সিডনী মঙ্গলবার, ২৪শে নভেম্বর ২০২০, ১০ই অগ্রহায়ণ ১৪২৭

নভেরা আহমেদ: বাংলাদেশের আধুনিক ভাস্কর্যশিল্পের অগ্রদূত : ড. আফরোজা পারভীন


প্রকাশিত:
২৯ অক্টোবর ২০২০ ১৪:২৪

আপডেট:
২৪ নভেম্বর ২০২০ ১৮:১০

 

নভেরা আহমেদ (মার্চ ২৯, ১৯৩৯- মে ৬, ২০১৫) একজন বাংলাদেশী ভাস্কর। তিনি বাংলাদেশের আধুনিক ভাস্কর্যশিল্পের অন্যতম অগ্রদূত । বিংশ শতাব্দীর প্রথম বাংলাদেশী আধুনিক ভাস্কর। ১৯৯৭ সালে বাংলাদেশ সরকার তাঁকে একুশে পদক প্রদান করে। তিনি মৃত্যুর পূর্ব পর্যন্ত প্রায় ৪৫ বছর প্যারিসে বসবাস করেন।
ষাটের দশকের পিছিয়ে পড়া সময়ে অযুত বাধাবিপত্তি ডিঙিয়ে তিনি একজন ভাস্কর মহিলা হয়েছিলেন। সোনালি ফসল ফলিয়ে গেছেন এককভাবে। তাঁর অপার ক্ষমতা, শিল্পবোধ, শিল্পের প্রতি একনিষ্ঠ তন্ময়তা ও ভালোবাসা, অনুভূতি ও নান্দনিকতা তাঁকে করেছে ভাস্কর্যের ভুবনে অনন্য। এখনো তাঁর সৃষ্টি সাম্প্রতিক ও সময়ের সঙ্গে টিকে আছে তাঁর ধ্রুপদী গুণের কারণে।
নভেরার জন্ম বাংলাদেশের সুন্দরবনে মার্চ ২৯, ১৯৩৯ খ্রিষ্টাব্দে। চাচা তাঁর নাম রাখেন নভেরা। নভেরা ফার্সি শব্দ। অর্থ নবাগত, নতুন জন্ম। তাঁর বাবা সৈয়দ আহমেদ সুন্দরবন অঞ্চলে কর্মরত ছিলেন । তবে পৈতৃক নিবাস চট্টগ্রামের আসকারদিঘির উত্তর পাড়। তাঁর বাবা চাকরিসূত্রে কিছুকাল কলকাতায় অবস্থান করায় নভেরার শৈশব কেটেছে কলকাতা শহরে। বিদ্যালয়ে অধ্যয়নকালেই তিনি নাচ, গান শেখার পাশাপাশি মাটি দিয়ে মূর্তি তৈরী করতেন। এ সময় নজরুলের এক জন্মোৎসবে নভেরা চট্টগ্রামের জুবিলি হলে জয়জয়ন্তী রাগে বাজানো মিউজিকের সাথে এক ঘণ্টা নৃত্য পরিবেশন করেছিলেন।
তিনি কলকাতার লরেটা স্কুল থেকে প্রবেশিকা (ম্যাট্রিক) পাস করেন। ১৯৪৭ খ্রিষ্টাব্দে ভারত বিভাগের পর তাঁরা পূর্ব পাকিস্তানের (বর্তমান বাংলাদেশ) কুমিল্লায় চলে আসেন। এ সময় নভেরা কুমিল্লা ভিক্টোরিয়া কলেজে ভর্তি হন। পিতার অবসরগ্রহণের পর তাঁদের পরিবার আদি নিবাস চট্টগ্রামে গিয়ে স্থায়ীভাবে বসবাস শুরু করে। চট্টগ্রাম কলেজে ভর্তি হন তিনি। এরপর আইন শিক্ষার জন্য তাঁকে লন্ডন পাঠানো হয় ১৯৫০ খ্রিষ্টাব্দে। শৈশব থেকেই নভেরার ইচ্ছা ছিল ভাস্কর্য করার। তাই তিনি সেখানে সিটি অ্যান্ড গিল্ডস্টোন কার্ভিং ক্লাসে যোগ দেন। পরবর্তীতে ১৯৫১ খ্রিষ্টাব্দে ভর্তি হন ক্যাম্বারওয়েল স্কুল অব আর্টস অ্যান্ড ক্র্যাফটসে ন্যাশনাল ডিপ্লোমা ইন ডিজাইনের মডেলিং ও স্কাল্পচার কোর্সে। সেখান পাঁচ বছরের ডিপ্লোমা কোর্স করার পর ১৯৫৫ সালে তিনি ইতালির ফ্লোরেন্স ও ভেনিসে ভাস্কর্য বিষয়ে শিক্ষা গ্রহণ শুরু করেন।
১৯৫৪ খ্রিষ্টাব্দের জানুয়ারি মাসে নভেরা আহমেদ ফ্লোরেন্সে গমন করেন। সঙ্গে ছিলেন শিল্পী হামিদুর রহমান। প্রথমে তাঁরা শিল্পী আমিনুল ইসলামের আতিথ্য গ্রহণ করেন । পরে তিনজন একত্রে একটি স্টুডিওতে উঠে যান। নভেরা প্রায় দুই মাস শুধু ঘুরে দেখলেন। পাশ্চাত্যের চিত্রশিল্প ও ভাস্কর্যের ঘটনাবহুল সময়ে নভেরা ইংল্যান্ডে যান। ইংল্যান্ড ছাড়াও তিনি ইতালি ও প্যারিসে প্রাচীন ও আধুনিক ভাস্কর্যের সঙ্গে পরিচিত হওয়ার সুযোগ পেয়েছিলেন। তিনি সেজান, গগাঁ ও ভ্যান গঘের কাজ সম্পর্কে জানার, পড়ার সুযোগ পেয়েছিলেন। ক্যাম্বারওয়েল স্কুলের ড. ফোগেল, ভেন্তুরিনো ভেন্তুরির নামে এক ইতালীয় শিল্পীর কাছে নভেরার নাম উল্লেখ করে একটি চিঠি দিয়েছিলেন। এই শিল্পীর সাহচর্যে নভেরা দোনাতেলোসহ প্রাচীন কয়েকজন শিল্পীর কাজের সঙ্গে পরিচিত হন এবং দুই মাস তাঁর কাছে কাজ শেখেন। অতঃপর ফ্লোরেন্স থেকে ভেনিসে গেলেন নভেরা ও হামিদ এবং পরবর্তীকালে ভেনিস থেকে লন্ডন। ১৯৫৪ খ্রিস্টাব্দে ক্রিসমাসের ছুটিতে নভেরা ও হামিদ প্যারিসে রঁদার মিউজিয়াম দেখতে গিয়েছিলেন। ভাস্কর্যের ছাত্রী নভেরা স্বভাবতই অত্যন্ত অভিভূত হয়েছিলেন রঁদার কাজ দেখে।
একজন ভাস্কর্য শিল্পী হিসেবে নভেরা আহমেদের মূল প্রবণতা ছিল ফিগারেটিভ এক্সপ্রেশন। তাঁর কাজের প্রধান বিষয়বন্তু হচ্ছে নারী প্রতিমূর্তি। তবে নারী প্রতিমূর্তি নির্মাণে বিমূর্ততার দিকে ঝুঁকেছেন। কাজের স্টাইলের দিক থেকে তিনি ব্রিটিশ ভাস্কর হেনরী মূর-এর (১৮৯৮ - ১৯৮৬ খ্রি.) অনুবর্তী। পরবর্তীকালে আরো একজন ভাস্কর একইভাবে হেনরী মূর দ্বারা প্রভাবান্বিত হয়েছেন। তিনি হলেন জুলিয়া কেইক (১৯৭৩ - )। নভেরা আহমেদ এবং জুলিয়া কেইক-এর কাজের মধ্যে আশ্চর্যজনক সমিলতা রয়েছে।
সমসাময়িক পুরুষ শিল্পীরা ইউরোপীয় ইন্দ্রিয় সুখাবহ নারীদেহে একটি রোমান্টিক ইমেজ দেবার চেষ্ট করেন। এমনকি জয়নুল, কামরুলরা নারীকে মাতা, কন্যা, স্ত্রী এবং অনুভূতিসম্পন্ন মানুষ হিসেবে দেখালেও নারীদের যথার্থ কর্মময় জীবন উহ্যই ছিল। নভেরা আহমেদ নারীকে দেখেছেন সম্পূর্ণ ভিন্নরূপে, পুরুষ শিল্পীদের উপস্থাপনার বিপরীতে। তাঁর কাজে নর-নারীর গ্রন্থনা একটি ঐক্য গঠন করে। তিনি ভাসা ভাসা সুন্দর আনন্দময়ী আদর্শ ফর্ম করার পরিবর্তে তাঁর ফর্মগুলোকে সরল, অর্থপূর্ণ, স্বকীয়তায় সমৃদ্ধ করেছেন। উন্মোচন করেছেন সবধরনের বিচলিত, আবেগমথিত, সত্যিকারের নারীর রূপকে। ‘দি লং ওয়েট’ কাজটি তাঁরই নমুনা। তাঁর মায়েরা সুন্দরী নয়, কিন্তু শক্তিময়ী, জোরালো ও সংগ্রামী। তারা মানবিকতার ধ্রুপদী প্রতীক।
নভেরা তাঁর শিল্পকর্মে একঘেয়েমি কাটাতে পরবর্তীতে কতগুলো কাজে ভিন্নমাত্রা সংযোজন করেছিলেন। যেমন: নগ্ন নারী মূর্তি, লম্বা গ্রীবা ও মাথার এনাটমিতে বাংলাদেশের ‘কন্যা-পুতুলের’ আঙ্গিকের পাশাপাশি হাত-পা-শরীরের অবস্থান স্থাপনের ক্ষেত্রে মদীয়ানির ফর্ম ও ড্রইভের সুষমা, স্তন ও শরীরের উপস্থাপনায় মহেঞ্জোদারোর ‘বালিকা-মূর্তির’ প্রাচ্য অভিলাষকে একত্রিত করেছেন। অন্যদিকে প্লাস্টার অব প্যারিসে নির্মিত দু’টি ভাস্কর্যে মুখমন্ডল বহুলাংশে বাস্তবধর্মী, সামান্য গান্ধারা শিল্পধারায় প্রভাবিত। সম্ভবত এই মস্তক দু’টি বুদ্ধের মস্তকের অনুকরণে অণুকৃতি।
নভেরার বেশকিছু ভাস্কর্যে আবহমান বাংলার লোকজ আঙ্গিকের আভাস পাওয়া যায়। তবে লোকজ ফর্মের সাথে সেখানে পাশ্চাত্য শিক্ষার সমন্বয়ও বর্তমান। লোকজ টেপা পুতুলের ফর্মকে সরলীকৃত করে তাকে দক্ষতার সাথে বিশেষায়িত করেছেন তিনি। এভাবে ঐতিহ্যের সাথে পাশ্চাত্য শিক্ষার সার্থকভাবে উপস্থাপনের চেষ্টা তাঁর আধুনিক চিন্তার লক্ষণ। এক্ষেত্রে তাঁর ভাস্কর্যগুলো আদলে তিনকোনা, চোখ ছিদ্র, লম্বা গ্রীবা অন্যতম বৈশিষ্ট্য হিসেবে আসে।
