সিডনী বুধবার, ২৭শে মে ২০২০, ১৪ই জ্যৈষ্ঠ ১৪২৭

করোনা ও কফিন : সাইফুর রহমান


প্রকাশিত:
১৯ মে ২০২০ ১৩:৫৮

আপডেট:
২০ মে ২০২০ ১০:৪৬

সাইফুর রহমান

 

এক.
এলার্ম ঘড়ির শব্দে ঘুম ভাঙ্গে আদ্রিয়ানার। সার্প সাতটা। লেপের তলা থেকে কচ্ছপের মতো মাথা ও শরীরটা ঈষৎ বের করে আর্তনাদরত ঘড়িটা একহাতে বন্ধ করে সে। তারপর তন্দ্রাতুর শরীরটা আবার বকের পালকের মতো শুভ্র কোয়েল্টের নিচে শুড়শুড় করে ঢুকে যায়। এটা আদ্রিয়ানার চিরকালের অভ্যেস। একবারে কিছুতেই উঠতে পারেনা সে। মিনিট পনের এভাবে শুয়ে থাকবে লেপের তলায়। তারপর কিছুক্ষণ বিছানায় আড়মোড়া ও গড়াগড়ি দিয়ে তবেই গা ঝাড়া দিয়ে উঠে বসবে। হঠাৎ আদ্রিয়ানার মনে হলো বিছানাটা কেমন যেন আর্দ্র আর্দ্র লাগছে। অদ্ভুত একরকম স্যাঁতসেতে অনুভূতি। এক ঝটকায় লেপটা সরিয়ে দিতেই বিস্ফারিত চোখে সে তাকাল বেডশিটের উপর। রক্তজবার মতো লালরক্তে ভিজে আছে বিছানার মাঝখানটা। সমস্ত চাদরটা যেন দেখাচ্ছে জাপানের পতাকার মতো। আরেব্বাস! রাতে তার রজস্বলা হয়েছে সে টেরই পায়নি। আজ তো ঋতুস্রাব হওয়ার কথা নয়। ধার্য তারিখ আরো দু’দিন পর। জলের স্রোতের মতো হঠাৎ এমন রজোদর্শনে খানিকটা উচ্ছ্বসিত হয়ে ওঠে আদ্রিয়ানা। এর কারণ, দিন দশেক আগে একদিন অপ্রত্যাশিত ভাবে প্রেমিক লুকার সঙ্গে অনিরাপদ শারীরিক সম্পর্ক স্থাপিত হয়েছিলো। এরকম পরিস্থিতির সম্মুখীন তাদের খুব কমই হতে হয় কিন্তু সেবার কিভাবে যে কি হয়ে গেল।

লুকার সঙ্গে আদ্রিয়ানার সম্পর্ক বছর তিনেক ধরে। লুকা দেখতে ওরকম আহামরি সুদর্শন সুপুরুষ নয়। গড়পড়তা চেহারা, উচ্চতা মাঝামাঝি গোছের। আদ্রিয়ানার মাথা বরাবর। দু’জনকে একসঙ্গে হাঁটতে বরং আদ্রিয়ানাকেই লম্বা মনে হয়। তবে লেখাপড়ায় অতি মেধাবী ও চৌকস ছেলে লুকা। প্রচন্ড ধী সম্পন্ন পুরুষ। লুকাও লোম্বার্দিয়া বিশ্ববিদ্যালয়ে দর্শনের ছাত্র। আদ্রিয়ানা নিজেও তার শারীরিক সৌন্দর্য নিয়ে বেশ খুতখুতে। এ জামানায় সুন্দরী হতে হলে ক্ষীণাঙ্গী হতে হয় কিন্তু আদ্রিয়ানার শরীর পূর্নবিকশিত। প্রতিটি অঙ্গ-প্রত্যঙ্গ সুপরিপুষ্ট। দেহ একটু ভারী সেজন্য চলাফেরাও ঈষৎ মন্থর। আদ্রিয়ানার মুখঅবয়বে স্নিগ্ধতার স্পর্শ নেই। আদ্রিয়ানা প্রায়ই রসিকতা করে বলে- জানোতো লুকা, ঈশ্বর আমাকে তৈরি করার সময় চেহারায় লাবণ্যের ময়ান দিতে ভুলে গিয়েছিলেন। লুকা হেসে বলে- তোমার ক্ষেত্রে ঈশ্বর যদি লাবণ্যের ময়ান দিতে ভুলে গিয়ে থাকেন তবে আমার ক্ষেত্রে ঈশ্বর নির্ঘাত সার দিতে ভুলে গিয়েছিলেন। দেখনা দীর্ঘকায় সব মানুষের ভিড়ে আমি কেমন খর্বকায় হয়ে রইলাম। লুকা দেখতে রাজপুত্র নয় এটা ঠিক। আয় রোজগারও কিছু নেই। ছাত্র মানুষ সেজন্য আয় রোজগারের প্রশ্ন অবান্তর। শুধু বিয়ে করবার প্রতিশ্রুতি দিয়ে আদ্রিয়ানার স্বপ্নকে বাঁচিয়ে রেখেছে বলে সে নিজেকে সম্পূর্ণরূপে সমর্পন করেছে লুকার কাছে।

আদ্রিয়ানার বাবা মারিও দিনি গোড়া ও প্রাচীনপন্থি মানুষ। মা মরা একমাত্র মেয়েকে সেজন্য সে সবসময় কঠোর শাসন ও নিয়ন্ত্রণের মধ্যে বড় করেছে। জীবনের সংকীর্ণ এই জানালা দিয়ে যতটুকু দেখা যায় ততটুকুই আদ্রিয়ানার পৃথিবী। তার বাইরে নিষিদ্ধ এলাকা। সুতরাং প্রত্যক্ষ জীবনের সংকীর্ণ গন্ডি নিয়েই তাকে সন্তুষ্ট থাকতে হয়েছে। ঘরের জীবনকে বাইরে প্রসারিত করবার অথবা বাইরের জীবনকে ঘরে আহ্বান করবার স্বচ্ছন্দ অধিকার তার কখনই ছিলনা। তাছাড়া মা নেই বলে সংসারের প্রতিকূল স্রোত ও ঝড়োবাতাসগুলো ছোটবেলা থেকে প্রতিনিয়ত আদ্রিয়ানার শরীরের উপর দিয়েই বয়ে যায়। বর্ষার নদীতে বাঁশের খুঁটির মতো সে থরথর করে কাঁপে বটে কিন্তু ভেসে যায় না।

আদ্রিয়ানা সোজা ছুটলো স্নানঘরে। প্রাতঃকৃত্য সেরে ও নিজেকে গুছিয়ে ভাবতে লাগলো এক্ষুণি বাবাকে ডেকে তোলা দরকার। বাবা নিশ্চয়ই অঘোরে ঘুমাচ্ছে। বাবার ঘরের দরজায় কড়া নেড়ে আদ্রিয়ানা হাঁক ছাড়ল- বাবা এখন কি উঠবে নাকি ঘুমাবে আরো কিছুক্ষণ। ওপাশ থেকে কোন সাড়াশব্দ পাওয়া গেল না। আদ্রিয়ানা পুনরায় হাঁক ছাড়ল- বাবা সকাল হয়ে গেছে। তুমি কি উঠবে এবার? নাকি ঘুমাবে আরো কিছুক্ষণ? এবার সাড়া পাওয়া গেল।

মারিও দিনি তন্দ্রা মেশানো কণ্ঠে বললেন- কাজ সেরে তুই দোকানে চলে যা। আমি দুপুরের দিকে আসব। শরীরটা ভাল লাগছে না। আদ্রিয়ানা সন্ত্রস্থ হয়ে বলল- জ্বরটর আসেনি তো আবার। দরজাটা খোল। তোমার শরীরটা একটু দেখে যাই। মারিও ওপাশ থেকে বললেন- তেমন কিছু না। শরীরটা বেশ ক্লান্ত লাগছে। সারারাত ঘুম হয়নি। শেষ রাতের দিকে কেবল চোখ দুটো ধরে এসেছিলো একটু। কাঁচা ঘুম ভেঙ্গে এখন আমি দোকানে যেতে পারব না। আদ্রিয়ানা আশ্বস্ত হয়ে বলল- তুমি তাহলে ঘুমোও আরো কিছুক্ষণ। শরীর যদি ভালো লাগে তাহলে এসো।

আদ্রিয়ানার বাবা মারিও দিনি গোড়া ও প্রাচীনপন্থি মানুষ। মা মরা একমাত্র মেয়েকে সেজন্য সে সবসময় কঠোর শাসন ও নিয়ন্ত্রণের মধ্যে বড় করেছে। জীবনের সংকীর্ণ এই জানালা দিয়ে যতটুকু দেখা যায় ততটুকুই আদ্রিয়ানার পৃথিবী। তার বাইরে নিষিদ্ধ এলাকা। সুতরাং প্রত্যক্ষ জীবনের সংকীর্ণ গন্ডি নিয়েই তাকে সন্তুষ্ট থাকতে হয়েছে।

সকালে ঘুম থেকে উঠে প্রাতঃকৃত্য সেরে রোজ ঘন্টা খানেক দৌড়ানোর অভ্যাস আদ্রিয়ানার। তারপর বাড়ি ফিরে স্নান ও প্রাতরাশ শেষ করে সোজা চলে যায় বিশ্ববিদ্যালয়ে। বিশ্ববিদ্যালয় থেকে ফিরে বিকেলের দিকে ঘন্টা দু’য়েক সে বসে কফিন বিক্রির দোকানে। তবে এখন যেহেতু বিশ্ববিদ্যালয় বন্ধ তাই পুরোটা সময়ই সে দোকানে বসে। আদ্রিয়ানা লোম্বার্দিয়া বিশ্ববিদ্যালয়ের ছাত্রী। পড়ছে ইতালিয়ান সাহিত্য নিয়ে। বাবা মারিওর ইচ্ছে ছিলো মেয়েকে ডাক্তারী পড়াবে কিন্তু ছোটবেলায় মা হারানো এই মেয়েটির প্রতি তেমন সু-নজর দিতে পারেনি বাবা মারিও দিনি। তাছাড়া ছোটবেলা থেকে ডাক্তারী কিংবা অন্যকোন বিষয়ের চেয়ে সাহিত্য পড়ার প্রতি আদ্রিয়ানার ঝোক ছিলো বেশি।

শরীরে ট্রাকস্যুট ও পায়ে ট্রেইনার গলিয়ে ঘর থেকে বের হয় আদ্রিয়ানা।
জানুয়ারির মাঝামাঝি শীতের তীব্রতা যেন অসহ্য হয়ে ওঠে। পাইন, ওক, চেষ্টনাট আর ম্যাপোল গাছের হলুদ রঙের পাতায় পথ ঢেকে যায়। পা দিয়ে পাতা সরিয়ে গন্তব্যে পথ করে নিতে হয় পথিকের। আদ্রিয়ানা দেখতে পায় ঝোপঝাড়ে ফুটে আছে অ্যাষ্টার, ব্লুবেলস, কসমস, সিলভিয়া, চন্দ্রমল্লিকা, ক্যালেন্ডুলা ও গ্লাডিওলাস সহ কত নাম নাজানা ফুল। এগুলো শীতের ফুল। বসন্তে ফুটবে লিলি, পানসি এবং রোডেন্ড্রন প্রভৃতি ফুল। পাতার আড়াল থেকে একটা তাসকুনি দোয়েল ডেকে ওঠে- চিইক্… চিইক্…।

বাড়ি থেকে সিকেমাইল দূরের সেরিয়া নদীটি ভয়ার্ত এই শীতে শৌর্যহীন অশীতিপর বৃদ্ধের মতো যুবুথুবু মেরে আছে। দড়ির মতো শীর্ণ নদীটি এঁকেবেঁকে ধাবিত হয়েছে আড্রিয়াটিক সাগরের বুকে। বর্তমানে নদীটি এমন দুর্দশাগ্রস্থ অবস্থা হলেও বর্ষায় এর বারবাড়ন্ত শরীর। যৌবনবতী তরুণীর মতো তখন সেটা খলখলিয়ে ও উদ্দম নৃত্যে বয়ে চলে।

