সিডনী বুধবার, ১২ই আগস্ট ২০২০, ২৮শে শ্রাবণ ১৪২৭

সুইসাইড নোট : শিবব্রত গুহ


প্রকাশিত:
৩০ জুলাই ২০২০ ১৭:৩২

আপডেট:
১২ আগস্ট ২০২০ ০৩:০৭

 

চিঠিটা পড়ার পরে, হতবাক হয়ে গেল প্রাণতোষ সমাদ্দার। সে যে নিজের চোখকেও বিশ্বাস করতে পারছে না। একি করে সম্ভব? না, না, এ কিছুতেই হতে পারে না সম্ভব। নিজের প্রাণের চেয়ে প্রিয় একমাত্র আদরের মেয়ে অনুরাধার নিথর মৃতদেহের দিকে চেয়ে এই কথাগুলো যেন নিজের অজান্তেই বলে উঠলো প্রাণতোষ।
মেয়ের মৃতদেহের পাশে, এই চিঠিটা পড়ে ছিল। এটাকে সুইসাইড নোট বলা যেতে পারে। এতে লেখা ছিল,

আমার প্রিয় বাবা,

এই চিঠিটা যখন তুমি পাবে,
তখন, আমি আর এই পৃথিবীতে থাকবো না। মাকে তো সেই কোন ছোটবেলায় হারিয়েছি, তা মনে পড়ে না। তারপর থেকে, তুমিই তো আমাকে, তিল তিল করে, আদরে স্নেহে করেছো মানুষ। আমি তোমার নয়নের মণি, সেটা আমি জানি। আমি পড়াশোনায় ছোটবেলা থেকেই খুবই মেধাবী, সেটা তো তুমি জানতে, তাহলে তুমি কেন বাবা আমার পড়াশোনা শেষ করতে দিলে না? কেন? কেন? কেন?
আমি তো চেয়েছিলাম, পড়াশোনা করে নিজের পায়ে দাঁড়াতে, একজন মানুষের মতো মানুষ হতে।
ছোটবেলা থেকেই আমার স্বপ্ন ছিল, যে, একজন বিদ্যালয়ের শিক্ষিকা হওয়ার । সেই লক্ষ্যে, আমি নিজেকে অনেকদিন থেকেই তৈরি করছিলাম।
আর একটা বছর, পরই তো, আমার ইতিহাসে এম. এ. টা শেষ হয়ে যেত। কিন্তু, তুমি তা হতে দিলে না,
বাবা, হতে দিলে না। কেন বাবা? কেন?
আমার সব স্বপ্ন তুমি নিজের হাতে ভেঙে দিলে বাবা, নিজের হাতে ভেঙে দিলে, এটা কি ঠিক করলে? তোমাকে তোমার বন্ধু পরেশ কি বোঝালো তুমি তাই বুঝলে, আমার কথা, নিজের মেয়ের কথা, একবারও শুনলে না, শুনলে না তুমি। যদি শুনতে, তাহলে আমার এখন যে খারাপ অবস্থা, সেই অবস্থায় পড়তে হত না, কক্ষনো না।
তুমি তো তোমার বন্ধুর আনা ভালো সম্বন্ধ নিয়ে আলহাদে আটখানা। তুমি ভেবেছিলে, পাত্র সুধাংশু, খুব ভালো হবে। সে যেহেতু, একজন বড় সরকারী অফিসার । কি তার ঠাটবাট! আর ঠাটবাট হবে নাইবা কেন! অনেক টাকা মাইনে পায়, বিদেশে পড়াশোনা করেছে, ধনী পরিবারের একমাত্র সন্তান। গাড়ি, কোলকাতা শহরে রাজপ্রাসাদের মতো বড় বাড়ি সব আছে, সব।
আর সেখানে আমি গ্রামের এক মধ্যবিত্ত পরিবারের সিধেসাধা একটা মেয়ে। সুধাংশু, দেখতে সুপুরুষ, তার যে আমার মতো একটা গ্রামের মেয়েকে একবারেই পছন্দ হয়ে যাবে, তা আমি স্বপ্নেও ভাবিনি কখনো। তুমি তো যেন হাতে স্বর্গ পেলে! তোমার আনন্দ আর ধরে না। তোমাকে তখন দেখে আমার যে কি হাসি পাচ্ছিল বাবা, কি বলবো!
তোমাকে সুধাংশু কথা দিয়েছিল, যে, বিয়ের পরে, ও আমাকে আরো পড়াশোনা করাবে, আর তুমি তাতেই, বিশ্বাস করে গেলে। আসলে, তুমি যে খুবই সহজ - সরল একজন মানুষ। যে যা বলে, তাতেই, বিশ্বাস করে নাও। মানুষকে বাবা, সহজে বিশ্বাস করতে নেই।
বিয়ের পরে, প্রথম কয়েকটা দিন, খুব ভালো আনন্দে কাটলো। আমি তখন যেন হাতে স্বর্গ পেয়েছি। নিজেকে খুব খুব সুখী মনে হতে লাগলো। আমার আনন্দ যেন আর ধরে না। কিন্তু, সুখ বড় বিচিত্র জিনিস। সেটা সবার কপালে সহ্য হয় না। মানুষ ভাবে এক, আর ঘটে আর এক।