১৯৫৮ তে সম্পন্ন পরিবার নামীয় কাজটিতে নভেরা গ্রামীণ একটি বিষয় ব্যবহার করেছেন। এখানে মানুষ ও গরুর পা এবং শরীর একীভূত হয়ে গেছে । এভাবেই গরুর ও মানুষ উভয়ের ওপর উভয়ের নির্ভরশীলতা বোঝানো হয়েছে। ভাস্কর্যটির কিছু কিছু অংশ বৃত্তাকারে কেটে বাদ দেওয়া হয়েছে। চট্টগ্রামের রেকিট অ্যান্ড কোলম্যান অফিস এবং ঢাকার অ্যাটমিক এনার্জি কমিশনের সামনের লনে নভেরার আরো দুটি কাজ আছে। কাজ দুটি আয়তনে তেমন বড় নয়, উচ্চতায় তিন ফুটের মতো। প্রথমটি অ্যাবস্ট্রাক্ট কাজ, দ্বিতীয়টি অ্যাবস্ট্রাকটেড মাতৃমূর্তি। ’৫৯ সালে নভেরা বার্মা (মিয়ানমার) গিয়েছিলেন বৌদ্ধমন্দির দেখার জন্য। সেখান থেকে ফিরে বুদ্ধের আসন বা পিস নামকরণে কয়েকটি কাজ করেছেন এবং কয়েকটি ফর্মে কাজটি করেছেন।
১৯৬১ খ্রিষ্টাব্দে অল পাকিস্তান পেইন্টিং অ্যান্ড স্কাল্পচার এক্সিবিশন আয়োজন হয়। সে সময় দশ বছর বয়সি একটি ছেলে ঘরের কাজে নভেরাকে সাহায্য করত। এই প্রদর্শনীর জন্য নভেরা তারই একটি আবক্ষমূর্তি তৈরি করলেন এবং নাম দিলেন ‘চাইল্ড ফিলোসফার’। এই ভাস্কর্যের জন্য তিনি সেই প্রদর্শনীতে প্রথম পুরস্কার লাভ করেন। অবয়বধর্মী ভাস্কর্য এক্সট্রিমিনেটিং এঞ্জেল, ছয় ফুটের অধিক উচ্চতাবিশিষ্ট স্টাইলাইজড ভাস্কর্যটিতে বিধৃত হয়েছে শকুনের শ্বাসরোধকারী একজন নারীর অবয়ব; নারীর হাতে অশুভ শক্তি ও মৃত্যুর পরাভবের প্রতীক।
তৎকালীন পশ্চিম পাকিস্তানে ভাস্কর হিসেবে নিজের একটা দৃঢ় অবস্থান তৈরি করতে সমর্থ হয়েছিলেন নভেরা। ১৯৬৮ থেকে ১৯৭০ খ্রিষ্টাব্দের মধ্যে নির্মিত ভাস্কর্যগুলোর মধ্যে অধিকাংশই বেশ বড় আকারের; ৫ ফুট থেকে শুরু করে ৭ ফুট ১১ ইঞ্চি পর্যন্ত উচ্চতাবিশিষ্ট। একই বিষয়বস্তু নিয়ে নির্মিত একাধিক ভাস্কর্যের মধ্যে পরিবার (১৯৫৮), যুগল (১৯৬৯), ইকারুস (১৯৬৯) ইত্যাদি কাজে মাধ্যমগত চাহিদার কারণেই অবয়বগুলি সরলীকৃত। ওয়েলডেড স্টিলের জেব্রা ক্রসিং (১৯৬৮), দুটি লুনাটিক টোটেম ইত্যাদির পাশাপাশি রয়েছে ব্রোঞ্জ মাধ্যমে তৈরি দন্ডায়মান অবয়ব। এছাড়া কয়েকটি রিলিফ ভাস্কর্য ও স্ক্রল। লুনাটিক টোটেম বা মেডিটেশন (১৯৬৮) এই দুটি ভাস্কর্যে শিল্পীর মরমি অনুভবের বহিঃপ্রকাশ ঘটেছে। কোথাওবা রয়েছে আদিম ভাস্কর্যরীতি থেকে পরিগ্রহণ। তবে একেবারে ভিন্ন রীতির কাজও ছিল এই প্রদর্শনীতে। বস্তুতপক্ষে তেত্রিশটি শিল্পকর্মের মধ্যে এক-তৃতীয়াংশ অর্থাৎ এগারোটিই ছিল পরিত্যক্ত ভাস্কর্য। ইন্দোচীনে ভূপাতিত মার্কিন যুদ্ধবিমানের ভগ্নাবশেষ থেকে তৈরি।
২০১৫ খ্রিষ্টাব্দ অবধি বিস্তৃত দীর্ঘ জীবনের তুলনায় নভেরা আহমেদের শিল্পকর্মের সংখ্যা কম। ষাট দশকের শেষভাগের মধ্যেই তাঁর যা কিছু সৃষ্টি ও নির্মাণ। ১৯৭৩ থেকে ২০১৫ পর্যন্ত প্যারিসের স্বেচ্ছানির্বাসনের জীবন পরিধিতি তিনি খুবই কম কাজ করেছেন। এ সময় অবশ্য তিনি কিছু ছবি এঁকেছেন।
২০১৫ খ্রিষ্টাব্দে তাঁর মৃত্যুর পর ৪৩টি চিত্রকর্মের হদিশ পাওয়া গেছে।
