সিডনী সোমবার, ২৭শে জুন ২০২২, ১২ই আষাঢ় ১৪২৯

আরনিমা হায়াৎ, আবু মহসিন খান এবং কিছু কথা : সালেহ আহমেদ জামী


প্রকাশিত:
১৭ ফেব্রুয়ারি ২০২২ ১৯:০৬

আপডেট:
২৭ জুন ২০২২ ০৩:০৮

ছবিঃ আরনিমা হায়াৎ এবং আবু মহসিন খান

 

ব্যক্তিগতভাবে এখন আমার ভিন্ন একটি পরিচয় আমি প্রবাসী। হ্যাঁ, মন না মানলেও আমি সত্যিই প্রবাসী। জীবনের এক তৃতীয়াংশ সময় প্রবাসে কেটে গেছে, ১৯ বছর! একেবারে কম নয়। এখানে বাংলাদেশী/বাঙালি কমিউনিটির খবর না চাইলেও কানে আসে। সামাজিক যোগাযোগ মাধ্যমের উন্নতিতে কূটনা ভাই-বোনের এখন আর দরকার পড়ে না। সামাজিক দেয়াল জুড়ে সাঁটানো থাকে সব ইতিকথা। আবার প্রগতির পাচকেরাও বড় বড় ডেকচিতে নানান ধরণের খানা তৈরী করে পরিবেশন করেন। সেসবের কোনটা ভালো লাগলে তা গ্রহণ করি। ভালো না লাগলে পাশ ফিরে ঘুমাই। চির নিদ্রায় শায়িত হওয়ার অপেক্ষায় এমনি করে জীবন কেটে যাচ্ছে।
দিন পনের আগে কোভিডের মায়াজাল থেকে মুক্ত হয়ে বাজারে গিয়েছিলাম। এক বাঙালি পথ আটকে দিয়ে এক দমে জানালেন নৃশংস এক মৃত্যুর খবর। সিডনিতে ১৯ বছরের এক বাঙালি মেয়ে তাঁর স্বামী/প্রেমিকের হাতে খুন হয়েছেন। মেয়েটির বাবা-মা এই শহরেই ব্যবসা করেন। কিছুদিন আগে একটি গোশতের দোকান কিনে নিয়েছেন। তাঁদের মুখ চিনি তারও আগে থেকে। এমনিতে কয়েকবার কথাও হয়েছে বাজার করতে গিয়ে। এর চেয়ে বেশি কিছু না। অল্প পরিচিত সেই মানুষটির উত্তেজিত বাৎচিতের কারণে কিছুক্ষণের মধ্যে আমার চারপাশে একটা জটলা তৈরী হয়ে গেল। চারিদিকে তাকিয়ে একটা থমথমে পরিবেশ লক্ষ্য করলাম। সবাই বেদনাবিঁধুর মন নিয়ে হা হুতাশ করছে। আহা! আহা! রব উঠছে। অনেকেই নানা রকমের কথা বলছেন ঘটে যাওয়া ঘটনাকে ঘিরে। অনেক কষ্ট সহ্য করে এবং অবাক হয়ে কিছুক্ষণ দাঁড়িয়ে রইলাম সেই জটলায়। এরই মাঝে ধমনীতে আঘাত করে গেছে খুব আপত্তিকর একটি বিষয় আর তা হলো মেয়েটিকে জড়িয়ে নানা রকম কূট মন্তব্য। তন্মধ্যে বেশ কিছু আবার খুবই আপত্তিকর। ঠাহর করার চেষ্টা করছিলাম ভুল শুনছি না তো? যে বা যারা এসব বাণী অর্চনায় যোগ দিচ্ছেন তারা একেবারেই সাধারণ মানুষ। উন্নত বিশ্বে বসবাসকারী বাঙালি, শিক্ষিত ও অভাবী নন এমন মানুষেরা।
