সিডনী সোমবার, ২৬শে অক্টোবর ২০২০, ১১ই কার্তিক ১৪২৭

সত্যজিৎ বিশ্বাসের রম্য গল্প

গাধা দিবস (রম্য গল্প) : সত্যজিৎ বিশ্বাস


প্রকাশিত:
২৩ সেপ্টেম্বর ২০২০ ১৫:১৭

আপডেট:
২৩ সেপ্টেম্বর ২০২০ ১৫:১৮



‘ফ্রেন্ডস ফর এভার ক্লাব-এর উদ্যোগে বিশেষ আলোচনা সভার আয়োজন করা হয়েছে, আপনাকে কিন্তু প্রধান অতিথি হতেই হবে’ কথাটা শুনে পুলক সাহেবের পুলকিত না হওয়ার কোন কারণই নেই। পেশায় ছোট চাকুরীজীবি হলেও সাহিত্য জগতে চরণ ফেলে গুটিগুটি বিচরন শুরু করে দিয়েছেন। এখন ফেসবুকে কবিতা কিংবা গল্প রচনা করে ছেড়ে দিলে গোটা পঞ্চাশের উপর লাইক তো পরেই উপরন্তু কমেন্টও আসে ‘অপূর্ব হয়েছে’, ‘চমৎকার হয়েছে’, ‘অনেকদিন পর এত সুন্দর একটা লেখা পড়লাম’। গেল সপ্তাহে একটা কবিতা লিখে পোষ্ট দেওয়ার পর একজন শেয়ারও করেছে। পাঠক মহলে এখনও তাঁর তেমন খোঁজ না পরলেও আত্মীয়, স্বজন, প্রতিবেশিরা তাঁর লেখালিখির নিয়মিত খোঁজ নেয়।

কোন অনুষ্ঠানে প্রধান অতিথির আমন্ত্রণ তাঁর জীবনে এই প্রথম। আমন্ত্রণ পেয়ে সঙ্গে সঙ্গেই রাজি হয়ে যাবার মানুষ পুলক সাহেব না। এতে দাম কমে যায়। তাছাড়া দাওয়াত দিতে যে চ্যাংড়া ছেলে দুটো এসেছে তারা হ্যাংলা ভেবে বসতে পারে।

