সিডনী মঙ্গলবার, ২৪শে নভেম্বর ২০২০, ১০ই অগ্রহায়ণ ১৪২৭

পুরুষকে মানুষ তৈরিতে মনোযোগী হতে হবে এবার : শাকিলা নাছরিন পাপিয়া


প্রকাশিত:
২৯ অক্টোবর ২০২০ ১৪:১০

আপডেট:
২৯ অক্টোবর ২০২০ ১৭:০১

 

আমরা নারীকে তার পোশাক, পর্দা, আচরণ শিখাতে শিখাতে ভুলেই গেছি এইগুলো পুরুষকেও শিখানো উচিৎ।
আমরা কখনো একজন পুরুষকে তার চোখের পর্দার ব্যাপারে কিছু বলি না। আমরা নারীর সম্ভ্রম নিয়ে কথা বলি কিন্তু পুরুষের সম্ভ্রম নিয়ে কিছু বলি না। সম্ব্রম থাকে মনে, মাথায়। অংগে নয়।
একটা গরুর বাচ্চা জন্মের পরই গরু৷ কিন্তু একটা মানুষের বাচ্চাকে মানুষ হয়ে ওঠার জন্য নানা প্রক্রিয়ার মধ্য দিয়ে যেতে হয়৷ একজন ছেলে বাচ্চা ধীরে ধীরে পুরুষ হয়৷ এই বড় হবার প্রক্রিয়ায় পরিবার,
সমাজ, রাষ্ট্র একদিকে তাকে পরনির্ভরশীল করে, অন্যদিকে তাকে স্বৈরাচারী, আরাম প্রিয়, অমানবিক হিসাবে গড়ে তোলে৷
একবার এক পুরুষ বলল, ঐ মেয়েটি চরিত্রহীন৷ কী করে জানলে? প্রশ্ন করলাম৷ উত্তর দিল, আমার সংগে বিছানায় গিয়েছিল৷ তা বিছানায় যাবার কারণে ও যদি চরিত্রহীন হয় তা হলে তুমি কী? আমি তো পুরুষ মানুষ৷
আমার আবার চরিত্র কী? একদম সত্যি কথা৷ পুরুষের চরিত্র, লজ্জা থাকতে নেই৷ এ ধারণা নিয়েই বড় হয় পুরুষ৷
মানুষ যে যে কারণে অন্যান্য প্রাণী থেকে আলাদা তার একটি হলো, লজ্জা৷ এই লজ্জাকে নারীর ভূষণ বানিয়ে পুরুষ হচ্ছে নির্লজ্জ৷ ছেলেবেলা থেকেই পরিবার বিদ্যালয়ে একটি ছেলে শিশু বার বার শোনে,ছিঃ পুরুষ মানুষ আবার কাঁদে নাকি! ফলে, ছেলে শিশুরা ধীরে ধীরে বড় হয় এই ধারণা নিয়ে, তার লজ্জা থাকবে না৷ অন্যের লজ্জা হরণই তার কর্তব্য৷ সে কাঁদবে না৷ অন্যের চোখে জল আনা তার দায়িত্ব৷
মানুষ হয়ে বেড়ে ওঠার প্রথম শর্ত লজ্জা৷ পুরুষ এই প্রথম ধাপ অতিক্রমেই ব্যর্থ৷ পুরুষকে নির্লজ্জ করে তৈরি করে পরিবার, সমাজ। পুরুষের মানুষ না হবার দায় আমরা এড়াতে পারি না।
ভালো খাবার, পোষাক, আদর, সিদ্ধান্ত গ্রহণ সর্বক্ষেত্রে ছেলে শিশু নিজের আধিপত্য লক্ষ করে পরিবারে তার বোনের তুলনায়৷ ছেলে বংশের প্রদীপ তাই তার প্রতি মা বাবার অতি মনোযোগ , পক্ষপাতমূলক আচরণ, ছেলেদের অত্যাচারী মানসিকতা গঠনে সহায়তা করে৷ সে নিজেকে নারীর তুলনায় শ্রেষ্ঠ এবং অধিক গুরুত্বপূর্ণ ভাবার শিক্ষা পরিবার থেকেই পায় জীবনের শুরুতে৷
কর্তৃত্বের ছড়ি ঘুরানোর ক্ষমতা জন্মগত অধিকার হিসাবে গন্য করে সে৷ দিন যায় বয়স বাড়ে, নারীর চলাফেরা, বাইরের আলো বাতাসে বেড়ে ওঠা সংকুচিত হয়,অদৃশ্য শিকল তার জীবনকে শৃঙ্খলিত করে৷ অন্যদিকে ছেলে শিশু সময়ের সাথে সাথে  বাহ্যিক দৃষ্টিতে স্বাধীন হয়৷ বাইরের পৃথিবী বড় হতে থাকে, জবাবদিহিতার ক্ষেত্র সংকুচিত হতে থাকে৷
পারিবারিক ,সামাজিক, রাষ্ট্রীয় শিক্ষা পুরুষকে এই ধারণায় বড় করে যে, পুরুষ খাদক আর নারী খাদ্য৷ পুরুষের সাহসিকতাকে বাঘের সংগে তুলনা করা হয়৷ পশুর সাথে তুলনা তাকে নির্লজ্জ আর হিংস্র হতে সাহায্য করে৷ তার মস্তিষ্কে ভাইবেরেশন হতে থাকে পশুত্ব৷প্রেমিক পুরুষ হয়ে আনুগত্য আর অবনত হবার শিক্ষা পরিবার তাকে দেয় না৷
