সিডনী মঙ্গলবার, ২৪শে নভেম্বর ২০২০, ১০ই অগ্রহায়ণ ১৪২৭

ফেরা : ডঃ গৌতম সরকার


প্রকাশিত:
২৮ অক্টোবর ২০২০ ১৭:১৮

আপডেট:
২৮ অক্টোবর ২০২০ ১৭:২০

 

তিরিশ বছর আগে যখন বাড়ি বানিয়ে ছেলে বউকে নিয়ে বিপুলবাবু এই অঞ্চলে বাস করতে এসেছিল তখন সত্যিসত্যিই এখানে রাতের বেলায় শেয়াল ডাকতো। মিতালী প্রথম থেকেই এই গণ্ডগ্রামে বাড়ি তৈরীর ব্যাপারে আপত্তি জানিয়ে আসছিলো। কলকাতার এক চিলতে এজমালি বাসা বাড়িতে কোনরকমে চালিয়ে নিতেও রাজি ছিলো। কিন্তু সুপর্ণ একটু বড় হতেই বিপুলবাবু আর ঝুঁকি নিতে ভয় পেল। আধাবস্তির সেই বাসস্থান মাঝেমাঝেই অশ্রাব্য ভাষা, কুৎসিত ইশারা, অসামাজিক কাজকর্ম আর পারস্পরিক ঝগড়া-কাজিয়াতে অসহনীয় হয়ে উঠতো। অফিসের প্রভিডেন্ট ফান্ড থেকে লোন নিয়ে জায়গাটা আগেই কিনে রেখেছিল। পরে সরকারি চাকরির সুবাদে ব্যাঙ্ক লোন পেতে অসুবিধা হয়নি। সেই লোন পাবার দুবছরের মাথায় কোনরকমে দুটি ঘর, বাথরুম আর রান্নাঘরটা করে উঠে এসেছিল। তাও তখন বাথরুম আর রান্নাঘরটা ঢালাই করে উঠতে পারেনি।

এখানে এসে প্রথমেই যে সমস্যাটা দেখা গেল সেটা হলো বাপটুর স্কুল। এই তল্লাটে একটাও ভালো স্কুল ছিলনা। মিতালীর স্বপ্ন ছিলো ছেলেকে ভালো স্কুলে (ইংলিশ মিডিয়াম হলে তো কথাই নেই) পড়াবেন। তাদের জীবন যেভাবেই কাটুক, ছেলের ভবিষ্যৎ উনি সোনার পাতে মুড়ে দিতে চেয়েছিলেন। তারপর তো আরও শতেক সমস্যা- বাজারহাট নেই, নেই একটা সিনেমাহল, স্থানীয় হাসপাতালে পাঁচ কিলোমিটার দূরে, মোড়ের মাথায় এক বৃদ্ধ হোমিওপ্যাথ ডাক্তারই এই অঞ্চলের ভরসা। প্রথম প্রথম মিতালীর মনে হতো তাদের যেন হাতে-পায়ে দড়ি বেঁধে মাঝ গঙ্গায় ফেলে দেওয়া হয়েছে। সবথেকে অসহায় লাগতো স্বামী অফিস বেরিয়ে যাওয়ার পর, সারাদিন ওই ছেলেকে নিয়ে একা একা সময় কাটতো। আশেপাশে কোনো বাড়িই ছিলোনা তো প্রতিবেশী দূরের কথা। দু- কিলোমিটার দূরে রেলস্টেশন, বাইরের পৃথিবীর সাথে যোগাযোগের একমাত্র মাধ্যম। প্রথম দিকে এত লোডশেডিং হতো যে বাধ্য হয়ে আবার হ্যারিকেন-লন্ঠনের পুরনো অভ্যাসে ফিরে যেতে হয়েছিল।

আস্তে আস্তে সেই গন্ড গ্রাম আধা শহর থেকে পাকাপাকি একটা শহর হয়ে উঠলো। আড়ে-দৈর্ঘ্যে বাড়তে বাড়তে এখন তো বেশ ঘিঞ্জি হয়েই উঠেছে। বাড়িঘর, দোকানপাট, বাজার, শপিং মল, মাল্টিপ্লেক্স, বাস-গাড়ি- মানুষের ভিড়ে এখনতো নাভিশ্বাস ওঠার জোগাড়। শত অসুবিধার মধ্যে থেকেও জায়গাটি ধীরে ধীরে নিজের জায়গা হয়ে উঠেছিলো। এখানকার স্কুল থেকেই ভালোভাবে পাশ করে বাপটু যাদবপুরে ইলেকট্রিক্যাল ইঞ্জিনিয়ারিং পড়তে গেলো। এখানে থাকতে থাকতেই মানুষটা চাকরি থেকে অবসর নিলো, তার কয়েকবছর পর এই বাড়ি থেকেই চলে গেলো। চাকরি করতে করতেই এই বাড়ি দোতলা হয়েছে, দোতলাটা যত্ন করে ক্ষমতার বাইরে খরচ করে ছেলে আর বৌমার জন্যে বানিয়েছিলেন। এসব ভাবলেই মিতালীর মুখে এক বিষাদের হাঁসি খেলে যায়। কোথায় ছেলে, কোথায় তার বউ আর কোথায়ই বা সেই মানুষটা ! এখন গোটা বাড়িতে লাঠি ধরে ধরে সাদা থান পড়া এক প্রেতিনী ঘুরে বেড়ায়।

আজ সকাল থেকে মিতালীর শরীরটা বেশ খারাপ লাগছে। জ্বর জ্বর ভাব, গলা ব্যথা, নিঃশ্বাসে কষ্ট। সকালবেলা উঠে স্নান সেরে কোনরকমে ঠাকুরকে একটু জল দিয়ে আবার বিছানা নিয়েছে। মালতি তো কদিনই আসছেনা, কি এক মরণ ভাইরাস এসেছে, সব কাজকর্ম বন্ধ করে দিতে হয়েছে। মিতালির মাথায় এসব ঢোকেনা, এত ডাক্তার চতুর্দিকে, বিজ্ঞান নাকি খুব উন্নতি করেছে, চাঁদে, মঙ্গলে মানুষ যাচ্ছে ! আর কোথাকার কি এক রোগ এসেছে, কেউ তাকে কাবু করতে পারছেনা ! কি জানি বাবা ! বিছানায় শুয়ে এইসব ভাবতে ভাবতে বেশ কষ্ট হতে লাগলো, কষ্টের মধ্যেই কখন যেন চোখ দুটো বুজে এলো।

