সিডনী বুধবার, ১২ই আগস্ট ২০২০, ২৮শে শ্রাবণ ১৪২৭

নৃশংস পক্ষপাত : ব্যারিস্টার সাইফুর রহমান


প্রকাশিত:
২৯ জুলাই ২০২০ ১৫:৫৯

আপডেট:
১২ আগস্ট ২০২০ ০৪:২২

ছবিঃ সাইফুর রহমান

 

এ জগতে এমন অনেক ঘটনা ঘটে যা কল্পনার চেয়েও নৃশংস
সোনালী নকশা কাটা চা ভর্তি পোরসিলিনের সাদা পেয়ালাটির দিকে ঈষৎ আড় চোখে তাকিয়ে আলতো করে সেটি হাতে তুলে নেয় নুহের। চায়ের অগ্রভাগে জমে থাকা গাঢ় তামাটে রঙের সরটুকুর ওপর ফুঁ দিতে দিতে পত্রিকার প্রথম পাতায় চোখ বুলাতে গিয়ে হঠাৎ তার মনে হয়- সকালের প্রথম আলোয় দুধ সহযোগে বাদামি রঙের এ পানীয়টুকু পান না করে পত্রিকা পাঠ সত্যিই যেন অসম্ভব ও অসহনীয়। তপ্ত ধূমায়িত এ পানীয়টি যদিও তার জিহ্বাকে খানিকটা ঝলসে দেয় বটে তবুও এটুকু ক্লেশ নুহের অবলীলায় সহ্য করে নেয় এই শর্তে যে, সকাল সকাল এই অমৃতটুকুর স্বাদ থেকে নিজেকে বঞ্চিত করা চলে না কিছুতেই। সে জন্যই বোধ করি সাত সকালে এক কাপ উৎকৃষ্ট চায়ের জন্য তৃষ্ণার্ত পাখির মতো ছটফট করতে থাকে নুহেরের তৃষ্ণিত হৃদয়।
আজ অবশ্য বাইরে আলো নেই। বেশ খানিকটা অন্ধকার। বাড়ির পশ্চিমের ঝুল বারান্দায় বসে বাইরে ভালো করে উঁকি দিতেই নুহের লক্ষ্য করল- ছাই রঙের পুঞ্জ পুঞ্জ মেঘ ছেয়ে ফেলেছে সম্পূর্ণ আকাশটিকে। ঝিরঝিরে বৃষ্টি হচ্ছে। ভাবে মনে হয় যেন একটু পরেই তুমূল বারিধারা নামবে ধরণীতে। পেছন থেকে নুহেরের স্ত্রী সাবিতা খানিকটা উত্তাপ ও উৎকণ্ঠিত কণ্ঠে বলল- ওগো শুনছো। নুহের পত্রিকা থেকে চোখ না তুলেই বলল- হুম। বল কি বলবে।

- হুম কি গো। তাকাও আমার দিকে। ইম্পর্টেন্ট কথা আছে। নুহের পত্রিকার পাতা থেকে চোখ সরিয়ে তাকায় সাবিতার দিকে- বল এবার।

-আবারও সেই একই রকম কাণ্ড। আজ আবার দেখলাম তিতানের মাথা থেকে গোছা গোছা চুল কে যেন উপড়ে নিয়েছে। চুলের সঙ্গে মাথার চাদির চামড়াও উঠে এসেছে খানিক। বিচ্ছিরি অবস্থা। কি যে হচ্ছে এসব। বাড়িতে নির্ঘাত ভূত ঢুকেছে। মেয়েটা তো কিছুই বলছে না। কিছু জিজ্ঞেস করলে শুধু ফ্যাল ফ্যাল করে তাকিয়ে থাকে। কেউ একজন মাথার চুল টেনে তুলে নিয়ে যাচ্ছে অথচ কে তুলে নিচ্ছে সে খবর মেয়েটির নেই। রাগে গা জ্বালা করে। আজকাল সব মেয়েরাই তো একটু চালাক চতুর হয়, চটপটে ধরনের হয়। মানুষ এত নরম ও সোজাসাপটা হলে চলে কী করে। নুহের বলল- খোঁজ নিয়ে দেখ কাজের মেয়েটা কিছু জানে কিনা। কহিনূরকেও শাসালাম খানিক। কহিনূর কাঁদো কাঁদো কণ্ঠে বলল- ‘আমি আপনার মাইয়ার মাথার চুল উঠামু ক্যান। আপনার মাইয়ার মতো এমন লক্ষ্মী মাইয়া তো আল্লার জমিনে আমি দুইডা দেহি নাই’। কহিনূরের বয়স ষোল-সতের বছর। সে এ বাড়িতে কাজ করছে প্রায় বছর দুয়েকের ওপরে। সে নেহায়েত শিশু নয় যে, এতটুকু বাচ্চার মাথা থেকে চুল উপড়ে নেবে।

