সিডনী বুধবার, ১২ই আগস্ট ২০২০, ২৮শে শ্রাবণ ১৪২৭

সজিনা গাছের সাপ : লিপি নাসরিন


প্রকাশিত:
৩০ জুলাই ২০২০ ১৫:৪৫

আপডেট:
১২ আগস্ট ২০২০ ০৪:২১

 

খুব ছোটবেলায় মৌলুদা নামটির সাথে পরিচিত হই।সেই একবারই শুনেছিলাম তারপর সেটি মাথা আর বুকের মধ্যে এমনভাবে গেঁথে আছে আজও যে বাড়তি আর নতুন করে শোনা লাগে না। তবে মৌলুদা নামটির সাথে জড়িয়ে আছে এক রহস্যময়তা- সেটি মৌলুদার মাকে দেখলেই অবচেতন স্তর থেকে ধাক্কা খেয়ে বেরিয়ে আসে চেতনার বাস্তবতায়। প্রায় দিন অফিস যাবার সময় তাকে দেখি মোড়ে গাড়ির জন্য বসে থাকতে। পিঠের একভাগ খোলা আরেক ভাগ গড়িয়ে আঁচল পড়েছে ঘাসের উপর। পাশেই রাখা লাঠির উপর ডান হাতটা চেপে বসে আছে আর থলিটা বাম হাতের কব্জিতে ঝুলানো।চোখ দু'টিতে কাত জমেছে, ক্ষীণ দৃষ্টি  কখনো একটানা দূরে ,কখনো এদিক সেদিক ঘুরে কী যেন খোঁজে। হাত উঁচু করে কোন চলন্ত বাহন থামানোর চেষ্টা করে। আমি দাঁড়িয়ে থাকা অবস্থায় কখনো কোন বাহনকে থামতে দেখিনি তার হাতের ইশারায় যদি না বাহনটি নিজের ইচ্ছায় থেমেছে এই মানুষটিকে উঠিয়ে নিতে।

সেদিন আমি অফিস থেকে ফেরার পথে সেই একইভাবে বিকেলের পড়ন্ত আলোয় তাকে বসে থাকতে দেখলাম বাড়ি ফেরার অপেক্ষায়।

মৌলুদার মা, তুমি কি বাড়ি যাবে?- বলতেই হাত পেতে দেয় সামনে। জানিনা টাকা চায় কিনা। কিন্তু আমি যে ক'দিন তাকে দেখেছি

চলতে পথে কিংবা মধুর মোড়ে অপেক্ষা করতে,

কোনদিন তাকে কথা বলতে শুনিনি।

তুমি কি কথা বলতে পারো না?

জিজ্ঞেস করতে গিয়েও থেমে যাই শুধু তার শূন্য ঘোলাটে চোখের দিকে তাকিয়ে থাকি যার চন্দ্রগ্রহণ লাগা চাঁদের মতো পিউপিল সাদা আকাশে ঘুরে বেড়ায়। তাকে দেখলে আমার 'পথের পাঁচালী'-র ইন্দির ঠাকরুনের কথা মনে পড়ে যদিও ইন্দির ঠাকরুন চরিত্রটির সাথে মৌলুদার মা'র শারীরিক কাঠামোগত  মিলটুকু ছাড়া অন্য কোন সাদৃশ্য আমি খুঁজে পাই না।

শুনেছিলাম মৌলুদার একটি মেয়ে ছিলো যাকে মৌলুদার মা মানুষ করেছিল সে সাপের কামড়ে মারা যাওয়ার পর।

মৌলুদার মৃত্যু আমার কাছে আজও কেমন রহস্যময়তায় ঘেরা। না,সে মৃত্যু কোন অলৌকিক ব্যাপার ছিল না, মানুষ জন্মালে একদিন তাকে মৃত্যুকে বরণ করতেই হয় এটাই স্বতঃসিদ্ধ, কিন্তু তারপরও আমার শিশু মনে সে মৃত্যু যেন আলাদা একটা অবয়বে ধরা ছিলো। কি জানি হয়তো সেই বয়সের ঘোর লাগা ব্যাপারটা আমি বহন করে চলেছি এখনো পর্যন্ত।

