সিডনী বুধবার, ২৭শে মে ২০২০, ১৪ই জ্যৈষ্ঠ ১৪২৭

অচিন ভূবন : শাহান আরা জাকির পারুল 


প্রকাশিত:
২০ মে ২০২০ ১৩:৩৩

আপডেট:
২০ মে ২০২০ ১৫:০০

 

ভ্যান চালক হাসন আলী মেয়ে জরিনা কে অভাবের সংসারেও বেশ ভালো খরচা পাতি করে ভালো ঘরেই বিয়ে দিয়েছিলো !
পুলা রমজান ঢাকায় গার্মেন্টস এ ভালো বেতন এ চাকরি করে !
বিয়ে করেই জরিনাকে ঢাকায় নিয়ে আসে রমজান!
ক'মাসের মধ্যেই জরিনা ভাড়া বাসার কাছাকাছি একটা হাসপাতালে আয়ার চাকুরী পায়!
খুব সংসারী মেয়ে জরিনা! কিছু টাকা পয়সা জমিয়ে বাচ্চা নেবে সিদ্ধান্ত নেয় তারা!
বছরখানেক পরে জরিনার কোল জুড়ে ফুট্ফুটে একটা ছেলে হলো!
তাদের আনন্দের সীমা নেই !
জরিনা মাকে নিয়ে এলো কিছুদিন এর জন্য, বাচ্চাকে দেখা শোনা করার জন্য!
দুজনের আয় রোজগারে ভালোই দিন কাটছিলো তাদের !
হঠাত্‌ পৃথিবীতে করোনা ভাইরাস এর আক্রমণে সবকিছু ওলোটপালোট হয়ে গেল তাদের!
প্রতিদিন করোনা রুগি আসতে থাকে হাসপাতালে!জরিনার বাসায় ফিরতে রাত হয়!
বাড়িওয়ালা বাধ সাধে! এতো রাতে বাসায় ফেরা যাবেনা এবং হাসপাতালের চাকরি ছাড়তে হবে ! কড়া নোটিস জারি করলো বাড়িওয়ালা !
এই দুঃসময়ে চাকরি ছাড়লে খাবে কি ? দুধের শিশুটার দুধের টাকা জরিনাই দেয় !
দুজনের সামান্য বেতনে খেয়ে পড়ে আর কিইবা থাকে ! ইতিমধ্যে কাছাকাছি, একজন করোনা রুগীর খবর পাওয়া গেলো!
বাড়িওয়ালার পুরো পরিবার যেন ক্রোধে ফেটে পড়বে আজ! কিভাবে জরিনা আজ বাসায় ঢোকে, দেখে নেবে!
চলতে থাকে তাদের প্রস্তুতি!
ঘটলোও তাই !
আজ একটু বেশি রাতই হবে জরিনার বাসায় ফিরতে !
হাসপাতালে করোনা রুগীও
দিন দিন বেড়েই যাচ্ছে ! জরিনার দায়িত্ব তাই বেড়ে গিয়ে বাসায় ফিরতে ঠিকই অনেক রাত হয় !
দুধের শিশু ! মনটা পড়ে থাকে বাচ্চাটার কাছেই !