খুব ধুমধাম করে ছেলের বিয়ে দিয়েছিল বিপুল আর মিতালী। ইঞ্জিনিয়ার ছেলের জন্য বড়লোকের একমাত্র মেয়েকে বউ করে নিয়ে এসেছিল। তখন ছেলের গর্বে বিপুলবাবুর পা মাটিতে পড়তোনা। সব জায়গাতেই প্রসঙ্গ উঠুক বা না উঠুক ছেলেকে নিয়ে জাহির করতো। মিতালীর সবসময় ভালো লাগতোনা, দুয়েকবার বিপুলকে এ নিয়ে আপত্তির কথা জানিয়েছে। সেসব কথা শুনে মানুষটা আরো জাঁক করে বলতো, "আরে বহু কষ্ট করে গাছে একটা অতীব উচ্চমানের ফল ফলিয়েছি, লোককে দেখাবো না !" মিতালী চুপ করে যেত, কিন্তু বাড়াবাড়িটা তার ভালো লাগতোনা। ছেলের বিয়ে হলো, বৌমা ঘর করতে এলো। বৌমাকে পেয়ে তাদের দুজনেরই নিজেদের মেয়ে না থাকার দুঃখ দূর হলো। কিছুদিন স্বপ্নের মতো কাটলো। কয়েকমাস পর থেকে কেমন যেন তাল কাটতে শুরু হলো, সংসারের স্বাভাবিক ছন্দগুলো হোঁচট খেতে লাগলো, বেঁচে থাকার দৈনন্দিন শব্দগুলি কেমন অন্য সুরে বাজতে লাগলো। এর মধ্যে একদিন বাপটু এসে মাকে মৃদুস্বরে নালিশ জানালো, " বাবা বাজার থেকে কি সব চারাপোনা নিয়ে আসে, আকৃতির ওই কাঁটামাছ খেতে খুব অসুবিধা হয়।" মিতালী তাড়াতাড়ি বলে ওঠেন, "সে কি! তা আগে বলিসনি কেন, আচ্ছা আমি তোর বাবাকে বলে দেবো।" সেই শুরু, তারপর আস্তে আস্তে ঘরের রং, চালের কোয়ালিটি, রংচটা পর্দা, সোফা-কুশন, ঝুলপড়া রান্নাঘর, মান্ধাতা আমলের টিভি, এসির অভাব এবং সর্বোপরি শ্বশুর মশাইয়ের বাঙাল টানে কথাবলা সব কিছু নিয়ে আপত্তি মুদিখানার ফর্দের মতো বাড়তে লাগলো। ধীরে ধীরে বাড়িতে নতুন নতুন জিনিসের আমদানি হতে লাগলো- এল.ই.ডি টিভি, এসি মেশিন, ওয়াশিং মেশিন, দামি কোম্পানির সাউন্ড সিস্টেম, নামি রেস্টুরেন্টের হোম ডেলিভারি ; তবে সবকিছুই বাইরের দরজা দিয়ে ঢুকে বসার ঘর পেরিয়ে সিঁড়ি বেয়ে ওপরে উঠে যেতে লাগলো। মিতালী-বিপুল দুজনেই বুঝেছিলেন এত পয়সা দিয়ে দোতলার মেঝেয় পাথর বসানো, টালি বসানো বড় বাথরুম, খোলা চওড়া বারান্দা সব কিছুই জলে গেল। কয়েকমাস বাদে বাবার অসুখের দোহাই দিয়ে জিনিসপত্র বোঝাই করে ছেলের হাত ধরে বৌমা নিজের বাপের বাড়ি গিয়ে উঠলো। আর বাড়ির মানুষটা, যে অকারণে যেখানে সেখানে গলা তুলে কৃতি ছেলের জাহির করে বেড়াতো সেই লোকটা লজ্জায়, অপমানে বাড়ির বাইরে বেরোনোই ছেড়ে দিলো। সপ্তায় একদিন কি দুদিন মাথা নিচু করে বাজারে যেত, তারপর সারাটা সময় নিচের একচিলতে বারান্দায় হাতল ভাঙা একটা কাঠের চেয়ারে বসে থাকতো। ওরা বাড়ি ছেড়ে যাওয়ার ঠিক দুবছরের মাথায় ম্যাসিভ সেরিব্রাল এটাকে ডাক্তার-বদ্দি করার কোনো সুযোগ না দিয়ে মানুষটা চলে গেলো। বাবার মুখাগ্নি করতে ছেলে এসেছিলো, কিন্তু বাবার কাজ করতে আসেনি। কলকাতায় করবে বলে গেলেও , শুনেছে কাজটা সে কালীঘাটেই সেরেছে।

ফোনটা অনেকক্ষণ থেকে বাজছে ; কিন্তু কোনোভাবে আওয়াজটা কমে গেছে তাই জ্বরের ঘোরে শুনতে পায়নি। মাথাটা সাংঘাতিক ধরে আছে। মাথা তুলতে কষ্ট হচ্ছে, সারা গায়ে অসহ্য ব্যাথা। হাতড়ে হাতড়ে বালিশের পাশ থেকে চশমাটা নিয়ে চোখে দিলো। মোবাইল স্ক্রিনে দেখলো মালতীর ফোন। তিনবার করেছে , মেয়েটা আসতে না পারলেও রোজ একবার করে ফোন করে খোঁজখবর নেয় আর ওর বর এর মধ্যে দুবার এসে দোকানপাট করে দিয়ে গেছে। সে বেচারি রিকশা চালাতো, এখন এই লকডাউনে তাকেও ঘরে বসে থাকতে হচ্ছে। মালতীকে ফোন করলো, ওদিকে রিং হয়ে গেলো কেউ ধরলোনা। মোবাইল বিছানায় রেখে আবার বালিশে মাথা দিয়ে চোখ বুজলেন।

