সিডনী শনিবার, ৩১শে অক্টোবর ২০২০, ১৫ই কার্তিক ১৪২৭

বধির নিরবধি (পর্ব চার) : আসিফ মেহ্‌দী


প্রকাশিত:
২১ সেপ্টেম্বর ২০২০ ১৪:৫০

আপডেট:
৩১ অক্টোবর ২০২০ ০৪:৪১

 

(দেশসেরা দুই ফান ম্যাগাজিন ‘উন্মাদ’ ও ‘রস+আলো’তে লেখার সুবাদে আসিফ মেহ্‌দী রম্যলেখক হিসেবে পরিচিতি পেয়েছিলেন আগেই। ‘বেতাল রম্য’ নামের প্রথম বইয়েই তিনি লাভ করেন তুঙ্গস্পর্শী জনপ্রিয়তা। তারপর একে একে প্রকাশিত তাঁর প্রতিটি বইয়ে ব্যঙ্গ আর হাসির সঙ্গে গভীর জীবনবোধের প্রতিফলন ঘটিয়ে তিনি শুধু পাঠকপ্রিয়তাই লাভ করেননি, তাঁর বইগুলো উঠে এসেছে বেস্ট সেলার বইয়ের তালিকায়। সেগুলোর মধ্যে 'বধির নিরবধি', ‘মায়া’, ‘অপ্সরা’, ‘তরু-নৃ’ অন্যতম। এছাড়া এনটিভিতে প্রচারিত তাঁর লেখা নাটক ‘অ্যানালগ ভালোবাসা’-র বিষয়বস্তুর জীবনঘনিষ্ঠতা দর্শকদের হৃদয় ছুঁয়েছে। ‘ন্যানো কাব্য’ নামে একটি বিশেষ কাব্যধারার প্রবর্তক আসিফ মেহ্‌দী কবিতা প্রেমীদের কাছে ন্যানো কবি হিসেবে পরিচিত। তাঁর প্রকাশিত বইয়ের সংখ্যা পঁচিশ।)

 

পর্ব চারঃ

মাইক্রোওয়েভ ওভেনে দুই কাপ কফি বানালেন ইনো ভাই। সঙ্গে ফ্রুট কেক আর বিস্কিট একটা ট্রে-তে করে নিয়ে এলেন। তিন রুমের এই ফ্ল্যাটের ভাড়াটে তিনি। কোনো এক অজ্ঞাত কারণে এখনো সংসার করা হয়ে ওঠেনি তার। ছোট ফ্ল্যাট ভাড়া পাওয়া মুশকিল। মেসে থাকতেও পছন্দ করেন না তিনি। রাতদিন অবশ্য একটি রুমেই পড়ে থাকেন। রুমটির দরজায় লেখা-সাধনাকক্ষ। সাধনাকক্ষে বসে ইনো ভাই লেখালেখি করেন। মোটিভেশনের ওপর তার বেশ কয়েকটি বইয়ের ভালোই কাটতি বাজারে। বেস্টসেলার তালিকায় ছিল তার লেখা বই, ‘মটোসিনথেসিস’। মটো অর্থ নীতিবাক্য বা আদর্শবাণী এবং সিনথেসিস অর্থ সংশ্লেষণ। বিভিন্ন অনুষ্ঠানে মোটিভেশনাল স্পিকার হিসেবেও তিনি আমন্ত্রণ পান। ইনো ভাই লাইমলাইটে থাকা কেউ না; তবে আপন ভুবনে ডুবে থাকা এক সাধক।

সাধনাকক্ষে নিজের চেয়ারে বসলেন ইনো ভাই। মোটামুটি অফিস বলা যেতে পারে। অফিশিয়াল সেক্রেটারিয়েট টেবিলের মতো না হলেও তার ঘরের টেবিলটির মধ্যে বেশ গাম্ভীর্য আছে। অন্যপাশের চেয়ারে বসে আছে রনি। ইনো ভাই দোতলার জানালাগুলোর পর্দা সরিয়ে দিলেন। ঘরের ভেতর আলো-বাতাসের খেলা শুরু হলো। এখানে আসার পর থেকে রনির মন ধাপেধাপে উৎফুল্ল হতে শুরু করেছে। ভাইয়ের উষ্ণ হাতের স্পর্শের হ্যান্ডশেক ছিল মন ফুরফুরে হওয়ার প্রথম ধাপ। তিনি নিজের হাতে কফি তৈরি করে নিয়ে আসাতে রনির মন আরেক ধাপ আনন্দিত হয়েছে। জানালা খুলে ঘর আলো-বাতাসময় করায় মন সতেজ হয়েছে আরও এক ধাপ।

