সিডনী মঙ্গলবার, ২৪শে নভেম্বর ২০২০, ১০ই অগ্রহায়ণ ১৪২৭

জিকো যখন ছায়াপথে : নবনীতা চট্টোপাধ্যায়


প্রকাশিত:
২৯ অক্টোবর ২০২০ ১৭:৫৯

আপডেট:
২৪ নভেম্বর ২০২০ ১৭:৩৩

 

দীর্ঘক্ষণ স্টান্ডে অপেক্ষার পর বিরক্ত হয়ে সে ট্যাক্সিতে উঠে গাড়ী স্টার্ট দিলো। পাশ থেকে এগিয়ে এসে বীরেশ বললো "আরে ইয়ার কি হলো? প্যাসেঞ্জার না নিয়েই চলে যাচ্ছ?" "দূর সেই সকাল এগারোটায় পেয়েছিলাম একজনকে। বাগবাজার থেকে উত্তরপাড়া। তাকে নামিয়ে দিয়ে ফিরতি পথে দুজনকে শেয়ারে ডানলপ নিয়ে গেছি। তারপর থেকে একটাও প্যাসেঞ্জার নেই। সন্ধ্যা সাতটা হয়ে গেল।" বীরেশ ও নিরাশভাবে মাথা নাড়ল "এই ওলা আর উবের ই আমাদের খেয়ে নিলো। কি যে দুর্দশা এখন আমাদের। আর রাজ্যশুদ্ধু লোকের যত রাগ সব ট্যাক্সিড্রাইভারদের উপর।" "এখানে বসে লাভ নেই বুঝলে। দেখি রাস্তা থেকে পাই কি না। মালিককে তো রোজকার টাকাটা দিতে হবে। চলি" "পরশু দুপুরে এসো ইউনিয়ন অফিসে...মিটিং আছে একটা।" বীরেশ চিৎকার করলো। হাত নেড়ে সম্মতি জানিয়ে বেরিয়ে পড়ল রমেন। 

সন্ধ্যার কলকাতা, অফিস ফেরত লোকজন মেট্রো থেকে উঠে ভিড় করে দাঁড়িয়ে আছে বাসের অপেক্ষায়। কেউ বেগতিক না হলে ট্যাক্সি চড়বে না। শালারা এত টাকা মাইনে পায় শুধু ট্যাক্সির বেলায় কিপটেমি। মনে মনে গাল দিয়ে আস্তে আস্তে গাড়ী চালাচ্ছে সে। গাড়ী কলেজ স্ট্রীটে ঢুকে পড়ল। চারিদিকে প্রচুর অল্প বয়েসী ছেলেমেয়ের দল...কবি সাহিত্যিকের আড্ডা। কিন্তু সবাই যেন আজ প্রতিজ্ঞা করেছে কেউ হলুদ ট্যাক্সিতে উঠবে না। কলেজ স্ট্রীট পেরিয়ে যাওয়ার পরই বৃষ্টি শুরু হলো ঝিরঝির করে। ট্যাক্সির ডানদিকের ওয়াইপারটা ঠিকমতো কাজ করছে না। ঝাপসা হয়ে যাচ্ছে সন্ধ্যার পথঘাট। একটা গলির মধ্যে ঘুরিয়ে ট্যাক্সিটা ঢোকালো রমেন। এই জায়গাটা রেসিডেন্সিয়াল এরিয়া| অধুনা ফ্লাটরাজত্বেও এখানে বেশ কয়েকটা বাড়ি আছে সামনে বাগান নিয়ে। সেইরকম একটা বাড়ির পাঁচিলের পাশে গাছের তলায় গাড়ীটা থামালো সে। কাঁচটা মুছতে হবে ভালো করে। মালিককে বললেও কান দেয় না। ওয়াইপারটা ঠিক না হলে মুশকিল।

গাড়ীর ভিতর থেকে কালো কাপড় বার করে  ভালো করে কাঁচটা মুচছিল রমেন হঠাৎ একটা তীব্র বুকফাটা কান্নায় চমকে গেল সে। একটু চুপ করে থেকে বুঝল আওয়াজটা আসছে সে যে বাড়ীর পাঁচিলের পাশে গাড়ীটাকে দাঁড় করিয়েছে সেই বাড়ী থেকেই। কি হলো? কেউ মারা টারা গেছে বোধহয়। নইলে এই বুক ফাটা কান্না বেরোয় না। "ও বাবা চোখ খোল...দ্যাখ আমি তোর কাছেই আছি..দ্যাখ বাবা দ্যাখ...চোখ মেলে দ্যাখ...এই যে তোর মা তোর সামনে...আমাদের ফেলে তুই কেন চলে গেলি বাবা।" "মনিকা শান্ত করো নিজেকে...ওকে শান্তিতে যেতে দাও। তুমি অমন ভেঙ্গে পড়লে ও শান্তিতে যেতে পারবে না।" পুরুষকন্ঠে সান্ত্বনা ভেসে এলো। "ওকে ছাড়া আমরা থাকবো কেমন করে?" ভেসে আসা সংলাপগুলো থেকে বোঝা যাচ্ছে তার ধারণাটা সঠিক। সন্ধ্যা গাঢ় হয়ে রাত্রির দিকে হাত বাড়াচ্ছে। ঝিরঝির বৃষ্টি আর হাওয়ায় রাস্তায় লোকজন একটু কম। কাঁচটা মুছে সে গাড়ীর থেকে জলের বোতল বার করে একটু জল খেল। এইসব আবহাওয়ায় প্যাসেঞ্জার পাওয়া আরো অনিশ্চিত। আজকের দিনটা ফাঁকাই গেলো তার। মালিককে রোজের টাকা দিয়ে তার অল্পই থাকবে। এমন সময় পাঁচিলের গেট খুলে বেরিয়ে এলেন মাঝবয়সী এক ভদ্রলোক। এপাশ ওপাশ তাকিয়ে তাকে দেখতে পেয়ে দ্রুত কাছে এলেন। "ভাই যাবেন?" "কোথায়?" রমেন নির্লিপ্তভাবে বললো। "মানে...ঠিক জানি না...আপনাকে একটু বুঝে নিয়ে যেতে হবে।"  "ঠিক বুঝলাম না দাদা। একটু ঝেড়ে কাশুন।" ভদ্রলোক এগিয়ে এসে রমেনের কাঁধে হাত রেখে বললেন"আসলে ভাই একটু বিপদে পড়েছি। মানে জিকো ...আমার পুষ্যিটা আজ বিকেলে মারা গেছে। ওকে একটু ভালো জায়গায় কবর দেবো।" "কুকুর না বেড়াল?" রমেন শুধোল। "কুকুর...গোল্ডেন রিট্রিভার...আমার ছেলের মত ছিলো। ওকে কী যেখানে সেখানে দিয়ে আসতে পারি।" "কুকুর...অসম্ভব দাদা। আমার ট্যাক্সিটা প্যাসেঞ্জারদের জন্য। এইসব কুকুরের লাশ নিয়ে যাওয়ার ভ্যান গাড়ি নয়।...না..না...ওসব হবে না।" "ভাই একটু হেল্প করো। এই সন্ধ্যায় বৃষ্টির জন্য কাউকে পাচ্ছিনা।" "বিড়াল হলে তাও বা কোনো ব্যাপার ছিলো না। আপনারা থলের মধ্যে ভরে ট্যাক্সিতে বসতেন। কিন্তু কুকুর...তাও আবার গোল্ডেন রিট্রিভার সে তো বেশ বড় সাইজ হয়।" "হ্যাঁ ভাই ওর খুব বড়সড় চেহারা। আচমকা এমন চলে যাবে আমরা ভাবতেই পারিনি।" "হবে না দাদা। গাড়ির মধ্যে কুকুরের লাশ নিয়ে গেলে মালিক আমার জান কয়লা করে দেবে।" রমেনের মুখে ...কুকুর...লাশ...এই কথাগুলো ভদ্রলোককে পীড়িত করছিলো বোঝা যাচ্ছিলো। 

