সিডনী বুধবার, ১২ই আগস্ট ২০২০, ২৮শে শ্রাবণ ১৪২৭

বৃষ্টি শেষের মেঘ : রাজন নন্দী


প্রকাশিত:
৩০ জুলাই ২০২০ ১৮:০৫

আপডেট:
১২ আগস্ট ২০২০ ০৩:৪৫

 

 

“YOU AND I HAVE PASSED THROUGH MANY BIRTHS”

 

ঐতো রুণু, ঘুমাচ্ছে। আর কী কোনদিন উঠবে ও!

তবুও এই যে তাকিয়ে আছি ওর দিকে; চাইছি একবার অন্তত ও চোখ মেলে তাকাক। এরই নাম বোধ হয় আশা। রুণু হয়ত কোনদিনই আর জাগবে না। এতদিনের উপেক্ষার জবাব হয়ত এভাবেই দিয়ে যাবে ও। কিন্তু আমি আশা বেঁধে রাখব, রুণু। অপেক্ষা করব। 

আমার জীবনে এখন চলছে আত্মবিশ্লেষণ পর্যায়। মানুষের জীবনের এরকম একেকটা পর্যায় থাকে। থাকে না? সময়ের নানা স্রোত, জীবনেরনদীটার বাঁকে এসে আজ ঘূর্ণী তুলছে। ওপাশে বিগত যৌবন, দূরে ঝাঁপসা কৈশর-শৈশব। এপারে হাসপাতালের আইসিইউতে আমার বর্তমান। 

রুণুর বেডের পাশ থেকে উঠে এসে কখন যে আমি নদীটায় একটা কাগজের নৌকা ভাসিয়ে বসে আছি। দাগটানা কাগজের নৌকাটি সেই থেকে নদীর ঘূর্ণীতে পাঁক খাচ্ছে তো খাচ্ছেই। সময় কি আজ আমাকে বিশ্বরূপ দেখাতে চাইছে?

তখন ভাদ্র মাস। সারাদেশেই খুব বন্যা হয়েছিল সে বছর। আমাদের টাঙ্গাইলেও। বন্যার কিছু পরে পরেই, আমরা উঠে এসেছিলাম আকুর ঠাকুর পাড়ার এক ভাড়া বাড়িতে। আমার ঠাঁই হয়েছিল ঠাকু’মার ঘরে। গলির পাশের ঘর বলে জানালা খোলা হত না সহসা। তাই এমন কি ভর দুপুর বেলাতেও ঘরটাতে থাকত একটা আবছায়া ভাব। সেই আলো আঁধারিতে আমাদের সাথে আরও এসে জুটেছিল দুটো টিকটিকি। ও দুটো কি আগে থেকেই এ ঘরে ছিল? নাকি আমাদেরই বাক্স-পেটরার সাথে এসে উঠেছিল? সেই রহস্য ভেদ করার মত সত্যান্বেষী আমি আর কোনদিনই হয়ে উঠতে পারিনি। 

কোন কোন অলস দুপুরে, আমি ওদের ঈশ্বর হয়ে উঠতাম। দেয়াল আর সিলিংয়ের ক্যানভাসে ওদের জীবন দেখতাম শুয়ে শুয়ে। ওরা মূলত খাবারের পেছনেই ছুটোছুটি করত। আর খিদে মিটে গেলে করত প্রেম। বেশ ছিল ওরা। কিন্তু ঈশ্বরের তা সইবে কেন? একদিন শয্যা থেকে উঠে গিয়ে ঈশ্বর বজ্র হানতে যাবেন; ওমনি ঠাকু’মা বলে উঠেছিলেন, ‘খবরদার! হারুল মারবি না কুনুদিন’। 

‘ক্যা, মারলে কি হয়?’

