সিডনী বুধবার, ১২ই আগস্ট ২০২০, ২৮শে শ্রাবণ ১৪২৭

নানাখাটাই : সায়মা আরজু


প্রকাশিত:
৩০ জুলাই ২০২০ ১৭:১৩

আপডেট:
১২ আগস্ট ২০২০ ০৪:০৯

ছবিঃ সায়মা আরজু

 

মিষ্টি কিছু খেতে ইচ্ছে করছে। রাত বারটা।আরও কিছুক্ষন কাজ করতে হবে নইলে কাল দুপুরে মিটিং এ প্রেজেন্টেশনটা করা যাবে না। একবার উঠে গিয়ে বিস্কিটের ডিব্বা, ফ্রিজ খুঁজে এল, রুমি। নাহ, পছন্দমত কিছুই পাওয়া গেল না। রুমি ফের কাজে মন দেয়।

বাইরে বৃষ্টি হচ্ছে, ঝমঝম বৃষ্টির শব্দের সাথে বজ্রপাতও। জানালার কাঁচের পাল্লায় টুংটাং শব্দ, মানে শিলা বৃষ্টি। বেশীক্ষন বসতে পারলনা রুমি, খাওয়ার ইচ্ছাটা আবার প্রবল হয়ে উঠেছে। চেয়ারের পিছে মাথা হেলান দিয়ে মনে করতে চেষ্টা করল কি খাওয়া যায় ? না ,না, ঠিক কি খেতে ইচ্ছা করছে ? স্বাদটা জিহবায় মিশে আছে, ঘ্রানটাও পাওয়া যাচ্ছে কিন্তু ঠিক মনে পড়ছে না। চোখ বন্ধ করে একটু চেষ্টাতেই মনে পড়ল, নানখাটাই। ইস এই বৃষ্টির রাতে নানখাটাই খেতে ইচ্ছে হল! নিজের উপরই বিরক্ত হয় রুমি।


রুমেল জেগে আছে। গভীর মনোযোগে বিছানায় আধশোয়া হয়ে কি একটা পড়ছে। রুমি কে উসখুস করতে দেখে জিজ্ঞেস করল,
- কি হয়েছে
-মিষ্টি খেতে ইচ্ছে করছে। সেটা আবার যেই সেই মিষ্টি না, নানখাটাই
- এটা কি
রুমি গুগলে সার্চ দিয়ে ছবি দেখায়
- হুম,কি দিয়ে বানায় এটা। মেইন ইনগ্রিডিয়েন্টস কি?
-ময়দা,সুগার,ঘি বা বাটার আর সুজি। সবই তোমার পছন্দ
- আচ্ছা! আমারতো আরো অনেক কিছু পছন্দ।ঠিক আধাঘন্টার মধ্যে কাজ শেষ করে বিছানায় আস। মিসিং ইউ।
বলে দুষ্টুমির হাসি হাসে রুমেল।

রুমি আবার ওঠে। ফ্রিজ থেকে কয়েকটি আঙ্গুর বের করে একটা প্লেটে নিয়ে রুমেলকে দেয়,নিজ একটা মুখে পুরে কাজে মন দিতে চেষ্টা করে। কিন্তু মন আজ কোনভাবেই বশে নেই। মনে হচ্ছে জীবনের একমাত্র উদ্দেশ্য নানখাটাই খাওয়া। অগত্যা রুমি আবার কাজ বন্ধ করল।ফ্রিজ থেকে মাখন বের করে গলিয়ে মেপে এককাপ নিয়ে এককাপ চিনির সাথে বিট করল। তারপর এতে যোগ করল ময়দা , দুই টেবিল চামচ সুজি আর চা চামচ এলাচির গুড়া। ট্রেতে বাটার পেপার বিছিয়ে ছোট ছোট করে নানখাটাই বানিয়ে উপরে পেস্তা কুঁচি সাজিয়ে দিল। যা দেখতে হয়েছে না,একেবারে তুষার কন্যা! নিজেকেই বাহবা দেয় রুমি।এরপর ওভেনে ঢুকিয়ে টাইমার ফিক্স করে চা এর পানি বসায়। মিষ্টি একটা ঘ্রান ছড়িয়ে পড়েছে সারা ঘরে।রুমির মনে পড়ে এরকম বৃষ্টির দিন গুলোতে মা রান্না শেষ করে মাটির চুলার ঢিমে আঁচে নানখাটাই বানাতো। ভর সন্ধ্যায় যখন মিষ্টি নানাখাটাইয়ের ঘ্রানে মৌ মৌ করত সারা বাড়ি তখন রুমি আর ওর ভাই রন্টু হাভাতের মত বসে থাকত বাটি হাতে নিয়ে, মা’র কখন কাজ শেষ হবে কখন নানখাটাই খেতে পাবে।

