সিডনী শনিবার, ৩১শে অক্টোবর ২০২০, ১৫ই কার্তিক ১৪২৭

ভ্যাকুয়ম ক্লিনার : বিনোদ ঘোষাল


প্রকাশিত:
২১ সেপ্টেম্বর ২০২০ ১৫:৫৪

আপডেট:
৩১ অক্টোবর ২০২০ ০৪:৫১

ছবিঃ বিনোদ ঘোষাল

 

(লেখক পরিচিতিঃ বিনোদ ঘোষালের জন্ম পশ্চিমবঙ্গের হুগলি জেলার কোন্নগরে। জীবনে বহু বিচিত্র কাজে জড়িয়ে পড়ার পর অবশেষে তিনি লেখালেখিকেই একমাত্র পেশা হিসেবে গ্রহণ করেছেন। ছোটগল্প, উপন্যাস, ফিচার, নাটক, চলচ্চিত্র সমালোচনা তার লেখালেখির বিষয়। দেশ পত্রিকাতে বিনোদ ঘোষালের লেখা প্রথম গল্প ‘একটু জীবনের বর্ণনা’  প্রকাশিত হলে, গল্পটি পাঠকমহলে বিশেষ সাড়া ফেলে। তারপর থেকে তিনি নিয়মিত লেখালেখি শুরু করেন। কাজী নজরুল ইসলামের সমগ্র জীবনকে ভিত্তি করে লেখা তার দীর্ঘ উপন্যাস ‘কে বাজায় বাঁশি?’ একটি উল্লেখযোগ্য কাজ হিসেবে স্বীকৃতি পেয়েছে। বিনোদ ঘোষাল ২০১১ সালে তার ‘ডানাওলা মানুষ গল্প’ গ্রন্থের জন্য পেয়েছেন কেন্দ্রীয় সাহিত্য একাডেমি যুব পুরস্কার। ২০১৪ সালে তিনি ‘নতুন গল্প ২৫’ বইটির জন্য পশ্চিমবঙ্গ বাংলা একাডেমির সোমেন চন্দ স্মৃতি পুরস্কার পান। এছাড়াও তিনি পূর্বভারত পুরস্কার, মিত্র ও ঘোষ স্মৃতি পুরস্কার, শৈলজানন্দ পুরস্কারে সম্মানীত হয়েছেন। দেশের বহু জাতীয় ও আন্তর্জাতিক স্তরের সাহিত্য উৎসবে বাঙালি লেখক প্রতিনিধি হিসেবে অংশ নিয়েছেন। ২০১৬ সালে তিনি মাননীয় ভারতের রাষ্ট্রপতি আমন্ত্রণে রাষ্ট্রপতিভবনে 'রাইটার্স ইন রেসিডেন্স প্রোগ্রামে' যোগদান করেন। অর্জন করেছেন ভারতের সংস্কৃতি মন্ত্রকের ফেলোশিপ)

 

ভ্যাকুয়ম ক্লিনার

ফোনটা কাটল অর্জুন। চোখে এখনও ঘুমের আঠা লেগে রয়েছে। বিছানা ছেড়ে উঠতে ইচ্ছে করছে না। মোবাইলে দেখল বেলা সাড়ে বারোটা। তারমানে সময় অনেকটাই। শুয়ে থেকেই টের পাচ্ছে আজ শরীরটা ডাউন রয়েছে। ভালো পারফরমান্স পোজিশনে নেই। গতকাল শেষরাতে বাড়ি ফিরেছে। আজকের দিনটা রেস্ট নিলে ভাল হত। কিন্তু মনে হচ্ছে আর সে উপায় নেই। মিসেস সুরেকা ওসব কিছু বোঝেন না। দুপুর দুটো থেকে সন্ধে ছটা আজ ডিউটি টাইম। ভেন্যু গলফগ্রিন। দূরদর্শন ভবনের কাছেই। তবে ক্লায়েন্ট পিক আপ-ড্রপ ফেসিলিটি দিতে পারবেন না, কনভেন্স আলাদা পে করবেন। আড়মোড়া ভাঙ্গল অর্জুন। তারপর আরও কিছুক্ষন ঝিম মেরে টানটান শুয়ে রইল। ঘরের এসি পুরো চিলড হয়ে রয়েছে। ওর পরনে শুধু একটা শর্টস, গারে চাপানো নরম ব্ল্যাঙ্কেটটা ঘুমের ঘোরে গা থেকে বেশ খানিকটা নেমে গিয়েছিল, ওটাকে মাথা পর্যন্ত টেনে নিয়ে আরও কিছুক্ষণ শুয়ে থাকল। তারপর প্রায় জোর করেই নিজেকে বিছানা থেকে ছাড়াল। এসি অফ করে বেডরুম থেকে বেরিয়ে এল। পার্কসার্কাসে একটি ওয়ান বি এইচকে ফ্ল্যাট ভাড়া নিয়ে এই বছরখানেক রয়েছে অর্জুন। একটা বেডরুম ছোট ডাইনিং স্পেস, কিচেন, টয়লেট । ডাইনিং স্পেসে ডাইনিং টেবল নেই। দরকার লাগে না। এই ছোট ফ্লাটের ভাড়া মাসে দশহাজার। একটা সময়ে এই টাকা ওর কাছে স্বপ্ন ছিল কিন্তু আজ দশ হাজার কেন, কুড়ি হাজার টাকা দিয়েও ও ভাড়া থাকতে পারে, অবশ্য একা মানুষ, এর বেশি ওর প্রয়োজন নেই।

টয়লেটে গিয়ে লাইট জ্বালিয়ে চওড়া আয়নাটার সামনে টানটান দাঁড়াল অর্জন। এই টয়লেটটা ও বাড়িওলার অনুমতি নিয়ে বিশেষভাবে সাজিয়েছে, একেবারে ঝকঝকে আধুনিক । তার কারণ অর্জুন নিজেকে দেখতে ভালো বাসে। শুধু তাই নয়, নিজেকে দেখাটা ওর কাজের মধ্যে পড়ে। আয়নার সামনে নিজেকে ঘন্টার পর ঘন্টা তাকিয়ে দেখতে পারে, মুগ্ধ হতে থাকে । রোজের মতো আজও তাই করল। টয়লেটের চারটে লাইটই জ্বালিয়ে দিয়ে বুক চিতিয়ে দাঁড়াল সামনে। জিম পাঁচ ফুট দশ ইঞ্চির জিম করা টিউনড নির্লোম ফিজিক ঝলসে উঠল আয়নার সামনে। ঘুরিয়ে ফিরিয়ে বেশ অনেকক্ষণ নিজেকে দেখল। ডানবাহুতে কালসিটে... ইসসস এগুলোই খুব বিশ্রী ব্যাপার! অর্জন যতটা সম্ভব এগুলোকে এড়িয়ে যেতে চেষ্টা করে, কিন্তু এক এক সময় এই বিচ্ছিরি ব্যাপারগুলোকে ফেস করতে হয়। যেমন কাল রাতে করতে হয়েছে। এইসব কালচে লাল দাগগুলো তার প্রফেশনের পক্ষে সত্যিই কলঙ্কের। পরের ক্লায়েন্ট অনেকসময়েই ভাল চোখে নেয় না। তারা নিখুঁত অর্জুনকে চায়।

