সিডনী বুধবার, ১৫ই জুলাই ২০২০, ১লা শ্রাবণ ১৪২৭

লড়াই : শীর্ষেন্দু মুখোপাধ্যায়


প্রকাশিত:
২৮ এপ্রিল ২০২০ ১৫:১১

আপডেট:
২০ মে ২০২০ ০৭:৩১

শীর্ষেন্দু মুখোপাধ্যায়

 

পালান আমাদের ক্ষেতে কাজ করে। 

সে ভালো লোক কী মন্দ লোক তা বোঝা খুব মুশকিল। তবে সে জানে খুব ভালো মাঞ্জা দিতে, মাছের এক নম্বর চার তৈরি করতে, কাঠমিস্ত্রির কাজও তার বেশ জানা, আর পারে গভীর ভাঙা গলায় গেঁয়ো গান গাইতে।

পালান গাছের নারকেল চুরি করে বেচে দিয়ে আসে। নিশুতরাতে পুকুরে জাল ফেলে মাছ তুলে নিয়ে যায়, খেতের ফসল চুরি করে। কিন্তু ধরা পড়লেই দোষ স্বীকার করে পায়ে ধরে ক্ষমা চায়। অনেক কাজের কাজি বলে তার হাসিটা বড়ো নির্দোষ আর সরল বলে দাদু তাকে তাড়ায় না।

আমাদের দিশি কুকুরটার নাম ‘ঘেউ’। ভারি তেজি কুকুর। মেজোকাকা যখন বিয়ে করে কাকিমাকে ঘরে আনলেন – বেশিদিনের কথা নয় – তখন কাকিমার বড়োলোক বাপের বাড়ি থেকে যেমন হাজার রকমের দামি জিনিস দিয়েছিল তেমনি আবার দুটো প্রাণীও দিয়েছিল সঙ্গে। এক প্রাণী হল এক যুবতি ঝি, তার নাম অধরা, অন্য প্রাণীটি হল ঘেউ।

ঘেউয়ের রং সাদা, চেহারা বিশাল আর চোখ রক্তবর্ণ। সে আসবার পর থেকে এ বাড়িতে বাইরের লোক আসা প্রায় বন্ধ। ঘেউ ডাকে কম কিন্তু কামড়ায় বেশি। সে আসার পর থেকে এ বাড়িতে অন্য বাড়ির ছেলেরা আসে না, অন্যের কুকুর-গোরু আসা বন্ধ। হাঁসমুরগি পর্যন্ত ভয়ে গা-ঢাকা দিয়েছে।

মেজোকাকিমা বড়ো সুন্দরী। হাঁটু পর্যন্ত এক ঢাল চুল, দূধে-আলতা গায়ের রং, রূপকথার রাজকন্যের মতো চেহারা। তিনি আস্তে হাঁটেন, কম কথা বলেন, দুটো বড়ো বড়ো চোখ দিয়ে মাঝে মাঝে অবাক হয়ে চারধার দেখেন। জেঠিমা, মা, বড়োকাকিমা যখন উদয়াস্ত সংসারের কাজ করছেন তখন মেজোকাকিমা শুয়ে-বসে বই পড়ে সময় কাটান। তাঁর ছাড়া কাপড় অধরা কেচে মেলে দেয়, চুল আঁচড়ে দেয়, আলতা পরিয়ে দেয়। সবাই গোপনে বলে, নতুন বউ কারও বশ মানবে না।

তা হোক, তবু মেজোকাকিমাকে আমাদের বড়ো পছন্দ। তাঁর কাছে জিনিস কেনার পয়সা চাইলেই পাই। শিশুদের তিনি বড়ো ভালোবাসেন। প্রায়ই মিষ্টি কিনে এনে আমাদের খাওয়ান।