রুমি জানালায় উঁকি দিল। বৃষ্টি আরও বেড়েছে মন হয়। সে গরম পানিতে টি ব্যাগ ভিজায়। টুং করে ওভেনের টাইমার অফ হয়ে যায়। রুমি নানখাটাই এর ট্রে টা বের করে। ভাবনায় ভর করে নিশ্চিন্তে ছোট বেলাটায় ঘুরে আসে। এমন সব বৃষ্টির দিনে ভুতের গল্প বেশ জমে উঠতো। রুমির মনে পড়ে শ্রাবন মাসে অমাবস্যার রাতকে গলাকাটা অমাবস্যা বলা হত। ঐ দিন নাকি গলাকাটা ভুত এখানে ওখানে ঘাপটি মেরে থাকত,বিশেষ করে শ্মশানে।কাউকে একা পেলেই গলা কেটে নামিয়ে দেবে, কাজেই ঐদিন সন্ধ্যার পরে ঘর থেকে বের হওয়া মানা! একবার এরকম এক বৃষ্টির রাতে নবীন দাদা, রুমির বাবার চাচা কিন্তু বয়সে রুমির বাবার থেকে ছোট, ভুত দেখে এমন ভয় পেয়েছিলেন যে হসপিটাল অবদি গিয়ে ঘুরে আসতে হয়েছিল। আর একটু হলেই হার্ট এ্যাটাক আর কি।


গল্পটা রুমির দাদার মুখ থেকেই শোনা। সকাল থেকে বৃষ্টি পড়ছিল। ঐ দিন ও মা নানখাটাই বানিয়েছেন। বিকেলে কোথা থেকে কাক ভেজা হয়ে দাদা এলেন। মা অতিথি দেখে ব্যস্ত হয়ে পড়লেন। এদিকে বৃষ্টি বেড়ে রাস্তায় পানি জমে গেছে বলে বাবা দাদাকে রাতে থেকে যেতে বললেন। মা ও রান্নার বন্দোবস্তে চলে গেলেন। সন্ধ্যায় চা এর সাথে চানাচুর মুড়ি মাখা আর মাখন স্বাদের নানাখাটাই। মা অবশ্য জানিয়ে দিয়ে গেছে রাতে খিচুড়ি,বেগুন ভাজা আর মোরগের ঝোল হচ্ছে। আমরাতো আহ্লাদে আটখানা। দাদাকে ধরলাম ভুতের গল্প বলেন। দাদা বললেন
- ভয় পাবে নাতো? সত্যি গল্প কিন্তু?
আমি আর রন্টু একসাথে বললাম,
- না দাদা,বলেন

দাদা বলছেন, " বৃষ্টি পড়ছিল অল্প অল্প তখন। বড় রাস্তা শেষ হয়েছে দাম বাড়ি পুকুর পাড়। পুকুরের এক পাশে বসতি অন্যপাশে জঙ্গল। জঙ্গলের পাশ দিয়ে ইট বিছানো চিকন রাস্তা। দিনের বেলায় মানুষ সচারচর কম চলাচল করে এপথ দিয়ে আর রাতে না ঠেকলে এদিক কেউ আসেনা। মেঘলা আকাশ বলে অন্ধকারটা সেদিন একটু বেশী। "

