সিডনী রবিবার, ২৭শে সেপ্টেম্বর ২০২০, ১২ই আশ্বিন ১৪২৭

নুনিয়াপট্টি : তামিম মাহমুদ সিদ্দিক


প্রকাশিত:
৫ আগস্ট ২০২০ ১৭:২৫

আপডেট:
৫ আগস্ট ২০২০ ১৮:২৭

 

শিবেন হাড়ির ছেলে সঞ্জয়। তিন মাস জেল খাটার পর মুরাদ উকিলের জিম্মায় আজ ছাড়া পেয়েছে। তখন বর্ষাকাল। একটানা পাঁচদিন ঝরবার পর বৃষ্টির বেগ আজ কিছুটা কমেছে। জেল থেকে বের হয়ে কাউকে কোথাও না পেয়ে সামনের দোকান থেকে একটা বিড়ি জ্বালিয়ে নিয়ে হাঁটতে লাগলো সে। লিটন ব্রীজ থেকে পশ্চিমদিকে শহরের প্রধান সড়ক ধরে মিনিট দশেক হাঁটলে সরিষাহাটির মোড়। সেখান থেকে বামদিকে অপেক্ষাকৃত সরু রাস্তা বেয়ে কিছুদূর গেলেই নুনিয়াপট্টি। সেখানেই শিবেন হাড়ির বাড়ি। সরকারি খাস জমির উপর দখল করে তোলা ছোটো বড় শ' তিনেক ঘর। 

হাড়ির মৃত্যুর পর পৈত্রিক সূত্রে পাওয়া দুইটি ঘর সঞ্জয়ের। তারই একটিতে সাত বছরের কানাইসহ স্বামী পরিত্যাক্তা বোনকে নিয়ে তার মা, আর অন্যটিতে তিনটি কন্যাসন্তানসহ কণিকাকে নিয়ে তার সংসার। দশ বছর আগে বাপ বেঁচে থাকতেই আঙ্গুরির বিয়ে হয়েছিলো পল্টু হাড়ির সাথে। বনিবনা না হওয়ায় বছর পাঁচেক আগে ছাড়াছাড়ি হয়েছে। সেই থেকে আঙ্গুরি এই বাড়িতেই থাকে। 

নুনিয়াপট্টির শেষ মাথায় একটা বড় সরকারি পুকুর। তারই পশ্চিম পাড়ে হাড়িদের ঘর। পট্টির শুরুতেই সুবল নুনিয়ার বাড়ি। তারপর মালতিদের। গলির প্যাঁচগুলো অতি সূক্ষ্ণ ও ঘিঞ্জি। একজনের উঠান থেকে আরেক জনের শোবার ঘর পর্যন্ত দেখা যায়। বেশিরভাগ ঘর ইঁট, বাঁশ ও টিনের ছাপড়া দিয়ে তৈরি। একেকটা ঘরে ছয়-সাতজন মিলে গাদাগাদি করে থাকে। একটানা বৃষ্টিতে গলির মুখের কাদাগুলো পচা গোবরের মতো গন্ধ ছড়িয়েছে। কোনো রকমে পড়ি পড়ি করতে করতে সেটাকে অতিক্রম করে এগিয়ে যেতেই মালতির সাথে দেখা। শিবু বাঁশফোঁড়ের বউ। বিশ বছর আগে এই পট্টিতে এসেছে। পক্ষাঘাতগ্রস্ত হবার আগ পর্যন্ত শিবুই ছিলো এই পাড়ার অঘোষিত সর্দার। মালতির চোখে মুখে তারই একটা প্রচ্ছন্ন ছাপ এখনও রয়ে গেছে। সঞ্জয়কে দেখেই চোখ আকাশে তুলে বললো,"কোথায় গিয়েছিলে গো? কতোদিন হলো মুখটা পর্যন্ত দেখি নি!"

বয়স পঁয়ত্রিশ পেরোলেও মালতির এখনো ভরাট শরীর। ছোটো খাটো ব্লাউজ দিয়ে বুকটা টান টান করে বাঁধা। এ পাড়ার মহিলাদের শাড়ি পড়বার ধরণটাই এমন। রঙিন প্রিন্টের শাড়ি শরীরের উপর চিকন করে জড়িয়ে রাখে। অপরিচিত লোক দেখলেই আঁচল দিয়ে পেট এবং পিঠের খোলা অংশগুলো ঢেকে রাখার ব্যার্থ চেষ্টা করে।

কথার কোনো জবাব না দিয়ে গট গট করে হাঁটতে হাঁটতে বাড়ির দিকে পা বাড়ালো সঞ্জয়। পেছন থেকে দুই ধাপ এগিয়ে এসে হাসতে হাসতে মালতি আবার বললো," এতো রাগ করলে চলে? কী আর এমন হইসে? সন্ধ্যায় একবার আইসো না কেনে?"

