবাজার গুলোতো এতই জনসমাগম হয় যে, অনেক সময় ধম বন্ধ হয়ে যাওয়ার উপক্রম হয়। শর্ত সাপেক্ষে বিধিনিষেধ শিথিল করা হলেও বর্তমানে তার দ্বারে কাছেও কেউ নেই।

দেশের বিভিন্ন এলাকায় শুরু হওয়া কোরবানির পশুর হাটগুলোতে স্বাস্থ্যবিধি একেবারেই মানা হচ্ছে না। একেকটি হাটে বিপুল সংখ্যক মানুষের সমাগম হচ্ছে। অথচ তারা কেউই সামাজিক দূরত্ব বজায় রাখা তো দূরে থাক, মাস্ক-গ্লাভস পর্যন্ত ব্যবহার করছে না। হাটগুলোর ইজারাদার, স্থানীয় জনপ্রতিনিধি কিংবা আইনশৃংখলা রক্ষাকারী বাহিনীর তরফে কোভিড-১৯ জন্য প্রযোজ্য স্বাস্থ্যবিধি অনুসরণের জন্য কোনো তাকিদও দেয়া হচ্ছে না। আবার কোথাও কোথাও তাগিদ দেয়া হলে ও কেউই স্বাস্থ্যবিধি তোয়াক্কা করছে না। বিশেষজ্ঞ ও পর্যবেক্ষকরা আশংকা করছেন, স্বাস্থ্যবিধি অমান্যের প্রতিক্রিয়া ভয়াবহ হয়ে উঠতে পারে। এমনিতেই করোনা সংক্রমণ ও মৃত্যুর হার ঊর্ধ্বমুখী। আগামীতে এই ঊর্ধ্বমুখিতা অব্যাহত থাকতে পারে। আশংকার এই প্রেক্ষাপটে আসন্ন ঈদুল আজহায় জনস্থানান্তর ও কোরবানীর পশুর হাটকে কেন্দ্র করে সংক্রমণের হার অস্বাভাবিকরকম বৃদ্ধি পেতে পারে। এই সুবাদে মৃত্যুর হারও বাড়তে পারে। বিশেষ করে কোরবানির হাট সংক্রমণের হটস্পটে পরিণত হতে পারে। সরকারি নির্দেশনায় স্বাস্থ্যবিধি মেনে হাটের যাবতীয় কার্যক্রম পরিচালনার কথা বলা হলেও বাস্তবে এ নির্দেশনা কোনো কাজে আসছে না। নির্দেশনা মানাও অত্যন্ত কঠিন। জনস্বাস্থ্য বিশেষজ্ঞরা আগেই সতর্ক করে দিয়েছেন, হাটে স্বাস্থ্যবিধি উপেক্ষিত হলে ফলাফল মারাত্মক রূপ নিতে পারে। আইইডিসিআরর তরফে বলা হয়েছে, যখন সংক্রমণ ঊর্ধ্বমুখী, তখন পশুর হাট বসলে ম্যাসাকার হয়ে যাবে। কোভিড-১৯ বিষয়ক জাতীয় কারিগরি পরামর্শক কমিটি ঢাকা, গাজীপুর, নারায়ণগঞ্জ ও চট্টগ্রামে কোরবানির পশুর হাট না বসানোর পরামর্শ দেয়। পশুর হাটে স্বাস্থ্যবিধি মানার সক্ষমতা নেই আমাদের। এক হাতিরঝিলেই আমরা জন সমাগম বন্ধ করতে পারিনি। কী করে হাটে স্বাস্থ্যবিধি মানা সম্ভব হবে?

এসব সতর্কবাণী ও পরামর্শ সত্ত্বেও  রাজধানীতে ১০টি পশুর হাট বসবে। আগে এর দ্বিগুণের বেশি হাট বসতো। হাটের সংখ্যা কমার কারণে এই ১০টি হাটে পশু ও জনসমাগম বেশি হওয়াই স্বাভাবিক। সেক্ষেত্রে স্বাস্থ্যবিধি উপেক্ষিত ও অমান্য হলে রাজধানীতে সংক্রমণ এখনকার চেয়ে অনেক বেশি বাড়তে পারে যা অত্যন্ত উদ্বেগের বিষয়। দক্ষিণ এশিয়া, বিশেষ করে বাংলাদেশ, ভারতও পাকিস্তান আগামীতে করোনার ব্যাপক  হতে পারে বলে বিশেষজ্ঞরা অভিমত প্রকাশ করেছেন। এক খবরে জানা গেছে, আগামী বছর করোনার  সবচেয়ে বাড়-বাড়ন্ত অবস্থা হবে এই তিন দেশ ও যুক্তরাষ্ট্রে। কাজেই, আমাদের যখন সতর্ক ও সাবধান হওয়া সবচেয়ে বেশি দরকার, তখন আমরা এমন কিছু করতে পারি না, যাতে বিপদ বাড়ে। কোরবানির পশুর হাট এবং ঈদ উপলক্ষে জনস্থানান্তর অবশ্যই বিপদজ্জনক। গত ঈদুল ফিতরে শেষ পর্যন্ত গণপরিবহন খুলে দেয়া হয় এবং দলে দলে মানুষ ঢাকাসহ বিভিন্ন বড় শহর থেকে গ্রামে চলে যায়। এর ফলাফল কিন্তু আমাদের জন্য মোটেই ভালো হয়নি। একারণে করোনা সংক্রমণ সারাদেশে ব্যাপকভাবে বেড়ে যায়। এই অভিজ্ঞতা সামনে রেখে এবার ঈদযাত্রা রহিত করা উচিৎ। যে যেখানে আছে সেখানেই তাকে আটকে রাখা প্রয়োজন। এ ব্যাপারে যথাযথ ব্যবস্থা সরকারকে করতে হবে। যারা ঈদ উপলক্ষে গ্রামে যেতে আগ্রহী বা ইচ্ছুক তাদেরও এই আগ্রহ ও ইচ্ছা ত্যাগ করা উচিৎ। মনে রাখতে হবে, তাদের ঘরে ফেরার এই আবেগ তাদের নিজেদের ও আত্মীয়-স্বজনদের জন্য মহাবিপদ, এমন কি মৃত্যু পর্যন্ত, ডেকে আনতে পারে। এক্ষেত্রে সকলের সব ধরনের ভাবাবেগ পরিহার করা উচিত।