নিজেকে বেশ কিছুক্ষণ ঘুরিয়ে ফিরিয়ে দেখে নিয়ে তারপর টুথব্রাশে পেস্ট লাগাল অর্জুন। গতকালের ক্লায়েন্টের নাম ছিল অনিতা ছাবারিয়া। বছর পয়তাল্লিশ হবে। কথায় কথায় বলেছিল হাজব্যান্ড দুবাইতে থাকে। আর ওদের এক ছেলে দেরাদুনে বোর্ডিং স্কুলে। এইসব ইনফো অর্জুনের ইদানিং আর ভালো লাগে না। এসব ওর কোনও ইন্টারেস্ট নেই। এই লাইনে আসার পর অর্জুন একসময় রিয়ালাইজ করেছে মানুষের দুঃখগুলো বেশ কমন। খুব বেশিদিন কালটিভেট করতে হয় না। জানতে জানতে কিছুদিন পরই কেমন একঘেয়ে লাগতে শুরু করে।

আবার ফোন বাজছে। বেসিনে থুতু ফেলে বেডরুমে গিয়ে দামি এন্ড্রয়েড ফোনটা হাতে নিল অর্জুন। অচেনা নাম্বার।

হ্যালো।

ওদিকে স্তব্ধতা।

হ্যালো। হু ইজ স্পিকিং?

ওদিকে কেউ একজন রয়েছে। তার ঘন ঘন শ্বাস পড়ার শব্দ শোনা যাচ্ছে ফোনে।

এই ধরণের শব্দহীন ফোন এলেই অর্জন অন্যরকম হয়ে যায়। ভেতরটা অস্থির লাগে। তোলপাড় হতে শুরু করে ভেতরটা। এতদিন পরেও!

শেষবার হ্যালো বলে ফোন নামিয়ে রাখার আগে অর্জুন শুনতে পেল ওদিক থেকে একজন মিহি কণ্ঠে বলে উঠলো হ্যালো, আমি মানে শ্রীলেখা চ্যাটার্জি বলছি, মিস সুরেকা আপনার নাম্বারটা আমাকে দিয়েছেন।

গলফগ্রীন?

হ্যাঁ।

আমার তো দুটোয় এ্যাপয়েন্টমেন্ট। আমি পৌছে যাব । আমাকে এ্যাড্রেসটা বলে দেবেন।

হ্যাঁ... হ্যাঁ নিশ্চয়ই। আমি কি মেসেজ করে দেব?

করতেও পারেন অথবা আমি ওখানে গিয়ে আপনাকে কল করে নিতে পারি। যেটা আপনার পক্ষে সুইটেবল।

ওক্কে আমাকে তাহলে কল করে নেবেন প্লিজ।

থ্যাঙ্ক ইউ মাডাম, বলে ফোন রেখে দিল অর্জু্ন। ফোনের ওপারের মহিলার গলায় বেশ টেনশন রয়েছে। বোঝাই যাচ্ছে নতুন। প্রথম দিকে একটু টেনশন থাকেই, ভয় থাকে। পরে মজা লেগে যায়। তারপর কেটে যায়। অর্জুনেরও ছিল। এখন ভয়, টেনশন কিছুই নেই। কিছুই নেই। আবার টয়েলেট গেল। দাঁত ব্রাশ করল অনেকক্ষণ ধরে। তারপর মুখ ধুয়ে দাঁতগুরো ভালো করে দেখল। পেটে চাপ আসছে। টুথপেস্টের গন্ধটা অর্জুনের পারগেটিভের কাজ করে। ব্রাশ মুখে দিলেই নিচে চাপ পড়ে । ছোট বেলার অভ্যাস। কমোডে বসে কয়েক মিনিটের মধ্যে কাজ সেরে ফেলে শাওয়ার চালিয়ে দিল অর্জুন । প্রতিদিন শাওয়ারের নিচে কমকরে পনেরো মিনিট দাঁড়িয়ে থাকে। দামী বিদেশি সাবানের মনভোলানো গন্ধে-ফেনায় ভরে যায় বাথরুম। অনেকক্ষণ ধরে শরীরের প্রতিটি ইঞ্চিকে সাবানে পরিস্কার করতে থাকে। করতে করতে অন্যমনস্ক হয়ে পড়ে মাঝেমাঝে, কিন্তু হাত চলতে থাকে যন্ত্রের মতো। সারাদিনের মধ্যে অর্জুনের একমাত্র নিজস্ব সময়টুকু হল এই স্নানের সময়। এই ছোট চারদেওয়ালটার মধ্যে ঢুকে পড়লে ও নিজেকে নিরাপদ মনে করে। স্বস্তি পায়। নিজেকে খুঁজে পায়। আজও তাই করতে থাকল, সাবানের ফেনায় নিজের সুপুরুষ চেহারাটা ভরিয়ে ফেলল অর্জুন। চুলে শ্যাম্পু দেওয়ার পর ধুয়ে ফেলে কন্ডিশনার মাখল। মিনিট কুড়ি চলল স্নানপর্ব। বেসিনের সামনের চওড়া আয়নাটা শরীরের নিন্মাঙ্গ পর্যন্ত পর্যন্ত ধরে ফেলে। শাওয়ারের বাস্পে আয়নার কাচ ঝাপসা হয়ে গিয়েছে। বেসিনের পাশের হ্যাঙ্গারে ঝোলানো সাদা তোয়ালে দিয়ে কাচটা ঘসে দিতেই সেখানে অর্জুনের নগ্ন শরীর যেন ঝলসে উঠল। যেন পাথর কুঁদে বানানো এই দেহ সৌষ্ঠব। অর্জুন নিজেকে দেখে নিজেই মুগ্ধ হয়ে যায় বারবার। সিক্স প্যাক কিংবা ল্যাটিস, ট্রাইসেপ বানানোর জন্য নয়, ও জিম করে স্রেফ নিজেকে চাবুকের মতো হিলহিলে রাখতে । সেটাই সবথেকে বেশি আকর্ষনীয় । নরম তোয়ালেতে গা মুছে সামান্য ওডিকোলন ছিটিয়ে টয়লেট থেকে বেরলো অর্জন। এবার তাড়াতাড়ি করে ফেলতে হবে।

বেডরুমে দেওয়াল লাগোয়া ওয়্যারড্রোব খুলে চটপট জিন্স আর ক্যাজুয়াল শার্ট বার করল। দুটোই ব্রান্ডেড। গোটা শরীরে ভাল করে দামী বডিস্প্রে ঢেলে শার্ট-প্যান্ট পরে নিল। পরিপাটি করে ঘন কালো চুল আঁচড়াল। মোটা ভুরুর নীচে অর্জুনের চোখদুটো বেশ মায়াময়। এটা ওর অন্যতম প্লাসপয়েন্ট। ক্লায়েন্ট পছন্দ করে। রেডি হয়ে বেডরুম থেকে বেরিয়ে অর্জুন ড্রয়িং রুমে গেল। এই ঘরটা অবশ্য ডয়িং কাম ডাইনিং রুম। ওর ফ্ল্যাটের দরজা খুললেই প্রথমে এই ঘরটা। এই ঘরে রয়েছে একটা ফ্রিজ, আর চারটে চেয়ার সমেত একটি ছোট ডাইনিং টেবিল। টেবিলের ওপর কয়েকটা কাপ-ডিস ইত্যাদি রাখা। আর এককোনে ওয়াকয়াউট করার মেশিন। মেশিনটার দিকে তাকাল অর্জুন। আজ আর এক্সারসাইজ করা হল না। এ্যাসাইনমেন্ট সেরে ইভিনিং এ করতেই হবে।

