সিডনী রবিবার, ২৭শে সেপ্টেম্বর ২০২০, ১২ই আশ্বিন ১৪২৭

রম্যরচনা - অভিভাবকের চোখে ভালোবাসা : তন্ময় চট্টোপাধ্যায়


প্রকাশিত:
৬ আগস্ট ২০২০ ১৭:৩১

আপডেট:
২৭ সেপ্টেম্বর ২০২০ ২৩:১৭

 

"হতচ্ছাড়া আমার মুখে একেবারে কালি মাখিয়ে দিলে ...।। কোন বাড়ীর ছেলে সে কথা ভুলে উনি কিনা গেছেন প্রেমপত্র লিখতে... ওঠ হতচ্ছাড়া, আজ তোর একদিন কী আমার একদিন!" এই বাক্যবানের সাথে শুরু হত আসল বাণ-নিক্ষেপ পর্ব। অভিভাবকের হাতে অবলীলায় উঠে আসত পায়ের অজন্তা হাওয়াই। 

 সংক্ষিপ্ত প্রস্তাবনা প্রয়োজন। ধরুন সময়টা শীতের এক চকচকে সকাল। ভোর রাতের আদুরে লেপের ওমে সদ্য গোঁফ ওঠা রোমিওটি হয়ত তখনো স্বপ্নে হাবুডুবু। এক টুকরো মেঘের মত মনে ভাসছে গত দিনের চিঠি হস্তান্তরের সেই নরম মুহূর্ত। হঠাৎ তাল গেল কেটে। কবিতা পিওর-রোম্যান্টিক থেকে নিমেষে হয়ে গেল মেটা-ফিজিক্যাল। রোমিওর অজান্তেই শুরু হয়ে গেল অজন্তা-পর্ব। রহস্যটা কী?  - না পিতা ঠাকুর মর্নিং-ওয়াকে গিয়ে আবিষ্কার করেছেন যে বেপাড়ার খগেন বা নগেনের পঞ্চদশী মেয়ের হাতে প্রেমপত্র ধরিয়েছে তার বয়সসন্ধি পার হওয়া সন্তানটি।

আর্কাইভ ঘাঁটলে চোখে পড়বে এই হাওয়াই-দাওয়াই এর জেরে বেশ কয়েক মিলিয়ন প্রেম দেহ রেখেছে এ দেশে। "শ্রীচরনেষু"রা প্রনম্য, তবে প্রয়োজনে "শ্রী-চরনের-সু" টির সুচারু ব্যবহারে তারা যে আপন সন্তানের দশা বেহাল করতে পারতেন - তা মোটেও বানানো কথা নয়।

এই "চটাস" পর্ব প্রয়োজনে দীর্ঘায়িত হত। কেননা নামজাদা গুনীনের মত সেকেলে অভিভাবকরা এটা মনে প্রানে মানতেন যে প্রতিটা "চটাস" এ শরীর থেকে প্রেমের ভূত নেমে যায় গুণোত্তর প্রগতির নিয়মে। সন্তানের এই দুরবস্থার কালে এদেশের জননীদের সন্তান-স্নেহ কিন্তু আশ্চর্যরকম ভাবে ভ্যানিশ হয়ে যেত। ফুটে উঠত স্বামীর সম্ভাব্য শারীরিক অবনতি নিয়ে দুশ্চিন্তা আর উদ্বেগ। উন্মত্ত স্বামীকে তিনি থামাতেন - "ওগো শান্ত হও তুমি, তোমার যে হাই প্রেশার......।"

প্রেসার তখন সত্যিই মাথায় চড়েছে। পেঁদানির সে কি মুদ্রা! নটরাজও হার মানবেন!  রোমিও কিশোরের একান্ত অনুনয়, "বাবা বিশ্বাস কর..."। ধুতির কোঁচা লুটোচ্ছে এক দিকে আর পিতা হাঁকছেন " কি বিশ্বাস করব রে শয়তান, চারিদিকে যে ঢি ঢি পড়ে গেছে।

