সিডনী বুধবার, ২১শে অক্টোবর ২০২০, ৬ই কার্তিক ১৪২৭

ধর্ম : বানীব্রত


প্রকাশিত:
১৭ অক্টোবর ২০২০ ১৬:৪৫

আপডেট:
২১ অক্টোবর ২০২০ ০৭:৫৮


শ্যামলী ষাটোর্ধ্ব একজন বিধবা, গৃহ পরিত্যাগী নারী। একমাত্র ছেলে আর ছেলের বউ এর ব্যবহারে অতিষ্ট হয়ে অবশেষে নিজের পেনশনের কাগজপত্র বাড়ির দলিল নিয়ে বাড়ি থেকে অজানা পথের উদ্দেশ্যে রওনা দিয়েছিল।

ওনার স্বামীর মৃত্যুর পর থেকে ছেলে আর তার স্ত্রী  সম্পত্তি নিজেদের নামে করার জন্য নানা ভাবে ওনাকে অত্যাচার করতে থাকে।  সম্পত্তি বলতে শ্যামলীর স্বামীর তৈরী করা সোনারপুর স্টেশনের  কাছে তিন তলা সাজান গোছান একটা বাড়ি। আর কিছু ব্যাঙ্ক ব্যালেন্স। মাত্র ছয় মাস আগে শ্যামলীর স্বামী রবিন সেন হৃদরোগে আক্রান্ত হয়ে মারা যান।  তার মাত্র দু বছর আগে তিনি ইনকাম ট্যাক্সের অফিসার পদ থেকে অবসর নেন। রবিন বাবু মারা যাবার  আগেই বাড়ির দলিল শ্যামলী দেবীর নামে করে দিয়ে যান। তারপর রবিন বাবু মারা যাবার পর শুরু হয়ে যায় মার প্রতি ছেলের অত্যাচার।

একদিন সকালে সূর্য ওঠার আগেই ঘর ছাড়েন শ্যামলী দেবী। তার চলে যাওয়া কাক পক্ষিতেও টের পায় নি। স্টেশনে  এসে শিয়ালদহ গামী ট্রেনে উঠে সোজা শিয়ালদহ এসে ওঠেন তিনি। স্টেশন থেকে বেড়িয়ে বাইরের স্টেশন চত্বরে এসে বসেন। তখন সবে পুবের আকাশে রবির দেখা দিয়েছে। চোখে মুখে ক্লান্তির ছাপ।আর চোখ বুঝে আসে ঘুমে। দেওয়ালে হেলান দিয়ে হাতের মাঝারি সাইজের ব্যাগটাকে বুকে জড়িয়ে কখন যেন তিনি ঘুমিয়ে পরেছেন।  ঘুম যখন ভাঙল তখন  সূর্য প্রায় মাথার উপর।  চোখ খুলেই উনি দেখলেন তাকে ঘিরে বেশ কয়েক জন মানুষ জড় হয়েছেন। ওনাকে চোখ খুলতে দেখেই উৎসুক চোখ মুখ গুলো থেকে নানা রকম প্রশ্ন উড়ে আস্তে লাগলো। শ্যামলী দেবীর তখন গলা শুকিয়ে কাঠ। আর পেটেও যেন ইদুর আজ খুব বেশী ছুটোছুটি করছে।  উৎসুক মানুষ গুলোকে এবার উনি জানতে চান তাদের এখানে কি দরকার? আর বললেন একটু শরীর টা খারাপ লাগছিল তাই উনি এখানে বসে আছেন। আস্তে আস্তে ভীড় টা হাল্কা হয়ে গেল।