সাবিতা মনে মনে ভাবে তাহলে আর বাকি থাকল নেহাল। নেহালের বয়স প্রায় তিন বছর। ও তিতানের চেয়ে বছর দেড়েকের ছোট। নেহালটা হয়েছে ভয়ানক রকমের দুষ্ট ও পাজির পাজড়া। বোনটা ভাইয়ের চেয়ে বছর দেড়েকের বড় হলেও নেহাল-ই বোনটার ওপর চড়াও হয় সর্বত্র। এক সময় হয়তো দেখা যায় বোনের চুল ধরে দিচ্ছে বেজায় টান আবার একটু পরেই হয়তো ধারালো নখ দিয়ে দিচ্ছে শক্ত আঁচড়। তিতান এতটাই নিরিহ যে, নেহালের এহেন অত্যাচার-অনাচার অবলীলায় মুখ বুজে সহ্য করে। অত্যাচারের মাত্রা বেশি হলে শুধু চেঁচিয়ে কাঁদে। ওর অভিব্যক্তি শুধু এতটুকুই। তবুও তিতান নেহালের শরীরে এতটুকু স্পর্শ করে না কখনও। নেহালের এমন ডাকাবুকো ধরনের আচরণের পেছনে রয়েছে নুহের ও সাবিতার অবাধ আশ্রয়-প্রশ্রয়। তারা দুজনেই নেহালকে এতটাই ভালোবাসে যে, সব ব্যাপারেই যেন ওর সাত খুন মাফ। অন্যদিকে সন্তান হিসেবে তিতান যেন সাবিতা ও নুহেরের দৃষ্টির একেবারেই বাইরে। এমন বঞ্চিত ও অবহেলিত পোষ্য সমাজে দু-একটির বেশি দেখা যায় না আজকাল। অন্য সন্তানের প্রতি উপেক্ষা ও অবহেলা প্রায় প্রতিটি সংসারে কমবেশি দৃশ্যমান থাকলেও নুহের ও সাবিতার এমন পক্ষপাতদুষ্ট আচরণ যে কোনো সাধারণ মানুষের চোখ দুটিকেও কষ্ট দেয় যেন। হাল আমলের সব উৎকৃষ্ট খেলনাগুলো জোটে নেহালের ভাগ্যে। অন্যদিকে উচ্ছিষ্ট ও যেসব খেলনার প্রতি নেহাল বিতশ্রদ্ধ সেগুলোই শুধু পায় তিতান।