ভদ্রলোক এবার পকেট থেকে পার্স বার করে একটা রঙীন দু হাজার টাকা রমেনের হাতে দিয়ে বললেন "একটু যে হেল্প করতে হবে ভাই| না হলে যে বিপদে পড়বো।" জোঁকের মুখে নুন পড়ার মত রমেন চুপ করে গেলো। সারাদিন আজ ঠিকমতো কামাই হয়নি। এই সুযোগ। "ঠিক আছে দাদা। তবে আপনারা লাশটা কোলে নিয়ে বসবেন। গাড়ীর সিটের উপর রাখবেন না।" "ঠিক আছে ভাই। আমরা ওকে কোলে নিয়েই বসবো।"  

"যাবেন কোথায়?" রমেন আবার প্রশ্ন করলো। "ঠিক জানি না...এসবের নির্দিষ্ট জায়গা আছে শুনেছি। তবে আমরা চাইছি গঙ্গার ধারে কোনো নির্জন জায়গায় সমাধিস্থ করতে। তোমার জানা আছে তেমন কিছু জায়গা?" "গঙ্গার ধারে প্রায় সব জায়গাই এখন বাঁধানো,  আলো দেওয়া. ..লোকজন ভর্তি।  সেখানে তো কবর দেওয়া যাবে না।  এক কাজ করুন. ..ওকে গংগায় ভাসিয়ে দিন। " "না. ..না. ..এসব কি বলছ? জিকো ছিল আমাদের বাড়ির প্রাণ। তাকে এইভাবে বিদায় জানাবো কি করে?  সে হয় না. .না. .না. ..।" রমেন একটু চিন্তা করে বললো" চলুন তাহলে।  বালির দিকে দু একটা ঘাট এখনো নির্জন. ..ফাঁকা আছে।" "হাঁ ভাই ওই নির্জন জায়গায় ওকে শুইয়ে দিয়ে আসব গঙ্গার ধারে। এসো ভাই তুমি বাড়ির ভিতরে এসো. ..বৃষ্টিতে ভিজো না। জিকোকে আমরা একটু তৈরী করে নিই। "

গাড়ীর দরজা লক করে সে ভদ্রলোকের পিছু পিছু বাড়িতে ঢুকলো।  বারান্দা পেরোলে বিরাট হলঘর।  মার্বেলের ঝাঁ চকচকে মেঝেতে বিছানো চাদরের উপর সোনালী লোমওয়ালা জিকো শুয়ে আছে।  মুখটা একটু হাঁ করা।  পাশে বসে ভদ্রলোকের স্ত্রী ওর গায়ে হাত বুলিয়ে দিচ্ছেন।  দুই ছোট ছোট নাতি নাতনিকে কাছে টেনে সোফায় বসে আছেন এক বৃদ্ধা।  শিশুদুটির মুখেও বেদনার ছাপ পরিস্ফুট। "মনিকা ওঠো।  এবার জিকোকে তৈরী করে দাও।  বহুকষ্টে এই ড্রাইভার ভাইকে পেয়েছি।  চলো এবার ওকে আমরা দিয়ে আসি দুজনে।  ভদ্রমহিলা চোখ মুছে বললেন "শেষবার শ্বাস নেবার সময় কেমন চোখ ঘুরিয়ে আমার দিকে চাইলো যেন আমাকে খুঁজছিল। " "তোমাকে তো দেখতে চাইবেই বৌমা।  বৃদ্ধা নরম সুরে বললেন তুমিই তো ওর মা ছিলে।  নিজের হাতে দুইবেলা খাওয়াতে।  বাছা আমার অকালে  চলে গেলো..।  যাও মা ওঠো।   ওকে সাজিয়ে দাও।"  ভদ্রলোক গলা তুলে ডাকলেন"   বাণী. ..যা জিকোর জামাকাপড় নিয়ে আয়।  বছর পনেরোর একটি কাজের মেয়ে ভিতরের ঘর থেকে অনেক কিছু নিয়ে এলো।  রমেনের বিস্ফারিত চোখের সামনে জিকোকে জ্যাকেট পড়ানো হলো, মাথায় টুপি, চোখে সানগ্লাস এমন কি চারপায়ের জুতো। বানী একটা রজনীগন্ধার মালা পড়িয়ে দিল জিকোর গলায়। বৃদ্ধার কোল থেকে তার শিশু নাতি বলে উঠল "ঠাম্মা জিকোর ডগ বিস্কিট দেবে না ওকে? জিকো খুব ভালোবাসতো ওটা।" "ওটা থাক। জিকোর বন্ধু পুলু এলে দেবো। জিকো খুশি হবে পুলু খেলে।" পাটভাঙা একটি চাদরে জিকোকে মুড়ে গাড়ীর দিকে এগোলেন ভদ্রলোক। পিছনে শোকে মুহ্যমান তার স্ত্রী। রমেন ট্যাক্সির পিছনের দরজাটা খুলে দিয়ে ড্রাইভারের সীটে বসলো।

