সিডনী রবিবার, ২৫শে জুলাই ২০২১, ৯ই শ্রাবণ ১৪২৮

কেবলই দীর্ঘশ্বাস : ডাঃ মালিহা পারভীন


প্রকাশিত:
১৭ জুলাই ২০২১ ১৩:২৮

আপডেট:
১৭ জুলাই ২০২১ ১৬:৫২

ছবিঃ ডাঃ মালিহা পারভীন

 

বলছি রুপগঞ্জের অগ্নিকাণ্ডের ঘটনা। তখন করোনাকালীন লক ডাউন চলছে। প্রতিদিন মৃত্যূ ও সংক্রমনের হার লাফিয়ে বাড়ছে। বেকারত্ব, দারিদ্র, বিপর্যস্ত শিক্ষাজীবন নিয়ে জনমনে যখন নিদারুন অনিশ্চয়তা ও হতাশা তখন একের পর এক দুঃসংবাদ। সম্প্রতি মগবাজার ট্র‍্যাজেডির ধুঁয়া  কাটতে না কাটতেই আবারও রুপগঞ্জ ট্র‍্যাজেডি।
গত ৮--০৭-২০২১, অপরাহ্নে নারায়নগঞ্জ জিলার রুপগঞ্জে হাশেম ফুড লিমিটেডের সেজান জুস কারখানার ভয়াবহ অগ্নিকান্ডের ঘটনা ঘটে গেল। প্রাণ হারালো অন্ততঃ ৫২ জন। কিশোর, কিশোরী, যুবক, যুবতী, মধ্যবয়স্ক মিলে অন্তত ৫২ জন তাজা প্রাণ পুড়ে অংগার হলো।  কি নৃশংসতা!  মানবিকতার কি বিরাট স্খলন, নির্মমতার নিষ্ঠুরতম দৃষ্টান্ত!
ভস্মীভূত ভবন থেকে একের পর এক বের করা হলো সাদা কাপড়ে  মোড়া মৃতদেহ। না না, দেহ নয়, আগুনে পোড়া মানব কংকাল। উদ্ধারকারীদের বেশি ওজন বইবার কষ্টটা এদের দেয়নি হতভাগারা। যেন কোলবালিশের খোলসে ভরা, ছোটবেলায় জলে ভাসিয়ে দেয়া কাগজের নৌকা!  আহা!  সাদা খামবন্দী দুর্ভাগাদের ভাগ্যলিপি! কিন্তু এ কি কেবলই এদের দূর্ভাগ্য! এ কি কেবলই দূর্ঘটনা!

অবশ্যই না। এটাতো খুন , জঘন্য হত্যাকান্ড! এদের হত্যাকারী কে, এদের বিচারই বা কারা করবে? এই হত্যাকারীদের দলে আছে ভাগ্যহত শ্রমিকদের ' বিধাতা ' শিল্প কারখানার মালিকগন। আছে চতুর ব্যবস্থাপনা পরিষদ, ঘুষখোর নকশাকারি ও নকশার অমুমোদন দেয়া কর্মকর্তাগন যাদের কাছে বিল্ডিং কোড মানেই পকেটে টাকা ভরা। এই হত্যাকারীদের দলে আছে ওইসব প্রতিষ্ঠান ও শিল্পকারখানার অনুমোদন দাতা, পরিদর্শক সহ আরো অনেকেই।


এই যে ফায়ার সার্ভিসকে দেখি আমরা ঘটনার পরপরই তাৎক্ষনিক দুর্ঘটনাস্থলে ছুটে যেয়ে দক্ষতার সাথে উদ্ধারকাজ সম্পন্ন করতে। কিন্তু এই ফায়ার ব্রিগেড আগে কেন নিয়মিতভাবে ভবনসমুহ, শিল্প কারখানা পরিদর্শন করে না? কেন ঝুঁকিপূর্ণ অথবা নিরাপদ পরীক্ষা করে তা চিহ্নিত করে না? বাসিন্দাদের বা কর্মীদের আত্মরক্ষার জন্য সমন্বিতভাবে নিয়মিত মহড়ার ব্যবস্থা করে না? 

