সিডনী শুক্রবার, ২৭শে নভেম্বর ২০২০, ১২ই অগ্রহায়ণ ১৪২৭

মিয়ানমার নির্বাচন ২০২০ ও রোহিঙ্গা ভবিষ্যৎ : মু: মাহবুবুর রহমান 


প্রকাশিত:
১৯ নভেম্বর ২০২০ ১৫:১১

আপডেট:
২৭ নভেম্বর ২০২০ ০৩:৩৪

ছবিঃ ইয়াঙ্গুনে ভোট দেয়ার লাইন

 

পার্লামেন্টে সংখ্যাগরিষ্ঠ আসন জিতে মিয়ানমারে ফের ক্ষমতায় বসতে যাচ্ছে অং সান সু চি'র নেতৃত্বাধীন ন্যাশনাল লীগ ফর ডেমোক্র্যাসি (এনএলডি)। এ পর্যন্ত প্রাপ্ত ফলাফলে জানা গেছে, ২০১৫ সালের নির্বাচনের চেয়েও ভালো ফলাফল করে ক্ষমতাসীন হচ্ছেন সু চি। 

মিয়ানমারের পার্লামেন্টের নিম্নকক্ষে (Pyithu Hluttaw) ৪৪০ ও উচ্চকক্ষে ((Amyotha Hluttaw) ২২৪ আসন রয়েছে। দেশটির সংবিধানে সেনাবাহিনীর জন্য সংসদে ২৫ শতাংশ আসন বরাদ্দের কথা বলা আছে৷ সে অনুযায়ী নিম্নকক্ষে ১১০টি ও উচ্চকক্ষে ৫৬ আসন সেনাবাহিনীর জন্য সংরক্ষিত। ফলে মিয়ানমারে নিম্ন কিংবা উচ্চকক্ষের সব আসনে নির্বাচন হয় না। নিম্ন কক্ষে হয় ৩৩০ আসনে ভোট আর উচ্চ কক্ষে হয় ১৬৮ আসনে ভোট।    

২০১৫ এর মতো এবারও দুই কক্ষেই সংখ্যাগরিষ্ঠ আসনে বিজয়ী হয়েছে সু চির দল। ২০১৫ সালে দেশটিতে প্রথমবারের মতো অনুষ্ঠিত সাধারণ নির্বাচনে অং সান সু চির এনএলডি ভূমিধস জয় পায়। ওই বছর দলটি সংসদের মোট ৩৯০ আসনে বিজয়ী হয়। সেই সংখ্যা ছাড়িয়ে এ বছর সুচির দল পেয়েছে ৩৯৬ আসন। ফলে নিশ্চিত করেই বলা যায় অং সান সু চির দল এনএলডি’ই মিয়ানমারে সরকার গঠন করতে যাচ্ছে।  

তথ্যপ্রবাহে ব্যাপক বিধি-নিষেধ থাকায় মিয়ানমার নির্বাচনের সার্বিক চিত্র বাইরে থেকে পাওয়ার সুযোগ সীমিত। তবে আন্তর্জাতিক সংবাদ মাধ্যমগুলো জানিয়েছে বড় ধরণের কোনো অঘটন ছাড়া মিয়ানমারে মোটামুটি শান্তিপূর্ণভাবেই অনুষ্ঠিত হয়েছে ২০২০ এর সাধারণ নির্বাচন। ব্যাপক কোভিড-১৯ সংক্রমণের মধ্যেও ভোটাররা নির্বাচনের দিন ভোটকেন্দ্রগুলোর সামনে লম্বা লাইনে দাঁড়িয়ে ভোট দিয়েছে বলে জানায় আন্তর্জাতিক সংবাদ মাধ্যম। কোভিডে এ পর্যন্ত মিয়ানমারে ১৬০০ জনের বেশি মানুষের মৃত্যু হয়েছে বলে জানা গেছে। 

৫০ বছরের সামরিক শাসনের অবসানের পর গণতান্ত্রিক যাত্রায় এ বছরের নির্বাচন ছিল দেশটির দ্বিতীয় সাধারণ নির্বাচন যা অনুষ্ঠিত হয় গত ৮ নভেম্বর। এবারের মিয়ানমার নির্বাচনে মোট নিবন্ধিত ভোটার ছিল ৩ কোটি ৭০ লাখ। তবে, নিরাপত্তার অজুহাতে নির্বাচন থেকে বাইরে রাখা হয় রাখাইন, শান ও কাচিন রাজ্যের রোহিঙ্গাসহ সংখ্যালঘু জনগোষ্ঠীর ২৬ লাখ মানুষকে।  

গত কয়েক দশক সামরিক শাসনে থাকা দেশটিতে ২০১৫ তে হওয়া প্রথম নির্বাচনে সংখ্যালঘু রোহিঙ্গাদের ভোট প্রক্রিয়ার বাইরে রাখা হয়েছিল। আর এবারও রোহিঙ্গাদের ভোটাধিকার প্রয়োগের সুযোগ দেয়া হয়নি। ১৯৮২ সাল থেকে নাগরিকত্বের পরিচয় নিয়ে সমস্যা থাকলেও ২০১৫ সালের  আগ পর্যন্ত অনুষ্ঠিত সব নির্বাচনে ভোটাধিকার প্রয়োগের সুযোগ পেয়েছিলো রোহিঙ্গারা। ২০১৫ সাল থেকে অন্যান্য মৌলিক অধিকার কেড়ে নেয়ার পাশাপাশি রোহিঙ্গাদের ভোটাধিকার প্রয়োগের অধিকারও কেড়ে নেয় মিয়ানমার।   