লোম্বার্দিয়া প্রদেশের ক্রেমা শহরে কফিনের দোকান কুড়িয়েবাড়িয়ে হাতে গোনা চার-পাঁচটির মতো। শহরের ঈশানকোণের একেবারে শেষপ্রান্তে কফিনের দোকান ‘অলতিমো সেলুট্যো’-অন্তিম বিদায়। দোকানটির মালিক আদ্রিয়ানার পিতা মারিও দিনি। ক্রেমা শহরে তাদের তিন পুরুষের বসবাস। মারিওর পিতাসহ সান্দ্রিও দিনি লোম্বার্দিয়া অঞ্চলে এসেছিলেন ক্রোয়োশিয়ার রাজধানী জাগ্রেব থেকে। তিনি ছিলেন সম্পন্ন কৃষক। মারিওর পিতা আলবের্তো দিনি কৃষি পেশায় না গিয়ে কফিন বেঁচা-কেনার ব্যবসায় নেমেছিলেন। সেই থেকে কফিন বিক্রির এই ব্যবসা। মারিওর বয়স সত্তর অতিক্রম করেছে গতবছর। যদিও পিয়েরো নামে একজন কর্মচারি দোকানে কাজ করে বটে কিন্তু মারিওর একমাত্র কন্যা আদ্রিয়ানা ও মারিও দু’জন মিলেই দেখাশোনা করে ব্যবসাটি।

সকালের স্নিগ্ধ পরিবেশে আদ্রিয়ানা হাঁটতে হাঁটতে চলে যায় বহুদূর। সেরিওর তীর ঘেষে সোজা পুবে। নদীর পাড় ধরে বেশ কিছুক্ষণ দৌড়ালে ছোট্ট অরণ্যকুঞ্জের মতো একটা জায়গা পাওয়া যায়। সেখানে পৌঁছে আদ্রিয়ানা বুকভরে নিশ্বাস নেয়। ভোরবেলা সূর্য উঠছে অরণ্যরাজির মাথাঘেষে। গাছপালা ও বাড়িঘরের উপরে ছড়িয়ে পড়েছে সোনালী আবির। নদীর কূল ধরে হাঁটতে হাঁটতে আদ্রিয়ানা ঘন অরণ্য গোছের একটি স্থানে এসে খানিক বিশ্রামের জন্য বসে পড়ে সবুজ ঘাসের উপর। তৃষ্ণা নিবারণের জন্য পানির ফ্লাক্স খুলে কয়েক ঢোক পানি খেয়ে নেয়। চারদিকে লার্চ, বীচ, হর্নবিম অ্যাশ আর চেষ্টনাট গাছের প্রাচুর্য। অজস্র বৃক্ষ বুকচিতিয়ে ঋজু হয়ে দাঁড়িয়ে আছে অরণ্যজুড়ে।

আদ্রিয়ানা উঠি উঠি করছিলো ঠিক এমন সময়ে ঈষৎ দূরে কিছু মানুষের চেঁচামেচি শুনে সেখানে যেতেই দেখা গেল ভ্রমরের পাখার মতো কালো কুচকুচে দীর্ঘকায় একটি সাপ কিলবিল করে ডাঙ্গা ছেড়ে ছুটে যাচ্ছে জলের দিকে। পাশ থেকে কে একজন বলল- আরে এটা তো ‘ওয়েষ্টার্ণ হুইপ স্নেক’। মারাত্বক বিষধর! আদ্রিয়ানা অস্ফুট স্বরে বলল- হুইপ স্নেকই বটে! একেবারে কুচকুচে কালো। লম্বা চাবুকের মতো। জনৈক পথচারি বলল- ক’দিন আগে এ বনে নাকি একটি মাদামি ভাল্লুক দেখা গেছে। আদ্রিয়ানা বলল- বাপরে! কী ভয়ানক কথা। তাহলে তো এদিকে ঘেষা যাবে না আর। আদ্রিয়ানা ভাবল এবার তাহলে বাড়ি ফেরা দরকার।

দুই.
সকাল দশটা নাগাদ আদ্রিয়ানা দোকানে এসে পৌঁছায়। পিয়েরো নামে যে ছেলেটি দোকানে কাজ করে সে ঘন্টাখানেক আগে এসে ধুলোবালি সাফসুতোর করে দোকানটি একেবারে ঝকঝকে করে তুলেছে। ছেলেটি বড় কাজের। বছর দু’য়েক ধরে কাজ করছে এখানে।

পিয়েরো আদ্রিয়ানাকে দোকানে ঢুকতে দেখে হাত তুলে বলল- বনজোরনো- সুপ্রভাত। আদ্রিয়ানা ঈষৎ হেঁসে বলল- বনজোরনো। কেমন আছো পিয়েরো? সব ঠিক আছেতো। পিয়েরো বার দুয়েক কেশে বলল- ভালোই। তবে দেখুননা কি ভয়ানক ঠান্ডা পড়েছে। মনে হচ্ছে যেন হাঁড়মাংস সব জমে যাবে। বলেই পুনরায় দু’তিনবার কাশলো সে।
-সে তুমি ঠিকই বলেছো পিয়েরো। জানুয়ারির মাঝামাঝি ঠান্ডা তো পড়বেই। ভাগ্য খারাপ হলে তুষারপাতও হতে পারে। পিয়েরো নিজের টেবিল চেয়ার ছেড়ে আদ্রিয়ানার টেবিলের সামনে এসে বসে। সকালের দিকে দোকানে খদ্দের তেমন একটা আসে না। দু’একজন যাও বা আসে মধ্যাহ্নের পর। বেশিরভাগ সকাল-ই দু’জন গল্প করে কাটিয়ে দেয়। পিয়েরো চেয়ারটা আদ্রিয়ানার টেবিলের সামনে টেনে নিতে নিতে জিজ্ঞেস করলো- আমাদের বড় কর্তা আসবে কখন। পুরোণো কাপড় দিয়ে টেবিলের উপরিভাগ মুছতে মুছতে আদ্রিয়ানা বলল- বাবার শরীরটা ভালো যাচ্ছে না। আসতে দেরি হবে। হয়তো দুপুরের দিকে আসবে।
-পিয়েরো হঠাৎ চেঁচিয়ে বলল- আদ্রিয়ানা ঐ দেখুন আপনার জুতোর সঙ্গে একদলা কাদা লেগে আছে। আদ্রিয়ানা ট্রেইনারের দিকে তাকিয়ে বলল- আরে যা! তাইতো, একি অবস্থা! সকালে মর্নিংওয়ার্ক করতে গিয়ে লেগেছে হয়তো। পিয়েরো ঠোঁটে একচিলতে হাসি তুলে বলল- আপনার বুঝি নাইকি ব্র্যান্ডের ট্রেইনার পছন্দ? আদ্রিয়ানা বলল- হুম! জানতো গ্রীক মিথোলজিতে নাইকি হচ্ছে ‘গডেস অব ভিক্টোরি’ অর্থাৎ বিজয়ীর দেবি। পুরুষতান্ত্রিক এই সমাজে জুতা কম্পানীটি যে একজন দেবির নামে এই ব্রান্ডের নামকরন করেছে এই বা কম কি। এজন্য এ ব্র্যান্ডের জুতাই আমি পড়ি সবসময়।
-পিয়েরো সোৎসাহে বলল- একটা বিষয় খেয়াল করেছেন আদ্রিয়ানা, চারপাশ ভিষণ ঠান্ডা হলেও বাইরে কিন্তু ঝলমলে রোদ।
-তাইতো দেখছি কাচাসোনা রঙা রোদ্দুর কচি পাতার উপর কেমন চকচক করছে। আঙ্গুল তুলে দূরে নির্দেশ করে আদ্রিয়ানা বলল- দেখেছো পিয়েরো চাপা ফুলের মতো সূর্যের আলো দূরের সেরিও নদীতে কেমন অদ্ভুত দেখাচ্ছে। মনে হচ্ছে যেন একরাশ আলোর মালা ক্রমশ দোল খাচ্ছে নদীতে। শীতে নদীটা কেমন শুকিয়ে যায়, অথচ ভরা বর্ষায় বর্ষাবিস্ফারিত এই একই নদী তরুণীর উচ্ছ্বসিত আবেগঘন অশ্রুরাশির মতো চারদিক ছলছল করে।
-তা বেশ বলেছেন আদ্রিয়ানা। আমি খেয়াল করে দেখেছি সাহিত্যের ছাত্রি বলেই হয়তো আপনার মুখ দিয়ে এতো সুন্দর সুন্দর সব কথামালা বের হয় সবসময়।
বেলা গড়িয়ে যায় কিন্তু খদ্দেরের দেখা নেই। অখন্ড অবসর। আদ্রিয়ানা তার টেবিলের দেরাজ থেকে দান্তের ‘ডিভাইন কমেডি’ কাব্যগ্রন্থটি বের করে চোখ বুলাতে থাকে। দৈনন্দিন হস্তস্পর্শে মলিন হয়ে উঠেছে বইটি। পিয়েরো আদ্রিয়ানাকে উদ্দেশ্য করে বলল- আপনি কবিতার বই নিয়ে বসলেন? কি বই এটা, দান্তের?
বই থেকে মুখ না ফিরিয়েই আদ্রিয়ানা বলল- হুম, দান্তের ‘লা দিভিনা কোম্মেদিয়া’। জানোতো পিয়েরো, ইংরেজদের যেমন- শেক্সপিয়র, ফরাসিদের- ভিক্তর হুগো, জামার্নদের- গ্যাটে, রুশিদের- তলেস্তয়। আমাদেরও ঠিক তেমনি দান্তে। ‘লা দিভিনা কোম্মেদিয়া’ হচ্ছে বিশ্বসাহিত্যের এক অমুল্য সম্পদ।

কলার মোচা দেখেছো কখনো, আদ্রিয়ানা জিজ্ঞেস করলো পিয়েরোকে। পিয়েরো প্রতিউত্তরে বলল- হ্যাঁ বেশ দেখেছি। আদ্রিয়ানা বলল- তো মোচার মত সেই নরকের বহিরাঙ্গনে দেখা গেল অসংখ্য প্রেতাত্মাদের ভিড়। ভিমরুল জাতীয় বড়ো বড়ো পোকার দংশনে তাদের শরীর হতে রক্ত ঝরে পড়ছে। ভীরু এবং দদুল্যমানচিত্ত মানুষদের মৃত্যুর পর এরকম শাস্তি পেতে হয়। সেই মোচাকৃতি জায়গার শুরুতেই নরক।

আদ্রিয়ানা কৌতুহলী কণ্ঠে পিয়েরোকে জিজ্ঞেস করল- তুমি কি ইংরেজ কবি শেলী, বায়রন, এলিয়টদের নাম শুনেছ? পিয়েরো তার পিঙ্গল বর্ণের বর্তুল চোখদুটোতে বিস্ময় তুলে বলল- না শুনিনি।
আদ্রিয়ানা বিজ্ঞের মতো বলল- দান্তের ডিভাইন কমেডি কাব্যটি ইতালিয়ান ছন্দ ‘টারজা রাইমায়’ রচিত। এটি দান্তেরই আবিস্কৃত ছন্দ। শেলী বায়রন এবং এলিয়ট এঁরা সবাই দান্তের উদ্ভাবিত ছন্দই ব্যবহার করেছেন তাদের কবিতায়।
আদ্রিয়ানা বলল- বুঝেছ পিয়েরো, ডিভাইন কমেডি হচ্ছে দান্তের কল্পনায় নরক, স্তব্ধলোক ও স্বর্গে ভ্রমণের বিবরণ। দান্তে যখন নরকে প্রবেশ করছেন তখন তার পথপ্রদর্শক হচ্ছেন তার অতিপ্রিয় রোমান কবি ভার্জিল। ভার্জিল তাকে হাত ধরে বাইরে নিয়ে এলেন, তারপর তাকে নিয়ে চললেন নরকের প্রবেশপথের দিকে। দান্তের কাব্যে নরক বা ইনফারনোর আকার দেখতে অনেকটা কলার মোচার মতো।

