সিডনী বৃহঃস্পতিবার, ৩০শে জুন ২০২২, ১৬ই আষাঢ় ১৪২৯

নাব্যতা সঙ্কটে সুরমা নদী ও ভাটির মানুষের কষ্ট : অন্জন কুমার রায়


প্রকাশিত:
৩১ মে ২০২২ ১০:১৮

আপডেট:
৩০ জুন ২০২২ ২৩:০৩

 

সিলেট নগরীর নিকটবর্তী সুরমা নদীর প্রায় ৮-১০ কিলোমিটার এলাকা শুষ্ক মৌসুমে চর জেগে থাকে। তাতে ঘাস গজায়, ছোট ছোট ছেলে-মেয়েরা খেলা করে। দুই কূলের মাঝখান দিয়ে খালের মতো পানি বয়ে চলে। বুঝার কোন উপায় নেই এটি সুরমা নদীর তীর। অথচ এক সময়ের খড়স্রোতা নদী এখন নাব্যতা হারিয়ে খালের মতো রূপ ধারণ করেছে। শুষ্ক মৌসুমে সুরমা নদীর উৎপত্তিস্থল থেকে পুরো নদীর তীরই এমন মনে হয়। অন্যদিকে, বর্ষার শুরুতে নদীটি পানিতে টইটুম্বর হয়ে থাকে। বিশেষ করে উজান থেকে নেমে আসা পানি এবং ভারী বৃষ্টিপাতের কারণে নদীতে পানি ফুলে উঠে।
সাম্প্রতিক সময়ে সুরমা নদীর পানি উপচে উঠে সিলেট শহর প্লাবিত হয়। যদিও বন্যার কিছুটা অবনতি হয়েছে। শহরের কোন কোন জায়গায় হাঁটু থেকে কোমর পর্যন্ত পানি ছিল। যে সকল নালা দিয়ে নদীতে পানি প্রবাহিত হয় সে সকল নালা এখনো পানিতে ভরপুর। শহরে বিভিন্ন রাস্তা পানিতে তলিয়ে যায়। নগরীর উপশহরের বিদ্যুৎ সাব স্টেশনে পানি উঠায় বিদ্যুৎ বন্ধ ছিল। ফলে সেসকল এলাকায় বিদ্যুৎ ছিল না। ফলে, স্বাভাবিক জীবন-যাপনে বিঘœ ঘটেছে। সবকিছু মিলিয়ে মানুষ মানবেতর জীবন-যাপন করেছে। এছাড়া শহরের কয়েকটি এলাকায় এখনো জলাবদ্ধতা দেখা যায়। বিশেষ করে শহরের তালতলা, উপশহর, কাজীর বাজার, তোপখানা, যতরপুর, সোবহানীঘাট, ছড়ার পাড়, মাছিমপুর ইত্যাদি এলাকাগুলো পানিতে তলিয়ে গিয়েছিল।
সুরমা নদীটির নাব্যতা হারিয়ে যাওয়াই বন্যার প্রধান কারণ। সিলেট শহরের ভেতর দিয়ে সুরমা নদী বয়ে চলেছে। ভারতের করিমগঞ্জে বরাক নদীর দুটি শাখা সুরমা ও কুশিয়ারা নদী। এদের মিলনস্থল সিলেটের জকিগঞ্জ উপজেলার অমলশিদ এলাকায়। পানি উন্নয়ন বোর্ড সূত্রমতে, এক সময় বরাক নদী হয়ে আসা পানির ৬০ শতাংশ কুশিয়ারা নদী দিয়ে প্রবাহিত হতো, বাকি ৪০ শতাংশ পানি সুরমা নদী দিয়ে প্রবাহিত হতো। কিন্তু, উৎপত্তিস্থল অমলশিদ থেকে ৩৩ কিলোমিটার পর্যন্ত সুরমা নদীর বিভিন্ন স্থানে চর জেগে উঠায় বর্তমানে ৮০ শতাংশ পানি প্রবাহিত হয় কুশিয়ারা নদী দিয়ে, বাকি ২০ শতাংশ প্রবাহিত হয় সুরমা নদী দিয়ে। মূলত, সুরমা নদীতে চর জেগে উঠায় নদীটি ভরাট হয়ে আসছে। তাই, বর্ষাকালে পাহাড়ী ঢল আর ভারি বর্ষণে নদী উপচে নদীর আশে-পাশের এলাকাসহ সিলেট নগরীর নিচু এলাকা সহজেই প্লাাবিত হয়। এছাড়াও নদীর তলদেশে প্লাস্টিক, আবর্জনা আর পলিথিনে ভরাট হয়ে আছে। তাই, শুষ্ক মৌসুমে নদীতে যেমন কম পানি থাকে তেমনি বর্ষাকালে অল্পেতেই পানি উপচে পড়ে।
বাংলাদেশ পরিবেশ আন্দোলনের (বাপা) মতে, সিলেটে পুকুর-দীঘি মিলে প্রায় তিন শতাধিক জলাশয় ছিল। এর দুই তৃতীয়াংশ ভরাট হয়ে গেছে। এছাড়াও সিলেটের ভেতর দিয়ে ছোট-বড় ২৫ টি প্রাকৃতিক খাল প্রবাহিত হয়েছে, যা 'ছড়া' নামে পরিচিত। পাহাড় বা টিলার পাদদেশ থেকে এ সকল টিলার উৎপত্তি হয়ে সুরমা নদীতে মিশেছে। এ সকল ছড়া দিয়ে পানি নিষ্কাশনের জন্য ব্যবহৃত হয়। বর্তমানে কয়েকটি ছড়া চোখে পড়লেও এগুলোর ড্রেনেজ ব্যবস্থা তেমন ভাল নয়। এগুলো সচল রাখারও কোন উদ্যোগ চোখ পড়ে না। ফলে, সামান্য বৃষ্টির ফলে শহরে অতি সহজেই জলাবদ্ধতা সৃষ্টি হয়। আবার, এই দুটি নদীর মধ্য দিয়ে ছোট-বড় প্রায় ১০০ টি নদীর পানি প্রবাহিত হয়। তাই এই দুটি নদীর নাব্যতা হারিয়ে যাওয়া মানে প্রবাহমান পানিপথে অন্যান্য নদীর উপর বিরুপ প্রভাব ফেলা।
