দামাল - বাংলা চলচ্চিত্রের বাঁক বদলের ছবি : মোঃ ইয়াকুব আলী
প্রকাশিত:
২৪ নভেম্বর ২০২২ ০৪:২৮
আপডেট:
৪ এপ্রিল ২০২৫ ০৩:৪৫

মুক্তিযুদ্ধ। বাংলাদেশের ইতিহাসের সবচেয়ে উল্লেখযোগ্য এবং ঘটনাবহুল এক অধ্যায়ের নাম। পাকিস্তানী শাসকগোষ্ঠির দীর্ঘ ২৪ বছরের শোষনের প্রতিবাদের একেবারে শেষ অধ্যায় ছিল সম্মুখসমরে বাঙালির এই সশস্ত্র অভ্যুথান। মুক্তিযুদ্ধটা প্রকৃত অর্থেই ছিল একটা জনযুদ্ধ। দেশের সকল বয়সের, সকল শ্রেণী পেশার মানুষ শুধুমাত্র দেশের প্রতি অপরিসীম ভালোবাসাকে কেন্দ্র করে একটি প্রশিক্ষিত সেনাবাহিনীর বিরুদ্ধে যুদ্ধে ঝাঁপিয়ে পড়েছিল এবং দীর্ঘ নয় মাসের রক্তক্ষয়ী সংগ্রামের মধ্যে দিয়ে ছিনিয়ে এনিছিল স্বাধিকার।
মুক্তিযুদ্ধে একদিকে যেমন ছিল কিশোর যোদ্ধা অন্যদিকে ছিল হাতে গোণা কিছু মানুষের এর বিরুদ্ধচারণ। কিন্তু দিনশেষে মুক্তিযোদ্ধারাই জয়ী হয়েছিল। কারণ দেশের সিংহভাগ জনগোষ্ঠি ছিল এই যুদ্ধের পক্ষে। সরাসরি যোদ্ধাদের বাইরে মুক্তিযোদ্ধারকে সবাই তাদের নিজ নিজ সামর্থ্য অনুযায়ী সাহায্য সহযোগিতা করেছিল। শান্তিপ্রিয় একটা নিরস্ত্র জাতিকে পাকিস্তানি শাসকগোষ্ঠি ইচ্ছে করেই ঠেলে দিয়েছিল এক অসম যুদ্ধে। তাদের ধারণা ছিল বাংলাদেশের জনগণ কোনভাবেই এই যুদ্ধে জয়ী হতে পারবে না। আর সেটাই হবে তাদের উচিৎ শিক্ষা যাতে ভবিষ্যতে আর কোনদিন যেন তারা মাথা তুলে দাঁড়াতে না পারে।
বঙ্গবন্ধুর ঐতিহাসিক ছয় দফা, সর্বদলীয় ছাত্র সংগ্রাম পরিষদের এগারো দফা না মেনে নেয়া। বঙ্গবন্ধুর ৭ই মার্চের ভাষণ। পরবর্তিতে ২৫শে মার্চ রাতের অন্ধকারে অপারেশন সার্চলাইট এর মাধ্যমে বাঙালি নিধন শুরু। এভাবেই শুরু হয়েছিল মুক্তিযুদ্ধ। আর তাতে অংশ নিয়েছিল বাংলাদেশের আপামর জনগোষ্ঠি। পাকিস্তানিরা বাংলাদেশকে প্রত্যেকটা ক্ষেত্রেই ন্যায়বিচার থেকে বঞ্চিত করতো। বাংলাদেশের ফুটবলাররাও পাকিস্তানি দলে ঢুকতে পারতো না। আর ঢুকতে পারলেও বৈষম্য ও বঞ্চনার স্বীকার হতো। এর মধ্যেই শুরু হয়ে যায় মুক্তিযুদ্ধ। তখন অন্য সকলের সাথে ফুটবলাররাও যুদ্ধে যোগ দেয়।
দেশ স্বাধীন করতে ফুটবলাররা জড়িয়ে গেলেও বাংলাদেশের অস্থায়ী সরকার একটা ফুটবল দল তৈরির উদ্যোগ নেয়। এতে একদিকে যেমন বহিঃবিশ্বে বাংলাদেশের পরিচিত বাড়বে অন্যদিকে এইসব ম্যাচ থেকে অর্জিত অর্থ দিয়ে সম্মুখ সমরে যোদ্ধাদের জন্য বিভিন্ন প্রকারের সরঞ্জাম কেনা সম্ভব হবে। এরপর স্বাধীন বাংলা বেতার কেন্দ্রে ঘোষণা দিয়ে ফুটবলারদের যোগাযোগ করতে বলা হয়। এরপর ফুটবলাররা একে একে এসে স্বাধীন বাংলা ফুটবল দলে যোগ দেন এবং খেলতে থাকেন একের পর এক শ্বাসরুদ্ধকর সব ম্যাচ। সেইসব ম্যাচের ফলাফল কি হয়েছিল সেটা জানতে হলে দেখতে হবে ফরিদুর রেজা সাগর রচিত এবং রায়হান রাফি পরিচালিত চলচ্চিত্র দামাল।
