সিডনী সোমবার, ২৬শে অক্টোবর ২০২০, ১১ই কার্তিক ১৪২৭

দুই বিশ্বযুদ্ধ ও বাংলা কবিতার চালচিত্র : আরিফুল ইসলাম সাহাজি 


প্রকাশিত:
২৫ সেপ্টেম্বর ২০২০ ১৭:৫৬

আপডেট:
২৬ অক্টোবর ২০২০ ২২:২০

 

কিছু লোভী ও নিষ্টুর গণমানবের স্বার্থ সংঘাতকে কেন্দ্র করে পৃথিবী প্রথম এক মহাযুদ্ধে জড়িয়ে যায় ১৯১৪ সালে । সাধারণ জন জীবনে এই মহারণের প্রভাব ছিল ভয়াবহ । পূর্বের সচল পৃথিবীকে মৃতপ্রায় করে উঠেছিলএকদল নৃশংস হায়েনার অতি সক্রিয়তার কারণে । ডি. এইচ. লরেন্স লিখলেন, প্রথম বিশ্বযুদ্ধের পর পুরনো পৃথিবীটা ধ্বংসপ্রাপ্ত হল, পাল্টে তার রূপ ও প্রকৃতির গল্প। 

'and become a vortex of broken passions, lusts, hopes, fears and horrors' 

এই বিশ্বযুদ্ধের ফল হয়েছিল ভয়ঙ্কর বিভীষিকার আদলময় । ধরণীর বুকে নামল যেন এক বুক অন্ধকার। অবিশ্বাস, স্বার্থ সংঘাত এবং নিষ্টুর প্রবৃত্তি জাগ্রত হল অন্য মানবিক সত্ত্বা সমূহকে অবদমিত করে। আপাত নিরীহ ঈশ্বরের সন্তান গণ প্রধানত দুই শিবিরে বিভক্ত হয়ে একে অপরের রক্ত ঝরাতে দৃঢ় সংকল্প করে বসল। ধরণীর বুক চিরে প্রতিষ্টিত হল এক সর্বশূন্যতার মহাগ্রাসময় আদল। এই সর্বশূন্যতার ছবিই আঁকলেন এলিঅট তাঁর 'The Westeland' কাব্যগ্রন্থে । তিনি যথার্থই লিখলেন, 

'This is the time of tension between dying and birth' 

আসলে, প্রথম যুদ্ধে এক মানবিক অবক্ষয়ের জন্ম দিয়েছিল। সুস্থ জীবনপ্রবাহ ক্রমশ অনিশ্চিত নৈরাশ্যময় অন্ধকুটিরের বন্দি হওয়ার উপক্রম হয়ে উঠেছিল। এই অস্তিত্ব সংকটময় বন্ধ্যা সময়ে কবি ইয়েটস - এর মনেও জাগল এক গুচ্ছ প্রশ্ন । ইয়েটস লিখলেন, 

'What shall I do with this absurdity 
O heart. O troubled heart - this caricature.
Decrepit age that has tied to me.' 

যদিও, প্রথম বিশ্বযুদ্ধে বাংলাদেশ তথা ভারতবর্ষের প্রত্যক্ষ যোগ ছিল না, এটি ঐতিহাসিক ভাবে সত্য হলেও, এই মহারণের ভয়াবহ প্রভাব কিন্তু সেই সময়কার ইংরেজ শাসনাধীন ভারতবর্ষেও ভীষণ রকম ভাবে পড়েছিল। যেহেতু, ইংরেজ প্রভুরা এই যুদ্ধে জড়িয়ে পড়েছিলেন, উক্তহেতুগত কারণে ভারতীয় প্রজাদের জীবনও ব্যতিব্যস্ত হয়ে উঠেছিল। সমাজ ও রাষ্ট্রের সার্বিক অন্ধকার কিম্বা গৌরব কথা লিখবার একটা তাগিদ সৃজনক্ষম মানুষের মধ্যে বিদ্যমান থেকেছে, সৃষ্টির আদিলগ্ন হতেই। কেননা, কাব্যসাধকগণ সমাজের বিশিষ্ট বৌদ্ধিক অংশ। সময়ের প্রসব যন্ত্রণা কাব্যশরীরে চিত্ররূপ দেওয়ার নিমিত্তেই তাঁরা আবির্ভূত হয়েছেন যুগে যুগে। ফলত, প্রথম বিশ্বযুদ্ধের কুপ্রভাব, স্বপ্নভঙ্গের ছবি বাঙলা সাহিত্যের দুয়ারে এসে ধাক্কা দেবে, সেটায় স্বাভাবিক। শ্রদ্ধেয় প্রমথনাথ বিশী লিখলেন, 