নভেরা আহমেদের কাজের সর্ববৃহৎ সংগ্রহ রয়েছে ঢাকাস্থ বাংলাদেশ জাতীয় জাদুঘর। এছাড়া প্যারিসে তাঁর স্বামী গেগ্ররী দ্য ব্রুনোর স্টুডিয়োতে ৯টি ভাষ্কর্য ও ৪৩টি অঙ্কিত চিত্র রয়েছে। বাংলাদেশ কেমিক্যাল ইন্ডাস্ট্রিজ কর্পোরেশনের ঢাকাস্থ প্রধান কার্যালয়ের লবিতে দীর্ঘকাল রক্ষিত একটি ভাস্কর্য ২০১৫’র শেষ ভাগে জাতীয় জাদুঘরে সংগ্রহ করা হয়। নভেরা আহমেদের ‘পরিবার’ ও আরো একটি কাজ জাতীয় জাদুঘরের ৩৭ সংখ্যক গ্যালারিতে প্রদর্শন করা হয়। পরিবার কাজটি ফার্মগেটের কাছে জনাব এম আর খানের বাড়ির উদ্যানে স্থাপিত ছিল যা ২০০১ খ্রিষ্টাব্দে জাতীয় জাদুঘর সংগ্রহ করে। ২০১৬ এর মধ্যভাগ অবধি এটি জাদুঘরের উদ্যানে সংস্থাপিত রাখে। পরে প্রাকৃতিক ক্ষতি এড়ানোর জন্য তা জাদুঘরের মূল ভবনে স্থানান্তর করা হয়েছে। ১৯৫২ খ্রিস্টাব্দে নির্মিত প্রথম শহীদ মিনারটি পাকিস্তান পুলিশ ও আর্মি ভেঙে ফেলে। শিক্ষাজীবন শেষে ১৯৫৬ খ্রিষ্টাব্দের জুন মাসে নভেরা দেশে ফিরে আসেন। সে সময় ঢাকায় কেন্দ্রীয় শহীদ মিনার নির্মাণের উদ্যোগ চলছিল। ভাস্কর হামিদুর রহমান প্রাথমিক নকশা প্রণয়নের কাজ শুরু করেন। এ কাজে নভেরা আহমেদ জড়িত হন। স্থির হয়, হামিদুর রহমানের নকশায় নির্মিত শহীদ মিনারে নভেরার তৈরী কিছু ভাস্কর্য সংস্থাপিত হবে। ১৯৫৮ খ্রিষ্টাব্দে সামরিক আইন জারী হলে কাজ বন্ধ হয়ে যায়। ফলস্বরূপ কেন্দ্রীয় শহীদ মিনারের জন্য ভাস্কর্য নির্মাণের কাজ নভেরা সম্পন্ন করার সুযোগ লাভ করেননি। শেষ পর্যন্ত কেন্দ্রীয় শহীদ মিনারের নির্মাতা হিসেবে তাঁর নাম আর উচ্চারিত হয়নি। এ নিয়ে মৃদু বিতর্ক রয়েছে। অনেকেই মনে করেন কেন্দ্রীয় শহীদ মিনারের নকশাকারী হিসেবে নভেরার অবদান রয়েছে।
১৯৫৭ খ্রিষ্টাব্দে পূর্ব পাকিস্তানের মুখ্যমন্ত্রী আতাউর রহমান খান শহীদ মিনারের পরিকল্পনা প্রণয়ন করার অনুরোধ করেন প্রধান প্রকৌশলী জনাব জব্বার এবং জয়নুল আবেদিনকে। জব্বার সাহেবের অন্যতম সহকর্মী ছিলেন প্রকৌশলী শফিকুল হক, নভেরার বড় বোন কুমুম হকের স্বামী। শহীদ মিনারের নকশার জন্য কাগজে কোনো বিজ্ঞাপন দেয়া হয়নি। জয়নুল আবেদিন সরাসরি হামিদকে বলেছিলেন স্কেচসহ মডেল পেশ করতে। স্কেচের কাজে হামিদুর রহমানের সাথে ছিলেন নভেরা। ইচ্ছে ছিল ১৯৫৮ সালের ২১ ফেব্রুয়ারির মধ্যে কাজটি শেষ হোক। কাজটি ত্বরান্বিত করতে নির্মাণাধীন মিনারের পাশে দুটি টিনের চালাঘর করে হামিদ ও নভেরার থাকার ব্যবস্থা করা হল। কিন্তু ৩/৪ মাসে কাজ শেষ হলো না। আর শেষাবধি হামিদুর রহমান শহীদ মিনারের যে মডেল ও স্কেচ উপস্থাপন করেছিলেন তার স্তম্ভগুলোর মাপ পরিবর্তন করে দেয়া হয়েছিল।