এই চলচ্চিত্রের যে বিষয়গুলো আমাকে ছুঁয়ে গেছে তার মধ্যে প্রথমেই বলতে হয় সেট ডিজাইন। সেটেউনবিংশ শতাব্দীর ষাট এবং সত্তর দশকের আবহ পুরোপুরি ফুটিয়ে তোলা হয়েছে। রাস্তাঘাট, বাড়িঘর, আসবাবপত্র, দৈনন্দিন ব্যবহার্য জিনিসপত্র সবকিছুতেই ছিল সেই সময়ের প্রতিচ্ছবি। উদাহরণস্বরূপ বলা যায়, দুর্জয়ের পেছনে পেছনে তার মা দৌড়াচ্ছেন কাঁসার গ্লাসে দুধ নিয়ে। বসার ঘরের দেয়ালে রয়েছে সূচিকর্ম। সেখানে রয়েছে কখনও 'মা' আবার কখনও লতাপাতা ফুল। তখনকার দিনের বকের মাথার মতো কাঠের ডাঁটার ছাতাও দেখা যাচ্ছে দেয়ালে লাগানো পেরেকে ঝুলছে।
বসার ঘরের সোফাসেটটাও সেই আমলের স্বাক্ষ বহন করে। রান্না ঘরের রুটি সেকার তাওয়া পর্যন্ত সেই সময় থেকে উঠে আসা। মাটির চুলার পাশেই রান্নাঘরের জানালায় ঠেস দেয়া রয়েছে পাটকাঠির সাথে দেয়া গোবরের ঘুটো। পুরো বাড়িঘরের দেয়াল, দরজা, জানালা এবং বারান্দা ও জানালার গ্রিল যেন সেই সময় থেকে উঠে আসা। বাড়ির দেয়ালে বা প্যারাপেটে সেই সময়ে ডিজাইন। বাড়ির মধ্যেই আছে ছাদে যাবার সিড়ি। রাস্তার দেয়ালে দেয়ালে লেখা রয়েছে সেই সময়ের সব যুগান্তকারী স্লোগান। সেই সময়ের সবচেয়ে জনপ্রিয় স্লোগান - তোমার আমার ঠিকানা পদ্মা মেঘনা যমুনা শোভা পাচ্ছে একটা দেয়ালে। ছেলেদের হাতের পুরনো বলের মধ্য উঁকি দিচ্ছে কমলা রঙের ব্লাডার। সব চরিত্রের পোশাক পরিচ্ছদে সেই সময়ের ছাপ।
স্বাধীন বাংলা ফুটবল দল শুধুই প্রীতি ফুটবল ম্যাচই খেলেনি। পাশাপাশি বেশ কিছু দুর্ধর্ষ সিদ্ধান্ত নিয়েছিল এবং বাস্তবায়নও করেছিল। এই সিদ্ধান্তগুলো নিয়ে তখনকার অস্থায়ী বাংলাদেশ সরকারের কর্তাব্যক্তিদের সাথে মনোমালিন্যও হয়েছিল কিন্তু তারা পিছু হটেননি। তখন পর্যন্ত বাংলাদেশ রাষ্ট্রকে কোন দেশ স্বীকৃতি দেয়নি। তাই ফুটবল মাঠে বাংলাদেশের পতাকা নিয়ে নামা ছিল সরাসরি রাষ্ট্রদ্রোহিতার শামিল। আর সেটা ছিলো আন্তর্জাতিক আইনেরও বরখেলাপ। তারা শুধু মাঠে জাতীয় পতাকা নিয়ে নেমেই ক্ষান্ত হননি। দলবেঁধে জাতীয় সংগীত পর্যন্ত গেয়েছেন। এই বিষয়গুলো যখন পর্দায় ফুটিয়ে তোলা হচ্ছিল তখন সাদাকালো স্থির চিত্রে একাত্তর সালের সত্যিকার স্বাধীন বাংলা ফুটবল দলের সময়টার প্রদর্শনী একজন দর্শককে সহজেই সেই সময়ের সাথে রিলেট করতে সাহায্য করেছে।