' ... সে যুগে বাঙালী কিশোর বয়সেই যৌবনটাকে ডিঙাইয়া একেবারে প্রৌঢ়ত্বে ডবল প্রমোশন পাইয়াছে। ইংরেজিতে যাহাকে যুগান্তের ক্লান্তি (fin de seicle) বলে, তাহারই আভাস কায়মনোবাক্যে - শতাব্দীর সূর্যাস্তের করুণ আভায় তাহার মনের শাখা পল্লব যেন শুষ্ক' 

বিশ্বময় এক অনন্য অচলাবস্থার সৃষ্টি হল। এক প্রবল যুগযন্ত্রণায় কাতর জীবনের গল্পের ইতিকথা ও ইতিবৃত্ত। সেই ধ্বংশতাপ থেকে বাঙালী কবিকুল নিজেদেরকে দূরে সরিয়ে রাখতে পারলেন না। রবীন্দ্রনাথের একাধিক কবিতায় উঠে এল বিশ্বযুদ্ধের প্রেক্ষাপট। 'ধর্মমোহ', 'আফ্রিকা', ' পত্রপুট' কাব্যগ্রন্থের ১৭ সংখ্যক কবিতা, 'প্রান্তিক' কাব্যগ্রন্থের ১৭ ও ১৮ সংখ্যক কবিতা, কিম্বা  'জন্মদিন' কাব্যগ্রন্থের ১৬, ২১ এবং ২২ সংখ্যক কবিতা, এছাড়াও, 'জন্মদিন', 'চলতিছবি' এবং 'নবজাতকে' র একাধিক কবিতায় আধুনিক হিংস্র মূল্যবোধের দ্বারা সুস্থ সংস্কৃতি ও সভ্যতার অপমান এবং সাম্রাজ্যবাদী শক্তির শক্তি প্রদর্শনের বিরুদ্ধে অবস্থান নিয়েছেন মনীষী কবি রবীন্দ্রনাথ। 'প্রান্তিক' এর ১৭ সংখ্যক কবিতাই দার্শনিক রবীন্দ্রনাথ অসংখ্য আরও এক বিশ্বযুদ্ধ জনজীবনকে ছিন্নভিন্ন করতে ফণা তুলছে, সেই আশঙ্কা ব্যক্ত করেছেন। গভীর ক্ষোভে মনীষী রবীন্দ্রনাথ লিখছেন, 

'আত্মঘাতী মূঢ়, উন্মত্ততা, দেখিনু সর্বাঙ্গে তার বিকৃতির কদর্য বিদ্রুপ। একদিকে স্পর্ধিত ক্রুরতা, /মত্ততার নিলজ্জ হুংকার, অন্যদিকে ভীরুতার / দ্বিধাগ্রস্ত চরণবিক্ষেপ .....' 