খুব ফুলের শখ ছিল বিপুলের, আর মিতালীর ফল-সবজির। দুজনে মিলে সামনের একচিলতে আর পিছনের জায়গাটায় কতরকম গাছ যে ফলিয়েছে। মিতালী তো সংসারের কাজ সেরে প্রায় সারাদিন ওই গাছ-গাছালি নিয়েই পড়ে থাকতো। বিপুল অফিস আর ছেলেটা স্কুলে চলে গেলে তার হাতে অফুরন্ত সময় থাকতো, মনের আনন্দে বাগান পরিচর্যা করতো। শনি-রবিবার বিপুল এসে হাত লাগাতো। শীতকালে এত সব্জি ফলতো যে বাজারে প্রায় যেতেই হতনা। শুধু নিজেরাই খেতনা, আশে পাশের বাড়িকে দিয়েও বেঁচে যেত। মালতী বলতো, "মাসিমা তোমার হাতের খুব গুণ, তুমি গাছ বসালে ফলপাকুর দোনো হয়ে ফলে।" বিপুলও মালতীকে সমর্থন করতো। মিতালীর খুব ভালো লাগতো। ফোনটা এবার কর্কশ স্বরে বেজে উঠলো, মালতী ফোন করেছে। কথা বলতে কষ্ট হচ্ছে, কোনরকমে নিজের শরীরের কথা বলে ফোন ছেড়ে দিলেন। এবা একবার ওঠা দরকার, বাথরুমে যেতে হবে। বিছানা থেকে উঠে মেঝেতে পা দিতেই মাথাটা ঘুরে গেলো, তাড়াতাড়ি খাটের বাজু ধরে সামলালেন, বেশ কিছুক্ষণ চোখে অন্ধকার দেখলেন। খাট থেকে বাথরুমে যেতে যেতে মনে হলো কত শত-সহস্র মাইল বন্ধুর পথ অতিক্রম করতে হচ্ছে।

বিপুলের মৃত্যুর পর চারদিককার রঙিন পৃথিবীটা এক ফুৎকারে সাদা-কালো হয়ে গেলো; আশ্বর্য্যজনক ভাবে চারদিককার শব্দগুলোও কেমন যেন কমে গেলো। আগে এই শহরের অজস্র, অযাচিত শব্দে প্রাণ ওষ্ঠাগত হয়ে উঠতো, কিন্তু যেদিন থেকে মিতালী এই বাড়িতে একদম একা হয়ে গেলো, সেদিন থেকে থমথমে এক নিস্তব্ধতা তাকে গ্রাস করতে শুরু করলো। মাঝেমাঝে সেটা যখন ভয়ংকর হয় গলা টিপে ধরতে যায় তখন মিতালী প্রাণ বাঁচাতে একফালি বারান্দার হাতল ভাঙা চেয়ারটায় গিয়ে বসে। আকুল প্রতিজ্ঞায় বহমান জীবনের স্রোত থেকে একমুঠো উষ্ণতা চুরি করে নিজের ঠান্ডা হয়ে যাওয়া বুকটা একটু সেঁকতে চায়। খুব ভালো লাগে লোকজনের ব্যাস্ত হাঁটাচলা , ফেরিওলাদের হরকরা শুনতে। আর সবচেয়ে ভালোলাগে বাচ্ছা বাচ্ছা ছেলেমেয়েগুলোর রংবেরংয়ের ইউনিফর্ম পরে পিঠে ঢাউস ব্যাগ ঝুলিয়ে স্কুলে যাওয়া দেখতে। বাপটুর ছোটবেলার কথা মনে পড়ে যায়। এখন এই অঞ্চলে অনেক ভালো ভালো স্কুল হয়েছে। তখন ছিল ওই সবেধন বিনোদবিহারী হাই স্কুল। সাদা জামা আর নেভি ব্লু প্যান্ট পড়িয়ে হাতে টিনের সুটকেস নিয়ে বাপটু তাঁর হাত ধরে স্কুলে যেতো। স্কুলের গেট দিয়ে ঢুকেও ঘুরে ঘুরে মাকে দেখতো। মিতালী সরে না গেলে ভিতরে ঢুকে গেটের দিকে তাকিয়ে ঠায় দাঁড়িয়ে থাকতো। বাধ্য হয়ে হাত নেড়ে মিতালীকে সরে আসতে হত।