পত্রিকা পাঠ ও চা পর্ব শেষ হলে নুহের গিয়ে ঢুকে স্নান ঘরে। প্রাতঃকৃত্য, গোসল অতঃপর প্রাতরাশ শেষ করে অফিসের জন্য তৈরি হতে হয় তাকে। নুহের চাকরি করে একটি বহুজাতিক ফাইন্যান্সিয়াল কোম্পানিতে। সেখানে সে একজন ঊর্ধ্বতন কর্মকর্তা। ঘর থেকে বেরিয়ে যাওয়ার আগ মুহূর্ত ওক কাঠের মিশমিশে কালো রঙের আলমারির সঙ্গে আঁটানো প্রমাণ সাইজের আরশির সামনে দাঁড়িয়ে আরেকবার নিজের বেশ-ভূষা, পোশাক-পরিচ্ছদ খুঁটিয়ে খুঁটিয়ে দেখে নেয় নুহের। আলতো করে আঙুল দিয়ে সামনের অবিন্যস্ত চুলগুলো বিন্যস্ত করে নেয়। তারপর হাত দিয়ে সদ্য ক্লিনসেইভ করা গাল দুটি দু-একবার ঘষে- ভালো করে দেখার চেষ্টা করে, মুখে কি ক্রিম লেগে আছে এখনও? না নেই। মনে মনেই আওড়ায় নুহের। স্যুট টাইয়ে নুহেরকে দারুণ মানায়। বিশেষ করে স্লিম ল্যাপেল স্যুটগুলোতে। তবে স্লিম ল্যাপেল স্যুটগুলোতে কিছু সমস্যাও আছে। কোটের কলারের ভাঁজ করা সরু অংশটুকুতে সাধারণত গোলাপ ফুল কিংবা এ জাতীয় কোটপিনগুলো বেশ খানিকটা বেমানান দেখায়। নুহের মনে মনে ভাবে কোটপিন আপাতত বাদ থাক। কোটের পকেটে শার্টের সঙ্গে ম্যাচ করে আপাতত গাঢ় লাল রঙের শুধু একটি রুমাল গুঁজে নিলেই হয়। শুধু স্যুট-টাই হবে কেন যে কোনো পোশাকেই মানায় তাকে। নুহের সুপুরুষ। দীর্ঘদেহী। এতটুকু মেদ নেই শরীরে। গায়ের রং উজ্জ্বল শ্যামবর্ণ। নিজেকে বারবার আয়নায় দেখে আত্মশ্লাঘায় মনটা ভরে ওঠে তার। ঠিক তখনই পাশে এসে দাঁড়ায় সাবিতা। নুহেরকে উদ্দেশ করে বলে- ওগো শুনছ- নেহাল যে তিতানের মাথা থেকে সব চুল টেনে তুলছে এ ব্যাপারে কি করা যায় বল তো। বাচ্চা দুটিকে একটা কিছু ডাক্তার-টাক্তার দেখানো দরকার। নাকি। নুহের কপাল কুঁচকে বলল- সে তো বুঝলাম। কিন্তু কোন ডাক্তারের পরামর্শ যে নেয়া যায় মনে মনে সেটাই ভাবছি। যা হোক অফিসে গিয়ে একটু এদিক ওদিক খোঁজখবর করে দেখি কোন উপায়ান্ত করা যায় কিনা। হাতঘড়ির দিকে তাকিয়ে আঁতকে ওঠে নুহের। এই রে সেরেছে। দেরি হয়ে যাচ্ছে অনেক। আমি চললাম বলেই দ্রুতপদে ঘর থেকে বেরিয়ে যায় নুহের।

রাত আটটা বাজার আগেভাগেই হাতের সব কাজকর্ম গুছিয়ে-গাছিয়ে সাবিতা সাধারণত বসে টেলিভিশন সেটের সামনে। সন্ধ্যাবেলার এ সময়টুকু শুধু তার নিজস্ব। এখানে কারো প্রবেশাধিকার নেই। স্টার জলসায় ‘কিরণমালা’ শুরু হলে স্বয়ং ফেরেশতা আজরাইলও বোধকরি সাবিতার জান কবজ করতে দ্বিধাবোধ করবে। সাবিতা আজরাইলকে দেখে হয়তো বলবে- ‘জান কবজ করতে আসছেন ভালো কথা, অসুবিধা নাই কিন্তু আগে কিরণমালাটা শেষ হোক তারপর’। কিরণমালা শুরু হওয়ার দু-এক মিনিটের মধ্যে সাবিতার ফোনটা বেজে উঠল মৃদু আওয়াজে। এ সময় সাবিতা সাধারণত তার মোবাইল ফোনটি বন্ধই রাখে। কিন্তু আজ মনের ভুলে ওটা বন্ধ করা হয়নি। ফোন করেছে নুহের তাই শত অনিচ্ছা সত্ত্বেও কলটি রিসিভ করতেই হল তাকে। সাবিতা বিরক্তি কণ্ঠে বলল- হ্যালো, কি হয়েছে বল। নুহের অপর প্রান্ত থেকে বলল- শোন, একজন ভালো ডাক্তারের সন্ধান পেয়েছি। শহরের নামকরা চাইল্ড স্পেশালিস্ট। সাবিতার বিরক্তি সপ্তমে উঠল- হ্যালো, আরে ফোন রাখ এখন। টিভিতে আমি কিরণমালা দেখছি। এখন কথা বলতে পারব না। বাসায় এসো তারপর সব শুনব। ফোনটা কেটে দিল সাবিতা। রাতে বিছানায় শুতে যাওয়ার আগে ড্রেসিং টেবিলের আয়নার সামনে চুল আঁচড়াতে আঁচড়াতে সাবিতা নুহেরকে জিজ্ঞেস করল- ওগো ফোনে তখন কি যেন কোন ডাক্তারের কথা বলছিলে। তা সে ডাক্তারের নাম কি। চেম্বার কোথায়। ডাক্তারের কথা বলব বলেই তো তোমাকে ফোন করেছিলাম। তুমি তো শুনতেই চাইলে না। কথাগুলো অভিযোগের সুরে বলল নুহের। সাবিতা পড়ে আছে আসমানি রঙের জমিনের ওপর হলুদ সূর্য্যমুখী ফুল আঁকা একটি নাইটি। বড় বড় হলুদ সূর্য্যমুখী ফুলগুলোর দিকে তাকিয়ে নুহের বলল- ওনার নাম ডা. কুদরত-ই-খুদা। ইনি দেশের একজন প্রথিতযশা চাইল্ড স্পেশালিস্ট। চেম্বার এলিফ্যান্ট রোডে। ফোন করে এপয়েন্টমেন্ট নিয়েছি। কালই দেখাতে হবে। তুমি বরং বাচ্চা দুটিকে নিয়ে পৌঁছে যেও চেম্বারে, কাগজে ঠিকানা লিখে দিচ্ছি। আমি অফিস থেকে সরাসরি পৌঁছে যাব ওখানে। সন্ধ্যার পরপরই সময় দিয়েছেন ডাক্তার সাহেব।