কলার মোচা দেখেছো কখনো, আদ্রিয়ানা জিজ্ঞেস করলো পিয়েরোকে। পিয়েরো প্রতিউত্তরে বলল- হ্যাঁ বেশ দেখেছি। আদ্রিয়ানা বলল- তো মোচার মত সেই নরকের বহিরাঙ্গনে দেখা গেল অসংখ্য প্রেতাত্মাদের ভিড়। ভিমরুল জাতীয় বড়ো বড়ো পোকার দংশনে তাদের শরীর হতে রক্ত ঝরে পড়ছে। ভীরু এবং দদুল্যমানচিত্ত মানুষদের মৃত্যুর পর এরকম শাস্তি পেতে হয়। সেই মোচাকৃতি জায়গার শুরুতেই নরক। তো সেই নরকের প্রথম বৃত্তে দেখা গেল হোমার, ওভিদ, হোরেস প্রমুখের মতো লেখকদের, যাঁরা খ্রিস্টধর্ম গ্রহণের সুযোগ পাননি। তাঁরা নানা সদ্গুণের অধিকারী হলেও যিশুর কৃপালাভ থেকে বঞ্চিত ছিলেন বলে নরকের প্রথম বৃত্তেই স্থান হয়েছে তাঁদের। অর্থাৎ তাঁদের পাপী চিহ্নিত করা হয়েছে বটে কিন্তু যন্ত্রণাদায়ক কোনো শাস্তির ব্যবস্থা করা হয়নি। প্রকৃতপক্ষে নরকের শুরু নিন্মাভিমুখী মোচাকৃতির দ্বিতীয় বৃত্ত থেকে। যারা কামজ প্রেমে মত্ত হয়ে সমস্ত জীবন কাটিয়েছে, তারা এখানে লুটোপুটি খেয়ে ভেসে বেড়াচ্ছে। মুহুর্তের জন্য তাদের শান্তি নেই। দান্তে এদের মধ্যে দেখতে পেলেন ইতালির রাভেল্লা শহরের পাওলো ও ফ্রান্সেসকে, যাদের করুণ অবৈধ প্রেমের কাহিনি দান্তে প্রথম বিবৃত করেছেন এবং তারপর সেগুলো বহু গ্রন্থে স্থান পেয়েছে। নরকের তৃতীয় বৃত্তে দান্তে পেলেন পেটুকদের। ভোজন ছিল এদের একমাত্র আনন্দ। শাস্তির জন্য এদের রাখা হয়েছে কর্দমের স্রোতে। এদের উপর লক্ষ রাখছে এক ত্রিমু-ধারী ভীষণাকৃতি পাহারাদার। পরের বৃত্তে দেখা গেল কৃপণদের। তাদের শাস্তি একটা প্রকান্ড পাথরের চাঁইকে ক্রমাগত ঠেলে নিয়ে যাওয়া। ভার্জিল এবার দান্তেকে নিয়ে গেলেন পঞ্চম বৃত্তে। তারপর ষষ্ঠ, সপ্তম ও এইভাবে অষ্টম ও নবম বৃত্তে পৌঁছালেন দান্তে। অষ্টম ও নবম চক্রে শাস্তিভোগ করে সেই সব পাপীরা, যারা বুদ্ধিবিচারের অপব্যবহার করেছে। মর্তের সব জীবের মধ্যে একমাত্র মানুষেরই যুক্তি-বুদ্ধি-বিচারের ক্ষমতা আছে। ঈশ্বর প্রদত্ত সেই শ্রেষ্ঠ ক্ষমতার যারা অপব্যবহার করে, পাপীদের মধ্যে তারা সবচেয়ে অধম।

পিয়েরো চোখ দুটো বড় বড় করে বলল- ওরেব্বাস! এতো বিশাল কাহিনী। কিন্তু কাহিনীটা বেশ অন্যরকম।
আদ্রিয়ানা উৎসাহ পেয়ে বলল- তুমিকি জানো পিয়েরো এই যে সামনে সেরিও নদীটা দেখছো এটাকে কিন্তু আমি মোটেও সেরিও নামে ডাকি না। এটা আমার কাছে সেই বিখ্যাত লিথি নদী। পিয়েরো ভ্রু কুঁচকে বলল- লিথি নদী? এ আবার কোন নদী? আদ্রিয়ানা মুখে হাসি তুলে বললেন- নরক ভ্রমণ শেষে দান্তে পৌঁছলেন পুর্গাতোরিও। পূর্গাতোরিও অর্থ কি সেটা জানো তো নিশ্চয়ই?
-হ্যাঁ। পুর্গতোরিও মানে তো শুদ্ধলোক। হ্যাঁ, তুমি ঠিকই বলেছো পিয়েরো। শুদ্ধলোক, অর্থাৎ মানুষ নরক ভোগ করার পর শুদ্ধলোকে এসে পরিশুদ্ধ হয়ে তারপর প্রবেশ করে স্বর্গে। তো হয়েছে কি- নরক ভ্রমণ শেষ করে শুদ্ধলোক পরিভ্রমণ শেষে দান্তে গেলেন লিথি নদীতে স্নান করতে। স্নান সেরে উঠতেই বিস্মৃত হলেন অতীতের সব স্মৃতি। তার আত্মা পরিশুদ্ধ হল। এবার যাত্রা মুল স্বর্গের পথে। ভার্জিলের যাত্রা এখানেই শেষ হল। ভার্জিল এখান থেকেই ফিরে গেলেন। দান্তের সেই ভুবনখ্যাত প্রণয়িণী বেআত্রিচে হলেন স্বর্গে তার পথপ্রদর্শক।

দান্তের ডিভাইন কমেডি নিয়ে কথা বলতে বলতে কখন যে মধ্যাহ্ন পার হয়ে পশ্চিম আকাশ জবাফুলের মতো রঙ ধারণ করেছে দু’জনের কেউই টের পায়নি সেটা। মাঝখানে অবশ্য দুপুর নাগাদ আদ্রিয়ানার লাঞ্চ বক্স থেকে দু’জন দুটো করে এগ সেন্ডইচ খেয়েছে শুধু। সন্ধ্যা হয়ে আসছে। দোকানের সামনের সড়ক দিয়ে দূরের মাঠ ও খামার থেকে ট্রাক বোঝাই ডালিম, ডুমুর ও পেস্তা নিয়ে যাওয়া হচ্ছে শহরে। আর পাকা আঙুর বোঝাই গাড়িগুলো যাচ্ছে চোলাইয়ের কারখানায়। সেই আঙ্গুর পচিয়ে তৈরি হবে উৎকৃষ্ট ওয়াইন।

এমন সময় মারিও এসে ঢুকলেন দোকানে। আদ্রিয়ানা ও পিয়েরো সমন্বয়ে অভিবাদন জানালো- ‘বুয়ানা ছেরা’- শুভ সন্ধ্যা। মারিও ও কাঁপা কাঁপা কণ্ঠে বললেন- বুয়ানা ছেরা। মারিওকে দেখতে বেশ অসুস্থ ও বিদ্ধস্ত লাগছে। মনে হচ্ছে যেন ঝড়ে পতনোম্মুখ একটা গাছকে কোনরকমে ঠেস দিয়ে দাড় করিয়ে রাখা হয়েছে। আদ্রিয়ানা সন্ত্রস্ত কণ্ঠে বলল- বাবা তোমাকে তো বেশ অসুস্থ দেখাচ্ছে, আজ না এলেও তো পারতে। মারিও চেয়ারে বসতে বসতে বললেন- এ আর এমন কী অসুস্থতা। কাল রাতে ঘুম হয়নি। এজন্য সকালের দিকে শরীরটা একটু খারাপ লাগছিল।

মারিও আদ্রিয়ানাকে লক্ষ্য করে বললেন- কিরে তোর হাতে কী বই ওটা। আদ্রিয়ানা ঈষৎ বিরক্ত কণ্ঠে বলল- বাবা তুমি কী অন্ধ। দেখতে পাচ্ছনা এটা দান্তের ‘ডিভাইন কমেডি’। এমন অপ্রত্যাশিত ব্যবহারে মারিও অবাক হলেন। তিনি মলিন কণ্ঠে বললেন- আমি তো অন্ধ’ই। অন্ধকে অন্ধ আর খঞ্জকে খঞ্জ কি আঙুল দিয়ে বুঝিয়ে দিতে হয়। আদ্রিয়ানা ভীষণ লজ্জা পেলেন। তিনি বেশ অপ্রস্তুত ও অস্বস্তি অনুভব করতে লাগলেন। আদ্রিয়ানার মনেই ছিলনা যে তার পিতার একটা চোখ অন্ধ। আদ্রিয়ানার মতো মারিও দিনিও শৈশবে মা হারিয়েছেন। জন্মের পরে মারিওকে এক স্তন্যদাত্রী ধাত্রীর বাড়ি পাঠিয়ে দেওয়া হয়। কিছুকাল পরে দেখা গেল মারিওর চোখ দুটি অন্ধ হবার উপক্রম হয়েছে। আসল রোগ চোখের নয়। যে স্তন্যদাত্রীর স্তন্য পান করে মারিও বড় হচ্ছিলেন তিনি গলগন্ড রোগে আক্রান্ত। সেইজন্য চোখের দৃষ্টি ক্ষীণ থেকে ক্ষীণতর হচ্ছে দিনকে দিন। বাড়ি এনে অনেক চিকিৎসা করা হল। একটি চোখ প্রায় গেছে বলা যেতে পারে। গলগন্ডকে তখন বলা হত রাজব্যাধি। লোকদের মধ্যে কুসংস্কার ছিল রাজা বা রানি যদি রোগীকে স্পর্শ করে দেন তাহলে রোগ ভালো হয়ে যায়। চিকিৎসায় যখন কিছু হল না তখন সিদ্ধান্ত হলো ছোট্ট মারিওকে নিয়ে যাওয়া হবে কোন রাজা কিংবা রানির আরোগ্যস্পর্শের জন্য। মারিওর বয়স তখন বছর আড়াই। কিন্তু রাজারানি পাওয়া যাবে কোথায়। এই চিন্তায় সবাই অস্থির। ইতালিতে কোন রাজারানি নেই। বিপ্লবিরা ফ্রান্সে রাজারানিকে গিলোটিনে শিরছ্শেদ ঘটিয়ে প্রতিষ্ঠিত করেছে রিপাবলিক। ইংলেন্ডে অবশ্য রানি এলিজাবেদ সবেই সিংহাসনে বসেছেন। কিন্তু ব্রিটেন তো অনেক দূরের পথ। খায়-খরচাও আকাশচুম্বি। তাছাড়া আড়াই বছরের শিশুকে এতোদূর নিয়ে যাওয়াও সমস্যা। খোঁজখবর করে দেখা গেল রানি এলিজাবেদের শাশুড়ি অর্থাৎ প্রিন্স ফিলিপের মা, রানি এলিস গ্রীসের একটা চার্চের ধর্ম প্রচারিকা। ইতালির নেপলস থেকে এথেন্স জাহাজে তিন চারদিনের পথ। খরচও তেমন নয়। অবশেষে মারিওর পিতা আলবের্তো দিনি ছেলেকে নিয়ে রওনা হলেন এথেন্সে। রানি এলিস কে দেখে তো আলবের্তোর ভিমরি খাওয়ার মতো অবস্থা। কে বলবে যে ইনি গ্রীস ও ডেনমার্কের রানি। হতদরিদ্র চেহারা। মলিন পোশাক। গলায় ক্রুসের মালা। ভাগ্যের নির্মম পরিহাস ছাড়া এটাকে আর কী বা বলা যায়। এথেন্সের একটা কনভেন্টের বেশ কিছু সেবিকাদের দেখাশুনা করেন রানি এলিস। কথায় কথায় রানির এই দুর্দশার কারণ জানাগেল। কনিষ্ঠ পুত্র হয়েও শৈশবে মায়ের কাছ থেকে এতোটুকু ভালোবাসা পাননি ফিলিপ। উপরন্ত প্রতিনিয়ত জুটেছে নিগৃহ ও রুঢ়ব্যবহার। সেজন্য মায়ের প্রতি কোন ভালোবাসা নেই প্রিন্স ফিলিপের। এমনকি জীবনে একটি ফুটোকড়িও পাঠাননি মায়ের জন্য। যা হোক রানি সযত্নে শিশুকে কোলে বসিয়ে গলায় মাদুলি ঝুলিয়ে দিলেন। পরিতাপের বিষয় হচ্ছে রানির স্নেহ স্পর্শ মারিওর বাঁ চোখটিকে রক্ষা করতে পারেনি। ওই চোখটিকে হারাতে হল চিরদিনের জন্য।