তিনমাস জেলে থাকার পর সঞ্জয়ের এই ফিরে আসাতে তার মা, বউ আর সন্তানগুলো ছাড়া পাড়ার আর কারো মধ্যে তেমন কোনো উৎসাহ দেখা গেলো না। এসব আজকাল ডালভাতের মতো। প্রায়ই ঘটে থাকে। ইচ্ছে হলেই এক ভ্যান পুলিশ এসে আজ সঞ্জয়, কাল নিতাই, পরশু ভুতুকে উঠিয়ে নিয়ে যায়। তারপর দু-দশদিন পর সবাই ফিরে আসে।

নুনিয়াপট্টির শুকরগুলো ময়লা ফেলার গাড্ডির ভেতর সারাদিন ঘঁত ঘঁত করে। ইঁট বিছানো রাস্তার ধারে মহিলারা কাজ সেরে এসে বসে। শরীর জুড়ায়। উলঙ্গ শিশুর দল কাদা মাখামাখি খেলে। নর্দমার শুকরের সাথে এদের দৃশ্যত কোনো পার্থক্য নেই।

বংশপরম্পরায় ওদের সকলেরই পরিচয় এক। সুইপার। আরো ভালো করে বলতে গেলে 'মেথর'। সময়ের সাথে সাথে অনেকের পেশার পরিবর্তন ঘটলেও পদবীর পরিবর্তন কারোই ঘটে নি। সকাল হবার আগে আগে শহরের সমস্ত আবর্জনা তুলে ফেলে দিয়ে আসে ছোটো যমুনা নদীর তীরে, 'মলফেলা' গাড্ডিতে। তারপর ঘরে এসে যে যার মতো ঝুঁকে পড়ে বিভিন্ন কাজে।

সেদিন ঘুম থেকে উঠতে উঠতে সঞ্জয়ের সন্ধ্যা হলো। তিন মাসের ধকল এক বিকেলের ঘুমে তার কিছুতেই কাটবে না। ভেজা মুড়ির সাথে চিনি মিশিয়ে গপাগপ কয়েক গাল খেয়ে বাড়ি থেকে বের হলো সে। মালতিদের উঠানে এখন অনেক ভিড়। স্বজাতি ছাড়াও আজকাল শহর থেকে অনেক প্যান্ট শার্ট পড়া ভদ্রলোক ছদ্মবেশে এখানে আসে। এ সময় মালতির ব্যাস্ততা ফুরায় না। এক হাতে তাকে সবকিছু সামলাতে হয়। শিবু ভালো থাকতে দুজনে মিলেই করতো। এখন পঞ্চান্ন পেরনো এই লোকটি করুণ বৃদ্ধের মতো সারাদিন বারান্দায় বসে বসে ঝিমায়। বাম সাইড পুরোপুরি অচল। কথা বলতে গেলে জরিয়ে আসে।

কোনোদিকে না তাকিয়ে সোজা মালতির ঘরে গিয়ে ঢুকলো সঞ্জয়। মালতি তখন বড় একটা চাড়ির ভিতর থেকে প্লাস্টিকের জগে করে চুয়ানি তুলছিলো। সঞ্জয়কে দেখেই ওর দিকে জগটা এগিয়ে দিয়ে বললো,"ভালোই করেছো। এখানে বসে বসে গিলতে থাকো। আমি ওদিকটা সামলে আসি।"

বৈকালিক ঘুমে শরীরে শৈথিল্য এলেও রাগ তার তখনো কমে নি। হাত থেকে জগটা টেনে নিয়ে বললো, "সে জন্যই এসেছি। নইলে এ বাড়িতে পা রাখতাম না।"

মালতি এবার হেসে ফেললো। বললো, "দোষ দিও না ভাই। এতোগুলো গাঁজা নিয়ে এসে তুমি সামলাতে পারলে না। আমার কী করার ছিলো, বলো? তোমাকে বাঁচাতে গেলে পুলিশ আমাকে সুদ্ধ ধরে নিয়ে যেতো।" 

-"ভালোই হতো! জেলে আমার একা একা এভাবে পচতে হতো হতো না।"

বারান্দায় বসে থাকা শিবুর করুণ মুখের দিকে তাকিয়ে মালতি বললো, "তখন এই লোকটার কী হতো, শুনি?"

