সিডনী মঙ্গলবার, ২৬শে জানুয়ারী ২০২১, ১২ই মাঘ ১৪২৭

নেট শূন্য বিল্ডিংয়ের দিকে যাচ্ছি আমরা : এম মাহমুদুল হাসান


প্রকাশিত:
১০ জানুয়ারী ২০২১ ১৭:২৫

আপডেট:
২৬ জানুয়ারী ২০২১ ০৪:২৩

ছবি সংগৃহিত

 

নেট শূন্য কি?

বিল্ডিংয়ের নেট শূন্য বলতে দুটি বিষয়কে বিবেচেনায় আনা হয় তা হলো নেট শূন্য শক্তি এবং নেট শূন্য কার্বন | নেট  শূন্য শক্তি বলতে যা বুঝায় তা হলো যে পরিমান শক্তি প্রতিবছর একটা বিল্ডিং এর দরকার হয় তাকে ভারসাম্য করার জন্য সেই পরিমান শক্তি উৎপাদন করা অনসাইট বা অফসাইট জায়গায় । কার্বন নিউট্রাল বিল্ডিং বলতে সেই বিল্ডিংকে বুঝানো হয় যেখানে  ব্যবহৃত শক্তির সর্বোচ্চ পরিমান খরচ কমানো এবং বাকি ব্যবহৃত প্রয়োজনীয় শক্তিকে শূন্য করার জন্য সর্বনিম্ন কার্বন শক্তির উৎস থেকে শক্তি ব্যবহার করা বা বেশি পরিমানে সর্বনিম্ন কার্বন উৎস থেকে শক্তি ব্যবহার করা।

 

নেট শূন্য প্রক্রিয়াটা  দু ভাগে বিভক্ত। একটি হলো রূপায়িত শক্তি বা কার্বন অন্যটি হলো চলমান (অপারেশনাল) শক্তি বা কার্বন। কনস্ট্রাকশন এবং ম্যাটেরিয়ালস তৈরিতে যে শক্তি ব্যবহৃত হয় তা হলো রূপায়িত শক্তি বা সঙ্গে সংশ্লিষ্ট সব উৎপাদিত কার্বন। অপারেশনাল শক্তি হলো জ্বালানি, ট্রান্সপোর্ট এবং অপচয়ে ব্যবহৃত শক্তি বা সঙ্গে সংশ্লিষ্ট সব উৎপাদিত কার্বন। একটি শূন্য কার্বন সার্টিফিকেশন পেতে হলে বিল্ডিংয়ের সঙ্গে সংশ্লিষ্ট সব উৎপাদিত কার্বনকে শূন্য করতে হবে স্বল্পমেয়াদি বা দীর্ঘমেয়াদি পরিকল্পনায়।

 

নেট শূন্য ডিজাইন

এবার আসা যাক নেট শূন্য (জিরো) ডিজাইন করতে হলে কি করতে হবে ?  প্রথমত যে স্থানে বিল্ডিং হবে তার সর্বোত্তম ব্যাবহার করা সহিষ্ণু শীতাতপ নিয়ন্ত্রণ বিবেচনায়, বিল্ডিংয়ের এনভেলাপ এবং ফর্ম হতে হবে জলবায়ু পরিবর্তন বিবেচনা করে, কম তাপ শোষণকারী উন্নত এনভেলাপ এবং দরজা-জানালা , পর্যাপ্ত সিলড এবং ইন্সুলেটেড, দক্ষ শক্তির শীতাতপ নিয়ন্ত্রিত (হিটিং, কুলিং), দক্ষ শক্তির গরম পানির সরঞ্জামের এবং বাসার ব্যবহৃত সরঞ্জামের। এর সঙ্গে থাকবে নবায়নযোগ্য শক্তি উৎপাদন অনসাইট বা অফসাইট  বা কার্বন অফসেট কিনতে হবে।

নেট শূন্য সার্টিফিকেশন

ইন্টারন্যাশনাল লিভিং ফিউচার ইনস্টিটিউট (আই এল এফ আই) বিল্ডিংয়ের শূন্য কার্বন (জিরো কার্বন) সার্টিফিকেশন দেয়।  অস্ট্রেলিয়াসহ বিশ্বের অনেক দেশে এদের শাখা আছে।  তবে আছে কিছু শর্ত এই নেট শূন্য সার্টিফিকেশনের, তা হলো বিল্ডিংকে হতে হবে প্রাকৃতিক গ্যাস বিহীন বা অনসাইট গ্যাস পোড়ানো যাবে না, প্রতিবছর শক্তি খরচ ৮৮ কিলো ওয়াট আওয়ার, রূপায়িত শক্তি ৫০০ কেজি প্রতিমিটার স্কয়ারে, নবায়নযোগ্য শক্তি স্থানীয় গ্রিড এ যোগান দিতে হবে । দেশভেদে বিল্ডিংয়ের অবস্থান এবং প্রকার অনুযায়ী আছে আরকিছু শর্ত, নির্দেশনা, ভবিষৎ পৰিকল্পনা এবং তার বাস্তবায়ন শুরু দেখানো।

 