বাথরুম সেরে ইচ্ছে হলো একটু বারান্দায় গিয়ে বসে। আর শুয়ে থাকলেই তো হবেনা, এই পোড়া পেটের জন্যে কিছু তো একটা ব্যবস্থা করতে হবে। জ্বরটা বেড়েছে মনে হচ্ছে ; ফ্রিজে গণেশের এনে দেওয়া দুধ আছে। সেটা গরম করে একমুঠো মুড়ি ছড়িয়ে খেয়ে নিলেই হবে। খেয়েদেয়ে একটা ক্যালপল খেয়ে নেবে। ধীরে ধীরে দেওয়াল ধরে বারান্দায় এলেন। বাইরে জষ্ঠি মাসের চড়া রোদের দিকে তাকিয়েই চোখ বুজে ফেলল, মাথাটা যেন আরো বেশি ধরে গেলো। পা ঘসে ঘসে চেয়ারে গিয়ে বসলো। সামনের রাস্তায় জনপ্রাণীও নেই, কুকুরগুলোও এই মহামারীতে কোথায় গিয়ে আশ্রয় নিয়েছে কে জানে! সব দোকানপাট বন্ধ। অনেকক্ষণ ঝিম মেরে বসে রইল । সম্বিত ফিরলো কলিং বেলের আওয়াজে। কে আবার এলো! এ ঘন্টা তো বহুদিন বাজেনি। কিন্তু সমস্যা হলো এখন গিয়ে দরজা খোলা। এই শরীরে এতটা গিয়ে দরজা খোলার কথা ভাবতেই ভয় পেয়ে গেল। ওদিকে উপর্যুপরি ঘন্টা বেজে চললো। মনে মনে সব শক্তি যোগাড় করে টলমল করতে করতে উঠেও আবার টাল সামলাতে না পেরে বসে পড়ল। এবার মোবাইলটা বাজতে শুরু করলো, সেটাও বিছানায় রেখে এসেছে। মিতালী অসহায় বোধ করল। গলা তুলে সাড়া দেবার মত শক্তিও অবশিষ্ট নেই। অসহায় কষ্টে ও নিজের অপারগতায় কেঁদে ফেলল মিতালি। চোখ বুজে ভগবানের কাছে শক্তি ভিক্ষা করতে লাগল। এমন সময় কচি একটা গলা ভেসে এলো গ্রিলের বাইরে থেকে, "দিদা, তুমি এখানে! আর আমি কখন থেকে তোমার ঘরের বেল বাজাচ্ছি।" মালতির মনে হলো স্বয়ং ঈশ্বরই মালতির ছেলের বেশে এসে ওনাকে এ বিপদ থেকে রক্ষা করলেন। ছেলেটির হাতে একটা টিফিন বাক্স, সেটা গ্রিলের জানলার ভিতর দিয়ে গলিয়ে বললো, "তোমার জ্বর, রান্না করতে পারবেনা, মা তাই তোমার খাবার পাঠিয়ে দিলো।" মিতালী অবাক হয়ে বললেন, " তোকে কেন পাঠালো, তোর বাবা কোথায়?" ছেলেটি উত্তর করলো, "বাবাই আসছিলো, কিন্তু পাড়ার কাকুগুলো বাবাকে বকে ঘরে পাঠিয়ে দিয়েছে। তারপর আমি মাকে বললাম, আমি পারবো। কাকুগুলো যেই ক্লাবঘরে ঢুকেছে , আমি এক ছুট্টে চলে এসেছি।" মিতালীর আধা সিক্ত চোখ আবার জলে ভরে উঠলো । হাত বাড়িয়ে ছেলেটির মাথা ছুঁতে গিয়েও হাতটা টেনে নিলেন। সারাক্ষণ টিভিতে 'সোশ্যাল ডিস্ট্যান্সিং' না কি একটা কথা বারংবার বলছে। বাক্সটা নিয়ে হাতটা একটু ওপরে তুলে ফিসফিস করে কি বললেন সেটা বাচ্চাটির কানেও গেলনা। ও হাত তুলে "আসছি" বলে এক দৌড়ে বাড়ির পিছন দিকে চলে গেলো।

পরের দুটো দিন মিতালির জীবন থেকে কিভাবে বাদ হয়ে গেলো টের পেলোনা। সেদিন কখন এবং কিভাবে বারান্দা থেকে ঘরে পৌঁছেছিল এবং তারপর কি হয়েছিলো সেটা তার স্মৃতি থেকে একেবারে মুছে গেছে। যখন চেতনায় ফিরেছিল তখন নিজেকে এক দুধ সাদা জগতে আবিষ্কার করেছিল। সাদা ধবধবে বিছানায় তিনি নিজেও সাদা শার্ট আর প্যান্ট পরে শুয়ে আছেন। গায়ের ওপর পাটভাঙা সাদা সুতির চাদর। মাথার ওপর অনেকগুলো বোতলের মতো জিনিস উল্টো করে ঝোলানো, আর তার থেকে সরু সরু নল বের হয়ে এসে তার শরীরের বিভিন্ন অংশের সাথে যুক্ত হয়েছে। কিছুক্ষণ পর সিস্টারদের কাছ থেকে জানলো প্রচন্ড জ্বর নিয়ে অজ্ঞান অবস্থায় তাঁকে এখানে ভর্তি করা হয়। আজ দুদিন পর তাঁর জ্ঞান ফিরেছে, কিছুক্ষন পর ডাক্তারবাবু এলেন। অল্পবয়সী একটি ছেলে, চোখেমুখে বুদ্ধি ঝকঝক করছে। হাঁসি মুখে বললো, " মা, আর কোনো চিন্তা নেই, তোমার করোনা রিপোর্ট নেগেটিভ এসেছে। সাধারণ জ্বরই হয়েছিলো, কিন্তু তোমার শরীর খুব কমজোরি, নিশ্চয়ই খাওয়াদাওয়া ঠিক মতো করোনা! তাই এই জ্বর তোমার মাথায় চড়ে বসেছিলো। বাড়িতে ছেলেমেয়ে তোমায় বকেনা !" মিতালী ম্লান হাঁসে। ডাক্তার ছেলেটি চিকিৎসা চালানোর পাশাপাশি কথায় কথায় মিতালীর জীবনের অনেক কথাই শুনে ফেললো। যাবার সময় ডাক্তার ছেলেটি বললো, "তোমার ছেলে কী তোমার শরীর খারাপের কথা জানে?" মিতালীর ফ্যালফেলে বোবা দৃষ্টি দেখে নিজেই বললো, "ঠিক আছে আজ সারাদিন ভালো মেয়ে হয়ে থাকো, কালকে তোমাকে ছেলের সাথে কথা বলিয়ে দেবো।" ডাক্তার চলে যাবার পর মিতালীর অসুস্হ মাথায় শত প্রশ্নের হুড়োহুড়ি শুরু হল। তার ঠিক কি হয়েছিল, কে তাকে এখানে নিয়ে এলো, সবচেয়ে বড় কথা ঘরতো ভিতর থেকে বন্ধ ছিল, তাহলে খুলে দিল কে ! বাপটু কি খবর পেয়ে এসেছে, ওই তাকে এখানে এনেছে ! এটাতো মনে হচ্ছে হসপিটাল নয়- বেশ ছিমছাম, পরিষ্কার-পরিচ্ছন্ন, স্টাফেরাও খুব বিনীত এবং দায়িত্বশীল। বিকেলে ভিজিটিং আওয়ারে তাঁর উদগ্রীব দুটো চোখ ভিজিটরসদের মধ্যে তার বাপটুকে খুঁজে বেড়াতে লাগলো। অবশেষে সাদা দেওয়াল আর ততোধিক সাদা পর্দায় ধাক্কা লেগে তার দৃষ্টি আবছা দুটি অবয়বের ওপর স্থিত হলো। চাদরের খুঁটে চোখ পরিষ্কার করে দেখলেন মালতী আর বাদল হাঁসি মুখে সামনে দাঁড়িয়ে। মালতীর মুখ থেকেই সব শুনলেন। ভাগ্যিস মেয়েটিকে কদিন আগেই মেডিক্লেমের ফাইলটা চিনিয়ে রেখেছিলো।