বিদ্যুৎ বা গ্যাস বিভাগেরও তো কোনো দায়িত্ব নেই? সময়মতন বিল পরিশোধ না করলে লাইন কেটে দেয়ার মধ্যে বা সংযোগ দেয়ার মধ্যেই কি তাদের কর্তব্য সীমাবদ্ধ! এই যে এতো মন্ত্রণালয়, অধিদপ্তর এদের এক্ষেত্রে কতোটা মনিটরিং আমার মতোন অজ্ঞ মানুষের তা জানতে ইচ্ছে করে। সবকিছুর উর্ধ্বে ব্যর্থ সিস্টেম আর এসকল খুনীদের জন্ম দেয়া দুর্নীতিবাজ প্রশাসন! বছর বছর সহস্র অপমৃত্যূর মধ্য দিয়ে কি সংশ্লিষ্ট বিভাগদেরকে কর্তব্য বা কাজের পরিধি শিখিয়ে দিতে হবে! আমি এ দেশের অতি সাধারণ একজন মানুষ। তবু এই প্রশ্নগুলি আমায় প্রায়ই ভাবিত করে। এগুলো শুধু অভিযোগই নয়,  অনুতাপও বটে। এ মোর দূর্ভাগা দেশ!! 
মিডিয়া, সাংবাদিকগনের এখন প্রচুর ব্যস্ততা যাচ্ছে! এ দেশে একের পর এক ট্র‍্যাজেডি ঘটতে থাকবে আর ব্যস্ততা বাড়বে তাদের। কাটতি হবে পত্রিকা, ব্রেকিং নিউজ। গরম হবে আমজনতার ফেসবুক পোস্ট। টিভির সামনে এ দেশের জনগন খেলা দেখার ফাঁকে ঢাকা মেডিকেল মর্গের সামনে স্বজনদের আহাজারি দেখবে। দেখবে অংগার হওয়া লাশের সাথে তাদের ডি এন এ মিলানোর আশায় অপেক্ষমান অশ্রুসিক্ত চোখ। আবার রিমোটের বোতাম চেপে বিনোদন চ্যানেলে চলে যাবে।
মগবাজার ট্র‍্যাজেডি, লঞ্চ ডুবি, রানা প্লাযা ধ্বস, তাজরীন গার্মেন্টস ট্র‍্যাজেডি, নিমতলা ট্র‍্যাজেডি, তনু, মুনিয়া, রুপা! আহা, একের পর এক ধারাবাহিক সিরিয়াল দেখে বাংলাদেশের জনগন! একেকটা ঘটনা ঘটে আর তামাশা শুরু হয়ে যায় দেশে। তদন্ত কমিটি,  ক্ষতিপূরন দিয়ে টোপ গেলানোর খবর পাই। পুলিশ বাহিনীর তৎপরতা নাটক চলে। এমনকি জড়িত সন্দেহে গ্রেফতার ড্রামা হয়।  কিন্তু মূল হোতারা বরাবরই আড়ালে থেকে যায়। অর্থ আর ক্ষমতার কাছে হার মানে পুলিশ, প্রশাসন ও এমনকি বিচার বিভাগও। দিন পার হয়। কিছুদিন পর সবাই ভুলে যায় সব।
আরেক নতুন ট্র‍্যাজেডি আসে। আবার ঝ'রে পরে নিরীহ কিছু প্রাণ। ঈদ আসে, পহেলা বোশেখ, আসে কত উৎসব। প্রতিবার লঞ্চডুবি, সড়ক দূর্ঘটনা ঘটতেই থাকে। মানুষ ধরেই নিয়েছে এইসব উৎসব মানেই কিছু প্রাণের অবসান। মহামারির মত এই মৃত্যুও যেন প্রকৃতির খেলা। এ ভেবেই নিজেকে সান্তনা দেয় এ দেশের মানুষ।
