সিডনী শনিবার, ৩১শে অক্টোবর ২০২০, ১৫ই কার্তিক ১৪২৭

ফুলন দেবীঃ যিনি নিজেই নিজের ধর্ষণের প্রতিশোধ নিয়েছিলেন : কাজী খাদিজা আক্তার 


প্রকাশিত:
১৫ অক্টোবর ২০২০ ১৪:৫৪

আপডেট:
৩১ অক্টোবর ২০২০ ০৩:৪৮

ছবিঃ কাজী খাদিজা আক্তার 

 

ভারতের অন্যতম সফল লেখক খুশবন্ত সিং এর "বুক অফ আনফরগেটেবল ওম্যান" এ তিনি ফুলন দেবী সম্পর্কে লিখতে গিয়ে ফুলন দেবীর দলের এক সদস্য যে কিনা পুলিশ হেফাজতে ছিল তার বয়ান তুলে ধরেছেন, বয়ানটি ছিলো- "ফুলন আমাদের সামনে জামা কাপড় এমনভাবে খুলতো যেনো আমরা অস্তিত্বহীন। অন্য মেয়েরা যে ভাষা ব্যবহার করতো তা মেয়েদের সাথে সঙ্গতিপূর্ণ। কিন্তু আমি যতোবার ফুলনকে দেখেছি তার মুখে নোংরা কথা ছাড়া আর কিছু শুনিনি। সে মুখ খুললেই নোংরা গালি বেরুতো -'গান্ডু, মাদারচোদ, বেটিচোদ'।" ভারতের নিচু বর্ণ হিসেবে পরিচিত মাল্লা বর্ণের পরিবারে ১৯৬৩ সালে জন্ম নেয়া ফুলন ছয় ভাই বোনের মধ্যে পাঁচ বোনের একজন হিসেবে স্বাভাবিক ভাবেই সে ছিলো বাবা মায়ের বোঝা, তারপর জীবনের বিভিন্ন সময়ে নরপিশাচদের আক্রমণে ধর্ষিত এবং পরবর্তী সময়ে ডাকাত পেশার অন্তর্ভুক্ত ফুলন দেবী থেকে এরকম নোংরা ভাষা বের হওয়াটা নিশ্চয়ই অস্বাভাবিক কিছু নয়।   

১৯৭৯ সালের ৬ জানুয়ারি প্রথম দফা গ্রেফতার হওয়ার পর ফুলন দেবীর জবানবন্দিতে তাঁর নিজের সম্পর্কে তিনি বলেছিলেন, "আমরা মাল্লা জাতের অন্তর্ভুক্ত এবং গুরহ কি পুরওয়া গ্রামে বাস করি। আমার বয়স যখন বার বছর তখন পুট্টি লাল নামে পঁয়তাল্লিশ বছর বয়স্ক এক বিপত্নীক লোকের সাথে আমাকে বিয়ে দেয়া হয়। "(বুক অফ আনফরগেটেবল ওম্যান, খুশবন্ত সিং) তার নিজের থেকে ত্রিশ বছরের চেয়ে বড় একজন লোকের সাথে তার অমতে বিয়ে দেয়া হলে এবং সেই স্বামীর জোরপূর্বক শারীরিক সম্পর্ক স্থাপন আর নিয়মিত নির্যাতন সহ্য করতে না পেরে সেখান থেকে চলে আসে ফুলন দেবী। কিন্তু বাবা মা লোক সমাজের ভয়ে ফুলকে আবার স্বামীর বাড়িতে ফিরিয়ে দিয়ে আসে। শেষপর্যন্ত ফুলন সেখান থেকে একেবারে পালিয়ে চলে আসে।এরপর সে কানপুরের কৈলাশের সাথে দ্বিতীয় বিয়ের কথাও তার জবানবন্দিতে স্বীকার করে। ১৯৭৯ সালে যখন ফুলন প্রথম বারের মতো গ্রেফতার হয় তখন তার তিনদিনের কারাবাসের সাজা হয়। এই তিনদিন ধরে পুলিশের কাছে প্রথমবারের মতো গণধর্ষণের স্বীকার হয় ফুলন।

