সিডনী মঙ্গলবার, ২৮শে মে ২০২৪, ১৪ই জ্যৈষ্ঠ ১৪৩১

দশম গ্রেডের জন্য প্রেস ক্লাবে দাঁড়ানো ছাড়া বিকল্প ছিল না : শাকিলা নাছরিন পাপিয়া


প্রকাশিত:
২ মে ২০২৩ ২১:৫০

আপডেট:
২৮ মে ২০২৪ ১০:২৮

 

অন্ধত্ব দুই প্রকার। যাদের চোখে আলো থাকে না। আর যারা অক্ষরজ্ঞান শূন্য অর্থাৎ যাদের অক্ষরজ্ঞান নেই। শিক্ষার প্রথম স্তর প্রাথমিক শিক্ষা।প্রাথমিক বিদ্যালয়ের শিক্ষকবৃন্দ অক্ষরজ্ঞান শিক্ষা দেবার মাধ্যমে প্রথম জ্ঞানের আলো জ্বেলে দেন। জ্ঞানের আলোকিত ভূবণে প্রবেশ করতে সাহায্য করেন মানব শিশুকে। মা বাবার ঋণ যেমন শোধ করা যায না, তেমন শিক্ষা গুরুর ঋণ টাকা বা অন্য কোন উপায়ে শোধ করা যায় না। কাদামাটি দিয়ে কুমোর যেমন তার মনের মাধুরী মিশিয়ে তৈরি করেন দৃষ্টি নন্দন সামগ্রী তেমন শিক্ষকের কাছে একতাল কাদা শিশু অবস্থায় একটি শিশু। শিক্ষক তাকে তৈরি করেন মানবিক মানুষ। শিক্ষক তার চোখে জ্বালান আলোক শিখা।
শিক্ষক মানুষের মাঝে গড়েন নতুন মানুষ।
সময় এবং সভ্যতা পরিবর্তন এনেছে অনেক কিছুতে কিন্তু গুরু শিষ্য সম্পর্ক আদি, অনন্ত। এই সম্পর্ক বিস্তৃত হয়েছে, হারিয়ে যায়নি। টাকায় এ সম্পর্ককে মূল্যায়ন করা যায় না।
আমরা বাদশাহ্ আলমগীরের কাহিনী জানি। সেই সাথে ইতিহাস সাক্ষ্য দেয় অতি অত্যাচারী শাসকও শিক্ষকের সম্মূখে সম্মানের সাথে, অবনত শিরে দাঁড়িয়েছে।
চাণক্য শ্লোকে আছে, " এক অক্ষরদাতা গুরুকেও গুরু বলিয়া মান্য করিবে। যে এক অক্ষরদাতা গুরুকে গুরু বলইয়া মান্য করে না, সে শতবার কুকুর যোনীতে জন্মগ্রহন করিয়া চন্ডালত্ব লাভ করিবে।"
আমরা মা- বাবা এবং শিক্ষক এই তিন সম্পর্ককে অন্য সব সম্পর্ক থেকে আলাদা করে দেখি। এই তিনটি সম্পর্ক মাথায় তুলে রাখার মতো সম্পর্ক।
যদি উন্নত সভ্য দেশগুলোর প্রতি লক্ষ করি তাহলে দেখবো সেসব দেশে শিক্ষকের মর্যাদা অন্য সব পেশার চেয়ে উর্দ্ধে।

আসুন কয়েকটি দেশে শিক্ষকদের অবস্থান সম্পর্কে আমরা জানি,

১) মার্কিন যুক্তরাষ্ট্রে, ভিআইপি বিবেচনা করে এমন দুটি ধরণের লোক রয়েছে: বিজ্ঞানী ও শিক্ষক।
২) ফরাসী আদালতে কেবল শিক্ষকদেরই চেয়ারে বসার অধিকার রয়েছে।
৩) জাপানের পুলিশ সরকারের কাছ থেকে অনুমতি নেওয়ার পরেই একজন শিক্ষককে গ্রেপ্তার করতে পারে।
৪) দক্ষিণ কোরিয়ার প্রতিটি শিক্ষক কেবল তার আই-কার্ড প্রদর্শন করে দক্ষিণ কোরিয়ার মন্ত্রীর সমস্ত অধিকার পান।
৫) আমেরিকান এবং ইউরোপীয় দেশগুলিতে প্রাথমিক শিক্ষকরা সর্বাধিক বেতন পান, কারণ তারা কেবল কাঁচা মাটি পাকা করেন।
৬) ফিনল্যান্ডে টপারদের প্রাথমিক শিক্ষক হিসাবে নিয়োগ করা হয়ে থাকে।

এবার আসি আমাদের দেশে। আমরা তলাবিহীন ঝুড়ি থেকে মধ্যম আয়ের দেশ হয়েছি। আমাদের দেশে ফ্রাইওভার, মেট্রোরেল, পদ্মাসেতু হয়েছে। অবকাঠামোগত উন্নয়নে আমরা নানাভাবে সক্ষমতার স্বাক্ষর রেখেছি।
কিন্তু প্রাথমিক বিদ্যালয়ের শিক্ষকদের ক্ষেত্রে আমরা ব্রিটিশ আমলের পাদুটীকা গল্পের পন্ডিতমশাইয়ের জীবনেই আটকে আছি। আমরা তালেব মাস্টারের জীবনকে অতিক্রম করতে পারিনি।