রনির কথা শোনার জন্য হাসিমুখে তার মুখোমুখি বসলেন ইনো ভাই। রনিও মনেমনে ঠিক করেছে, ভাইকে সব খুলে বলবে আজ। প্রফেশন নিয়ে সে বর্তমানে কতটা অসুখী, তা বিস্তারিত জানাবে। এক পর্যায়ে রনি নিজের মনের কথা বলা শুরু করল এবং বলেই চলল। সে যে এত কথা বলতে পারে, তা নিজেই জানত না। অবশ্য ইনো ভাইও সাহায্য করছেন। তিনি সহযোগিতা না করলে রনি হয়তো এত কথা বলত না। এমনকি রনির প্রেমের ব্যাপারেও অনেক তথ্য কায়দা করে জেনে নিচ্ছেন ইনো ভাই। কারও মনের গোপন কথা বের করে নেওয়ার ক্ষেত্রে তার বেশ ভালো দক্ষতা আছে। তিনি চাহনি বিনিময় করে, পাল্টা প্রশ্ন করে, নানারকম উৎসাহব্যঞ্জক শব্দ উচ্চারণ করে রনির মনের তলায় জমে থাকা না-বলা কথাগুলো যেন ড্রেজিং করে তুলে ফেলছেন।

কথা বলতে বলতে কখন যে একটি ঘণ্টা পার হয়ে গেছে, টের পায়নি রনি। ইনো ভাই বললেন, ‘সমাধান ছাড়া কোনো সমস্যা আসে না দুনিয়ায়, এটা তো নিশ্চয়ই মানিস?’

‘জি, মানি ভাই।’

‘তাহলে এবার একটু হাস। তখন থেকে হাঁসের মতো মুখ চ্যাপ্টা করে আছিস! তোর মুখ দেখে মনে হচ্ছে জীবন বুঝি এখানেই শেষ। অথচ তোর জীবন এখনো শুরুই হয়নি!’

‘কী যে বলেন, ভাই।’

‘মুখ এমন গোমড়া করে রাখলে যে কেউ তাই-ই বলবে। মূলত দুটো বিষয় তোকে ভেতর থেকে পোড়াচ্ছে।’

‘দুইটা বিষয়! আমি তো চাকরি ছাড়া অন্য কোনো বিষয় খুঁজে পাচ্ছি না।’

‘আমার কী মনে হয় জানিস!’

‘কী?’

‘আমার মনে হচ্ছে, শুধু প্রফেশন তোর মনকে বিষণ্ন করে তোলেনি; সঙ্গে আছে রিলেশন। প্রফেশন আর রিলেশনের সমন্বিত ইফেক্টে তোর এই ভীষণ খারাপ লাগা।’

‘ভাই, এটা সত্যি যে নূপুরের সঙ্গে বেশিরভাগ ক্ষেত্রেই ভালোভাবে কথা হয় না-এতে আমার সাময়িক মন খারাপ থাকে। কিন্তু বর্তমানের বাজে অনুভূতির জন্য রিলেশনশিপ দায়ী-এটা মেনে নিতে পারছি না।’

‘তোদের সম্পর্কের বেশ কিছু দিক আমি মার্ক করেছি, যেগুলো আমার কাছে স্বাভাবিক মনে হয়নি।’

‘কোন বিষয়গুলো ভাই?’ রনি যখন ভার্সিটিতে পড়ত, তখন ইনো ভাই সম্পর্কে নানা গল্প শুনেছে। এমনও হয়েছে, তিনি নাকি একসঙ্গে কয়েকজনের সঙ্গে প্রেম করেছেন! এমন ঝানু প্রেমিক যখন এভাবে বলছেন, সেক্ষেত্রে রনি বাকি কথাটুকুও শুনতে আগ্রহী।

ইনো ভাই বললেন, ‘সেসব বিষয় পরে বলছি। তার আগে বল তো, তোর কখনো কি এমন হয়, কোনো একটা গানের কিছু অংশ কোথাও শুনেছিস, তারপর তার লাইনগুলো সারাক্ষণ মাথায় ঘুরঘুর করতে থাকে?’