'কল্লোল' (১৯২৩), 'কালিকলম' (১৯২৬), 'প্রগতি' (১৯২৭), 'পরিচয়' (১৯৩১) প্রভৃতি পত্রিকাকে কেন্দ্র করে একদল কবি এক নব্য কাব্য আন্দোলন গড়ে তুলতে প্রয়াসী হন। শুধুমাত্র রবীন্দ্র রোমান্টিক পরিআবহের বিরোধীতা নয়, যুদ্ধপরবর্তী সময়ের মানবিক অবক্ষয়ের কালচিত্র এবং মানবিক সংকটের ছবি কাব্য শরীরে লেপন করবার তাগিদ তাঁরা অনুভব করেন। 

এই কালপর্বেই বিদ্রোহী কবি নজরুলের আবির্ভাব। অগ্নিপুরুষ নজরুল তাঁর লেখনীর মাধ্যমে রবীন্দ্রনাথের পাশে এক স্বতন্ত্র কাব্যলয় গড়ে তুলতে সক্ষম হলেন। নজরুল ইসলাম  মানবিক বোধে পরিপূর্ণ একজন মহান কাব্য সাধক। বিশ্বযুদ্ধ পরবর্তী মানব জীবনের বিভিন্ন মানবিক অবক্ষয় , দুর্ভিক্ষ , শাসকের নিপীড়নের বিরুদ্ধে তিনি সর্বদায় খড়গহস্ত । সাম্রাজ্যবাদী শাসকের শোষণের বিরুদ্ধে সারাজীবন সংগ্রাম করেছেন  মহান কবি মানুষ নজরুল ইসলাম। 

'পরের মুলুক লুট করে খায় / ডাকাত তারা ডাকাত' 

সমকালের আর এক কবি সত্যেন্দ্রনাথ দত্ত। তাঁর 'আমরা', 'গঙ্গাহৃদি বঙ্গভূমি', সহ একাধিক কবিতাই বঙ্গভূমির গৌরব গাথা বর্ণিত হয়েছে। অন্যদিকে শাসকের নিপীড়ন, জালিয়ানওয়ালাবাগের হত্যাকান্ডের বিরুদ্ধে লেখা' ফরিয়াদ' , 'দাবির চিঠি', 'আখেরি’, 'সাম্যবাদ' প্রভৃতি কবিতায় দুর্বলের প্রতি সবলের হম্বিতম্বির বিরুদ্ধেই তিনি অবস্থান নিয়েছেন। 

সমকালের আরও দুইজন কবির কথা বলতে হয় - এঁরা হলেন যতীন্দ্রনাথ সেনগুপ্ত ও মোহিতলাল মজুমদার। যতীন্দ্রনাথের কবিতায় মূলত জড়বাদী জীবন দর্শন, রোমান্টিক কল্পনার বুনন মুখ্যরূপ নিয়েছে, অন্যদিকে মোহিতলালে ধরা পড়েছে ডি .এইচ লরেন্স কিম্বা বোদলেয়ারের মতো জীবনবোধ ও মানব চেতনার বিকাশ। এখানে বলে নেওয়া দরকার, এই পর্বে কাব্যিক কলায় বৈচিত্র এলেও বিশ্বযুদ্ধত্তোর কুপ্রভাব, বাঙালী জীবনের উৎকণ্ঠা তেমন ভাবে ধরা পড়ল না। তবে নজরুল ইসলাম এবং অন্যান্য কয়েকজন শ্রদ্ধেয় কবির কাব্যিক চরণে মানুষের দুঃখকথা প্রকাশ হলেও, সামগ্রিক ভাবে গণমানুষের আক্রান্ত জীবনকে উপলব্ধি করে কাব্যরচনা করবার সুযোগ হারিয়ে ফেললেন, এই সময়ের অধিকাংশ কবিকুল। কেননা, এ পর্বের কবিগণ  অধিকাংশই রবীন্দ্রনুসারি, তাঁরা অন্ধভাবে রবীন্দ্রনুসরণকেই নিজেদের কাব্যিক লক্ষ্য হিসাবে গ্রহণ করলেন। 