ছবিঃ ফুলন দেবী

ফুলন দেবীর ডাকাত দলে অন্তর্ভুক্ত হওয়ার ইতিহাসও কিন্তু কম ঘটনাবহুল নয়। মাত্র আঠারো বছর বয়সে যখন ফুলন নিজেকে সবার কাছ থেকে পরিত্যক্ত অবস্থায় দেখতে পেলো, যখন বুঝতে পারলো ফুলনকে তার বাবামা আর চায় না, বৃদ্ধ স্বামী তাকে তালাক দিয়েছে, দ্বিতীয় বিয়েও মূল্যহীন হয়ে পড়েছে তখন ফুলনের মনে হলো তার সামনে দূরে কোথাও গিয়ে বেশ্যাবৃত্তি গ্রহণ অথবা আত্মহত্যা ছাড়া আর কোনো পথ খোলা নেই। সহসা ফুলনের সাথে পরিচয় হলো ডাকাত দলের সদস্য বিক্রম সিং এর সঙ্গে। বিক্রম সিং এর সঙ্গেও তার দৈহিক সম্পর্ক হয় এবং এক সময় বিক্রম তাকে দলে নিয়ে যেতে চাইলো প্রথমে ফুলন অস্বীকার করলেও বিক্রম তাকে কৌশলে দলের সদস্য করে নিলো। সেই থেকে ফুলনের ডাকু হওয়া এবং পরবর্তীতে বিক্রম সিংকেই ফুলন ভালোবেসেছিলো।কিন্তু তারপরেও ফুলনের দৈহিক অত্যাচার থেকে পরিত্রাণ নেই। সে পছন্দ করুক আর নাই করুক দলের অন্য সদস্যদেরকেও তার দেহ ভোগ করতে দিতে হতো। দলের নেতা বাবু গুজ্জার নিষ্ঠুর দৈহিক  আক্রমণ পরতে থাকে ফুলনের ওপর। ফুলন তা সহ্য করতে না পেরে বিক্রমকে জানায় এবং বিক্রম একরাতে বাবু গুজ্জাকে গুলি করে হত্যা করে এবং নিজেকে দলের নেতা হিসেবে ঘোষণা করে, আর দলের সবাইকে হুশিয়ার করে দেয় যেন কেউ ফুলনকে স্পর্শ না করে। 

এরপর শুরু হয় ফুলনের জীবনের আরেক মোড়। বিক্রম সিং প্রকৃতপক্ষে দলের নেতা ছিলেন না, ছিলেন ঠাকুর সম্প্রদায়ের শ্রীরাম ও তার ভাই লালরাম। দুজনে জেলে বন্দী ছিলো। বিক্রম সিং ৮০০০০ টাকা খরচ করে তাদের জামিন করায়। তারা দুভাই আসার পর দলের নেতৃত্ব দাবী করে বিক্রমের কাছে কিন্তু দলের অন্যরা তাতে রাজী হয়নি। এরপর শ্রীরাম এবং লালরাম দুজন মিলে বিক্রম সিং কে খুন করে পথের কাটা পরিষ্কার করে। এরপর তারা দুভাই ফুলনকে অপহরণ করে নিয়ে আসে কানপুর থেকে ১০০ কিলোমিটার দূরে অবস্থিত বেহমাই নামক উত্তর প্রদেশের একটি গ্রামে। সেখানে প্রায় বিবস্ত্র করে পুরো গ্রামবাসীর সামনে হাজির করে শ্রীরাম।বিক্রমের হত্যাকারী দাবী করে তার ওপর চালানো হয় অত্যাচার। প্রথমে শ্রীরাম তার ভাই এবং পরে একে একে ঠাকুর সম্প্রদায়ের বহু লোক প্রায় ২৩ দিন ধরে তাকে গণধর্ষণ করে। একপর্যায়ে তাকে মৃত ভেবে ফেলে রেখে যায়। ফুলন সেখান থেকে কোনোরকমে প্রাণে বেঁচে যায়। ফুলন দেবীর আত্মজীবনীর লেখিকা মালা সেনকে ফুলন বলেছিলো- "ওরা আমার সাথে অনেক অন্যায় অত্যাচার করেছিলো।"