বেশিক্ষণ সেই আলাপে দাঁড়িয়ে থাকা কষ্টকর ও লজ্জাজনক। ভারী মন নিয়ে ঘরে ফিরলাম। ফেরার পথে মনে হানা দিলো গুরুত্বপূর্ণ কিছু প্রশ্ন। আচ্ছা আমারও তো সন্তান আছে, তাই না? ওরাও তো এদেশেই জন্ম নিয়ে বড় হয়ে উঠছে, তাই না? মেয়েটি আমার ছেলের থেকে ৭/৮ বছরের বড়, তাই কি? আমরাও তো সন্তানের চেয়ে কম মেধাবী পরিচয় নিয়েই পরবর্তী জীবন অতিবাহিত করতে পারি, তাই না? কি প্রক্রিয়ায় তাহলে সন্তানদের বড় করছি? তবে কি আমরা কোনো ভুল পথে জীবন পরিচালনা করছি? প্রাচ্য আর পাশ্চত্যের মধ্যে মিল না এনে কি বরং বৈরিতা তৈরি করছি? আমাদের হাতের নাগালে কি কোনো অনুকরণীয়-অনুসরণীয় কোন সাংস্কৃতিক পরিবেশ পাচ্ছি? ধর্মীয় অনুশাসনের নামে আসলে আমরা কি লালন-পালন করছি? নিজেকে কি প্রস্তুত করছি আগামী প্রজন্মের সাথে মিলে মিশে যেতে? মন কেন ফেলে আসা সময়ে স্থির হয়ে আছে? (এটা প্রবাসীদের রোগ) কেন সাধারণের মুখে এমন সব কুৎসিত মন্তব্য ঘুরছে? এসব ভাবতে ভাবতে বাসায় ফিরে এলাম। গতানুগতিক ব্যস্ততায় মিশে যাওয়ার আগে সন্তানদের দিকে তাকিয়ে নীরবে দীর্ঘশ্বাস ছাড়লাম। সেই রাতে পরিবারের কাউকে আর কিছু বলা হলো না। মাথার মধ্যে ঘুরপাক খাচ্ছিলো কেবল একটি বিষয়ই আরনিমা হায়াৎ মরে গেছে বা কেউ তাকে হত্যা করেছে। পরের ভাবনাগুলি বড্ড এলোমেলো ও অসংযত কেননা ঐ পরিবারের পথ পরিক্রমা, বেড়ে উঠা, আদর্শ, মূল্যবোধ, চিন্তা-চেতনা, চারপাশের পরিবেশ, আকাঙ্খা কিংবা অভিলাষ কোনটাই আমার জানার কথা না, আমি জানিও না। তবে মোটা দাগে কিছু বিষয় অনুমান করতে পারি এই যা। বাকি যা পারি তা হচ্ছে না বুঝে, না জেনে, 'শর্তকে কারণ' বা 'সহকার্যকে কারণ' অথবা 'দূরবর্তী শর্তকে কারণ' কিংবা 'অবৈজ্ঞানিক-অযৌক্তিক' কিছু বিষয়কে উপস্থাপন করা। আমি যুক্তিবিদ্যা পড়ে হৃদয়ে ধারণ করেছি তাই গড্ডলিকা প্রবাহে গা ভাসানোর সেই পথ পরিহার করলাম খুব যত্নের সাথে। কিন্তু ভাবনার দুয়ার উন্মুক্ত রাখলাম।
শরীর কাহিল জন্য তখনই কিছু লিখতে চাইলেও শক্তি পাচ্ছিলাম না। সপ্তাহ না ঘুরতেই জানলাম আবু মহসিন নামে একজন মানুষ ফেসবুক লাইভে এসে নিজেকে হনন করেছেন। ১৭/১৮ মিনিটের সেই লাইভ ভিডিও দেখলাম ও শুনলাম। প্রচন্ডরকমভাবে মানসিক আঘাতপ্রাপ্ত হলাম শেষের ১০/১২ সেকেন্ডের অংশে। এমন মৃত্যু দেখার দুর্ভাগ্য এর আগে হয়নি। ঝাঁকুনিটি চোখ হয়ে বুকে এসে বিঁধলো। এর আগেই অবশ্য নিউজ ফিডে মহসিন সাহেবের মৃত্যুকে নিয়ে এক অসভ্য সংবাদিকের শিরোনাম দেখে দাঁত কিড়মিড় করে উঠেছিল। বহু কষ্টে নিজেকে সামলানোর পরও সকালটি হয়ে উঠলো বিষাদময়। খবরের কাগজে বিস্তারিত জানলাম। উনি একা থাকতেন। বয়স যথেষ্ট। ছেলে-মেয়ে বড় হয়ে গেছে। উনি থাকতেন ঢাকার একটি ফ্ল্যাটে প্রায় একা। ব্যবসায় লোকসানের মধ্যে আছেন। সবাই তার সাথে প্রতারণা করেছেন, ঠকিয়েছেন, কেউ সহযোগিতার হাত বাড়াননিসহ নানান অনুযোগ। শূন্যতা আর হতাশার ছবিটি স্পষ্ট