আমি কোন অভিনয় বোদ্ধা নই কিন্তু প্রত্যেকটা চরিত্রকে দেখে মনেহয়েছে তারা যেন সত্যিকার অর্থেই সেই চরিত্রের মানুষ। আর সংলাপগুলো ছিলো দুর্দান্ত। একটা সংলাপ আমার কানে বাজছে। বাবার নিখোঁজের পর মেয়ে বলছে - বাবার পায়ে নাইলনের মোজা ছিল, নাইলনের মোজা অনেকদিন পঁচে না। এটা দ্বারা যদি বাবা বা তার লাশকে চিহ্নিত করা যায়। সেই সময়ের সামাজিকতার ছাপও স্পষ্ট ছিল চরিত্রগুলোর অভিনয়ে। মেয়ে একজন জুতা সারাইকারির কাছে একটা চিরকুট রেখে যান। আর ছেলে এসে সেটা সংগ্রহ করেন। এটা হুবহু সেই সময়ের ছেলেমেয়েদের মেলামেশার কঠিন বিষয়টা তুলে ধরেছে।
মুক্তিযুদ্ধের ক্যাম্পগুলোর চিত্রও তুলে ধরা হয়েছে এই চলচ্চিত্রে। সারি সারি তাঁবু, সেখানে হারিকেন বা হ্যাজাক লাইটের আলো। মুক্তিযোদ্ধাদের চিরায়ত পোশাক লুঙ্গি আর একটামাত্র শার্ট। এমনকি সেই সময়ের প্রচলিত মাফলারকেও দেখানো হয়েছে। পাশাপাশি শান্তি কমিটির কর্মকাণ্ডও এসেছে। তাদের ভাঙা উচ্চারণে উর্দু বলা, পাকিস্তানি সেনাবাহিনীর সৈন্যদের তোয়াজ করে চলা। তাদের কাছে মুক্তিযোদ্ধাদের তালিকা সরবরাহ করা। পাকিস্তানি সৈন্যদের মনোরঞ্জনের ব্যবস্থা করা। অনেক সময় তাদের ডিঙিয়ে তাদের খুশি করার জন্য নিজেই মানুষকে হত্যা করা। আর কথায় কথায় ধর্মের অজুহাত দেয়া এবং পাকিস্তানের অখণ্ডতার কথা বলা। এসব বলেই তারা তাদের কর্মকাণ্ডগুলোকে জায়েজ করতে চেয়েছে। তাদের স্লোগান ছিল - পাকিস্তান জিন্দাবাদ। আর মুক্তিযোদ্ধাদের স্লোগান ছিল - জয় বাংলা।
এই চলচ্চিত্রের সবচেয়ে বড় দিক আমার কাছে মনেহয়েছে বর্তমান সময়ের প্রেক্ষাপটে পঞ্চাশ বছর আগের সংগ্রামের সাদৃশ্য দেখানো। আসলে রাষ্ট্র হিসাবে যেমন মুক্তিযুদ্ধ আমাদের সব কাজেই ছায়া হয়ে থাকে। তেমনি ব্যাক্তি জীবনের চলার পথেও কঠিন বাঁধা পেরোবার মানসিক শক্তি জোগায়। এখনো আমরা যখন কোন বাঁধা অতিক্রম করতে যেয়ে ক্লান্ত বা নিরাশ হয়ে পড়ি তখন মুক্তিযোদ্ধারা আমাদের প্রেরণা জোগায়। হোক সেটা খেলার মাঠ কিংবা যুদ্ধের ময়দান। আর এই চলচ্চিত্রে ঘটনাগুলোকে এতো সাবলীলভাবে তুলে ধরা হয়েছে যে দর্শক সহজেই নিজেকে চলচ্চিত্রের চরিত্রে নিজেকে কল্পনা করবেন। নিজের অজান্তেই রাজাকারের ভুল উচ্চারণের উর্দু শুনে হাসবেন, মুক্তিযোদ্ধাদের উপর চালানো নির্মম অত্যাচারে কাদবেন। আবার কখনও বা নিজের অজান্তেই হাত মুঠো করে আকাশে ছুড়ে দিয়ে বলবেন - জয় বাংলা!