‘হুম, সেটা তো হয়ই।’

‘এর কারণ হলো, আমাদের ব্রেন সম্পূর্ণতা পছন্দ করে। যেকোনো বিষয়ে পরিপূর্ণতা লাভের তৃপ্তি পছন্দ করে। অসম্পূর্ণতা ব্রেন নিতে পারে না। তোর জীবনে প্রফেশন আর রিলেশনের ক্ষেত্রে অসম্পূর্ণতা আছে, ফলে ব্রেনের গুঁতানিতে তুই বিষণ্ন হয়ে উঠেছিস।’

‘জানি না, ভাই! এই চাকরি যখন পেয়েছিলাম, তখন আমার মনে হয়েছিল, আমি জীবনে সর্বোচ্চ কিছু অর্জন করে ফেলেছি। আবার, নূপুরের সঙ্গে পরিচয় হওয়ার পর থেকে মনে হয়েছে, আমি সবদিক দিয়ে পরিপূর্ণ এক মানবী পেয়েছি।’

‘তোর অন্তরের বর্তমান উপলব্ধি এসবের উল্টো। হতে পারে বাইরে থেকে এভাবে চিন্তা করে তুই নিজেকে মানিয়ে নিচ্ছিস কিন্তু ভেতরে ভেতরে তোর অনুভূতি একদম বিপরীত। বরং আমি যা মনে করি, সেটা শুনলে তুই চমকে উঠবি।’

রনি কিছুটা বিস্ময় নিয়ে জিজ্ঞেস করল, ‘কী মনে করেন?’

ইনো ভাই বলা শুরু করলেন, ‘আমি মনে করি, তোর ভীষণ বিষণ্নতার জন্য প্রফেশনের চেয়ে রিলেশনটা বেশি দায়ী। তোর কথা শুনে সহজেই বোঝা যায়, এই সম্পর্ক তোকে সমাজ-সংসার থেকে বিচ্ছিন্ন করে ফেলেছে। অন্যান্য যেসব সামাজিক রিলেশন স্বাভাবিক ও সম্পূর্ণ, সেগুলোকে করেছে অসম্পূর্ণ। তোর ভেতরে অগোচরে ভর করেছে বিশাল অপূর্ণতা ও শূন্যতা। সত্যিকারের ভালোবাসার মানুষ কখনো তার সঙ্গীর স্বাধীনতায় হস্তক্ষেপ করার কথা না! প্রত্যেকের ইনডিভিজুয়্যালিটি থাকে। সেই ব্যক্তিস্বাতন্ত্র্য মেনে নেওয়া ও মানিয়ে নেওয়াই হলো একটি সম্পর্কের মধুরতম দিক। তোর ক্ষেত্রে...’

ইনো ভাইয়ের কথা শেষ হওয়ার আগেই রনি বলল, ‘কিন্তু...’

রনিও কথা শেষ করতে পারল না। তার আগেই ইনো ভাই বললেন, ‘আচ্ছা বল তো, মাথার ভেতরে গানের লাইন ঘুরঘুর করতে থাকলে, সেই চক্র থেকে বের হওয়ার জন্য কী করা উচিত?’

‘উহু।’ মাথা নেড়ে রনি জানিয়ে দিল যে তার জানা নেই।

ইনো ভাই জানালেন, ‘গানের শেষ লাইনটা মনে করে একবার গেয়ে ফেলা উচিত। কারণ, শেষের লাইন ব্রেন জানামাত্র সম্পূর্ণতার তৃপ্তি পায় এবং চক্রটি ভেঙে যায়।’

রনি ঠিক বুঝতে পারছে না, কী কারণে এসব কথা বলছেন ইনো ভাই। তিনি বলে চললেন, ‘বর্তমান সম্পর্কের কারণে তোর মধ্যে যেসব অপূর্ণতা বা অসম্পূর্ণতা তৈরি হয়েছে, সেগুলো তোকেই উপড়ে ফেলতে হবে। সেসব চক্র সম্পূর্ণ ও স্বাভাবিক করলেই কেবল তোর মুক্তি মিলবে।’

‘এটা কীভাবে সম্ভব, ভাই?’

