সিডনী শনিবার, ২৪শে জুলাই ২০২১, ৯ই শ্রাবণ ১৪২৮

ফাঁদ : শেখ মোহাম্মদ হাসানূর কবীর


প্রকাশিত:
১ অক্টোবর ২০২০ ১৪:৪৪

আপডেট:
২৪ জুলাই ২০২১ ২২:২৬

ছবিঃ শেখ মোহাম্মদ হাসানূর কবীর

 

গভীর রাতে আবিরের ফোন বেজে ওঠে। রেখা তখন অঘোরে ঘুমুচ্ছে। ফোনের শব্দে রেখার ঘুম ভেঙ্গে যায়। রেখা ফোনটি রিসিভ করে হ্যালো বলার সাথে সাথে মেয়েলি কণ্ঠ টের পেয়ে ওপাশ থেকে ফোন রেখে দেয়। রেখা ভীষণ বিরক্ত হয়। সমূহ বিপদের আশঙ্কা অনুভব করতে পেরে আবির ঘুমানোর ভান করে মরার মতন পড়ে থাকে। প্রতিপক্ষকে নিষ্ক্রিয় দেখে রেখার রাগ কিছুটা ফিকে হয়ে আসে। তারপর আবিরকে পাশ ফিরিয়ে অল্পকিছুক্ষণের মধ্যেই রেখা পুনরায় ঘুমের অতলে নিমগ্ন হয়ে যায়। ইদানিং আবিরের আচরণ খুব রহস্যাবৃত মনে হয় রেখার। হঠাৎ কেমন যেন অচেনা হয়ে যাচ্ছে আবির। দুজনে খুব কাছাকাছি থাকলেও আবিরকে আজকাল মনে হয় বেগানা পুরুষ।

বছর দুএক আগে পাবলিক সার্ভিসের চাকরিটি ছেড়ে দিয়ে পুরোপুরি ব্যবসায় মনোযোগ দেয় আবির। চাকরিতে তার কোনো কালেই আগ্রহ ছিলোনা। ছেলেবেলা থেকেই চাকরির প্রতি বীতশ্রদ্ধ ছিলো আবির। বন্ধুদের কেউ চাকরির প্রসঙ্গ তুললেই আবির তাদের নীতিকথা শুনিয়ে দিতো, শৃঙ্খলপ্রিয় সিংহের থেকে স্বাধীন গাধাও উত্তম। সেই আবির রেখার সম্মান বাঁচাতে সাময়িক চাকরিতে ঢোকলেও দুচার বছর না যেতেই চাকরিতে ইস্তফা দিলো। প্রথম দিকে আবিরের চাকরি ছাড়ার বিষয়টি রেখা জানতো না। পরে জানতে পারলেও আবিরকে পুনরায় চাকরিতে ফেরানো কোনো প্রকারেই আর সম্ভব হয়ে ওঠেনি। অনেকটা দায়ে পড়ে আবিরের স্বেচ্ছাচারিতাকে যেন বিড়ম্বিত নিয়তি হিসেবে মেনে নিয়েছিলো রেখা।

রেখার সাথে আবিরের যখন বিয়ে হয়, তখন আবির সবেমাত্র পড়াশোনা শেষ করেছে। বাড়ির কেউ রাজি ছিলো না বেকার ছেলের সাথে রেখাকে বিয়ে দিতে; কিন্তু আবিরকে রেখার অসম্ভব ভালোলেগেছিলো। আর তাই সবার মতামতকে উপেক্ষা করে রেখা আবিরকে বিয়ে করার জন্য মরিয়া হয়ে ওঠে। রেখার অবাধ্যতার কাছে শেষ পর্যন্ত হার মানে রেখার মা বাবাসহ আত্মীয়পরিজন সবাই।

বিয়ের এক বছরের মাথায় চাকরি হয় আবিরের। হালুয়াঘাটে কৃষি সম্প্রসারণ কর্মকর্তা হিসেবে যোগদান করে আবির। ময়মনসিংহের গারো পাহাড়ের পাদদেশে সীমান্তবর্তী ছোট্ট মফস্বল শহর হালুয়াঘাট। শহরের কোল ঘেঁষে বয়ে গেছে দর্শা নদী। উত্তরে মেঘালয়ের মেঘ ছোঁয়া বড় বড় শৈলশৃঙ্গ এ শহরের নিসর্গের চিরায়ত রূপকে যেন বহুগুণে বাড়িয়ে দিয়েছে।