ভারতের উত্তর প্রদেশের একটি গ্রাম বেহমাই।  ১৯৮১ সালের ১৪ ফেব্রুয়ারি। সেই দিনের একটি লোমহর্ষক ঘটনাই ফুলন দেবীকে পুরো বিশ্বে  পরিচয় করিয়ে দেয় "দস্যুরাণী" হিসেবে। তার প্রেমিক বিক্রম সিং কে হত্যার জন্য সেদিন ২২ ঠাকুরকে এক সারিতে দাঁড় করিয়ে গুলি করে মেরে ফেলে ফুলন। ইতিহাসে এই ঘটনা বেহমাই হত্যাকাণ্ড বা "বেহমাই গণহত্যা" নামে কুখ্যাত। ফুলন শুধু তার প্রেমিককে হত্যার জন্য যে এই গণহত্যা করেছে তা নয়, এ ছিলো তার গণধর্ষণের প্রতিশোধ এবং উচ্চজাত ঠাকুর সম্প্রদায়ের উপর বহুকালের পুঞ্জিভূত আক্রোশ। এরপর থেকে দস্যুরাণী ফুলন দেবীর নাম বেশ জনপ্রিয় হয়ে উঠে। শুনা যায় সে সময় শহরগুলোতে দূর্গার বেশে ফুলনের মূর্তির বেচাকেনা শুরু হয়ে যায়।এই ধরনের প্রতিশোধ কোনো সাধারণ নারীর পক্ষে সম্ভব নয়।

এই ঘটনার দুবছর পর পুলিশকে নাস্তানাবুদ করে প্রায় ৮০০০ দর্শকের উপস্থিতিতে ফুলন নির্দিষ্ট শর্ত সাপেক্ষে আত্মসমর্পণ করে। এই শর্তগুলোর প্রায় সবগুলোই পুলিশ মেনে নেয়, শুধু ৮ বছরের বদলে তাকে ১১ বছর কারাদণ্ড দেয়া হয়। ১৯৯৪ সালে ফুলন মুক্তি পায়। ফুলনের রাজনৈতিক জীবন শুরু হলো। ১৯৯৬ সালে সমাজপার্টি (এসপি) ফুলনকে মির্জাপুর আসনে নির্বাচন করার জন্য বাছাই করে। নির্বাচনে জয় লাভ করে ফুলন দেবী। পরবর্তীতে ১৯৯৮ সালে মধ্যবর্তী নির্বাচনে হেরে গেলেও ১৯৯৯ সালে আবার জয় লাভ করে ফুলন। ২০০১ সালের ২৫ জুলাই পার্লামেন্ট থেকে ফেরার পথে শের সিং এর গুলিতে মৃত্যু বরণ করে এই সাহসী নারী। এই হলো দস্যুরাণী ফুলন দেবীর ঘটনাবহুল জীবনকাহিনী। যার সময়সীমা মাত্র আটত্রিশ বছরেরও কম। 

দস্যুরাণী হিসেবে তার কর্মকাণ্ডের জন্য ফুলন দেবীকে ঘৃণা করবেন নাকি এক নিম্ন মাল্লা জাতে জন্মগ্রহণ করে জীবনের কুৎসিত রুপ দেখা এবং জীবনে অসংখ্য বার ধর্ষিত হওয়া এক জ্বালাময়ী নারীর ধর্ষণের বিরুদ্ধে সাহসী প্রতিশোধ নেয়াকে সাধুবাদ জানাবেন তা একান্তই আপনার ব্যাপার। তবে আমি কিন্তু তাঁকে স্যালুট জানাই।          

 

কাজী খাদিজা আক্তার 
প্রভাষক (ইংরেজি)  
সরাইল সরকারি কলেজ

   

এই লেখকের অন্যান্য লেখা



আপনার মূল্যবান মতামত দিন:


Top