‘হারুল মারলে তুইও ওইরকম হাড়গিলা হবি আর খালি টিকটিক টিকটিক করবি’।

আমি শাক্ত পরিবারের ছেলে। শুনেছি, আমার এক ঠাকুরদা এককোপে পাঠার ঘাড় থেকে ধর আলাদা করেতে পারতেন। তার সেই বীরত্বের কথা এমনকি পাঠা সমাজেও ছড়িয়ে পরে থাকবে। কারনণ তাঁকে দেখলেই নাকি ওই অবোধ জীবগুলোর ভেতর অস্থিরতা দেখা যেত। যাবে নাই বা কেন? ঘটনাক্রমে, নিঠুর খুনীকেও তো দেখেছি জল্লাদের দিকে তাকিয়ে কেঁপে উঠতে। 

আমার সেই ঠাকুরদাকে আমি কোনদিন দেখিনি। সময়ে পরিবারের সেই শৌর্যবীর্যও নিছক গল্প। কাজেই বসাক বাড়ির সাদা রামছাগলটা যেদিন আমার স্কুলের ব্যাগ চিবিয়ে খেতে শুরু করল, ব্যাগ ছুঁড়ে ফেলে রেখে পালিয়েছিলাম। টিকটিকি মেরে হাড়গিলা হবার মত বেপরোয়া কি করে হব আমি? 

কিন্তু রুণু? ও কি মেরেছিল কোন টিকটিকিকে? তাই কি আজ এমন হাড় স্বর্বস্ব হয়ে শুয়ে আছে? 

রুণুর দিকে তাকালাম। আজ এই ঘরে আমরাই যেন সেই দুই টিকটিকি। আমাদের লক্ষ্য করে অলক্ষ্যে হয়ত হাসছেন কোন ঈশ্বর! তার হাত থেকে আমাদের রক্ষা করবেন তেমন ঠাকু’মারা কি আর আছেন কোথাও? 

এইসব ভাবছি, ঠিক তখনই টিকটিক করে উঠল দেয়াল ঘড়িটা। চারটা বাজে।

 

“IT’S 4 O’CLOCK AND I THOUGHT OF YOU”

রোজ চারটায় ঝুনুকে পড়াতে ওদের আদালত পাড়ার বাড়িতে যেতাম আমি। 

ঝুনুরা ছিল তিন বোন। সুবিমল বোসের তিন রূপবতী কন্যা - রুমু, রুণু আর ঝুনু। তাদের রূপের খ্যাতি ছিল শহর জুড়ে। বড় কালীবাড়ির উল্টোদিকের সে বাড়ি থেকে বিকেল বেলার নামকীর্তন শোনা যেত। কোন কোন সন্ধ্যায় রাসলীলাও। 

সেখানে যেতে আসতে কত কিষান-কাণাইয়ের ঠেক যে পেরুতে হত আমাকে! তার হিসেব করলে স্বয়ং রসিক কানাইও চমকে উঠতেন। তারা গলির অভূক্ত কুকুরের মতন ঈর্ষায় চেয়ে থাকত আমার দিকে। যেন আমিই ও বাড়ির পোষা সারমেয়টি। 

অনেক বারই এমন হয়েছে যে ও বাড়িতে যাবার বা সেখান থেকে ফেরার সময় কেউ কেউ আমাকে থামিয়ে কথা শুনিয়েছে। কেউ ভয় দেখিয়েছে। কেউ বা হাতে চিঠি গুঁজে দিয়ে বলেছে, ‘মাষ্টার! ঠিকমত যদি পৌঁছাইতে পার তাইলে কইলাম তোমার পোষ্ট মাষ্টারের চাকরিও পাক্কা। রতন কেবিনে সারামাস পেট চুক্তি খাওয়ামু’! 

আমি ঘাড় গুঁজে চলে আসতাম। সুবিমল বোসের বাড়িতে ঢোকার আগে পৌরসভার ড্রেনে ফেলে দিতাম সেই সব চিঠি। কারন চিঠি দেবার সাহস তখন আমার ছিল না। রতন কেবিনে সারা জীবন খাওয়ার বিনিময়েও না। তবে একটা চিঠি আমি আর ফেলতে পারিনি। 

চিঠিটা এসেছিল বাড়ির ভেতর থেকে। আমিও অভ্যাসবশত নিয়ে নিয়েছিলাম হাত পেতে। আর উজবুকের মত ঢোক গিলে বলেছিলাম, কাকে দেব? 