শেষ বিকালের ভয়ংকর রকমের লম্বা যানজট ঠেলে উত্তরা থেকে এলিফ্যান্ট রোড পৌঁছতে ঘণ্টা দুয়েক দেরি হল সাবিতাদের। নুহের আগেই এসে পৌঁছে গেছে সেখানে। ডাক্তার সাহেব পৌঢ় ও রাশভারী ধরনের মানুষ। মাথা ভর্তি চুল। সব চুলই সাদা ধবধবে। তিনি মনোযোগ দিয়ে সবকিছু ভালো করে ও খুঁটিয়ে খুঁটিয়ে শুনলেন। তারপর চশমাটি চোখ থেকে নামিয়ে হাতে নিয়ে চশমার গ্লাস দুটি টিস্যু পেপার দিয়ে পরিষ্কার করতে করতে বললেন- আপনারা যদি কিছু মনে না করেন তবে তিতানের সঙ্গে আমি একটু একান্তে কথা বলতে চাই। সাবিতা ও নুহের একসঙ্গে বলে উঠল অবশ্যই। তারপর ওরা দু’জন নেহালকে সঙ্গে নিয়ে বাইরে গিয়ে বসল। প্রায় মিনিট কুড়ি পর অপেক্ষার প্রহর শেষ হল। পিয়ন এসে বলে গেল ডাক্তার সাহেব এবার ওদের ভেতরে ডেকে পাঠিয়েছে। ডা. কুদরত-ই-খুদা তার ডাক্তারি যন্ত্রপাতিগুলো টেবিলের ওপর গোছাতে গোছাতে সাবিতা ও নুহেরের দিকে তাকিয়ে টেবিলের সামনের চেয়ারগুলোতে বসতে ইঙ্গিত করলেন। সেই সঙ্গে উপস্থিত নার্সটিকে অনুরোধ করলেন তিতান ও নেহালকে বাইরে নিয়ে যেতে। ডাক্তার ভদ্রলোকটি এবার নুহেরের দিকে তাকিয়ে বললেন- আপনার মনে হয় ছেলে সন্তান খুব পছন্দ, তাই না নুহের সাহেব। আপনার সব আদর আহহ্লাদ শুধু নেহালকে ঘিরেই। আমি ঠিক ধরেছি কিনা বলুন। কুদরত-ই-খুদা এবার সাবিতার দৃষ্টি অনুসরণ করে বললেন- আপনারও কিন্তু ঠিক একই অবস্থা। আপনার স্বামীর মতো এতটা না হলেও আপনারও ধ্যান-জ্ঞান ও সব ভালোবাসা আপনার ছেলেকে ঘিরে। আমি কি ভুল বললাম কিছু। নুহের ও সাবিতা দু’জনই নিশ্চুপ। নুহের একটু প্রতিবাদের মতো আমতা আমতা করে বলল- না মানে ইয়ে...। আরে থামুন সাহেব। একটি মেয়ে তার বাবা মার কাছ থেকে ভালোবাসা না পেয়ে পেয়ে রাগে, দুঃখে, ক্ষোভে ও অভিমানে নিজের মাথার চুল নিজে ওপরে নিচ্ছে। আর আপনি মানে মানে করছেন। কথাগুলো বেশ চড়া গলায় বললেন ডাক্তার। আপনার মেয়ে তিতানের একটি চুলও নেহাল তুলেনি। আপনাদের দু’জনের এমন নৃশংস পক্ষপাতদুষ্ট আচরণে মেয়েটি ক্ষোভে, অভিমানে সে তার নিজের চুল নিজেই টেনে তুলত। কিন্তু তার ভাইকে সে কখনও আঘাত করেনি। আপনাদের মতো শিক্ষিত মানুষের হৃদয়বৃত্তিগুলো যে এমন পক্ষপাতদুষ্ট হতে পারে সেটা আমার চিন্তারও বাইরে।