চাকরিতে যোগদান করেই আবির রেখাকে নিয়ে যায় হালুয়াঘাটে। শহরের শেষ প্রান্তে কড়ইতলীতে চমৎকার একটি কাঠের দোতলা বাড়ি ভাড়া নেয়। চাকরির শুরুর দিকে অফিসের কাজে উদয়াস্ত ব্যস্ত থাকতো আবির। রেখা আবিরের অপেক্ষায় পথ চেয়ে বসে থাকতো সন্ধ্যা অবধি। কাজ শেষে আবির যখন ঘরে ফিরতো, রেখা তখন এক বুক অভিমানে দরজা খুলে দিয়ে বারান্দায় এসে কাঠের রেলিং ধরে দাঁড়িয়ে থাকতো। দূরে গাঢ় নীল পাহাড়ের বুকে অস্তমিত সূর্যের রক্তিম লাল আভা মিশে এক প্রকার বর্ণিল বিষাদে ছেয়ে যেতো চারিদিক। আর সেই অন্তহীন বিষাদের মাঝে আবিরের উপস্থিতি রেখার মনে জাগাতো অনাবিল সুখানুভূতি।

প্রথম দিকে ভালোই ছিলো তাদের বোঝাপড়ার সংসার। দারুণ ব্যস্ততার মাঝেও আবির ফোন দিয়ে সারাক্ষণ রেখার খবর নিতো; কিন্তু চাকরি ছেড়ে ব্যবসায় ঢোকার পর থেকেই টাকা আর মেয়ে মানুষের নেশায় আবির হয়ে ওঠে একটা উন্মত্ত বিবেকহীন অমানুষ।

সকালে অফিসে এসে চায়ের কাপে চুমুক দিতে দিতে পকেট থেকে মোবাইল ফোনটা বের করে আবির। বের করে গত রাতে ফোন আসা নাম্বারটি চেনার চেষ্টা করে; কিন্তু না, কোনো ভাবেই পরিচিত কাউকে মনে হচ্ছে না।

কিছুক্ষণ ভেবেচিন্তে অচেনা নাম্বারটিতে ফোন দেয় আবির। ফোন দেয়ার অনতিবিলম্বে একজন স্ত্রীলোক ফোন ধরে আগ্রহভরা কণ্ঠে আবিরকে বলে,

কেমন আছেন আপনি? গত রাতে আপনাকে অস্বস্তিতে ফেলার জন্য ক্ষমা চেয়ে নিচ্ছি।

একজন নাম পরিচয়হীন স্ত্রীলোকের নিঃসঙ্কোচ আবেদনে আবির হকচকিয়ে যায়। কি বলবে বুঝে ওঠতে পারে না খানিকটা সময়। অতঃপর গলা ঝেড়ে শান্তস্বরে উদ্বিগ্ন আবির স্ত্রীলোকটিকে প্রশ্ন করে,

কে আপনি?

স্ত্রীলোকটি শব্দ করে হাসতে থাকে। হাসির আওয়াজ শুনে মুগ্ধতায় ভরে যায় আবিরের মন। হাসি থামলে স্ত্রীলোকটি জবাব দেয়,

আমি বেলা। এ শহরে নতুন আগন্তুক বলতে পারেন। হালুয়াঘাটের সূর্যপুর এক বিকেলে আপনার সঙ্গে আলাপ হয়েছিলো।

চিনতে পেরেছেন?

আবির কিছুটা বিব্রত হয়। অনেক চেষ্টা করে স্মৃতি হাতরেও স্ত্রীলোকটির কথা মনে করতে পারছে না। শেষমেষ ভরাট কণ্ঠে অন্ধকারে ঢিল ছোঁড়ার মতো আবির স্ত্রীলোকটির কথার উত্তর দেয়,

চিনবো না কেনো?