ফ্রিজ খুলে দুটো ডিম আর ব্রাউন ব্রেড বার করল। এখন ব্রেড টোস্ট আর এগপোচ দিয়ে ব্রেকফাস্ট হবে। তারপরেই বেড়িয়ে পড়তে হবে। লাঞ্চ ক্লায়ন্টের সঙ্গে।

কিচেনে ব্রেকফাস্ট তৈরি করতে করতেই মোবাইলে উবের বুক করে নিল অর্জুন। আজকাল ও আর বাসে যাতায়াত করে না। নিজে গাড়ি কিনতেই পারে, তবে এখন দরকার নেই। সময় পড়ে রয়েছে অনেক।

 

###

ফ্ল্যাটের নিচে এসে দাঁড়াতেই মে মাসের দুপুরের রোদটা যেন এক মুহূর্তে সেঁকে দিল অর্জুনকে । অসহ্য গরম! এই কয়েক মিনিটেই চামড়া যেন জ্বলে উঠেছে। উফ আর কতক্ষণ দেরি করবে ক্যাবটা? ডিসগাস্টিং! ড্রাইভারকে ফোন করল ও। কী হল দাদা আর কতক্ষণ?

চলে এসেছি কাছাকাছি। উত্তর দিল ড্রাইভার । আর মিনিটখানেক।

মিনিটিখানেকও লাগল না। ট্যাক্সিটা এসে দাঁড়াল। ভেতরে ঢুকে হাঁফ ছেড়ে বাঁচল অর্জুন। দম যেন আটকে আসছিল। ট্যাক্সির ভেতরে এসির ঠান্ডায় শরীর জুড়োতে শুরু করল।

এখান থেকে গলফগ্রিন রাস্তা ক্লিয়ার থাকলেও বেশ কিছুক্ষণ সময়। ট্যাক্মিতে নিজেকে এলিয়ে দিয়ে বাইরের দিকে তাকাল অর্জুন। এখন আর মনে পড়ছে না বাইরে ঠিক কতটা গরম। সুখ পেলে মানুষ খুব দ্রুত ভুলতে পারে অতীতকে তা সে যতই সাম্প্রতিক হোক না কেন। কলকাতা শহরে মে মাসের দুপুরেও থিক থিক করছে মানুষ। একটা ছেলেকে দেখল ফুটপাতে দাঁড়িয়ে বোতল থেকে নিজের চোখে মুখে জল দিচ্ছে। ছেলেটার বয়স অর্জুনের থেকে কিছুটা কমই হবে। ওয়েল ড্রেস, কাঁধে চামড়ার কর্পোরেট ব্যাগ । দেখেই মনে হয় বেচুবাবু। লাইনে কতদিনের হবে? কী বেচে? ভাবতে ভাবতেই কয়েকটা বছর পিছিয়ে গেল ও।

 

###

বিকম পার্টটু-র শেষ পরীক্ষার দিন বাবা অর্জুনের সামনে হাতজোড় করে বলেছিল এই পর্যন্ত আমার করার ছিল, ব্যাস এরপর কিছু করতে হলে নিজের ক্ষমতায় করো, আর তোমার জন্য আমার কিছু করার সাধ্য নেই। বাবা হিসেবে যতটুকু করার করতে চেষ্টা করেছি।

বাবার দোমড়ানো মোচড়ানো মুখের দিকে তাকিয়ে অর্জুন বুঝতে পেরেছিল বাবা কথাগুলো আসলে যন্ত্রণা থেকেই বলছে। ফ্যাক্টরি বন্ধ হয়ে গিয়ে পঞ্চাশ বছর বয়েসে ঘরে বসে যাওয়া অকাল বৃদ্ধ বাবার জন্য করুণাই হয়েছিল সেদিন। ঠিকই তো, গ্র্যাচুইটি আর পেনশনের সামান্য কটা টাকা থেকে এতদিন ধরে তিনজনের পেট চালিয়েছে এটাই অনেক। এবার নিজের পথ দেখে নিতে হবে। স্কুল লাইফ থেকে পাড়ার -স্কুলের ফুটবল খেলতে খেলতে ফোর টেন পর্যন্ত পৌছেছিল অর্জুন। সকলেই বলত ছেলেটার সম্ভাবনা ররেছে, ঠিকঠাক ট্রেনিং পেলে অনেকদূর যাবে। না, অনেকদূর যেতে পারেনি। তার আগেই থেমে যেতে হয়েছিল। খেলাধুলো গরীৰ মানুষের জন্য নয়। দিন আনো দিন খাও এই হল জীবন। খেলা ছেড়ে দিল অর্জুন, কিন্তু পেটানো শরীরটা সঙ্গ ছাড়ল না। কিছুদিনের জন্য একটা চার্টার্ড ফার্মে জুনিয়র এ্যাকাউন্টেন্ট হিসেবে কাজ করার পর বুঝতে পেরেছিল মাস গেলে হাতে যা আসবে তার থেকে যাতায়াত টিফিন ইত্যাদির পয়সা খসানোর পর হাতে শুধু ধুপকাঠি কেনার টাকাটুকু থাকতে পারে তার বেশি কিছু নয়। কাজ ছেড়ে দিল, এক বন্ধু পরামর্শ দিল রোজগারের একটাই রাস্তা তা হল মাকেটিং। সিমপ্লি বেচুবাবু হয়ে যাও। ক্লিক করে গেলে উন্নতির শেষ নেই। সেই লাইনেই ঝাঁপাল অর্জুন। প্রথমেই সুযোগ পেল একটা পাবলিশিং হাউজে। ইংলিশ পাবলিশিং হাউজ। ডোর টু ডোর ঘুরে ডিকশনারি, থেসোরাস বিক্রি করা। স্যালারি কিছু নেই, শুধু কমিশন, আর ডেইলি কনভেন্স। প্রায় মাস দেড়েক চলল ভারি বইয়ের ব্যাগ কাঁধে নিয়ে এই বাড়ি ওই অফিস। দেখা গেল মানুষ সবকিছুর মানে জেনে বসে রয়েছে, তার আর ডিকশনারি দরকার নেই। ওই ঘোরাঘুরি পোঘাল না। একটা প্রাইভেট ব্যাঙ্কে কিছুদিন থাকল তারপর। কাস্টমার ধরে এ্যাকাউন্ট খুলিয়ে দিতে পারলেই কমিশন। টার্গেট ফুলফিল হল না।

ব্যাঙ্ক একদিন বলল এবার তুমি আসতে পারো। অনেক এসির হাওয়া খেয়েছো।

ওই কাজটাও গেল। মায়ের মুখ ব্যাজার। বাবা বলল, কাজে লেগে থাকতে হয়। পারছি না বলে ছেড়ে দিলে আমি এতদিন সংসার টানতে পারতাম না। টাকা কেউ মুখ দেখে দেয় না ইত্যাদি...

