সিডনী মঙ্গলবার, ২৬শে জানুয়ারী ২০২১, ১২ই মাঘ ১৪২৭


কিংবদন্তী সুবল দাস

আধুনিক এবং চলচ্চিত্রের গান যাঁর পরশেই পেয়েছে গর্ববোধের মর্যাদা: অশ্রু বড়ুয়া


প্রকাশিত:
১১ জানুয়ারী ২০২১ ১৫:০৪

আপডেট:
১১ জানুয়ারী ২০২১ ১৬:৫৩

ছবিঃ সুবল দাস

 

ভাগ্যে জোটেনি রাষ্ট্রীয় কোনো সন্মান বা পুরস্কার-এই লজ্বা কার ?

 

ছবির এই মানুষটির নাম-সুকুমার চন্দ্র দাস। মেঘনা নদীর কন্যা- নদী তিতাস'র পাড়েই কাটে তাঁর শৈশব এবং কৈশোর। অনেকটা শৈশবেই সঙ্গীতে হাতেখড়ি তাঁর। যদিও ফুটবল ছিল তাঁর খুউব পচ্ছন্দের। এক সময় সঙ্গীত এবং ক্রীড়াঙ্গনে যুগপৎ নিজেকে মেলে ধরতেই গ্রামের বাড়ি ছেড়ে ঠাঁই নিলেন ঢাকায়। ফুটবলে

ছিলেন দুর্দান্ত উজ্জ্বল খেলোয়াড়। ওই সময় আজাদ স্পোর্টিং ক্লাবের গোলরক্ষক হিসেবে প্রথম বিভাগ ফুটবল লীগে শুরু করেন খেলা। কিন্ত সাতসুরের মোহময় হাতছানিতে বিদায় দিলেন প্রিয় ফুটবলকেও।

পুরোদমে আত্মনিয়োগ করলেন শুধু সঙ্গীতেই। হয়ে উঠলেন পরিপূর্ণ একজন সুরকার-সঙ্গীত পরিচালক। বাংলাদেশের সঙ্গীতে উজ্জ্বল এক নক্ষত্র হয়ে ছড়ালেন আলো। সুরের জাদুকর হয়ে কালকে করলেন জয়। ধীরে ধীরে হয়ে উঠলেন বাংলাদেশের

সঙ্গীতে অন্যতম এক কিংবদন্তী। নাম তাঁর সুকুমার চন্দ্র দাস। এই নামের মানুষটিকে চিনতে হয়তো অনেক-কেই ভাবনায় ফেলেছে নিশ্চয়ই। হ্যাঁ, বলছি-তিনি হলেন বাংলা গানের সুর ও সঙ্গীতের কিংবদন্তী স্রষ্টা- সুবল দাস।

বাংলাদেশের আধুনিক মৌলিক গান এবং চলচ্চিত্র সঙ্গীত যাঁর পরশে শুধু সমৃদ্ধই হয়নি বরং পেয়েছে গর্ববোধের মর্যাদা।

ঢাকাই চলচ্চিত্রের অসংখ্য কালজয়ী গানের সুরস্রষ্টা, ক্ষণজন্মা সুবল দাস'র ৯৩ তম জন্মবার্ষিকী ছিল সাতাশ ডিসেম্বর। আজ এদিনে বরেণ্য সঙ্গীতজ্ঞ'র প্রতি রইল এক হৃদয়ের অসীম শ্রদ্ধা ও অকুন্ঠ ভালোবাসা।

 

বাংলাদেশের দক্ষিণ-পূর্বাংশে প্রবাহমান একটি নদী বিশেষ 'তিতাস'। যার উপত্তিস্থল ভারতের অঙ্গরাজ্য ত্রিপুরায় হলেও বাংলাদেশ-ভারতের আন্ত: সীমানা সংশ্লিষ্ট নদী হিসেবে এটি বাংলাদেশে তিতাস নামেই পরিচিত। তিতাস একটি নদীর নাম-এই শিরোনামে প্রখ্যাত উপন্যাসিক অদ্বৈত মল্লবর্মণ-র জনপ্রিয় উপন্যাস যেমন রয়েছে তেমনি রয়েছে প্রখ্যাত চলচ্চিত্র পরিচালক ঋত্বিক ঘটক'র নির্মাণে চলচ্চিত্র। এছাড়া তিতাস-দেশের অন্যতম বৃহৎ নদী মেঘনা'র কন্যা বা মেয়ে-এমনই প্রচলিত উপকথা তো দীর্ঘদিনের। নদী তিতাস'র প্রবাহমান জেলা ব্রাহ্মণবাড়িয়ায় জন্মেছিলেন সঙ্গীতের বরেণ্য ব্যক্তিত্ব সুবল দাস। দিনটি ছিল- ইংরেজি উনিশ'শ সাতাশ সালের সাতাশ ডিসেম্বর। ওই তিতাস