রুণু আমার উচ্চাভিলাষহীনতায় আহত হয়ে বলেছিল, ‘ভাল অংক বুঝলে কি হবে, সংকেত একদম বোঝেন না আপনি’।

কথা সত্য। ছেলেবেলা থেকেই অংকে আমার মাথা ভাল। বেশ ভাল। ওই চিঠি পড়ার পড়ে আমি সংকেতও ভাল বুঝতে শুরু করলাম। 

পত্রপাঠ ঝুনু’কে পড়ানো ছেড়ে দেয়ার সিদ্ধান্ত নিলাম। ওর মাকে গিয়ে বলললাম, জেঠীমা, ঝুনু’কে আর পড়াইতে পারুম না।

‘ক্যা? তর কথা শোনে না; না?’

তা না জেঠীমা। 

‘হ হ বুঝছি। তুই আর কি কইবি? আমি প্যাটে ধরছি, আমি জানিনা! খাঁড়া। ঝুনু? ওই ঝুনু?’

সত্যি কইতাছি জেঠিমা। ঝুনু কিছু করে নাই। সামনে আমার পরীক্ষা। তাই ..

‘সামনে তো ঝুনুরও পরীক্ষারে বাবা।’ 

ততক্ষণে রুণু - ঝুনু চলে এসেছে। পেছনে পেছনে রুমু’দিও। অতএব প্রশ্নোত্তর পর্ব আবার শুরু হল।

রুমু’দি বলল, ‘কি হইছে মা?’

‘ওই দেখ সবগুলা আইছে। আমি তো খালি ঝুনুরে ডাকছি।’

ঝুনু বলল, 'কও মা।’

‘পলাশ কইতাছে, ও নাকি তরে আর পড়াইতে পারব না। আমি তো ভাবছি, তুই আবার কোন শয়তানী করছস। তা এখন কয়, সামনে পরীক্ষাতাই ..।’

হ জেঠিমা, পরীক্ষা। বলে, আড়চোখে তাকালাম রুণুর দিকে। দেখি ও ওর দুই অনিন্দ্যসুন্দর চোখ দুটো আমার দিকেই তাকিয়ে আছে। 

এবার রুণু মুখ খুলল, ‘পরীক্ষা যখন তাইলে থাক মা। পলাশ’দার দিকে সারা শহর তাকাইয়া আছে। তারে আর আটকাইয়ো না।’ 

না, ছাত্রীর বড় বোনের সঙ্গে ইটিস পিটিস কাহিনীর নায়ক আমি হতে চাইনি। তাই ও বাড়িতে যাওয়া ছাড়লাম। কিন্তু আষ্ঠেপৃষ্ঠে জড়িয়ে গেলাম রুণু’র সঙ্গে।  

 

“হৃদয়ে রয়েছ গোপনে, রয়েছ নয়নে নয়নে”

আহা! কী যে সব দিন ছিল! 

রুণুদের স্কুলের ইউনিফর্ম ছিল সবুজ কামিজের সাথে সাদা পাজামা আর ওড়না। কাওকে সেই পোশাকে দেখলেই বুকের কাছে শিরশির করে উঠত। মাঝে মাঝে ইচ্ছে করত, ছুটে গিয়ে রুণুর স্কুলে যাবার পথ হয়ে যাই। ও আমার বুকের ‘পরে হাটুক। 

সেই সময়ের মফস্ব:ল শহরের বাস্তবতায় পাশাপাশি হেটে প্রেম করার মত সাহস আমার ছিল না। এমন কি ওর স্কুলের আসা যাওয়ার রাস্তায় দাঁড়িয়ে থাকার সাহসও না। কিন্তু রুণুর সাহসের কোন অভাব ছিল না। আমার সুবিধা করে দিতে ও ঘুর পথে যাওয়া আসা শুরু করল। 