ভাত গাঁজিয়ে চুয়ানি তৈরি করার ক্ষমতা অনেকেরই আছে। কিন্তু সেটাতে পরিমান মতো পানি মিশিয়ে দু একটা নেশার বড়ি গুলিয়ে আরো সুস্বাদু করার ব্যাপারে মালতির জুরি নেই। অনেকের লাইসেন্স থাকলেও কাস্টোমার তাই মালতির ঘরেই বেশি। এ পাড়ার পুরুষেরা সকলেই মদ খায়। মদ খাওয়া এদের ঐতিহ্য। জন্ম, মৃত্যু, হাসি, কান্না সব উপলক্ষ্যেই এরা মদ খায়। বড়লোকদের সাথে এদের মদ খাওয়ার পার্থক্য হলো, বড়লোকেরা মদ খেয়ে মূল্যবোধ হারায় আর এরা মদ খেয়ে মূল্যবোধ সঞ্চয় করে।

 

সবাই চলে যাওয়ার পর মালতি নিজেও খানিকটা খায়। তারপর বারান্দায় বসে থাকা শিবুর পাশে গিয়ে বসে। জীর্ণ হাত-পা দুটি মালিশ করে দেয়। পরম মমতায় স্বামীর জড়িয়ে যাওয়া শব্দের নিশানা ধরে ধরে গল্প করে। খিলখিল করে হাসে। কোনোদিন ইচ্ছে হলে খায়, না হলে ঘুমিয়ে পড়ে। কোনো কোনো রাতে মালতির সারারাত ঘুম আসে না। জেগে জেগে কতো কিছু ভাবে! নিস্তেজ শিবুর পাশে শুয়ে শুয়ে শরীরের আগুন পোহায়।

 

তখন কলোনি আমল। ভারতবর্ষে মহারানীর শাষণ চলছে। উত্তরপ্রদেশ, ঝাড়খণ্ড, আসাম, উড়িষ্যা প্রভৃতি অঞ্চল থেকে নিম্নবর্ণের অচ্ছুত অবাঙ্গালী সনাতনীরা দলবেঁধে বঙ্গদেশে আসে। হাড়ি, ডোম, নুনিয়া, বাঁশফোঁড় ইত্যাদি পদবিধারী নমশুদ্রদের সবাই মেথর নামে চেনে। শোনা যায়, সত্যাগ্রহ আন্দোলনের সময় গান্ধীজ্বি এদের ভালোবেসে নাম দিয়েছিলেন 'হরিজন'।

 

ভারত বিভক্ত হলেও এদের বড় একটা অংশ এই দেশেই থেকে যায়। রেললাইনের ধারে, শহরতলীর খাস জমিতে, চা বাগেনের আশেপাশে ছোটো ছোট ঘর তৈরি করে কলোনি গড়ে তোলে। নওগাঁ শহরে অবস্থিত এরকমই একটি কলোনির নাম 'নুনিয়াপট্টি'।

এসব ইতিহাস অনেক পুরনো। সঞ্জয় ওর দাদুর কাছে শুনেছে। ওর দাদু শুনেছে তার দাদুর কাছে।

 

পূর্বপুরুষের পরিচ্ছন্নতা কর্মে এদের ভাগ্যের পরিবর্তন কারোই ঘটে নি। তাই হাল আমলে এসে অনেকেই পেশার পরিবর্তন ঘটিয়েছে। বিশেষ করে সুশীলদের অনুরোধে শহরের অভিজাত পাড়াগুলোতে যখন পুলিশের তদারকি বেড়েই চলেছে, তখন এদেরই কারো কারো মদদে মাদকদ্রব্যগুলো এসে আশ্রয় নিয়েছে নুনিয়াপট্টিতে। 

 

রাতের অন্ধকারে পুলিশের চোখ ফাঁকি দিয়ে কুষ্টিয়া থেকে চালান নিয়ে আসে মোর্শেদ। তারপর সুবলের ঘরে বসে বসে সেগুলোর ভাগ বাটোয়ারা চলে। পল্টু হাড়ির সাথে সঞ্জয়ের মুখ দেখাদেখি বন্ধ হলেও এইখানে এসে তারা হাসি মুখে কথা বলে। মহাজনের দেনা পাওনা মিটিয়ে দিয়ে লাভ লোকসানের হিসাব করে।