২০১৭ সালে রোহিঙ্গা গণহত্যায় মদদ দেওয়ার অভিযোগে বিশ্বজুড়ে সমালোচিত হন নোবেল জয়ী নেত্রী অং সান সু চি। কিন্তু রোহিঙ্গাদের গণহত্যার কোনো প্রভাব মিয়ানমারের অভ্যন্তরীন তথা সুচির রাজনীতিতে কোনো প্রভাব পড়েছে বলে মনে হয় না বরং দেশের ভেতরে সু চি’র জনপ্রিয়তা আরো বেড়েছে। যার প্রমান এবারের নির্বাচনের ফল।  কাজেই এই নির্বাচন মিয়ানমারের জাতিগত দ্বন্দ্বের কোনো সমাধান কিংবা বাংলাদেশে পালিয়ে আসা ১১ লাখেরও বেশি রোহিঙ্গার জন্য কোনো সুসংবাদ বয়ে আনবে কীনা সে প্রশ্ন করাই যায় ।  

নাগরিকত্ব নিয়ে সাংবিধানিক জটিলতায় ২০১৫ সালের নির্বাচনে বিজয়ী হয়েও প্রধানমন্ত্রী কিংবা প্রেসিডেন্টের পদ পাননি সু চি। আলাদা পদ সৃষ্টি করে তিনি হন স্টেট কাউন্সিলর। এ বছরও হয়তো নতুনভাবে স্টেট কাউন্সিলরই থাকবেন মিয়ানমারে আপোষহীন তকমা পাওয়া নেত্রী অং সান সু চি। এতে কি মিয়ানমারে রোহিঙ্গারা কোনো বাড়তি সুবিধা পাবেন? উত্তরটি যে, না হবে সেটা রোহিঙ্গারা গত পাঁচ বছর সু চি স্টেট কাউন্সিলর থাকাকালীনই টের পেয়েছে।   

প্রকৃত অর্থে, সামরিকতন্ত্রের পথ থেকে বাকবদল করে গণতন্ত্রের দিকে মিয়ানমার নতুন ভাবে যাত্রা শুরু করেছিলো ২০১০ সালের নভেম্বরে, কারণ সে বছর দীর্ঘ বন্দী দশা থেকে মুক্তি পেয়েছিলো গণতন্ত্রপন্থী হিসেবে সুপরিচিত হয়ে ওঠা নেত্রী অং সান সু চি। আর সুচির এই মুক্তিতে আশাবাদী হয়েছিল সংখ্যালঘু রোহিঙ্গা মুসলিমরা।  কারণ রোহিঙ্গারা সবসময় সু চির একনিষ্ঠ সমর্থক ছিল। কিন্তু তাদের সে আশা দুরাশায় পরিণত হতে বেশিদিন সময় লাগেনি। মুক্তি পাওয়ার পর এখন পর্যন্ত রোহিঙ্গা নামক শব্দটি মুখে নেননি সু চি। বিশ্ব মিডিয়া রোহিঙ্গা শব্দ ব্যবহার করলেও মিয়ানমারের অভ্যন্তরে রোহিঙ্গা নামক শব্দ ব্যবহার নিষিদ্ধ।   

সর্বশেষ ২০২০ সালে আন্তর্জাতিক অপরাধ আদালতে মিয়ানমারের বিরুদ্ধে ওঠা রোহিঙ্গা গণহত্যার অভিযোগের জবাব দিতে ব্যস্ত ছিলেন সু চি, কোন কোন মহলের অভিযোগ তিনি এমনকি মিয়ানমার সামরিক বাহিনীর বিরুদ্ধে ওঠা অভিযোগের যৌক্তিকতা প্রমাণেরও চেষ্টা করেছেন।  

মিয়ানমারের সাড়ে পাঁচ কোটি জনসংখ্যার মাত্র চার শতাংশ মুসলিম এবং এদের বর্তমানে কোন মূলধারার রাজনৈতিক দল নেই। আবার এই চার শতাংশ মুসলমানের সবাই রোহিঙ্গা নয়, যদিও একসময় মিয়ানমারে মুসলিম সম্প্রদায়ের মধ্যে সর্বাধিক সংখ্যক ছিলো রোহিঙ্গা মুসলিম। যারা মূলত বসবাস করতো মিয়ানমারের রাখাইন প্রদেশে কিংবা রাখাইন রাজ্যে (রাখাইনের পূর্ব নাম ছিলো আরাকান)। আর দেশটির রাখাইন রাজ্যে মিয়ানমার সেনাবাহিনীর নির্যাতন-নিপীড়ন থেকে প্রাণ বাচাতে ২০১৭ সালে  বাংলাদেশে পালিয়ে এসেছে অন্তত ১১ লক্ষ রোহিঙ্গা মুসলিম। কাজেই মিয়ানমারে এখন মোট জনসংখ্যার চার শতাংশ মুসলিম আছে কীনা সে প্রশ্নই থেকেই যায়।   