স্কুল ছুটির সময়ে হয় আমি ‘সঙ্গীতা’য় বসে বসে গান শুনতাম। নয়তো কানুদার বইয়ের দোকানে বসে মাসুদ রানা পড়তাম। আর ভাবতাম কখন ভিক্টোরিয়া রোড ধরে আমার সোহানা আসবে? শুধু একটু চোখের দেখা। কখনও বই বা ক্যাসেট নাড়াচাড়ার ফাঁকে চিঠি দেয়া নেয়া। ক্রমে কানুদার দোকান হয়ে উঠেছিল আমাদের পোষ্ট অফিস। চিঠিগুলো হয়ে উঠেছিল আমাদের ‘হোয়াটস আ্যাপ’।

ওদিকে আমার তখন এইচএসসিতে বসবার সময় ঘনিয়ে আসছে। রুণুরও এস এস সি। তাই ওর বাইরে বেরুনো প্রায় বন্ধ হয়ে গেল। এস এস সি’তে ভাল করেছিলাম বলে, আমাকে ঘিরে সবার তখন অনেক প্রত্যাশা। কিন্তু আমার পড়াশোনা শিকেয় উঠল। 

পড়তে বসে, ঘন্টার পর ঘন্টা রুণুর দেয়া রুমালে নাক ডুবিয়ে ওকে ভাবতাম। শুধু ওকে একবার দেখতে পাবার আশায় আমি বক ধার্মিক হয়ে উঠলাম। সকাল-বিকাল কালীবাড়িতে হানা দিতে লাগলাম। রকম দেখে আমার সেজদি বলেছিল, ‘অতি ভক্তি কিন্তু চোরের লক্ষণরে’। আমি অবশ্য হাজিরা দিয়ে যেতে লাগলাম। যদি দেখা হয়ে যায়! দেখা হল রথ যাত্রার দিন। 

 

অপেক্ষাই ছিল প্রেমের ডাকনাম

কালীবাড়িতে সেদিন হাজার মানুষের ভীড়। 

সকালে অনেকক্ষণ বসে থেকে ফিরে এলাম। দেখা নেই। বিকেলে আবার গেলাম। সন্ধ্যা হয় হয়। মনে বিরহের মেঘ ঘন হয়ে ঝরে পড়তে চাইছে। পাতার বাঁশি কিনে বাজানোর চেষ্টা করছি। এমন সময় সে এল। 

কালীবাড়ির সেই বিশাল গেটে হঠাৎ থমকে গেল সময়। ওকে দেখার সঙ্গে সঙ্গেই আর সবকিছু কেমন ঝাপসা হয়ে গেল। বাগানে আরও হাজারটা ফুলের ভীড়ে সূর্যমুখীর দিকে যেমন চোখ যায় সবার আগে, তেমনি আমার দৃষ্টি বিঁধে রইল রুণুর উপরে। অস্ত যেতে যেতে স্বয়ং সূর্যদেবও যেন থমকে রইলেন ওর মুখের ‘পরে। আর আমি? ঝাপসা হয়ে যাওয়া ভীড়ের ভেতর পাতার বাঁশি মুখে স্থানুর মতন দাঁড়িয়ে রইলাম। 

আমার ধ্যান ভাঙ্গল যখন ঝুনু এসে বলল, ‘আরে! পলাশ দা! আপনার না পরীক্ষা? কালীবাড়িতে কি করেন?’ 

আমি আর কি বলব? বুঝলাম পড়ানো বন্ধ করার জন্য ঝুনু ক্ষেপে আছে আমার উপরে। সেই দিনের পরে আমি আর ওদের বাড়ি যাইনি। শুনেছি ও নাকি কান্নাকাটিও করেছে। 

কাজেই, কিছু না বলে কেবল হাসলাম। তারপর ঢপ করে জেঠীমাকে প্রণাম করে ফেললাম। উনি বলে উঠলেন, ‘আইছে ভাল করছে। তগরেতো টাইনাও আনতে পারি না। দ্যাখ, এই বয়সেই কি ভক্তি।’ তারপরে মাথায় হাত বুলিয়ে দিতে দিতে বললেন, ‘বাইচা থাক বাবা। শতায়ু হও।’ 

পরিবেশটা সহজ হয়ে গেল। আমিও বোস পরিবারের সাথে ভিরে গেলাম। লোকেরা রথ টানছে। আমরাও রথের পিছনে হাটছিলাম। হঠাৎ রুণু যেন কি বলল ওর মাকে। শুনে জেঠীমা ডাকলেন, ‘পলাশ?’ 