জানি এদের কথা একসময় সবাই ভুলে যাবে যেমন ভুলে গেছে এমন অনেক ঘটনা।  এদের নামে রাজপথও হবে না, মনুমেন্টও হবে না। সেলাই মেশিন বা শিল্পকারখানার চাকাও থেমে থাকবে না। এই সকল বিদেহী আত্মাদের শান্তি হউক পরপারে।
তবে যাদের যায় তারাই জানে, যারা হারায় তারাই বোঝে যন্ত্রণাময় দুঃসহ এ বেঁচে থাকা! দূর্ঘটানার কবল থেকে ফিরে আসা শারীরিক ও মানসিকভাবে ক্ষতিগ্রস্ত হতভাগাদের কেউ আর পরবর্তীতে খোঁজও রাখে না। দারিদ্র, বিকলাঙ্গ, চিকিৎসাহীন দিনরাত্রি আর দুঃস্বপ্ন ভরা স্মৃতি নিয়ে কাটে ভাগ্যক্রমে বেঁচে যাওয়া আহত এই মানুষগুলোর। বাকি জীবন পার হয় মানবেতর দুর্দশার মধ্যে।এখন চলুন তো একটু ভাবি নিহতদের স্বজনেদের নিয়ে! এদের চোখের পানি সময়ে শুকায় হয়তো। কিন্তু বুকের মধ্যে নিদারুন হাহাকার আর বেদনা গেঁথে থাকে প্রতি নিঃশ্বাসে। মৃত্যূর ফাঁদপাতা কর্মক্ষেত্রে কেউ হারায় মা বাবাকে,  কেউ হারায় সন্তান, কেউ  ভাই -বোন বা আত্মীয়দের।
খেতে গেলেই অভাগী কোনো মায়ের মনে পরে আহারে মেয়েটা! সেইদিন নাইট ডিউটিতে যাওয়ার সময় তাড়াহুড়ায় ভাল করে খেয়ে যায়নি। সকালে ফিরে আলুভর্তা গরম ভাত খাবে বলেছিল। বাঁধিয়ে রাখা মেয়ের ছবি বুকে চেপে কান্নায় ভেংগে পরেন।
গরম পাতিলে অসতর্কতায় হাতে একটু ছ্যাঁকা লাগে যখন সেই জ্বলুনি যে মনকে অংগার করে! অল্পতেই এতো জ্বলুনি! আহা, সেদিন যখন আগুনে ঝলসে যাচ্ছিল সোনামনির  কচি শরীরটা কি কষ্টই না পেয়েছে! হাত বেয়ে ঘাড় বেয়ে মাথার চুলের  দাউদাউ আগুনের শিখা! নাহ, আর ভাবতে পারে না! সেদিনের মতন আর খাওয়া হয় না মা, বাবা বা কোনো বোনের। ঘরের দরজায় তালা ঝুলানো দেখলেই অভিশাপ দেয় সেই পাষণ্ডকে যে বাইরে থেকে দরজার তালা বন্ধ করে দিয়ে অগ্নিকুন্ডের মধ্যে এতোগুলি মানুষকে পুড়ে মারতে সাহায্য করেছে। এতো ভয়াবহ কষ্ট নিয়ে  কি রকম এই বেঁচে থাকা তাদের! নিহতের স্বজনরা সৃষ্টিকর্তার কাছে তাই কামনা করেন অল্প আয়ুর। করোনাক্রান্তি নিয়ে তাদের তেমন আর শংকা কাজ করে না।
সেদিনের সেই দূর্ঘটনায় ১৪-১৫ বছরের আমেনা করোনাকালিন লক ডাউনে স্কুলবন্ধে ঢাকায় এসেছিল খালার বাড়ি বেড়াতে। পাঁচ হাজার টাকা বেতনে তিন মাসের জন্য কাজ নেয় হাশেম বেভারেজ কোম্পানিতে। বাবাকে বলেছিল 'ঈদের আগে আমি তোমার হাতে দেইখো ১৫ হাজার টাকা তুইল্যা দিমু।'