আপনাদের মতো মানুষদের কি করা উচিত জানেন- গলায় দড়ি নিয়ে ঝুলে পড়া উচিত। কারণ আপনারা শিক্ষিত সমাজের কলংক। বিদেশ থেকে ডিগ্রি নিয়েছেন। ভালো কোম্পানিতে চাকরি করছেন। পোশাক-আশাকেও কেতাদুরস্তভাব। কিন্তু ধ্যানধারণা পুষছেন সেই মধ্য যুগের। আরে ভাই, মধ্য যুগে আরবে মেয়েদের যে মাটির নিচে পুঁতে ফেলা হতো তারও একটি অর্থনৈতিক কারণ ছিল। মেয়েরা মেষ চারণ কিংবা অন্য কোনো কৃষি কাজে অংশ নিতে পারত না। তখনকার যুগে মেয়ে ছিল একটা বার্ডেন। তাই মেয়ে সন্তান জন্মানোর সঙ্গে সঙ্গেই তারা মাটির নিচে পুঁতে ফেলত। সচ্ছল পরিবারগুলোতে সাধারণত এ রেওয়াজ ছিল না। অসচ্ছল গরিব পরিবারগুলো খাবারের সংস্থান করতে পারবে না বলেই তারা এ ধরনের কাজ করত। একটু ভাবুন তো একটি পরিবার কতটা দুঃখ, কষ্ট নিয়ে কবরস্থ করত তাদের সুস্থ, সুন্দর প্রিয় সন্তানদের। অথচ দেড় হাজার বছর পরও আপনারা প্রায় একই ধরনের কাজ করছেন নিছক অবজ্ঞা ও অবহেলায়। নুহেরের দিকে তাকিয়ে ডাক্তার আরো বললেন- আচ্ছা আমাকে বলুন তো এই যে পৃথিবীর তাবদ পুরুষ মানুষ মিলে তাজমহল তৈরি করেছে, আল-হামারা, বাকিংহাম, ভার্সাই প্রাসাদ তৈরি করেছে, পৃথিবীতে তারা তৈরি করেছে যত সব অট্টালিকা ও সৌধ, এগুলো কি পুরুষ মানুষ তাদের মা-বাবাদের জন্য তৈরি করেছে। না করেনি। এগুলো তারা তৈরি করেছে তাদের প্রভুদের জন্য। তাদের নির্দেশদাতাদের জন্য। তাহলে আপনাদের মতো মানুষের কেন এমন মনে হয় যে, একটি ছেলে সন্তান সব বিশ্ব জয় করে সেটা এনে দেবে আপনার হাতের মুঠোয়। শুনুন নুহের সাহেব, আজকালের জামানায় যে গৌরব একটি ছেলে সন্তানকে দিয়ে সম্ভব তার চেয়ে কম না হলেও বেশি গৌরব অর্জন সম্ভব একটি মেয়ে সন্তানের কাছ থেকে। আপনার মেয়েটির দিকে একবার ভালো করে তাকিয়ে দেখুন তো। পরীর মতো সুন্দর, নবনীর মতো কোমল, ভোরের শিশিরের মতো øিগ্ধ, পদ্ম পুকুরের মতো শান্ত একটি সন্তান এসেছে আপনার ঘর আলো করে। এর চেয়ে বেশি আর কি চান আপনি। আপনার মেয়েটির এটাই কি দোষ যে, সে মেয়ে হয়ে জšে§ছে।