আমি ব্যাক্তিগতভাবে সবসময়ই চাইতাম মুক্তিযুদ্ধের মতো একটা বিশাল ঘটনার বিভিন্ন দিক নিয়ে আলাদা আলাদা চলচ্চিত্র হোক। এবং সেটা অবশ্যই বর্তমান সময়োপযোগী করে। দেরিতে হলেও সেই কাজটা শুরু হয়েছে। ইমপ্রেস টেলিফিল্ম এবং ফরিদুর রেজা সাগরকে এই জন্য ধন্যবাদ। আর পরিচালক রায়হান রাফির কথা বলতে হয় আলাদাভাবে। কারণ একজন পরিচালকই একটা সিনেমার জাদুর টিয়াপাখি যার মধ্যে সিনেমার জানটা লুকানো থাকে। আবার পরিচালকই সিনেমাটাকে এগিয়ে নিয়ে চলেন। সেদিক দিয়ে রায়হান রাফি শতভাগ সফল বলা যায়।
রায়হান রাফির মতো তরুণ চিত্র পরিচালক আমাদের চলচ্চিত্রের হারানো ধারাকে আবার ফিরিয়ে নিয়ে আসার গুরু দায়িত্ব নিজে কাঁধে তুলে নিয়েছেন। তাই তাঁর জন্য অন্তরের অন্তস্তল থেকে দোয়া। আপনাদের হাত ধরেই ফিরে আসুক চলচ্চিত্রের সুদিন৷ চলচ্চিত্রের সুদিন ফিরে আসলে অবধারিতভাবেই আমাদের সমাজের উপর চেপে বসা কুসংস্কারের ভূত পালানোর পথ খুঁজবে। কেটে যাবে মুক্তিযুদ্ধ নিয়ে সবধরণের ধোঁয়াশা। অবসান হবে সব বিতর্কের। সবমিলিয়ে দামাল হয়ে উঠেছে বাংলাদেশের চলচ্চিত্রের বাঁক বদলের সিনেমা।
অস্ট্রেলিয়াতে এই চলচ্চিত্রের পরিবেশক পথ প্রোডাকশন এবং দেশী ইভেন্টস। তাদেরকে আন্তরিক ধন্যবাদ প্রবাসীদের মধ্যে বাংলা সংস্কৃতির চর্চাটা চালিত করার জন্য। সিডনিতে দামাল'র প্রথম শো ছিল হাউসফুল। এমনকি কিছু মানুষ শেষে এসে পেছনে দাড়িয়েও সিনেমাটা দেখেছেন। এবং সিনেমা শেষে তাদের মুগ্ধতার কথা জানিয়েছেন। এভাবেই একদিন বিশ্বময় ছড়িয়ে পড়বে বাংলাদেশের ইতিহাস ও ঐতিহ্য।
মো: ইয়াকুব আলী
বিষয়: মো: ইয়াকুব আলী
আপনার মূল্যবান মতামত দিন: