সিডনী সোমবার, ২৭শে জুন ২০২২, ১২ই আষাঢ় ১৪২৯

১৯৭১: লন্ডন ও ফ্রান্সে প্রতিবাদ : সালেক খোকন


প্রকাশিত:
২৮ ডিসেম্বর ২০২০ ১১:৪১

আপডেট:
২৭ জুন ২০২২ ০২:২৭

ছবিঃ ১ আগস্ট ১৯৭১, লন্ডনের ট্রাফালগার স্কয়ারে প্রতিবাদ সমাবেশ  

 

১৯৭১ সালে বাংলাদেশে পাকিস্তানি সেনাদের গণহত্যার বিরুদ্ধে সারাবিশ্বে নানাভাবে প্রতিবাদ করেছিলেন কিছু মানুষ। ছোট ছোট উদ্যোগ নিয়েই বিশ্বকে তারা আহবান জানিয়েছিলেন বাংলাদেশের পক্ষে দাঁড়ানোর জন্য। ইতিহাসের পাতা থেকে নেওয়া তেমনি কিছু প্রতিবাদের কথা তুলে ধরা হলো:

লন্ডনে বাংলাদেশের স্বাধীনতার পক্ষে সক্রিয় ছিলেন কিছু মানুষ। অক্সফোর্ড পড়ূয়া ব্রিটিশ তরুণী ম্যারিয়েটা প্রকোপে। ১৯৭১-এ গণমাধ্যমে প্রচারিত বাংলাদেশে ঘটে যাওয়া ভয়াবহ হত্যাযজ্ঞের ছবি তাকে প্রবলভাবে আন্দোলিত করে। ২০ এপ্রিল ব্রিটেনে তার নিজ বাড়িতে অনুষ্ঠিত এক সভায় তাকে সাধারণ সম্পাদক করে গড়ে তোলা হয় একটি নতুন সংগঠন 'অ্যাকশন বাংলাদেশ'। প্রেস ইউনিয়ন, ইন্টারন্যাশনাল কনসেন্স ইন অ্যাকশন, পিস নিউজ, ইয়ং লিবারেলস, থার্ড ওয়ার্ল্ড রিভিউ, বাংলাদেশ নিউজ লেটার ফ্রেন্ডস পিস কমিটি ও বাংলাদেশ স্টুডেন্টস অ্যাকশন কমিটির প্রতিনিধিরা ওই সভায় অংশ নেয়। 'অ্যাকশন বাংলাদেশের' প্রধান কাজ ছিল পশ্চিম পাকিস্তানিদের দ্বারা সংঘটিত গণহত্যার নৃশংসতা সম্পর্কে বিশ্ব বিবেককে জাগ্রত করে তোলা। লন্ডনের ক্যামডেনে ম্যারিয়েটার নিজ বাড়িতে ছিল 'অ্যাকশন বাংলাদেশ'-এর কার্যালয়। এপ্রিল থেকে ডিসেম্বর দীর্ঘ ৯ মাস অক্লান্তভাবে এদেশের মানুষের জন্য তহবিল সংগ্রহ আর বিশ্বের বিভিন্ন দেশের সমর্থন আদায় করার জন্য কাজ করেন ম্যারিয়েটা। বিশ্বখ্যাত টাইমস ও গার্ডিয়ান পত্রিকার মাধ্যমে সারা বিশ্বকে তারা জানিয়েছিলেন, বাংলাদেশের গণহত্যার নানান চিত্র।

ম্যারিয়েটার সঙ্গে একাত্তরে যুক্ত ছিলেন আরও দু'জন উদ্যোগী মানুষ। তাদের একজন স্কুলশিক্ষক পল কনেট। 'অ্যাকশন বাংলাদেশ' সংগঠনটির সভাপতি ছিলেন তিনি। তাকে ভালোবেসে বিয়ে করেন নিউ জার্সির মেয়ে এলেন। দু'জনেই লন্ডনভিত্তিক ওয়ার রেজিস্টার্স ইন্টারন্যাশনালের সক্রিয় কর্মী ছিলেন। একাত্তরে বাংলাদেশে নিরীহ নিরপরাধ জনমানুষের ওপর নির্মম হত্যাকাণ্ডের বিরুদ্ধে প্রতিবাদ ও জনমত গড়ে তোলার গুরুত্বপূর্ণ কাজটি করেছিলেন এই দম্পতি। পাকিস্তানি সেনারা পূর্ব পাকিস্তানের নিরীহ মানুষের রক্ত ঝরাচ্ছে- এমন খবরে বসে থাকতে পরেননি তারা। মুক্তিযুদ্ধকে সমর্থন ও অসহায় বাঙালিদের সাহায্য করতে 'অপারেশন ওমেগা' নামে একটি সংস্থা গড়ে তোলেন। ১ আগস্ট ১৯৭১ তারিখে লন্ডনের ট্রাফালগার স্কয়ারে তারা বিশাল এক জনসভার আয়োজন করে। যেখানে মূল দাবি উত্থাপিত হয়- বাংলাদেশে গণহত্যায় পাকিস্তানি সামরিক সরকারের বিরুদ্ধে ব্যবস্থা নেওয়া এবং বাংলাদেশকে স্বীকৃতি প্রদান। জনসভা শেষে বেশকিছু ত্রাণ সামগ্রীসহ একটি অ্যাম্বুলেন্স নিয়ে পলের স্ত্রী এলেন কনেট চলে আসেন ভারতে। অতঃপর অক্টোবরে জীবনের ঝুঁকি নিয়ে যশোরের উপকণ্ঠ শিমুলিয়া দিয়ে ঢোকেন বাংলাদেশে। কিন্তু পাকিস্তান সেনাবাহিনী তাকে গ্রেফতার করে এবং দুই বছরের কারাদণ্ড দেয়।