 

টাকা পয়সা বুঝিয়ে নিয়ে মোর্শেদ চলে গেলে সুবল এবার সঞ্জয়ের দিকে তাকায়। বলে, "কয়দিন আগেই তুই ধরা খাইছিস। এড্যাই শ্যাষ। সাবধানে কাম করবি। মাল গুলান এমুন জায়গায় রাখবি, যাতে কাক পক্ষিও ট্যার না পায়।"

 

সঞ্জয় মাথা নাড়ে। মালতিকে উদ্দেশ্য করে উত্তেজিত হয়ে বলে, "সেবার ওই মাগীর জন্যই তো ধরা খাইলাম! নইলে দশ হাত মাটি খুঁইরাও পুলিশ আমার মালের নাগাল পাবে না। ব্যাবসা তো আজকাল থ্যাক্যা করি না, দাদা। পুলিশ কোনোদিন টিকি পর্যন্ত ছুঁতে পারে নি।"

সঞ্জয়ের কথায় সুবল আশ্বস্ত হলেও পল্টুর অস্বস্তি কাটে না। এতোগুলো মাল সে লুকাবে কোথায়? তার উপর ওই বাড়িতে এখন আঙ্গুরি থাকে। ওকে সে হাড়ে হাড়ে চেনে। 

পাঁচ বছর আগে মহাদেবপুর থেকে এক বাঁশফোঁড় মেয়েকে বিয়ে করে পল্টু যখন এই পট্টিতে এনেছিলো, তখন একটা মাছকোটা বটি হাতে নিয়ে দরজার সামনে দাঁড়িয়ে আঙ্গুরি বলেছিলো, "এক্ষুণি ওই মাইয়াডারে বাড়িতে রাইখা আসো। নইলে এক কোপে গলাডা নামায়া দিমু।"

ওইদিন পাড়ার মুরুব্বিরা আঙ্গুরির এই রুদ্রমুর্তি দেখে বলেছিলো, "শ্যাষ! সংসারে আর টিকলো না মাইয়াডা।"

দুপুরের পরপরই নুনিয়াপট্টির গলিগুলোতে যুবকদের আনাগোনা বাড়ে। এ সময় চুয়ানির চাহিদা কম থাকে। ফেন্সিডিল, ইয়াবা আর গাঁজা পাওয়ার জন্য বাবুপাড়ার কলেজ পড়ুয়া ছেলেরা দল বেঁধে পুকুরের পাড়ে এসে জড় হয়। সঞ্জয়ের সংকেত পেলে আঙ্গুরি ক্ষিপ্রগতিতে গলির মুখে চলে আসে। শরীরের আনাচে কানাচে গুঁজে রাখা বোতলগুলো খালাস করে তাড়াতাড়ি সটকে পড়ে।

সুবলের চোখে মালতির চেয়ে আঙ্গুরিই বেশি ভালো। শিবু স্ট্রোক করার পর থেকে পৌরসভার কাজে মালতিকে আর খুব একটা দেখা যায় না। সারাদিন বাড়িতে বসে থাকে। মদ বানায়। সেই মদ বিক্রি করে কাস্টোমারের কাছ থেকে কড়ায় গণ্ডায় পয়সা আদায় করে নেয়। কেউ কেউ আকারে ইঙ্গিতে কিছু বললে গালি দিয়ে চৌদ্দ গুষ্টি উদ্ধার করে। সবকিছু দেখে শুনে সুবল তাই আঙ্গুরির উপরেই আস্থা রাখে বেশি।

ওর সাথে কথা বলতে তার ভালো লাগে। ভোরবেলা কাজে যাওয়ার সময় ছুতো করে কাছে আসে। বেলচা নিয়ে দাঁড়ায়। পান চিবোতে চিবোতে বলে, "হ্যাঁ রে আঙ্গুরি! এই বেলা কিছু খাস নি বুঝি!"