আদ্রিয়ানা বললেন- বাবা আমি সত্যি দুঃখিত। ওভাবে বলিনি আমি। তুমি মনে কষ্ট নিওনা। ‘ইস্কুজামি’- আমাকে ক্ষমা করে দাও। উদ্ভুদ্ধ পরিস্থিতি কিছুটা সহজ করার জন্যই বোধহয় পিয়েরো দু’জনকে উদ্দেশ্য করে বললেন- শুনেছেন নাকি চিনের উহান প্রদেশে করোনা নামে একটা ভাইরাস ছড়িয়ে পড়ছে। এ পর্যন্ত এক হাজারেরও বেশি মানুষ মারা গেছে। আদ্রিয়ানা ও মারিও দু’জনেই মাথা নেড়ে বললেন- বিগত এক সপ্তাহ ধরে তো শুধু চিনে মৃত্যুর খবরই পাচ্ছি। কী ভয়ঙ্কর অবস্থা! মৃতের সংখ্যা নাকি এক হাজার ছাড়িয়েছে। আদ্রিয়ানা আফসোস করে বলল- আহা কি হৃদয় বিদারক পরিস্থিতি। মারিও বললেন- উহানে নিশ্চয়ই এখন হাজার হাজার কফিন বিক্রি হচ্ছে? তাইনারে আদ্রিয়ানা। অথচ দেখ আমাদের এখানে কফিন বিক্রির কি করুণ অবস্থা। আদ্রিয়ানা কণ্ঠে উস্মা তুলে বলল- বাবা তুমি কি পাগল হয়ে গেলে। কি চাও তুমি। আমাদের এখানেও এ ধরনের মড়ক শুরু হোক। যাতে করে হুড়হুড় করে কফিন বিক্রি হয়। তোমার এই কফিন বিক্রির জন্য কি এখন এ দেশের মানুষগুলোকে মরতে হবে সব। বিপন্নের মতো হাত দুটো কচলে মারিও বলল- এতো রাগ করছিস কেন। দেখছিসনা বিক্রিবাট্টার কি অবস্থা। সপ্তাহে দু’চারটের বেশি কফিন বিক্রি হয় না। ওদিকে বাড়িটার মর্টগেজের টাকা শোধ করতে হয় প্রতিমাসে এতো এতো। সংসারের খরচ, তোর পড়াশুনা এসব না হয় নাই বললাম। কফিন বিক্রি না হলে কিভাবে চলা যায় বলতো দেখি।

আদ্রিয়ানা চোখ দুটো বড় বড় করে বলল- তাই বলে তুমি মানুষের মৃত্যু কামনা করবে। এ কেমন কথা। এ কাজ যদি না পোষায় তবে অন্য পেশা খুঁজে নাও। কিন্তু তাই বলে…।
ফিলিওলা- মাই চাইল্ড, আমার কথায় রাগ করিস না। একথা আমি অনেক কষ্টে বলেছি। জীবনে বেঁচে থাকার জন্য কত কিছুই না করেছি। জীবনটা অনেক কঠিনরে মা। এ পেশায় আসবোনা বলেই তো জীবনের বারোটা বছর নষ্ট করেছি। অর্থকড়ি আয় রোজগার করতে পারিনি বটে কিন্তু অভিজ্ঞতায় সমৃদ্ধ হয়েছি। সবকিছু করে ব্যর্থ হয়ে তবেই এসেছি এ পেশায়। আমার বয়স তখন ঊনিশ কী কুড়ি। গায়গতরে ও চোখে মুখে তারুণ্যের ঝিলিক। মাথায় কি যে খেয়াল চাপলো বলতে পারবো না। মনে হলো নৌকর্মি হয়ে পৃথিবী ঘুরবো। চলে গেলাম ভেনিসে। সেখান থেকে বড় বড় সব জাহাজ যায় উত্তর আমেরিকা, দক্ষিণ আমেরিকা, চিন, জাপান, ভারত সিংহল কত কত দেশে। আমার আত্মীয়-পরিজন বাঁধা দিয়ে বললেন- সমুদ্র যাত্রা! সে তো ভীষণ বিপদসংকুল। ওখানে যেয়ে লাভ কি বাপু। কুলি কামিনগিরি করে খাও তবুও নিজদেশ ভাল। তারা আক্ষেপ করে বললেন- সমুদ্র মন্থন করে কী এমন হীরে জহরত তুলে আনবে যে সমুদ্রে যাওয়ার জন্য পাগল হয়ে উঠেছ। আমি মুখে কিছুই বলিনা, তবে মনে মনে ভাবি, বড় হব আমি তাই জীবনের আবর্তে ঝাপিয়ে পড়তে হবে আমাকে। মনে মনে ভাবি ঠুলিবাধা বলদের মতো একই বৃত্তে ঘুরে মরাই কি আমার ললাটলিপি। কূলগৌরব নেই তো কি হয়েছে ঈষৎ অর্থগৌরব যদি অর্জন করা যায় তবে জীবনটা নিশ্চিন্তে চলে যাবে। পারিবারিক ভাবে বিত্তশালী না হলে কি হবে প্রাণ-প্রাচুর্যে উচ্ছ্বল মানুষ আমি। প্রতিনিয়ত আমার ভাবনা, নিরানন্দ, নিঃসঙ্গ ও বৈচিত্রাহীন এ জীবন প্রাণ-প্রাচুর্য ও ঐশ্বর্যে যে করেই হোক ভরিয়ে তুলতেই হবে আমাকে। সমস্য হচ্ছে ব্যক্তিগত বেদনার নিরাবরণ এই প্রকাশকে কেউ মুল্য দিতে চায় না।

করোনা ভাইরাসটি যে এমন মহামড়ক হিসেবে আবির্ভূত হবে সেটা কেউ কল্পনাও করেনি। এযাবত মৃতের সংখ্যা পনের হাজার ছাড়িয়েছে। তারমধ্যে এই লোম্বার্দিয়া অঞ্চলের অবস্থাই সবচেয়ে বেশী করুণ। এখানেই মারা গেছে প্রায় হাজার দশেক মানুষ। সর্বনাশা দুর্যোগটি যে এভাবে হানা দেবে সেটা চিন্তারও অতীত। এমন দুর্দৈব মহামারি ইতালির মানুষ কেন, পৃথিবীর মানুষও নিকট অতীতে দেখেনি।

“রেজিনা ডেল সারে” নামক একটি জাহাজে উঠে পড়লাম। তবে নৌকর্মি হিসেবে নয়। জাহাজের পাচকের সাহায্যকারী হিসেবে। আমার একটি চোখ নষ্ট বলে নৌকর্মি হিসেবে কেউ নিতে রাজি হলোনা। তবে আমার সব কথা শুনে জাহাজের পাচক রাজি হলো। কোন এক অনির্দেশ্য লক্ষের মোহে তন্ময় হয়ে ভেসে পড়লাম সমুদ্রে।

‘রোজিনা ডেল সারে’ অর্থাৎ ‘সমুদ্রের রানি’ নামের সেই জাহাজটি যাচ্ছিল ভারত ও সিংহল হয়ে চিনে। আফিম আর গন্ধকের বিনিময়ে ইতালি রপ্তানী করে গাড়ি ও গাড়ির খুচরা যন্ত্রাংশ। মারিও দিনি বললেন- আমাদের সময় প্রচলিত একটি প্রথা ছিল আফিম খেয়ে নেশা করা। সে সময় আফিম বিক্রির ছোট ছোট দোকানে আফিম বিক্রি হতো। এমন কি মুদি দোকানেও পাওয়া যেত আফিম। আর গন্ধক ব্যবহৃত হতো দেশলাই তৈরির কাজে। যা হোক জীবনের মুল্যবান বারটি বছর কাটিয়েছি সমুদ্রে। আমেরিকা, অষ্ট্রেলিয়া, বাহামা, চিন, জাপান, ভারত- কতো দেশ-বিদেশ ঘুরেছি। কত কত অভিজ্ঞতা। তাইওয়ানে গিয়ে একটি মজার জিনিস দেখেছিলাম। ওখানে কিছু মানুষের রুচি অনুযায়ী ঝিনুকের খোল চুর্ণ করে তৈরি হয় কফিন। আবার জাপানে কিছু মানুষ এতোই সৌখিন যে মৃত্যুর পরেও যাতে করে তাদের সৌখিনতা অক্ষুন্ন থাকে সেজন্য তারা কফিনের গায়ে সুন্দর সুন্দর সব ছবি আঁকে। যেমন ধরো সূর্যোদয় কিংবা সূর্যাস্তের ছবি। কেউ কেউ আঁকে অরণ্য, গাছপালা বৃক্ষরাজি। কেউ ফুল-ফল-পাখি। আবার হয়তো দেখা যায় কোনো দেশপ্রেমিক কফিনে আঁকে নিজ দেশের পতাকা। চিন ও জাপানিদের আরেকটি সৌখিন বিষয় আমার নজর কেড়েছ ওঁরা অনেক সময় সিপ্রেস সুগা ও থুজা প্রভৃতি সুগন্ধী ও অপচনশীল কাঠ ব্যবহার করে কফিন তৈরিতে।
সিংহলে আমি কাটিয়েছিলাম বছর খানেক। ওখানে দেখেছি চিন, জাপানের ঠিক উল্টো চিত্র। মৃতের সৎকার যত সস্তায় করা যায় সেটাই যেন তাদের একমাত্র লক্ষ্য। সেখানে অতিসস্তা কাঠের তৈরি কফিনে মৃত মানুষদের সমাহিত করা হয়। ওখানে কফিন তৈরিতে ব্যবহৃত হয় ছাতিম গাছের কাঠ। আদ্রিয়ানা ভ্রু কুঁচকে বলল- ছাতিম গাছ? মারিও হেসে বললেন- ওই তো আমাদের ‘এলষ্টনিয়া স্কলারিস’। স্কলারিস শব্দটির সঙ্গে বিদ্যা অর্থাৎ লেখাপড়ার যোগ আছে। এ ধরনের নামকরণের কারণ ছাতিমের নরম কাঠ থেকে পেন্সিল ও স্লেট তৈরি হয়। মারিও এবার গল্প থামিয়ে বললেন- দেখ তো আদ্রিয়ানা সময় কত হলো। দোকান বন্ধ করার সময় হয়ে এসেছে বোধহয়। আদ্রিয়ানা ঘড়ি দেখে বলল- সন্ধ্যা সাতটা।
-দোকানপাট বন্ধ করে এবার বাড়ি ফেরা যাক তাহলে।

