সিডনী রবিবার, ২৭শে সেপ্টেম্বর ২০২০, ১২ই আশ্বিন ১৪২৭

বুয়া কেলেংকারি (রম্য গল্প) : সত্যজিৎ বিশ্বাস


প্রকাশিত:
৫ আগস্ট ২০২০ ১৭:১৪

আপডেট:
৫ আগস্ট ২০২০ ১৭:১৭


বিপদ মিসকল দিয়ে আসে না। রিপন সাহেবের বেলাতেও আসেনি। ঝুপ করে এসে টুপ করে পড়েছে। এমন একটা ঘটনা যে ঘটবে রিপন সাহেব ঘুণাক্ষরেও যদি টের পেতেন, ঝামেলার ধারে কাছ দিয়েও হাঁটতেন না। বলা নেই, কওয়া নেই ঝামেলার দায়ভার এসে পড়লো রিপন সাহেবের ঘাড়ে।
ঘটনা অতি সামান্য। হঠাৎ করেই এতদিনের কাজের মেয়েটা বেঁকে বসেছে, আর কাজ করবে না। কী ব্যাপার প্রশ্ন করলে কোন জবাব দেয় না। একটু কেমন কেমন সন্দেহ হওয়ায় রিপন সাহেবের গিন্নী মিসেস লিলি আড়ালে নিয়ে অনেকবার জিজ্ঞাসা করেছে। হাতে, মাথায় হাত বুলিয়ে বুঝিয়ে বলেছে- যাবি যা, কিন্তু কি জন্য যাচ্ছিস বলে যা। বজ্জাত মেয়েটা মুখে খিল দিয়ে রেখেছে। কার্য, কারণ কিছুই প্রকাশ করছে না। এমন না যে মেয়েটা কথা কম বলে। এমনিতে কথার পপকর্ণ ফোঁটায় কিন্তু কেন যেতে চায় জিজ্ঞাসা করলেই মুখে ফেবিকল।
আজ আর মেয়েটা শুধু মন খারাপ করেই বসে থাকেনি, কাঁদতে বসে গেছে। তের, চৌদ্দ বছরের কাজের মেয়ে যখন কাঁদতে বসে, ব্যাপার আর সাধারনে থেমে থাকে না। ‘অ’ এর দিকে উপচে পড়া শুরু করে। রিপন সাহেব অস্থির পায়চারি শুরু করে দিলেন।
মেয়েদের সন্ধানী চোখ ইলেকট্রনিক রাডারকেও হারিয়ে দেয়। রিপন সাহেবকে সেই দৃষ্টিতে স্ক্যান করে বেডরুমের বাইরে পাঠিয়ে দিলেন মিসেস লিলি। তারপর সপাটে দরজা বন্ধ করে কাজের মেয়েটাকে নিয়ে পড়লেন। আমি কাউকে কিচ্ছু বলব না, যাওয়ার আগে শুধু বলে যা, কেন যাবি? অনেকক্ষণ পর বড় একটা শ্বাস ফেলে মেয়েটা ফিসফিস করে উঠল, এই বাসাত ভালা লাগেনা।
‘কেন ভালো লাগে না, বল?’ ঝাড়া পনের মিনিট তাঁকিয়ে থেকেও উত্তর না পেয়ে বালিশে মুখ ডুবিয়ে কাঁদতে লাগলেন মিসেস লিলি।
বউয়ের চোখের জল উপেক্ষা করে পাষাণেরা। বুকে লোম না থাকলেও রিপন সাহেব পাষাণ না। মেয়েটাকে গেস্টরুমে পাঠিয়ে স্ত্রীকে বোঝাতে বসলেন। মন খারাপ কোরো না তো, আরেকটা কাজের মেয়ে ঠিক জোগাড় করে আনবো।
সময় জিনিষটা বিশাল ব্যাপার। কিছু সময় আছে, যখন অনেক কথা বলে বউকে শান্ত করতে হয়। আরো কিছু সময় আছে, যখন কোন কথা না বলে বউকে শান্ত করতে হয়। কোন সময়ে কোন থিয়োরী কাজে লাগবে, না জানলে শুধু বিপদ না, মহাবিপদ। দশ নাম্বার মহাবিপদ সংকেতের ঝান্ডা আঁচ করতে না পেরে রিপন সাহেব মহাবিপদে পড়লেন।
সুপ্ত আগ্নেয়গিরি যেন জীবন্ত হয়ে উঠলো। মিসেস লিলির মুখ থেকে ছিটকে ছিটকে পড়তে শুরু করলো উত্তপ্ত লাভা, ‘তা তো পারবেই। তোমার হাতে তো অফুরন্ত কাজের মেয়ের স্টক থাকবেই। আচ্ছা সত্যি করে বলতো কী এমন ঘটনা ঘটলো যে, এতদিনের কাজের মেয়েটা মুখ ফুটে বলতে পর্যন্ত পারছেনা আমাকে। এতটুকু মেয়ের মধ্যে কি আছে, যা আমার মধ্যে নেই? ওর কাছেই তোমাকে যেতে হলো শেষ পর্যন্ত! তুমি এতটা নীচে নামতে পারলে? ছিহ’