 বালির এই ঘাটটা বেশ নির্জন। একে তো বৃষ্টির রাত, তার উপরে কিছুদিন আগে খবরের কাগজ তোলপাড় করা এক কুখ্যাত খুনের ঘটনাস্থল ছিল এই জায়গা।  সন্ধ্যা হতে না হতেই জায়গাটি নির্জন হয়ে যায়। জি.টি.রোড থেকে একটু ভেতরে তাই গলিপথ ধরে ট্যাক্সি  একদম ঘাটের সামনে এসে দাঁড়ালো। সামনে হু...হু...গঙ্গা। কাছাকাছি জনবসতি বলতে হিন্দুস্থানী বিহারীদের দুই একটা বস্তি। রমেন নেমে পিছনের দরজা খুলে দিয়ে বলল " শাবল নিয়ে এসেছেন তো সাথে?" "ওহো হো...একদম ভুলে গেছি" ভদ্রলোককে কিঞ্চিৎ অসহায় লাগলো। কি করা যায় বলোতো ভাই?" বিরক্ত মুখে রমেন বললো "আপনারা গাড়ীতে বসুন..আমি দেখছি"

গলির মুখ থেকে দুজন হিন্দুস্থানী বস্তির কিশোরকে ডেকে নিয়ে এলো সে। একজনের হাতে শাবল। জিকোকে কোলে নিয়ে দম্পতি গাড়ী থেকে নেমে এলেন। "ওদের একটু টাকা দিতে হবে,আমি বলেকয়ে নিয়ে এসেছি"  "হাঁ...হাঁ..অবশ্যই" গঙ্গার ধারের নরম মাটিতে দেখতে দেখতে দুই ফিটের একটি কবর হয়ে গেলো। ভদ্রলোক ভদ্রমহিলা নীচু হয়ে ছেলেদুটির সাথে জিকোর কবরে মাটি লাগালেন। সব সারা হলে ভদ্রমহিলা আবার ডুকরে কেঁদে উঠলেন। "ম্যাডাম...রমেন বিরক্ত স্বরে বললো  এখানে কান্নাকাটি করলে মহল্লার লোকজন বেরিয়ে আসবে...কেস খেয়ে যাবেন।" পার্স থেকে টাকা বার করে হিন্দুস্থানী কিশোর দুটিকে দিতে দিতে ভদ্রলোক সর্তক করলেন "মনিকা চুপ করো। চলো গাড়ীতে বসি" এবার ফিরে যাবার পালা।  পিছনের সিট থেকে ভদ্রলোক সান্ত্বনা দিচ্ছেন স্ত্রীকে"শোনো আমি জানি জিকোকে ছাড়া তোমার খুব ফাঁকা লাগবে। আফটার অল ও তোমার সাথে সবসময় থাকতো। আমি দেখছি খুব তাড়াতাড়ি আরো একটা নিয়ে আসার। দেখো ভালো লাগবে" অস্ফুটস্বরে ভদ্রমহিলা কি বললেন বোঝা গেলো না। ট্যাক্সি বাড়ীর সামনে দাঁড়াল। ভদ্রলোক নেমে পার্স থেকে আরো একটা পাঁচশো টাকার নোট দিয়ে রমেনকে বললেন "থ্যাংক ইউ ভাই। এই ঝড়বৃষ্টির রাতে....সমস্যায় পড়েছিলাম। খুব উপকার হলো।