ভুরু কুঁচকে একটু বিরক্তির ভাব ফুটিয়ে পুলক সাহেব বললেন, কবে বললে তোমরা? শুক্রবার? কিন্তু এ দিনটা যে আমার লেখালিখি করার দিন।
-‘কী যে বলেন, লেখালিখি তো সারা জীবন করতেই পারবেন। কিন্তু এমন আলোচনা সভা আর পাবেন কই? তাছাড়া আমরা তো অনেক দূরে কোথাও অনুষ্ঠান করছি না। বাজারের পাশে যে চিরসাথী কমিউনিটি সেন্টার আছে, ওটা চেনেন তো? ওখানেই আয়োজন করব।’ দুজনের মধ্যে পাটকাঠির মতো ছেলেটা কিছু বলার আগেই তাকে থামিয়ে দিয়ে উত্তর দিলো তাগড়া মাস্তান চেহারার ছেলেটা।
- তাই নাকি?
- তাই তো বলছি। আপনার বাসা থেকে মাত্র পাঁচ মিনিটের হাঁটার পথ। আলোচনা সভা শেষ করে হাঁটতে হাঁটতে বাসায় এসে লিখতে বসবেন।
- কিন্তু কীসের উপর আলোচনা সভা, আর আমাকেই বা কেন? একটু খুলে বলতে যদি বাবারা?
- এখানে তো খোলাখুলির কিছু নেই। কী খুলবো, বলুন?
- ইয়ে মানে, যা আছে তাই যদি খুলে বলতে। যা দিনকাল পড়েছে, আমার আবার হার্টের অবস্থা ভালো না। ওটা যদি খুলে পড়ে যায়, তাহলে তো সবই শেষ।
- আরে না, না আপনি যা ভাবছেন, তেমন কোন গন্ডগোল হবে না ওখানে। এটা কোন রাজনৈতিক আলোচনা সভা না। আসলে আপনি ছাড়া সাহিত্য রসিক, বোদ্ধা, বাকপটু আর কাউকে এ পাড়ায় খুঁজে পাইনি বলেই আপনি। অন্য কেউ হলে অনুষ্ঠানের জন্য চাঁদা চাইতাম কিন্তু আপনি সাহিত্যিক মানুষ, আপনার কাছে কি চাঁদা চাইতে পারি? শুধু চমৎকার একটা বক্তৃতা দিয়ে আমাদের অনুষ্ঠানটা স্বার্থক করে দিন।
- কিন্তু
- ‘কোন কিন্তু টিন্তু শুনছি না। আপনাকে যেতেই হবে। গতবার এক খেলোয়ার নিয়ে এসেছিলাম। অনুষ্ঠান শুরু হতেই দৌড়ে ভেগেছে। তাই, আমি বড় মুখ করে সবাইকে বলে এসেছি, এবার একটা কবি কিংবা সাহিত্যিক ধরে আনবোই আনব।
- খেলোয়ারের জায়গায় কবি-সাহিত্যিক? চলবে তো?
- চলবে মানে? মেসি, রোনালদোর মতো দৌড়াবে। তারা বল ছোটায়, আপনারা কলম ছোটান। ছোটানোটাই তো আসল কথা, ঠিক কীনা বলুন?
- বেশ খানিকক্ষণ হা হয়ে তাঁকিয়ে থেকে পুলক সাহেব বললেন, তা তো ঠিকই।
- তাহলে কথা ফাইনাল?
- এত করে তোমরা যখন বলছ, অবশ্যই যাবো। তোমাদের মতো তরুনদের ডাকে এগিয়ে আসাও তো আমার কর্তব্য। তা, আর কে কে আসছে অনুষ্ঠানে?
- সে তো লম্বা লিস্ট। পাড়ার ক্লাবের আলোচনা সভা। পাড়ার সবাই তো থাকবেই। তবে মঞ্চে থাকবে ক্লাবের প্রেসিডেন্ট, সেক্রেটারি, কোষাধক্ষ্য আর আপনি। আর বক্তব্য শুধু আপনিই দেবেন। বাকীরা নিজেদের পরিচয় দিয়েই বসে পড়বে।
- কেন? বাকিরা কিছু বলবে না, কেন?
পাটকাঠি কিছু বলতে যাবার আগেই আবারও পিঠে ধরাম করে থাপ্পর বসিয়ে দিয়ে থামিয়ে দিল তাগড়া মাস্তান। এবার আর সইতে পারলেন না পুলক সাহেব। বলেই বসলেন, এই ব্যাপারটা সেই প্রথম থেকে খেয়াল করছি।
- কোন ব্যাপারটা?
- তোমার সাথের ছেলেটা তখন থেকে কিছু বলতে গেলেই ওকে থামিয়ে দিচ্ছো। কেন থামিয়ে দিচ্ছো? ওর যদি কিছু বলার থাকে, বলুক না।
শুকনা পাটকাঠি খুশিতে সব দাঁত বের করে কিছু বলতে যাবার জন্য মুখ খোলার আগেই হাত দেখিয়ে থামিয়ে দিলো তাগড়া জোয়ানটা।
- কী যে বলেন না? ওর কোন সাহিত্য জ্ঞান আছে নাকি? তাছাড়া কী বলতে, কখন কী বলে ফেলে তার ঠিক নেই। গতবারের অনুষ্ঠান পন্ড হয়েছিল তো ওর আবোল তাবোল কথার জন্যই। তাই, এবার অনেক ভেবে, চিন্তে, বেছে, টেছে আপনাকে ঠিক করেছি। খেয়াল রাখবেন, আপনার বক্তৃতা শুনে সবাই যেন টাসকি খায়।
আর কোন প্রশ্ন না থাকলে, আমরা তাহলে এবার উঠি। ওদিকে অনেক কাজ পড়ে রয়েছে। সব নিজ হাতে সামলাতে হয় যে। তো সেই কথাই রইল, শুক্রবার দিন বিকেল পাঁচটায় রেডি হয়ে থাকবেন। আমরা এসে আপনাকে নিয়ে যাবো।

‘ঠিক আছে, বাবারা এসো’ বলে বিদায় দেবার কিছুক্ষন পরেই টনক নড়লো। কিছুই তো ঠিক নেই। কী বিষয়ের উপর বক্তৃতা দিতে হবে, তাই তো জানা হলো না। বক্তৃতা- টক্তৃতা দিতে তিনি পিছ পা নন। কিন্তু আলোচনার বিষয়টা জানতে পারলে স্পিচটা ভালো করে তৈরী করে নেয়া যেত। থাক, ব্যাপার না। কয়েকটা বিখ্যাত কবিতার লাইন আর মোটিভেশনাল দু, চারটা কথা ঠিক করে নিয়ে যেতে হবে। বাকিটা পরিস্থিতি বুঝে মনে-মুখে ঠিক করে নেয়া যাবে।

পুলক সাহেব পুলক জাগানো শুক্রবারে সাত সকালে উঠে পাঞ্জাবী আর পায়জামা পড়ে আয়নার সামনে ট্রায়াল দিলেন কয়েকবার। অদৃশ্য মাইক্রোফোন হাতে নিয়ে আয়নার দিকে তাকিয়ে কবিতার লাইনগুলোও বলে গেলেন গড়গড় করে। নিজের পারফরমেন্সে খুশি হয়ে আয়না চাপড়ে দিয়ে ফেসবুকে স্ট্যাটাস লিখতে বসলেন, ‘আজ বিকাল পাঁচটায় এক বিশাল আলোচনা সভায় প্রধান অতিথি ও একমাত্র বক্তৃতা প্রদানকারী হিসেবে থাকছি আমি। আপনি সাদর আমন্ত্রিত’।