আমার তো আত্মা খাঁচাছাড়া হওয়ার জোগাড়। চোরের মন পুলিশ পুলিশ। গলা শুকিয়ে গেল। কোন রকমে বললাম, কি জেঠীমা? 

‘রুণু একটু বাসায় যাইব। যে ভীড়! তুই অর সাথে একটু যাতো।’ 

শুনে আমার ঘাম দিয়ে জ্বর ছাড়ল। বললাম, আইচ্ছা জেঠীমা। তারপর অনুসরণ করলাম রুণুকে। ও ততক্ষণে হাঁটতে শুরু করে দিয়েছে। পেছনে শুনতে পেলাম ঝুনু বলছে, ‘দিদি বাসায় যায় ক্যান মা? আমিও যাই? ..’ 

সেদিনই প্রথম। আমি আর রুণু পাশাপাশি হেটেছি। শুধু আমরা দুজন। 

আমরা হাটছি, চারপাশ থেকে বহু মানুষের ভীড় এসে আমাদের আড়াল করে দাঁড়াল। জনতার চিলচিৎকার হাতে হাত ধরে দাঁড়িয়ে আমাদের কথাকে দিল গোপণীয়তার ঘেরাটোপ। সেই দুধ-সন্ধ্যায় সমস্ত পৃথিবী এসে জগন্নাথদেবের রথ টেনে নিয়ে চলে গেল একদিকে। আর আমরা উল্টোদিকে। ধীর পায়ে হেটে যেতে লাগলাম প্রথম প্রেমের অমরাবতীর দিকে। 

 

“একা মেয়েটার নরম গালের পাশে”

বাড়ির গেটের তালা খুলে রুণু গট গট করে ভেতরে ঢুকে গেল। 

আমি খুব ধীরে, যেন কেউ টের না পায় এমন নি:শব্দে গেট বন্ধ করলাম। ছোট্ট উঠোন টপকে রুণু ততক্ষণে ঘরের দরজায় চাবি ঘুরাচ্ছে। আমি গিয়ে দাঁড়ালাম ওর ঠিক পেছনে। সেই প্রথম এত কাছে। আর একটু ঝুকলেই ওর ঝরণার মত চুলে আমি সাঁতার কাটতে পারি। সেদিনই প্রথম আমি টের পেলাম, কি এক অদ্ভুত সুন্দর গন্ধ ওকে ঘিরে আছে। দরজা খুলে গেল। 

রুণু ভেতরে ঢুকে একপাশে সরে দাঁড়াল। আমি ঢুকে ঘুরে দাঁড়ালাম। ও ততক্ষণে দরজা আটকে তাতে পিঠ ঠেকিয়ে ঘুরে দাঁড়িয়েছে। আমরা তখন মুখোমুখী। আমি বলতে যাচ্ছিলাম যে কি জন্য ও বাসায় এল। কিন্তু আমার কথারা জন্মাবার আগেই রুণুর মুখের ভেতরে গিয়ে গলে গেল। আমার মুখের ভেতরে তখন ওর উঞ্চ ঠোঁট। ওরই মতন চঞ্চল। 

একটু আগেও যখন ওর সঙ্গে হেঁটে আসছিলাম, কেমন যেন বিবশ ছিলাম। ঘোরের ভেতর ছিলাম। কিন্তু ওকে আমার বুকের আলিঙ্গনের ভেতর পেয়ে আমার ঘোর কেটে গিয়েছিল। আমি এক ঝটকায় কিশোর থেকে পুরুষ হয়ে উঠেছিলাম সেদিন। 