আদ্রিয়ানা পিয়েরোর দিকে তাকিয়ে চোখ দিয়ে ইশারা করলো দোকানের ভিতরের জিনিসপত্র সব গুছিয়েগাছিয়ে দোকান বন্ধ করতে। এমন সময় হন্তদন্ত হয়ে জনৈক এক খদ্দের প্রবেশ করলো দোকানে। জনৈক সেই খদ্দের মারিও দিনিকে উদ্দেশ্য করে বললেন- ইস্কুজামি- অনুগ্রহ করে আমায় ক্ষমা করবেন। আপনারা বোধহয় দোকান বন্ধ করছিলেন কিন্তু আমার একটি কফিন প্রয়োজন। মারিও দিনি বললেন- সে তো বুঝলাম কিন্তু কি ধরনের কফিন চাই আপনার। সস্তা, নাকি দামি কাঠের। জনৈক সেই ক্রেতা বললেন- সস্তাও নয় আবার বেশি দামিও নয়, মোটামুটি গোছের একটা হলেই চলবে। মারিও কফিন ক্রেতাকে উদ্দেশ্য করে বললেন- পাইন কাঠের কফিনগুলো সবচেয়ে সস্তা। ওগুলোর একেকটার দাম পড়বে চারশ ইউরো। ওক কাঠ আরেকটু দামি, ওগুলোর একেকটার দাম পড়বে ছ’শ ইউরো। চেরি কাঠের কফিনের দাম একহাজার। মেহগনি কাঠের দাম….। আগুন্তুক মারিওকে থামিয়ে দিয়ে বললেন- আমার অতো দামি কাঠের কফিন প্রয়োজন নেই। ওক কাঠের একটা হলেই চলবে। আদ্রিয়ানা বসেছিল একটু দূরে। সে একটি কবিতা ভাজতে লাগল গুনগুন করে-

একদা চমৎকার একটি পিতৃভূমি ছিল আমার
ছিল সারি সারি ওক বৃক্ষ; যতদূর মনে করতে পারি॥
লম্বা হয়ে জন্মাতো, এবং ফুটতো মিষ্টি ভায়োলেট ফুলগুলো
এটা আমার স্বপ্ন, হয়তো।

পিয়েরো অস্ফুট কণ্ঠে আদ্রিয়ানাকে উদ্দেশ্য করে বলল- এটা কার কবিতা? আদ্রিয়ানা ঠোটের কোণে ঈষৎ হাসি তুলে বলল- বিখ্যাত জার্মান কবি হাইনরিথ হাইনের। ক্রেতা লোকটা ওক কাঠের কফিনের কথা বলল বলে কবিতাটির কথা মনে পড়ল।

মারিওকে উদ্দেশ্য করে ক্রেতা বলল- শুনুন আমার মা খুবই অসুস্থ। হাসপাতালে ভর্তি। বার্ধক্যজনিত রোগে ভুগছে। ডাক্তার আমাদের জানিয়ে দিয়েছে যে কোন সময় তার প্রাণপ্রদীপ নিভে যাবে। সেজন্যই কফিনটা তৈরির ফরমাস দিতে এলাম।

মারিও আস্বস্তের সুরে বললেন- আপনাকে ফরমাস দিতে হবে কেন? ওক কাঠের কফিন আমাদের দোকানের পেছনে যে পণ্যাগারটি আছে ওখানেই তো আছে বেশ কয়েকটা। আপনি পছন্দ করে নিয়ে নিন না যেটা আপনার পছন্দ।

আগুন্তুক বলল- আপনার তৈরি করা কফিন তো আমি নিতে পারব না। মারিও দিনি আশ্চর্যান্বিত কণ্ঠে বললেন- কেন? সমস্যা কোথায়?
-আমি যে কফিনটা নিতে চাচ্ছি সেটাতে কোন ধাতব বস্তু থাকা চলবে না। এই যেমন ধরুন লোহার হাতল কিংবা পেরেক ইত্যাদি। মারিও ক্রেতাকে উদ্দেশ্য করে বললেন- কিছু মনে করবেন না, আপনি কি ইহুদী?
-কি করে বুঝলেন?

-কী যে বলেন। এতোদিন ধরে কফিনের ব্যবসা করছি। আপনিই বুঝি প্রথম ইহুদী যে কিনা আমার দোকান থেকে কফিন নিচ্ছে। আপনার আগেও বহু ইহুদী আমার কাছ থেকে কফিন নিয়েছে। আপনার কফিন তো তাহলে এমন ভাবে তৈরি করতে হবে যাতে কোন ধাতব বস্তু না থাকে। কফিনের হাতলগুলোও তৈরি করতে হবে কাঠ দিয়ে। আর লোহার পেরেকের বদলে ব্যবহার করতে হবে কাঠের গোঁজ। তাইতো?
-জি হ্যাঁ। আপনি ঠিক-ই ধরেছেন। তবে আগামিকালের মধ্যেই যদি কফিনটা তৈরি করা যায় তাহলে উপকৃত হই। বলাতো যায়না কখন…।
-আপনি কফিনের দামটা এডভান্স করে যান। আমি চেষ্টা করবো কাল না হয় পরশু আপনি কফিন অবশ্যই পেয়ে যাবেন।
আগন্তুক কফিনের টাকা অগ্রিম জমা করে চলে যেতেই আদ্রিয়ানা তার বাবাকে উদ্দেশ্য করে বললেন- ইহুদিদের কফিনে ধাতব বস্তু ব্যবহার নিষেধ কেন বাবা?
-তা আমি নিশ্চিত করে বলতে পারব না। তবে ইহুদী ও মুসলিম সম্প্রদায়ের মানুষ সৎকারের জন্য খুবই সাধারণ জিনিস ব্যবহার করে। ধনী, গরীব, উঁচুনিচু সব মানুষের জন্য একই ধরনের সাধারণ শবাচ্ছাদন বস্ত্র ব্যবহৃত হয়। তবে আমার কাছে অবাক লাগে যখন দেখি খ্রীষ্টান ধর্মের কিছু মানুষ মৃত্যুর পরও তাদের জেল্লা জৌলুস দেখাতে কুণ্ঠা বোধ করেনা। তাদের কফিনগুলো তৈরি হয় অনেক মুল্যবান কাঠ কিংবা ধাতু দিয়ে। পারলে তো অনেকে হিরে জহরত দিয়েই তাদের কফিনগুলো তৈরি করে। তোমরা শুনে অবাক হবে যে সেই ১৯৬২ সালে আমেরিকার রাষ্ট্রপতি কেনেডির কফিন কেনা হয়েছিল চারহাজার ডলার দিয়ে। এখনকার মুল্যমানে যা চারলক্ষ ইউরোর সমান। ভাবা যায়! তবে হিন্দুধর্মের মধ্যেও এই ধরনের প্রথা কিছুটা বিদ্যমান। আমি বোধহয় খবরেই দেখেছিলাম নাকি পত্রিকায় পড়েছিলাম মনে নেই, ১৯৮৪ সালে ভারতের তৎকালিন প্রধানমন্ত্রি ইন্দিরা গান্ধিকে যখন শিখ আততায়ীরা হত্যা করে, তার শেষকৃৎ অনুষ্ঠানে তাকে পোড়ানো হয়েছিল অতি উচ্চ মুল্যের সুগন্ধি চন্দন কাঠ দিয়ে। কথা শেষ করে মারিও বললেন- ও মাই গড। সাতটা পেরিয়ে গেছে সেই কখন, চলো, চলো এবার ওঠা যাক।


তিন.
সকালের দিকে কফিনের দোকানটি সবে মাত্র খোলা হয়েছে। মারিও, আদ্রিয়ানা ও পিয়েরো যে যার কাজকর্ম নিয়ে ব্যস্ত হয়ে উঠেছে। এমন সময় হুড়মুড় করে দোকানে প্রবেশ করে লুকা। লুকাকে দেখেই আদ্রিয়ানা বলে উঠলো- আরে লুকা যে। এতো সকাল সকাল দোকানে এসে হাজির হলে। জরুরী কিছু? আমাদের তো আজ সন্ধ্যার পরে দেখা হওয়ার কথা ছিল, ইস্ট্রাত্তস ক্যাফেতে। লুকা আদ্রিয়ানাকে উদ্দেশ্য করে বলল- খবর শুনেছ কিছু। ইতালিতে তো করোনার অবস্থা ভয়াবহ! মাত্র সপ্তাহ খানেকের মধ্যে আক্রান্তের সংখ্যা দশ হাজার। এর মধ্যে আমাদের এই লোম্বার্দিয়া প্রদেশে আট হাজার আক্রান্ত। গতকার পর্যন্ত শুধু ক্রেমা শহরেই মারা গেছে শ’খানেক। পাশ্ববর্তী শহর লোদি, ব্রেসিয়া ক্রোমোনিয়া, মিলানো প্রভৃতি শহর মিলে মৃতের সংখ্যা পাঁচশতাধিক। কি যে হচ্ছে কিছুই তো বুঝতে পারছি না। সরকার লকডাউনের আদেশ করলো অথচ শহরের মেয়র তাতে রাজি হলো না। এখন দেখ তো কি অবস্থা!
মারিও উদ্বিগ্ন কণ্ঠে বললেন- লুকা তুমি ঠিকই বলেছো। চিন দেশের করোনা এখানেও যে এভাবে ছড়িয়ে পড়বে আমরা তো কেউ কল্পনাই করতে পারিনি। লোকজন তো সব মিলানোর সানছিরো ইষ্টিডিয়ামে অনুষ্ঠিত চেম্পিয়ানশিপ লীগকেই এর জন্য দায়ি করছে। সরকার তো লকডাউনের আদেশ দিয়েছিলো কিন্তু মিলানোর মেয়র সে আদেশ উপেক্ষা করে কিভাবে ফুটবল খেলার অনুমতি প্রদান করলো? এমন কান্ডজ্ঞানহীন মানুষ কিভাবে হয়। আদ্রিয়ানা বলল- যেখানে চিনে করোনার ভয়াবহ চিত্র আমরা রোজ দেখতে পাচ্ছিলাম সেখানে আমাদের কিন্তু বেশ আগে থেকেই প্রস্তুতি নেয়ার প্রয়োজন ছিল। লুকা চুকচুক করে বলল- এখন কি যে হবে ঈশ্বরই জানেন। পিয়েরো লুকাকে উদ্দেশ্য করে বলল- আচ্ছা লুকা, ক্রেমা শহরে লোক মারা গেছে শ’খানেক? কিন্তু আমরা তো কফিন তৈরির ফরমাস পেলাম মাত্র দশ খানার। বাকি নব্বইটা কফিন কে সাপ্লাই দিচ্ছে। আদ্রিয়ানা ধমক দিয়ে পিয়েরোকে থামিয়ে দিলো। কি বলছো পিয়েরো এসব। এই শহরে কি কফিনের দোকান আর নেই। লুকাও বড় বড় চোখ করে তাকিয়ে আছে পিয়েরোর দিকে। পরিস্থিতি সামাল দিতে আদ্রিয়ানা লুকাকে লক্ষ্য করে বলল- চলো নদীর ধারটায় একটু হেঁটে আসি দু’জন। দুপুরে আমাদের সঙ্গে লাঞ্চ সেরে তারপর যাবে।

হাঁটতে হাঁটতে দু’জন পৌঁছে যায় সেরিনা নদীর তীর ঘেষে বৃক্ষঘেরা ছায়াচ্ছন্ন অরণ্যে। বার্চ গাছের নিচে দু’জন জুত করে বসে পা দুটো এলিয়ে দিয়ে। লুকা আলতো করে আদ্রিয়ানার হাতের আঙ্গুলগুলো স্পর্শ করে। চোখ দিয়ে ইশারা করে ঠোঁট দিয়ে তার ঠোঁটে উষ্ণ স্পর্শ বুলিয়ে দিতে। আদ্রিয়ানা ঈষৎ হেসে বলল- দেখতে পাচ্ছনা এখন করোনা কাল চলছে। এসব নিষিদ্ধ এখন। দূরে গিয়ে বস। ব্যক্তিগত দূরত্ব বজায় রাখ। চুম্বনের মাদকতার অন্তরালে আদ্রিয়ানা যেন স্পষ্ট শুনতে পায় মৃত্যুর বিদ্রুপাত্মক হাসি। প্রিয়তমের আদিম আহ্বানে তার সামনে ভেসে ওঠে রক্তমাংসহীন কঙ্কালসার মৃত্যু মুখের দৃশ্য। লুকা আক্ষেপ মিশেল কণ্ঠে বলল- আমার কি করোনা হয়েছে নাকি যে দূরে গিয়ে বসতে হবে। আচ্ছা তোমার হাতে ওটা কি বই? আদ্রিয়ানা সহাস্যে বলল- দান্তের ‘ডিভাইন কমেডি’।