-"খেয়েছি! খেয়েছি! তোমার মতো নিত্য না খেয়ে আসি না।"

-"এমনি বললাম। চল কিছু খেয়ে আসি।"

আঙ্গুরি জবাব দেয় না। খিলখিল করে হাসে। 

সঞ্জয়ের এ নিয়ে কোনো মাথা ব্যাথা নেই। কিন্তু দূর থেকে দেখে দেখে পল্টুর শরীর জ্বলে যায়। মাঝে মধ্যে মনে হয় বেলচা দিয়ে বেটার মাথাটা দুই ভাগ কতে দ্যায়। কিন্তু সেটা আর হয়ে ওঠে না। হাজার হলেও গোপন ব্যাবসার আঞ্চলিক মহাজন সে। সুবলের উপর তার ভাগ্যটা অনেকখানি নির্ভরশীল।

কালিপূজার দিন লগ্ন থেকে শুরু করে মধ্যরাত পর্যন্ত হৈ হুল্লোর চলে। পাড়ার ছেলে-বুড়ো-মধ্যবয়সীরা পুকুরের পাড়ে এসে জড় হয়। একটা অস্থায়ী মণ্ডপকে ঘিরে পূজা আর্চনা চলে। পাঁঠা বলি হয়। কম বেশি সকলের ঘরেই সেদিন মাংসের গন্ধ পাওয়া যায়।

সুবল সেদিন মালতিদের বাড়িতে মদ খেতে এলো ঠিক সময়ে। মুখের শ্রী যেমনই থাকুক, হাঁটা চলার ভাবটা সে বাবুদের মতো আয়ত্ব করেছে। একটু পরেই পেছনে পেছনে সঞ্জয় এলো। আজকাল সুবলের সাথে তাকে ঘন ঘন দেখা যায়।

সারাদিন গু মুত সাফ করে পাড়ার মরদেরা এইখানে এসে জড় হয়। আনন্দ ফুর্তি করে। শিবু কেবল বারান্দার একপাশে বসে বসে সারাদিন ঝিমায়। কেউ পাশ ঘেঁষে যাওয়ার সময় হাতটা নাড়িয়ে, মুখটা নাড়িয়ে কিছু বলার চেষ্টা করে। সারা পায় না। সঞ্জয়কে দেখলেই তার এই ঝাঁকুনিটা দ্বিগুণ বেড়ে যায়। ঝাঁকুনি দিতে দিতে মুখ দিয়ে লালা ঝরে, গোঁ গোঁ শব্দ হয়।

নারিকেলের ছোবড়াগুলো গোল করে বেঁধে নিয়ে আগুন জ্বালালো সঞ্জয়। তারপর তামাক ভরানো মাটির কলকিতে বৃদ্ধাঙুলি দিয়ে ঠেসে ধরে সুবলের দিকে এগিয়ে দিলো। বললো,"খাসা মাল। দেও দেকি একখান টান।"

-"হ! খাসাই তো!"

ধোঁয়ার কুণ্ডলি ছাড়তে ছাড়তে উত্তর দিলো সুবল।

এরই মধ্যে মালতি এসে একজগ চুয়ানি দিয়ে গেলো। 

আঁচল দিয়ে নাক মুখ চেপে ধরে বললো,"এইসব গাঁজা টাজা খেও না বাপু! বড্ড গন্ধ করে।"

সঞ্জয় জবাব দিলো না। 

সুবল চোখ কচলাতে কচলাতে বললো,"কেনো রে মালতি, আজ তুই ও কথা বলছিস কেনো? মদ কেউ খাচ্ছে না বুঝি!"

-"সাধে বলছি না দাদা। পুলিশে ঝামেলা করে। আর তাছাড়া পাড়ায় ওসব ঢুকিয়ে ঝামেলা বাড়ানোর কী দরকার? মদ হলেই তো হয়!"

-"ঝামেলা বলছিস কেনো? আমি আছি না! ওসব সামলানোর লোক আছে আমার। কিচ্ছু হবে না।"

তারপর গলাটা নামিয়ে নিয়ে ধীরে ধীরে বললো,"শোন মালতি! সারাজীবন গু মুত সাফ করে সবাই ফকিন্নিই রয়ে গেলো। কেউ যদি এদিক ওদিক তাকিয়ে দু-দশ পয়সা কামাই করতে পারে, তাতে তোর কী আর আমার কী!"

মালতি জানে, সুবলকে ওসব বুঝিয়ে কোনো লাভ হবে না।

সেদিন সে পল্টু হাড়িকেও এই কথাগুলোই বলেছিলো। পল্টু তখন কোঁচড়ের ভিতর থেকে একটা খয়েরি রঙের ট্যাবলেট বের করে খেঁকিয়ে খেঁকিয়ে বলেছিলো,"ধর! ধর! তোর মরদকে গিয়া খাওয়া। দেখবি, কেমন চাঙ্গা হয়ে উঠেছে।"