টাকা মুখ দেখে দেয় কি অন্যকিছু দেখে তখনও জানা হয়নি অর্জুনের। তবে চেনাশোনা বারছিল। সেই সূত্রেই একদিন একট নামকরা ব্র্যান্ডের হোমএ্য্যাপ্লায়েন্স কোম্পানিতে সেলস এক্সিকিউটিভের চাকরি লাগল। ভ্যাকুওম ক্লিনার ডেমন্সট্রেশনের কাজ। আবার ডোর টু ডোর। এবার কোমর বেঁধে লাগল অর্জুন । টার্গেট রিচ করতেই হবে। ফুটবল পেটানো শরীরের ওপর শার্ট ট্রাউজার শু চাপিয়ে আয়নার সামনে দাঁড়ালে নিজেই এক এক সময় মুগ্ধ হয়ে যেত অর্জুন । পুরো ম্যাচো বলতে যা বোঝায় আর কি। নিজের রূপ নিয়ে যথেষ্ট সচেতনও ছিল ও। জান লড়িয়ে দিল নতুন কাজটায়। কিন্তু কপাল মন্দ। লোকে ভ্যাকুওম সাফ করতে খুব বেশি আগ্রহী নয় দেখা গেল। মে মাসের গরমে শরীরের গ্লুকোজ গলিয়ে কাহিল হয়ে ধুঁকতে ধুঁকতে সল্টলেকের মিসেস আশা সুরেকার কাছে একগ্লাস জল চেয়েছিল অর্জুন। তারপর মধ্য চল্লিশের মিসেস সুরেকা একেবারে হিন্দি বি গ্রেড মুভির টিপিক্যাল স্টাইলটাই নিয়েছিলেন, মানে জলের গ্লাসটি টেবিলের ওপর রাখার সময় তার বুকের আচল খসে গিয়ে ভরাট বুকের প্রকট ইঙ্গিত ঝাপিয়ে পড়েছিল অর্জুনের চোখে। জল খেয়ে তেষ্টা মেটার পর মিসেস সুরেকা বলেছিলেন তুমি খুব টায়ার্ড মনে হচ্ছে। ইউ ক্যান টেক আ ন্যাপ, ফিল ফ্রি, আমি এসিটা ফুল চিলড করে দিই।

অর্জুন সমঝদার কিন্তু মিসেস সুরেকা প্রবল ইশারাতেও সেদিন সাড়া দেয়নি। কে জানে যদি ইশারা ভুল হয়। কিন্তু তার পরের দিনই সুরেকা অর্জনের মোবাইলে ফোন করে জানালেন, ভ্যাকুয়ম ক্লিনার ঠিকঠাক কাজ করছে না। আরেকবার এসে যদি.... 

আরেকবার আসার পর আর ইঙ্গিতে ভুল করেনি অর্জুন। সদ্য ডাঙার তোলা কাতলা মাছের মতো মিসেস সুরেকার স্বপ্নের মতো নরম বিছানায় দাপানোর পর অর্জুনকে প্রফেশন্যাল কোচের মতো মিসেস সুরেকা বলেছিল গুড প্লেয়ার। আই লাইক ইট। তুমি অনেকদুর যাবে। আর অর্জুন অবাক হয়ে গিয়েছিল প্রায় পঞ্চাশ ছুঁই মহিলার শরীরে এত জোশ!

অর্জুনের হাতে একটা খাম ধরিয়ে দিয়ে সুরেকা বলেছিল ইফ ইউ উইশ কিপ ইন টাচ। তোমার এই জব তোমার জন্য সুইটেবল নয়। যে ঐশর্য তোমার রয়েছে তাকে ক্যাশ করাও ।

অর্জুন চিটচিটে গা নিয়ে বাড়ি ফিরে দেখেছিল খামের ভেতরে পুরো দশ হাজার ক্যাশ।

তারপর আরও বার কয়েক। প্রতিবারই দশ নয়। শেষ বার সুরেকা খাম ছাড়া পাঁচ হাজার হাতে দিয়ে বলেছিলেন এটা নাও। যদি আরও ইনকাম বাড়াতে চাও তাহলে তোমার জন্য একটা সুযোগ রয়েছে, এন্ড আই থিঙ্ক ইউ শুড গ্র্যাব দ্য অপরচুনিটি। তারপর সুরেকার কাছে অর্জুন শুনেছিল এক বিচিত্র ইনকামের পথ। কলকাতায় অনেক নানা বয়েসের মহিলা রয়েছেন যারা পুরুষ সঙ্গ চায়। তারা আসলে সেই পুরুষদের মতোই প্রকৃত একা। তাদের জন্য তোমাকে কিছুটা সময় দিতে হবে।

সেই সময় কীভাবে দিতে হবে তা আর বুঝিয়ে দেওয়ার প্রয়োজন হয়নি। তবে ভেতর থেকে কেউ একটা বারণ করছিল। মানুষের ভেতর বেশিরভাগ সময়েই না না করে চেঁচায়, তাকে বেশি পাত্তা দিতে নেই। সেই ভেতরের লোকটার মুখ চেপে ধরে রাজি হয়ে গিয়েছিল অর্জুন ।

আর রাজি হওয়ার পর মিসেস সুরেকা তার বিজনেস টার্মের কথা জানিয়েছিলেন। পেমেন্ট কিন্তু অর্জুন নিজে ক্লায়েন্টের কাছ থেকে পাবে না, সেটা সুরেকা নেবে। এবং অর্জুন পেমেন্ট পাবে সুরেকার কাছ থেকে। আর ক্লায়েন্টের সঙ্গে সে কখনও পেমেন্টের এ্যামাউন্ট নিয়ে ডিসকাস করতে পারবে না। তবে ক্লায়েন্ট যদি খুশি হয়ে টিপস বাবদ ক্যাশ বা কোনও গিফট দিতে চায় তাহলে কোনও অসুবিধা নেই। নিজের বা ক্লায়ন্টের পারসোনাল লাইফ নিয়ে কোনও ডিসকাশন করবে না ইত্যাদি। তোমার এই প্রফেশনটার নাম জানো?

হু জানি, জিগোলো। শব্দটা উচ্চারণ করতে গিয়ে অর্জুন বুঝতে পেরেছিল ওর মুখের ভেতর অকারণে থুতু জমে উঠছে।

তারপর শুরু হল কাজ। কাজের সঙ্গে মিসেস সুরেকার ক্রমাগত ট্রেনিং। ড্রেসকোড কেমন হবে? কী পারফিউম ইউজ করতে হবে, মাউথ ফ্রেশনার থেকে তিন চার রকমের ফ্লেবারড কন্ডোম সবসময়ে নিজের কিটে রাখতে হবে, কারণ অনেক সময়েই ক্লায়েন্ট সেটা সেটা সঙ্গে রাখতে পারে না। বডি হেয়ারি থাকবে নাকি শেভড, কী কী উপায়ে ক্লায়েন্টকে ম্যক্সিম্যাম স্যাটিসফাই করা যায় তার পাঠ নিতে নিতে নিজেকে আর মানুষ বলে মনে হত না, একটা জ্যান্ত পুতুল। যার শুধু শরীরটুকুই রয়েছে কিন্তু প্রাণ, আত্মা, কিছু নেই, কিচ্ছু না।

মাস কয়েকের মধ্যে ফুল ট্রেইন্ড হয়ে গেল অর্জন। জানল সুরেকার এমপ্লয়ি শুধু ও একা নয়, এই শহরে ওর মতো আরও বেশ কয়কজন রয়েছে। তাদের সঙ্গে কখনই অর্জুনের দেখা হয়নি, কিংবা হয়তো হয়েছে পথে ঘাটে, কিন্তু কেউ কাউকে চিনতে পারেনি।