দাদার বাসায় আমরা অনেক গিয়েছি। বাসাটা এমন জায়গায় যে দাম বাড়ি পুকুর পাড় দিয়ে ছোট রাস্তাটা ধরে গেলে দশ মিনিটে পৌঁছা যায়। নইলে আরও অনেকটা পথ ঘুরে অন্যদিক দিয়ে আসতে হবে।পুকুরের ধার ঘেঁষে  কয়েকঘর নিম্নবর্নের হিন্দুরা থাকত সে সময়। তাদের মূলত মাখন, ঘোল বিক্রি করাই পেশা। দুপুরের পর থেকে সন্ধ্যা অবদি  এসব বাড়িতে ব্যাস্ততা থাকতো খুব, তারপর পুরো এলাকা শুনশান। বাঁশের সাথে দড়ি বেঁধে তারা খুব সহজেই তৈরী করে নিত মাখন তৈরীর ম্যাশিন। পিতলের বালতিতে রাখা দুধের মধ্যে বাঁশের ঘুর্ননে যে অপূর্ব শব্দ তৈরী হত তারই  হাত ধরে ঘোলের উপর ভেসে উঠত মোমের মত মাখন। সে মাখন দেখতেও যেমন সুন্দর খেতেও তেমনি স্বাদ! তাদের কেউ কেউ রোজ সকালে মাটির হাড়ি বাঁশের দুমাথায় বেঁধে পাড়ায় পাড়ায় হাঁক দিয়ে বেড়াত “চাই ঘোল মাখন ….” । পুকুর থেকে কিছুটা ভিতরের দিকে কিছু অবস্থাপন্ন হিন্দুদের বাস ছিল। নামে দাম বাড়ি হলেও  এ এলাকায় এখন মুসলমানদের সংখ্যাই বেশী। বেশীরভাগ হিন্দুই জমি বিক্রি করে ইন্ডিয়া চলে গেছে।

"  আমার তো জানো  বাজারে একটা ইলেক্ট্রনিক্স গুডস এর দোকান। বৃষ্টি আর বেচাকেনা কম দেখে রাত নয়টায় দোকান বন্ধ করে বের হয়ে আসলাম। বেশ কটা রিক্সাকে ডেকে জিগ্যেস করলাম কিন্তু কেউই আমার বাসার দিকটায় যেতে রাজি হলো না। অবশেষে একজনকে বড় রাস্তার মাথা অবদি পঁচিশ টাকায় ভাড়া করে উঠে পড়লাম। ভাড়া মিটিয়ে ছোট রাস্তায় পা রাখতেই গা ছমছম করে উঠল। চারদিকে কেউ নেই। নিজের নিঃশ্বাসের শব্দও শোনা যাচ্ছে। "