যারা মনে করছেন, আমার লেখায় আমি পুরুষদের ছোট করে দেখতে চেয়েছি তাদের প্রতি অনুরোধ, দয়া করে কী বলতে চাচ্ছি বুঝবার চেষ্টা করুন৷ ৷ অবিশ্বাস আর অসম্মানের এক আঁধার সময়ে বসবাস আমাদের৷ ত্রুটিটা কোথায় তা খুঁজে পাবার প্রয়াস ৷
নারী বা পুরুষ দুই দলের কোন একটি দল পিছিয়ে থাকলেই মানব সমাজের পিছিয়ে থাকা৷ সৃষ্টির টিকে থাকা এবং বিকাশ,  উভয় ক্ষেত্রে উভয়ের ভূমিকাই স্ব স্ব ক্ষেত্রে অপরিহার্য৷
ভালোবেসে ভালোবাসার মানুষের হাতে হাত রেখে সংসার সমুদ্র পাড় হবার জন্য দুজনকেই শুদ্ধ হওয়া প্রয়োজন৷
এই শুদ্ধতার প্রশ্নে সমাজের বেশির ভাগ পুরুষই নয় শুধু , নারীও মনে করে পুরুষের আবার শুদ্ধতা কি?
সভ্য হতে গেলে,  মানুষ হতে হলে নিজেকে জানতে হবে সবার আগে৷ একজন লেখক সময়ের সন্তান৷ তার নিজের জীবন মূখ্য নয়, সমাজ এবং তার অসংগতি তুলে ধরে সমাধান খোঁজাই উচিৎ৷
শারীরিক শুদ্ধতার শিক্ষা যুগে যুগে নারীকে দেয়া হয়েছে কঠোরভাবে৷ পুরুষকে সাধারণত শারীরিক শুদ্ধতা নিয়ে কিছুই বলা হয় না৷
নারী ঋতুমতি হলে তা লজ্জার৷ পুরুষের খতনায় নেচে গেয়ে উৎসব পালন করা হয়৷ লজ্জা নয়, ব্যাপারটা আনন্দের৷ নারী তার শরীরকে সুরক্ষায় যত কঠোর হয়,পুরুষ সে সুরক্ষা ভাঙ্গায় তত সচেষ্ট হয়৷ পবিত্রতা রক্ষা মানুষের কাজ৷ এই পবিত্রতা রক্ষায় পুরুষকে পরিবার, সমাজ রাষ্ট্র বাধ্য করে না৷ তার বেড়ে ওঠা এই ধারণা নিয়ে যে, বস্র হরণ তোমার অধিকার৷ সেবা দেয়া নয়, সেবা পাওয়া তোমার অধিকার৷
জন্ম থেকে বেড়ে ওঠার প্রতি ধাপে একটু একটু করে ছেলে শিশু মানবিক পুরুষ নয়, স্বৈরাচারী পুরুষ হয়৷ ভালোবাসা নয়, প্রেম নয়, কামনার কাছে আত্মসমর্পন করে৷ প্রেমের শাশ্বত বাণী তাকে কেউ শোনায় না৷ ভালোবাসায় সিক্ত হবার শিক্ষা তাকে সমাজ দেয় না৷
কামনার আগুনে প্রজ্জ্বলিত পুরুষ ক্রমেই একা হয়৷ দহনে দহনে নিঃসংগ সে মানবিকতা অর্জনে ব্যর্থ হয়৷ প্রতি পদে পদে মানবিকতা হারানো পুরুষের মাঝেই স্রোতের বিপরীতে জন্ম নেয় মহামানব৷ শৃংখল ভেঙ্গে বেড়িযে এসে তাঁদের আলোয় আলোকিত করে সমাজকে৷
পুরুষের মানুষ হয়ে বেড়ে ওঠা প্রচলিত সমাজ আর চিন্তা চেতনায় সহজ নয়৷পুরুষের নীরব কান্না, অদৃশ্য শৃংখল সমাজ দেখে না৷ সাহিত্যেও  এর স্থান নেই৷  যদিও বলা হয় , নারীর বুক ফাটে কিন্তু মুখ ফোটে না৷ আমার মনে হয় কথাটা পুরুষের বেলায় প্রযোজ্য৷ নারী চিৎকার করে যা বলতে পারে পুরুষ কি তা পারে?
এখন সময় পুরুষকে মানবিক মানুষ করে গড়ে তোলার৷  ঘরে ঘরে পুত্র সন্তানকে পবিত্র, মানবিক, শুদ্ধ করে গড়ে না তুললে ভাইয়ের আদরের বোন, পিতার বুকের ধন রাজকন্যা কার হাতে ভালোবেসে রাখবে বিশ্বাসের হাত?

 

শাকিলা নাছরিন পাপিয়া
শিক্ষক ও কলামিস্ট

 

এই লেখকের অন্যান্য লেখা



আপনার মূল্যবান মতামত দিন:


Top