ভ্যাকুয়ম ক্লিনারের চাকরিটা কিন্তু ছাড়ল না অর্জুন। মিসেস সুরেকাই ছাড়তে বারণ করেছিলেন, ওটা হল সেফগার্ড। কখনও আচমকা সমস্যায় পড়ে গেলে এ ক্লিনারই বাঁচাবে। আর সত্যি বাঁচিয়েও ছিল একবার-দু'বার। বেহালার ঘটনাটা তো সাংঘাতিক হয়েছিল। দুপুরে কল ছিল অর্জুনের। অর্জুন গিয়ে সেই মহিলার সঙ্গে কাজ শুরু করেছে আচমকাই কলিং বেল। এখন কে? মহিলা গায়ে কোনও রকমে চাদর জড়িয়ে দরজার আইহোল দিয়ে কে এসেছে দেখেই চমকে উঠেছিলেন, হুরমুড় করে বেডরুমে ঢুকে নাইটি পরতে পরতে বলেছিলেন আমার হাবি এসে গিয়েছে। স্কাউন্ড্রেলটা এখন কী করে এল জানি না, নাইটের ফ্লাইটে ফেরার কথা ছিল। প্লিজ তুমি কুইক রেডি হয়ে ড্রয়িং রুমে গিয়ে বসো।

কয়েক মুহূর্তের মধ্যে তৈরি হয়ে গিয়ে ড্রইংরুমে গিয়ে বসেছিল অর্জুন । হাতে ভ্যাকুয়ম ক্লিনার। মহিলা দরজা খুলতেই হাবির প্রবেশ।

দরজার খুলতে এত দেরী কেন? প্রশ্নের সঙ্গেই অর্জুনের দিকে শ্যেনদৃষ্টিতে তাকিয়েছিল লোকটা। অর্জুন ভেবেছিল এবার বিশাল বাওয়াল লাগবে । দরজা খুলতে এত দেরির জন্য কোনও অজুহাতই যথেষ্ট নয়। কেন দেরি হল তার কারণ প্রায় স্পষ্ট। অর্জন এটুকু সময়ের মধ্যে ঘাবড়ে গিয়ে শার্টটাও ভালো করে ইন করতে পারেনি। কিন্তু ওকে অবাক করে দিয়ে লোকটা কিছুই না বলে অন্য ঘরে চলে গিয়েছিল। ফ্ল্যাট ছেড়ে বেরোনোর সময় অর্জুন আর নিজের কৌতুহল চেপে রাখতে পারেনি, নিচু গলায় মহিলাকে শুধু জিজ্ঞাসা করেছিল, উনি কিছু বললেন না তো?

উত্তরে হিসহিস করে উঠেছিলেন মহিলা, কিছু বলার মতো মুরোদ রয়েছে নাকি ওর?

কিসের মুরোদ তা আর জানা হয়নি।

এমনই কত কত অভিজ্ঞতা । মিসেস সুরেকার দয়ায় রোজগার বাড়তে বাড়তে এখন মাসে কম করে পঞ্চাশ হাজার, কোনও মাসে তার থেকেও অনেক বেশি হয়ে যায়। বেশ আছে। প্রথমদিকে বেশ রোমাঞ্চ লাগত, কখনও আবার গা ঘিনঘিন করত, বমি আসত একএকটি ক্লায়েন্টের চেহারা, হাবভাব দেখে, কিন্তু এখন আর কিছুই আসে না। ভেতরে ভেতরে একটা অদ্ভুত নির্লিপ্তি এসে গিয়েছে। রাস্তায় কোনও সুন্দরী মেয়ে গেলে একবার চোখ মেলে তাকানোরও আগ্রহ জাগে না অর্জুনের। ফলে বিয়ে করার, সংসার করারও কোনও ইচ্ছে নেই।

হাজার রকম ভাবতে ভাবতে ট্যাক্সি এসে দাঁড়াল গন্তব্যে। এবার কোন দিকে যাব?

ট্যাক্সিওলার প্রশ্নে অর্জুনের এতক্ষণের ভাবনায় ছেদ পড়ল। অর্জুন বলল, দাঁড়ান একটু জেনে নিই লোকেশনটা। মহিলাকে ফোন করল ও।

আবার ওদিক থেকে মিহি কণ্ঠ, হ্যাঁ আপনি এসে গিয়েছেন?

হ্যাঁ, এই কেকশপের সামনে।

প্লিজ ওয়েট ফর আ মিনিট, আয়্যাম কামিং।

কামিং! বেশ অবাক হল অর্জুন। মহিলা ওকে রিসিভ করতে আসছে? সাধারনত এমনটা হয় না। বিস্ময়বোধটা প্রকাশ করল না অর্জুন। চুপ করে থাকল।

আপনার গাড়ির নাম্বারটা বলবেন প্লিজ? মহিলা জিজ্ঞাসা করলেন।

হ্যাঁ, বলে ফোনটা হোল্ডে রেখে ট্যাক্সিওয়ালার কাছ থেকে নাম্বারটা জেনে নিয়ে মহিলাকে জানাল অর্জুন।

ওকে থ্যাঙ্কস। জাস্ট রিচিং। বলে মহিলা ফোন কেটে দিলেন।

এখানে নামবেন?

হাঁ দাদা এখানেই, আমাকে একজন রিসিভ করতে আসছেন, একটু অপেক্ষা করতে হবে। বাইরে যা গরম।

ট্যাক্সিওলা উত্তর দিল না। চুপ করে বসে রইল। মিটার অন।

মিনিট দুয়েকের মধ্যেই ট্যাক্সির সামনে এসে দাঁড়াল একটা গ্রে কালারের জাইলো। ড্রাইভার সিটের উইন্ডো গ্লাসটা নামতে সানগ্লাস পরা একটি মুখ। অর্জনের দিকে তাকিয়ে জিজ্ঞাসা করলেন, রেহান?

ইয়া। স্বাভাবিকভাবে উত্তরটা দিতে গিয়েও অর্জুন বুঝতে পারল ওর মুখ বেঁকে যাচ্ছে পরম বিতৃষ্ণায়।

প্লিজ কাম। চড়া লিপস্টিকের ফাঁক দিয়ে ঝকঝকে দাঁতের পাটি ঝিলিক দিল রোদ্দুরে।

এই বিজনেসে অর্জুনের নাম রেহান বিশ্বাস। সুরেকাই প্রথম দিন বলে দিয়েছিলেন, নেভার ইউজ ইয়োর অরিজিনাল নেম। তাই নিজের নাম নিজেই নেওয়া।

ট্যাক্সি ড্রাইভারকে পে করে নামতে ইচ্ছে করছিল না অর্জুনের । এই প্রথম পালাতে ইচ্ছে করছিল। হে ভগবান! এ কে? নিশ্চয়ই এ ক্লায়েন্ট নয়। নিশ্চয়ই নয়।

কয়েক মুহূর্তের রোদ্দুরের ছ্যাকাটুকু পেরিয়ে জাইলোর পিছনের দরজা খুলতে গেল অর্জুন। ভেতর থেকে আবার সেই রিনরিনে গলায় আবদার এল। আপনি আমার পাশের সিটেও বসতে পারেন।

অর্জুন নেহাৎ অনিচ্ছায় সামনের ফ্রন্টডোর খুলে মহিলার পাশে বসল। দরজা বন্ধ করার সঙ্গে সঙ্গে গাড়ি ছেড়ে দিলেন তিনি।

আরচোখে আবার আজকের ক্লায়েন্টের দিকে তাকাল অর্জুন। কোঁচকানো মুখ, ববকাট কার্ল করা চুল প্রায় সবটাই সাদা, স্টিয়ারিং ধরা হাতদুটোর থেকেও টিলে চামড়া কিছুটা ঝুলে রয়েছে, কানে দুল। পাথরটা দেখলে আন্দাজ করা যায় রিয়্যাল ডায়মন্ড। হাতের আঙটির পাথরও তাই। রিস্টলেটও। পরনের সালোয়ারটাও কোনও নামি বুটিকের হবে। কত বয়স হবে? সত্তর নাকি তারও বেশি। তারও? কিন্তু এ কে? আর যাচ্ছেই বা কোথায়? নাহ জানতেই হবে।

আপনি? জিগাসা করেই ফেলল অর্জুন ।

আমিই শ্রীলেখা চ্যাটার্জি, মৃদু হেসে বললেন মহিলা। চ্যাটার্জি শব্দটা পুরো বৃটিশ এ্যাকসেন্ট।

ওহ মাই গড! এই... এই সে!