নদীর পাড়ে কাটে তাঁর শৈশব এবং কৈশোর। বাবার নাম-রসিক লাল দাস ও মা-কামিনী দাস। আসল নাম-সুকুমার চন্দ্র দাস হলেও যিনি পরবর্তীতে সুবল দাস নামেই সর্বত্র পরিচিত এবং জনপ্রিয়তা লাভ করেন।

 

পরিবারের সবাই গানবাজনা ভালোবাসতেন বলেই গানের সাথে তাঁর যোগসূত্র ছিল নিবিড়। জীবনের শুরুতেই মূলত যন্ত্রসঙ্গীত শিল্পী হিসেবে আত্মপ্রকাশ করেন তিনি। বাজাতেন সেতার।

প্রখ্যাত ওস্তাদ আলাউদ্দিন খাঁর ভাগ্নে- ওস্তাদ ইসরাইল খাঁর সান্নিধ্য লাভ করেন সুবল দাস। পরবর্তীতে ওস্তাদ খাদেম হোসেন খান, ওস্তাদ আয়েত আলী খাঁ এর কাছ থেকে যন্ত্রসঙ্গীতের ওপর তালিম নেন তিনি। সঙ্গীতে পারদর্শিতা অর্জন করে তিনি সুর ও সঙ্গীত পরিচালনায় মনোনিবেশ করেন। প্রথম দিকে তিনি বন্ধুদের করা মঞ্চ নাটকে সঙ্গীত পরিচালনা শুরু করেন।

 

ইংরেজি ১৯৫৬ সাল। চাকুরির সূত্র ধরেই তৎকালীন পশ্চিম পাকিস্তানে পাড়ি জমান সুবল দাস। প্রায় এক যুগ অবধি তিনি ওখানেই ছিলেন। বিশেষ করে ১৯৬৭ সাল পর্যন্ত পাকিস্তানের লাহোরে কাটিয়েছেন তিনি।

ইংরেজি ১৯৫৯ সালে মুক্তিপ্রাপ্ত ফতেহ্ লোহানী পরিচালিত ‘আকাশ আর মাটি’ ছবির মাধ্যমে চলচ্চিত্রে সঙ্গীত পরিচালনায় নাম লেখান সুবল দাস।

ইংরেজি ১৯৬৩ সাল। বাংলাদেশের গানের ভুবনে উজ্জ্বল নক্ষত্র সুবল দাস যোগ দিলেন পাকিস্তান রেডিওতে সংগীত পরিচালক হিসেবে।

 

ইংরেজি ১৯৬৭ সাল। পাকিস্তান টেলিভিশনে সুরকার হিসেবে কাজ শুরু করেন। কিন্তু পরবর্তীতে চলচ্চিত্রের সঙ্গীতে ঝুঁকে পড়েন তিনি। ওই সময় ড. নচিকেতা ঘোষ, শ্যামল মিত্র, রবিন চট্টোপাধ্যয়, হেমন্ত মুখোপাধ্যয়-এর মতো সঙ্গীত ব্যক্তিত্বদের সংস্পর্শে বেড়ে ওঠেন সুবল দাস।

দীর্ঘ চার দশকের সংগীতজীবনে তিন শতাধিক চলচ্চিত্রে সংগীত পরিচালনা করেছেন তিনি। সিনেমার গান ছাড়াও বেতার- টেলিভিশনের অসংখ্য গানে সুরারোপ করেছেন সুবল দাস। তাঁর সুরারোপিত গান গেয়ে অনেক শিল্পী যেমন হয়েছেন জনপ্রিয় তেমনি পেয়েছেন খ্যাতি।

 

অসংখ্য জনপ্রিয় ও মিষ্টি গানের সুরকার সুবল দাস। যাঁর ঝুঁলিতে রয়েছে বহু জনপ্রিয় ও কালজয়ী গান। যে গানগুলো এখন সঙ্গীতমোদীদের মনে অন্যরকম দোলা দেয়।

সুবল দাসের সুর ও সঙ্গীতে যেসব গান আজো হৃদয়কে নাড়া দেয়-

 