তবে এবারের নির্বাচনে রোহিঙ্গা ছাড়া অন্য মুসলিম সম্প্রদায় থেকে দু'জন পার্লামেন্ট সদস্য হিসাবে নির্বাচিত হয়েছেন বলে জানা গেছে। তারা দু'জনই এন এল ডি 'র প্রার্থী হিসাবে নির্বাচনে প্রতিদ্বন্দ্বিতা করে বিজয়ী হয়েছেন। অং সান সু চির ক্ষমতাসীন ন্যাশনাল লিগ ফর ডেমোক্রেসি (এনএলডি) দলের ১,১০০ এর বেশি প্রার্থীর মধ্যে মাত্র এই দুজনই ছিলেন মুসলিম প্রার্থী। তাদের মধ্যে একজন হলেন সিথু মং (৩৩) যিনি ইয়াঙ্গুন শহরের কেন্দ্রীয় এলাকার সংসদীয় আসনে নির্বাচিত হয়েছেন।  আরেকজন হলেন উইন মিয়া মিয়া (৭১) যিনি বিজয়ী হয়েছেন মান্দালয়ে। ২০১৫ সালের নির্বাচনে মুসলিম সম্প্রদায়ের কেউই নির্বাচনে প্রার্থী হতে পারেনি, তবে এবারের নির্বাচনে এই দু'জন মুসলিম সম্প্রদায়ের প্রতিনিধিত্ব করার সুযোগ পেয়েছেন।   

জয়ের পর এএফপিকে দেওয়া এক সাক্ষাৎকারে সিথু মং বলেন, ‘আমি সব ধর্মের জনগণের জন্য কাজ করব, বিশেষ করে যারা বৈষম্যের শিকার, নিপীড়িত বা মানবাধিকার থেকে বঞ্চিত।‘ তিনি আরো বলেন, ‘আমার এলাকার কোনো মানুষের প্রতি অন্যায় হলে, আমি তাদের রক্ষা করব।‘  তবে রোহিঙ্গা ইস্যু নিয়ে কথা বলতে রাজী হননি তিনি। রোহিঙ্গা বাদে মিয়ানমারে অন্যান্য জাতিগোষ্ঠীর মুসলিমদের নাগরিকত্ব থাকলেও, তাদেরকেও বৈষম্যের শিকার হতে হয় বলে জানান সিথু মং। 

মিয়ানমারের এবারের নির্বাচন কার্যত কোনো গুণগত পরিবর্তন নিয়ে আসেনি, গত পাঁচ বছর যারা ক্ষমতায় ছিল তারাই আবার আসছে ক্ষমতায়। কাজেই রোহিঙ্গা ইস্যুতে শাসকগোষ্ঠীর পূর্বতন অবস্থান থেকে সরে আসার তেমন কোনো সম্ভাবনা নেই বলেই মনে করছেন আন্তর্জাতিক বিশ্লেষকরা। অবশ্য সু চি 'র দল না এসে যদি অন্য কোনো দলও ক্ষমতায় আসতো তাতেও রোহিঙ্গাদের জন্য তেমন কোনো সুখবর আসতো বলে মনে করেন না বিশ্লেষকরা, কারণ রোহিঙ্গা ইস্যুতে মিয়ানমারের সেনাবাহিনী ও সবকটি রাজনৈতিক দলের মনোভাব প্রায় একই। 

বাংলাদেশের ৩৪ টি ক্যাম্পে ১১ লাখেরও বেশি রোহিঙ্গা গত তিন বছরের বেশি সময় ধরে অবস্থান করলেও তাদের ফিরিয়ে নেয়ার ব্যাপারে কার্যত কোন উদ্যোগ নেয়নি মিয়ানমার। এছাড়া গত বিশ বছরেরও বেশি সময় ধরে বাংলাদেশে অবস্থানকারী ৩ লাখেরও বেশি রোহিঙ্গা তো আছেই। এইসব রোহিঙ্গারা কবে মিয়ানমারে ফেরত যাবে কিংবা তাদের ফিরিয়ে নিতে মিয়ানমারের নতুন সরকার কতটুকু উদ্যোগী হবে সে প্রশ্নের উত্তর হয়তো সময়ই বলে দিবে।  তবে আপাত: দৃষ্টিতে মিয়ানমারের ২০২০ নির্বাচনের ফল ও পারিপার্শ্বিক অবস্থা, রোহিঙ্গা জনগোষ্ঠীর ভবিষ্যৎ সংরক্ষণের জন্য যে, কোনো সুখবর বয়ে আনেনি এটা বলাই যায়।   

ছবি সৌজন্যঃ রয়টার্স

 

মু: মাহবুবুর রহমান 
নিউজিল্যান্ডের মেসি ইউনিভার্সিটির পিএইচডি গবেষক



আপনার মূল্যবান মতামত দিন:


Top