পরের দিন আবার ডাক্তার ছেলেটি এলো। প্রাথমিক চিকিৎসা সেরে কথামতো নিজের মোবাইল থেকে বাপটুর নাম্বার জেনে ফোন লাগালো। নিজের পরিচয় দিয়ে মিতালীর শারীরিক অবস্থার কথা জানালো। চিন্তার কিছু নেই সেটাও জানিয়ে দিলো। তারপর মিতালীকে ফোনটা এগিয়ে দিল কথা বলার জন্যে। মিতালী দুর্বল গলায় ছেলের শরীরের, অফিসের কাজের খবর নিতে লাগলেন। ডাক্তার ছেলেটি হাঁ করে মিতালীর মুখের দিকে তাকিয়ে রইলো। মিতালী শেষ করল, "হ্যাঁ, হ্যাঁ, সব ঠিক আছে তুই চিন্তা করিসনা বাবা, আমি ভালো আছি।" ডাক্তার ছেলেটি ফোন না কাটতে ইশারা করল। মিতালীর হাত থেকে ফোনটা নিয়ে একটু হেঁসেই বলল, " আরে সুপর্ণবাবু, মা অসুস্থ এসে একটু দেখে যান।" ও প্রান্ত থেকে বাপটু কি বললো বোঝা গেলোনা। ডাক্তারবাবু বলল, " আরে এই তো পঁচিশ-তিরিশ কিলোমিটার রাস্তা ! কতটুকুই বা সময় লাগবে ! তাছাড়া আপনার তো নিজের গাড়ি আছে !" তারপর কি কথা হলো মিতালী বুঝতে পারলোনা, তবে দেখতে পেল ডাক্তারবাবুর মুখটা হঠাৎ গম্ভীর হয়ে গেলো। যাওয়ার সময় মিতালীকে কোনো কথা না বলেই চলে গেল।

দুদিন পর মিতালীর ছুটি হলো। এতদিন রোজ মালতি আর বাদল এসেছে। ডাক্তারের সঙ্গে দেখা করে কথাও বলেছে। আজ রিলিজের সময় বাদল পাড়ার একটি ছেলেকে সঙ্গে করে নিয়ে এসেছে। বেচারীতো বেশি দূর লেখাপড়া শেখেনি, প্রেসক্রিপশন, ডাক্তারের নির্দেশ ও পথ্য বোঝা, তার ওপর মেডিক্লেমের কাগজপত্র মাফিক হিসেবনিকেশ বুঝে নেওয়া ওর পক্ষে সম্ভব নয়। আর মালতী আজ মিতালীর বাড়িটা পরিষ্কার করে সাজিয়ে গুছিয়ে রাখছে , তারপর ডাক্তারের নির্দেশমতো পথ্যেরও জোগাড় করছে। বাড়ি ফিরে মিতালীর মনে হলো তাঁর পুনর্জন্ম হলো। বাদলের সাথে যে ছেলেটি হসপিটালে গিয়েছিলো সে ছেলেটি ওদের পাড়ার ক্লাবের সেক্রেটারি। তার সাথে গিয়ে বাদল এলাকার কাউন্সিলরের সাথে কথা বলে মালতির মিতালীর বাড়িতে কাজে আসার পারমিশন জোগাড় করেছে। মালতি এখন সারাটাদিন মিতালীর সঙ্গে সঙ্গে থাকে। স্নান করানো, খাওয়ানো সব কিছু করে দেয়। রাত্রের খাবারের জোগাড় করে হাতের কাছে রেখে বুঝিয়ে দিয়ে সন্ধ্যের পর বাড়ি ফেরে। একবার জিজ্ঞাসা করেছিলো রাত্রে বাদল এসে শোবে কিনা, মিতালী না করে দিয়েছে। এমনিতেই এদের কাছে তার ঋণের শেষ নেই ; তার এই নবজন্ম তো এদের হাত দিয়েই হয়েছে। তাছাড়া এই বয়সে সবসময়ে কাপড়চোপড় ঠিকঠাক থাকেনা, সেখানে ঘরে একজন পুরুষমানুষের উপস্থিতি তাঁর অস্বস্তি বাড়াবে বই কমাবেনা।

হাসপাতাল থেকে ফিরে দুদিন চলে গেল ছেলের কোনো ফোন এলোনা ; আবার বিষাদের হাঁসি খেলে গেল রোগশীর্ণ মুখটি জুড়ে। ছোটবেলায় তার শরীরের সাথে লেপ্টে থাকা শিশুগন্ধে গোটা ঘরটা ভরে গেলো। বড় হওয়ার পরও ছেলেটা  কথা নেই বার্তা নেই হঠাৎ হঠাৎ করে মাকে জড়িয়ে ধরে বুকে মাথা গুঁজে জোরে জোরে নিঃশ্বাস নিতো। মিতালী হেঁসে জিজ্ঞাসা করতো, "কি রে পাগলা ছেলে, কি হলো?" ও বলতো, "চুপ করো, তোমার গায়ের গন্ধ নিচ্ছি। মা তোমার গা থেকে সবসময় ফুলের গন্ধ আসে, কিন্তু কোন ফুলের গন্ধ বুঝতে পারিনা।" মিতালী হেঁসে ছেলেকে আরো জোরে বুকের মধ্যে চেপে ধরতো। অজান্তেই একটা দীর্ঘশ্বাস বেরিয়ে আসে, চোখের কোন দুটো ভিজে গেলো। হাত বাড়িয়ে মোবাইলটা নিয়ে ছেলের নাম্বার ডায়াল করলেন। অনেকক্ষণ রিং হওয়ার পর বাপটু ফোন তুললো। কিন্তু ওর গলা শুনে মিতালী চমকে উঠলো। উদ্বেগ চাপতে না পেরে উনি ফোনেই চিৎকার করে উঠলেন, " তোর কি হয়েছে বাবা! তোর গলাটা এমন শুনতে লাগছে কেন?" ওপ্রান্ত কিছুক্ষণ চুপ করে থাকে……

"বাপটু, বাপটি, তুই কি আমার কথা শুনতে পাচ্ছিস?"