ছবিঃ ফ্রান্সে প্রতিবাদের তৎকালীন সংবাদ

 

১৯৭১ সালে বাংলাদেশের গণহত্যার খবর জেনে উৎকণ্ঠিত হয়েছিলেন ফ্রান্সের বুদ্ধিজীবী আঁদ্রে মালরো। মুক্তিযুদ্ধের সময় ফরেন লিজিয়ন গঠন করে বাঙালির প্রতিরোধ যুদ্ধে অংশ নিতে চেয়েছিলেন তিনি, উদ্বুদ্ধ করেছিলেন বিশ্বজনমতকে। বাংলাদেশের স্বাধীনতা যুদ্ধের পক্ষে তিনি সাংস্কৃতিক আন্দোলন গড়ে তোলেন। সরকারের কাছে তিনি আকুতি জানিয়েছিলেন- 'আমাকে একটা যুদ্ধবিমান দাও, আমি বাংলাদেশের স্বাধীনতার জন্য জীবনের শেষ লড়াইটা করতে চাই।' ফ্রান্স সরকারের উদ্দেশে তার এ আকুতি আজও ইতিহাস হয়ে আছে। তার এই আকুতি ফ্রান্সের জনগণের মনকে স্পর্শ করে। সে সময় তিনি প্রকাশ্যে বিবৃতি দিয়ে বাংলাদেশের মুক্তিযুদ্ধে অংশগ্রহণের ইচ্ছা ব্যক্ত করেন। তার আহ্বানে পশ্চিমা লেখক ও বুদ্ধিজীবী সমাজে ব্যাপক চাঞ্চল্যের সৃষ্টি হয়। ফলে অনেকেই পাকিস্তানি বর্বরতার প্রতিবাদ করেন।

আঁদ্রে মালরোর রচনা পড়ে উদ্বুদ্ধ হন পল ক্যুয়ের। মালরোর বাংলাদেশের পক্ষে লড়বার সংকল্প বিশেষভাবে অনুপ্রাণিত করে তাকে। ৩ ডিসেম্বর ১৯৭১। পল ক্যুয়ের একটি ঘটনা ঘটিয়ে বসলেন। প্যারিসের অরলি বিমানবন্দরে এসে পাকিস্তান ইন্টারন্যাশনাল এয়ারলাইন্সের একটি বোয়িংয়ের নিয়ন্ত্রণ নেন তিনি। একটি ব্যাগের ভেতর থেকে বৈদ্যুতিক তার বের করে দেখিয়ে তিনি ঘোষণা দিয়েছিলেন যে, ব্যাগে বোমা আছে। এরপর তিনি দাবি করেন, পূর্ব পাকিস্তানের স্বাধীনতার জন্য লড়তে থাকা মানুষের জন্য অবিলম্বে ২০ টন মেডিকেল সামগ্রী ও রিলিফ প্লেনটিতে তোলা না হলে তিনি বোমার বিস্টেম্ফারণ ঘটিয়ে প্লেনটিকে উড়িয়ে দেবেন। তার দাবি অনুযায়ী বিমানে রিলিফ সামগ্রী তোলাও হয়। পরে রেড ক্রস ও বিমানবন্দর কর্মীদের ছদ্মবেশে পুলিশ তাকে গ্রেফতার করে। ব্যাগ খুলে দেখা যায়, সেখানে রয়েছে কতকগুলো বই, এক কপি বাইবেল ও একটি ইলেক্ট্রিক শেভার। এভাবে পাঁচ ঘণ্টায় শেষ হয় বিমান ছিনতাইয়ের ঘটনাটি। তবে অভিনব এ ঘটনার পর ওষুধ ও রিলিফ সামগ্রী পূর্ব পাকিস্তানে পাঠানোর সিদ্ধান্ত নেয় ফ্রান্স সরকার।

ছবি: সংগৃহীত

 

সালেক খোকন
লেখক ও মুক্তিযুদ্ধবিষয়ক গবেষক

 

এই লেখকের অন্যান্য লেখা



আপনার মূল্যবান মতামত দিন:


Top