আমার দাদুর অনেক পয়সা। লোকে তাকে বিরাট ধনী বলে জানে। কিন্তু বড়োলোকদের মতো চালচলন দাদুর নয়। যেটুকু সময় ওকালতি করেন সেটুকু বাদ দিলে অন্য সময়ে তার হেঁটো ধুতি, খালি গা – আর হাতে হয় দা, নয়তো কোদাল কিংবা বেড়া বাধবার বাঁখারির গোছা। দাদু কখনো বিশ্রাম করতে ভালোবাসেন না। বলেন, বিশ্রাম এক ধরনের মৃত্যু। চব্বিশ ঘণ্টার মধ্যে চার ঘণ্টা ঘুমোবে। বাকি সময়টায় কাজ করবে।

পালান আর ঘেউ দাদুর ছায়া হয়ে ঘোরে। বাড়িতে ধোপা বা নাপিত এলে ঘেউ তাদের তাড়া করবেই। তখন দাদু বা পালান তাকে ধমক দিলে তবেই ক্ষান্ত হয়। অন্য কারও ধমককে সে গ্রাহ্য করে না, এমনকী মেজোকাকিমা বা অধরার ধমককেও নয়। তাই মেজোকাকিমা একদিন রাগ করে অধরাকে বললেন, বাপের বাড়িতে থাকতে ঘেউ আমার কত বাধ্য ছিল। এখন বেয়াড়া হয়েছে। অধরা, ওকে এখন থেকে শিকল দিয়ে বেঁধে রাখবি।

মেজোকাকা কাকিমাকে বড়ো ভয় পেতেন। মুখোমুখি দাঁড়িয়ে কথা বলতে গেলে প্রায়ই চোখে চোখে তাকাতে পারতেন না। কাকিমা তাঁকে শিকল কেনার কথা বলতে কাকা খুব মজবুত বিলেতি শেকল কিনে এনে দিলেন। ঘেউ বাঁধা পড়ল।

দাদু এসব টেরও পাননি। পরদিন বাগানে গিয়ে গাছপালার পরিচর্যার সময়ে একটু অবাক হয়ে চারপাশ দেখে বললেন, কুকুরটা কই রে?

পালান বলে, বাঁধা আছে দেখেছি।

বাঁধা? কে বাঁধল?

ওই খোঁচড় ঝিটাই বোধ হয়।

দাদু ডাকলেন, ঘেউ! কোথায় রে তুই?

 

মেজোকাকার ঘরের পেছনের বারান্দা থেকে এখন ঘেউয়ের করুণ আর্তনাদ আর শেকলের ঠুনঠুন শব্দ ভেসে এল। আর কী ভীষণ যে দাপাদাপি করতে লাগল সে। মেজোকাকিমা কঠিন স্বরে ঘেউকে বললেন, বেত খাবে এরপর।

ঘেউ চুপ করল।

দাদু একটু গম্ভীর হয়ে গেলেন।

আমরা আলায়-বালায় ঘুরি, অতশত খেয়াল করি না। তবু টের পেলাম, বাড়ির হাওয়ায় একটা থমথমে ভূতুড়ে ভাব।

সেবার পুজোর কিছু আগে মেজোকাকিমার বাপের বাড়ি থেকে তত্ত্ব এল। সে তত্ত্ব দেখে লোকে তাজ্জব। বিশাল বিশাল পেতলের পরাতে থরে-বিথরে সাজানো সব জিনিস। খাবার-দাবার, কাপড়-চোপড়, গয়নাগাটি পর্যন্ত। কম করে পনেরোজন লোক বয়ে এনেছে, সঙ্গে আবার বল্লমধারী পাঁচজন পাইক।

সে তত্ত্ব দেখতে বিস্তর লোক জমা হয়েছিল। ঘেউ বাঁধা আছে বলে লোকে তখন আসতে সাহস পায়।

জীবজন্তু বা পোকামাকড় মারা দাদু খুব অপছন্দ করতেন। এমনকী সাপ পর্যন্ত মারা নিষেধ ছিল। আমাদের বাড়িতে বহুকাল ধরে একজোড়া গোখরো ঘুরে বেড়ায়। বাস্তসাপ বলে তাদের আমরা খুব একটা ভয় পেতাম না। তারা যেখানে-সেখানে বিড়ে পাকিয়ে পড়ে থাকে। কখনো রোদ পোহায়, হাততালি দিলে চলে যায় ধীরে-সুস্থে।