এবার ছেলে কথা বলে, "হ্যাঁ পাচ্ছি।"

"তবে কথা বলছিস না কেন, কি হয়েছে তোর!"

"আরে তেমন কিছু নয় , ওই একটু জ্বর হয়েছে।"

মিতালী টেলিফোনে কাশির আওয়াজ পেলেন।

"আরে, তোর তো কাশিও হয়েছে, ডাক্তার দেখিয়েছিস, ওষুধ খেয়েছিস?"

"হ্যাঁ, খেয়েছি।"

"কিন্তু ডাক্তার দেখানোটা খুব জরুরি। চতুর্দিকে যা সব শুনছি, আমার বুকটা কাঁপছে বাবা!"

সুপর্ণ বিরক্ত হলো, মুখে বললো, "আরে কিছু হবেনা, দুএকদিনেই ঠিক হয়ে যাবে, এখন তুমি ছাড়ো", এই বলে ফোন কেটে দিলো।

মিতালীর আশপাশের পৃথিবী আবার টলমল করতে লাগলো; কি করবেন বুঝে উঠতে পারলেননা। আকৃতির সাথে কথা বলবেন ! কিন্তু তাইবা কিভাবে বলবেন ! ছেলের বউয়ের ফোন নাম্বার তো তার কাছে নেই। ফোন করলে তো আবার ছেলের মোবাইলেই করতে হবে। অশান্তি নিয়েই দিনটা কাটলো। খাওয়ার রুচি চলে গেল, মালতীর জোরাজুরিতে একটু কিছু মুখে দিতেই হলো। টেনশনে দুপুরে দুচোখের পাতা এক হলোনা। পাশের ঘরে মালতী টিভির ভলিউম আস্তে করে সিরিয়াল দেখছে। আর মিতালী আকাশ-পাতাল, বাস্তব-অবাস্তব চিন্তা আর আশঙ্কা নিয়ে সন্ধ্যা পার করে দিলো। মালতি চলে যেতে আবার ছেলেকে ফোন করলেন।

এখন মধ্যরাত। বহুবছর পর সদ্য মা হওয়ার অনুভূতি পঁয়ষট্টির মিতালীকে জুড়ে। পাশ থেকে যেন ছোট্ট শিশুর দুধ গন্ধ পাচ্ছেন। আনন্দ ঘোরে পাশ ফিরে বাঁহাতটা বাড়ালেন, শূন্য বিছানার ঠান্ডা স্পর্শে চমকে উঠলেন। চটকা ভেঙে রুঢ় বাস্তবে ফিরলেন। ভেবে পেলেননা একজন স্ত্রী কিভাবে অসুস্থ স্বামীকে একলা একটা ঘরে ফেলে রেখে পাশের ঘরে নিশ্চিন্তে ঘুমিয়ে পড়ে। এ কী রোগ যা স্ত্রীকে স্বামীর কাছে, ছেলেকে বাবার কাছে, মাকে সন্তানের কাছে যেতে বাধা দেয় ! একটা কথা ভেবে মিতালীর বুক হিম হয়ে গেল, ছেলেটার রাত্রে যদি বাড়াবাড়ি হয়, তাহলে ওকে কে দেখবে ! মন্দ আশঙ্কায় উনি ধড়মড় করে বিছানায় উঠে বসলেন, নিঃশ্বাসে একটা কষ্ট টের পেতে লাগলেন। একটু সময় লাগলো সামলাতে, তারপর অসহায়ের মতো ফুঁপিয়ে কেঁদে উঠলেন। কানের মধ্যে অসুস্থ ছেলের গলাটা বারবার বাজতে লাগলো। হাত বাড়িয়ে গ্লাস থেকে একটু জল খেয়ে নিজেকে সামলালেন। প্রায় জেগে জেগেই সারারাত কাটলো। ভোরের দিকে একটু ঘুমিয়ে পড়েছিল। ঘুম ভাঙতে অবচেতনেই ফোনটা আঁকড়ে ধরলো।

 

ফোন বেজে চললো কেউ ধরলোনা। রিং হয়েই চললো, রিং হয়েই চললো, হতে হতে থেমে গেলো। আবার বাজালেন, আবার বাজালেন, ফোন করেই চললেন, ফোন করেই চললেন, এটা চলতেই থাকলো, চলতেই থাকলো। মালতী এসে দেখলো একটা মানুষ বাসি মুখে, বাসি কাপড়ে, মশারির মধ্যে বসে পাগলের মতো মোবাইলের চাবি টিপেই চলেছে। এটা আগে কোনোদিন হয়নি, সে যখন আসে তখন মিতালীর স্নান সেরে পূজো অবধি হয়ে যায়। মালতী কিছু গন্ডগোল টের পেয়ে মিতালীর হাত থেকে মোবাইলটা নিয়ে নিল। জোর করে বিছানা থেকে মানুষটিকে বের করে বাথরুমে ঢুকিয়ে দিলো। এবার সে নিজেও কল করে দেখলো, দাদাবাবুর মোবাইলে পুরো রিং হয়ে গেল কিন্তু কেউ তুললোনা। ফোনটা নিজের কাছে রেখে মালতী রান্নাঘরে ঢুকে গ্যাসে চায়ের জল চাপালো।

