সিডনী শুক্রবার, ২৭শে নভেম্বর ২০২০, ১২ই অগ্রহায়ণ ১৪২৭


হে বন্ধু বিদায় : সুভাষ দে


প্রকাশিত:
১৬ নভেম্বর ২০২০ ১৬:২৪

আপডেট:
২৭ নভেম্বর ২০২০ ০২:৪২

ছবিঃ সৌমিত্র চট্টোপাধ্যায়

 

কিছু কিছু অভিনেতা আছেন যারা কোন নির্দিষ্ট পরিচালকের সবথেকে পছন্দের অভিনেতা হয়ে ওঠেন। তাঁরা যেন সেই পরিচালককে রন্ধ্রে রন্ধ্রে চেনেন, জানেন। শুটিংএর সেটে কখন ঠিক কতটা ছড়িয়ে পড়তে হবে যেন সব তাদের নখদর্পনে। যেন তাদের জন্মই হয়েছে এই পরিচালকের জন্য অভিনয় করতে। তেমনই সত্যজিৎ রায়ের নাম বিশ্ব চলচিত্রে যেকোনো গ্রন্থে যতবারই লেখা হবে ততবারই ফুটনোটে একটা নাম জ্বলজ্বল করবে "সৌমিত্র চট্টোপাধ্যায়"। সত্যজিৎ তাঁর মানসপুত্র সৌমিত্রকে "জলসা ঘর" এর সেটে ছবি বিশ্বাসের সাথে পরিচয় করে দিয়ে বলেন, "এই আমার অপু"। ফেলুদা লেখার সময় সত্যজিৎ নাকি কিছুটা সৌমিত্র চট্টোপাধ্যায়কেই কল্পনা করে ফেলুদার স্কেচ করতেন।

ফ্রান্সের সর্বোচ্চ অসামরিক পুরষ্কার " লিজিয়ঁ অব অনার", ইতালি থেকে লাইভ টাইম অ্যাচিভমেন্ট ইত্যাদি পুরষ্কারে ভূষিত প্রথম আন্তর্জাতিক বাঙালী অভিনেতা কতকটা ব্রাত্যই থেকে গেলেন নিজের ঘরে। বলিউডি চাকচিক্যের চাপে পড়ে প্রাদেশিক চলচিত্রগুলির ক্ষতির আশঙ্কা তিনি বহু আগেই করেছিলেন, হয়েছেও তাই। আবার কখনও অভ্যন্তরীণ রাজনীতি যোগ্য সম্মান পেতে দেয়নি তাঁকে। অভিনেতা জীবনের মধ্যগগনে থাকার সময় বারবার পুরষ্কারের মঞ্চে ব্রাত্য হয়ে থাকাটা একসময় তাকে কতটা বিঁধত তা তাঁর বিভিন্ন সাক্ষাৎকারেই বোঝা যেত।

তবে পুরষ্কার এলো, বয়স সন্ধিতে। ততোদিনে পুরষ্কারের ব্যাপারে তিনি উদাসীন হয়ে পড়েছেন। ২০০৮ সালে এলো জাতীয় পুরষ্কার আর তার এক বছর পর দাদাসাহেব ফালকে। এর আগে ১৯৭০ এ পদ্মশ্রী ও ২০০১ সালে স্পেশাল জুরি অ্যাওয়ার্ড তিনি ফিরিয়ে দিয়েছিলেন। চিরকাল বামপন্থী মনোভাবাপন্ন অভিনেতা কোনদিম আপোষ করেননি তাঁর নিজস্ব সত্ত্বার সাথে।

তবে পর্দার অপু বা গঙ্গাচরণ চক্রবর্তী বা উদয়ন পণ্ডিত? পুরষ্কারে বেড়াজালে এই চরিত্রদেরকে কি বাঁধা সম্ভব? বাঙালি, বাংলা চলচিত্র, বাঙালি দর্শক যতদিন থাকবে ততোদিন এক একটা উজ্জ্বল নক্ষত্রের মতো জ্বলজ্বল করবে এই চরিত্ররা। অত্যাচারী স্বৈরাচারী শাষকের শাষণের বিদায় ঘটাতে ব্যক্ত হবে "দড়ি ধরে মারো টান, রাজা হবে খান খান"। কোন দুঁদে আসামির মিস্ট্রি সলভ করতে করতে ফেলুদা চোয়াল শক্ত করে অস্ফুটে বলে উঠবেন "হয় এর বদলা নেবো নয়তো গোয়েন্দাগিরি ছেড়ে দেবো।" উনি থেকে যাবেন বন্ধুদের অরণ্য অভিজানে, উনি থেকে যাবেন অঘোর সেনের ল্যাবরেটরিতে, উনি থেকে যাবেন চারমিনারে আর থেকে যাবেন নস্টালজিয়ায়। উনি থেকে যাবেন অপর্ণা, চারুলতা আর মৃণ্ময়ীদের হৃদয়ে আর সাথে থেকে যাবে একটা স্নিগ্ধ হাসি।

শিখিয়ে দিয়ে গেলেন চরম কষ্টের দিনে স্ত্রীকে জিজ্ঞাসা করতে হয় "তোমার অনুশোচনা হয় না?" নাহ, আমাদের টেলিপ্যাথির জোড় নেই। থাকলে আজ আমাদেরকে ছেড়ে চলে যেতে পারতেন না, না ফেরার দেশে। "দুষ্টু লোকটা" এক নিমেষেই একটা যুগের অবসান ঘটিয়ে দিলো, কেড়ে নিলো আমাদের ফেলু মিত্তির কে। ওপার থেকে মানিক দা বোধহয় ডেকে পাঠিয়েছিলেন, মগনলাল মেঘরাজ আবারও ভয়ঙ্কর কিছু প্ল্যান করছে। তাঁর প্রদোষ মিত্রকে চাই।

সৌমিত্ররা কি কখনও চলে যায়? এতো গল্প, এতো চরিত্র, এতো কবিতা, এতো নাটক, এতো সংলাপ -- এগুলো তাহলে কি হবে? আজ তাঁর প্রয়ানে যে মুকুলগুলোকে মেরে ফেলা হল তারা তো বলেছিলো -- "আমরা তো এখনও বড়ো হইনি।" নক্ষত্র খসে পড়তে তো অনেক দেখলাম, কিন্তু আজ যে গোটা  ছোটবেলাই খসে গেল। সৌমিত্রবাবু, ওপারে মানিকবাবু, জটায়ু, মগনলাল মেঘরাজ সবাই আছে, শুধু ফেলুদারই অভাব ছিল এতোদিন। আজ থেকে আর সে অভাব রইলো না।

আবার কোন একদিন দেখা হবে "তিন ভুবনের পারে"।
তোমারে যা দিয়েছিনু সে তোমারি দান—
গ্রহণ করেছ যত ঋণী তত করেছ আমায়।
হে বন্ধু, বিদায়।

 

সুভাষ দে
পশ্চিমবঙ্গ, ভারত

 

এই লেখকের অন্যান্য লেখা


বিষয়: সুভাষ দে


আপনার মূল্যবান মতামত দিন:


Top