শ্যামলী দেবী ভাবলেন এবার একটু কিছু খেয়ে তারপর কোথায় যাবেন ঠিক করবেন। যখন উনি উঠতে যাবেন তখন একটি বছর ত্রিশের ছেলে হাতে চায়ের গ্লাস আর একটা প্লেটে কয়েকটি লুচি আর তরকারি এনে বলে মা এটা খেয়ে নিন।  খিদের তাড়নায় শ্যামলী দেবী খাবারটা নিলেন। ছেলেটি ওনার পাশে বসে পরম যত্নে খাইয়ে দিল। কথায় কথায় শ্যামলী দেবী জানতে পারলো  উল্টো দিকে ছেলেটির দোকান সকালের দিকে ওনাকে এখানে বসতে দেখে ছিলো কিন্ত মাঝখানে খরিদ্দারের ভীড় থাকার জন্য ওনার দিকে লক্ষ্য রাখতে পারেনি। ভীড় হল্কা হবার পর সারাক্ষন ওর চোখ ছিল শ্যামলী দেবীর উপর তাই উনি চোখ খুলতেই  খাবারের ব্যবস্থা করেছে। শ্যামলী দেবী ছেলেটি কে অনেক আশির্বাদ করলেন। পয়সা দিতে গেলে ছেলেটি বলে মাকে খাইয়ে সে পয়সা নিতে পারবে না। এরপর শ্যামলী দেবীকে নিয়ে ছেলেটি ওর দোকানে নিয়ে আসে। আসার পথে ওর নাম বলে জামিল।শ্যামলী দেবী ভাবতে থাকে তার ছেলের ব্যবহার আর অপরিচিত মুসলিম একটি ছেলের ব্যবহার যাকে সে পেটে ধরেনি। ভাবতে ভাবতে চোখে নেমে আসে জলের ধারা।
সম্বিত ফেরে যখন জামিল জিজ্ঞেস করে কোথায় যাবেন মা। নিজেকে কোন মতে সামলে সামলে নিয়ে অস্ফুটে বলে জানি না। এবারে শ্যামলীর মনে হলো  জামিলের ব্যবহার যেন কত আপন কত পরিচিত।

জমিল হাতের কাজ করতে করতে খেয়াল করেছিল অন্যমনস্ক হয়ে শ্যামলী কাঁদছেন।
এগিয়ে এসে চোখের জল মুছিয়ে দিয়ে জিজ্ঞেস করল কি হয়েছে মা। তুমি কাঁদছ কেন। শ্যামলী  নিজেকে সামলে নিয়ে বলে না বাবা তোমার মুখে মা বলে ডাকটা আমাকে তৃপ্তি দিল। অনেক দিন এত আন্তরিক ভাবে মা ডাকটা শুনি নি তাই আরকি! কথাটা শেষ হতে না দিয়ে জামিল বলে কেন আপনার সন্তান এভাবে মা বলে ডাকেনা?  ডাকত এখন আর ডাকেনা আর  এখন শুধু ওদের বাড়ির দিকে মন আমি ওদের কাছে ব্রাত্য। আচ্ছা বাবা তুমি আমাকে মা বলে ডাকলে কেন? জামিল বলল ছোটবেলায় ওর বাবা মারা যান। তারপর ওর মা  ওকে রেখে অন্য একজনের  সাথে চলে যায়। তারপর থেকে ওর আশ্রয় এই শিয়ালদহ।  এখানেই বড় হওয়া তারপর  এখানকার দাদারা যারা আমাকে ছোট থেকে মানুষ করেছে তারই আমাকে এই ছোট্ট দোকানটা করে দিয়েছে। তাতে চা আর টিফিন করেই আমার একার পেট চলে যায়। তবে মা একটা কথা বলব আপনি যদি আমার কাছে থেকে যান তাহলে কি খুব অসুবিধা হবে। আমি মায়ের স্নেহ পাইনি কোন দিন। আপনি থাকলে আমি আমার মাকে তো পাব। আর আপনাকে আর কোথাও যেতে হবে না। শ্যামলী মন্ত্রমুগ্ধের  মতো ওর কথা গুলো  শুনছিল। একটু চিন্তা করে বলল ঠিক আছে। জামিল দোকান বন্ধ করে নতুন মাকে নিয়ে চলে গেল ওর ভাড়ার বাড়িতে। 


বানীব্রত
পশ্চিম বঙ্গ, ভারত

 

এই লেখকের অন্যান্য লেখা


বিষয়: বানীব্রত


আপনার মূল্যবান মতামত দিন:


Top