এখন বিকেল চারটে বাজে। সকাল থেকে চেষ্টা করে সবেমাত্র মিতালীকে কিছু মুখে তুলতে রাজি করাতে পেরেছে ; তাও ছেলের চিকিৎসা শুরুর খবর পাবার পর। সকালে দাদাবাবুকে ফোনে না পাওয়ায় মালতীও ভয় পেয়ে গিয়েছিলো। ও সঙ্গে সঙ্গে ফোন করে বাদলকে খবরটা দেয়। এদিকে সকাল থেকেই কেঁদেকেটে মাসিমা শরীর খারাপ করে ফেলেছিলো। অবশেষে বেলা দশটার সময় দাদাবাবু ফোন তোলে, কিন্তু মাসিমার শত জিজ্ঞাসার কোনো উত্তর না দিয়ে শুধু বলতে পেরেছে,  “মা বড় কষ্ট, আমাকে তোমার কাছে নিয়ে যাও।" তারপর থেকে দিনভর যা চললো ! খাওয়ার কথা বলতেই ভয় পাচ্ছিল। মালতী ভাবে - এই দুনিয়ার কতকিছুই এখনো দেখা বাকি আছে ! নিজের স্ত্রী-সন্তান রোগের ভয়ে কাছে আসা তো দূরের কথা , দরজা খুলে খবরটা পর্যন্ত নিতে ভয় পাচ্ছে। এ ভদ্রলোকদের কি রকম সম্পর্ক ভগবান ! আজ বাদলেরা গিয়ে মানুষটাকে হাসপাতালে ভর্তি না করলে মানুষটা মরেই যেত। ঠিক তার পাশের ঘরেই মানুষগুলো খাচ্ছে-দাচ্ছে, ঘুমোচ্ছে, টিভি দেখছে,  ভাবতেই বুকখানা কেমন ফাঁকা ফাঁকা হয়ে গেল। মানুষটাকে নাকি দরজার পাল্লা একটুখানি খুলে খাবার আর জল এগিয়ে দিয়ে তড়িঘড়ি দরজা আটকে দিত। বাদলেরা যখন আজ গিয়ে জোর করে দাদাবাবুর ঘর খুলে ঢুকেছে, দেখেছে গত দুদিনের অভুক্ত খাবার থেকে পচা গন্ধ বেরোচ্ছে , চতুর্দিকে মাছি ভনভন করছে। সেই পরিবেশে বিছানার ওপর দাদাবাবুর শরীরটা এতটুকু হয়ে পড়ে আছে; জ্ঞান প্রায় নেই, নাড়িও খুব ক্ষীণ। সেই অবস্থায় হাসপাতালে নিয়ে গিয়ে করোনা পরীক্ষা করে প্রথমবারেই রোগ ধরা পড়েছে । মালতির বুকটা কেঁপে ওঠে ; বাদলতো মানুষটাকে প্রায় পাঁজাকোলা করে তুলে হাসপাতালে নিয়ে গেছে, তার ঘরেও তো একটা বাচ্ছা আছে। ভগবানের উদ্দেশ্যে হাত তুলে প্রার্থনা " ঠাকুর আমার বাছাকে ভালো রেখো, দাদাবাবুকে ভালো করে দাও।"

দুদিন পর থেকে ওষুধে কাজ হতে শুরু হলো। প্রথম দুদিন টানা অক্সিজেন দেওয়ার পর তৃতীয়দিন থেকে নিঃশ্বাসের কষ্টটা কমলো। বিকেল থেকে অক্সিজেন সিলিন্ডার সরিয়ে নেওয়া হলো। চতুর্থ দিন বাদলের ফোন থেকে মায়ের সঙ্গে কথা বললো সুপর্ণ। ছেলের গলা শুনে মায়েরও এতদিনের উদ্বেগ অর্ধেক হয়ে গেলো। এতদিন পর মায়ের শরীরের খবর নিলো ছেলে। তাতে মায়ের সব অসুস্থতা নিমেষের ফুৎকারে উবে গেলো। বৌমার ও তার বাবা-মায়ের খবর জানতে চাইতেই ছেলে চুপ মেরে গেল। পরে জানালো আকৃতি বাবাকে নিয়ে একদিন হাসপাতালে এসেছিল, ডাক্তারের সঙ্গেও নাকি দেখা করেছে। কিন্তু ওই একদিন ! এদিকে মালতী বাদলকে প্রায় রোজদিন এতটা পথ উজিয়ে পাঠাচ্ছে। ওদের পাড়ার ছেলেগুলো খুব ভালো ; ক্লাবের এম্বুলেন্স গাড়িটা খালি থাকলে ওরা বাদলকে সেটা ব্যবহার করতে দিচ্ছে। ওই যে ছেলেটি তাকে নার্সিং হোমে নিয়ে গিয়েছিল, সেই ছেলেটি একদিন বাড়িতে এসে বলে গেছে, "মাসিমা আপনি দাদার জন্যে একদম চিন্তা করবেননা , আমরা আছি।"

গত দুদিন ধরে আকাশ ভাঙা বৃষ্টিতে কলকাতা শহরের প্রায় অর্ধেকটা জলের তলায় চলে গিয়েছিল। এই হসপিটালের অবস্থাও সাময়িকভাবে অচল হয়ে পড়েছিল। অধিকাংশ স্টাফ আসতে পারেনি, আউটডোর বন্ধ ছিল, কয়েকজন ডাক্তার আর নার্স দৌড়াদৌড়ি করে গোটা হাসপাতাল সামলাতে গলদঘর্ম হয়েছে। তবে কাল থেকে মেঘ কেটেছে, শুনছে দুয়েক জায়গা বাদ দিয়ে জলও নেমে গেছে। সবচেয়ে মুশকিলে পড়েছিল মোবাইল নেটওয়ার্ক পুরোপুরি বন্ধ হয়ে যাওয়ায়। আর কালকেই ডাক্তারবাবু জানিয়ে দিয়েছেন আজ সুপর্নর ছুটি হবে। কাল বহু কষ্টে বাদলের লাইন পেয়েছিল সুপর্ণ। আজ বাদল আসবে এম্বুলেন্স নিয়ে। এর মধ্যে একদিন আকৃতি একলা এসেছিল সারা শরীর প্রটেক্টিভ গিয়ারে ঢেকে। অনেকটা দূর থেকে মুখোশের ভিতর থেকে কি বলছিলো তার এক বিন্দুও বুঝতে পারেনি সুপর্ণ, যদিচ শোনার মানসিকতাও ছিলনা। একবার দুর্বল কণ্ঠে তাতাইয়ের কথা জিজ্ঞাসা করেছিল, সেটা নিশ্চয়ই বর্ম ভেদ করে ওর কানে পৌঁছায়নি। তারপর তাড়াহুড়ো করে চলে গিয়েছিল। আজ সুপর্ণকে ছেড়ে দিচ্ছে সেটা কি আকৃতি জানে ! এখানে ভর্তি করার সময় আকৃতি ছিলোনা। হোম অ্যাড্রেস  আর ফোন নাম্বারের জায়গার নিশ্চয়ই আকৃতির বাড়ির ঠিকানা আর ফোন নাম্বারই দেওয়া হয়েছিল। আকৃতি কি আজ আসবে ! ছেলেটার জন্যে সুপর্ণর মনটা খুব খারাপ লাগতে লাগলো। কতদিন ছেলেটাকে দেখেনি !