- এই পৃথিবীতে তবে কী আমার নেই -মানবেন্দ্র
- তুমি যে আমার কবিতা -মাহমুদুন্নবী
- ও মেয়ের নাম দিব কী ভাবি শুধু -মাহমুদুন্নবী
- আমি মানুষের মতো বাঁচতে -প্রবাল চৌধুরী
- সন্ধ্যারও ছায়া নামে -সাবিনা ইয়াসমিন
- এই বৃষ্টি ভেজা রাতে চলে যেওনা -রুনা লায়লা
- চলে যায় যদি কেউ বাঁধন -সৈয়দ আব্দুল হাদী
- বন্ধু তুমি শত্রু তুমি তুমি আমার -আব্দুল জব্বার
- শিল্পী আমি তোমাদেরই গান -রুনা লায়লা
- কোথায় যাব বন্ধু বলো কোথায় -প্রবাল চৌধুরী
- আমি সাতসাগর পাড়ি দিয়ে কেনো -মাহমুদুন্নবী
- মনের এই ছোট্ট ঘরে -সাবিনা ইয়াসমিন
- তুমি না এলে বরষায় -বশির আহমেদ
- গানেরই খাতায় স্বরলিপি লিখে -রুনা লায়লা
- একটি রজনী গন্ধা-আঞ্জুমান আরা বেগম
- ও মেয়ের ঝিনুক ঝিনুক চোখে -প্রবাল চৌধুরী
- পাপী বুঝবিরে তুই কখন -আব্দুল আলীম
- একি বাঁধনে বলো জড়ালে -আবিদা সুলতানা
- বলাকা মন হারাতে চায় -ফেরদৌসী রহমান
- আজকের এই চাঁদের আলো -রুনা লায়লা
- ভীরু প্রাণে এলো ভালোবাসা -সাবিনা ইয়াসমিন
- এই পৃথিবীর পান্থশালায় গাইতে -মাহমুদুন্নবী
- আমি লিখতে পেরেছি -সাইফুল ইসলাম
- যখন থামবে কোলাহল -রুনা লায়লা
- কিছু বলতে ইচ্ছে করে-সাবিনা
- যখন আমি থাকবো নাকো -রুনা লায়লা
- শহর থেকে দূরে -সাবিনা ইয়াসমিন
- পান খাইয়া ঠোঁট লাল করিলাম -রুনা লায়লা
- এক অন্তবিহীন স্বপ্ন ছিল -মাহমুদুন্নবী
- তোমাদের সুখের এই নীড়ে –সৈয়দ আব্দুল হাদী
- চলতে পথে দেখা হয়েছে -সাবিনা ইয়াসমিন
- শোনো আমার ফরিয়াদ -খুরশিদ আলম
- সজনী গো ভালোবেসে এতো -বশির আহমেদ
- পান খাইয়া ঠোঁট লাল করিলাম -রুনা লায়লা
- ওগো মনোমিতা-সাবিনা ইয়াসমিন
- দিন দুপুরে মনের ঘরে -রুনা লায়লা
- সুরের আগুনে পুড়ে -আব্দুল জব্বার ও সাবিনা ইয়াসমিন
- যদি বউ সাজগো -রুনা লায়লা ও খুরশীদ আলম
- কত যে ভালোবাসি তোমায়-প্রবাল চৌধুরী ও উমা খান
- ওরে ও বাঁশিওয়ালা -কুমার বিশ্বজিত ও অঞ্জু ঘোষ
-এরকম আরো অনেক হৃদয়ছোঁয়া গান এখনও শ্রোতাদের মাঝে অন্যরকম মুগ্ধতা ছড়ায়।

 

সুবল দাস ছিলেন সত্যিকার অর্থে মিষ্টি সুরের এক স্রষ্টা। তাঁর সুর ও সঙ্গীতে অজস্র আধুনিক গান অন্যরকম জনপ্রিয় হয়ে আছে। মেলোডিয়াস গানের প্রতি দারুণ রকম দুর্বল ছিলেন তিনি।

 

