সিডনী মঙ্গলবার, ২৬শে জানুয়ারী ২০২১, ১৩ই মাঘ ১৪২৭

বকুল ফুল : সুতপা ধর চট্টোপাধ্যায়


প্রকাশিত:
২৬ নভেম্বর ২০২০ ১৫:১৫

আপডেট:
২৬ নভেম্বর ২০২০ ১৫:৪০

 

টোটো থেকে নেমে দৌড়ে ডাকবাক্সের সামনে আসতেই দুরদুর করে উঠল বুকটা। বসন্তবৌরি তড়িঘড়ি হাতে ডাকবাক্সটার বন্ধ ঢাকনাটা খুলল। আজও! আজও সেই এক জিনিস!ও কিছুতেই বুঝতে পারছেনা রোজ রোজ কে এভাবে ওর নামে ডাকবাক্সে এই একগোছা করে বকুল ফুল রেখে যায়।  একমাস হোল এই মেসে এসেছে ও। তারপর দিন সাতেক পর থেকে  পর পর বাইশ দিন ধরে এই একই ঘটনা ঘটে চলেছে। নাম নেই ঠিকানা নেই- শুধু খুব সাধারণ সাদা একটা খামে ভরে রাখা থাকে এই একমুঠো বকুল ফুল, খামের ওপর কাঁপা কাঁপা অক্ষরে লেখা থাকে- বসন্তবৌরি । ভেতর থেকে বকুল ফুলের ম ম করা গন্ধ কাগজের আবরণ ঠেলে বেরিয়ে আসে খাম খোলার আগেই। টোটো করে সঙ্গীত ভবন থেকে ফিরে মেস অবধি এই হাঁটা পথটুকু দৌড়ে পার করে সে- বকুল ফুলের টানে। মফঃস্বলের মেয়ে সে। ছোট থেকে বকুল ফুল কম দেখেনি। শিলিগুড়ির ভেতর ছোট্ট শহরতলিতে ওদের বাড়ির গলির মুখে সে এক মস্ত বড় বকুল গাছ ছিল। এখনো আছে। এই সময়ে গাছ ভরা বকুল ফুল উপচে পড়ে মাটিতে, সেই ছোট থেকে দেখে আসছে ও। সুতরাং বকুলের রূপ গন্ধ বর্ণ ওর অজানা নয়। কিন্তু এভাবে অচেনা অদেখা মানুষের রোজ রোজ তার নামে রেখে যাওয়া বকুল ফুলের অদম্য টান আলাদা এক অনুভূতির স্বাদ দিয়েছে ওকে। এই কদিনে বসন্তবৌরির স্বাভাবিক ছন্দের জীবনকে নাড়িয়ে দিয়েছে এই অতি চেনা ফুল।     

ফুল কটা হাতে নিয়ে রোজের মতো খানিকক্ষণ দাঁড়িয়ে থাকে বসন্তবৌরি। প্রতিদিনের মতো আজও মনটা ভালো লাগায় ভরে যায়, সেই সঙ্গে একটু একটু চিনচিনে কষ্ট কষ্ট সুখের অনুভূতি। এমন সুন্দর করে ওর জন্য রেখে যাওয়া উপহারের প্রেরক কে তা ওর জানা নেই। প্রথম দিন বেশ হকচকিয়ে গেছিল ও। মেসের রুম মেটরা কম হাসাহাসি করেনি।দিন রাত সকাল সন্ধে জানলা খুলে খুলে কতবার যে দেখা হয়েছে কে এসে ফুল রেখে যাচ্ছে? মেস বাড়ির আশেপাশে কাউকে ঘুরতে হাঁটতে দেখলে মনে হয়েছে- এই সে নয় তো? শিল্পী আর চৈতি তো ধরেই নিয়েছে বসন্তবৌরির কোন অ্যাডমায়ারার বা প্রেমিকের কাজ এটা। দিন নেই, রাত নেই ওরা এখন ওকে যখন তখন বৌরি না ডেকে বকুল বলেও ডাকে। খুব যে খারাপ লাগে তা না, তবে কে সেই ব্যক্তি- তা জানার কৌতূহল বসন্তবৌরিকে বেশ ভাবায়। সময় নেই, অসময় নেই- যে কোন সময়ে ভাবায়।

আলতো হাতে ফুলগুলো নিয়ে নাকের সামনে এনে প্রাণ ভরে বকুলের গন্ধ নিল ও। তারপর মুখের কাছে এনে খুব আলগোছে চুমু খেল, মুগ্ধতায় দেখল তাদের বিভোর হয়ে।তারপর হঠাৎ মনে পড়ায় চারপাশ চকিতে দেখে নিল- ইশ! কেউ দেখে ফেলল না তো? সে যদি এখানেই আশেপাশে লুকিয়ে থাকে? তাড়াতাড়ি ফুলগুলো কাঁধের ঝোলা ব্যাগে ঢুকিয়ে নিয়ে দৌড়ে সিঁড়ি বেয়ে দোতলায় উঠে গেল সে।

 

“এখন আর দেরী নয় ধর গো তোরা হাতে হাতে ধর গো...” বৌরির বিছানায় বসে হারমনিয়াম নিয়ে গলা ছেড়ে গান গাইছে শিল্পী আর চৈতি। বৌরিকে দেখেই গান থামিয়ে একসাথে হৈ হৈ রৈ রৈ করে উঠল ওরা। “আজও হাতে বকুল ফুল?” “দে, দে, আমিও একটু শুঁকি” “অতো চটকাস না,  রাত অবধি গন্ধ থাকবেনা” – কিছুক্ষণ চলল, যেমন রোজ চলে।

এতো দেরী করলি বকুল? তোর ফুলের মালিকের দেখা পেয়েছিস নাকি?হাসতে হাসতে চৈতি জানতে চায়।