আঙ্গুরির সাথে ছাড়াছাড়ি হবার পর মালতিদের এই গলি দিয়ে পল্টু আর খুব একটা যাওয়া আসা করে না। কিন্তু সঞ্জয়ের সাথে পার্টনারশিপ গড়বার পর থেকে তার এই পুরনো সংকোচ এখন কেটে গেছে। তরকারি বাজার থেকে একটা সরু ছিপছিপে রাস্তা পট্টির মধ্যে দিয়ে পুকুরের পাড়ে এসে ঠেকেছে। সেদিক দিয়ে হেঁটে হেঁটে সাবেক শ্বশুরালয় পেরিয়ে আরো কিছুদূর এগিয়ে যেতেই আঙ্গুরির সাথে দেখা। 

এরকম মুখোমুখি সাখ্যাত এর আগেও দু একবার হয়েছে। কিন্তু কথা কেউই বলে নি। আঙ্গুরি অন্যদিকে মুখ ঘুরিয়ে নিয়ে চলে গেছে। আসেপাশে লোকজন থাকায় পল্টুও কিছু বলার সাহস পায় নি। আজ একা একা পেয়ে ওর সামনে দাঁড়িয়ে পথ আটকালো সে। দাঁত কেলিয়ে হাসতে হাসতে বললো,"জ্বইলা পুইড়া এভাবে আর কতোদিন মরবা?"

-"আমি মরি মরি। তোর কী রে হারামি? 

পল্টু এবার ক্ষেপে যায়। 

বলে,"বেশি বাড়াবাড়ি করবি না আঙ্গুরি। ওই বুইড়ার সাথে আর একদিন কথা কইলে তোরে খুন কইরা ফালামু, কইলাম!"

-"আহ! মরদ! খুন কইরা ফালাবে! যা সামনে থাইক্যা! নইলে চিল্লায়া মানুষ জড় করমু।"

পল্টু এবার এদিক ওদিক তাকিয়ে আচমকা আঙ্গুরির হাত চেপে ধরে। বলে," ডাক! ডাক! সবাইরে ডাক! আমারে মাইরা ফালায়া দে।"

-"ছাইড়া দে হারামির বাচ্চা..."

আঙ্গুরির মুখ দিয়ে ফটাফট কিছু অশ্রাব্য গালি বর্শার মতো বেড়িয়ে এলো। এক ঝটকায় হাতটা ছাড়িয়ে নিয়ে বাড়ির দিকে পা বাড়ালো সে।

পরদিন পল্টুর সাথে সঞ্জয়ের একরকম হাতাহাতিই হয়ে গেলো। ঘটনার সূত্রপাত অনেক আগের। মাস তিনেক হলো। ইন্ডিয়া থেকে  মালামাল কেনার জন্য সঞ্জয়ের কাছ থেকে সে হাজার দশেক টাকা ধার নিয়েছিলো। কথা ছিলো, একমাস পরে সুদসহ বারো হাজার টাকা সে ফেরত দেবে। অথচ তিনমাস পার হয়ে গেলেও এখন পর্যন্ত তার কোনো নাম গন্ধ নেই। পরপর কয়েকদিন পল্টুর বাড়িতে গিয়েও কোনো লাভ হয় নি তার। 'আজ দেবো, কাল দেবো' করতে করতে কেবল চরকির মতো ঘুরিয়েছে।

সন্ধ্যার আগে আগে সেদিন মালতিদের বাড়ির সামনে পেয়ে তার পথ আটকালো সঞ্জয়। বললো,"টাকাগুলো দিয়ে দে পল্টু! নইলে কিন্তু ভালো হবে না কইলাম।"

-"হ! টাকা তো দিমুই! সামনে মাসে ইন্ডিয়া থেকে বড় একটা চালান আসবে। তখন তোরে সুদে আসলে সব টাকা বুঝায়া দিমু।"

চালানের কথা শুনে সঞ্জয় এবার রেগে যায়। দুই হাত দিয়ে ওর শার্টের কলার ধরে ঝাঁকাতে ঝাঁকাতে বলে,"অতো চালান ফালান বুঝি না। এক্ষুণি তুই আমারে টাকা দে। নইলে কিন্তু খুন কইরা ফালামু!"