সাড়ে বারোটার পর খাওয়ার শেষে সিস্টার এসে বিছানাটা নামিয়ে দিয়ে বলে গেলেন , " আধ ঘন্টা রেস্ট নিয়ে নিন। তারপর আপনাকে রেডি করে দেবো। আজ আপনার ছুটি তো ?"

সুপর্ণ মৃদু হাঁসল, মনে মনে ভাবলো হ্যাঁ ছুটিই বটে ! স্কুলে যখন পড়তো তখন পাঠ্য বইয়ে একটা কবিতা পড়তে হত, 'ছুটি', যতদূর মনে পড়ে রবি ঠাকুরের লেখা। সেই কবিতাটি পড়াতে গিয়ে বাংলার স্যার বীরেনবাবুর কথাগুলো এখনো স্পষ্ট মনে করতে পারে, " ছুটি শব্দটা আপেক্ষিক, চরম বা পরম ছুটি একমাত্র মৃত্যুতে পাওয়া যায়। আর বাদবাকি ছুটি কেবল ছুটে চলা। এক কর্ম থেকে আরেক কর্মে, এক ধ্যান থেকে আরেক ধ্যানে, এক শক্তি থেকে আরেক শক্তিতে। আসলে যে কোনো কর্মের সফল রূপদানই হলো ছুটি, সন্তুষ্টি, আত্মশুদ্ধি।" ঠিক দুটোর সময় সুপর্ণ নীচে নেমে এলো। লাউঞ্জ পেরিয়ে বাইরে এসে অনেকদিন পর এত বড় একটা আকাশ একসাথে দেখলো। মাথাটা একটু টলমল করছে। কতদিন পর এতটা পথ হাঁটলো ! হসপিটালের ছেলেটি এখনো তার হাত ধরে, তার অন্য হাতে একটা প্লাস্টিকের প্যাকেটে সুপর্ণর টুকটাক কয়েকটি জিনিস। বাইরে এসে চোখের চত্বরে একটা চেনামুখ খুঁজে বেড়ালেন, কিন্তু দৃষ্টির চার সমকোণ বিস্তারেও কাউকে খুঁজে পেলনা ৷ এমন সময় বাদল আর আরেকটি ছেলে হসপিটালের ভিতর থেকে বেরিয়ে এলো। বাদল এগিয়ে এসে বললো, " দাদাবাবু চলুন, এখানের সব ব্যাপার মিটে গেছে।" সুপর্ণ হাসপাতালের ছেলেটিকে হাঁসিমুখে বিদায় জানিয়ে সামনে দাঁড়ানো এম্বুলেন্সে উঠে বসলো।

এটা কি কাল! মাথাটা পুরো ফাঁকা হয়ে গেছে , কিছুতেই মনে পড়ছেনা। আকাশে রোদ থাকলেও জানলা দিয়ে আসা ঠান্ডা হাওয়ায় শরীরটা জুড়িয়ে যাচ্ছে। নীল আকাশের বুকে সাদা মেঘের ওড়াউড়ি দেখতে দেখতে শিউলি ফুলের গন্ধ নাকে এলো। আর সঙ্গে সঙ্গে মনে পড়ে গেল, আরে এখন তো শরৎকাল ! হিসেবমত দুর্গাপূজা তো কদিন পরেই। শিউলি গন্ধের দৈব স্পর্শে তার রোগক্লান্ত মুখও দিব্যকান্তি হয়ে উঠলো। চোখের সামনে ভেসে উঠলো তাদের বাড়ি, গেটের পাশে শিউলি গাছটা এই সময় ফুলের ভারে ঝুঁকে পড়তো। বাইরের মণ্ডপে ঢাক বাজছে, বাবা বারান্দায় হাতল ভাঙা চেয়ারটায় বসে চা খেতে খেতে খবরের কাগজ পড়ছে, আর মা স্নান সেরে ভেজা চুলে, লালপাড় সাদা শাড়ি পরে ফুল তুলছে। গোটা গাড়িতে শিউলি ফুলের গন্ধে ভরে উঠছে। বাদলরাও কি এই গন্ধ পাচ্ছে ! চোখ খুলে দেখলো ওরা গল্পেতে মত্ত, গন্ধ ওদের নাকে যাচ্ছে কিনা বুঝতে পারলোনা। রবীন্দ্র সদন পেরিয়ে গাড়ি হরিশ মুখার্জী রোড ধরতে গেলে সুপর্ণ চেঁচিয়ে উঠে আপত্তি জানালো, "ড্রাইভার ভাই, ডানদিক নিন ডানদিক।" বলে দ্বিতীয় হুগলী সেতুর দিকে ইশারা করলো। বাদলেরা কথা থামিয়ে তার দিকে অবাক হয়ে তাকিয়ে রইলো। তারপর বাদল বললো, " কি হলো আপনি বাড়ি ফিরবেন না?" সুপর্ণ মাথা নেড়ে বললো, " হ্যাঁ, বাড়িতেই তো ফিরবো, মায়ের বাড়ি।"

 

ডঃ গৌতম সরকার
লেখক, পশ্চিম বঙ্গ, ভারত

 

এই লেখকের অন্যান্য লেখা



আপনার মূল্যবান মতামত দিন:


Top