সিডনী শুক্রবার, ২৭শে নভেম্বর ২০২০, ১২ই অগ্রহায়ণ ১৪২৭

অহো শাল্লা, অহো ভাটিবাংলা এবং স্বপ্নবান মানুষেরা : সাইফুর রহমান কায়েস


প্রকাশিত:
১৪ নভেম্বর ২০২০ ১৬:১১

আপডেট:
২৭ নভেম্বর ২০২০ ০০:০১

 

শাল্লা ভাটির জনপদের একটি সুবিদিত অঞ্চল। এই অঞ্চলেই আছে বিশাল হাওর। ফসলি জমির বিস্তীর্ণ প্রান্তর। কাদিরপুর কয়লার খনি। রাজনীতির প্রবাদ পুরুষ ভাটিবাংলার মানুষের আস্থার প্রতীক বাবু সুরঞ্জিত সেনগুপ্ত এই অঞ্চলের মানুষ। সেনবাবু বলতে আমরা ভাটিবাংলাকে বুঝি আর ভাটিবাংলা বলতেই সেনবাবুর নামটি খুব সহজেই আমাদের নজরে আসে, স্মৃতির ঝাপসাভাব আর ঘোর কেটে যায়। কালিদহ সাগরের পাড়ে এই অঞ্চল অবস্থিত। একসময়ের স্থায়ী সমুদ্র কালের বিবর্তনে অস্থায়ী সমুদ্রের রূপ ধারণ করেছে।  যেদিকেই তাকাবেন বর্ষাকালে চারদিকেই জলরাশি চোখে পড়বে। 

এই জনপদে ভেলানগর নদী পেরিয়ে আগেও এসেছি দুইতিন বার। এবার এসেছি দাড়াইন নদী পেরিয়ে দিরাইয়ের হারাণপুর ঘাট থেকে। দিরাই থেকে শ্যামারচর পর্যন্ত রাস্তার বেহালদশা আমাদের উন্নতিকে বিলবোর্ড দিয়ে ঢেকে দিয়েছে। এটি এখন স্থানীয় জনগণের গলার কাটা হয়ে দাড়িয়েছে। মরণফাঁদ বললেও অত্যুক্তি হবে না।

 কিন্তু এবার ভাটি অঞ্চলে অনেক পরিবর্তন চোখে পড়েছে। আগে বাজারের জন্য কোনো নির্দিষ্ট স্থান ছিলো না। রাস্তার ধারে বাজার বসতো। কিন্তু এখন বড় জলাশয় ভরাট করে বাজারের জন্য শেড নির্মাণ করা হয়েছে। উন্নতি অনেকটাই এগ্রেসিভ পন্থায় হয়েছে। ফলে বিপর্যয়ের আশংকাটি একটি স্থায়ী শংকায় রূপ নিয়েছে। 

গতকাল আমি  দুপুরের খাবার খাচ্ছিলাম অফিসে বসে। এক সহকর্মী অফিসে এসে বললেন বাজারের পাশের খালে এক যুবককে যক্ষি নিয়ে গেছে। কিন্তু এই বিজ্ঞানের উৎকর্ষের যুগে আমি যক্ষির উপস্থিতি মানতে নারাজ। এই খালটি উন্নয়নের বলি হয়েছে। স্থানীয় উপজেলা প্রশাসনের সীমানায় একটি বড় পুকুর ভরাট করতে গিয়ে এই খাল থেকে খননযন্ত্র দিয়ে মাটি উত্তোলন করায় খালের গভীরতা বেড়ে এমন পরিস্থিতি সৃষ্টি হয়েছে যে বর্ষায় এখানে পানির ঘূর্ণন তৈরির ফলে স্রোতের এবং জলের খরতা তৈরী হতে দেখা যায়। এর পাকে মানুষ গরু যাই পড়ুক না কেনো এর থেকে নিস্তার পাওয়ার সম্ভাবনা ক্ষীণ হয়ে পড়ে। যার ফল আমরা দেখি যুবকের সলিলসমাধি রচনার মধ্য দিয়ে। কাল থেকে স্থানীয় যুবক এবং ডুবুরিগণ অক্লান্ত পরিশ্রম করেও তলিয়ে যাওয়া যুবকটিকে মৃত কিংবা জীবিত কোনো অবস্থায়ই উদ্ধার করতে পারেন নি। আমাদের শনৈ শনৈ বাহ্যিক উন্নতি এই যুবককে মৃত্যুর দিকে ঠেলে দিয়েছে। এটা একইভাবে প্রাকৃতিক বিপর্যয়ের শামিল। ইকোলজিক্যাল ডেষ্ট্রাকশন যখন হয় তখন সেটা আর উন্নয়ন হিসাবে অভিহিত হয় না। সেটিকে অবনয়ন বলাই শ্রেয়। একইভাবে আমরা দেখি ভাটির জনপদের কিছু অঞ্চলকে পর্যটনের জন্য যখন উন্মুক্ত করে দেয়া হয়েছে তখন প্রাকৃতিক ভারসাম্য হুমকির মুখে পড়ে গেছে। দিরাই পদ্মবিলকে যখন পর্যটকদের কাছে আকর্ষণীয় করে তোলার লক্ষ্যে গণমাধ্যমে প্রচার চালানো হলো তখন মানুষ হুমড়ি খেয়ে পড়েছে। কিন্তু পরের বছর সেই পদ্মবিলটি স্থানীয় লোভী মানুষের খপ্পরে পড়ে, মাছ ধরার লোভনীয় স্থান বলে গণ্য হওয়ায়, গোখাদ্যের জন্য উপযুক্ত বিবেচিত হওয়ায় পরের বছরই পদ্মবিল তার গৌরব হারিয়েছে। এখন বিল আছে পদ্ম নাই। 