এই সাপ দুটোকে ভয় পেতেন কাকিমা। মাঝে মাঝে রাগারাগি করে বলতেন, সাপকে কোনো বিশ্বাস আছে? এক্ষুনি এদের মেরে ফেলা দরকার।

তাঁর সে-কথায় কেউ কান দেয়নি। এমনকী মেজোকাকাও না। সবাই বিশ্বাস করত, সাপ দুটো এ বাড়ির পরম মঙ্গল করছে।

মেজোকাকিমার বাপের বাড়ির তত্ত্ব এসেছিল ঠিক দুপুরবেলায়, পুরুষমানুষ কেউ তখন বাড়িতে নেই। তত্ত্ববাহক লোকদের খাওয়ার ব্যবস্থা করতে বাড়ির মেয়েরা মহাব্যস্ত।

সেই সময়ে মেজোকাকিমা পাইকদের ডেকে বললেন, দুটো গোখরো সাপ আছে ও বাড়িতে । একটু আগেও উঠোনের পশ্চিম ধারে তুলসীঝাড়ের তলাকার গর্তে ঢুকতে দেখেছি ওদের। ও দুটোকে খুঁজে বের করে মেরে ফেলো।

পাইকরা মহাবাধ্যের লোক। সঙ্গে সঙ্গে লাঠিসোটা আর বল্লম বাগিয়ে উঠে পড়ল।

এক পাইক তুলসীঝাড়ের তলাকার গর্তে শাবল চালিয়ে মুখ বড়ো করে ফেলল। ভেতর থেকে ফোঁসফোঁসানির শব্দ আসছিল। ঠিক সেই সময়ে দৃশ্যটা দেখে বারান্দা থেকে ঘেউ বুকফাটা চিৎকার করে দাপাদাপি শুরু করল। তার দুই চোখ লাল, মুখ দিয়ে ফেনা গড়াচ্ছে, শেকলটা প্রায় সে ছেঁড়ে আর কী!

মেজোকাকিমা একটা লম্বা বেত নিয়ে এসে সপাটে কয়েক ঘা বসালেন ঘেউয়ের পিঠে। ঘেউ সে মার গ্রাহ্য করল না। উলটে শেকল প্রায় ছিড়ে মেজোকাকিমাকে কামড়াতে গেল।

পুকুরে নেমে পানা পরিষ্কার করছিল পালান। ঘেউয়ের চিৎকারে কী যেন বুঝতে পেরে উঠে এসে দাঁড়াল। বিশাল কালো চেহারা তার, কালো কাঁধে তখনও সবুজ কচুরিপানা লেগে আছে।

অবাক হয়ে সে তুলসীঝাড়ের কাছে পাইকদের কান্ড দেখে হঠাৎ দু-হাত তুলে ধেয়ে আসতে আসতে বলল, সর্বনাশ। সর্বনাশ! 

মেজোকাকিমা তখন রাগে আগুন। পাইকদের চেঁচিয়ে বললেন, এ লোকটা মহাচোর। এটাকে ঠাণ্ডা করো তো। তারপর ঘাড়ধাক্কা দিয়ে বের করে দাও বাড়ি থেকে।

পালান একবার ঘুরে তাকাল মেজোকাকিমার দিকে। মনে হল, এক রাগি দৈত্য তাকিয়ে আছে সুন্দর রাজকন্যার দিকে।

পরমুহূর্তেই পালান লকড়ির ঘরে গিয়ে একটা প্রকান্ড লাঠি হাতে বেরিয়ে লাফিয়ে উঠোনে নামল।

ততক্ষণে অবশ্য পাইকরা একটা গোখরো সাপকে বল্লমে বিঁধে মেরে ফেলেছে। উঠোনে সাপটাকে শুইয়ে তারা অবাক হয়ে সাপটার বিশাল দৈর্ঘ্য দেখছিল। দু-জন পাইক ওদিকে শাবল আর বল্লমের খোঁচায় দ্বিতীয় সাপটাকেও জখম করে ফেলেছে। 