যেহেতু দেশের বিভিন্ন এলাকায় কোরবানির পশুর হাট বসেছে এবং আগামীতে দেশের বড় বড় শহরগুলোতেও বসবে সুতরাং অধিক সতর্ক-সচেতন হওয়ার বিকল্প নেই। সবচেয়ে ভালো হতো যদি হাটকে এড়িয়ে যাওয়া সম্ভব হতো। উপযুক্ত বিকল্প থাকলে সেটা হতো। অনলাইন হাট একটি ভালো বিকল্প হতে পারতো। এক্ষেত্রে সাধারণ মানুষের অভিজ্ঞতা খুব বেশী নয়। ব্যবস্থাও অপ্রতুল। ঢাকায় অনলাইন হাট থেকে পশু কেনাবেচা সংখ্যায় কম হলেও শুরু হয়েছে। বিশেষজ্ঞরা অনেকেই এই বিকল্পটি ব্যাপকভাবে ব্যবহারের তাকিদ দিয়েছেন। এতেও সংক্রমণের ঝুঁকি আছে বটে, তবে কম। আস্থার সমস্যা রয়েছে। প্রতারিত হওয়ার আশংকাও আছে। তাই সবাই অনলাইন হাটে ঢুকতে পারছে না। আশা করা যায়, আগামীতে অনলাইন হাট জনপ্রিয় হয়ে উঠবে। যাহোক, যেসব হাট ইতোমধ্যে বসেছে এবং আগামীতে যেসব হাট বসবে তার প্রত্যেকটিতে যতটা সম্ভব স্বাস্থ্যবিধি কার্যকর করার পদক্ষেপ নিতে হবে। এটা আইনশৃংখলা রক্ষাকারী বাহিনীর একার পক্ষে করা সম্ভব নয়। এক্ষেত্রে হাটের ইজারাদার ও স্থানীয় জনপ্রতিনিধিদের উদ্যোগী ভূমিকা রাখতে হবে। মাইকিং করে, লিফলেট বিতরণ করে, পোস্টার দিয়ে, মসজিদের ঈমামদের মাধ্যমে, হাটবাজার বসার আগে এলাকার গণ্যমান্য ও জনপ্রতিনিধির মাধ্যমে গণসচেতনতা মূলক পাড়ায় পাড়ায় বৈঠক করে এবং গণমাধ্যমে বিজ্ঞাপন দিয়ে জনসচেতনতা বৃদ্ধি করতে হবে। পশুর হাটের ক্রেতা-বিক্রেতাদেরও নিজেদের ও পরিবার পরিজনের নিরাপত্তার স্বার্থে অত্যাধিক সতর্কতা ও সাবধানতা অবলম্বন করতে হবে। ইউনিয়নের হাটবাজার গুলোতে স্থানীয় জনপ্রতিনিধি, স্থানীয় সচেনতন লোকদের সাথে সমন্বয় করে সামাজিক বা পারস্পারিক দূরত্ব বজায় রেখে পশুর হাট পরিচালনা করতে পারলেও কিছুটা উপকারে আসতে পারে। সবার আগে আমাদের ও সমাজের প্রতিটি লোককে নিজ উদ্যোগ বা প্রয়োজনে সচেতন হতে হবে। আমাদের একটি কথা সকলের মাথায় বা মনে রাখতে হবে যে, আমি আর আপনি বেচে থাকলে এবছর না হলেও আগামীতেও কোরবানী করতে পারব। কিন্তু আমাদের অসচেতনতার জন্য যদি ভাইরাসটির সংক্রমণের স্বীকার হই বা হয়ে যাই তাহলে এমনও হতে পারে আমার আর আপনার অসচেতনতার কারনে বাড়ি, পাড়া মহল্লা এমন কি গ্রামেও ছড়িয়ে পড়তে পারে। হতে পারে মহাবিপদের সম্মূখীন।

 

ওসমান গনি
সাংবাদিক ও কলামিস্ট



আপনার মূল্যবান মতামত দিন:


Top