আপনি! বিস্ময়টা আর চাপতে পারল না অর্জুন। মুখ থেকে বেরিয়েই গেল শব্দটা।

ইয়েস।

হুঁ, মাথা গরম হয়ে গেল অর্জুনের। সুরেকা ভেবেছে কী? দুটো পয়সার জন্য যার তার কাছে পাঠিয়ে দিচ্ছে। এই বুড়ির সঙ্গে শেষ পর্যন্ত... ছি! গা ঘুলিয়ে উঠল অর্জুনের।

বুড়ি নির্বিকার। পাকা হাতে ড্রাইভ করছে। কোন চুলোয় যাচ্ছে কে জানে। মরার বয়স হয়ে গেল তবু শরীরের শখ যায়নি। এ আদৌ... মাথা কাজ করছে না অর্জুনের ।

আপনি রিল্যাক্স হয়ে বসুন। বাই দ্য ওয়ে আমি কি আপনাকে তুমি করে বলতে পারি?

হ্যাঁ পারেন।

থ্যাঙ্কস।

আমরা কোথায় যাচ্ছি জানতে পারি? বিরক্তি নিয়েই জিজ্ঞাসা করল অর্জুন।

ওহ শিয়োর। আমরা নিউ আলীপুর যাচ্ছি। সাউথ ভিউতে।

ওখানে কেন?

বলব। তা তোমার নামটি কিন্তু ভারি সুন্দর । রেহান। দিব্বি নাম। মিস সুরেকার কাছে তোমার নামটা শুনেই আমি তোমাকে চুজ করেছিলাম। তারপর উনি যখন তোমার ফটো মেল করলেন আমাকে তখন সঙ্গে সঙ্গে ডিসাইড করে ফেলেছিলাম তুমিই আজ আমার সঙ্গে সারাদিন থাকবে।

সারাদিন মানে...

ইয়েস আই নো, আপ টু সিক্স পি এম। সুরেকা আমাকে সব টার্ম কন্ডিশন বলে দিয়েছেন।

সাউথ ভিউ হোটেল কলকাতার নামী হোটেলগুলোর মধ্যে একটি। তারমানে ওখানেই কোনও রুম বুক করেছে বুড়ি। কিছুক্ষণের মধ্যেই পৌছে গেল। পার্কিং জোনে পার্ক করার পর উনি যখন গাড়ি থেকে নামলেন অর্জুন দেখল এই বয়েসেও বুড়ি বেশ টানটান হয়ে হাঁটতে পারে। পায়ের চটিটার দামও কয়েক হাজারটাকা হবেই।

প্লিজ কাম। বলে অর্জুনের হাত ধরল শ্রীলেখা । হাতটা কনকনে ঠান্ডা এবং মসৃণ ।

অস্বস্তি হচ্ছিল অর্জুনের । দাঁত চিপে নাক দিয়ে গরম নিঃশ্বাস ফেলতে ফেলতে হোটেলের ভেতরে ঢুকল ও।

ফার্স্টে আমরা লাঞ্চটা করে ফেলি তারপর কী করব সেটা বলছি।

আমি কিন্তু কিছু খাব না।

তাই বললে হয়? আমি প্ল্যানই করে রেখেছি আজ একসঙ্গে খাব। প্লিজ...

পেট যে ভরা ঠিক তাও নয়, আচ্ছা ঠিক আছে। রাজি হয়ে গেল ও। হোটেলের একটি নিদিষ্ট কর্নারে বুড়ির সঙ্গে ঢোকামাত্র বুঝল এটা হোটেলের রেস্তোরা। ঢোকামাত্র ওয়েটার বেশ খাতির করে বসাল ওদের দু'জনকে । ওয়েটার বুড়ির দিকে তাকিয়ে একগাল হেসে জিজ্ঞাসা কলল, ভালো আছেন মাডাম?

হ্যাঁ তুমি ভালো তো ইয়াসিন?

হ্যাঁ ম্যাডাম ভালো।

আচ্ছা, এ হল রেহান। খুব ভালো ছেলে । দেখেতেও কী সুন্দর বলো?

ইয়েস ম্যাডাম।

বুড়ির এমন আদিখ্যেতায় তিতিবিরক্ত হয়ে উঠছিল অর্জুন।

তুমি কী খাবে বলো?

আপনার যা ইচ্ছে। আমার কোনও চয়েজ নেই। তবে অল্প।

ওহ শিয়োর। বেশ তাহলে ইয়াসিন আমার ফেভারিট ডিশই দুটো দিয়ো।

ওক্কে ম্যাডাম। 

ইয়াসিন চলে যাচ্ছিল। আবার ওকে থামাল বুড়ি। ওহ ইয়াসিন।

ইয়েস ম্যাম।

আগে দুটো তোমাদের স্পেশাল সরবত দাও প্লিজ।

ওক্কে ম্যাডাম। ইয়াসিন চলে গেল।

বুড়ি আর অর্জুন মুখোমুখি। পকেটে ভাল রেস্ত না থাকলে এই হোটেলে লাঞ্চ করা অসম্ভব। একদিনের রুম ভাড়া কেমন হতে পারে? দশ হাজারের নিচে নয় নিশ্চয়ই। তারপর এইসব খানা পিনা। সুরাকাও ডেফিনিট ভালো আদায় করেছে বুড়ি থেকে । আর এই ভাগারের মরার সঙ্গে শুয়ে অর্জনের কপালে ম্যাক্সিমাম দশ। তার কমও হতে পারে। এ্যামাউন্টটা সুরেকাই ঠিক করে। অর্জুন একবার ভাবল বুড়িকে বসিয়ে রেখে পালাবে। কিন্তু আজ পালালে আর কাল থেকে সুরেকার থেকে কোনও এ্যাসিনমেন্ট পাবে না। সেই আবার পুরনো জীবন... নাহ!