দেখা যাচ্ছিল। আরো দেখা যাচ্ছিল বদলে যাওয়া সমাজের ফলাফল, অনেক কিছু থেকেও কোন কিছুই সে উপভোগ করছে না। অসহায় পরিবার, অসহায় সমাজ। একটা অস্থিরতা বিদ্যমান সব কিছুতেই। মুহূর্তেই সকলে বিচারক-বিশেষজ্ঞ হয়ে মন্তব্য করে চলেছেন। সেসব পড়ে বা দেখে আরো বিচলিত হয়ে উঠেছিলাম। মনোবিজ্ঞান বা অপরাধ বিজ্ঞান নিয়ে কোন বিশেষ ধারণা থাকলে হয়তো নিজেকে সান্ত্বনা দিতে পারতাম। অশান্ত মন শান্ত করতে আমি ছটফট করে মা'কে ফোন করলাম। তিনি বাংলাদেশে থাকেন। মা'কে মহসিন সাহেবের কথা কিছু না বললেও কল্পনা করলাম অনেক কিছুই। যদিও মায়ের পাশেই আমার বোন আছেন। 'মা' আদতে খুব একা থাকেন না। তবে মাঝে মাঝে দুঃশ্চিন্তা হয়। এ ধরণের অপমৃত্যুর খবরে কে না বিচলিত হয় বলুন? সমাজ যে ধারায় পরিচালিত হচ্ছে তাতে কাছাকাছি ধরণের আরও অপমৃত্যু অত্যাসন্ন। তবে কি আমাদের জীবন-যাপনের পদ্ধতি ভুলে ভরা? নাকি মহসিন সাহেবকে পাগল বা পাপী কিংবা বোকা অথবা মানসিক রোগী আখ্যা দিয়ে যে যা করছি তাকে যথার্থ ধরে নিয়ে আবারও যে তিমিরে ছিলাম সেই তিমিরেই ফিরে যাবো? এই ধরণের মৃত্যু একটি সমাজের জন্য অনেক বড় দুঃশ্চিন্তার কারণ। মানসিক স্বাস্থ্য বলে যে একটি বিষয় রয়েছে সেটা কি উহ্যই থেকে যাবে?
আমি একটি কথা খুব জোরের সাথে বলতে চাই, "আমাদের সমৃদ্ধি আনায়নের পথে যথেষ্ট গাফলতি আছে। আরো অনুভব করি মানবিকতার বিষয়টি হারিয়ে যেতে বসেছে পারিবারিক পরিকাঠামো থেকে। খুবই এককেন্দ্রিক চিন্তা সারা বিশ্বেই নানান অস্থিরতা তৈরী করছে। পরিবারের মূল্যবোধটি কেবল কাগজে-কলমেই রয়েছে কিন্তু বাস্তবতা বড্ড রূঢ়"! দুটি মৃত্যুই অনাকাঙ্খিত। একটি হত্যা (খুনি স্বীকারোক্তি দিয়েছে), আরেকটি আত্মহত্যা। দুটি দুই প্রজন্মের। দুটি আবার দুই দেশে। একজন আমাদের আগের প্রজন্মের (৫৭+), আরেকজন সন্তান কিংবা ভাগ্নি-ভাতিজির বয়েসী মানে পরবর্তী প্রজন্মের (১৯+)। এতো অমিলের মাঝে কিছু অদৃশ্য মিল রয়েছে। হায়াৎ পরিবারের সন্তান হারানোর বেদনা কিংবা মহসিন সাহেবের বেঁচে থাকা পরিজনদের কষ্ট কি কাছাকাছি? সেই উত্তর জানা নেই।
একটি উন্নত জীবনের আশায় বাংলাদেশ থেকে যে পরিবারটির সঙ্গে আরনিমা এসেছিল তারা সেই পথে অনেকদূর অগ্রসর হয়েছিলেন। কিন্তু কোন একটা পর্যায়ে চলার পথ আর কুসুমাস্তীর্ণ থাকেনি। সেখানে রাজ্যের অনাকাঙ্খিত সব আপদ এসে উপস্থিত। প্রবাসে এসব আপদ-বিপদ আসেই। একটু চোখ-কান খোলা রাখলে জানবেন প্রবাসে উন্নতি যেমন ধরা দেয় ঠিক সমান্তরালভাবে নানান বাঁধা-বিপত্তি, চড়াই-উৎরাই, হায়-হাঙ্গামাও এসে