আমি ওকে পাঁজাকোলে তুলে নিয়েছিলাম। ওর দস্যিপনা তখন ভোরের শিউলির মতন আমার বুকের ‘পরে ছড়িয়ে আছে। সেই অদ্ভুত গন্ধটা আমায় জাগিয়ে দিয়ে পাগল করে তুলেছে। মার্তন্ডের মত জ্বলে উঠেছে আমার যৌবন। আমি অভূতপূর্ব ক্ষীপ্রতায় ওকে নিয়ে গিয়ে শুইয়ে দিয়েছিলাম বিছানার উপর। ওখানে ও তখন শুষ্ক সৈকতের মতন শুয়ে। আমি দ্রুত সমুদ্র হয়ে লুটিয়ে পড়লাম। 

 

“তুমি আর আমি মাঝে কেহ নাই কোন বাধা নাই ভুবনে” 

না। আমাদের কোন পূর্ব প্রস্তুতি ছিল না। 

হ্যাঁ, ততদিনে আমরা দু’জন দুজনকে পাগলের মত চাইতেও শুরু করেছি। দু’জনের চিঠিতেই সেই ব্যাকুলতার চর্চা ছিল। কিন্তু সেইদিন, মিলনের সেই চরমক্ষণে আমি কেন যেন রমনজয়ী হয়ে উঠে দাঁড়িয়েছিলাম। ওর কপালে চুমু খেয়ে বলেছিলাম, আজ না, রুণু। এভাবে না। ওর চোখে ছিল যুগপৎ বিষ্ময় আর মুগ্ধতা। আমি তখনও দাঁড়িয়ে। ও বসে থেকেই আমায় জড়িয়ে ধরেছিল অনেকক্ষণ। আমি মনে মনে বলেছিলাম, “আমি পাইলাম, আমি ইহাকে পাইলাম”। 

এরপরে, আমরা কি ফিরে গিয়েছিলাম কালীবাড়িতে? হয়ত। কিংবা যাইনি। সেই সন্ধ্যার পরে, আর সবকিছুই খুব অপ্রাসঙ্গিক হয়ে গিয়েছিল। সাপের খোলসের মতন খসে পড়ে গিয়েছিল যাপিত জীবনের দ্বিধা, সংকোচ আর লোকলজ্জা। সেদিন আমার সামান্যকে এমনি অনায়াসে উর্দ্ধে তুলে ধরেছিল রুণু’র প্রেমের বরাভয়।

এর পরে আমাদের সময় সওয়ার হল বুলেট ট্রেনে। পাশ করার পর আমি ইঞ্জিনিয়ারিং পড়তে চলে গেলাম ঢাকায়। বছর না ঘুরতেই বৃত্তি নিয়ে ইন্ডিয়ার খরকপুরে। ততদিনে এক-দুই করে আমার আর রুণু’র কথা পরিচিত মহলে রাষ্ট্র হয়ে গেছে। আমাদের বৃহস্পতি তখন তুঙ্গে। কী করে সেই রুণু’কেই হারিয়ে ফেললাম আমি?

 

“কোথায় রাখ আমাকে, তুমি বল না”

খরকপুরে প্রথম দিকটায় আমি বুঁদ হয়ে ছিলাম কুয়াশা প্রহর নামের এক অডিও আ্যলবামে।

সারাদিন ঘুরিয়ে ফিরিয়ে জুয়েলের ‘কোথায় রাখ আমাকে তুমি বল না’ গানটা শুনতাম। তখন কী আর জানতাম, সারা জীবন ধরেই আমাকে এই প্রশ্নের উত্তর খুঁজে বেড়াতে হবে!