নভেরার প্রথম একক ভাস্কর্য প্রদর্শনী আয়োজিত হয়েছিল ১৯৬০ সালের ৭ আগস্ট ঢাকার কেন্দ্রীয় গণগ্রন্থাগার প্রাঙ্গনে (বর্তমানে ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয় গ্রন্থাগার) পাকিস্তান জাতিসংঘ সমিতির উদ্যোগে এবং এশিয়া ফাউন্ডেশনের সহযোগিতায়। ইনার গেজ শিরোনামের ওই প্রদর্শনীটি ছিল তৎকালীন পূর্ব পাকিস্তানের প্রথম একক ভাস্কর্য প্রদর্শনী। প্রদর্শনী উদ্বোধন করেন তৎকালীন পূর্ব পাকিস্তানের গভর্নর মোহাম্মদ আজম খান। এই প্রদর্শনী দশদিন সর্বসাধারণের জন্য উন্মুক্ত ছিল। কেবলমাত্র ঘরের মধ্যে সীমাবদ্ধ না রেখে কিছু ভাস্কর্য গ্রন্থাগার প্রাঙ্গণেও প্রদর্শিত হয়েছিল। প্রদর্শনীতে ভাস্কর্য ছিল প্রায় পঁচাত্তরটি। এর প্রায় তিন যুগ পরে বাংলাদেশ জাতীয় জাদুঘরের উদ্যোগে অনুষ্ঠিত প্রদর্শনীতে তিরিশটির বেশি ভাস্কর্য সংগৃহীত হয়। ১৯৯৮ সালে একত্রে এক মাসেরও বেশি সময় ধরে প্রদর্শিত হয় ভাস্কর্যগুলি।
নভেরার দ্বিতীয় একক প্রদর্শনী অনুষ্ঠিত হয় ১৯৭০ সালে ব্যাংককে। এই প্রদর্শনীটি ছিল ব্যাংককে ধাতব ভাস্কর্যের প্রথম মুক্তাঙ্গন প্রদর্শনী। এতে নভেরা ধাতব মাধ্যমে কিছু ভাস্কর্য প্রদর্শন করেন। ব্রোঞ্জ ছাড়াও এ-পর্বে নভেরা তাঁর ভাস্কর্যের উপকরণ হিসেবে ব্যবহার করেছেন শিট মেটাল এবং ঝালাইকৃত বা ওয়েলডেড ও স্টেইনলেস স্টিল। ব্যাংকক আলিয়ঁস ফ্রঁসেজের আয়োজনে প্রদর্শনী চলেছিল ১৯৭০ সালের ১৪ থেকে ২৪ অক্টোবর পর্যন্ত, ২৯ থানন সাথর্ন তাই, আয়োজক প্রতিষ্ঠানের নিজস্ব ভবনে। প্রদর্শনী আয়োজনে পৃষ্ঠপোষকতা করেছিলেন থাইল্যান্ডে পাকিস্তানের রাষ্ট্রদূত রব, শিল্পাকর্ন বিশ্ববিদ্যালয়ের আলংকারিক শিল্পকলা অনুষদের ডিন যুবরাজ ইয়াৎচাই চিত্রাবংস, পাকিস্তান ইন্টারন্যাশনাল এয়ারলাইনসের ডিরেক্টর মাহমুদ-আল-হক। উদ্বোধন করেছিলেন শৌখিন চিত্রকর ও ভাস্কর যুবরাজ কারাবিক চক্রবন্ধু।
১৯৭৩ খ্রিষ্টাব্দে জুলাই মাসে তাঁর তৃতীয় একক প্রদর্শনী আয়োজিত হয়েছিল প্যারিসের রিভগেস গ্যালারিতে। প্যারিসে বসবাসকালে ১৯৭৪ খ্রিষ্টাব্দে সড়ক দুর্ঘটনায় আক্রান্ত হন নভেরা। তবে বড় কোন আঘাত পাননি। তৎকালীন পররাষ্ট্রমন্ত্রী ড. কামাল হোসেন সরকারের পক্ষ থেকে তখন একটি মাসোহার দেওয়ার ব্যবস্থা করেন। কিন্তু ১৯৭৫ খ্রিষ্টাব্দে বঙ্গবন্ধুর হত্যার পর, তা বাতিল হয়ে যায়।
সর্বশেষ ২০১৪ খ্রিষ্টাব্দে প্যারিসে তাঁর পূর্বাপর কাজের একশ দিনব্যাপী একটি প্রদর্শনী আয়োজিত হয়। ১৯৮৮ খ্রিষ্টাব্দে প্যারিসে অবস্থানকালে ব্যাংককের আলিয়ঁস ও পাকিস্তান ইন্টারন্যাশনাল এয়ারলাইনস যৌথভাবে তাঁর একটি একক প্রদর্শনীর আয়োজন করে। ৪১ বছর পর ২০১৪ সালের ১৬ জানুয়ারি প্যারিসের গ্যালারি রিভগেসে নভেরা আহমেদের রেট্রোসপেকটিভ প্রদর্শনী শিল্পকর্মের প্রদর্শনী অনুষ্ঠিত হয়। প্রায় একশো দিনব্যাপী প্রদর্শনীতে প্রদর্শিত হয়েছে তাঁর ১৯৬৯-২০১৪ কালপর্বের ৫১টি শিল্পকর্ম, যার মধ্যে রয়েছে ৪২টি চিত্রকর্ম ও নয়টি ভাস্কর্য।
২০১৫ খ্রিষ্টাব্দে বাংলাদেশ জাতীয় জাদুঘর নভেরার জীবন ও আদ্যন্ত শিল্পকর্মের ওপর একটি প্রদর্শনীর আয়োজন করে। ৭ থেকে ১৯ অক্টোবর ২০১৫ এই দুই সপ্তাহব্যাপাী প্রদর্শনীটির আয়োজন করা হয় জাদুঘরের নলিনীকান্ত ভট্টশালী চিত্রশালায়। এতে নভেরার ৩৫টি শিল্প কর্ম প্রদর্শিত হয়।