এক বর্ষাকালে বৃষ্টিভাঙা রোদের সকালে মৌলুদা সজিনা গাছে সজনেডাঁটা ভাঙতে উঠেছিল। সেই গাছেই নাকি ছিলো সাপটা। মৌলুদা সাপটাকে দেখে নাকি বলেছিল , এই সাপ তুই কি আমারে কামড়াবি? নাকি বললাম এ কারণে যে সেইদিন তাদের উঠোনে দাঁড়িয়ে আমি এসব কথাই শুনেছিলাম প্রায় মানুষের মুখে মুখে।

সেই রাতেই মাটির ঘরে মৌলুদার পায়ে সাপ কামড়ায়।

সেই সময় সাপের কামড়ে কারো মৃত্যু হলে গ্রামজুড়ে জানাজানি হয়ে যেতো আর মানুষ ভেঙে পড়তো সে বাড়িতে।

মৌলুদাকে উঠোনে শুইয়ে রাখলো সাদা কাপড়ে ঢেকে আর বাড়ির লোকজন মুরগির বাচ্চা ঢাকবার টাবরার উপর সুক্ষ্মজাল দিয়ে আধমরা সাপটিকে বন্দি করে রেখেছিল ওঝার জন্য। ততক্ষণে ওঝা আনতে লোক চলে গেছে। আমি আমার ফুফুদের সাথে সেই বিরল দৃশ্য দেখার জন্য মৌলুদাদের উঠোনে গিয়ে দাঁড়িয়েছিলাম।

এক শোক আর ভয়ার্ত উৎসবের আমেজ নিয়ে নারী-পুরুষ গিয়ে জড়ো হলো মৌলুদার মা'র উঠোন থেকে পায়ে হাঁটা মাটির রাস্তা অব্দি। যথাসময়ে ওঝা এলো কিন্তু যখন টাবরা আলগা করলো সাপটাকে দেখার জন্য তখন সবার সব প্রচেষ্টাকে বৃদ্ধাঙ্গুলি দেখিয়ে সাপ পালিয়ে গেছে আর সাথে নিয়ে গেছে মৌলুদার প্রাণ। আগত গ্রামবাসী সেদিন কান্নাভেজা চোখ মুছতে মুছতে যার যার বাড়ির পথ ধরেছিল।

ঢেকে রাখা সাপটিকে তারা নাকি মেরেছিল সকালবেলা সেই সজিনা গাছ থেকেই তারপর আধমরা করে বন্দি করে রেখেছিল যেন ওঝার বিষ নামানোর কাজ সহজ হয়। ওঝার আসলে কিছুই করার ছিলো না কারণ অনেক আগেই মৌলুদার শরীর বিষে নীল হয়ে গিয়েছিল কিন্তু সেসময় মানুষ ভাবতো ওঝা দিয়ে বিষ নামানো যায় এবং সাপটাকে ধরে রাখতে পারলে ওঝার পক্ষে সেটি সহজ

মৌলুদা মারা গেলে তার ছোট্ট মেয়েটা তার

নানীর কাছে থেকেই বড় হতে লাগলো কারণ মৌলুদাই ছিল বাবা-মা'র একমাত্র সন্তান।

বাসস্টপেজের পাশে দোকানের শেডের নীচে বসে থাকা মৌলুদার মাকে দেখে সে সব কথা ভেসে ওঠে চোখের পর্দায় কারণ মৌলুদার সেই মৃত্যুঘুম থেকে জেগে ওঠার প্রত্যাশা আমার ছোট্টপ্রাণেও সেদিন সঞ্চারিত হয়েছিল, আর অন্য অনেকের মতো আমিও তাকিয়ে তাকিয়ে সেই সজনে গাছটি দেখেছিলাম সেদিন।