এরকম একটি পরিস্থিতির জন্য বোধকরি নুহের ও সাবিতা কেউই প্রস্তুত ছিলেন না। নিজেদের ভুলগুলোকে কেউ এমন ভাবে আঙুল দিয়ে ধরিয়ে দিলে ভয়ানক রকমের অস্বস্তি হওয়ার কথা। নুহের ও সাবিতা দু’জনেরই সেরকম অস্বস্তি হচ্ছিল। মাথা নিচু করে ডাক্তার সাহেবের কথাগুলো শুনে যাওয়া ছাড়া তাদের আর কি বা করার থাকে। মুখে কোনো কথা না বলে শুধু ডাক্তারের ভিজিট চুকিয়ে দিয়ে চেম্বার থেকে বিদায় নেয় নুহের ও তার পরিবার। ডাক্তার কুদরত-ই-খুদার পর্যবেক্ষণ ও পরামর্শের পর সবকিছুর পরিসমাপ্তি ও চুকেমুকে গেলেই বোধকরি ভালো হতো। নুহের তার পরিবার নিয়ে সুখে দুঃখে বাকি জীবনটা হয়তো কাটিয়ে দিতে পারত। কিন্তু ভাগ্যের পরিহাস বড়ই অদ্ভুদ।

মাস দু’তিনের পরের ঘটনা। শুক্রবার দিনটি নুহেরের সাপ্তাহিক ছুটি। নুহেরও সাধারণত তার সপ্তাহের সব কাজকর্মগুলো সেরে নেয় এই দিনটিতে। ঘরের বাজার সদাই নিয়ে তাকে অবশ্য চিন্তা করেত হয় না, কারণ বিয়ের পর থেকে সেকাজটি সুনিপুণভাবে কাঁধে তুলে নিয়েছে সাবিতা। শুক্রবার সকালে উঠেই নুহেরের প্রথম কাজ হচ্ছে তার প্রিয় পিত রঙের ২০০১ মডেলের নিশান ব্ল–বার্ড গাড়িটি ধুয়ে-মুছে পরিষ্কার করা। গাড়িটির জন্য একজন ব্যক্তিগত ড্রাইভার পোষার ক্ষমতা যদিও নুহেরের রয়েছে বটে কিন্তু নুহের নিজেই ড্রাইভ করতে বেশি সাচ্ছন্দ্যবোধ করে। গাড়িটির জন্য কোনো চালক বরাদ্দ নেই বলে গাড়িটি ধোয়া মোছা ও রক্ষণাবেক্ষণের মতো কাজগুলো বেশিরভাগ সময় তাকেই করতে হয়। শুক্রবার বাদে সপ্তাহের অন্য দু-একদিন গাড়িটি অবশ্য সাফসুতরো করে দেয় বাড়ির দারোয়ান সিরাজ। এজন্য নুহের আলাদা করে কিছু মাসোহারা দেয় সিরাজকে।

সে যাক প্রতি শুক্রবারের মতো আজও নুহের তার গাড়িটি ধোয়া মোছা করছিল। হঠাৎ সে লক্ষ্য করল সামনের দিকের ডান পাশের চাকাটি পাংচার হয়ে বসে গেছে একেবারে। মাস ছয়েক আগেই ডানলপ কোম্পানির নতুন দু’জোড়া চাকা লাগানো হয়েছে গাড়িটিতে। স্বল্প সময়ের ব্যবধানে নতুন এ চাকাগুলো পাংচার হওয়ার কথা নয়।

নুহের যা ভেবেছিল হয়েছে আসলে তা-ই।

কীভাবে যেন পেরেক ঢুকে পড়েছে সামনের দিকের ডান পাশের চাকাটিতে। পেরেকটি নেহায়েত ছোট নয়। অনেক কষ্টে টেনেটুনে সেটাকে বের করতে হল চাকা থেকে। চাকা খোলার ঘূর্ণি অস্ত্রটি দিয়ে চুপসে যাওয়া চাকাটি খুলে গাড়ির বনেট থেকে অতিরিক্ত চাকাটি বের করে লাগিয়ে নেয়ার জন্য উদ্যোগী হয় নুহের। অনেক্ষণ ধরে পাশে দাঁড়িয়ে চাকা পরিবর্তনের প্রক্রিয়াটি দেখছিল তিতান। নতুন চাকাটি লাগানোর সময় হঠাৎ নুহেরের মনে হল তিতান পরিত্যক্ত পেরেকটি হাতে তুলে নিয়ে কী যেন আঁকিবুঁকি করছে গাড়ির পেছন দিকটায়। তার এ অতি প্রিয় সবে ধন নীলমণি এই গাড়িটির গাঁয়ে আঁকিবুঁকি? মুহূর্তেই মাথায় আগুন চেপে গেল নুহেরের সে চাকা খোলা বন্ধ রেখে দৌড়ে তিতানের কাছে এসে সত্যি সত্যি দেখল কী যেন হিজিবিজি শিল্পকর্মে লিপ্ত তিতান। কী সর্বনাশ...!!! এ তুই কী করছিস তিতান? বলেই হাতে থাকা ঘূর্ণি অস্ত্রটি দিয়ে তিতানের হাতে সজোরে আঘাত হানল নুহের। তিতান ডান হাতের মধ্যম আঙুলটি বাঁ হাতে চেপে ধরে মা গো চিৎকার করে ছিটকে পড়ল বেশ খানিকটা দূরে। তারপর গড়াগড়ি খেতে লাগল