আপনাকে কি ভোলা যায়?

স্ত্রীলোকটি হেসে অবাক হয়ে বললো,

কেনো বলুন তো?

আবির কোনোরকম ভণিতা না করেই সলজ্জভাবে মেয়েটির কথার উত্তর দিলো,

না, মানে সেদিন আপনাকে বেশ লাগছিলো। বলতে পারেন কিঞ্চিৎ প্রেমেও পড়েগিয়েছিলাম।

মেয়েটি অবাক হওয়ার ভান করলো,

তাই বুঝি?

দেখুন, আপনাকেও খুব ভালোলেগেছিলো আমার। আপনার যোগ্যতা ও ব্যক্তিত্ব আপনার প্রতি আমার আগ্রহকে বাড়িয়ে দিয়েছেছিলো সেদিন। আর তাই এতটা বছরেও আপনাকে ভুলতে পারিনি।

সত্যিই, অসাধারণ পুরুষ আপনি!

বেশ কিছু সময় দুজনের মধ্যে এরূপ নানা অপ্রাসঙ্গিক বিষয়ে কথা হয়। তারপর কোনো প্রকার ভদ্রতার তোয়াক্কা না করে ঠাস করে চড় মারার ভঙ্গিতে স্ত্রীলোকটি ফোন রেখে দেয়।

বেলার প্রতি অত্যধিক কৌতূহলের কারণে খুব অল্প সময়েই বেলার সঙ্গে ঘনিষ্ঠতা বাড়ে আবিরের। একদিন আবিরের নিমন্ত্রণে বেলা আসে আবিরের ফকিরাপুলের অফিসে। ময়ূরকণ্ঠী সিল্কের শাড়িতে অপরূপ মায়াবতী বেলার ডাগর চোখের চাহনি মুগ্ধ করে আবিরকে। ঝঞ্ঝাবিক্ষুব্ধ আকাশে উত্তাল ঘন কালো মেঘরাশির কোলে সঞ্চারণশীল বিজুরির মতই বেলার আপাদমস্তক বুভুক্ষু দৃষ্টিতে নিরীক্ষণ করে পরম তৃপ্তিতে অস্ফুটে আবির বেলাকে বলে,

আহা! কি চমৎকার দেখতে আপনি।

কামনার আগুনে পুড়ে দগ্ধ হয় আবির। বেলার নিবিড় সাহচর্য পেতে মরিয়া হয়ে ওঠে সে। মনে মনে ভাবে, বেলাকে ছাড়া তার এক মুহূর্তও চলবে না।

দিন গড়িয়ে যায়। সময় বদলাতে থাকে। আবির এবং বেলার সম্পর্ক চূড়ান্ত পরিণতির দিকে এগোয়। রেখা ও আবিরের দাম্পত্য জীবনে চলতে থাকে টানাপড়েন। আবিরের সাথে কলহ করে রেখা সবকিছু ছেড়েছুড়ে বাবার বাড়ি চলে যায়। যাওয়ার সময় চিরকুটে লিখে যায়, আবির যেন তাকে ফিরিয়ে আনার অকারণ চেষ্টা না করে।

রেখার চলে যাওয়ায় আবিরের মনে কোনো রকম ভাবান্তর হয়না। বরং রেখার অনুপস্থিতিতে বেলাকে কাছে পাওয়ার কামনায় আবির ব্যাকুল হয়ে ওঠে।

বেশ কয়েকদিন হয় বেলার কোনো খবর নেই। বেলার এমন হঠাৎ নিরুদ্দেশে আবিরের মন উৎকণ্ঠায় ছেয়ে যায়। একদিন অপরাহ্ণে আবিরকে চমকে দিয়ে বেলা ফোন দেয়। ফোন দিয়ে আদর জড়ানো কণ্ঠে বলে,

আবির, আমি গ্রামে চলে এসেছি। আপনাকে ভীষণ অনুভব করছি। চলে আসুন না আমাদের গ্রামে। করিমগঞ্জে বিল হাওড় বেষ্টিত আমাদের গ্রাম। বর্ষায় উন্মত্ত যৌবনা হাওড়ের বুকে দুজনে নৌকোয় করে ভেসে বেড়াবো বুনো হাঁসের মতন। চমৎকার সময় কাটবে আমাদের।

প্লিজ, না করবেন না!