‘বন্ধুদের সঙ্গে আবার আড্ডায় মেতে ওঠ। আত্মীয়দের বাসায় যাওয়া-আসা কর। প্রতিবেশিদের সঙ্গে দেখাসাক্ষাৎ কর। মূল কথা, একাকীত্বের বেড়াজাল থেকে তোকে বেরিয়ে আসতে হবে।’

‘কিন্তু নূপুর যে এগুলো পছন্দ করে না!’

‘তুই ওর পছন্দের এত মূল্য দিচ্ছিস, ওর উচিত তোর ব্যক্তিসত্ত্বাকে মূল্যায়ন করা। তোর স্বাভাবিক ও সুস্থ বিকাশে সহযোগিতা করা।’

‘আপনি নূপুরকে চেনেন না বলে এমন বলছেন, ভাই! এসব বললে আমার সঙ্গে আর সম্পর্কই রাখবে না।’

ইনো ভাই একটু দম নিয়ে বললেন, ‘আমি যা শুনলাম ও বুঝলাম, নূপুর না চাইলে তার সঙ্গে যোগাযোগের অধিকারও তোর নাই! সে তোকে শুধু নিঃসঙ্গ দ্বীপবাসীই করেনি; করেছে তটস্থ ও আতংকগ্রস্ত। তার সঙ্গে কথা বললেও দুশ্চিন্তা এবং তাকে হারানোর ভয় তোর মধ্যে কাজ করে। এমনকি তুই এটাও বললি, নূপুরের পরিবারের কেউ তোদের এই সম্পর্কের কথা জানে না। খুবই অস্বাভাবিক ঠেকছে আমার কাছে। তোদের সম্পর্কের কোনো স্থায়ী রূপ আমি কল্পনা করতে পারছি না। আমার সত্যিকারের পরামর্শ কি তুই চাস?’

রনি দৃঢ়তার সঙ্গে বলল, ‘অবশ্যই চাই, ভাই। সেজন্যই আপনার কাছে এসেছি। আপনি ছাড়া অন্য কোনো মানুষ আমার সমস্যার সমাধান দিতে পারবে বলে আমি বিশ্বাস করি না।’

ইনো ভাই আরও একবার দম নিলেন। তারপর বললেন, ‘তাহলে শোন, নূপুর আসলে তোকে ভালোবাসে না। সরি টু সে বাট যেটা সত্যি, সেটাই বলছি। সমাজে এমন কিছু মেয়ে আছে যারা অপশন খোঁজে। তোকে সে ধরে রেখেছে জাস্ট একটা অপশন হিসেবে কিন্তু তার যদি মনে হয় বেটার অপশন খুঁজে পেয়েছে, তবে সে কোনো এক ছুতায় তোর সঙ্গে সম্পর্ক ভাঙতে এক মিনিটও নেবে না! আমি দুঃখিত এভাবে বলছি কিন্তু এটাই সত্যি। এমন মেয়েরা মন নিয়ে স্রেফ খেলা করে। তোর সম্পর্কের ধরন আমার পরিচিত অনেকের কেস-এর সঙ্গে মিলে গেছে। তাই তোকে সাবধান করে দিতে চাই। নূপুরের মতো মেয়েরা ছেলেদের নিঃসঙ্গ থেকে নিঃসঙ্গতর করে ফেলে। সবকিছুতে সন্দেহ করে ও নানা অভিযোগ করে ছেলেটিকে একাকীত্বের মধ্যে ব্যতিব্যস্ত রাখে। অন্যদিকে, নিজেরা অপশন খুঁজে বেড়ায়। তারা প্রিয় মানুষের মধ্যে ভালো কিছুই খুঁজে পায় না-এটাই প্রমাণ করে এ ধরনের মেয়েরা প্রকৃত শুভাকাঙ্ক্ষী না। ইংরেজিতে একটি কথা আছে- Observe your enemies, for they first find out your faults। অন্তর থেকে তোকে ভালোবাসে না নূপুর। তার হৃদয়ে তোর কোনো স্থান নেই।’