মেঝেতে। চিৎকারের তীক্ষ্মতায় ও তীব্রতায় নুহেরের এবার মনে হল এ কী করল সে। হাতের আঙুলগুলো আবার ভেঙে-টেঙে গেল না তো। চিৎকার-চেঁচামেচি শুনে নিচে নেমে এলো সাবিতা। এসব দেখে সাবিতা তো একেবারে হতভম্ব। হচ্ছে কী এসব! সিরাজ দ্রুত বরফকুচি সংগ্রহ করে আনল বেশ খানিক। বরফগুলো তিতানের আঙুলের সঙ্গে বেঁধে দেয়া হল একটি কাপড়ের টুকরো দিয়ে।

রাতে শরীর উজিয়ে জ্বর নামল তিতানের। দু’দিন অতিবাহিত হওয়ার পর তিতানের মনে হল সে যেন আর কিছুতেই সহ্য করতে পারছে না আঙুলের ব্যথা। অসহনীয় শরীরভেদ্য তীক্ষ্ম ব্যথা গ্রাস করে নিয়েছে তাকে। বিছানায় শুয়ে শুধু ছটফট করে তিতান। তার গোংরানি ও অসহ্য কাতরানিতে বাধ্য হয়ে নুহের ও সাবিতা তিতানকে নিয়ে দ্বারস্থ হল বাংলাদেশের বিখ্যাত অর্থপেডিক সার্জেন প্রফেসর হুমায়ুন কবিরের চেম্বারে। ডাক্তার তিতানের আঙুলটি দীর্ঘ সময় ধরে পর্যবেক্ষণ করে বললেন-‘আপনারা অনেক দেরি করে ফেলেছেন। আঙুলের বেশিরভাগ টিস্যুই নষ্ট হয়ে গেছে। ভেইনগুলোও প্রায় সব অকেজো হয়ে গেছে ইতোমধ্যে। এখন আঙুলটি কেটে বাদ দেয়া ছাড়া অন্য কোনো গতান্তর নেই।’

এ কী বলছেন ডাক্তার সাহেব। নুহের কথাগুলো বলল ফ্যাসফ্যাসে গলায়। দয়া করে কিছু একটা করুন। আঙুলটি কী কোনোভাবেই সেইভ করা যায় না? আঙুলটি কাটা গেলে আমি ওর বিয়ে দেব কেমন করে। প্রফেসর হুমায়ুন কবির কণ্ঠে উষ্মা নিয়ে বললেন- ‘এমন সিরিয়াস মুহূর্তেও আপনি মেয়েটির বিয়ের কথা ভাবছেন। আপনার কী একটিবার মনে হল না যে, কী দহনে মেয়েটি সারা জীবন জ্বলবে। তার কী একটিবারও মনে হবে না যে তার এ বিকৃত হাতটির জন্য দায়ী অন্য কেউ নয় বরং তার নিজের পিতা। আপনারা যদি রাজি থাকেন তবে অপারেশন করতে হবে আজ রাতেই। তা না হলে আরও বেশি ক্ষতি হয়ে যেতে পারে। নুহের কিছু না বলে চেম্বার থেকে বেরিয়ে গেল নিঃশ্বব্দে।