সর্বশেষ ২০০৪ সালে সারা দেশের মতো সিলেটে বড় ধরণের বন্যা হয়। এবারের বন্যা ও জলাবদ্ধতার জন্য সুরমা নদীর নাব্যতা সঙ্কটই দায়ী। বিশেষ করে হাওড় অঞ্চলে জলাধার নির্মাণ, নিম্নাঞ্চল ভরাট, পানির স্বাভাবিক গতিপথ বদলে দেওয়া ইত্যাদি। সুরমা নদীর গতিপথে পানির স্বাভাবিক প্রবাহের ধর্ম অনুযায়ী পাহাড়ী ঢলের শেষ গন্তব্য সিলেট-সুনামগঞ্জের হাওড়। কিন্তু, বর্তমান সময়ে বন্যার পানি ভাটির দিকে না নেমে সিলেট শহরের বিভিন্ন জায়গা প্লাবিত হয়। নদীর বাড়তি পানি ধরে না রাখতে পারলে পানির সৃষ্ট বাড়তি চাপে গতিপথ বদলে যায়। তাই, সুরমা নদীর পানিও অন্যদিকে প্রবাহিত হয়। যার ফলে বন্যার প্রকোপ দেখা দেয়।
বন্যার পানিতে ডুবে যাওয়ায় সিলেটের গোয়াইনঘাট, সুনামগঞ্জ-ছাতক-দোয়ারা বাজার সড়ক, বিশ্বম্ভরপুর-তাহিরপুর সড়কে যান চলাচল বন্ধ রয়েছে। বন্যার পানিতে ভেসে গিয়েছে কয়েকশ পুকুরের মাছ। খাল-বিল, নদী-নালা ও হাওড়ের পানি এখনে বিপদসীমার কাছাকাছি প্রবাহিত হচ্ছে। পানিতে ঢেউয়ের কারণে নদী তীরবর্তী দোকানপাট, রাস্তা-ঘাট ক্রমশ ধসে যাচ্ছে।
বন্যায় সবচেয়ে বেশি ক্ষতিগ্রস্থ হয়েছে কৃষি ও মৎস্য চাষের সাথে সম্পৃক্ত। আকসি¥ক বন্যায় বোরো ধান, আউশের বীজতলা এবং গ্রীষ্মকালীন সবজির ব্যাপক ক্ষতি হয়েছে। এর মধ্যে মৎস্য খামারীদের প্রায় ২২ কোটি টাকা ক্ষতিগ্রস্থ হয়। বন্যার পানি প্লাবিত হওয়ায় অনেকে গৃহস্থালি মালামাল রক্ষায় ব্যস্ত থাকায় আশ্রয়কেন্দ্রে অনেকেই আশ্রয় নিতে পারেনি। তাই, গবাদি পশু নিয়ে অনাহারে, অর্ধাহারে মানবেতর জীবন-যাপন করছে। সমাজের প্রান্তিক পর্যায়ের মানুষ বেশি ক্ষতির সম্মুখীন হয়েছে। পানির কারণে হাঁস, মুরগী, গরু, ছাগল নিরাপদ স্থানে সরিয়ে রাখা দুরুহ ব্যাপার। তাই অনেকেই সস্তা দামে এগুলো বিক্রি করতে বাধ্য হয়েছেন। নগর এলাকার অলগিলতিে থাকা ড্রনেরে পানি উঠে আসায় স্থানীয়রা বপিাকে পড়ছেনে। পানরি সঙ্গে উঠে আসছে ময়লা আর্বজনা, এছাড়া র্দুগন্ধরে কারণে চলাচলে বড়িম্বনা পোহাতে হচ্ছে জনসাধারণক।ে বন্যার পানতিে সড়কে উঠে আসা ময়লা-আর্বজনা পচে র্দুগন্ধ সৃষ্টি হয়ছে।ে বাসা-বাড়রি টউিবওয়লে ও মোটর তলয়িে যাওয়ায় কাদাযুক্ত পানি আসছ।ে ফলে খাবার ও গৃহস্থালি কাজে ব্যবহারযোগ্য পানরি ভোগান্তি রয়ে গছে।ে
সুরমা নদীর পানি হ্রাস পেলেও কুশিয়ারা নদীর পানি কয়েকটি পয়েন্টে বিপৎসীমার ওপরে। বৃষ্টি ও ঢল কমে যাওয়ায় উজানের পানি নেমে ভাটি অঞ্চল সুনামগঞ্জে চাপ সৃষ্টি করছে। যে সকল এলাকা থেকে পানি নামতে শুরু করেছে সে সকল এলাকার রাস্তা-ঘাটের বেহাল অবস্থা। বন্যার ময়লা পানি জমে রোগ জীবাণু ছড়িয়ে পড়ছে। যার ফলে পানি বাহিত রোগ বেড়ে যাচ্ছে। বন্যায় রাস্তা-ঘাট ক্ষতিগ্রস্থ হওয়ায় সাধারণ জনগণের দুর্ভোগ পোহাতে হচ্ছে। বন্যা কবলিত এ সকল এলাকায় বিশুদ্ধ পানি, শিশু খাদ্য, শুকনো খাবার, গো-খাদ্যের মারাত্মক সঙ্কট দেখা দিয়েছে। প্লাবিত এলাকায় জ্বর, ডায়রিয়া, আমাশয়, জÐিসসহ পানিবাহিত রোগ ছড়িয়ে পড়ছে। তবে, পানিবাহিত রোগ প্রতিরোধে বিভিন্ন ধরণের উদ্যোগ গ্রহণ করা হয়েছে। কিছু কিছু এলাকায় ঔষধ, খাবার স্যালাইন ও পানি বিশুদ্ধকরণ ট্যাবলেট বিতরণ করা হয়েছে।