ইনো ভাই কথা বলে চলেছেন আর রনির স্মৃতিতে অনেক কিছু দৃশ্যায়িত হয়ে চলেছে। হঠাৎ-ই নানা চিন্তার খণ্ড-বিখণ্ড মেঘ যেন সরে যাচ্ছে; অজানা আশংকার একটি অবয়ব খুঁজে পাচ্ছে রনি! তার অন্তর যেন জানিয়ে দিচ্ছে, নূপুর তার সঙ্গে প্রতারণা করে চলেছে; অচিরেই তাকে ছেড়ে চলে যাবে! যে দুর্বোধ্য আশংকায় রনির মন বিশেষভাবে বিষণ্ন, তা যেন স্পষ্ট হয়ে ধরা দিচ্ছে। এই মুহূর্তে অনেক ঘটনাই রনির মনে পড়ছে। নূপুরের আচরণগুলো মস্তিষ্কে আছড়ে পড়ছে। সেসব মনে হয়ে শ্বাস নিতেই কষ্ট হচ্ছে তার। চোখে পানি চলে এসেছে। ছলনার মাধ্যমে একজন মানুষকে এভাবে শুধু অপশন হিসেবে রেখে দেওয়া, অপেক্ষার পাত্র বানানো-কুৎসিত অন্যায়। পরক্ষণেই রনির মনে হচ্ছে, হতাশার কারণে সে এমন করছে না তো! প্রিয় মানুষ সম্পর্কে নিশ্চিত না হয়ে তাকে এভাবে সন্দেহ করা ঠিক না। রনি নিচুস্বরে বলল, ‘নূপুরের মতো মেয়ের পক্ষে এমন করা সম্ভব না, ভাই। ও আমাকে সত্যিই ভালোবাসে কিন্তু...’

ইনো ভাই রনির কথা শেষ হওয়ার আগেই বললেন, ‘কিছু মনে করিস না; নূপুর তোকে সত্যিই ভালোবাসে কিনা, তা পরীক্ষা করে দেখতে পারিস। তা নাহলে তুই-ই পস্তাবি। ওর জন্য অপেক্ষা করছিস ঠিকই কিন্তু একটা সময় দেখবি অতি সামান্য ছুঁতোয় তোকে ছেড়ে অন্য ছেলের হাত ধরে সোনালি ভবিষ্যৎ নির্মাণে ব্যস্ত হয়ে পড়েছে। ভয়ংকর স্বার্থপর এরা। এদের কাছে প্রেম অনেকটা গেম এর মতো!’

‘ভালোবাসা আবার পরীক্ষা করা যায় নাকি, ভাই?’

‘সবই পরীক্ষা করা সম্ভব। ভালোবাসার পরীক্ষা নিয়ে পরে বলছি। তার আগে সত্যি করে বল তো-তোর কি নূপুরের কোনো কথার কারণে মনে হয়েছে, যে চাকরিটা করছিস, তা জঘন্য?’

খানিকক্ষণ চুপ থেকে রনি বলল, ‘নূপুর বলছিল, ওর কোনো এক আত্মীয় বিদেশে সেটেলড হয়েছে। ওর নিজেরও ইচ্ছা, ভবিষ্যতে বিদেশে স্থায়ী হওয়া। আসলে সেটা শোনার পর থেকেই আমার মনে হচ্ছে, এ আমি কোনদিকে ক্যারিয়ার গড়ছি!’

‘শোন ছোটভাই, তোর ফাঁপা রিলেশনশিপ তোকে আত্মা ও মনের দিক থেকে ক্রমেই নিঃস্ব করে ফেলছে। মোহ কেটে গেলে তুই বেঁচে যেতি। কিন্তু ব্যাপারটা এত সহজ না আমি জানি। সময় লাগবে। তবে তোর তাড়নাকে আমি পজিটিভলি নিতে চাই। তোর ক্যারিয়ার সবে শুরু। রিঅ্যাকটিভ না হয়ে প্রোঅ্যাকটিভলি তোকে ক্যারিয়ারের পথে এগোতে হবে। কৌশলী হতে হবে।’

‘চালাকি আমি পারি না, ভাই।’

‘কৌশলী মানে চালাক হতে হবে, এটা তোকে কে বলল? আমি তোকে তিনটা সূত্র বলব। এই সূত্রগুলো অনুসরণ করে চলবি। জীবনের সঙ্গে মেলানোর চেষ্টা করবি। তাহলে সঠিক পথ খুঁজে পেতে সুবিধা হবে। তুই নিজেই হয়ে উঠবি নিজের জীবনের গাইড।’

‘কী সূত্র, ভাই?’