নিম্ন মধ্যবিত্ত পরিবারের ইঞ্জিনিয়ারিং শেষ বর্ষের এক তরুণীও ছিল সেই ৫৩ লাশের একজন। অনিশ্চিত বেকারত্ব ঘুচাতে সে মাত্র ৫ মাস আগে এই জুস তৈরির কারখানায় চাকরি নিয়েছিল। ফুটফুটে সম্ভাবনাময় এই তরুণীর গোলাপী শরীর কয়লা  হলো। মেয়েটির ডাগর চোখের পাতা, হাতের নখ - জ্বলতে থাকলো দাউ দাউ। টিভির খবরে মেয়েটির প্রায় বৃদ্ধ মাকে দেখলাম মর্গের সামনে ডি এন এ পরীক্ষার জন্য এসেছেন। কয়লা হাড়গোড় তার মেয়ের শুধু এইটুকু নিশ্চিত হতে চান এ মুহুর্তে। গ্রীলড চিকেন খেয়ে উল্লাস করা শিল্পপতিদের  মতন 'পতিগন' এর বিবেক 'মানবগ্রীলড ' দেখে কতোটা শোকাহত হয় খুব জানতে ইচ্ছে করে।
সবার মতন এইসব আমেনা, জরিনা, মাসুমদের জীবন ছিল নানান বাঁকে নানান স্বপ্নের বসবাস। আজ তা ছাই ভস্ম শুধু। আজ তা দীর্ঘশ্বাস। এর বিচার একদিন হবে এইটুকু আশাও নিহতের পরিবার বা দেশবাসী করতে পারে না। অভিজ্ঞতায় বলে যারা দোষী তাদের আসলে তেমন কোনো শাস্তি হয় না। সাময়িক জেল খেটে বেরিয়ে আসবে এরা। আবার অনিরাপদ পরিবেশে গরীবদের শ্রম পুঁজি করে গড়বে টাকার পাহাড়। সরকারের নীতি নির্ধারকদের চেয়ার হয়তো পরিবর্তন হবে কিন্তু অশুভ বিবর্তনের ধারায় 'নীতিবান'দের পরিবর্তন হবে না।
লিখাটি যখন লিখছি হঠাৎ বৃষ্টি এলো। ভাবলাম প্রকৃতির বিরুপত আচরনের কথাও। মানুষের মংগলের জন্যতো প্রকৃতি! কিন্তু যেদিন রুপগঞ্জে আগুন লেগেছিল তখন ছিল কড়া রোদ। ঝমঝম বৃষ্টি হলে কি আরো কিছু প্রাণ বেঁচে যেতো!  উদ্ধারকারীরাও বলছিল যে ঠান্ডা থাকলে উদ্ধার কাজ আরো ত্বরান্বিত হতো। বাইরের আবহাওয়া ও কারখানার ভিতরের তাপ মিলে প্রচন্ড গরম তৈরি হয়েছিল ভিতরে। তাহলে 'বর্ষামংগল' কাদের জন্য প্রকৃত মংগল বয়ে আনে ভাবছি!
সেদিন হাশেম গ্রুপের সেজান ফ্রুট জুস ফ্যাক্টরির অগ্নিকান্ডে অনেকের মাঝে একজন নবীন বাবাও ছিলেন। যার বাচ্চার বয়স মাত্র দু'মাস।এবারের ঈদ অন্যরকম আনন্দের হতে পারতো এই পরিবারে।কিন্তু বাচ্চাটা বাবা ছাড়া বড় হতে থাকবে। তার হাতে সেজান ফ্রুট জুসের প্যাকেট ঠিকই আসবে। কিন্তু খোকার হাত বাবা আর ধরবে না কখনোই।

 

ডা: মালিহা পারভীন
কবি ও কথা সাহিত্যিক

সেগুনবাগিচা, ঢাকা

 

এই লেখকের অন্যান্য লেখা



আপনার মূল্যবান মতামত দিন:


Top