উন্নয়নের থাবা দেখেছি করচার হাওরে। বিশ্বম্ভরপুর উপজেলা সদরেও। বেশী লাভ ও লোভের বশবর্তী হয়ে মানুষ দালান নির্মাণের প্রতিযোগিতায় নেমেছেন। নির্বিচারে জলাশয় ভরাট করে লাল শাপলার চারণভূমি নষ্ট করা হচ্ছে। ফলে পরিবেশ, প্রতিবেশ এবং প্রাণ, প্রাণী বৈচিত্র এখন হুমকির মুখে পড়েছে।  দেখার কেউ নাই। যারা দেখার কথা তারা চোখে ঠুলি আর মুখে কুলুপ এঁটে বসে রয়েছেন। উন্নতি এখন হাওর, বাওর, বিল, জলাশয়ের পাশাপাশি মাছের, পাখাপাখালির এবং শাপলা শালুকের অভয়াশ্রমকে গিলে খাচ্ছে। টেকসই উন্নয়ন মডেলের কথা জোরেশোরে বলা হলেও সেটি এখন একটি আপ্তবাক্য ছাড়া আর কিছুই নয়। এধরনের উন্নয়ন আমাদের স্বপ্নকেও গিলে খাচ্ছে। গিলে খাচ্ছে আমাদের মানবিকতা ও মানবতাকেও। নগদ লাভের কাটায় আমরা যতোদিন উন্নয়নকে পরিমাপ করবো ততোদিন বেপথুমতী হতেই থাকবো। আর প্রাণ, প্রাণী সংহরণের মতো ঘটনা ঘটতেই থাকবে। তাই সকল অংশীজনকেই এখন থেকে হাওর নিয়ে আলাদাভাবে ভাবতে হবে। বিশেষ পরিকল্পনা প্রণয়ন করতে হবে। 

সাম্প্রতিক সময়ে অতি বন্যা আমাদের সেই শিক্ষা দিয়ে গেছে। উপর্যুপরি বন্যায় ভাটি অঞ্চলের বাড়িঘর, রাস্তাঘাট, জীবন ও জীবিকা, খাদ্য উৎপাদন মারাত্মকভাবে ক্ষতিগ্রস্ত হয়েছে।

ভাদেরটেক এলাকায় বাড়িঘর, রাস্তাঘাট ভেঙ্গে বড়খালে পরিণত হয়েছে। চলতি নদীতে অবৈধভাবে বালি, পাথর উত্তোলন অবাধে থাকায় পরিবেশ ধ্বংসের মুখে পড়ে গেছে। লোকাল ইকোনমি এই সুযোগে ফুলেফেঁপে উঠার দৃশ্য আমরা দেখতে পাই। কিন্তু এখন প্রশাসনের অনঢ় অবস্থানের কারণে স্থানীয় জনগণ এখন আর নদী থেকে বালি,পাথর উত্তোলন করতে পারছেন না। ফলে পরিবেশ ও প্রতিবেশ ধ্বংসযজ্ঞ থেকে আপাততঃ নিস্তার পেলেও তাদের জীবন ও জীবিকা পড়ে গেছে লাটে। যারা বারকী শ্রমিক ছিলেন তারাও বিপাকে পড়ে গেছেন। এদেরকে পুনর্বাসনের উদ্যোগ এখনি না নিলে সামাজিক বিশৃঙ্খলা বা সোশ্যাল ডিজর্ডার দেখা দেয়ার সম্ভাবনাকে একেবারে উড়িয়ে দেয়া যায় না। বিকল্প কর্মসংস্থানের ব্যবস্থা করে দেয়া, আর্থিকভাবে সহযোগীতা দেয়া রাষ্ট্রের দায় ও দায়িত্বের মধ্যে পড়ে। এর জন্য সুবিধাভোগী বিশেষ প্রকল্প হাতে নেয়া প্রয়োজন। পরিবেশ ও প্রতিবেশ বিধ্বংসী সকল কার্যক্রম থেকে জনগণকে মুখ ফিরিয়ে অন্যান্য উৎপাদনমুখি কাজে নিয়োজিত করতে সরকারী প্রণোদনা প্রয়োজন। 