১৯৬১ খ্রিষ্টাব্দে ভাস্কর হিসেবে জাতীয় পর্যায়ে স্বীকৃতি পেয়েছিলেন তিনি। ন্যাশনাল এক্সিবিশন অব পেইন্টিং স্কাল্পচার এ্যান্ড গ্রাফিক আর্টস শিরোনমে এই প্রদর্শনীতে স্থান পাওয়া তাঁর ছ’টি ভাস্কর্যের মধ্যে চাইল্ড ফিলোসফার নামে একটি ভাস্কর্য বেস্ট স্কাল্পচারে পুরস্কৃত হয়। ১৯৯৭ খ্রিষ্টাব্দে বাংলাদেশ সরকার প্রদত্ত সর্বোচ্চ বেসামরিক সম্মাননা একুশে পদকে ভূষিত হয়েছেন। এক সময় বাংলাদেশ জাতীয় জাদুঘরের একটি হলের নামকরণ করা হয়েছিল "ভাস্কর নভেরা আহমেদ হল"। বর্তমানে বাংলা একাডেমী’র একটি হলের নাম নভেরা হল।
স্থায়ীভাবে চট্টগ্রামে বসবাস করার সময় এক পুলিশ অফিসারের সাথে নভেরার বিয়ে হয়েছিল। কিন্তু অল্পদিনের মধ্যেই তাঁদের বিচ্ছেদ ঘটে। এরপর পিতা মাতা তাঁকে বিয়ে দেয়ার চেষ্টা করে বারবার ব্যর্থ হন। প্যারিসে অবস্থানকালে ১৯৮৪ খ্রিষ্টাব্দে পঁয়তাল্লিশ বৎসর বয়সে তিনি গ্রেগরি দ্য বুনসকে (এৎবমড়রৎব ফব ইৎড়ঁযহং) বিয়ে করেন। ফ্রান্সের নিভৃত পল্লিতে লোক চক্ষুর অন্তরালে স্থায়ীভাবে বসবাস শুরু করেন তাঁরা। নভেরার স্বামীর একটি বুটিকের দোকান ছিল প্যারিসে। ২০১৫-এ মৃত্যু অবধি এই দম্পতি এক সঙ্গেই ছিলেন।
মৃত্যু অবধি তিনি মানুষের বিশেষ করে বাংলাদেশীদের সংসর্গ বাঁচিয়ে চলেছেন। এমনকি বাংলায় কথা বলতেও তাঁর অনীহা ছিল প্রকট।বাংলাদেশী কেউ তাঁর সাথে দেখা করতে চাইলে তিনি সহজে রাজি হতেন না। হামিদুর রহমান আমিনুল ইসলামসহ এমন দুচারজন ছাড়া তাঁর তেমন বন্ধুবান্ধবও ছিল না। তাঁর জীবন যাপনও অনেকের পছন্দ ছিল না। তিনি যুগের তুলনায় আধুনিক ছিলেন। পশ্চিমা চালচলন ছিল তাঁর, ঘুরে বেড়াতে ভালবাসতেন। পোশাক-পরিচ্ছদ, ভবঘুরে স্বভাবের জন্য সমালোচিতও হয়েছেন বারবার। ‘কালো ট্রাউজার, কালো ব্লাউজ, গলায় কালো রুদ্রাক্ষের মালা। চোখের নিচে ভ্রূর আদলে দীর্ঘ মেকআপের কালো বাঁকা একটা রেখা টানা।’ এভাবেই নভেরার রূপের বর্ণনা করেছেন কথা সাহিত্যিক হাসনাত আবদুল হাই। কিন্তু আশ্চর্যের ব্যাপার পছন্দ করতেন শাড়ি। কালো রং ছিল তাঁর বিশেষ প্রিয়। প্যারিসেও শাড়ি পরে ঘুরে বেড়াতেন। চুল মাথার ওপর চুড়ো করে চুল বাঁধতেন। কপালে থাকতো দীর্ঘ কালো টিপ। এতে ত^াকে দারুণ স্মার্ট দেখাতো। তিনি স্মার্ট ছিলেন, উচ্ছল নয়। কথা বলতেন অনুচ্চ স্বরে। সবকিছুতেই ছিলো পরিমিতিবোধ। নভেরা পছন্দ করতেন রসমালাই, রসগোল্লা আর বিরিয়ানি।
আধুনিক ছিলেন, ছিলেন প্রচন্ড আত্মমর্যাদাসম্পন্ন। এ প্রসঙ্গে নভেরার সাথে শিল্পী আমিনুল ইসলামের ফ্লোরেন্সে দেখা হওয়ার বিষয়টি বলা যেতে পারে। ‘ হঠাৎ একদিন নভেরা তাঁর বন্ধু শিল্পী হামিদুর রহমানকে নিয়ে হাজির। তাঁরা তার সঙ্গে থাকতে চান কয়দিন। আমিনুলের আপত্তি ছিল না, কিন্তু সমস্যা হলো ঘর মাত্র একটা। সেই এক ঘরে একটি নারী, দুটি পুরুষের একসঙ্গে থাকার গল্প যেমন অবিশ্বাস্য, তেমনি চমকপ্রদ। ফ্লোরেন্সে সেইভাবে থাকার সময় নভেরা আত্মমর্যাদা, ব্যক্তিত্ব এবং সম্ভ্রমবোধ বজায় রেখেছিলেন। এর ফলে আমিনুলের কাছে তাঁর মর্যাদা বৃদ্ধি পেয়েছিল।’