এতো সহজে দমে যাবার লোক পল্টু নয়। মিশকালো শরীরে তার হাতির মতো বল। ইচ্ছে করলে ওরকম দু-চারজন সঞ্জয়কে সে একাই ঘায়েল করতে পারে। দোষ তারই। তাই কোনো রকমে কলারটা ছাড়িয়ে নিয়ে পরি পরি করতে করতে গলির প্যাঁচ ধরে দৌড়ে পালালো সে।

তারপর একমাস পার হয়ে গেলো। পল্টুকে কোথাও খুঁজে পাওয়া গেলো না।

হঠাৎ একদিন নুনিয়াপট্টিতে খুব হৈচৈ শোনা গেলো। রাতের অন্ধকারে এক ভ্যান পুলিশ এসে সুবল আর সঞ্জয় উঠিয়ে নিয়ে গেলো। সারা পাড়া তন্ন তন্ন করে খুঁজেও আঙ্গুরির কোনো সন্ধান পেলো না কেউ। পরদিন ভোর হতে না হতেই শুকর চড়ানো গাড্ডির ভিতর থেকে কাদা মাখানো শরীর নিয়ে আবির্ভূত হলো সে। দুইদিন পরে সুবল ফিরে এলেও সঞ্জয়ের কোনো সন্ধান পাওয়া গেলো না।

পত্রিকায় খবর বেরুনোর পর সবাই জানতে পারলো, নুনিয়াপট্টির মাদক ব্যাবসায়ী সঞ্জয় পুলিশের সাথে বন্দুকযুদ্ধে নিহত হয়েছে।

 

এরপর থেকে আঙ্গুরির প্রতি সুবলের দরদ যেনো দিনে দিনে বেড়েই চলেছে। কাজের ফাঁকে ফাঁকে সুযোগ পেলেই ওর কাছে গিয়ে বসে। ঠোঁট দুটি চুক চুক করে সান্ত্বনা দেয়। আলাপ জমানোর চেষ্টা করে। বলে,"শোন আঙ্গুরি! একদম চিন্তা করবি না। আমি আছি তো এ পাড়ায় তোর কোনো ভয় নেই, বুঝলি? কেউ কিছু বলতে আসলে শুধু আমাকে জানাবি। গলাটা ধরে শালাকে একেবারে গাড্ডির মধ্যে পুঁইতা ফালামু!"

 

আঙ্গুরি কিছুই বলে না। খানিক্ষণ তাকিয়ে থাকার পর চোখটা নামিয়ে নেয়। সুবল তাতে আশ্বস্ত হয়। আরেকটু কাছে গিয়ে ঘনিষ্ঠ হয়ে বসে। বলে,"সকাল থেকে কিছু খাস নি বুঝি? বড্ড খিদা লেগেছে। চল কিছু খেয়ে আসি।"

 

-"আমার খিদা নাই। তুমি যাও গিয়া।"

 

-হ! তোরে কইসে খিদা নাই! খিদায়ে সারাদিন চোখমুখ লাল কইরা থাকস, আর কস খিদা নাই।"

 

-"কইলাম তো খিদা নাই। এখন যাও তো সামনে থাইক্যা।"

 

আঙ্গুরির কথায় সুবল এবার হতাশ হয়। বেলচা হাতে নিয়ে দাঁড়াতে দাঁড়াতে বলে,"যাইতাছি। তয় তোর চোখমুখ সারাদিন এমন লাল হয়া থাকে ক্যান?"

 

সুবলের মুখে নিজের চোখমুখের খবর পেয়ে চমকে উঠে আঙ্গুরি। নিজেকে সামলে নিয়ে বলে,"সে তুমি বুঝবে না!" 

 

সারাদিন কামকাজ শেষে ঘরে ফিরে আঙ্গুরির দুঃশ্চিন্তা কাটে না। বাড়ির পেছনে পুঁতে রাখা বড় একটা ডাবরের ভিতরে মালগুলো লুকিয়ে রেখেছিলো সঞ্জয়। ওগুলো এখন সেরকমই আছে। কাস্টোমার এসে এসে ফিরে যায়। আঙ্গুরি খুলেও দেখে না। কমসে কম দশ হাজার টাকার মাল হবে।

 

সেদিন মাঝরাতে ঘরের পেছনে খট খট শব্দ শুনে ঘুম ভেঙে গেলো তার। বিছানায় উঠে বসে একবার এদিক ওদিক তাকালো সে। তক্তপোষের এক কোণে বুড়ি আর কানাই তখন মরার মতো ঘুমিয়ে আছে। আস্তে করে দরোজা খুলে ঘর থেকে বের হলো সে। বারান্দায় দাঁড়িয়ে লাইটটা জ্বালাতেই শব্দ থেমে গেলো। অস্পষ্ট ছায়ার মতো কী একটা পশ্চিম থেকে পূর্বদিকে দৌড়ে পালালো। 

আঙ্গুরি কাঁপা কাঁপা গলায় চিৎকার করে বললো,"কে? কে ওখানে?"

