সিডনী বৃহঃস্পতিবার, ১৬ই সেপ্টেম্বর ২০২১, ১লা আশ্বিন ১৪২৮

সরকারী চাকরিতে আবেদনের সময় বাড়ানো সমীচীন : অন্জন কুমার রায়


প্রকাশিত:
২৩ আগস্ট ২০২১ ১৬:৩৯

আপডেট:
২৩ আগস্ট ২০২১ ১৮:৩১

 

শিক্ষার্থীদের মাঝে একটা স্বপ্ন থাকে। কারো সেটা পুরণ হয়, আবার কারো স্বপ্ন স্বপ্নই থেকে যায়। এমনকি বিশ্ববিদ্যালয়ের সর্বোচ্চ ডিগ্রি নিয়েও চাকরিক্ষেত্রে প্রবেশ অনেকটা নড়বড়ে হয়ে আসে। আমাদের দেশে চাকরি প্রত্যাশীর তুলনায় চাকরির ক্ষেত্র অতিনগন্য। তাই চাকরির প্রতিযোগিতায় টিকে থাকা অনেক কঠিন। আশার কথা হল, এদেশের তরুণ তরুণীরা অতি তীব্র প্রতিযোগিতার মাঝেও নিজেদের স্থান ধরে রাখার চেষ্টা করে। তারা কখনো নিরাশ হয় না।

করোনা মহামারী প্রাদুর্ভাব শিক্ষা ক্ষেত্রে বিরূপ প্রভাব ফেলছে। করোনা কালীন সময়ে শিক্ষার্থীদের লেখা-পড়ার ক্ষতি কোন ভাবেই পুষিয়ে নেয়া সম্ভব নয়। যারা চাকুরীর প্রত্যাশায় দিন গুণছে তাদের জীবন একটি অনির্দিষ্ট গন্তব্য স্থানে থমকে আছে। প্রায় দেড় বছর যাবৎ চাকরীর তেমন নিয়োগ বিজ্ঞপ্তি প্রকাশিত হয় না। যারা পূর্বের বিজ্ঞপ্তিগুলোতে আবেদন করেছে তারা পরীক্ষার আশায় আছে। তাই দেশের অনেক সংখ্যক তরুণ-তরুণী বেকার। তারই বিবেচনায় সরকারী চাকরী প্রার্থীদের বয়স ২১ মাস ছাড়ের কথা উল্লেখ করে প্রজ্ঞাপন জারি করা হয়েছে। গত বছরের ২৫ মার্চ পর্যন্ত যাদের বয়স ৩০ বছর পূর্ণ হয়েছে আগামী ৩১ ডিসেম্বর পর্যন্ত সরকারী চাকরী নিয়োগে যত বিজ্ঞপ্তি প্রকাশ হবে, তারা আবেদন করতে পারবে। যা এই মুহূর্তে সরকারের প্রশংসনীয় একটি উদ্যোগ বলা চলে।

তবে, চাকরি প্রত্যাশীদের পাশাপাশি চলমান শিক্ষার্থীদের কথাও বিবেচনায় নেয়া যেতে পারে। কারণ, করোনা মহামারীর দরুণ চলমান শিক্ষার্থীরা বেশি ক্ষতিগ্রস্থ হয়েছে। করোনা কালীন সময়ে যেটুকু সময় নষ্ট হয়েছে তা শিক্ষা জীবনের পরবর্তী সময় এমনকি সরকারী চাকরীতে আবেদনের সময়ও এর নেতিবাচক প্রভাব বজায় থাকবে। আমাদের দেশে রাজনৈতিক অস্থিতিশীলতা কিংবা অন্য কোন কারণে বিশ্ববিদ্যালয়গুলোতে সেশন জট লেগেই থাকে। বেশির ভাগ উচ্চ শিক্ষা প্রতিষ্ঠান এখনো এ ধরণের নেতিবাচক কর্মকাণ্ড থেকে বেরিয়ে আসতে পারেনি যা সুষ্ঠু শিক্ষা ব্যবস্থাকে ব্যাহত করছে। ফলে, শিক্ষার্থীদের শিক্ষা জীবন চরমভাবে ক্ষতিগ্রস্থ হচ্ছে। তাই একজন শিক্ষার্থীর অনার্স-মাস্টার্স শেষ করতে বয়স ২৫-২৬ পেরিয়ে যায়। তার উপর করোনার হানা। এখানেও প্রায় দেড় বছর চলে গেল। সামনের দিনগুলোতে যে শিক্ষার্থীদের সময় কোন ভাবে নষ্ট হবে না তার কোন নিশ্চয়তা নেই।