বলা যেতে পারে, প্রথম বিশ্বযুদ্ধ থেকে দ্বিতীয় বিশ্বযুদ্ধ, এই কালপর্বকে আধুনিক বাংলা কবিতার উন্মেষ পর্ব বলা যেতে পারে। ঊনিশ শতকের স্থির বিশ্বাস বিশ শতকে এসে হতাশার আদল নিল। এ শতকের কবিগণ রোমান্টিক ভাসা কাব্যস্রোত থেকে অনেকটাই সরে এলেন। কেননা, তাঁরা উপলদ্ধি করলেন, 

'পৃথিবীর গভীর, গভীরতর অসুখ এখন' 

ফলত, তাঁদের কবিতায় বিশশতকে পঞ্জিভুত মানবিক অবক্ষয় এবং নৈরাশ্যের গল্প কাব্যিক আদল পেল। সংশয়, মানসিক দ্বন্দ, জীবনবোধের অবক্ষয়, হতাশা তাঁদের কবিতায় মূর্ত করে তুললেন। প্রেমেন্দ্র মিত্র লিখলেন, 

'বাঁজা ডাঙায় লড়াই বাধে, হাজার দাঁতে কামড়ে ছেঁড়ে টুঁটি / লক্ষ খুনীর খুন চেপেছে, কবন্ধ ধড় খাচ্ছে লুটোপুটি' 

কবি সুধীন্দ্রনাথ লিখলেন, 

‘জীবনের সার কথা পিশাচের উপজীব্য হওয়া নির্বিকারে, নির্বিবাদে সওয়া ...’

বিশশতকের এই মানবিক অবক্ষয় ভীষণ রকম ভাবে কাব্যিক রূপ দিতে সক্ষম হয়েছেন রবীন্দ্রউত্তর কালের শ্রেষ্ঠতম কবি প্রতিভা জীবনানন্দ দাশ। জীবনানন্দকে আমরা গভীর ভাবে উপলব্ধি করলে দেখবো, তাঁর যে জগৎ, সে জগতে ঈশ্বরের অলিখিত সম্ভ্রম নেই, নেই মায়াবী জগতের হাতছানিও। আসলে জীবনানন্দ যে সময়ে পৃথিবীর বুকে হেঁটে বেরিয়েছেন সে তো যেমন তেমন সময় নয়, মানুষ সে সময় 

'যক্ষ্মায় ধুঁকে মরে মানুষের মন', 

এই মনমরা সময়ে দাঁড়িয়ে জীবনানন্দ কেমন করে বলবেন 'আহা কী আনন্দ আকাশে বাতাসে', তিনি পারেন না, কেননা 'মাথার ভিতরে / স্বপ্ন নয় - প্রেম নয় - কোন এক বোধ কাজ করে' 

এই অনন্য বোধ দ্বারা চালিত হয়েছে জীবনানন্দের কাব্যময় জীবন। জীবনানন্দকে গভীর মনোযোগ সহ নিরীক্ষণ করলে অনুভব হয়, কবির কাব্যশরীরে অন্ধকার প্রসঙ্গ এবং মৃত্যুচেতনার বারবাড়ন্ত যেন একটু গভীর নিকষ কালোর মত লেপ্টে রয়েছে। বিষয়টির নেপথ্যে নিশ্চয় বেশ কয়েকটি কারণ রয়েছে, প্রথমত সময়, জীবনানন্দ যেকালে বেড়ে উঠছেন সেই সময় প্রবাহ মোটেই সাদাসিধে সরল ছিল না, পরাধীন দেশ, বিশ্বযুদ্ধ, ইংরেজ বিরোধী আন্দোলন, মন্বন্তর মহামারি, গণমানুষের আর্তনাদের সঙ্গে জীবনানন্দের কর্মজীবনের ব্যর্থতার সংযোগ জীবনানন্দ ক্রমশঃ নিরানন্দ মননের অধিকারী করে তুলছিল। আসলে ধ্বংসের পিরামিডে আরোহণ করে সুখের স্বর্গ রচনা করা বেশ কঠিন, অবশ্য সময়কে অস্বীকার করে অনেকেই সন্ধ্যাতারা পেড়ে প্রেমিকার খোঁপায় গুঁজে দেন, জীবনানন্দ তাঁদের দলভুক্ত নন, তিনি নজরুলের মত সরাসরি বিদ্রোহী হুঙ্কার দেননি হয়তো, তবুও দৃঢ়কণ্ঠে সমস্ত নোংরামি ভন্ডামির বিরুদ্ধে সোচ্চার হয়েছেন অনন্য ভাষা ও উপমার সহচর্যে। 

