সিডনী রবিবার, ৯ই আগস্ট ২০২০, ২৫শে শ্রাবণ ১৪২৭

বিদায় সম্ভাষণ (রম্য গল্প) : সত্যজিৎ বিশ্বাস


প্রকাশিত:
২৯ জুলাই ২০২০ ১৫:৫৩

আপডেট:
৫ আগস্ট ২০২০ ১৭:১৮

ছবিঃ সত্যাজিৎ বিশ্বাস



সকাল সাত ঘটিকায় বাস ছাড়িবে। শ্বাশুড়ি বাড়ি যাইবে। শ্বাশুড়িকে সময়মতো বাস ধরাইয়া দিবার টেনশনে এই কনকনে শীতের রাত্রিতেও ইন্দ্রজিত ঘামিতে লাগিল। অতঃপর ভোর সাড়ে পাঁচটা বাজিতে না বাজিতেই লাফ দিয়া উঠিয়া ঈষৎ নাসিকা গর্জন করিতে থাকা শ্বাশুড়িকে ধাক্কাইতে শুরু করিল। অন্ধকারে আচমকা ধাক্কা খাইয়া শ্বাশুড়ি কে, কে বলিয়া ধরমর করিয়া উঠিয়া বসিল।

ইন্দ্রজিতের বধূ ঘুম ভাঙ্গিয়া এ দৃশ্য দেখিয়া হতবাক। প্রিয় জননী গতকল্যই আসিয়াছে জামাই বাড়ি। জামাই যখন কুশলাদি বিনিময়ের এক পর্যায়ে প্রশ্ন করিল, কতদিন থাকিবেন মা? ভদ্রতার খাতিরে শ্বাশুড়ি শুধু জামাইকে কহিয়াছিল, বাড়িতে তো অনেক কাজ ফেলিয়া আসিয়াছি, আগামীকল্য প্রত্যুষেই গেলেই ভাল হয়। অতঃপর কথা অন্যদিকে প্রবাহিত হওয়াতে এই কথা লইয়া আর কথা চালাচালি হয় নাই।

নেত্র ডলিতে ডলিতে কর্তব্য পরায়ন জামাইয়ের ডাকাডাকির এই দৃশ্য অবলোকন করিয়া ইন্দ্রজিতের বউ কিংকর্তব্যবিমুঢ় হইয়া গেল।

পরিস্থিতি সামাল দিতে ইন্দ্রজিতের শ্বাশুড়িমাতা শীতে কাঁপিতে কাঁপিতে লেপের ওম ছাড়িয়া বিছানা হইতে নামে। দাঁতে দাঁতে বাড়ি খাইতে খাইতে জামাইকে শুধায়, বাবা এত ভোরে যাইব কীসে? কর্তব্য পরায়ণ জামাই গর্বের হাসি হাসিয়া কহে, ও নিয়ে আপনাকে ভাবিতে হইবে না। প্রযুক্তি এখন ঢের আগাইয়া গিয়াছে। এপস দিয়া উবার কল করিতেছি। সময়মত বাসে তুলিয়া দিবার পুরো দায়িত্ব আমার হাতে ছাড়িয়া দিন।

শ্বাশুড়ি মাতা ‘ঠিক আছে বাবা’ বলিয়া হাতমুখে ঠান্ডা জলের ঝাপটা দিয়া কাঁপিতে কাঁপিতে ডাইনিং টেবিলে আসিয়া বসে। ততক্ষণে ইন্দ্রজিতের বধূ এক পেয়ালা চা বানাইয়া মায়ের হাতে তুলিয়া দেয়। মেয়ের বানানো চায়ের কাপে চুমুক দিবার বাসনায় কাপখানা মুখের সন্নিকটে আনিবা মাত্রই ইন্দ্রজিত হন্তদন্ত হইয়া ছুটিয়া আসিয়া কহে, ‘এ কী, আপনি এই ক্ষণে চা নিয়া বসিয়াছেন? উবার কোম্পানীর বাহন তো চলিয়া আসিয়াছে। এখন চলুন তো, এদিকে যে বাস মিস হইয়া যায়। শ্বাশুড়ি লজ্জায় চায়ের কাপখানা নামাইয়া রাখিয়া কহে, চলো বাবা।

শ্বাশুড়ির ঢাউস ব্যাগখানা স্কন্ধে লইয়া চারতালা হইতে বাসার নীচে নামিয়া ইন্দ্রজিত অবাক হয়। অনতিদূরে রাস্তার ওপারে একখানা মোটরসাইকেল দাঁড়াইয়া রহিয়াছে, কোনো গাড়ি তো দেখা যায় না!

করিৎকর্মা ইন্দ্রজিত তড়িৎ গতিতে উবার চালককে ফোন দেয়। উবার চালক ফোন ধরিয়া কহে, আমি তো আপনার বাসার সামনেই দাঁড়াইয়া আছি। ইন্দ্রজিত হতভম্ব হইয়া জবাব দেয়, তাহইলে আমি কাহার বাসার সামনে দাঁড়াইয়া আছি?