আবির কি বলবে বুঝে ওঠতে পারেনা। এদিকে বেলাকে ফিরিয়ে দেয়ার মতো মনের জোরও তার নেই। অতএব, কোনো কিছু না ভেবেই তৎক্ষণাৎ উচ্ছ¡সিত মনে আবির বেলার প্রস্তাবে রাজি হয়ে যায়।

পরদিন বেলার সাথে দেখা করতে আবির করিমগঞ্জে বেলার গ্রামের উদ্দেশ্যে রওনা হয়। ঢাকা থেকে বাসে করিমগঞ্জ নেমে তারপর নৌকাযোগে বিশাল জলাভূমি পেরিয়ে অবশেষে গন্তব্যে পৌঁছে যায় আবির। বেলা আগে থেকেই আবিরের অপেক্ষায় ছিলো। আবিরকে দেখে ম্লান হেসে উষ্ণ অভ্যর্থনা জানিয়ে আবিরকে একটি নির্জন বাড়িতে নিয়ে যায় বেলা। পরিপূর্ণ পুলকে আবিরের মন রোমাঞ্চিত হয় ; কিন্তু কিছুক্ষণ না যেতেই বাধে চরম বিপত্তি। কতকগুলো গুণ্ডা মতন লোক বাড়িটিতে এসে ঘরে ঢোকে আবিরকে খুঁটির সঙ্গে বেঁধে দরজা আঁটকে দেয়।

ঘটনার আকস্মিকতায় আবিরের বুঝতে বাকি থাকেনা যে, লোকগুলো তাকে ফাঁদে ফেলেছে। আর একাজে বেলা নেহায়েত শিকার ধরার টোপ মাত্র।

লোকগুলো আবিরকে জানোয়ারের মতন নির্দয়ভাবে ঠ্যাঙিয়ে যা কিছু সাথে ছিলো সব কেড়ে নেয়। এমন কি পরনের কাপড় অবধি। কেবল মৌলানামতন একজন দয়াদ্র হয়ে আবিরের অন্তর্বাসটি ফেরত দেয়। আবির ইজ্জতসমেত সর্বস্ব বিসর্জন দিয়েও তাদের সন্তুষ্ট করতে পারেনা। তারা আবিরের কাছে বেশুমার টাকা দাবি করে। লোকগুলো আবিরকে এটাও জানিয়ে দেয় যে, যথাসময়ে টাকা দিতে ব্যর্থ হলে তারা তাকে বস্তায় ভরে বিলের কাদামাটিতে পোঁতে ফেলবে।

আবিরের এই দুরবস্থার কথা জানতে পেরে রেখা নিদারুণ বেদনায় ক্ষতবিক্ষত হয়। অভিমান ভুলে আবিরের মুক্তিপণের টাকা নিয়ে উদ্ভ্রান্তের মতন ছুটে যায় করিমগঞ্জে আবিরকে ফাঁদ থেকে মুক্ত করতে।

অবশেষে অনেক কাঠখড় পুড়িয়ে আবিরকে উদ্ধার করে ঢাকায় ফিরিয়ে নিয়ে আসে রেখা। একই ছাদের নিচে থেকেও ঘৃণায় আবিরের কাছ থেকে নিজেকে দূরে সরিয়ে নেয় সে। আবির প্রায়শ্চিতের গন্ধক দহনে নিজেকে জ্বালিয়ে শুধরে নেয়। তবে রেখার অন্তরপটে আবিরের প্রতি অবিশ্বাসের যে দাগ পড়ে, তা আর কোনো দিনও মুছে যায় না। চাঁদের বুকের কলঙ্ক রেখার মতোই সে দাগ রয়ে যায় অক্ষত অমলিন।

 

শেখ মোহাম্মদ হাসানূর কবীর

 

এই লেখকের অন্যান্য লেখা



আপনার মূল্যবান মতামত দিন:


Top