কবি হেঁটেছেন অনন্তকাল পৃথিবীর পথ ধরে, ক্লান্ত হয়েছেন , ক্লান্তি আসবারই কথা, এই পৃথিবী কোনকালেই মানুষের বাসযোগ্য ছিল না, একটা রক্তচক্ষু বরাবরই স্বাধীন সম্প্রীতি সৌহার্দ্যপূর্ণ চিন্তন ও মননকে দমন করেছে। গ্যালিলিও, কোপারনিকস বলি হয়েছেন অন্ধত্বের, হিটলার, মুসোলিনীরা বারে বারে ফিরে এসেছে নানা যুগে, নানা রুপে ফলে ক্লান্তি তো আসবেই। কবি ক্লান্ত হয়েছেন, জীবন ধূসর হয়েছে, তা থেকে মুক্তির পথও তিনি খুঁজেছেন নিজস্ব ভঙ্গিমায়। ঈশ্বরের কৃপা তিনি চাননি, তাঁর মানস ঈশ্বর বনলতা, সূচেতনা, সুরঞ্জনা নামীয় আরও বেশ কয়েকজন নারীমুর্ত্তি। জীবনানন্দ তাঁদের কাছেই চেয়েছেন মুক্তির এক পৃথিবী নিশ্বাস আর দুদন্ডের শান্তি। 

 জীবনানন্দের কবিতায় এক ধরনের অন্ধকার কুন্ডলি আকারে বর্তমান থেকেছে প্রায় প্রথম থেকেই। অন্ধকার যেহেতু মৃত্যুর সমগোত্রীয়, ফলে মৃত্যু চেতনাও জীবনানন্দের কবিতায় ব্যঞ্জক আকার নিয়েছে। প্রসঙ্গক্রমে 'ধূসর পাণ্ডুলিপির' কয়েকটি কবিতার কথা মনে পড়ছে। এই সমস্ত কবিতা পাঠক অন্তলীন আবেগ, নির্জনতার আস্বাদ এবং অনন্য কাব্যময় শব্দ অনুভব করবেন। কাব্য রচনার সময় কবি জীবনানন্দ রবীন্দ্রনাথের সন্ধ্যা সংগীতের নিঃসঙ্গতা দ্বারা প্রভাবিত হয়ে থাকতে পারেন। 'হাওয়ার রাত,' কবিতাটিতে লক্ষ তারার মাঝেও কবি নিজেকে নিঃসঙ্গ অনুভব করেছেন। ইংরেজ কবিরা একে বলেছেন, 'Romantic Melancholy' । 

মৃত্যুচেতনা জীবনানন্দের কবিতায় বরাবরই ওঁৎ পেতে ছিল। নেপথ্যে হয়তো সময়ের প্রসববেদনা দায়ী। ব্যক্তি জীবনের গল্পেও অবক্ষয়ের শেষ ছিল না। ফলত, জীবন থেকে পলাতক কবি অনেক সময় মৃত্যুর মধ্যে মুক্তি খুঁজেছেন কবি। কেননা, 

'সব রাঙা কামনার শিয়রে যে দেয়ালের মতো এসে জাগে ধূসর মৃত্যুর মুখ; একদিন পৃথিবীতে স্বপ্ন ছিল ....' 