সেদিনই সন্ধ্যা নাগাদ ডাক্তার হুমায়ুন কবির অপারেশন করে তিতানের ডান হাতের মধ্যম আঙুলটি কেটে ফেলে দিলেন। চেতনানাশকের প্রভাবেই বোধকরি সারা রাত ঘুমে নিমগ্ন রইল মেয়েটি। সকালের দিকে দু-একবার চোখ খুললেও বিকালের দিকে কথা বলতে শুরু করল মোটামুটি একরকম। নুহের একটি চেয়ার টেনে মেয়ের বিছানার পাশে গিয়ে বসল। আশালতা নার্সিং হোমের এ কক্ষটিতে এ মুহূর্তে সাবিতা ও তার একমাত্র ছেলে নেহাল ছাড়া আর কেউ নেই। সাবিতা বাসনপত্র ধোয়া মোছার কাজে ব্যস্ত। সাবিতার বর্তমান আবাসস্থল নার্সিং হোমের এ রুমটি। রাতেও মেয়ের সঙ্গে থাকতে হয় তাকেই। নুহের আলতো করে তিতানের বাঁ হাতটি টেনে নিয়ে হাতের তালুটি ঘষতে ঘষতে বলল- ‘মা অনেক কষ্ট হচ্ছে তাই না। ভয় করো না ভালো হয়ে যাবে ইনশাআল্লাহ। ঝরঝর করে অশ্র“ ঝরতে থাকে নুহেরের দু’চোখ বেয়ে।’ তিতান নুহেরকে উদ্দেশ করে বলে- ‘আব্বু তুমি কেঁদো না। কেন তুমি এত দুঃখ পাচ্ছ। আমার আঙুল কয়েক দিনের মধ্যেই আবার গজিয়ে যাবে। তুমি কিছুই জান না। আমি কার্টুনে কত দেখেছি আঙুল, হাত এগুলো কাটা গেলে আবার নতুন করে হাত গজায়, আঙুল হয়। তুমি দেখ আমার আঙুলটিও দু-একদিনের মধ্যে নতুন করে গজিয়ে যাবে’। মেয়ের মুখে এসব শুনে নুহেরের বুকটা হুহু করে ওঠে। বাষ্পরুদ্ধ হয়ে ওঠে তার কণ্ঠ। মুখে আর একটি কথাও ফুটল না তার। শুধু মাথা নিচু করে ফুঁপিয়ে ফুঁপিয়ে কাঁদতে লাগল।

বিকালের দিকে বাসায় ফিরে গ্যারেজে পার্ক করা গাড়িটির পাশ দিয়ে সিঁড়ি ভেঙে ওপরে উঠার সময় হঠাৎ গাড়িটির পাশে গিয়ে দাঁড়াল নুহের। তারপর গাড়িটির গায়ে কষে লাথি লাগাল বেশ কয়েকটা। মেয়েটি হিজিবিজি করে যে আঁকিবুঁকি করেছিল নুহের উবু হয়ে সেটা দেখার চেষ্টা করল একবার। আর তখনই নুহেরের বুকটা কাঁপতে লাগল তিরতির করে। তিতানের অংকিত শিল্পকর্মটি আসলে কোনো আঁকিবুঁকি নয় বরং সেখানে ছোট ছোট বাংলা অক্ষরে তিতান লিখেছে- ‘বাবা আমি তোমাকে অনেক ভালোবাসি।’ লেখাটি পড়ার পর মাথায় হাত দিয়ে গ্যারেজের মেঝেতেই বেশ কিছুক্ষণ বসে রইল নুহের। অন্ধকার ঘনিয়ে আসার পর উঠে গেল দোতলায়।

সকালে নুহেরই সাধারণত নাস্তা নিয়ে হসপিটালে যায়। অথচ এখন দুপুর প্রায় ১২টা তারপরও আজ নুহেরের দেখা নেই। মোবাইল ফোনটাও সুইচড্ অফ। আর দেরি করা যায় না। সাবিতা মনে মনে ভাবে। একটা রিকশা নিয়ে বাড়ির উদ্দেশে রওনা হয় সে। বাড়ি পৌঁছে সিঁড়ি ডিঙ্গিয়ে দরজা নক করতেই সে লক্ষ করল দরজাটি ভেতর থেকে বন্ধ। তার ব্যাগে অবশ্য অতিরিক্ত এক গোছা চাবি রয়েছে। ভেনিটি ব্যাগ থেকে চাবির গোছাটি বের করে দরজা খুলতেই সাবিতা বিস্ফারিত নেত্রে দেখল, বসার ঘরের সিলিং ফ্যানের সঙ্গে ঝুলছে নুহেরের অসাড় দেহটি।



আপনার মূল্যবান মতামত দিন:


Top