গদি চেয়ারটায় চেপে বসল অর্জুন। খামচে ধরল চেয়ারের হাতল।

তুমি রিল্যাক্স করো। এত স্টিফ হয়ে রয়েছ কেন। বলে হাসল বুড়ি। অর্জুন এবার বুঝতে পারল দাঁতগুলো বাঁধানো। ফলস দাঁত খুলে ফেললে মুখটা যে কী ভয়ংকর হয়ে উঠবে মনে মনে কল্পনা করার চেষ্টা করল।

হঠাৎ বুড়ির কী যেন মনে পড়ল, অর্জুনকে বলল রেহান তুমি একটু বসো, আমি এখনই আসছি। বলে উঠে গেল।

ওঠামাত্র মোবাইল বার করল অর্জুন। সুরেকাকে একবার জানানো দরকার। কিন্তু কী বলবে ভেবে পেল না। টেক্সট করল, ম্যাডাম আজকের ক্লায়েন্ট এবাভ সেভেন্টি। আমি জানি না কী করে ডিল করব।

মেসেজ সেন্ড করল। কয়েক মিনিটের মধ্যে কোনও রিপ্লাই এল না, বুড়ি ফিরে এল।

একটা জরুরী কথাই ভুলে গিয়েছিলাম। সেটা বলে এলাম। যাক গে চলো এবার দু'জনে একটু গল্প করি। আমার কথাই বলি আগে, বলে উনি বলতে শুরু করলেন, আমি আসলে বালিগঞ্জ পন্ডিতিয়ার মেয়ে। পঁচিশ বছর বয়েসে বিয়ে করে দেশ ছেড়ে চলে গিয়েছিলাম হিউস্টনে।

হাজব্যান্ড ওখানেই চাকরি করত। তিরিশ বছর ওখানে থাকার পর আবার ফিরতে হল। বলে একটু থামলেন তিনি। এখন অবশ্য আর পন্ডিতিয়া নয়, গলফগ্রিনে ফ্ল্যাট নিয়েছি।

বুড়ির শুধু ধনী নয়, অভিজাত ঘরের সেটা ওর মাপে মাপ কথা বার্তা, সৌজন্যবোধ থেকেই বুঝতে পারছিল অর্জন। এবং তা এই বুড়ো বয়েসে ভীমরতি কি রিসেন্ট ধরল নাকি বরাবরের অভ্যাস কে জানে?

ওয়েটার দুটো সফটড্রিংস দিয়ে গেল।

প্লিজ। বলে গ্লাসের দিকে ইশারা করল শ্রীলেখা। তারপর আপন মনে নিজের ছোটবেলার কথা, বিয়ের গল্প, প্রবাসে থাকার সময়কার বিশেষ বিশেষ ঘটনা ক্রমাগত বকে যেতে লাগল । আর বকার মাঝেমাঝেই থেমে গিয়ে, তুমি বোর হচ্ছ না তো প্রশ্ন।

মাথা ভোঁ ভোঁ করছিল বকবকানি শুনে। আজকের দিনটা যে এমন অভিশপ্ত যাবে কাল রাতেও ভাবতে পারেনি।

ড্রিংক্স শেষ হওয়ার পর বুড়ি বলল, লাঞ্চটা সেরে নিয়ে আমরা একটু শপিং করব কেমন।

লাঞ্চও এসে গেল। পিওর বাঙালি থালি। লাউ চিংড়ি থেকে শুরু করে, ইলিশ, পাতুরি, ভেটকি, পাবদা, গলদা, মাটন কিছু বাকি নেই।

এতকিছু দেখে আঁতকে উঠল অর্জু্ন। ওরেনাবা এই এতকিছু আমি খেতে পারন না ইমপসিবল!

আরে খাও খাও এই বয়েসে খাবে না তো কবে খাবে? শুরু করে দাও।

না না এত খাওয়ার আমার অভ্যাস নেই।

তাও বটে তোমরা আবার সব ডায়েটফায়েট করো। আমিও করি, তবে আজ নো ডায়েট । আজ স্পেশাল। বলে লিপস্টিক মাখা ঠোঁটের ফাঁক থেকে বাঁধানো দাঁতের সারি বার করে মাপা হাসল বুড়ি।

অর্জুন হাত গুটিয়ে বসে রয়েছে দেখে শ্রীলেখা বলল, আচ্ছা অত ভয় পেতে হবে না, তোমার যেটুকু ইচ্ছে হয় সেই টুকুই খাও কেমন। কিন্তু ঠান্ডা কোরো না।

অর্জুন খেতে শুরু করল। কতকাল পর আবার এমন ইলিশ, ভেটকি, লাউ চিংড়ি... যেন গত জন্মের কথা, একটা বাড়ির বারান্দা সেখানে থালা পেতে মাটিতে খেতে বসা... নাহ ওসব ভাবনাকে প্রশ্রয় দিতে নেই। খেতে শুরু করল। তার সঙ্গে বুড়ির বকবক। হিউস্টনে থাকার সময় কীভাবে বাঙালি খাবার জোগার হত, ডলার দিলে নাকি ভাল কলমি শাকও পাওয়া যায় সেখানে হাবিজাবি বকবকম।

প্রায় ঘন্টাখানেক ধরে খাওয়াদাওয়া পর্ব চলল, বুড়ির থেকে অর্জুন একটু বেশিই খেয়ে ফেলল। এতকিছু খাবে না ভেবেও শেষ পর্যন্ত লোভ সামলাতে পারল না। খাওয়ার পর বুড়ি বলল এবার একটু প্লিজ আমার সঙ্গে যাবে?

ওহ এবার বোধ হয় সেই ভয়ঙ্কর মুহূর্তের মুখোমুখি হতে হবে। উপায় নেই। অর্জুন যন্ত্রের মতো উঠে দাঁড়াল। বুড়ি হোটেলটাকে পুরো গুলে খেয়েছে। হোটেলেরই একটা ফ্লোরে ওদের নিজস্ব শপিং কর্নার। গারমেন্টস, এ্যাকসেসরিজ, কিউরিও এইসব পাওয়া যায়। শ্রীলেখা গিয়ে যেন হামলে পড়ল সেখানে। ঘন্টা দেড়েক ঘাটাঘাটি করে একটা সালোয়ার, একটা জাঙ্ক জুয়েলারি সেট আর একটা পারফিউম নিল। কেনার সময় বারবার অর্জুনের দিকে তাকিয়ে জিজ্ঞাসা করছিল আচ্ছা এটা কেমন হবে? এই সালোয়ারটা পরলে আমাকে কেমন দেখাবে? এই জুয়েলারিটা দেখো কেমন?

এমনভাবে অর্জনকে জিজ্ঞাসা করছিল যেন অর্জুন ওর ইয়ে... মানে কোনও ঘনিষ্ট রিলেটিভ। কত রকমের পাগল যে রয়েছে পৃথিবীতে ।

প্রায় কুড়ি হাজার টাকার কেনাকাটি পর্ব সেরে খুশি মনে প্যাকেট হাতে নিয়ে বুড়ি খুব খুশি হয়ে বলল তুমি খুব ভাল ছেলে। তোমার চয়েজ খুব সুন্দর । আমার সঙ্গে মেলে। তারপর নিজের দামি রিস্টওয়াচের দিকে তাকিয়ে বলল ওহো দেখেচো পাঁচটা বেজে গেলো। চলো চলো এবার আসল কাজটা করতে হবে।

এবার তাহলে? মনে মনে তৈরি হল অর্জুন।

কিন্তু না এবারেও ভড়কি খেল। বুড়ি আবার ফিরে গেল সেই রেস্ত্যোরায়। সেই নির্দিষ্ট টেবিল। এখন রেস্ত্যোরায় যথেষ্ট লোকজন। চেয়ারে গিয়ে বসতেই আবার সেই ইয়াসিন। ম্যাডাম আনব?