মৌলুদার মেয়েটিকে আর কখনো দেখিনি বা হয়তো দেখেছিলাম কিন্তু চিনতে পারিনি তবে শুনেছিলাম হয়তো নাতনিকে বিয়ে দিয়ে নিজের কাছেই রেখেছেন মৌলুদার মা। মৌলুদার বাবা মারা গিয়েছেন বেশ ক'বছর হলো এখন এই নাতনি তার একমাত্র ভরসার জায়গা।

একদিন বাসা থেকে বের হয়ে দেখি মৌলুদার মা সেই একই ভঙ্গিতে বসে আছে আর পাশেই একজন মাঝ তিরিশের মহিলা দাঁড়িয়ে আছে- বুঝতে অসুবিধা হলো না এই মৌলুদার সেই মেয়ে।

আমি কাছে গিয়ে বললাম,উনি আপনার কে হয়?

আমার নানী

এভাবে ওনাকে একলা ছাড়েন কেন? রাস্তাঘাটে গাড়ি চাপা পড়বে তো। উনি কি ভিক্ষা করেন? আপনারা উনার দেখাশোনা করেন না? কথাগুলো এক নিঃশ্বাসে বলে ফেললাম।

তাকে যেন একটু বিষণ্ণ মনে হলো।

ক্ষরিত ভেজা কণ্ঠে জানালো, নানী তো কারো কথা শোনে না আর ঘরে রাখাও যায় না। সকাল হলি লাঠি আর থলিটা নে বেরুবে।মোড়ে এসে হাত উঁচু করে গাড়িতে উঠে শহরে যাবে।

শহরে কী করেন উনি?

কী আর করবে, এ গলি সে গলি ঘুরে বেড়ায় মাছ বাজারে গে থলে পাতে, তরকারিয়ালার কাছতে তরকারি আনে।

আমি উৎসুক হয়ে জানতে চাইলাম তাদের সংসার কিভাবে চলে। সে মুখ নিচু করে বললো, লোকের বাড়ি কাজ করি, বিলে ধান রুতি যাই, ধান ঝাড়ি, যখন যা হয় তাই করি।

আপনার বাবার বাড়ি যান না? আমি প্রশ্ন করি।

যাই, আব্বা বেঁচে আছে কিন্তু আমার সৎ ভাইরা ঠিকমত খাতি-পরতি দেয় না তা আমারে কী করে দেখবে?

আমাদের কথোপকথনের মাঝেও দেখলাম মৌলুদার মা বেশ কয়েকবার হাত উঠিয়ে গাড়ি থামাবার চেষ্টা করছে। ছোট-বড় সব গাড়ি তার দিকে বিন্দুমাত্র দৃষ্টিপাত না করে শাঁই শাঁই  করে বের হয়ে যাচ্ছে।

বড় অদ্ভুত এ জগত সংসারের নিয়ম- একসময় যার যৌবন ছিল, স্বামী,সন্তান নিয়ে সুখের সংসার ছিলো সে আজ নির্বাক একজন মানুষ, ফ্যাকাশে চোখ দিয়ে শুনে নেয় জগতের সব ভাষা যে জগত তাকে অপ্রয়োজনীয় ভেবে একপাশে সরিয়ে রেখেছে। আমিও ব্যস্ত হয়ে একটা ইজি বাইকে উঠে পড়ি, ভাবি দুইনারী  জীবনের দু’প্রান্তে দাঁড়িয়ে কোন এক অচল জীবনের হাতছানিতে ছুটে বেড়াচ্ছে । পিছন ফিরে কিছুক্ষণ তাকিয়ে থাকি। হয়তো কেউ তাকে গাড়িতে উঠিয়ে নেবে, নামিয়ে দেবে ব্যস্ত শহরের কোন বাস্তবতায়।

 

এই লেখকের অন্যান্য লেখা



আপনার মূল্যবান মতামত দিন:


Top