উবার চালক এইবার তাহার পরনের পোশাকের বর্ননা দিতে লাগিল। ইন্দ্রজিত অবাক হইয়া লক্ষ্য করে, তাহার বর্ননার সহিত মোটর সাইকেলওয়ালার হুবুহু মিল। মোটর সাইকেলওয়ালাও তাহাকে দেখিয়া সম্মুখে আসিয়া জিজ্ঞাসা করিল, আপনাদের মধ্যে কে যাইবে? পাশ হইতে সে কথা শুনিয়া বউ আর শ্বাশুড়ি বিস্মিত দৃষ্টিতে একে অপরের পাণে তাকাইয়া রহিল।

উবার চালক – ইন্দ্রজিত - তাহার বউ - শ্বাশুড়ি সবার বিস্ময় কাঁটিতে বেশ কিছু দামি মূহুর্ত চলিয়া যাইবার পর খেয়াল হইল, আরে তাইতো, বাস তো সাতটায়। আর তো দেরি চলে না। কল্যাণপুর বাসস্ট্যান্ড হইতে তড়িঘড়ি করিয়া একখানা সিএনজি ভাড়া করিয়া ইন্দ্রজিত সিএনজি ড্রাইভারকে কলাবাগান বাসস্ট্যান্ডের উদ্দেশ্যে ছুটিতে নির্দেশ দেয়।

পরিবেশ অনুকূলে আনিতে ইন্দ্রজিত পাশে বসা দুই ভোতা মুখকে বোঝাইতে শুরু করিল, ‘কল দিলাম প্রাইভেট কারওয়ালাকে, সে আসিল মোটর সাইকেল লইয়া? কতদূর বেকুব চিন্তা করা যায়? ইহা অতি অবশ্যই কোম্পানীর এপস জনিত কারিগরি জটিলতা। প্রাইভেট কার ডাকিতে গিয়া মোটর সাইকেল ডাকিব, আমি কী এতবড় বেকুব? চিন্তা করো সেই বেয়াদপ আবার কহে, কে যাইবেন? আরে ব্যাটা ফাজিল, তুই কেমন করিয়া ভাবলি, আমার শ্বশুড়ি তোর পিছনে বসিয়া কোমর জড়াইয়া ধরিয়া রওনা দিবে?’
সম্মুখ হইতে সিএনজিওয়ালা মস্তক ঘুরাইয়া কহে, ভাই বাসস্ট্যান্ড আসিয়া পড়িয়াছি, কোনখানে নামিবেন?

ইন্দ্রজিত বিস্ফোরিত নয়নে সিএনজির শিকে চিবুক ঠেকাইয়া উঁকি দিয়া দেখে তাহারা গাবতলী আসিয়াছে। সিএনজিওয়ালা আবার শুধাইলো, আরো সামনে যাইব? কলাবাগান কী আরো সামনে?

সিএনজিওয়ালার বংশলতিকা লইয়া দুইখানা কুৎসিত গালি দেবার পর স্মরণ হইল, পাশে শুধু বউ না শ্বাশুড়িও তো উপস্থিত আছে। তৃতীয়, চতুর্থ গালি দ্বয় মনে মনে দিতে দিতে ইন্দ্রজিত ড্রাইভারকে পথ দেখাইতে শুরু করিল। ইচ্ছা হইতেছিল ব্যাটাকে বলিতে, ‘শহরের কিছুই যখন চিনিস না, তুই পিছনে বস, আমিই চালাই’।

কনকনে শীতে জ্যামবিহীন রাস্তা পাইয়া কলাবাগান বাসস্ট্যান্ডে যখন সিএনজি পৌঁছাইলো তখন ঘড়িতে ৬টা ৫৫মিনিট। সিএনজি ভাড়া মিটাইয়া দিতে দিতে ইন্দ্রজিত শ্বাশুড়িমাতাকে কহিল, আগামীবার যখন আসিবেন, এত স্বল্প সময় নিয়া আসিবেন না। অতি অবশ্যই কয়েকদিন বেড়াইবার সময় নিয়া আসিবেন।

শ্বাশুড়িমাতা সম্মতি জানাইয়া মাথা নাড়াইতে না নাড়াইতেই বাসও মাথা নাড়াইতে শুরু করিল।

পোঁ পোঁ শব্দ করিয়া বাস ছাড়িবার পর ইন্দ্রজিতের মনে হইল, আরে তাইতো, শ্বাশুড়ি মাতা কে তো বিদায় সম্ভাষণ জানানো হইল না। চলমান বাসের পিছন পিছন দৌড়াইতে দৌড়াইতে ইন্দ্রজিত চিৎকার করিয়া হাত নাড়াইতে নাড়াইতে কহিল, ‘টা, টা, আবার আসিবেন’।

শ্বাশুড়ি মাতাসহ বাসশুদ্ধ মানুষ জানালা দিয়া মুখ, হাত বাহির করিয়া জবাব দিল, ‘টা, টা’।

সত্যজিৎ বিশ্বাস
রম্য লেখক ও শিশু সাহিত্যিক
* রম্য বিভাগীয় সম্পাদক- কিশোর বাংলা
* নির্বাহী সম্পাদক- কিশোরকাল
* কন্ট্রিবিউটার – মাসিক স্যাটায়ার কার্টুন ম্যাগাজিন ‘উন্মাদ’, জাতীয় দৈনিক যুগান্তর ‘বিচ্ছু’, দৈনিক ইত্তেফাক ‘ঠাট্টা’।

 

এই লেখকের অন্যান্য লেখা



আপনার মূল্যবান মতামত দিন:


Top