ফুরফুরে মেজাজে ফিরছিল রমেন।  আজ ভালোই কামিয়েছে। সারাদিনের সেই বিরক্তিভাবটা কেটে গেছে। টাকা এমন ই জিনিষ। রাত্রি সওয়া দশটা বাজে। রাস্তা মোটামুটি ফাঁকা বৃষ্টির রাত বলে। এখান থেকে মালিকের গ্যারাজটা অবশ্য বেশি দূর নয়। হঠাৎ গাড়ীর পিছন থেকে একটা আওয়াজ ভেসে এলো 'ঘাউ' কুকুরের ডাক। মূহুর্তে গায়ের লোম খাঁড়া হয়ে গেল তার। কি হল? জিকোর ভূত নাকি? পিছনে ঘাড় ঘুরিয়ে দেখল একবার। কিছু নেই। তবে কি ভুল শুনল? এক নি:শ্বাসে গাড়ি চালিয়ে গ্যারাজে পৌছে গেল সে। মালিকের পাওনা, গাড়ীর চাবি হস্তান্তর করে বলল " ডানদিকের ওয়াইপারটা কাজ করছে না । ওটা চটজলদি সারাও বস। না হলে প্রব্লেম আছে" উত্তর না দিয়ে ওর কাছ থেকে চাবি নিয়ে ট্যাক্সির সামনের দরজা খুলল মালিক। তারপর আচমকা বলল "আরে এটা কি?" পিছনের দরজা খুলে হাত বাড়িয়ে জিনিসটা নিল মালিক। দামী লেডিস পার্স। ব্যাগের মধ্যে একরাশ নোট, ব্যাংকের এ.টি.এম কার্ড, মেয়েদের রুমাল, হেয়ার ক্লিপ। হাত বাড়িয়ে মালিকের কাছ থেকে ব্যাগটা নিল রমেন "দিয়ে আসি, লাস্ট প্যাসেঞ্জার ছিল এক দাদা বৌদি। ওনারাই ফেলে গেছেন"
"বাড়ী চিনিস ওদের?"
"হ্যাঁ...হ্যাঁ...বাড়ীতেই তো পৌছে দিলাম।" মালিক এবার পিছনের দরজাটা বন্ধ করতেই আচমকা গাড়ীর ভিতর থেকে লাফ দিয়ে নামল একটা কুকুর। "আরে এটা কি করে ঢুকল?" মালিকের চীৎকার। রমেন হাঁ হয়ে গেছিল। তাহলে এটাই ডেকেছিল মাঝপথে। কিন্তু ঢুকল কিভাবে গাড়ীতে? যাই হোক এখন মালিক কে ম্যানেজ করতে হবে। কুকুরের লাশ নিয়ে গেছে এটা বলা যাবে না। "মনে হচ্ছে মালিক আমি যখন ওনাদের জিনিষ ডিকি থেকে বার করছিলাম, ওনারা ও নেমে এসেছিলেন ডিকির সামনে তখনই কোন ফাঁকে ও ঢুকেছে"
"যত্তসব। আজ তোর কি হয়েছে বল তো? লেডিস ব্যাগ...কুকুর...সব গাড়ী থেকে বেরোচ্ছে। এরপর কোনোদিন জ্যান্ত একটা মেয়ে লাফ দিয়ে বেরোবে। বলবি আমি কিচ্ছু জানি না...কখন ঢুকে পড়েছে"
হা হা করে হেসে রমেন বলল "গাড়ী কাল সকালে এসে সাফ করে দেব। যাই ব্যাগটা দিয়ে আসি।"