এ সময়ে পালানের লাঠি তাদের একজনের কাঁধে পড়তেই লোকটা 'বাপ' বলে উঠোনে গড়িয়ে পড়ে। অন্য পাইকরা মুহূর্তের মধ্যে সজাগ হয়ে যে-যার অস্ত্র হাতে নেয়।

তারপর উঠোন জুড়ে এক বিশাল লড়াই বেধে যায়। একদিকে পালান একা, অন্যদিকে পাঁচজন পাইক সমেত পনেরোজন জোয়ান।

আমাদের মধ্যে সবচেয়ে ভীতু মেয়ে কমললতা গিয়ে হঠাৎ খুব সাহস করে ঘেউয়ের গলার বকলশ থেকে শেকলের হুকটা খুলে দিল। ঘেউয়ের সাদা শরীরটা আলোর ঝলকানির মতো উঠোনে ছুটে গেল।

সারাপাড়া জুড়ে বিশাল হাঙ্গামার গোলমাল ছড়িয়ে গেল। ভিড়ে ভিড়াক্কার। আমরা ছোটোরা সেই ভিড়ের পেছনে পড়ে কিছুই দেখতে পেলাম না। শুধু বিকট গালাগাল আর চেঁচানি শুনতে পাচ্ছিলাম। 

সব লড়াই-ই একসময়ে থামে। এটাও থামল। দেখি, ভিড়ের ভেতর চ্যাংদোলা করে পালানকে ডাক্তারখানায় নিয়ে যাচ্ছে কিছু পাড়ার লোক। তার পেটে বুকে বল্লমের ফুটো, মাথায় রক্তের টুপি পরে আছে। ঘেউ মাটিতে পড়ে করুণ আর্তনাদ করছিল। অনেক চেষ্টাতেও সে কোমর আলগা করে দাঁড়াতে পারছিল না।

মানুষ কীভাবে যুদ্ধ জিতবে তার কোনো নিয়ম নেই। অনেক সময় মানুষ যুদ্ধে জিতেও হারে, আবার কখনো হেরেও জিতে যায়।

এই ঘটনার দু-মাস বাদে দেখা যেত, পালান আবার খেতের কাজে নেমেছে। তবে আগের মতো অতটা দৌড়ঝাঁপ গাছবাওয়া পারে না। ধীরে-সুস্থে টুকটুক করে কাজ করে বেড়ায়, দাদুর সঙ্গে ছায়া হয়ে লেগে থাকে।

ঘেউও আগের মতো নেই। তার একটা ঠ্যাং সব সময় উঁচু হয়ে থাকে। তিন ঠ্যাঙে সে নেংচে নেংচে ঘোরে দাদুর সঙ্গে।

দাদু নির্বিকার। সেই হেঁটো ধুতি, খালি গা আর হাতে সব সময়ে গৃহকর্মের নানা সরঞ্জাম।

মেজোকাকিমা তখন ঘোমটা টেনে খুব লজ্জানত বউয়ের মতো নানা কাজকর্ম করে বেড়ায়। জেঠিমা, মা, কাকিমাদের সঙ্গে একসঙ্গেই খায়, গল্প করে, হাসেও।

এখন অধরার বড়ো কাজ বেড়েছে। সামনে অগ্রহায়ণে পালানের সঙ্গে তার বিয়ে, পালানকে সেই জন্যে দাদু একটি জমি দিয়েছেন ঘর বাঁধতে, তাতে অবসর সময়ে ঝুড়ি দিয়ে মাটি ফেলতে হয় অধরাকে। ভিত করে তারপর বাঁশবাখারি টিন দিয়ে ঘর উঠবে। বড়ো খাটুনি। মেজোকাকিমা তাকে যখন-তখন ডাকলে সে একটু বিরক্ত হয়ে বলে, বাবা রে বাবা, সব সময়ে তোমাদের কাজে মাথা দিলেই চলবে! আমার নিজের বুঝি কাজ নেই?

 

লেখক: শীর্ষেন্দু মুখোপাধ্যায়

 

এই লেখকের অন্যান্য লেখা



আপনার মূল্যবান মতামত দিন:


Top