রহস্যময় কারণে তিনি আর কখনো বাংলাদেশে প্রত্যাবর্তন করেন নি। হতে পারে সেটা তার অভিমান। তিনি ঢাকা আর্ট কলেজে পড়েননি। নিজে নিজেই শিখেছিলেন। নিজেকে নির্মাণ করেছিলেন। আর্ট কলেজে চাকরি পাননি তিনি। চাকরি পেলে হয়ত তিনি এদেশে থেকে যেতে পারতেন। ঢাকায় স্থিত হতে পারতেন। ঢাকা তখন প্রাদেশিক রাজধানী মাত্র, স্থাপত্যের সংখ্যা কম ছিল। নভেরা কোনো কাজ পাচ্ছিলেন না বলেই উর্দু কবি ফয়েজ আহমেদ ফয়েজ তাঁকে লাহোরে যাওয়ার আমন্ত্রণ জানালেন। কিছু কাজের ব্যবস্থা তিনি করে দিতে পারবেন এমন প্রতিশ্রুতিও দিয়েছিলেন। ফয়েজ আহমেদ তাঁকে উর্দু লেখক ইসমাত চুগতাইয়ের সঙ্গে পরিচয় করিয়ে দিয়েছিলেন। নভেরা তাঁর বাড়িতেই আতিথ্য গ্রহণ করেন। পাঞ্জাবের মুখ্যমন্ত্রী মমতাজ হোসেন দৌলতানা তাঁর একটি ভাস্কর্য কিনেছিলেন। নভেরার আরেকটি কাজ পাকিস্তানের রাষ্ট্রীয় বিমান সংস্থা পিআইএ কিনেছিল। লাহোরে থাকতেই নভেরার মনে হলো ভরত নাট্যম শেখা প্রয়োজন। স্থির হলো মুম্বাই যাবেন। নাচ সব সময়ই তাঁর প্রিয় শিল্প ছিল। এটি পরিষ্কার, ভাস্কর্যে ব্যবহারের জন্যই নভেরা নাচ শিখতে শুরু করেছিলেন। কিন্তু তিন বছরের কোর্স নয় মাসে শেষ করতে গিয়ে অসুস্থ হয়ে পড়লেন। তাঁর হাঁটু এমনভাবে ফুলে গিয়েছিল যে লাঠি ছাড়া হাঁটতে পারতেন না। কিছুদিনের মধ্যেই দেখা গেল নভেরার ইউটেরাসে টিউমার হয়েছে। বন্ধুদের সহযোগিতায় তিনি লন্ডনে চলে যান এবং সেখানে ইতালিয়ান হাসপাতালে তাঁর হিসটেকটোমি হয়। এখান থেকে সুস্থ হয়ে নভেরা প্যারিসে চলে যান। এর বছর চারেক পরে তিনি ব্যাংককে এসেছিলেন।
নভেরার আড়ালপ্রিয়তা আর দেখা না দেয়ার প্রবণতার জন্য তিনি মিথ হয়ে গেছেন। 'কিংবদন্তি'তে পরিণত হয়েছেন। তাঁর কাজ সম্বন্ধে মানুষ বেশি জানেন না। তার কারণও আছে, তাঁর খুব বেশি কাজ কিন্তু নেই। কারণ, যে সমস্ত কাজ আছে, সেগুলো প্রথম দিককার। সেই কাজগুলো কতজন দেখেছেন, সে-ও একটা প্রশ্ন। তাই ভাস্কর্যের দিক থেকে তাঁর কাজের মূল্যায়ন করা বড় দুরূহ। তাঁর কাজগুলোর মধ্যে একধরনের পরিশীলন আছে। আধুনিকতার মিশেল আছে । ১৯৬০ সালে নভেরার এক প্রদর্শনীর পুস্তিকায় শিল্পাচার্য জয়নুল তাঁর সম্পর্কে বলেছিলেন, ‘আজ এখানে নভেরা যা করছেন, তা বুঝতে আমাদের অনেক দিন অপেক্ষা করতে হবে।’
নভেরার নারীরা মেদহীন, ঋজু। নভেরার ভাস্কর্যের মধ্যে কয়েকটি হচ্ছে ‘চাইল্ড ফিলোসফার’, ‘মা ও শিশু’, ‘এক্সটার্মিনেটিং অ্যাঞ্জেল’, ‘পরিবার’ (১৯৫৮), ‘যুগল’ (১৯৬৯), ‘ইকারুস’ (১৯৬৯), ‘ জেব্রা ক্রসিং’ (১৯৬৮) ইত্যাদি।
১৯৫৮ খ্রিষ্টাব্দে তেঁজগাও শিল্প এলাকায় অবস্থিত একজন শিল্পপতির বাসস্থানের আঙিনায় প্রাঙ্গন ভাস্কর্য স্থাপন করেন। এর নাম ছিল 'কাউ এন্ড টু ফিগার্স'।
নভেরাকে আমরা পেয়েছি কথা সাহিত্যিক হাসনাত আবদুল হাই রচিত জীবনীভিত্তিক উপন্যাস ‘নভেরা’ (প্রকাশকাল-১৯৯৪), এন রাশেদ চৌধুরীর প্রামাণ্যচিত্র ‘শিল্পী নভেরা আহমেদের সৃজন ভুবন ন হন্যতে’ (১৯৯৯) ও চয়ন খায়রুল হাবিবের কবিতা ‘নভেরায় হংসনিল’।