‘নিউটনের তিন গতিসূত্রের মতো জীবনের তিন সূত্র-নিজেকে চেনা, পরিস্থিতি চেনা এবং নেশাগ্রস্ত হওয়া।’

‘নেশাগ্রস্ত হওয়া! শেষমেশ নেশাগ্রস্ত হতে হবে!’

‘আগে ব্যাখ্যাটা শোন।’

‘জি ভাই, বলুন।’

‘নিজেকে চেনা মানে হলো নিজের মন কী চায়, সেটা জানার চেষ্টা করা। আমরা প্রিয়জন, পরিবার বা সমাজের চাপে অনেক কিছু করি কিন্তু দুনিয়ায় সবচেয়ে আপন যা, তা হলো নিজের মন। সেই মনের কথা বা অন্তরের ইচ্ছা কী, তা কতজন কান পেতে শোনার চেষ্টা করে? মনের অভিলাষ শোনার ব্যাপারে আমরা নিরবধি থাকি বধির। অথচ জীবনে সঠিক পথে চলার জন্য, লক্ষ্য অর্জনের জন্য, সফলতার জন্য নিজের মনকে চেনা দরকার সবচেয়ে বেশি। মনীষীরা চিরকাল একই কথা বলে গেছেন। তোর নিজের অন্তর সত্যিকার অর্থে কী চায়, সেটি জানার চেষ্টা কর।’

‘ভাই, আমার মাঝেমাঝে মনে হয় এই কর্পোরেট জব আমার জন্য না। অনেক টাকা পাচ্ছি সত্য কিন্তু এভাবে সারাদিন খাটুনির মধ্যে আমি কোনো তৃপ্তি পাই না। দিনেদিনে মানসিক শান্তি একদম হারিয়ে ফেলছি।’

‘এমন হুটহাট করেও নিজের মনের ইচ্ছা সম্পর্কে ধারণা করা ঠিক না। একটু সময় নে। নিজের অন্তর কী চায়, সেটা খুঁজে বের করার চেষ্টা কর।’

‘জি, ভাই।’

‘দ্বিতীয় সূত্র হলো, পরিস্থিতি চেনা। তোর মন যা চায়, সেদিকে এগিয়ে যাওয়ার মতো অনুকূল আবহাওয়া সবসময় পাবি না। বাধা থাকবে, ঝড় আসবে। তাই সুযোগের সদ্ব্যবহার করার কথা জ্ঞানীরা বলেন। তুই উপযুক্ত পরিস্থিতির অপেক্ষায় থাকবি কিংবা উপযুক্ত পরিস্থিতি খুঁজে বের করবি বা তৈরির চেষ্টা করবি। এটা অবশ্য ভাগ্যের ওপরও নির্ভর করে। যাহোক, অনুকূল পরিস্থিতির উদ্ভব হলে তুই তা অনুভব করতে পারবি ছোটছোট অর্জন বা সফলতার মাধ্যমে। তখন নিজের সমস্ত ক্যাপাবিলিটি নিয়ে এগিয়ে যাবি পথ ধরে। ঠিকই পরিপূর্ণভাবে সফল হবি।’

রনির বেশ মজাই লাগছে। সে প্রশ্ন করল, ‘ভাই, ক্যাপাবিলিটি মানে কী বোঝাচ্ছেন?’