-বিগত সপ্তাহখানেক ধরে দেখছি তুমি এই বইটাই পড়ছ। ব্যাপারটা কি খুলে বলো তো।
-ব্যাপার আবার কি? অনেকদিন আগে পড়েছিলাম একবার। এখন আবার নতুন করে পড়ছি। এটা তো বারবার পড়ার মতোই বই। তাই নয় কি?
-হ্যাঁ, সে তো ঠিক আছে। আমি নিজেও পড়েছি একবার কিন্তু এটাতো চিরায়ত সাহিত্য, ক্ল্যাসিক, পাঁচশত বছর আগের লেখা কাব্য, আধুনিক সাহিত্যের বইটই তোমার কিছু পড়া উচিত। তুমি আলবার্তো মোরাভিয়া পড়েছো?
-বেশ পড়েছি, কেন পড়বো না। তুমি ভুলে যাচ্ছ যে আমি সাহিত্যের ছাত্রি। আমার তো ইউনিভার্সিটিতে পাঠ্যই ছিলো মেরোভিয়া। তবে ওর লেখায় যৌনচিত্র বড্ড বেশি। লুকা কণ্ঠে উষ্মা প্রকাশ করে বলল- কি বলছ এসব। মেরোভিয়ার রচনায় যৌনচিত্রের আধিক্য থাকলেও এটাই তার একমাত্র অবলম্বন নয়। তার রচনার প্রধান গুণ গল্প বলার সাবলীল ভঙ্গি। ভাষা সংযত ও সরল। আঙ্গিক খোঁজার নাম করে ভাষার কান মুচড়ে সেটাকে অস্বাভাবিক করে তোলার চেষ্টা করেননি মেরোভিয়া। এজন্যই গল্পপিপাসু পাঠকদের কাছে ওঁর লেখা এতোটা প্রিয়।
-দান্তের কাব্য প্রকাশের রীতিও তো সাবলীল। বিশেষ করে দান্তের স্বচ্ছল ও সংযত ভাষা পাঠকদের প্রথম থেকেই আকৃষ্ট করে রাখে। লুকা তুমি শুনে অবাক হবে যে, দান্তের ডিভাইন কমেডিতে প্রাচীন গ্রীক, রোমান সাহিত্যিক ও দার্শনিকেরা যেমন এসেছেন ঠিক তেমনি দান্তের পরলোক ভাবনার সঙ্গে ভারতীয় দর্শন ও পুরাণের ভাবনার কিছু কিছু মিল পাওয়া যায়। মহাভারতে যুধিষ্ঠির যে নরক দেখেছেন সেসব বর্ণনার সঙ্গে দান্তের নরকের সাদৃশ্য দেখা যায়।
-এতে আর অবাক হওয়ার কি আছে। আদ্রিয়ানা তুমি জান কিনা জানি না। গ্যেটে, নিটশে, শোপেন হাওয়ার প্রভৃতি মনীষীরা ভারতীয় চিন্তাধারা দ্বারা দারুনভাবে প্রভাবিত হয়েছিলেন। শোপেন হাওয়ার তো বেশ জোর দিয়েই বলেছেন যে, ভারতীয় দর্শনের এক পৃষ্ঠায় যতটা সারবস্তু পাওয়া যায়, কান্টের দশখানা দর্শনের বইয়ের মধ্যেও তা নেই। তাছাড়া তুমি নিশ্চয়ই জানো চারজন বিদেশী লেখক ভারতবর্ষ নিয়ে লিখে নোবেল পেয়েছেন। কিপলিং, কার্ল গেলেরূপের, টমাসমান ও হেরমান হেসে।
-তাই নাকি? দারুন তো!
-আচ্ছা লুকা তুমি আমাকে কতটুকু ভালোবাসো বলতো। ধরো আমি দান্তের প্রেমিকা বিয়াত্রিচে আর তুমি দান্তে। আমাদের যদি বিয়ে না হয়। তুমিকি পারবে আমার কথা ভেবে ভেবে সমস্ত জীবনটা পার করতে? তোমার সমস্ত কাব্য কবিতায় থাকব শুধু আমি।
-কী বলছ এসব আবোল তাবোল। আমি কিভাবে দান্তে হব। আমি তো কিছু লিখতেই জানি না। কোথায় মহামানব দান্তে আর কোথায় এই আমি চুনোপুটি লুকা।
-একটিবার ভেবে দেখো লুকা, দু’জনের মধ্যে কী দুর্দান্ত ভালোবাসা। কী অসামান্য প্রেম। দান্তে বিয়াত্রিচেকে জীবনে শুধু দু’বার দেখেছিলো। একবার ন’বছর বয়সে, আরেকবার আঠারো বছর বয়সে। অথচ জীবনে কখনোই বিয়াত্রিচেকে ভুলতে পারেননি দান্তে। তাঁর প্রথম কাব্যগ্রন্থ ‘ভিটানোভার’ কাহিনী তো মূলত দান্তের নিজেরই জীবনের কথা। এ কাব্যে তিনি বর্ণনা করেছেন কেমন করে বালক বয়সে বিয়াত্রিচে নামে এক ফুটফুটে পরীর মতো সুন্দরী মেয়ের সঙ্গে তাঁর পরিচয় হয়েছিলো, কিভাবে তিনি অলক্ষে ও অজান্তে বিয়াত্রিচেকে ভালোবেসেছিলেন। সবচেয়ে আশ্চর্য বিষয় কি জানো লুকা- দান্তের সেই ভালোবাসার মধ্যে কামজলিপ্সা ছিল না একবিন্দু।
-লুকা অট্টহাসি হেসে বলল, আমি বিশ্বাস করি না এসব গালগল্প। শারীরিক আকর্ষণই তো প্রেমের চালিকাশক্তি।
-সবাই কি তোমার মত। দেহ? সে তো মনের ইশারাতেই চলে। বাতাস ছাড়া যেমন গাছের পাতা নড়ে না। ঠিক তেমনি মন না চাইলে শরীরও জাগে না।
-আমি পৃথিবীর সবার মতো। আমি তোমার এসব কথা মানি না।
-লুকা তুমি বিশ্বাস করো বা না করো এটাই সত্যি। পৃথিবীতে দু’একজন ব্যতিক্রমও হয়। আমি বিশ্বাস করি দেহাতীত, ইন্দ্রিয়াতীত, কামগন্ধহীন সেই অপূর্ব প্রেমের মাধুর্যে নিশ্চয়ই নিষিক্ত হয়ে উঠত দান্তের মন। এই গোপন প্রেমের অনুভূতিকে সম্বল করেই দান্তে শুরু করেছিলেন তাঁর কাব্যসাধনা। বাস্তব বিদায় নিয়ে বিয়াত্রিচে এবার দৃঢ়ভাবে আসন গেড়ে বসলো তাঁর হৃদয় বেদিতে। বিয়াত্রিচে গৌরবান্বিত হলেন দান্তের লেখায়। একটি বিষয় লক্ষ্য করেছো লুকা?
-কোন বিষয়ের কথা বলছো! খুলে না বললে বুঝব কিভাবে?
-ওই যে ডিভাইন কমেডি কাব্যে দান্তে কী দারুন মহিমায় সম্মানিত করেছেন বিয়াত্রিচেকে। শুদ্ধলোক থেকে স্বর্গে ঢোকার প্রবেশ মুখে দান্তে কবি ভার্জিলকে ফিরিয়ে দিলেন। এবার সঙ্গী হলেন তার আরাধ্য মানস প্রণয়িনী বিয়াত্রিচে। বিয়াত্রিচে দান্তেকে সম্ভাষণ জানিয়ে বললেন- এখন আপনি অমৃতলোকে উপস্থিত হয়েছেন। বিশুদ্ধ আত্মা যখন ঈশ্বর দর্শনের জন্য ব্যাকুল হয় তখনই কেবল এখানে আসা সম্ভব। দান্তের কল্পিত ও বর্ণিত স্বর্গ কিন্তু মধ্যযুগীয় জ্যোতির্বিদ্যায় ও ধর্মতত্ত্বে নির্দেশিত স্বর্গলোকের কথাই স্মরণ করিয়ে দেয়। মধ্যযুগে ধারণা করা হতো, চন্দ্রসহ নয়টি গ্রহলোকের উর্ধ্বে স্বর্গলোক অবস্থিত। বিয়াত্রিচে দান্তেকে সঙ্গে করে প্রথমেই দু’জনে এসে উপস্থিত হলেন চন্দ্রগ্রহে। এর অধিপতি চন্দ্র। বিয়াত্রিচে তাঁর প্রজ্ঞাময় আলোচনার মাধ্যমে দান্তেকে বোঝালেন চন্দ্র ও নক্ষত্রের অতীন্দ্রিয় রহস্যের কথা। ঈশ্বরের করুণালাভে যারা অনুগ্রহপ্রাপ্ত হয়েছেন তাঁদের কয়েকজনকে দেখা গেল স্বর্গের এ স্তরে। এরপর বুধরাজ্যে…। এভাবে নয়টি স্তরের সবগুলোতেই সঙ্গী হলেন বিয়াত্রিচে। জানো লুকা, একলোক থেকে অন্যলোকে যেতে যেতে বিয়াত্রিচের ঐশ্বী সৌন্দর্য্যও ক্রমশ উজ্জ্বল থেকে উজ্জ্বলতর হতে লাগল।
লুকা অসহীষ্ণু কণ্ঠে বলল- তোমার এসব প্রেমজাতীয় লেকচার অন্যএকদিন শুনব। দুপুর হয়ে গেছে, ক্ষুধায় পেট চো চো করছে। লাঞ্চ যদি করাতে চাও তো চল, না হয় আমি চললাম।
আদ্রিয়ানা ফিক করে হেসে বলল- আমি জানি তুমি ক্ষুধা সহ্য করতে পারো না। ঈশ্বর যদি তোমাকে এখন স্বর্গেও পাঠাতে চায় তুমি রাজি হবে না। তুমি অম্লান বদনে বলবে আগে লাঞ্চ সেরে নেই তারপর যাব।
দু’জনেই একসঙ্গে হেসে উঠল তারপর রওয়ানা হলো দোকানের দিকে।