পরিবর্তন এসেছে সকল পেশায়। যেমনঃ

ইউনিয়ন পরিষদের সচিব-- ছিল ১৪ তম গ্রেড।বর্তমানে ১০ম গ্রেড।
কৃষি উপ -পরিদর্শক এস এস সি শিক্ষাগত যোগ্যতা এবং ডিপ্লোমা করে ১০ তম গ্রেড।
ভূমি অফিসের তহশিলদার ১৭ তম গ্রেড থেকে বর্তমানে ১০ তম গ্রেডে।
নির্বাচন কমিশনের কর্মকর্তারা ১৬ তম গ্রেড থেকে ৯ম গ্রেডে।
নার্সেরা ডিপ্লোমা করে এখন ১০ম গ্রেডে।

যে শিক্ষাগত যোগ্যতায় প্রাথমিকের শিক্ষকের বেতন ১৩ তম গ্রেডে তার চেয়ে কম শিক্ষাগত যোগ্যতায় অন্য পেশাজীবিদের বেতন ১০ম গ্রেডে।
প্রাথমিক বিদ্যালয়ের শিক্ষকদের বেতন একটা এ ক্যাটাগরি পত্রিকার ঝাঁড়ুদারের সমান।
আমরা উন্নয়নে রোল মডেল হতে পারি অথচ আমাদের শিক্ষা গুরুদের উন্নত জীবনমান নিশ্চিত করতে পারি না।
স্বাধীনতা অর্জনের অর্ধশত বছর পার হলো। নানা পেশায় পরিবর্তন এসেছে। পরিবর্তন এসেছে দেশের নানা অবকাঠামোতে। শিক্ষকদের শিক্ষাগত যোগ্যতায় পরিবর্তন এসেছে। স্মার্ট শিক্ষার জন্য দেশ স্মার্ট শিক্ষক খুঁজছে। কিন্তু শিক্ষকদের সম্মান আর আর্থিক স্বচ্ছলতার প্রসঙ্গ আসলেই উপদেশ বর্ষণ শুরু হয়ে যায়।

নতুন নিয়োগ পাওয়া একজন সরকারি প্রাথমিক বিদ্যালয়ের শিক্ষকের বর্তমান বেতন নিম্নরূপঃ

গ্রেড ঃ ১৩ তম
বেতন স্কেলঃ ১১০০০/ --২৬৫৯০/

বেসিক সেলারীঃ ১১০০০/
বাড়ি ভাড়াঃ ৪৯৫০/
চিকিৎসা ভাতাঃ ১৫০০/
টিফিন ভাতাঃ৷ ২০০/

মোটঃ৷ ১৭৬৫০/

বিএফ কর্তনঃ৷ ১১০/
রেভি. স্টাম্পঃ ১০/

মোট কর্তনঃ ১২০/

নীট প্রাপ্যঃ ১৭৫৩০/

এই বেতনে কেন একজন শিক্ষক তার মেধাকে কাজে লাগাবে? একজন মানুষের ভদ্রভাবে বেঁচে থাকার জন্য এই বেতন কি যথেষ্ট? তাছাড়া সারা জীবনে নেই কোন পদোন্নতি।
সম্প্রতি ডাটা এন্ট্রি অপারেটরদের প্রাথমিক শিক্ষকদের প্রশিক্ষক হিসাবে পদোন্নতি দিয়ে শিক্ষকদের নানা অসম্মানের সাথে নতুন অসম্মান যোগ করা হয়েছে।
কম শিক্ষাগত যোগ্যতা নিয়ে অন্যরা যখন দশম গ্রেডের দ্বিতীয় শ্রেণির কর্মকর্তা তখন শুধু প্রাথমিক বিদ্যালয়ের সহকারী শিক্ষকবৃন্দ তৃতীয় শ্রেণির কর্মচারী। স্মার্ট শিক্ষার কথা বলছি। অথচ স্মার্ট শিক্ষক তৈরিতে যত অনিহা। গত অর্ধশত বছর প্রাথমিক বিদ্যালয়ের শিক্ষকরা এ দেশ এবং জাতির স্বার্থে তাদের নিজেদের অর্থনৈতিক স্বার্থকে বিসর্জন দিয়েছেন। এ জাতিকে জ্ঞানের আলো বিতরণের সময় নিজেদের অর্থনৈতিক অবস্থানের চিন্তা করেননি। কিন্তু অন্যরা যখন উপরে উঠে যাচ্ছে, জীবন যাপনের ব্যয় যখন আকাশচুম্বী এবং দেশ যখন অনেক উন্নত দেশকেও ছাড়িয়ে যাচ্ছে তখন কেন শিক্ষকদের বঞ্চনার অবসান হবে না?
নীতি নির্ধারকবৃন্দ শিক্ষকদের প্রয়োজনীয়তা, তাদের সম্মান, তাদের উন্নত জীবনমানের প্রয়োজন বুঝতে পারবে আশা করেছিলাম। শৈশবের গুরুর সম্মানের দায় মাথায় নিয়ে এ জাতি নিজেদের প্রয়োজনেই শিক্ষকদের শিক্ষক হিসাবে তৈরি করবে এ আশায় চুপ থাকা হয়েছে বহুকাল।
গুরু দক্ষিণা দিতে ব্যর্থ জাতিকে চোখে আঙ্গুল দিয়ে দেখাবার প্রয়োজন হয়েছে অসম্মান, অপমানের জায়গাটা। তাই বাধ্য হয়েই সারা দেশের সরকারি প্রাথমিক বিদ্যালয়ের সহকারী শিক্ষকবৃন্দ আগামী
৪মে/ ২৩ প্রেস ক্লাবে সমবেত হবেন তাদের বঞ্চনার কথা, অসম্মানের কথা নিয়ে। শিষ্যদের নীরবতাই গুরুদের বাধ্য করল রাস্তায় নামতে। এ লজ্জা কার?

 

শাকিলা নাছরিন পাপিয়া
শিক্ষক ও কলামিস্ট

 

এই লেখকের অন্যান্য লেখা



আপনার মূল্যবান মতামত দিন:


Developed with by
Top