এই স্বপ্নের অবলুপ্তিই কবির হৃদয়ে জন্ম দিয়েছে এক মানবিক অবক্ষয়ের। মানুষের ভিতর মনুষত্বের যে বড্ড অভাব, যা কবি ক্লান্ত করে তুলেছে। তাই কবি লিখলেন, 

'মৃত পশুদের মতো আমাদের মাংস লয়ে আমরাও পড়ে থাকি;/ বিয়োগের - বিয়োগের - মরণের মুখে এসে পড়ে সব / ঐ মৃত মৃগদের মতো' 

এই মানবিক অবক্ষয় জীবনানন্দ মানতে পারেননি। সভ্যতার চরম অসুখ দেখে ক্লান্ত জীবনানন্দ তাঁর কবিতায় বার বার মৃত্যুর প্রসঙ্গ এনে হাজির করেছেন। 

'শোনা গেল লাসকাটা ঘরে 
নিয়ে গেছে তারে; 
কাল রাতে - ফাল্গুনের রাতের আঁধারে 
যখন গিয়েছে ডুবে পঞ্চমীর চাঁদ 
মরিবার হলো তার সাধ;' 

'মরিবার সাধ' তো সাধে জন্মায় না, একটা সমাজিক ও মানবিক অবক্ষয় এর নেপথ্যের কারণ হিসাবে সর্বদায় বিদ্যমান থাকে। 
একালের আরও এক প্রতিনিধিস্থানীয় কবি হলেন সুধীন্দ্রনাথ দত্ত। তাঁর কবিতাতেও আমরা যুদ্ধোত্তর পৃথিবীর মানবিক অবক্ষয় ও সংকট, নৈরাশ্যর চালচিত্রের কাব্যিক আদল লক্ষ্য করি। সুধীন্দ্রনাথ লিখছেন, 

'কোথায় লুকাবে? ধূ ধূ করে মরুভূমি; 
ক্ষয়ে ক্ষয়ে ছায়া মরে গেছে পদতলে 
আজ দিগন্তে মরীচিকাও যে নেই 
নির্বাক নীল নির্মম মহাকাশ।' 

অন্য একটি কবিতায় সুধীন্দ্রনাথ লিখছেন, 

'অতল শূন্যের শেষে পড়ে আছি আমি নিরাশ্রয়ে
দেখিতেছি ভ্রমি ভ্রান্ত চোখে 
গতাসু আলোর প্রেত বিচরিছে স্তবকে স্তবকে' 

আসলে, এই হতাশা এবং মানবিক সংকট সবটাই বিশ্বযুদ্ধের দান। ১৯৩৯ এ শুরু হওয়া দ্বিতীয় মহাযুদ্ধের ভয়াবহতা ছিল আরও ব্যাপক। এবার যুদ্ধ ইউরোপ ছাড়িয়ে এশিয়া মহাদেশেও হাজির হল। ঔপনিবেশিক শাসনে প্রাণ ওষ্ঠাগত আমাদের স্বদেশও পুরোপুরি এই বিশ্বযুদ্ধ দ্বারা আক্রান্ত হল বলা চলে। একদিকে ফ্যাসিবাদী শক্তি সমূহের উন্মত্ততা এবং দানবীয় দাপট, সাথে সাথে বিয়াল্লিশের ভারত ছাড় আন্দোলনে উত্তাল হয়ে উঠল মহামানবের সাগরতরী তৎকালীন অবিভক্ত ভারত। ১৯৪৩ এ শুরু হল মন্বন্তর, পয়ত্রিশ লক্ষেরও বেশি মানুষ মারা গেলেন অন্নভাবে। ৪৬ এ সংঘটিত হল সম্প্রদায়িক দাঙ্গা। ওই বছরই তেভাগা আন্দোলন ব্যাপকতর রূপ ধারণ করল। ১৯৪১ এ রবীন্দ্রনাথের মহাপ্রয়াণ যে শূন্যতার সৃষ্টি করেছিল, ৪৮ এ গান্ধীজীর মৃত্যু তার একটা মর্মান্তিক প্রলেপ দিল ভারতবাসীর হৃদয়ে। ১৯৪৭ এ এল দ্বিখণ্ডিত স্বাধীনতা। ফলত, দ্বিতীয় বিশ্বযুদ্ধের পর পরই তৎকালীন অবিভক্ত ভারতের বুকে এক নিকষ কালো অন্ধকার নেমে আসে কুন্ডলি পাকানো চক্রের মত। এই পর্বের কবিগণ কিছুতেই বেরিয়ে আসতে পারলেন না এই মানবিক অবক্ষয়ের ভয়াল ত্রাস থেকে। জীবনানন্দ লিখলেন, 