আমি যখন সেকেন্ড ইয়ারে, রুমু’দির বিয়ে হয়ে গেল। রুণুর চিঠি থেকে জানলাম, ছেলে আমেরিকায় থাকে। এইটুকুই। আমার তখন মিডটার্ম চলছে। বিয়েতে থাকতে পারলাম না। যাহোক মাস তিনেক বাদে দেশে ফিরে দেখা করতে গিয়ে জানলাম যে রুমুদির বর আমেরিকায় ফিরে গেছেন। কিছুদিন পরে দিদিকেও নিয়ে যাবেন। 

ক্রমে সেই কিছুদিন গড়িয়ে মাস, এমনকি বছর পেরিয়ে গেল। ভিসা নিয়ে কি যেন সব জটিলতা ছিল। রুমু’দির বর আটকে গিয়েছিলন। কারণ একবার আমেরিকা ছাড়লে আর হয়ত ফিরতে পারবে না। তই নিজেও পারছিলেন না দেশে ফিরতে। আবার দিদিকেও নিয়ে যেতে পারছিলেন না বৈধ কাগজপত্রের অভাবে। 

রুণুর চিঠিতে দিদির আর ওদের পরিবারের হতাশার কথা পড়ে মন খারাপ হয়ে যেত। কিন্তু আমার যে তখন পড়ার খুব চাপ। ওকে যতটা সাহস বা সান্ত্বনা দেবার দরকার ছিল তা আমি দিয়ে উঠতে পারিনি। আমার চিঠি লেখাও কমে গিয়েছিল। মনে আছে, রুণু’র তিনটা চিঠির উত্তরে কোনরকমে হয়ত আট/দশ লাইন লিখে পাঠাতাম। সব মিলিয়ে রুণুও অভিমান করে চিঠি লেখা কমিয়ে দিল। এর কিছুদিন পড়েই ঘটল সেই ঘটনা। 

 

“হাওয়ায় হারিয়ে ফেললাম”

বিয়ের প্রায় দেড় বছর পর, রুমুদির বর এক উপায় বের করলেন। 

তিনি তখন ঘোষিত অবৈধ। কাজেই এক বন্ধুর স্মরণাপন্ন হলেন। যিনি তখন দেশে, মাস তিনেক পড়ে ফিরবেন। তিনি রুমুদি’কে তার কাগুজে বউ হিসেবে নিয়ে যেতে রাজি হলেন। এসবই ঘটল খুব গোপনে। রুণুর বাবা-মা স্বাভাবতই ব্যাপারটা পাঁচকান করতে চাননি। কামাল সাহেব তার লাল টুকটুকে কাগুজে বউকে নিয়ে গেলেন আমেরিকায়। কে জানে পথে তাদের নিজেদের ভেতর কোন বোঝাপড়া হয়েছিল কী না! আমেরিকায় ফিরে গিয়ে কামাল সাহেব আর বউ ফেরত দিলেন না। 

এরপর যা হয়! পরিবারটার মরাল ভেঙ্গে গেল। বছর গড়িয়ে গেল। কিন্তু নানা লোকের নানা কথা-মন্তব্য থামল না। সামাজিকভাবে ক্রমশ কোনঠাঁসা হয়ে পড়ল ওরা। একদিন হঠাৎ স্ট্রোক করে শয্যাশায়ী হলেন রুণুর বাবা। পরিবারটির তখন পথে বসার অবস্থা। 

আর আমি? তখনও দেশের বাইরে। নিজের প্রেমকে মধ্যবিত্তের উচ্চাকাঙ্খার লক্ষণরেখায় বেঁধে রেখে, ‘ইঞ্জিনিয়ার’ হবার সোনার হরিণের পেছনে ছুটছি।

রুমুদির বর ততদিনে বৈধতা ফিরে ফেয়েছেন। তার বুকে তখন প্রতিশোধের অগুন। তিনি প্রস্তাব দিলেন, রুণুকে তার সঙ্গে বিয়ে দিলে তিনি ওদের পরিবারের দ্বায়িত্ব নিতে রাজি আছেন। রুণু কী তবে ওর পরিবারকে বাঁচানোর সিদ্ধান্তই নিয়েছিল?

এই সব কথাই আমি জেনেছিলাম, আমাকে লেখা রুণুর শেষ চিঠি থেকে। ওর সাথে আমার আর দেখা হয়নি কোনদিন।

 

“এ এক অন্য প্রমের গান!”