একালে ভাইরাল হয়, সেকালে হত ঢি-ঢি। প্রেমের খবর কেমন করে ঢি-ঢি হয়ে যেত সেও এক রহস্য। ধরা যাক কোন এক নির্জন দুপুরে প্রেমিক যুগলের চিঠি বিনিময় সম্পন্ন হয়েছে। সাক্ষী বলতে হয়ত এক আধপাগলা ভবঘুরে বা এক হাড্ডিসার সারমেয়। এমন কেস বিজ্ঞাপিত না হবার পক্ষে দিব্যি বাজী ধরা যায়। তবু ঢি-ঢি আটকানো যেত না। পাড়ার কাকু-জ্যেঠুরা  ছাড়াও বেপাড়ার মশলা কাকু, সেলাই পিসি, রান্না কাকিমা, কাজের দিদি - সকলেই অভিভাবক হয়ে কিশোর কিশোরীর ভবিষ্যৎ নিয়ে ভাবতেন। খবর কোনো ভাবে লিক হলেই নিমেষে ঢি ঢি। শ্রোতার চোখ বেরিয়ে আসত রসগোল্লার মত - "বলিস কিরে শিবে প্রেম করেছে? মানে স্বপনের বড় ব্যাটা! দেখ কান্ড! সেদিনের হাঁটুর বয়সী ছেলে! কী যুগ এল, অ্যাঁ? হ্যাঁরে, তা কার সাথে? অ্যাঁ বলিস কী, আবার চিঠি চালাচালি চলে? তলে তলে এতকিছু?.........?"

 

শ্রোতা বক্তা - উভয়েই চনমনিয়ে উঠতেন। তারপর পাড়ার চন্ডীমন্ডপ, ন্যাড়াদার সেলুন, শিবুর মুদিখানায় সে সব গল্প ফুলে ফেঁপে উঠত। বাত, আর্থারাইটিস - কোনকিছুই বাধা হয়ে উঠত না। খোঁড়াতে খোঁড়াতে তিন মাইল পথ ঠেঙ্গিয়ে এসে বেপাড়ার বেতো পিসেমশাই পর্যন্ত যথাস্থানে আগুন লাগিয়ে যেতেন - "বড়খোকাটির দিকে একটু নজর রেখো হে। গায়ে রঙ লেগেছে, কানাঘুষো যা শুনছি..."  নিমেষে পাড়ার "শান্তি"ধাম হয়ে উঠত অশান্তিধাম। গল্পের রোমিওর কথাই ধরা যাক। তার পিতা ঠাকুরের কানে যিনি কথাটি তুলেছেন তিনি আর কেউ নন - তার প্রাতঃভ্রমনের অনিয়মিত সঙ্গী হারান। বছরে ছ মাস হাঁপানিতে ভোগেন। শীত তার কাছে বিষ স্বরূপ। সেই হেপো হারান শীতের পরোয়া না করে চিঠি লেখকের "চাপাটি"র ব্যবস্থা পাকা করে গেলেন।  

প্রেমিক প্রেমিকা সাধে সেয়ানা হয়ে উঠত না। অভিভাবকের কানে ওঠা মানেই যে প্রেম আই সি ইউ তে চলে যাবে - সে বোধ ছিল বেশ টনটনে। তাই চিলেকোঠার ঘরে, পাঁপড়ভাজা দুপুরে প্রাণ পেত প্রেমের চিঠি। দলিল জাল করার মত পাপ-কর্মটি সেরে উঠতে রোমিওর এক পোয়া ঘাম বেরিয়ে যেত। বাড়ীর মত ইস্কুলেও একশো চুয়াল্লিশ ধারা। জ্যান্ত "সি সি টি ভি' র মত স্যারেরা ছিলেন। প্রেম-পত্র তাদের হাতে ওঠা মানেই গোটা ইস্কুল জুড়ে মোচ্ছবের উচ্ছ্বাস। পক্ককেশ শিক্ষকও সানন্দে যৌবন ফিরে পেতেন। টিচার্স রুমে ডাক পড়ত অভিযুক্তের। তারপর হত সেই চিঠির সরব পাঠ। সাথে সাথে বিচারপর্ব। বাড়ীতে যেমন অজন্তা হাওয়াই, ইস্কুলে তেমনি বেতের দাওয়াই। 

কুচুটে শনি, বক্রী রাহু-কেতুর বাধা কাটিয়ে বরাতজোরে এগিয়ে যাওয়া রোমিওর শেষ বাম্পার ছিল প্রেমিকার বাবা। দ্য লাস্ট সামুরাই। "যা সিমরন জি লে আপনি জিন্দেগী" - বলে ভাবালু চোখে মেয়ের হাত ছেড়ে দেবেন - তেমন জিনিস বিধাতা এদেশে কমই পাঠিয়েছেন।  ষাট সত্তরের দশকে বাংলা সিনেমার প্রেমিকার পিতার চোখে থাকত ভ্রুকুটি। ব্যাজার মুখে প্রেমিকের কাছে প্রশ্ন রাখতেন, "কত টাকা মাইনে পাও?" 