বন্যার পানি নেমে যাওয়ার সাথে সাথে ক্ষতিগ্রস্থ সড়ক মেরামত, ক্ষতিগ্রস্থ বাসাবাড়ির তালিকা প্রণয়ন এবং নগরীকে বন্যামুক্ত রাখতে করণীয় নির্ধারণে একটি উচ্চ পর্যায়ের সমন্বয় কমিটি গঠন করা হয়েছে। সিলেট সিটি কর্পোরশন, সড়ক ও জনপথ, এবং পানি উন্নয়ন বোর্ডেও প্রতিনিধিদের সমন্বয়ে গঠিত কমিটি বন্যায় ক্ষয়-ক্ষতি নির্ধারণ, তালিকা প্রণয়ন ও করণীয় বিষয়ে প্রতিবেদন তৈরি করে।এ কমিটির যৌথ প্রস্তাবনা সংশ্লিষ্ট মন্ত্রণালয়ে পাঠানো হবে (দৈনিক জনকন্ঠ, ২৪ মে,২০২২)।

টানা পাহাড়ী ঢল ও অতি বৃষ্টি হলে সুরমা এবং কুশিয়ারা নদীর খনন ছাড়া সিলেটের বন্যা মোকাবেলা করা সম্ভব নয়। সুরমা নদী পানি ধারণ ক্ষমতা হারিয়েছে। খনন হলে পানি ধারণ ক্ষমতা থাকবে। পার্শ্ববর্তী জেলা মৌলভীবাজারের মনু নদী খনন হওয়ায় মৌলভীবাজার শহর বন্যামুক্ত হয়েছে। তাই সুরমা এবং কুশিয়ারা নদী খনন করলে সিলেটের এলাকা বন্যার কবল থেকে রক্ষা পাবে। এ দুটি নদী খনন না করলে সিলেট অঞ্চলের সকল নদীই এক সময় বিপন্ন হয়ে পড়বে। কয়েক বছর পরপর বন্যা দেখা দিবে, ফসলের ক্ষতি হবে, মানুষের দুর্ভোগ বাড়বে।

নগর এলাকার অলিগলিতে থাকা ড্রেনের পানি উঠে আসায় স্থানীয়রা বিপাকে পড়েছেন। পানির সঙ্গে উঠে আসছে ময়লা আবর্জনা, এছাড়া দুর্গন্ধের কারণে চলাচলে বিড়ম্বনা পোহাতে হচ্ছে জনসাধারণকে। বন্যার পানিতে সড়কে উঠে আসা ময়লা-আবর্জনা পচে দুর্গন্ধ সৃষ্টি হয়েছে। বাসা-বাড়ির টিউবওয়েল ও মোটর তলিয়ে যাওয়ায় কাদাযুক্ত পানি আসছে। ফলে খাবার ও গৃহস্থালি কাজে ব্যবহারযোগ্য পানির ভোগান্তি রয়ে গেছে।

 

অন্জন কুমার রায়
ব্যাংক কর্মকর্তা ও লেখক

 

এই লেখকের অন্যান্য লেখা



আপনার মূল্যবান মতামত দিন:


Top