দাদা বলে চলছেন আর রন্টি খাবার মুখেই নিয়ে হা করে রইল। ভয়ে চাবাতে ও ভুলে গেছে ও।
"ভয়ে ভয়ে চারদিকে তাকিয়ে দেখি কেউ নেই। মাঝে মাঝে সরসর আওয়াজ। ভাবলাম বেজি টেজি হবে মনে হয়। কিছুক্ষন পরে মনে হল কেউ একজন পিছনে পিছনে আসছে। দোয়া দরুদ পড়ে বুকে ফুঁ দিয়ে পিছনে ফিরে দেখি কেউ নেই। আবার সামনে হাঁটত থাকি। একটু পরেই মনে হল সামনে কেউ দাঁড়িয়ে। মনে হল ঘোমটা মাথায় একটা বউ,হাত বাড়িয়ে আমাকে ডাকছে। এই রাতে এখানে বউ আসবে কেন, তাও একা,নিজেকে জিজ্ঞেস করি,আবার তাকাই, না ঠিকই দেখছি বউটি আমাকে হাত ইশারা করে ডেকেই চলছে। দোয়া পড়ে ফুঁ দেই, হাতে তালি দেই, কোনটাতেই কোন কাজ হচ্ছেনা। বউটি ওই একই জায়গায় দাঁড়িয়ে। এবার রক্ত হীম হতে শুরু করল। মনে হয় ভয়ে সেন্সলেস হয়ে পড়ে গেলাম। সারারাত সেখানেই। পরে সকালে লোকজন ধরে হসপিটালে নিয়ে গেলে হুঁশ আসল। আমিও নাছোড়বান্দা ঐ ভুতের রহস্য উন্মোচন না করে আমার শান্তি নেই। সুস্থ হয়ে একদিন রাতে অনেক সাহস করে যেখানটাতে সেন্সলেস হয়ে পড়ে গেছিলাম সেখানে গিয়ে দাড়াই । হাতে পাঁচ ব্যাটারির একটা টর্চ।আশেপাশে তেমন কিছুই চোখে পড়ল না। কিন্তু যেইনা টর্চ বন্ধ করলাম বউ হাজির। টর্চ জ্বালালে বৌ উধাও কিন্তু টর্চ বন্ধ করলেই বউ, এমন চলল কিছুক্ষন। টর্চ মেরে চারদিক আবার দেখলাম। কোথাও অস্বাভাবিক কিছু পেলামনা।শুধু দেখলাম রাস্তার একটু ভিতরে একটা কলাগাছ সামনের দিকে সামান্য ঝুঁকে আছে , বাতাসে পাতা নাড়াচ্ছে।তখন আসল রহস্য পরিস্কার হল। নিজের বোকামীতে নিজেরই হাসি পেয়ে গেল। এই কলা গাছটিই অন্ধকারে মনে হয়েছে ঘোমটা পড়া বউ। আর বাতাসে যখন এর পাতা নড়ছিল তখন মনে হচ্ছিল বউটা হাত ইশারা করে আমাকে ডাকছে। বুঝলে দাদুভাই ভুত কি?" দাদা খুব মজা করে গল্প করতেন। সেইসব মানুষ কেউ নেই। একটা দীর্ঘ শ্বাস বের হয় রুমির বুকের গভীর হতে।

নানখাটাইগুলো এতক্ষণে ঠান্ডা হয়েছে। একটা নিয়ে রুমি কামড় বসাল,সেই ছোটবেলার স্বাদ, আহা রুমি চোখ বন্ধ করে মুখের মধ্যে মাখন আর মিষ্টির গলে যাওয়া স্বাদ অনুভব করতে লাগল। ঠিক ঐসময় কাঁধে একটা হাতের স্পর্শ। আহ্ বলে আঁতকে ওঠে রুমি।চোখ মেলে দেখে রুমেল।
রুমেল বলে,
- ভয় পেলে?
-হুম
- এই হচ্ছে তাহলে, আমিতো ঘ্রানে আর থাকতে পারলাম না।
বলে পরপর তিন-চারটা নানখাটাই খেয়ে নিল। রুমির চায়ের কাপটা নিজের দিকে টেনে নিয়ে চুমুক  দিতে দিতে বলল
- বাকি গুলো কিন্তু আমার
রুমি হাসে বলে 'প্রেমে পড়লে তবে নানখাটাই এর'? 'তোমারও',বলে রুমেল হাসে।

রুমি ঘড়ির দিকে তাকিয়ে দেখে দেড়টা বাজে। এখন শুরু করলেও আড়াইটার মধ্যে কাজ উঠে যাবে।দ্রুত কাজে মন দেয় রুমি। রুমেল একটা ডিব্বার মধ্যে গুনে গুনে আঠেরটা নানখাটাই ঢুকায়। বলে দশটা আমার আর আটটা তোমার, আচ্ছা? রুমি হাসে বলে, “আচ্ছা”।



আপনার মূল্যবান মতামত দিন:


Top