উত্তর আধুনিকে বদলে গেছে গল্প। তবে ভ্যালেন্টাইনের দিনে সকাল থেকে মেয়ে জরুরী প্র্যাক্টিক্যাল ক্লাসে যাবে বলে সাজুগুজু সারছে আর পিতাঠাকুর নিদারুণ আনন্দে সিপ সিপ করে দার্জিলিং টি সেবন করছেন - তেমনটা এদেশে হয় না। এই পরিস্থিতিতে অনেক পিতা  ভাববাচ্যবাদী। সরাসরি মেয়েকে কিছু না বলে মেয়ের মায়ের উদ্দেশ্যে বলে ওঠেন, "আজ হঠাৎ করে এত সাজগোজের আবার কি হল! প্র্যাক্টিক্যাল ক্লাসে আজকাল আবার সাজগোজ লাগছে নাকি?" সেকেলে অটোক্র্যাশি নেই। হুঙ্কার বুমেরাং হতে পারে জেনে মিইয়ে গেছে আওয়াজ। ভয়ানক "জিও-যুগে" কে কোথায় হারাবে - তাই বা কে জানে? ভ্যালেন্টাইন দিবসে তবু এনারা অ্যান্টি-রোম্যান্টিক - ডিগ্ল্যামারাইজড লুকের পক্ষে সওয়াল করে যান। হুট করে সেদিনের একরত্তি মেয়েটা সীমানা ছাড়াচ্ছে - এ যেন একালেও অভিভাবক ঠিক হজম করতে পারেন না।

যত জ্বালা মায়েদের। তিনি সব জানেন। ভূগোল কোচিং ক্লাসের বলাই যে ফেউ এর মত তার মেয়ে মিতার পিছনে পড়েছে সে খবর তিনি রাখেন। বলাইয়ের পাল্লায় পড়ে মেয়ে যে দিনে রাতে "লাই" আওড়াচ্ছে - তাও তার জানা। আগস্ট এর ১৫ তারিখে কোচিং এর নাম করে মেয়ে যে মনি স্কোয়ারে হাওয়া খেয়ে এল - লেডি ব্যোমকেস সেজে সে কেস তিনিই ক্র্যাক করেছেন। আড়ালে একটা থাপ্পড়ও কষিয়েছেন মেয়েকে। মেয়ের মোবাইলে বলাইয়ের মেসেজ "কি করছিস?" এর জবাবে তিনি লিখে পাঠিয়েছেন "মুগুর ভাঁজছি, তোর মাথায় ভাঙব"। আর কিই বা করবেন তিনি! বলাই এর ওপর বলপ্রয়োগ তো আর সম্ভব নয়।

প্রেমিকার মা' এর সবচেয়ে বড় সমস্যা হল এডিটিং। আটপৌরে হাউস ওয়াইফ তিনি। সিরিয়াল দেখতে দেখতে সারাদিন এডিটিং করেন, করেন রি-এডিটিং। বাইরের জগত সামলে আসা গৃহ-কর্তাটির কানে কতটা তোলা যায় - সেই নিয়েই তার ভাবনা। তার শেষ সিদ্ধান্ত - বলাইয়ের কথাটা বলা যায়, তবে এস-এম- এসের কথাটা বাদ। মেয়ের মিথ্যেভাষণ কানে উঠবে তবে না, মনি- স্কোয়্যারের গল্প ছেঁটে দিতে হবে। মেয়ের চিন্তায় কর্তার প্রেশার চড়বে, সুগার বাড়বে, কলেস্টেরল হৃৎপিণ্ডের দখল নেবে - তা তিনি মোটেই চান না।

সেকালের বা একালের গিন্নীদের এই প্রেমিকা-সত্তাটা কিন্তু আজও লক্ষণীয়। সন্তানের প্রেমের মনিটরিং করতে গিয়ে কর্তা-প্রেমের কথা তেনারা আজও ভোলেন না। তবে উত্তর আধুনিকের প্রেম অভিভাবকের তুলনায় ঢের বলিষ্ঠ। অভিভাবকরা আগে ছিলেন টাইসনের ভূমিকায়। প্রেমকে নক আউট করে দিতেন কয়েক মিনিটে। এখন নিজেদের নক আউট হওয়ার পালা। আলগা হয়েছে অধিকারের রাশ। তবে ভালবাসার চরিত্রও যে একালে ঢের আলগা - সে কথাও বলতে হবে বৈকি!

 

তন্ময় চট্টোপাধ্যায়
কলকাতা

 

এই লেখকের অন্যান্য লেখা



আপনার মূল্যবান মতামত দিন:


Top