বেশ কিছুক্ষণ এদিক ওদিক করে বিপুল সাহেব দেওয়াল ঘড়ির দিকে তাঁকালেন। ঘড়ির কাঁটায় কেউ চুইংগাম লাগিয়ে রেখেছে কীনা কে জানে? সময় যেন আর কাটতেই চায় না। এই গরমে পাঞ্জাবী, পায়জামা পড়ে সেই কখন থেকে বসে আছেন তো আছেনই। ছেলেগুলো কী ভুলে গেল? নাকি আরো ভালো কোন বক্তা জোগাড় করে ফেলল? তাই যদি হয় তাহলে তো মান সন্মানের আর কিছুই অবশিষ্ট থাকবে না। নাহ্, আবেগের বশে আগেভাগে ফেসবুকে স্ট্যাটাস দেওয়াটা মোটেই উচিত হয়নি।

সাড়ে পাঁচটা বাজে, এখনো ছেলেগুলোর কোন খবর নেই। নিজে থেকে যে খবর নেবেন, সে উপায়ও তো নেই। উত্তেজনার চোটে কারো মোবাইল নাম্বারও রাখা হয়নি। ঠিক এমন সময় কলিংবেল বাজতেই লাফ দিয়ে উঠে বসলেন পুলক সাহেব। সদর দরজার কি-হোলে তাকাতেই বুক থেকে হিমালয় পর্বত সরে গেল নিমিষে। ওরা নিতে এসেছে।

দূর থেকে মঞ্চ দেখে মনটা ভরে গেল পুলক সাহেবের। আয়োজনটা খারাপ করেনি ছেলেপেলেগুলো। দর্শক সারিতেও লোকজন কম না। এগিয়ে গিয়ে মঞ্চে বসতে না বসতেই দর্শকদের মধ্যে থেকে কে যেন বলে উঠল, চিড়িয়া তো এসে গেছে, এখন আর দেরি কেন?
সব কথা শুনতে নেই। পুলক সাহেব পাঞ্জাবীখানা টেনে ঠিক করে হাসি হাসি মুখে সামনের দিকে তাঁকালেন।

মাইকে সেদিনের সেই তাগড়া ছেলেটা এসে অনুষ্ঠান শুরুর ঘোষনা দিতেই কোথা থেকে যেন কয়েকটা পিচ্চি এসে মঞ্চে উপবিষ্ট সবার গলায় গাঁদা ফুলের মালা পড়িয়ে দিয়ে গেল। সাথে সাথে হাততালির শব্দ শোনা গেল। পুলক সাহেবের সন্দেহ হলো, এটা খুব সম্ভবত রেকর্ড করা হাততালি। সামনে উপবিষ্ট দর্শক সারির কাউকে তো হাততালি দিতে দেখা গেল না। তাহলে হাততালি দিলো কারা?
এরই মাঝে দর্শকদের মাঝ থেকে কে যেন চিৎকার দিয়ে বলে উঠল, গাধাদের গলায় গাঁদার মালা মানিয়েছে বেশ। কেমন জানি খটকা লাগল। চট করে পেছনে টানানো প্যানাফ্লেক্স ব্যানারের দিকে তাকালেন পুলক সাহেব।
‘বিশ্ব গাধা দিবসে গাধা সংরক্ষণে আমাদের করনীয়’।
প্রধান অতিথি ও মূল আলোচক- পুলক রহমান।
আয়োজনে- ফ্রেন্ডস ফর এভার ক্লাব।

ততক্ষণে ঘোষক আবার ঘোষণা শুরু করে দিয়েছে। সবাইকে বরণের পর এখন মূল্যবান বক্তৃতা দিতে আসছেন আমাদের মূল আকর্ষণ জনপ্রিয় সাহিত্যিক, আজকের তরুনদের আলোক বর্তিকা ... ... ...
মাথা ঘুরিয়ে মঞ্চে লুটিয়ে পড়ার আগে এর বেশি আর শুনতে পারলেন না পুলক সাহেব।

 

সত্যজিৎ বিশ্বাস
রম্য লেখক ও শিশু সাহিত্যিক
* রম্য বিভাগীয় সম্পাদক- কিশোর বাংলা
* নির্বাহী সম্পাদক- কিশোরকাল
* কন্ট্রিবিউটার – মাসিক স্যাটায়ার কার্টুন ম্যাগাজিন ‘উন্মাদ’, জাতীয় দৈনিক যুগান্তর ‘বিচ্ছু’, দৈনিক ইত্তেফাক ‘ঠাট্টা’।

 

এই লেখকের অন্যান্য লেখা



আপনার মূল্যবান মতামত দিন:


Top