অতি লাভের মানসিকতা থেকে সরে না আসলে এই ভাটিয়াংলাকে, এর সৌন্দর্যকে রক্ষা করা যাবে না। স্থানীয় কৃষিভিত্তিক, ছোটোখাটো ব্যবসায়ভিত্তিক কার্যক্রমকে উৎসাহিত করতে হবে। এর জন্য প্রয়োজনীয় তহবিলের যোগান দিতে হবে নামমাত্র সুদে অথবা বিনাসুদে, সহজশর্তে। 

শাল্লাসহ ভাটির সকল জনপদ একটি সম্ভাবনাময় অঞ্চল হিসাবে বিবেচিত হোক। এখানে শুধু যে পর্যটনকে কেন্দ্র করেই অর্থনৈতিক কর্মকাণ্ড চলতে পারে তা কিন্তু নয়। বাণিজ্যিক কৃষির ক্ষেত্রে এই অঞ্চলসমূহ মাইলফলক হিসাবে বিবেচিত হতে পারে। 

ভাটি অঞ্চলের অবকাঠামোগত উন্নয়নের দিকে নজর দিতে হবে। যোগাযোগ, শিক্ষা, স্বাস্থ্য এবং মানবিক উন্নয়নে বাজেট বরাদ্দ বাড়াতে হবে। দুর্নীতিবাজদের শকুনচক্ষুকে উৎপাটন করতে হবে। শূণ্য সহিষ্ণুতার নীতির প্রতিফলন আমরা দেখতে চাই জাতীয় জীবনের সর্বস্তরে। নতুবা শকুনেরা সব খেয়ে ফেলবে। সাগরচুরিতে মেতে উঠবে। 

কাল সকালে ফিরতে হবে সিলেটে। আমার তাই হাতে বৈঠা, ঘাটে নাও। দীর্ঘ একবছর পরে ভাটিবাংলা নিয়ে লিখছি। ভাটিবাংলা যে বাংলার প্রাণ৷ এখানকার মানুষগুলোর সংগ্রাম মুখরতা আমাকে প্রাণিত করে। জীবন সংগ্রামে সাফল্যের চূড়ায় আমরা তাদের দেখতে পাই বলেই র‍্যাবের ডিজি চোধুরী আব্দুল্লাহ আল মামুন এখন পিছিয়ে পড়া মানুষদের স্বপ্নদ্রষ্টা, আদর্শ। সেনবাবুর তৈরী করা পথেই এগুচ্ছেন তার স্ত্রী ডক্টর জয়া সেন এমপি। তার বিপরীত স্রোতে দাড় বেয়ে চলা জনকল্যাণে নিবেদিতপ্রাণ হাওরবন্ধু মান্যবর অমর চাঁদ দাস। তিনি মুক্তিযুদ্ধের অকোতুভয় সংগঠক, বাম রাজনীতির প্রবাদপ্রতিম ব্যক্তিত্ব, যুদ্ধাপরাধীদের বিরুদ্ধে বিচারের উচ্চকণ্ঠ, একজন হার মানতে না জানা মানুষ। সাতাত্তর বছরের চির তরুণ। এই ভাটির পুরুষের স্নেহে আমি বেড়ে উঠি। আমিও হয়ে উঠি স্বপ্নচারী ও স্বপ্নসঞ্চারী যুবক। তাকে সাথে নিয়ে গণহত্যার তথ্যচিত্র লিখতে লিখতে আমি এই বোধ ও বোধনের আনন্দে মেতে উঠি।

ছবিঃ ইন্টারনেট থেকে

 

সাইফুর রহমান কায়েস 
প্রধান সম্পাদক
শব্দকথা টোয়েন্টিফোর ডটকম 



আপনার মূল্যবান মতামত দিন:


Top