চার.
করোনা ভাইরাসটি যে এমন মহামড়ক হিসেবে আবির্ভূত হবে সেটা কেউ কল্পনাও করেনি। এযাবত মৃতের সংখ্যা পনের হাজার ছাড়িয়েছে। তারমধ্যে এই লোম্বার্দিয়া অঞ্চলের অবস্থাই সবচেয়ে বেশী করুণ। এখানেই মারা গেছে প্রায় হাজার দশেক মানুষ। সর্বনাশা দুর্যোগটি যে এভাবে হানা দেবে সেটা চিন্তারও অতীত। এমন দুর্দৈব মহামারি ইতালির মানুষ কেন, পৃথিবীর মানুষও নিকট অতীতে দেখেনি। ‘আলতিমো সেলুট্যো’ নামক এই দোকানটির এমন রমরমা অবস্থা যে, ভাবাইযায় না। দিনে এক থেকে দু’শ কফিন সাপ্লাই দিয়েও কুলকিনারা করা যাচ্ছে না। চাহিদা আসছে আরো বেশি বেশি কফিনের। আরো দু’জন নতুন কর্মচারী নিয়োগ দিয়েছেন মারিও দিনি। এদের মধ্যে আন্দ্রেয়া পিতো, পেশায় ছুতার। সে কাঠের কাজকর্ম মোটামুটি ভালোই জানে। কিন্তু মার্কো ছেলেটি বয়সেও তরুণ, কাজেরও পূর্ব কোন অভিজ্ঞতা নেই। সুবিধে একটাই, তাকে দিয়ে মাল ডেলিভারির কাজটা ভালভাবে সম্পন্ন করা যায়। দোকানের সবাই এখন ভিষণ ব্যস্ত। অনিবার্য ভাবে সবাইকে মুখে মাস্ক পড়তে হয়েছে, হাতে গ্লাভস। দেখে মনে হয় যেন এটা কফিনের দোকান নয় বরং হাসপাতাল। দুপুরের দিকে সবাই যখন আহারে ব্যস্ত। আদ্রিয়ানা লক্ষ্য করলো মার্কো কিছুই খাচ্ছে না। সে চিবুকে হাত রেখে কি যেন ভাবছে। আদ্রিয়ানা অনুসন্ধিৎসু কণ্ঠে মার্কোকে বলল- কি ভায়া, তুমি কিছু খাচ্ছ না যে? কী এতো ভাবছো? মার্কো দীর্ঘ্য নিঃশ্বাস ছেড়ে বলল- চারদিকে শুধু মৃত্যুর মিছিল। এতো এতো মানুষ মারা যাচ্ছে। ভাবছি আমিও কি আক্রান্ত হতে পারি না কারোনায়? আদ্রিয়ানা বলল- আরে এতো চিন্তার কি আছে। তুমি বয়সে তরুণ। করোনায় তো বয়স্ক লোকজনই মারা যাচ্ছে বেশি। তাছাড়া ঈশ্বর যদি তোমার মৃত্যু এভাবে লিখে রাখে তো সেটা কেউ তো আর খন্ডাতে পারবে না।
মারিও দিনি বড় প্লেট ভর্তি এক প্লেট স্পেগেতি নিয়ে বসেছেন। সে মার্কোকে বলল- বৎস, তোমার বয়স অনেক কম। করোনা তোমাকে আক্রান্ত করবে না। করোনার কিন্তু আমার মতো বৃদ্ধলোক পছন্দ। সে হিসেবে তোমাদের সকলের মধ্যে মৃত্যুর সারিতে আমিই প্রথম। আদ্রিয়ানা খাওয়া থামিয়ে বলল- তুমি থামবে বাবা, এমন অলক্ষুণে কথা তোমার মুখ দিয়ে কিভাবে বেরোয় বুঝিনা আমি। মার্কো আদ্রিয়ানাকে বলল- আচ্ছা আদ্রিয়ানা, দু’একদিন ধরে আপনাকে একটা কথা জিজ্ঞেস করবো ভাবছিলাম। আদ্রিয়ানা বলল- বলো কি জানতে চাও? মার্কো বলল- আচ্ছা দোকানের পিছন দিকটায় আপনাদের যে মালগুদামঘরটা আছে ওখানে গিটার সাদৃশ্য কাঠের বড় একটি বাক্স দেখলাম। ওটা কি জিনিস? আদ্রিয়ানা ঈষৎ হেসে বলল- ওরে পাগল, ওটা বাক্স নয় গিটার কফিন।
-গিটার কফিন? এ আবার কি জিনিস?
-ক্রেমা শহরের এক শিল্পীর ভ্রাতা এই গিটার কফিনটার ফরমাস করে গেছে। দু’চারদিনের মধ্যেই হয়তো নিয়ে যাবে। ওই শিল্পীর মৃত্যুর পর তাকে সমাহিত করা হবে এই গিটার কফিনে।
মার্কো সাগ্রহে বলল- এমন অদ্ভুত জিনিস আমি জীবনে কখনো দেখিনি। মারিও দিনি থালার শেষ স্পেগেতিটুকু মুখে তুলে চিবাতে চিবাতে বললেন- দেখো বাছা, তোমার বয়স অল্প। এখনো অনেককিছু দেখার বাকি। আমি বছর কুড়ি আগে একবার গিয়েছিলাম আফ্রিকার দেশ ঘানায়। সেখানে দেখলাম এক অদ্ভুত জিনিস। যে ব্যক্তি গান করে অর্থাৎ গায়ক বা শিল্পী যাই বলো না কেন, সে লোকটিকে সমাহিত করা হচ্ছে কাঠের তৈরি গিটার কিংবা মাইক্রোফোনের মতো কফিনে। আবার যে লোকটা হয়তো মদের দোকানে কাজ করতো তার জন্য মদের বোতল সাদৃশ্য কফিন। যে ব্যক্তিটি গাড়ি ব্যবসায়ী তাকে কবর দেয়া হচ্ছে গাড়ি আকৃতির কফিনে।

এভাবে যে, যে ব্যবসা কিংবা পেশায় যুক্ত তার জন্য হুবহু সে ধরনের কফিন। বন্দুক ব্যবসায়ির জন্য বন্দুক কফিন। ক্যামেরাম্যানের জন্য ক্যামেরা কফিন। ব্যক্তিজীবনে হয়তো যে মানুষটি ছিলো প্রচন্ড রাগি ও বদমেজাজি তার জন্য লাল টুকটুকে মরিচ কফিন। ঘানায় এসব দেখে আমার মাথায় হঠাৎ একটি ব্যবসায়িক বুদ্ধি খেলে গেল। ভাবলাম লোম্বার্দিয়া অঞ্চলেও কি এ ধরনের সংস্কৃতি চালু করা যায় না? তাহলে তো বেশ ভালোই হয়। তারপর যখন এ ধরনের কফিন বানানো শুরু করলাম, বিস্ময়ে লক্ষ্য করলাম মানুষের মধ্যে এ ধরনের কফিনের চাহিদা অসামান্য। তো বিশ বছর আগে সে প্রথা চালু করেছিলাম আজ সেটা ফুলেফেঁপে মহিরুহু আকার ধারণ করেছে। শুধু লোম্বার্দিয়াতেই নয়, ইতালির সমস্ত উত্তরাঞ্চলে ছড়িয়ে পড়েছে আমার চালু করা এই সংস্কৃতি। এবার বুঝেছ?

মারিও যখন মার্কোকে এসব বোঝাচ্ছিলেন তখন দোকানে এসে ঢুকল বয়স্ক মতো এক খদ্দের। বুওন পমেরিজ্জো- শুভ অপরাহ্ন। মারিও ও ভদ্রলোকের শুভাসিসের উত্তরে বললেন- বুওন পমেরিজ্জো- শুভ অপরাহ্ন। খদ্দের বেচারা লকডাউনের কারণে হয়তো অনেকটা পথ হেঁটে এসেছেন। ঈষৎ হাঁপাতে হাঁপাতে বললেন- আমার একটি কফিন প্রয়োজন। তবে কফিনটি তৈরি করতে হবে ইয়ুবৃক্ষের কাঠ দিয়ে। মারিও বিস্ফারিত নেত্রে বললেন- ইয়ুকাঠ? সে তো বেশ খরচার জিনিস। ইয়ুকাঠের কফিন বানাতে কিন্তু দাম পড়বে অনেক। কম করে হলেও দু’হাজার ইউরো। মারিও লোকটির দিকে তাকিয়ে বললেন- হঠাৎ ইয়ুকাঠের কফিন চাচ্ছেন কেন? হাজার খানেক ইউরোর মধ্যেই তো ভাল কফিন পাচ্ছেন।
আগুন্তুক খদ্দের বললেন- আসলে হয়েছে কি জানেন, আমার বাবা হচ্ছেন একটি চার্চের পাদ্রি। অশীতিপর বৃদ্ধ মানুষ। তার জীবনের শেষ ইচ্ছা তাকে যেন ইয়ুকাঠের কফিনে সমাহিত করা হয়। আপনি তো নিশ্চয়ই জানেন ক্রিশ্চিয়ান ধর্মে ইয়ুকাঠ কতটা পবিত্র। মারিও নির্লিপ্ত ভাবে বললেন- সে তো জানি কিন্তু প্রথমতো ইয়ুকাঠ জোগাড় করা খুব কষ্টসাধ্য হবে এ মুহুর্তে। আর দ্বিতীয়ত, দেখছেন তো চারদিকে কি অবস্থা! আমরা গড়ে দেড়-দু’শ কফিন সরবরাহ করতেই হিমসিম খাচ্ছি। আপনার চাহিদা মাফিক এ ধরনের কফিন তৈরি করা তো সময় সাপেক্ষ ব্যাপার। আগুন্তুক ক্রেতা বললেন- সে আপনি সময় নিন না দু’এক সপ্তাহ। কিন্তু কফিনটার দাম কিন্তু আমার কাছে একটু বেশি মনে হচ্ছে। মাস চারেক আগে আমি অন্য আরেকটি দোকানে খোঁজখবর নিয়েছিলাম। ওরা আমাকে ধারণা দিয়েছিলো যে পনের’শ ইউরোর মতো দাম পড়বে কফিনটার। মারিও বললেন- সে আপনি ঠিকই বলেছেন। চারমাস পূর্বে আমিও হয়তো আপনাকে ওই মূল্যেই দিতে পারতাম। কিন্তু আপনারও তো নিশ্চয়ই জানা আছে দু’মাস আগে সপ্তাহব্যাপী ১৮০ কিলোমিটার বেগে ঝড়বৃষ্টিতে এক কোটি চল্লিশ লক্ষ গাছ ধ্বংস হয়ে গেছে। উত্তরাঞ্চলীয় এলাকার এনটিনো, ভেনেতো ও লোম্বার্দিয়া এলাকাগুলো সবচেয়ে বেশি ক্ষতিগ্রস্থ হয়েছে এই ঝড়ে। ঝড়ে আল্পস এলাকায় পাইন, রেড সপ্রুস ওক, ইয়ু প্রভৃতি বৃক্ষগুলো দেশলাইয়ের কাঠির মতো সারি ধরে ভেঙ্গে পড়েছে। সেজন্য এখন কাঠের ভিষণ প্রাদুর্ভাব।

টাকা-পয়সার ঘাটতি থাকলে আপনি অন্য একটি কাজও কিন্তু করতে পারেন। সাধারণ কফিনের ভেতর ইয়ুগাছের ডালপালা ভরে দিয়েও তাকে সমাধিস্থ করা যেতে পারে। ধর্মীয় দৃষ্টিকোণ থেকে ফজিলত কিন্তু সেই একই। আমি অনেককেই দেখেছি এমন করতে।
খদ্দের মাথা নেড়ে বললেন- আমার বাবা আমাকে লালন-পালন করেছেন। আমাকে মানুষের মতো মানুষ হিসেবে তৈরি করেছেন। আমি যে করেই হোক বাবার শেষ ইচ্ছেটুকু পূরণ করতে চাই। হোক দাম দু’হাজার ইউরো। আপনি কবে নাগাদ ডেলিভারি দিতে পারবেন সেটা বলুন? মারিও বললেন- আচ্ছা তাহলে এক হাজার ইউরো এডভান্স করে যান, বাকিটা ডেলিভারির সময় দেবেন। সময় লাগবে কিন্তু কুড়িদিনের মতো।
আগুন্তুক পকেট থেকে টাকা বের করে মারিওর হাতে তুলে দিয়ে বললেন- কফিনের ভেতরের বিছানা যেন নরম ও আরামদায়ক হয়। আর ভেতরের কাপড়টা হওয়া চাই কিন্তু টার্কিস সিল্ক।
ডাক্তার আদ্রিয়ানাকে উদ্দেশ্য করে বললেন- আশ্চর্য! এমন ভঙ্গুর দেহেও এমন দুর্দমনীয় প্রাণশক্তি। বিছানায় শুয়ে শুয়েও মারিও নাকি বারবার স্বগোক্তি করছিলেন- আমাকে বাঁচতে হবে। যে করেই হোক আমাকে আমার মেয়ের জন্য হলেও বাঁচতে হবে।