অনেকে উচ্চ শিক্ষার আগ্রহে স্কলারশীপ নিয়ে বিদেশ গমণ করেন। উভয় দেশে শিক্ষা প্রতিষ্ঠানে অধ্যয়নের জন্য বয়স ত্রিশের কোটায় চলে যায়। ফলে, আমাদের দেশে সরকারী চাকরীতে আবেদনের কোন সুযোগ থাকে না। তাই উচ্চ শিক্ষার্থে বিদেশ গমণকারীরা দেশে ফিরে আসতে চায়না। আমরা হারাই মেধাবীদের, দেশ বঞ্চিত হয় মেধাবীদের সেবা থেকে। চাকরীতে আবেদনের সুযোগ থাকলে হয়তো তাদের কেউ কেউ দেশ সেবায় ব্রতী হতে পারতো। কিন্তু, সেটা অপ্রত্যাশিত। আবেদনের বয়স শেষ হবার ভয়ে অনেকে উচ্চ শিক্ষার জন্য দেশের বাইরে যেতেও আগ্রহী নয়। ফলে, দেশের অনেক শিক্ষার্থী উচ্চ শিক্ষা থেকে বঞ্চিত হয়। অবনমন ঘটে শিক্ষার মানদণ্ডে।

বর্তমানে আমাদের দেশে নারীরাও চাকরিক্ষেত্রে যথেষ্ট সুনামের সাথে এগিয়ে যাচ্ছে। সংসারের শত প্রতিকূলতাকে ডিঙিয়ে চাকরীতে প্রবেশ করছে। তবে তাদের অনেকেই একটা নির্দিষ্ট গ্রাউণ্ডে আটকে যাচ্ছে। বাস্তবিক পক্ষে একাডেমিক শিক্ষা শেষ হওয়ার পর বেশির ভাগ নারীদের বিয়ে হয়ে যায়। তারপর সংসার, ঘর সামলানো, নতুন পরিবেশের সাথে খাপ খাওয়ানো। এতে বয়স ত্রিশ চলে যায়। তার মধ্যে কেউ হয়তো জয়ী হয় কেউ পেছনে হারিয়ে যায়। আমরা জয়ীদেরকে নিয়েই জয়গানে ব্রতী হই, বাহবা দেই, স্মরণ করি। পেছনে যারা পড়ে থাকে তাদের সবাই কি পেছনের সারিতেই বলিয়ান ছিল? না, তাদের কেউ কেউ সামনের সারিতেও এগিয়ে ছিল। কিন্তু, বয়সের বাঁধার কারণে সামনে এগিয়ে যেতে পারেনি! সার্টিফিকেট কিংবা সনদের ধারালো দিকটা এখানেই ম্লান হয়ে আসে। অথচ, সুযোগ ও সময়ের সুসমন্বয় পেলে তারাও চাকুরীক্ষেত্রে প্রবেশ করতে পারতো। কিন্তু চাকুরীতে প্রবেশের বয়স নির্দিষ্ট ফ্রেমে আটকে থাকার কারণে তাদেরকে থেমে যেতে হয়!

তারুণ্যের শক্তি বা কর্মদক্ষতার উপর একটি দেশের উন্নতি অনেকটা নির্ভর করে। বর্তমানে বাংলাদেশ ডেমোগ্রাফিক ডিভিডেন্টে অবস্থান করছে। তাই এ সময়টুকুতে দেশের সব তরুণদের সৃজনশীলতা ও কর্মদক্ষতাকে কাজে লাগাতে হবে। সরকারী চাকরীতে প্রবেশের সময়সীমা ৩০ বছর হওয়ায় অনেক বেসরকারী সেক্টরও প্রবেশের সময় সীমা ৩০ বছর হিসেবে বিবেচনা করছে। ফলে ৩০ বছর পেরিয়ে গেলে চাকরি জোটানো কঠিন হয়ে যাচ্ছে। তাই ৩০ বছরকে মানদণ্ড হিসেবে বিবেচনায় না নিয়ে চাকরিতে প্রবেশের সময় সীমা বাড়ালে অনেকে বেকারত্বেও অভিশাপ থেকে মুক্তি পাবে।
চাহিদা ও বাস্তবতা বিবেচনায় বিভিন্ন দেশে চাকরিতে প্রবেশের বয়স বিভিন্ন রকম। কিছু কিছু উন্নত দেশে সরকারী চাকরিতে প্রবেশের সীমা বেঁধে দেয়া হয়না। অনেক দেশে আগ্রহী ব্যক্তিরা অবসরে যাওয়ার আগের দিন সরকারী চাকরীতে যোগ দিতে পারেন। তাই সরকারী চাকরিতে প্রবেশের বয়স সীমা ত্রিশ না রেখে উন্মুক্ত করা হোক। তাতে, অনেকেরই আশার বাতিটুকু জ্বেলে উঠবে এবং মেধাবীদের প্রত্যাবর্তন ঘটবে। শিক্ষার্থীদের মনোবল বাড়বে, চাকরির পুরো ক্ষেত্র দক্ষতার মিশেলে গড়ে উঠবে। অপরদিকে, মহামারীর সময়কে রূপান্তর কাল হিসেবে বিবেচনা করে সরকারী চাকরিতে আবেদনের বয়স বাড়ানো সমীচীন।
তাই, সুজিত সরকারের ভাষায় বলতেই পারি:
"দেয়াল তুললেই ঘর
ভেঙ্গে ফেললেই পৃথিবী"

 

অনজন কুমার রায়
ব্যাংকার ও লেখক

 

এই লেখকের অন্যান্য লেখা



আপনার মূল্যবান মতামত দিন:


Top