বিয়ের কিছুদিন পরে, আমি স্বামীকে বলি, আমার পড়াশোনা আবার শুরু করার কথা৷ কিন্তু, স্বামী বেঁকে বসে, সাথে আমার শ্বশুরবাড়ির সবাই। তাদের পরিবারে, বাড়ির বউদের নাকি বাড়ির বাইরে বেরোতে নেই। আর বউদের পড়াশোনা করারও নিয়ম নেই। বউদের কাজ সংসার সামলানো, বাচ্চার জন্ম দেওয়া ও বাচ্চা মানুষ করা। এর বাইরে কিছু নয়।
একি তুঘলকি নিয়ম রে বাবা! আমি মানতে পারলাম না এই নিয়ম। এই সমাজে নারী হয়ে জন্মানো কি অপরাধ? বলো না বাবা? বলো আমায়? নারীদের কি নিজেদের পায়ে দাঁড়ানোর চেষ্টা করা উচিত নয়? তাদের স্বাবলম্বী হওয়া কি সমাজ মেনে নিতে পারে না? আমাদের পুরুষতান্ত্রিক সমাজে, নারীদের প্রতিপদে দোষ দেখা হয়। এই সমাজে, নারীরা হল পুরুষদের অধীন। তাদের নেই কোন স্বাধীনতা। পুরুষদের অনুগ্রহ নিয়েই তাদের এই সভ্য সমাজে বেঁচে থাকতে হয়।
আমার শ্বশুরবাড়িতে, কোন কিছুর বিরুদ্ধে প্রতিবাদ করতে নেই। প্রতিবাদ করতে গেলে, ভাগ্যে জুটবে অপমান আর অপমান। আমার ক্ষেত্রেও তার কোন ব্যতিক্রম ঘটলো না। আমি, তোমার সন্মানের কথা ভেবে সব মুখ বুজে করলাম সহ্য।
আমার স্বামী, জানো বাবা, এক ভদ্রবেশী শয়তান। ও একটা লম্পট, বর্বর, জানোয়ার। অনেক মেয়ের সাথে ওর রয়েছে ঘনিষ্ঠ সম্পর্ক। প্রথম প্রথম আমি বুঝতে পারিনি। তুমি বলেছিলে, মেয়েদের জীবনে স্বামী হল দেবতা। আমি তোমার কথায় বিশ্বাস করে, তাঁকে বসিয়েছিলাম দেবতার আসনে। কিন্তু, পরে বুঝলাম, সে যোগ্যই নয় দেবতার আসনে বসার।
আমি করেছিলাম প্রতিবাদ, হ্যাঁ, বাবা, হ্যাঁ, তোমার মেয়ে করেছিল প্রতিবাদ। অন্যায়ের বিরুদ্ধে প্রতিবাদ করতে তোমার মেয়ে জানে, সে তো তুমিই শিখিয়েছ আমাকে। আমি করেছিলাম প্রতিবাদ, আমার স্বামীর লাম্পট্যের, তার বদলে আমার কপালে কি জুটেছিল জানো? বাবা? জানো? শুনলে তুমি হয়তো খুব দুঃখ পাবে।
তবুও বলছি, আমার স্বামী বিয়ের কিছুদিন পর থেকেই, রাতের পর রাত বাড়ি আসতো না।
আমার জানো বাবা, খুব খুব কষ্ট হতো। কিন্তু, আমার এই কষ্টের কথা আমি বলবো কাকে? কাকে? তোমাকে বললে তুমি যে কষ্ট পেতে, তোমাকে কষ্ট দিতে আমি চাইনি বাবা, একদম চাইনি।
তুমি যে আমাকে ভালোবাসো, বড় ভালোবাসো, তা আমি জানি। আমার স্বামীর লাম্পট্যের প্রতিবাদ করাতে, ও আমাকে মারতো, খুব মারতো। ও তো আর মানুষ নয়, একটা আস্ত জানোয়ার। পশুর মতো আমার ওপর  করতো অত্যাচার। আমার সারা গায়ে পড়ে গেছে কালশিটে। আমার নিজের ওপর ক্রমশ ঘেন্না জন্মাতে লাগলো।
তাই, শেষে, সুইসাইড করার সিদ্ধান্ত নিলাম। জানি, আত্মহত্যা মহাপাপ। তবুও, এছাড়া, আমার সামনে আর কোন রাস্তা নেই। শুধু, তোমার জন্য, বাবা, তোমার জন্য, আমার মনটা কেমন দুঃখে যাচ্ছে ভরে। তোমাকে মৃত্যুর আগে, একবার, শুধু একবার, যদি দেখতে পেতাম, তাহলে খুব ভালো হত।
কিন্তু, তা তো আর হবার নয়। তুমি আমার ওপর রাগ কোরো না বাবা, কোরো না রাগ। আমি যদি
আবার মানুষ হয়ে জন্মাই, তবে তোমাকেই যেন আমার আবার বাবা রূপে পাই। আমি চলে যাচ্ছি বাবা, তোমার থেকে অনেক অনেক দূরে, বাবা....

ইতি
তোমার আদরের মেয়ে অনুরাধা


আর নিজেকে ধরে রাখতে পারলো না প্রাণতোষ। হাউহাউ করে কেঁদে বুকে জড়িয়ে ধরলো মেয়ে অনুরাধার মৃতদেহ। মারে, মারে, এই বুড়ো বাপটার ওপরে অভিমান করে আমাকে একা রেখে চলে গেলি, আমাকে একবার কিছু জানালি না কেন? কেন? হায় বিধাতা, এ তুমি আমার কি সর্বনাশ করলে, কি সর্বনাশ!

 

শিবব্রত গুহ
কলকাতা

 

এই লেখকের অন্যান্য লেখা



আপনার মূল্যবান মতামত দিন:


Top