অবশেষে যা হওয়ার তাই ঘটলো! জরিনা বাড়ি ফিরলো রাত ১২টার দিকে,গায়ে প্রচন্ড জ্বর নিয়ে! 
বুঝতে পারছিলো ভালো করেই , মরণব্যাধি করোনা’র রুগীদের সেবা করতে করতে করোনা এখন বিগড়ে গিয়ে তাকে আক্রমণ করেছে ভালোমতোই!
নিরিবিলি রাস্তায় হেঁটে হেঁটেই বাসায় ফেরে জরিনা!বাড়িওয়ালা বিশাল ফ্ল্যাটের একসাইড এ বেশ কটা টিনসেড এর খুপরি ঘর তুলে ভাড়া দিয়েছে! তারই একটা ঘরে ভাড়া থাকে জরিনার পরিবার!
খুব লোভী স্বভাবের এই মানুষটা বিগড়ে গেলে আর মানুষ থাকেনা !
কি যে আছে আইজ কপালে !
জ্বরে কুঁকড়ে নানান কথা ভাবতে ভাবতে গেট এর কড়া নাড়ে জরিনা! আজ গেট ও খোলা নাই !
করা নাড়ার শব্দ শুনেই বাড়িওয়ালা দলবল নিয়ে গর্জন করে ওঠে ---- হেই বেডি আমার বাড়িতে তুমি আর আইজ থেইকা ঢুকতে পাইরবানা! বহুতবার তুমারে ওয়ার্নিং দিতাছি,কানেই লওনা!
রাগে ফুঁসতে থাকে বাড়িওয়ালা!ঘরে বাচ্চাটা মায়ের বুকের দুধ খাবার জন্য কান্না শোনা যাচ্ছে!
চিৎকার ,চেঁচামেচি শুনে রমজান ও জরিনার মা বাচ্চাটারে কোলে নিয়ে দৌড়ে বের হয় !
মারমূখী বাড়িওয়ালার দলবল দেখে ভয় পায় রমজান ও জরিনার মা!
কোন প্রতিবাদ করার সাহস পায়না তারা!
অসহায়ভাবে বোবার মত দাঁড়িয়ে থাকে তারা দূরে!
জ্বরে কাঁপতে কাঁপতে জরিনা বাড়িওয়ালার পা দুটি চেপে ধরে !
-- সব্বোনাশ,একি!তোরতো দেহি শরিল এ বহুত জ্বর?
যা ভাবছিল্যাম ۔۔۔۔۔۔
টান মেরে পা সড়িয়ে নিয়ে খেমচি মারতে থাকে বাড়িওয়ালা!
---- কি কইলা,ওর গায়ে জ্বর ?অইছে কাম তাইলেতো হ্যার করনায় ধরছে!ওরে বাহির কইরা দ্যাও এক্ষুনি!আমাগো সবাইরে মারবো এই রাক্ষুইস্যা বেডি!
বাড়িওয়ালি চিৎকার করতে থাকে !
মুহূর্তে খুপরির অন্যান্য ভাড়াটিয়ারা ছুটে এসে সবকিছু শুনে জরিনাকে তাড়ানোর জন্য এক হয়ে গেল!
চারপাঁচজন বখাটে ছেলে তাড়িয়ে বের করে নিয়ে গেল জরিনাকে!
দূরে বাচ্চা কোলে নিয়ে রমজান ও জরিনার মা ফ্যালফ্যাল করে অসহায়ভাবে দাঁড়িয়ে নিস্পলক দেখে গেল সব !
অনেক কাকুতিমিনতি করেও কিছুই করতে পারলোনা তারা !দুধের শিশু বাচ্চাটি মায়ের কোলে যাবার জন্য ব্যাকুল হয়ে কান্না করতে থাকে!
জরিনা দুহাত বাড়িয়ে আকাশ পাতাল ফাটিয়ে আর্তনাদ করে আহাজারি করতে থাকে !
মন গলেনা কারো!
বদমাইশরা অনেক দূরে অচেনা এক গ্রামের মাঠে টংমতো একটা খালি খুপরিতে রেখে আসে জরিনাকে!
সারারাত অন্ধকারে এক ভৌতিক পরিবেশের সৃষ্টি হয় ! ভয়ে কাঁপতে থাকে জরিনা !জ্বর আরো বেড়ে যায় !
মেঘ গর্জন করে বিদ্যুৎ চমকায়!মুষলধারে বৃষ্টি নামে !
একসময় জরিনা জ্ঞান হারায়!
পরদিন গোপনে জরিনার কর্মস্থলে খবর দেয় রমজান!সঙ্গে সঙ্গে পুলিশবাহিনী ছোটে জরিনাকে উদ্ধার করতে!
পুলিশ জরিনাকে উদ্ধার করে ঠিকই!
কিন্তু ততক্ষনে হতভাগী জরিনা এই কঠিন পৃথিবীর কঠিন মানুষের কাছ থেকে ধরাছোয়ার বাইরে বহুদূরে চলে গেছে!
যাবার আগে একটি অজ পাড়া গাঁয়ের সপ্নীল মেয়ে জরিনা এই পৃথিবীতে দেখে যায় ,যার যার জীবন বাঁচাতে
মানুষ কত নৃশংস ও নিষ্ঠুর হতে পারে!

 

শাহান আরা জাকির পারুল 
নাট্যকার, লেখক ও গবেষক

 

এই লেখকের অন্যান্য লেখা



আপনার মূল্যবান মতামত দিন:


Top