পাশ করে বেরিয়ে যথারীতি চাকরীতে ঢুকেছিলাম। 

দ্রুত উন্নতি হতে লাগল। স্পষ্ট মনে আছে, তোমার সঙ্গে পরিচয় হয়েছিল তোমার বাবার দেয়া এক পার্টিতে। 

তিনি তখন রোডস এন্ড হাইওয়ের এমডি আর আমি ওঁর প্রিয় তরুণ তূর্কি। তুমি সদ্য বিশ্বভারতি ফেরত। আমাদের খুব জমে গিয়েছিল সেই পার্টিতে। তোমার নাম ‘রুণু’ শুনে আমি চমকে উঠেছিলাম। আর আমি কবিতা লিখি শুনে তুমিও। বিশ্বাসই করতে চাইছিলে না। মনে আছে?

তোমার চোখে মুগ্ধতা দেখেছিলাম আমি। দেখে ভয় পেয়ে গিয়েছিলাম। চোখ ভরা প্রেম আমি আগেও দেখেছি রুণু। তার পরিণাম আমার এই মৃত মাছের চোখের মত হৃদয়। কিন্তু তুমি? 

মেয়েরা নাকি চোখ দেখলেই পুরুষের মন বুঝতে পারে? তুমি কেন পারনি?সেদিন আরও অনেক এ্যাডমায়ারের মতই আমাকে এড়িয়ে চলে যেতে পারতে তুমি। আমরা কেবল বন্ধুও তো হতে পারতাম। অথচ আমাকে অপ্রস্তুত করে দিয়ে তোমার দিক থেকে সেটা দ্রত ভালবাসায় গড়াল। এমন নি:স্বার্থ ভালবাসা এর আগে আর কোন নারী দেয়নি কোন পুরুষকে। 

কিন্তু আমি যে ততদিনে ভাল না বাসতে শিখে গেছি। উপর চালাক হয়ে উঠেছি। নিজেকে অস্বীকার করে ভান করতে শিখেছি। হয়ত উপরে উঠার সিঁড়ি আর তুমি বরাবর হয়ে গিয়েছিলে। কিংবা অবচেতনে ‘রুণু’কে পাবার মোহে তোমার বানভাসী ভালবাসায় ঝাঁপ দিয়েছিল আমার বিবশ মন।

তোমার বাবা ছিলেন একজন সত্যিকারের আধুনিক মানুষ। তিনি ধর্ম নামের সামাজিক ব্যাধিটাকে সামলালেন। শুরু হল আমাদের সংসার। বছর না গড়াতেই আমার পীড়াপিড়িতেই তুমি দেশ ছাড়তে রাজী হলে। 

আমরা এলাম আমার স্বপ্ন ভঙ্গের ঠিকানা - আমেরিকায়। কেন? ‘রুণু’র কাছাকাছি যেতেই কি? হ্যাঁ, ‘রুণু’কে আমি ভুলতে পারিনি। ওর জন্য ভালোবাসা কেটে গিয়ে যদি ঘৃণা তৈরী হত! তাহলে হয়ত তোমার প্রতি এই অন্যায় আমি করতে পারতাম না রুণু। 

কিন্তু সেই ঘটনার পরে, ঘৃণার বদলে ‘রুণু’র উপর, ওঁর নি:স্বার্থ সিদ্ধান্তের উপর আমার শ্রদ্ধা বরং বেড়ে গিয়েছিল। আমায় ছেড়ে গিয়ে ওঁর জন্য আমার ভালবাসাকে আসলে অমরত্ব দিয়ে গিয়েছিল ‘রুণু’। 

ঘৃণা আমি করতে শুরু করলাম নিজেকে। নিজের আত্মরতির সুখকে। আর তা না হলে, আমিও হয়ত তোমাকে সত্যিকারের ভালবাসতাম রুণু। আমাকে ক্ষমা করো না তুমি। কক্ষনো না।

 

রাজন নন্দী
কবি ও লেখক

 

এই লেখকের অন্যান্য লেখা



আপনার মূল্যবান মতামত দিন:


Top