ইনো ভাই উত্তরে বললেন, ‘সেটার জন্য তৃতীয় সূত্র। সূত্রটি হলো, নেশাগ্রস্ত হওয়া। এই নেশা এডিকশন অর্থে না; ডিভোশন অর্থে। অর্থাৎ ভালো কাজের প্রতি নেশাগ্রস্ত হওয়া। নিজের অন্তরকে চেনার পর সেই পথে এগিয়ে যাওয়ার জন্য সংশ্লিষ্ট জ্ঞান ও অভিজ্ঞতা অর্জন করা শুরু করতে হবে। নিজেকে লক্ষ্যের প্রতি ফোকাসড রেখে এগিয়ে যেতে হবে। নানাভাবে আগ্রহের বিষয়টিতে জ্ঞান ও অভিজ্ঞতা অর্জন করা সম্ভব। যেমন- পড়াশোনার মাধ্যমে, ট্রেনিং ও সেমিনারে অংশ নেওয়ার মাধ্যমে। এমনকি আগ্রহ থাকলে মুভি দেখা, আড্ডা, ভ্রমণ, গেট টুগেদার থেকেও জ্ঞান ও অভিজ্ঞতা অর্জন করা সম্ভব। তারপর একদিন অনুকূল পরিস্থিতি তৈরি হলে দেখবি, তুই দ্রুত এগিয়ে যাচ্ছিস। এসব সূত্রকেই জীবনের কৌশল বলি আমি। তোকে কৌশলী হতে বলার অর্থ, জীবনের পথে এসব কৌশল মনে রেখে বুঝেশুনে এগোতে হবে।’

এটুকু বলে ইনো ভাই থামলেন। রনি কোনো কথা বলল না। চুপ করে আছে; যেন চিন্তার জগতে ডুবে গেছে। ইনো ভাই বললেন, ‘কী ভাবছিস?’

রনি উত্তর দিল, ‘সূত্র তিনটা নিয়েই ভাবছি, ভাই। নিজেকে চেনা, পরিস্থিতি চেনা আর নেশাগ্রস্ত হওয়া! জীবনের অনেক ঘটনাই এখন মাথায় ঘুরছে। তখন সূত্রগুলো জানা থাকলে সেসব পথে হাঁটা আমার জন্য সহজ হতো। এখন বুঝতে পারছি, জগতের সব পথ তো আর আমার জন্য না। আসলে কিছুদিন জীবন নিয়ে ভাবতে হবে, ভাই।’

ইনো ভাই মাথা নেড়ে বললেন, ‘শুধু জীবন নিয়ে বললে একটু ভুল হবে; নিজের জীবন নিয়ে ভাবতে হবে। মিলিয়ন-ট্রিলিয়ন বৈচিত্র্যে ঠাসা পৃথিবীতে অন্যের জীবন নিয়ে আপাতত বেশি না ভাবলেও চলবে। সবারই উচিত অন্যের চিন্তায় ডুবে না থেকে, অন্যের সমালোচনায় বুঁদ হয়ে না থেকে আগে নিজের জীবন নিয়ে ভাবা। সাফল্যের সূত্র একাধিক হলেও জীবনে ব্যর্থতার সূত্র একটাই। তা হলো-অন্যের সমালোচনায় ব্যস্ত থাকা। প্রত্যেকে নিজেকে নিয়ে ভাবলে ও নিজে ভালো হলে এমনিতেই সমাজের, দেশের তথা সকলের ভালো হবে।’

এরপরই ইনো ভাই রনিকে জানালেন ভালোবাসার পরীক্ষা নেওয়ার তিন কৌশল। কৌশলত্রয় শোনার পর ‘ভাই’ বলেই রনি থেমে গেল। তার মনে পড়ে গেল, ইনো ভাই ধন্যবাদ দেওয়া পছন্দ করেন না। রনির থেমে যাওয়া দেখে ইনো ভাই বললেন, ‘ভালো থাকিস। দোয়া রইল। তুই আমার কথাগুলো পজিটিভলি নিয়েছিস। আশাকরি, তোর সোনালি পথের খোঁজ তুই পাবি।’

(চলবে)

আসিফ মেহ্‌দী
কথাসাহিত্যিক ও প্রকৌশলী

 

বধির নিরবধি (পর্ব এক)
বধির নিরবধি (পর্ব দুই)
বধির নিরবধি (পর্ব তিন)

 

এই লেখকের অন্যান্য লেখা



আপনার মূল্যবান মতামত দিন:


Top