নিরংহকারী এবং উদার মনের মানুষ হিসেবে বিশেষভাবে পরিচিত এই গুণী মানুষটি এক সময় হয়ে উঠেন দেশের ফিল্ম ইন্ডাষ্ট্রির প্রাণ। বিশেষ করে চলচ্চিত্র সঙ্গীতে তিনি এনেছেন এক নতুন ধারা। সুবল দাস-র সুর ও সঙ্গীত পরিচালনায়  উল্লেখযোগ্য ছবিসমূহের মধ্যে- কাজল, ইন্ধন, সাতরং, আলিবাবা, জুলেখা, পিয়াসা, প্রীত না জানে রীত, কংগন, স্বর্ণকমল, ভানুমতি, স্বরলিপি, তানসেন, দর্পচূর্ণ, এখানে আকাশ নীল, দুরন্ত দুর্বার, অনির্বাণ, চাবুক, মামা ভাগ্নে, অনেক দিন আগে, উৎসর্গ, অনেক প্রেম অনেক জ্বালা, ডাক পিয়ন, আলো তুমি আলেয়া, নকল মানুষ, উপহার, হাসি কান্না, যোগ বিয়োগ, গৃহলক্ষ্মী, বানাজারান, হারানো মানিক, লালুভুলু, ঝুমুর, শীষনাগ, অচেনা অতিথি, এরাও মানুষ, রক্ত শপথ, উজ্জ্বল সূর্যের নীচে, রাজমহল, বুলবুল-এ বাগদাদ, শীষনাগ, মধুমতি, শহর থেকে দূরে, ওয়াদা, আলিফ লায়লা, রাজকন্যা, রাজনন্দিনী, আখেরী নিশান, কলংকিনী, গাঁয়ের ছেলে, দোস্তী, অনুরাগ, ভালো মানুষ, পুত্রবধূ, ভাঙ্গাগড়া, পদ্মাবতী, সওদাগর, চিৎকার, নরম গরম, রাজসিংহাসন, আবেহায়াত, গলি থেকে রাজপথ, শাহীচোর, তিন বাহাদুর, হাসান তারেক, জোস, জালিম, সম্রাট, আন্দাজ, মা ও ছেলে, মায়ের দাবী, বাহাদুর মেয়ে, তালাচাবি, শিরি ফরহাদ, তালুকদার, খামোশ, বিষকন্যার প্রেম, সোনার সংসার, সুলতানা ডাকু, অগ্নিকন্যা, রঙ্গীন অরুণ বরুণ কিরণমালা, পয়সা পয়সা, গোলমাল, রাঙাভাবী, ববি, প্রায়শ্চিত, অন্ধ বিশ্বাস, গরীবের বউ, জিজ্ঞাসা, লটারী, টাকার অহংকার, অবুঝ সন্তান, আঞ্জুমান, বাজীগর, লাটসাহেব অন্যতম।

 

এছাড়া তিনটি বিখ্যাত ছবির শুধু ব্যাকগ্রাউন্ড মিউজিক করেছেন সুবল দাস। ছবি তিনটি হলো- অবুঝ মন, প্রতিশোধ এবং অশ্রু দিয়ে লেখা। তিনি ‘ফেরারী’ নামে একটি ছবিও প্রযোজনা করেছেন।

 

এভাবেই নিজের প্রতিভা বিকশিত করে ধীরে ধীরে সুবল দাস হয়ে উঠলেন এদেশের সঙ্গীতের অন্যতম এক কিংবদন্তী। বাংলা আধুনিক গানের বিকাশে যাঁর অবদান অপরিসীম।

ব্যক্তিগত জীবনে প্রচণ্ড রকম অন্তর্মুখী এক মানুষ ছিলেন সুবল দাস। প্রচার-প্রচারণায় বিশ্বাস করতেন না একদমই। আর এ কারণেই সঙ্গীতে তাঁর এত্তোসব অবদান সত্বেও তিনি খানিকটা অপ্রকাশিতই থেকে গেছেন। নিজের সৃষ্টির মাঝেই কেবল অমরত্ব লাভ করে আছেন তিনি।

 

অসংখ্য জনপ্রিয় শ্রুতিমধুর গানের সুরকার সুবল দাস। এদেশের সঙ্গীতের জন্য সারাজীবন সাধনা আর পরিশ্রম করে গেলেও জীবদ্দশায় তাঁর ভাগ্যে জোটেনি রাষ্ট্রীয় কোনো সন্মান বা পুরস্কার।

 

ইংরেজি ২০০৫ সাল, ১৬ আগস্ট। এই দিনে ভারতের লাইফলাইন হাসপাতালে চিকিৎসাধীন অবস্থায় মৃত্যুবরণ করেন তিনি।

সুর ও সঙ্গীতের মহৎপ্রান সুবল দাস-কে জীবদ্দশায় ভূষিত করা হয়নি কোনো পদক বা পুরস্কারে। এমনকি মৃত্যুর পরও সামান্য শোক- সমবেদনাও প্রকাশ করা হয়নি রাষ্ট্রের পক্ষ থেকে।

এ যেনো চরম অসম্মান। বড়ই বেদনার-বড়ই লজ্বার।

চোখের দেখায় অদেখা হলেও বাংলাদেশের সঙ্গীতে সুবল দাস'র নাম রয়ে যাবে বাংলার গানে-গানে। রয়ে যাবে লক্ষ কোটি শ্রোতার হৃদয়ে।

 

বাংলা গানের প্রবাদপ্রতিম সুরস্রষ্টা সুবল দাস-কে মরণোত্তর হলেও রাষ্ট্রীয় সন্মান বা পুরস্কারে ভূষিত করার দাবি আজ সময়ের-সকলের।

    

অশ্রু বড়ুয়া
গীতিকবি, সুরকার ও সঙ্গীত পরিচালক
বাংলাদেশ টেলিভিশন

 

এই লেখকের অন্যান্য লেখা



আপনার মূল্যবান মতামত দিন:


Top