'এ যুগে কোথাও কোনো আলো / কোনো কান্তিময় আলো / চোখের সমুখে নেই যাত্রিকের' 

অমিয় চক্রবর্তী লিখলেন, 

'অন্ন আছে 
লোভের মরাইয়ে ধ্বংস গোলায় অন্ন আছে 
পণ্যরাষ্ট্র জানে ভুবনের অন্নের পথ' 

'স্মৃতি সত্তা ভবিষ্যতে' কবি বিষ্ণু দের উপলব্ধি, 

'এ নরকে 
মনে হয় আশা নেই, জীবনের ভাষা নেই, 
যেখানে রয়েছি আজ সে কোনো গ্রামও নয়, শহরও তো নয় / প্রান্তর পাহাড় নয়, নদী নয়, দুঃস্বপ্ন কেবল' 

অন্ধকার চিরস্থায়ী নয়, অন্ধকারের মাঝে থেকেও এই পর্বের কবিগণ উপলদ্ধি করেছিলেন অন্ধকার একদিন কাটবেই, কেননা রাতের গভীরতা যত অতলময় হোক না কেন, ভোরের সূর্য একসময় ঠিক উঠবেই। বিষ্ণু দে লিখলেন, 

'তবু জানি এই দধীচির হাড়ে, এই ভাঙা হাতিয়ারে / ইতিহাসে আজ পাতা কেটে দেব, লিখব প্রাণের ভাষ্য' 

হিরোশিমা ও নাগাসাকির ঘটনা হিংস্র সাম্রাজ্যবাদী শক্তির  দানবীয় রূপ প্রকাশ্যে আনে। এই দুই ঘটনায় মানুষের মূল্যবোধে ভীষণ রকম আঘাত করেছিল। নিরস্ত্র কবির সংবেদনশীল আত্মা এই ঘটনায় নীরব থাকতে পারেনি। জীবনানন্দ, সুধীন্দ্রনাথ, বিষ্ণু দে, পরবর্তীতে সমর সেন, সুকান্ত ভট্টাচার্য, সুভাষ মুখোপাধ্যায়, অরুণ মিত্র, মঙ্গলাচরণ চট্টোপাধ্যায় প্রমুখ শ্রদ্ধেয়জনের কবিতায় ধ্বংসের প্রবল উত্তাপের মাঝে অবস্থান করেও দাঁতে দাঁত চেপে লড়াই করবার হৃদয় নির্মাণ ও দৃঢ় সংকল্পের শপথ লক্ষ্যগোচর হয়। 

'এ করাল সংক্রান্তি নিঃসন্দেহে পার হব 
যে মৃত্যু প্রাণ আনে তার ফিনিক্স গানে,
প্রগতির সম্মলিত বীর্যে, অক্লান্ত আত্মদানে'

 

আরিফুল ইসলাম সাহাজি 
অধ্যাপক, পশ্চিমবঙ্গ, ভারত 

 

এই লেখকের অন্যান্য লেখা

 



আপনার মূল্যবান মতামত দিন:


Top