হাজির হয়। হঠাৎ করেই কি দুঃসহ পরিস্থিতির আবির্ভাব ঘটে? হয়তো না। প্রথমে সেসব নিয়ে কথা হয় না। বড় ধরণের ঘটনার আগেই ছোট ছোট ঘটনায় সেসবের ইশারা পাওয়া যায়। তাহলে কবে? কখন? কিভাবে? এর বিস্তার ঘটে? আমার বিশ্বাস আকস্মিক কোন ঘটনা না ঘটলে মূলত পরিবার ও চারপাশের পরিবেশ দ্বারাই আমরা ধীরে ধীরে প্রভাবিত হই। মনের অজান্তেই জড়িয়ে যাই ধুম্রজালে। আরনিমা ক্ষেত্রেও কি অজানা কোন ভুল ছিল? হয়তো। প্রবাস জীবনের অভিজ্ঞতা সম্পন্নরা জানেন সন্তান গড়ে তোলার কাজটি খুব সহজ নয়। এক শব্দে দুরূহ। এখানে বিপদ হাতছানি দেয় প্রতিনিয়ত। মহসিন সাহেবের ক্ষেত্রেও উন্নত জীবনের আকাঙ্খা লক্ষণীয়। তিনিও চেয়েছিলেন একটি উন্নত, নির্বিঘ্ন ও সমৃদ্ধ জীবন। তথাকথিত স্ট্যাটাস ধরে রাখতে গিয়ে তিনি একের পর এক চাপ নিতে গিয়ে একসময় সেই চাপ সইতে না পেরে অসহায় আত্মসমর্পণ করেছেন। তাঁর মতন অনেকেই হার্টফেল, হার্ট এটাক, মস্তিষ্কে রক্তক্ষরণ কোন কোন ক্ষেত্রে আত্মহত্যা করেন। অনেক খবর আমরা পাই না, অনুসন্ধান করলে আপনি পাবেন।
কারো উন্নতিতে যদি পরিবার, সমাজ এবং আপনার অন্তরাত্মা উপকৃত না হয় তবে সে উন্নতি কি আদর্শ বা অনুসরণীয়? চলমান ইঁদুর দৌড় আজ সমাজ থেকে মমতা, সহমর্মিতা ও সারল্যকে তুলে নিয়ে এমন সব প্রপঞ্চ এনে দিয়েছে যা মানিয়ে নিয়ে নিজেকে নিরাপদ রাখা দুষ্কর। যেমনটি আজ সব সমাজেই অহরহ দেখা যায়। ইঁদুর দৌড়ের উৎস 'লোভ' এবং বেশিরভাগ ক্ষেত্রেই সীমাহীন লোভ। আসুন আমরাও সমূহ বিপদ থেকে নিজেদের বাঁচাতে বিকল্প কিছু চিন্তা করতে শিখি। কিছু দুর্দশা কমাই। আপনার দায়িত্ব আপনি না নিলে রাষ্ট্র, সমাজের তেমন দায় নেই আপনাকে বিপদ থেকে উদ্ধারের। দিনশেষে ভোগান্তি আপনারই, তাই পছন্দও আপনারই হওয়া চাই। জীবনের একটা চরম সত্য হচ্ছে যে কোনো পরিস্থিতিতে সমস্যা আসবেই, সংঘাত হবেই, দুঃখ-অপমানের মুখোমুখি আপনাকে হতেই হবে, কোনো না কোনো ভাবে অভাবগ্রস্থ আপনি থাকবেনই, বিপত্তি থেকে আপনার মুক্তি নাই। কিন্তু তাই বলে কি জীবন থেমে থাকে? আরেকটুকু সংযত হোন পরিকল্পনায়। উন্নতি ও উন্নত জীবন আপনি চাইতেই পারেন। পাশাপাশি নিরাপদ পরিকল্পনাও দরকার সেটা কি সত্যি নয়? ষড়রিপুর অন্যতম প্রধান 'লোভ' কে লাগাম দিলে দেখবেন চাহিদা কম, আর চাহিদা কম হলে বিপদও কম। জীবনে পরিমিতিবোধ খুব জরুরি তার সাথে অন্য পাঁচটি রিপু কাম, ক্রোধ, মোহ, মদ ও মাৎসর্য নিয়ন্ত্রণ অন্তত অনাকাঙ্খিত বিপদ থেকে পরিত্রাণ এনে দিতেও পারে।


সালেহ আহমেদ জামী
সিডনি

 



আপনার মূল্যবান মতামত দিন:


Top