কোনো উত্তর পাওয়া গেলো না।

 

কিছুক্ষণ দাঁড়িয়ে থাকার পর কোনো সাড়া শব্দ না পেয়ে ঘরের দিকে পা বাড়ালো আঙ্গুরি। হঠাৎ ঝড়ের মতো পেছন থেকে পল্টু এসে দুই হাত দিয়ে তার চোখমুখ শক্ত করে চেপে ধরলো। ডান হাতে রাখা রামদাটা গলার কাছে এনে ঝাঁকাতে ঝাঁকাতে বললো,"বেশি চালাকি করবি না আঙ্গুরি। এক কোপে গলাডা নামায়া দিমু।"

 

তারপর হাত ধরে হেঁচরাতে হেঁচরাতে বারান্দা থেকে নামিয়ে উঠানের দিকে নিয়ে গেলো। বললো,"মালগুলান কই রাখছস? সত্যি কইরা কইবি। নইলে কিন্তু ভালো হবে না, কইলাম।"

 

আঙ্গুরি জানে, এ যাত্রায় বাঁচতে হলে আজ তাকে সত্যি বলাটা ছাড়া আর কোনো উপায় নেই। 

 

ঘরের পেছনে পুঁতে রাখা ডাবরের ভিতর থেকে মালগুলো তুলতে তুলতে পল্টু বললো,"সোনাগুলান কই রাখছস?"

 

-"ঘরে আছে।"

 

-"চল! একটা একটা কইরা সব আমারে তুইলা দিবি।"

 

অন্য সময় হলে পল্টুর কাছে এতো সহজে আঙ্গুরি কিছুতেই হার মানতো না। এখন সময় বদলেছে। সঞ্জয় মরে যাবার পর মালতিও আর সেভাবে মিশতে চায় না। সুবল আকারে ইঙ্গিতে অনেক কথাই বলে। আঙ্গুরি সেসব কথার অর্থ বোঝে। ইঙ্গিত দিয়েই সে এতোদিন মানুষ চড়িয়েছে।

 

বারান্দার বসে বসে উবু হয়ে একটা বিড়ি জ্বালালো পল্টু। এতোক্ষণ পরে আঙ্গুরির হাতটা ছেড়ে দিয়ে বললো,"যা! ঘরের ভিতর থেকে সোনা দানা যা কিছু আছে বাইর কইরা আন।"

 

আঙ্গুরি ঘরের ভেতরে গেলো। পাঁচ বছর আগে যে দগদগে আগুন নিয়ে পল্টুর ঘর ছেড়ে সে এই বাড়িতে এসে উঠেছিলো, আজ তারই এক ভয়ঙ্কর রূপ শরীরের ভেতরে ভেতরে টগবগ করে উঠলো। ঘর থেকে গয়নার পুটলিটা বের করে এনে পল্টুর হাতে ধরিয়ে দিয়ে বললো,"ধর! গয়না লে, কুত্তার বাচ্চা!"

বলেই আঁচলের তলে লুকিয়ে রাখা রামদাটা বের করে পল্টুর ঘারে সজোরে একটা কোপ বসিয়ে দিলো।

 

কিছুক্ষণ গোঙ্গানির শব্দ পাওয়া গেলো। তারপর নিরব, শুনশান। 

 

সেদিন অমাবশ্যা। চারিদিকে ঘুটঘুটে অন্ধকার। আকাশের অসংখ্য তারা ঝিঁঝিঁর ডাকের সাথে ওঠা নামা করে। পল্টুর ফিনকি দিয়ে ওঠা রক্তে তার শরীর ভিজে গেছে। কিছুক্ষণ দাঁড়িয়ে থাকার পর ধীরে ধীরে বাড়ি থেকে বের হলো সে। হাঁটতে হাঁটতে পুকুরের পাড়ে এসে থমকে দাঁড়ালো। পশ্চিম পাড়ে পল্টু হাড়ির ঘরে তখনো আলো জ্বলছে। শরীরের ভেতরটা ছমছম করে উঠলো তার। কী জানি! কী মনে পড়েছে আজ! তারপর দুই হাত জোড় করে সেই আলোটার দিকে তাকিয়ে প্রণাম করলো সে।

 

হাজার হলেও ভগবান। আজ সে তাকে অকথ্য ভাষায় গালি দিয়েছে।

 



আপনার মূল্যবান মতামত দিন:


Top