ওহ শিয়োর।

ফিরে গেল ইরাসিন। আর একটু পরেই ট্রে তে করে যে জিনিসটি এনে টেনিলে রাখল ইয়াসিন তা দেখে থ হয়ে গেল অর্জুন। অসাধারণ দেখতে একটা বার্থডে কেক। কেকের ওপর লেখা হ্যাপি বার্থ ডে শ্রীলেখা।

কী ব্যপার? আজ আপনার জন্মদিন?

ইয়েস ডার্লিং। প্লিজ ক্যান্ডেলটা জ্বালাতে আমায় হেল্প করো।

অর্জুন হেল্প করবে কী। পুরো বোমকে গিয়েছে। এসব কী হচ্ছে কিছুই মাথায় ঢুকছে না ওর।

প্লিজ রেহান হেল্প মি।

সুদৃশ ক্যান্ডেলটা জ্বালিয়ে দিল অর্জুন। তারপর বুড়ি এক ফুঁইয়ে ওটাকে নিভিয়ে খুব মন দিয়ে কেক কেটে একটুকরো অর্জনের মুখের সামনে ধরল, প্লিজ ডিয়ার।

অর্জুন খেল অল্প।

আমাকে খাওয়াবে না?

ওহ শিয়োর। ওই খণ্ডটাই পালটা শ্রীলেখার মুখের সামনে বাড়িয়ে দিল ও। শ্রীলেখা পুরো খন্ডটাই খেয়ে নিয়ে ন্যাপিতে মুখ মুছে আবার চেয়ারে বসল।

ওহ হ্যাপি বার্থডে ম্যাডাম।

থ্যাঙ্ক ইউ ডিয়ার। প্লিজ বসো।

অর্জুন দেখল বুড়ির এতক্ষনের উচ্ছ্বসিত চোখমুখ আচমকাই কেমন অন্ধকার হয়ে উঠেছে। চোখদুটিও কেমন চিকচিক করছে। শ্রীলেখা আলতো ভাবে নিজের মাথা নুইয়ে নিল।

হঠাৎ কী হল বুঝতে পারল না অর্জুন।

ম্যাডাম এনিথিং রঙ?

নো নাথিং... বলে একটু চুপ থাকল শ্রীলেখা। আসলে আমাকে তুমি আমাকে কী ভাবছ বাট বিলিভ মি আজকের দিনটায় আমি একা থাকতে পারি না। বড কষ্ট হয়। ওরা যখন ছিল... বাবা আর ছেলেতে মিলে কী যে করত সারাদিন...আবার থামল শ্রীলেখা। গলা খাকড়াল। তারপর আবার থেমে থেমে নিচু গলায় বলতে থাকল, আমার হাজব্যান্ড আবীর আর আমাদের একমাত্র ছেলে অর্ক... সেদিনও আমার জন্মদিন ছিল জানো। ওরা সেবার আমার জন্য মস্ত একটা কেক অর্ডার করেছিল। দুজনে বিকেলে বেড়িয়েছিল কেক আরও কী কী সব যেন আনতে... অর্কই ড্রাইভ করছিল সেদিন। উল্টোদিক থেকে আসা একটা কন্টেনর... কথা থামিয়ে নিজের কাঁপতে থাকা ঠোঁট কামড়ে ধরল শ্রীলেখা। বড় বড় শ্বাস নিতে থাকল, ফিরে এলাম দেশে, একা । টকা পয়সার অভাব ছিল না তো, তাই প্রথমদিকটায় বন্ধুবান্ধব, আত্মীয়স্বজনের অভাব ঘটেনি। কিন্তু পরে বুঝতে পারছিলাম এরা কেউ আমার জন্য সহানুভূতিশীল নয়, আমার টাকা পয়সার দিকেই এদের নজর । সবার সঙ্গে যোগাযোগ বন্ধ করে দিলাম আমি। কিন্তু একা একা কি মানুষ বাঁচতে পারে বলো? এক এক সময় দম আটকে আসত, মানুষের সঙ্গে কথা বলতে, তার সঙ্গে কিচুটা সময় কাটাতে ইচ্ছে করত, কিন্তু কার সঙ্গে বন্ধুত্ব পাতাব আমি? প্রায় সবাই দেখি নিজের স্বার্থের জন্য মেশে। কষ্ট পাচ্ছিলাম খুব। তারপর আচমকাই একদিন একটা ম্যাগে মিস সুরেকার এ্যাড দেখলাম । মনের মতো বন্ধু। মনের মতো বন্ধু আমি আর কোনওদিনই পাব না, যে দু'জন ছিল তারা আমাকে ছেড়ে চলে গিয়েছে, আর যারা রয়েছে তারা বন্ধু নয়, কিন্তু আমি তো একা একা পাগল হয়ে যাচ্ছিলাম। আমার মনে হল ওইসব ছদ্মবেশী বন্ধুর থেকে ভালো হায়ার করা প্রফেশনাল বন্ধু, যারা অন্তত আমাকে ঠকাবে না। মিস সুরেকার ফোন নাম্বারে কল করলাম, উনি আমাকে তিন চারজনের ফটো পাঠালেন, তার মধ্যে দুটি মেয়ের ফটোও ছিল। কিন্তু তোমার ফটোটা দেখতেই আমি চমকে গেলাম, আমার অর্কও ঠিক তোমার মতো লম্বা জুলফি রাখত... কী হুল্লোর যে করত আজকের দিনটায়... কথাটা শেষ হওয়ার আগেই শ্রীলেখা নিজের ব্যাগ খুলে রুমাল বার করতে গেলেন কিন্তু তার আগেই নোনা জলের ফোঁটাটা তার কোলের ওপর পড়ল।

অর্জুন চুপ করে বসে শুনছিল। নড়াচড়া করতে পর্যন্ত ভুলে গিয়েছে।

সরি ইয়ংম্যান... নিজেকে সামলাতে শুরু করলেন শ্রীলেখা। রুমালে নিজের চোখ মুছলেন শ্রীলেখা। তারপর বললেন, ছটা বেজে গিয়েছে, নাউ ইউ আর ফ্রি। এন্ড থ্যাঙ্কস ফর ইওর কাইন্ড কোম্পানি রেহান, গড ব্লেস। বলে ডানহাতটা বাড়িয়ে দিলেন শ্রীলেখা।

দ্বিতীয়বার ওর হাত ধরার সময়ে অর্জুন বুঝতে পারল ওর হাতটা থিরথির করে কাঁপছে ।

থ্যাঙ্ক ইউ ম্যাডাম । আমি কি আপনাকে বাড়ি পর্যন্ত পৌঁছে দেব? জিজ্ঞাসা করল অর্জন ।

নো নো ইটস ওকে।

অর্জুন রেস্ত্যোরার থেকে বেরিয়ে আসার সময় আরেকবার পিছনে তাকাল। শ্রীলেখা ওর দিকে তাকিয়ে রয়েছেন। হোটেল থেকে বেরিয়ে আসার ঠিক আগের মুহূর্তে থমকে দাঁড়াল অর্জুন। তারপর দ্রুত পায়ে আবার ভেতরে ঢুকে সেই শপিং কর্নারে গেল। একটা সুন্দর হ্যাপি বার্থডে কার্ড কিনে সেখানে লিখল টু শ্রীলেখা ম্যাডাম। আর নিচে লিখল, ফ্রম অর্জুন ।

 

এই লেখকের অন্যান্য লেখা



আপনার মূল্যবান মতামত দিন:


Top