নেট শূন্য : অস্ট্রেলিয়া এবং বিশ্বের অন্য দেশগুলির অবস্থা

অস্ট্রেলিয়ায় “ক্লাইমেট অ্যাক্টিভ” প্রোগ্রামটি অস্ট্রেলিয়ানদের এখন এবং ভবিষ্যতের জন্য জলবায়ু পদক্ষেপ গ্রহণের ক্ষমতা দিচ্ছে। এই প্রোগ্রামটি প্রত্যয়িত সদস্যদের দ্বারা পরিচালিত এবং সরকার-সমর্থিত প্রোগ্রাম । কার্বন নিরপেক্ষ হয়ে উঠতে, ব্যবসা এবং সংস্থাগুলি তাদের কার্যকলাপ দ্বারা উৎপাদিত গ্রিনহাউস গ্যাস নির্গমন যেমন জ্বালানী বা বিদ্যুতের ব্যবহার এবং ট্রান্সপোর্ট ব্যবহৃত শক্তি বা সঙ্গে সংশ্লিষ্ট সব উৎপাদিত কার্বন গণনা করে। তারা নতুন প্রযুক্তিতে বিনিয়োগ করে বা তাদের পরিচালনার উপায় পরিবর্তন করে এই নির্গমনকে যথাসম্ভব হ্রাস করে। কার্বন অফসেট কিনে যে কোনও অবশিষ্ট নির্গমনকে 'বাতিল' করা যায়। কার্বন অফসেট ইউনিটগুলি এমন ক্রিয়াকলাপ থেকে উত্পাদিত হয় যা গ্রিনহাউস গ্যাস নির্গমনকে পরিবেশে ছেড়ে দেওয়া থেকে বাধা দেয়, হ্রাস করে বা সরিয়ে দেয় |  “ক্লাইমেট অ্যাক্টিভ” প্রোগ্রামটি বিল্ডিংয়ের অপারেশনাল শক্তি বা সঙ্গে সংশ্লিষ্ট সব উৎপাদিত কার্বনকে শূন্য বা নিরপেক্ষ (নিউট্রাল) করে । গ্রীন বিল্ডিং কাউন্সিল অস্ট্রেলিয়া ২০২০ সাল থেকে একটি ৬ ষ্টার বিল্ডিংকে – তার অপারেশনাল শক্তি বা কার্বন  অবশ্যই নেট শূন্য হতে হবে  বলে নতুন রেটিং টুল “গ্রীন ষ্টার বিল্ডিংসের” আওতায় এনেছে । ২০২৩ এ একটি ৫- ষ্টার বিল্ডিংকে অবশ্যই নেট শূন্য হতে হবে এবং ১00% নবায়নযোগ্য  শক্তি দিয়ে চালাতে হবে বা ১00% নবায়নযোগ্য শক্তির উৎস বা সবুজ শক্তি থেকে  ব্যবহার করতে হবে ।

 

ইইউ, চীন, জাপান, দক্ষিণ কোরিয়া এবং আমেরিকা - বৈশ্বিক অর্থনীতির প্রায় দুই তৃতীয়াংশ, বিশ্বের প্রায় অর্ধেক কার্বন  নির্গমন করে ।  এসব দেশ ২০৫০ সালের মধ্যে নেট শূন্য থাকবে বলে ঘোষণা দিয়েছে । এসব দেশ জীবাশ্ম জ্বালানী কম পরিমান ব্যবহার করবে ।  এটি একটি বিশাল স্থানান্তর। অস্ট্রেলিয়া জীবাশ্ম জ্বালানী রফতানি বাজারের ৭৫ % এর কাছাকাছি এবং চীন হলো অন্যতম আমদানিকারক দেশ ।   এর অর্থ কী তা নিয়ে কোনও বিভ্রান্তি না ঘটে। মূলত শূন্যে পৌঁছনোর অর্থ হ'ল ২০৩০ সালের মধ্যে কমবেশি বাজার কমে যাওয়া, কয়লা, গ্যাস ও তেল থেকে বেরিয়ে আসা। এটি অস্ট্রেলিয়ার জন্য একটি ভূমিকম্পের মতো পরিবর্তন এবং এর অর্থ সম্ভবত আমাদের কয়লা ও গ্যাসের চাহিদা কমবে যা গত কয়েক দশকে যত দ্রুত বেড়েছে। জীবাশ্ম জ্বালানীর রপ্তানি আয়ে সংকোচন এবং কম ব্যবহার একটা বড় চ্যালেঞ্জ অস্ট্রেলিয়ার জন্য ।

 

নতুন নেট শূন্য বিল্ডিং নির্মাণের ক্ষেত্রে দেশগুলির আইন এবং তার প্রয়োগের পাশাপাশি মালিক পক্ষ, বিকাশকারী এবং নির্মাতারা (ডেভেলপার, বিল্ডার), প্রকৌশলী, টেকনোলজিস্ট, আর্কিটেক্টস থেকে শুরু করে আমাদের পর্যন্ত একটা বিশাল ভূমিকা আছে। প্রাথমিক পুঁজি একটু বেশি খরচ হলেও, চলমান খরচ অনেক কম থাকে নেট শূন্য বিল্ডিংয়ে।  যদি বিল্ডিংয়ের লাইফ সাইকেল ৫০-১০০ বছর ধরি তাহলে খুব কম চলমান খরচ সম্পন্ন, শূন্য কার্বন নির্গমনকারী, পরিবেশ রক্ষাকারী, স্বাস্থ্যকর ও আরামদায়ক আবাসস্থল নির্মাণে এবং জাতিসংঘের টেকসই উন্নয়ন (সাস্টেইনাবল ডেভেলপমেন্ট) লক্ষ্য পূরণে বিশ্বের অনেক দেশই এগিয়ে যাবে।

 

এম মাহমুদুল হাসান
সাস্টেনিবিলিটি কনসালটেন্ট
ব্রিসবেন অস্ট্রেলিয়া

 

এই লেখকের অন্যান্য লেখা



আপনার মূল্যবান মতামত দিন:


Top