১৯৯৪ সালে হাসনাত আবদুল হাই সাপ্তাহিক বিচিত্রার ঈদসংখ্যায় 'নভেরা' উপন্যাসটি লেখেন। নভেরা প্রত্যাবর্তন করেন নতুন প্রজন্মের আইকন হয়ে, পুনর্জন্ম ঘটে তাঁর ভাস্কর্যের। ওই বছরেরই ১০ নভেম্বরে দৈনিক সংবাদের সাহিত্য সাময়িকীতে মেহবুব আহমেদ লেখেন 'ভাস্কর নভেরা আহমেদ'। আর রাষ্ট্রযন্ত্রও যেন নিভৃতে সক্রিয় হয়ে ওঠে। সাপ্তাহিক বিচিত্রায় ১৯৯৭ সালের ১৭ অক্টোবরে (বর্ষ ২৯, সংখ্যা ২২) প্যারিসের বাংলাদেশ মিশনে কাউন্সিলর হিসেবে কর্মরত লেখক ইকতিয়ার চৌধুরী 'নভেরার ঠিকানা : প্যারিস' নিবন্ধটি লেখার পর তাঁর অবস্থানও নিশ্চিত হয় সবার কাছে। ১৯৯৯ সালে প্রধানমন্ত্রী শেখ হাসিনার সঙ্গে প্যারিসে সাক্ষাৎ-এর বাসস পরিবেশিত খবরে নভেরার পরিচিতি ‘ভাস্কর’ নয়, ‘স্থপতি’ লেখা হয়েছিল।
২০১০ খ্রিষ্টাব্দের নভেম্বর মাসে স্ট্রোকের ফলে হুইলচেয়ারে বসেই তাঁর শেষ জীবন কাটে। তবে শরীর দুর্বল হলেও তাঁর প্রবল মনোবল ছিলো অক্ষুণ্ন। আর তাই বই পড়া ও ধ্যান- এসবের মধ্য দিয়ে তাঁর দিনের অনেকটা সময় কাটত। তিনি আনন্দ খুঁজে পেতেন রবীন্দ্রনাথে, আর বৌদ্ধ দর্শনে পেয়েছিলেন আত্মার প্রশান্তি।
২০১৪ থেকে নভেরা আহমেদ শ্বাসকষ্টে ভুগছিলেন। ২০১৫ খ্রিষ্টাব্দের এপ্রিল মাসে তাঁর অবস্থার অবনতি ঘটে। মৃত্যুর দুই দিন আগে তিনি কোমায় চলে যান। কয়েকদিন পর ৫ মে, মঙ্গলবার প্যারিসের স্থানীয় সময় ভোর তিনটা থেকে চারটার মধ্যে ৭৬ বছর বয়সে তাঁর মৃত্যু হয়।
বাঙালি মধ্যবিত্ত মুসলিম পরিবারের একজন মেয়ে শিল্পচর্চা করছেন রক্ষণশীল সমাজে। তাঁর কাজ, বেশভূষা, আচার-আচরণ বলে দিয়েছিল তিনি সমাজের প্রচলিত সংস্কারের বিরুদ্ধে। নিজের অভিরুচি অনুযায়ী জীবনযাপন করছেন। সেই নৈতিক শক্তি তাঁর ব্যক্তিত্বকে দৃঢ়তা দিয়েছিল, অনন্য করে তুলেছিল।
বাংলাদেশের শিল্পী ও সমালোচকদের সম্বন্ধে তাঁর বেশ অভিমান ছিল। একজন স্পর্শকাতর শিল্পী হিসেবে এমন অভিমান থাকা স্বাভাবিক। প্রচন্ড ইগো ছিল তাঁর । অসুস্থ হলে একা একাই হাসপাতালে গেছেন। কাউকে দেখতে যেতে বলেননি। সুস্থ হয়ে ফিরে এসেছেন। নভেরা চলে যাবার দিন তাই তাঁর স্বামী
ভেতরের ঝড়কে বুঝতে না দিয়ে শান্ত থাকার ভান করে ওয়ার্ডরোব থেকে একে একে নামাচ্ছিলেন নভেরার জামাকাপড়। শেষযাত্রায় কোন পোশাকটা মানাবে ভালো, তা নিয়ে ভাবছিলেন। অনেক ভেবেচিন্তে একটা কমলা রঙের জামা বের করা হলো। দারুণ সুন্দর সে জামা!
কফিনে নভেরার ডান কাঁধের পাশে গ্রেগোয়া রাখলেন তাঁর বাগানের একটি উজ্জ্বল হলুদ গোলাপ, তাঁর শেষ প্রদর্শনীর একটি ক্যাটালগ। বাঁ কাঁধের পাশে রাখলেন একটা পাখির মৃতদেহ। এটি সেই পাখি, যে পাখিকে নভেরা প্রতিদিন নিজ হাতে খাওয়াতেন। অদ্ভুত ব্যাপার হলো, এই পাখিও নভেরার সঙ্গে একই দিনে মারা গেছে।
নভেরাকে সমাহিত করার আগে তিনি শুধু বলতে পেরেছিলেন, ‘স্বর্গে আবার দেখা হবে।’ দুঃখ করে বলেছিলেন, ‘একটাই বিয়ে, একটাই জীবন।’ গ্রেগোয়া দুঃখ করে বলেছিলেন, ‘খুব ইগো ছিল ওর। নিজে যা বুঝবে, তাই করবে, অন্যের কথা আমলেই নেবে না। চিকিৎসকেরা বলেছিলেন ফিজিওথেরাপি করাতে। করাল না। আমার কথা যদি একটু শুনত, তাহলে হয়তো আরও কয়েকটা বছর বাঁচত।’
(তথ্যসূত্র : উইকিপিডিয়া, কালি ও কলম, শিল্প ও শিল্পী, সাপ্তাহিক, বিভিন্ন জাতীয় দৈনিক পত্র-পত্রিকা, ইন্টারনেট)।

 

ড. আফরোজা পারভীন
কথাশিল্পী, প্রাবন্ধিক, কলামলেখক
অবসরপ্রাপ্ত যুগ্মসচিব

 

এই লেখকের অন্যান্য লেখা



আপনার মূল্যবান মতামত দিন:


Top