হনহন করে হাঁটছিল রমেন। বৃষ্টিটা একটু ধরেছে। রাস্তা মোটামুটি ফাঁকা। শুধু হুস হুস করে দুর্বার গতিতে বেরিয়ে যাচ্ছে একের পর এক গাড়ী। কি মনে হতে হঠাৎ পিছু ফিরে দাঁড়াল সে। হ্যাঁ যা ভেবেছে তাই। গাড়ী থেকে বেরোনো সেই পাটকিলে রঙের নিরীহ নেড়ি কুকুরের বাচ্চা। তার পিছু পিছু আসছে। কি চায় ওটা? খাবার...আশ্রয়? গাড়ীতে ঢুকল কিভাবে? যাকগে আর মনোযোগ না দিয়ে দ্রুত হেঁটে সে নির্দিষ্ট বাড়ীর সামনে চলে এলো। বেল বাজাতেই একটু নীরবতা। তারপর বারান্দার লাইট জ্বলে উঠল। সেই ভদ্রলোক আর তার স্ত্রী| "কি ব্যাপার? কিছু হয়েছে?" ভদ্রলোক  জিজ্ঞাসা করলেন।
"না...মানে ম্যাডাম ওনার পার্সটা গাড়ীর ভিতর ফেলে গেছিলেন।  ওটা ফেরত দিতে এলাম"
ভদ্রলোক গ্রিলের তালা খুললেন। "মনিকা দ্যাখো তোমার পার্সটা  ট্যাক্সিতে ফেলে নেমে এসেছো। জিকোর শোকে তোমার মাথার ঠিক নেই"
রমেন ভদ্রমহিলার দিকে তাকালো। এখন যদিও অনেকটা ধাতস্থ লাগছে ভদ্রমহিলাকে। কাজের মেয়েটা একটু  পর্দা সরিয়ে এসে দাঁড়িয়েছিল। তাকে গলা তুলে বললেন "বানী টেবিলে ভাত বাড়। আমরা আসছি।" তারপর রমেনের হাত থেকে ব্যাগটা নিয়ে নরম সুরে বললেন "থ্যাংক ইউ ভাই। আমার ভুলের জন্য আবার আপনাকে এতোটা আসতে হলো।"
"না...না ঠিক আছে। ওটা কোনো ব্যাপার নয়" রমেনের কথা শেষ হওয়ার আগেই তাকে ঠেলে ঢুকে পড়ল রাস্তার সেই কুকুরছানাটি। ছুটে চলে গেলো ভদ্রমহিলার কাছে। তার  পায়ের কাছে নাইটি ধরে টানতে লাগলো। ভদ্রমহিলা নীচু হয়ে মাথায় হাত ছোঁয়ালেন। "পুলু জিকো আর নেই রে। সব ফেলে চলে গেছে। আর আসবে না" কি বুঝল সেই অবুঝ সারমেয় সেই জানে। এক ছুটে চলে গেলো বারান্দার মেঝেতে থাকা জিকোর গলার চেনের কাছে। তীব্রভাবে শুঁকতে লাগলো মেঝে।
"একে আপনারা চেনেন? আরে এতো আমার ট্যাক্সির  মধ্যে ঢুকে পড়েছিল কিভাবে"
"হ্যাঁ ওতো পুলু, জিকোর বন্ধু, জিকো গ্রিলের ভিতরে চেন দিয়ে বাঁধা থাকত আর পুলু রোজ বাইরে থেকে জিকোর সাথে ভাব করতো। মাঝে মাঝে জিকোকে আমরা বাগানে ছেড়ে দিতাম। তখন এই পুলুর সাথেই ও খেলত। খুব খুশী হত পুলুকে দেখলে। পুলু ও রোজ আসতো" সেই বৃদ্ধা (ভদ্রলোকের মা)  বললেন "মনে হয় তোরা যখন চাদর মুড়ে জিকোকে কোলে করে গাড়ীতে উঠলি তখনি ও কোনো একটা সময় টুক করে
ঢুকে পড়েছে। ওর তো প্রানের বন্ধু ছিল জিকো"

সহসা এইসব সংলাপ থামিয়ে দিয়ে সেই ছোট্ট নামানুষটি মাটিতে বসে পড়ে উপরের দিকে মুখ তুলে করুণ স্বরে চীৎকার করে কাঁদতে শুরু করলো। সেই অবুঝ সখার তীব্র তীক্ষ্ণ দরদী আর্তনাদ শূন্য থেকে মহাশূন্যে ছড়িয়ে দিল এক আকুল প্রশ্ন....কোথায়....কোথায়....কোথায়...?

 

নবনীতা চট্টোপাধ্যায়
পশ্চিম বঙ্গ, ভারত

 

এই লেখকের অন্যান্য লেখা



আপনার মূল্যবান মতামত দিন:


Top