রিপন সাহেব তীব্র আর্তনাদ করে উঠলেন, ‘আমি? এসব কী বলো তুমি? আমাকে এমন মনে হয়?’ উত্তর শুনে মিসেস লিলি তেলে জলে ছিটকে উঠলেন, ‘তুমি ছাড়া এ বাসায় পুরুষ মানুষ আর কেউ আছে?’ রিপন সাহেবের মুখ থেকে ফস করে বের হয়ে গেল, ‘কেন, তোমার বাবা চিকিৎসার জন্য গত মাসে দিন পনের ছিল না?’ ঝাড়ু হাতে স্ত্রী ছুটে আসার আগেই বাথরুমে ঢুকে দরজা লাগিয়ে দিলেন রিপন সাহেব।
শ্বশুড় বাড়ির চৌদ্দ গুষ্টির চরিত্র উদ্ধারের পরেও দরজা খোলার নাম নেই দেখে বাইরে থেকে ছিটকিনি লাগিয়ে দিলেন মিসেস লিলি। রিপন সাহেব তবুও খুশি, যাক বাবা, কিছুটা সময় তো পাওয়া গেল। মাথা ঠান্ডা করে কমোডে বসে ভাবতে বসলেন, এ উটকো বিপদ থেকে উদ্ধারের উপায় কী?
‘মানুষের জীবনের সবচেয়ে বড় বুদ্ধিটা বের হয় কমোডে বসে’ উক্তিটা কোন মনীষী কমোডে বসে বের করেছেন মনে করতে পারলেন না রিপন সাহেব। তবে যেই করুক, সেই মনীষী জিনিষ একটা। মনীষীর বাণীর সত্যতা প্রমাণে একটুও দেরি হলো না। এরমধ্যেই বুদ্ধি একটা বের হয়ে গেছে। না, না, পেছন দিয়ে না। ভাগ্যিস, পরনের ফতুয়ার পকেটে মোবাইল সেটটা ছিল। সাথে সাথে ফোন দিলেন গিন্নীর একমাত্র ভ্যাগাবন্ড ছোটভাই বুলেটকে। একমাত্র সেইই পারবে পরিস্থিতি নিয়ন্ত্রণে আনতে। যত যাই টিটকারী করুক, বুলেট তার দুলাভাইকে যথেষ্ঠ পরিমানে ভালও বাসে।
বুলেট বুলেটের বেগেই হাজির হয়ে ডাইনিং টেবিলে মোবাইল কোর্ট বসালো। বোনের কাছে সব শুনে সন্দেহের চোখে তাকাল দুলাভাইয়ের দিকে। রিপন সাহেব প্রবল বেগে দু’পাশে মাথা নেড়ে ইশারায় নিজের অবস্থান পরিষ্কার জানিয়ে দিলো।
কোন এক রহস্যময় কারণে বুয়ারা বাসার ফটকা ছেলেপেলে খুব পছন্দ করে। এ মেয়েও তার ব্যতিক্রম না। বুলেটকে দেখেই চা বানিয়ে নিয়ে এসে মুচকি হেসে বলল, আর কিছু লাগব ভাইজান? রিপন সাহেব পরিষ্কার শুনলেন, ‘ভাইয়ের’ চেয়ে ‘জান’ টা একটু বেশি দরদ দিয়েই উচ্চারণ করলো বদ মেয়েটা। পরিস্থিতি অনুকূলে না থাকায় চুপ করে হজম করে নিলেন বিষয়টা।
চায়ের কাপে চুমুক দিয়ে বুলেট তৃপ্তির ভঙ্গিতে বলল, এত ভালো চা বানানো কার কাছ থেকে শিখলে? আহ, নিমিষে চাঙ্গা। এক কাজ করো, চলো আমাদের বাসায় কাজ করবে। বদ মেয়েটা লাফ দিয়ে উঠে বলল, যাইতে পারি, তয় একটা শর্তে। আপনাগো বাসায় জি বাংলা, জি সিনেমা আছে তো? এই বাসায় এইগুলা চেলেনের একটাও নাই। মানুষ কেমনে থাকে, কন ভাই-জান?
একসাথে তিনটে ঘটনা ঘটলো ডাইনিং টেবিলে।
একঃ রিপন সাহেব আহ্ বলে একটা স্বস্তির নিঃশ্বাস ছুঁড়ে দিলেন শুন্যে।
দুইঃ মিসেস লিলি লজ্জিত মুখে স্বামীর দিকে তাঁকালেন।
তিনঃ কেস সমাধানের আনন্দে বুলেট ইয়েস-ইয়েস বলে হ্যান্ডসেক করে বসল কাজের বুয়ার সাথে।
---

সত্যজিৎ বিশ্বাস
রম্য লেখক ও শিশু সাহিত্যিক
* রম্য বিভাগীয় সম্পাদক- কিশোর বাংলা
* নির্বাহী সম্পাদক- কিশোরকাল
* কন্ট্রিবিউটার – মাসিক স্যাটায়ার কার্টুন ম্যাগাজিন ‘উন্মাদ’, জাতীয় দৈনিক যুগান্তর ‘বিচ্ছু’, দৈনিক ইত্তেফাক ‘ঠাট্টা’।

 

এই লেখকের অন্যান্য লেখা



আপনার মূল্যবান মতামত দিন:


Top