মারিও টাকা গুনতে গুনতে বললেন- সে আপনি ভাববেন না। সবকিছু আপনার রুচি ও পছন্দ মাফিক-ই হবে। খদ্দের মারিওকে সবকিছু বুঝিয়ে দিয়ে প্রস্থান করতেই মার্কো ছেলেটা মারিওকে বলল- আচ্ছা মারিও, ইয়ুকাঠের মাহাত্মটাতো বুঝলাম না। মার্কোর কাঁচাবয়স বলেই হয়তো সবকিছুতে তার আগ্রহ প্রবল। মারিও বললেন- দেখ বাছা, সারা বছর ধরে সবুজ থাকে এমন একটি দেবদারু জাতের গাছ হচ্ছে এই ইয়ু। যেটি হাজার বছর ধরে বেঁচে থাকতে পারে। অনেকেই এই গাছটিতে পুনর্জন্ম এবং অনন্ত জীবনের প্রতিচ্ছবি হিসাবে দেখেন। এর কারণ, এই গাছের ভেঙ্গে বা বিচ্ছিন্ন হয়ে পড়া ডালপালা থেকে নতুন গাছের জন্ম হতে পারে। এমনকি পুরনো গাছের গুড়ির ভেতর থেকেও নতুন একটি ইয়ু গাছের জন্ম হতে পারে। তাই অনেকে একে পুনর্জন্মের উদাহরণ হিসাবেও মনে করেন। খৃষ্টান ধর্মাবলম্বীদের কাছে ইয়ু একটি প্রতীকী গাছ মারা যাওয়া স্বজনদের ইয়ুকাঠের কফিনে সমাহিত করা হয় কিংবা ইয়ু গাছের অঙ্কুর দেয়া হয় কফিনের ভেতর। অনেক চার্চের পাশে এই গাছটি দেখা যায়। তবে খৃষ্টান ধর্মেরও বহুপূর্ব থেকে অনেক আদিবাসী গোষ্ঠী এই গাছটিকে পূজা করে আসছে। তারা তাদের প্রার্থনার স্থান নির্বাচন করতো ইয়ু গাছের নিচে। মার্কোকে উদ্দেশ্য করে মারিও বললেন- এবার বুঝেছ বৎস ইয়ুকাঠের মাহাত্ম। মার্কো মাথা নেড়ে বলল- হুম, বুঝেছি।

আদ্রিয়ানার দিকে তাকিয়ে মারিও বললেন- তোকে আমার মনের একটা কথা বলি আদ্রিয়ানা। ঈশ্বর যদি আমাকে অনেক ধনি করতেন তবে আমি আমার মরদেহকে কবর দিতে দিতাম না। লেলিন, মাওসেতুং ও হো চে মিনদের মরদেহ যেভাবে সংরক্ষিত করা হয়েছে আমার দেহটিকেও সেভাবে সংরক্ষিত করতাম। আদ্রিয়ান ভ্রু কুচকে বলল- ওঁদের মরদেহ কিভাবে সংরক্ষণ করা হয়েছে বাবা? মারিও বললেন- তোরা এতো এতো লেখাপড়া করেছিস আর এসব তথ্য তোদের কাছে নেই? ওঁদের মরদেহগুলোকে মমি করে রাখা হয়েছে গ্লাসের কফিনে। লেলিনেরটা আছে মস্কোর রেড স্কয়ারে, মাওসেতুংএর টা চিনের তিয়েনমেন স্কয়ারে। আর হো চে মিনেরটা ভিয়েতনামের রাজধানী হ্যনয়ের হো চে মিন জাদুঘরে। প্রতিবছর হাজার হাজার অনুসারি তাদের এই মহান নেতাদের দেখে অনুপ্রাণিত হয়। আদ্রিয়ানা বলল- কিন্তু বাবা, তুমি তো আর নেতা কিংবা বড় কোন কেউকেটা নও যে তোমায় মমিকরা গ্লাসের কফিন মানুষ লাইন ধরে দেখবে। মারিও সকৌতুকে বলল- কি বলিস? আমি সাধারণ আমজনতা বলেই তো সাধারণ মানুষ আসবে আমাকে দেখতে। বলবে এই দেখ, একজন সাধারণ মানুষ যাকে মমি করে রাখা হয়েছে সুদৃশ্য কাঁচের কফিনে।
গল্পগুজব চলছিলো ভালই কিন্তু কিছুসময়ের মধ্যে হাসপাতাল কর্তৃপক্ষের বড় একটি ট্রাক দোকানের সামনে এসে হাজির। মারিও শশব্যস্ত হয়ে বললেন- ওরে আন্দ্রেয়া, মার্কো, পিয়েরো তোরা সবাই মিলে কফিনগুলো সব ট্রাকে তুলে দে। আর মার্কো তুই যা মালগুলোর সঙ্গে। আমার শরীরটাও বেশি ভাল নেই, জ্বর জ্বর লাগছে। বাড়িতে গিয়ে বিশ্রাম নিতে হবে।


পাঁচ.
সকালের টুকিটাকি কাজকর্ম সেরে চায়ের পেয়ালা হাতে দরজার সামনে পড়ে থাকা পত্রিকাটি হাতে তুলে নেয় আদ্রিয়ানা। পত্রিকার পাতা উল্টাতে গিয়ে তার চোখ পড়ে লাল অক্ষরে লেখা বড় হেডিংটার উপর- ‘করোনায় মৃতের সংখ্যা বিশ হাজার’। অস্ফুট কণ্ঠে আদ্রিয়ানা বলে ওঠে- হায় ঈশ্বর! কি যে হবে। দেশের মানুষগুলো কি সবই মারা যাবে করোনায়। ওদিকে বেলা হয়ে যাচ্ছে অনেক কিন্তু বাবার কোন সাড়াশব্দ পাওয়া যাচ্ছে না। ভেজানো দরজাটা ঈষৎ ঠেলে ঘরে প্রবেশ করে আদ্রিয়ানা। দু’দিন ধরে মারিও জ্বরে আক্রান্ত। এরই মধ্যে একেবারে শয্যালগ্ন হয়ে পড়েছে বেচারা।

বিছানায় বসে কপালে হাত দিতেই চমকে ওঠে আদ্রিয়ানা। গরমে গা পুড়ে যাচ্ছে। শরীরে খৈ ফোটার মতো জ্বর। আদ্রিয়ানা বলল- বাবা তোমার তো ভীষণ জ্বর। মারিও গুংরানির মতো শব্দ করে বললেন- জ্বর, সে তো আছেই। মাঝরাত থেকে প্রচন্ড গলাব্যথা। একবার ভাবলাম তোকে ডেকে তুলি। আবার মনে হলো তোকে ডেকেই বা কি লাভ। সকাল থেকে শ্বাস নিতেও বেশ কষ্ট হচ্ছে। আদ্রিয়ানা বলল- বাবা শোন, আর দেরি করা চলে না। তোমাকে এখনই হাসপাতালে ভর্তি করতে হবে। আদ্রিয়ানা দ্রুত কল করে একটি এ্যাম্বুলেন্স ডাকলেন। তারপর চটপট রেডি হয়ে দু’চারটি আনুষাঙ্গিক জিনিসপত্র ব্যাগে গুজে মারিওকে নিয়ে ছুটলেন হাসপাতালে।

মনে মনে যা ভেবেছিলো আদ্রিয়ানা, হয়েছে আসলে সেটাই। ডাক্তার রক্ত ও সিরাম পরিক্ষা করে জানালেন মারিও করোনায় আক্রান্ত। আদ্রিয়ানার মাথায় যেন আকাশ ভেঙ্গে পড়ল। ছোটবেলায় সে মাকে হারিয়েছে, এখন যদি…। তবে তো দুনিয়াতে আপন বলে তার আর কেউ রইবে না। খবর পেয়ে লুকা ছুটে এলো দ্রুত। লুকা আদ্রিয়ানাকে সান্তনা দিয়ে বলল- ভয়ের কিছু নেই। মাত্র দশ শতাংশ মানুষই মারা যায় এ রোগে। বাকি লোকজন সব সুস্থ হয়ে ঘরে ফেরে। চিন্তার কিছু নেই। ভালো করে চিকিৎসাপত্র করলে সম্পূর্ণ সুস্থ হয়ে ঘরে ফিরবে মারিও। আদ্রিয়ানা ফুপিয়ে কাঁদতে কাঁদতে বলল- এমন এক রোগ হলো, যন্ত্রণাক্লিষ্ট বাবার পাশে বসে যে বাবাকে সেবা শশ্রুষা করে সারিয়ে তুলব সে সুযোগও সুদূর পরাহত।

একসপ্তাহ পার হয়ে গেল দেখতে দেখতে। অবস্থার উন্নতির কিংবা অবনতি কিছুই বোঝা যাচ্ছে না। মুর্তিমতী শোকের মতো কাঁচের দেয়ালের এক পাশে দাঁড়িয়ে অপলক চোখে বাবার মুখের দিকে তাকিয়ে থাকে আদ্রিয়ানা। শৈশব থেকে স্নেহ ভালোবাসা থেকে বঞ্চিত এই মানুষটি মৃত্যুর পূর্বমুহুর্তে মেয়ের শোকাচ্ছন্ন মুর্তি দেখে কি একটু হলেও শান্তি পাচ্ছেন? কে জানে।

ডাক্তার আদ্রিয়ানাকে উদ্দেশ্য করে বললেন- আশ্চর্য! এমন ভঙ্গুর দেহেও এমন দুর্দমনীয় প্রাণশক্তি। বিছানায় শুয়ে শুয়েও মারিও নাকি বারবার স্বগোক্তি করছিলেন- আমাকে বাঁচতে হবে। যে করেই হোক আমাকে আমার মেয়ের জন্য হলেও বাঁচতে হবে।
কিন্তু শেষ রক্ষা হলো না। যমে-মানুষে টানাটানি চলল আরো চার দিন। ভেন্টিলেটর দিয়েও বাঁচানো গেলনা। সমস্ত প্রাণশক্তি নিঃশেষ করে মৃত্যুর মুখে ঢলে পড়লেন মারিও।

আদ্রিয়ানা পিয়োরোকে সঙ্গে নিয়ে এলেন কফিনের দোকানে। ওয়্যারহাউজে যে কফিনগুলো তৈরি আছে, সেখান থেকেই যে কোন একটা কফিন দ্রুত নিয়ে ফিরে যেতে হবে হাসপাতালে। তারপর মর্গ থেকে শবদেহটা তুলে সমাহিত করা হবে ক্রেমা গোরস্থানে। ডজন দু’য়েক কফিন বিক্ষিপ্ত ভাবে ছড়িয়েছিটিয়ে আছে মালগুদাম ঘরটায়। হঠাৎ একটি কফিনে চোখ আটকে গেল আদ্রিয়ানার। মেহগণি কাঠের বাদামি কফিন। চকচকে তকতকে। সুন্দর করে পলিশ করা। আরেকটু কাছে যেতেই চমকে উঠলেন আদ্রিয়ানা। দেখা গেল কফিনটার সমস্ত শরীর জুড়ে করোনা ভাইরাসটি কদম ফুলের মতো খোদাই করে ক্রাফ্ট করা। দেখে মনে হচ্ছে যেন কোন জাত শিল্পী কফিনের প্রতিটি জায়গায় নৈপুণ্যময় হাতে নকশা কেটেছেন করোনা ভাইরাসের। আশ্চর্য! এই কফিন তো আগে চোখে পড়েনি আদ্রিয়ানার। চোখ দুটো কপালে তুলে পিয়েরো বলল- কই আমিও তো দেখিনি এটা আগে। তন্ন তন্ন করে রেজিষ্ট্রার বই খুঁজেও পাওয়া গেল না এর ফরমাস দাতাকে। তবে কে অর্ডার করেছে এমন একটি কফিন। তাহলে কি বাবাই…। আদ্রিয়ানা ও পিয়েরো দু’জনেই বিস্ময়ে বিহ্বল হয়ে তাকিয়ে রইল অদ্ভুত এই কফিনটার দিকে।




আপনার মূল্যবান মতামত দিন:


Top