খুঁজতে তো যাইনি। গেছিলাম কলা ভবনে স্বর্নালীর সাথে।

এরকম করে কতদিন চলবে বৌরি? প্রশ্ন করে চৈতি।

কিরকম করে? খাটের পাশে রাখা বোতল থেকে জল খেতে গিয়ে থেমে গেল বসন্তবৌরি ।

এই যে  ফুল দেওয়া নেওয়ার পালা? ভারচুয়াল  ওয়ার্ল্ডের প্রেমিক প্রেমিকারাও  নিজেদেরকে এতো লুকিয়ে রাখেনা।

তুই এতটা সিওর হচ্ছিস কি করে যে ওর কোন প্রেমিকই ওকে ফুল দেয়? শিল্পী সামান্য বিরক্ত নিয়ে কথাটা বলে।

শোন , রোজ রোজ এভাবে লুকিয়ে চুরিয়ে ফুল দিয়ে যাওয়া রোম্যান্টিক প্রেমিকেরই লক্ষণ।  মাস্টার ডিগ্রি করতে এসে আশাকরি এটা তোদের বুঝিয়ে দিতে হবেনা।

বসন্তবৌরির মুখে চিন্তা কৌতূহল আর বিস্ময় ঠেলাঠেলি করে জায়গা করে নিয়েছে- এই সূর্য ডোবা বিকেলের  আলোয় তা স্পষ্ট। ঠোঁট দুটো নড়ল ওর- কি করে ধরতে পারি বুঝতে পারছিনা। কখন আসে কখন রেখে যায়, কিভাবে জানব?

নীচের বাড়িওয়ালা মাসিমাকে বলে রাখব? শিল্পী তাড়াতাড়ি সমাধান খোঁজে।

যাহ! মাথা খারাপ? ও বুড়ি এই নিয়ে তুলকালাম করবে। ভাববে আমরা বোধহয়... কি যেন বলে- “বেলেল্লাপনা” করে ফেলছি।

চৈতির বলার ধরণে সবাই হেসে ফ্যালে।

এই ,চা দেবেনা  ছোটু?  পাঁচটা তো বেজে  গেছে। চৈতি প্রসঙ্গ পাল্টায়।

দেবে দাঁড়া! এই তো সবে পাঁচটা বাজল। চৈতি টা একেবারে পাক্কা চা খোর। শিল্পী আড়মোড়া ভাঙতে ভাঙতে বলে।

বলতে বলতে হাতে কেটলি  নিয়ে ঢুকল  ছোটু।

ওরে ছোটু, এতো দেরী কেন করিস বাচ্চা?

লাজুক মুখে একবার বসন্তবৌরি র দিকে তাকিয়ে নেয় ছোটু।- দেরী হয়ি গেল।

টেবিলে রাখা কাপ গুলোকে সোজা করে তিনটে কাপে চা ঢালে ছোটু।

এই ছোটু তোর বয়েস কত রে? চৈতি জিজ্ঞেস করে।

তেরো।

কেটলিটার বয়েস? মজা করে বসন্তবৌরি।

ছোটুলাজুক হেসে মাথা নাড়ে- সে জানে না।

যা পালা। দোকান ফেলে এসেছিস।  শঙ্কর কাকু বকবে। বসন্তবৌরি তাড়া দেয়।

ছোটু চলে যেতে গিয়ে ফিরে আসে- কাল থেকি আর দেরী হবেনি।

এই ছোটু শোন, একটা কাজ করে দিতে পারবি?

ছোটু দুটো  বড় বড় চোখ তুলে বসন্তবৌরির দিকে তাকায়।

বসন্তবৌরি বলে- তুই কাজের ফাঁকে ফাঁকে এসে একবার করে আমাদের নিচতলাটা দেখে যেতে পারবি?

কেন? প্রশ্ন করে ছতু।

তুই আমাদের গেটের পাশের ডাকবাক্সটা দেখেছিস?

অতো নজর করিনি। সে দেখি নিব। কিন্তু কেন?

এতক্ষণ চৈতিরা অবাক হয়ে বসন্তবৌরির কথা শুনছিল। এবার চৈতি মুখ খুলল-

ওকে বলছিস কেন? ও কিভাবে দেখবে? ওর চায়ের দোকান থেকে কি আমাদের মেস দেখা যায়? সে তো গলি পেরিয়ে বাঁক নিয়ে আরও কিছুটা যেতে হয়।

বলো না, কেন? ছোটু  জিজ্ঞেস করে।

তোকে দেখতে হবে আমাদের ওই ডাকবাক্সে কে এসে রোজ একটা করে সাদা খাম রেখে যায়?

ছোটু কিছু বলার আগেই চৈতি বলে ওঠে- তোর মাথাটা গ্যাছে রে বকুল। কোন সময়ে রাখছে তা কি তুই নিজেও জানিস যে ওকে সেই সময়ে আসতে বলবি? ও কি কাজকম্ম ছেড়ে এখানে দাঁড়িয়ে থাকবে?

শিল্পী মধ্যে  বক্তব্য রাখে- আর তাছাড়া শঙ্কর কাকু জানতে পারলে ওকে কাজ থেকে ছাঁটাই করে দেবে।

ছোটু বড় অস্বস্তিতে পড়ে যায়। কি উত্তর দেবে ভেবে পায় না।

তুই পালা রে ছোটু। এবার কিন্তু তোকে খুঁজতে লেগে যাবে তোর কাকু। ছোটুকে যেন বাঁচিয়ে দিল চৈতি।

ছোটু কেটলি হাতে দৌড় লাগাল।

বসন্তবৌরি ফুলগুলো হাতে নিয়ে শুঁকল।

তোর ভালো লাগে রোজ ফুল পেতে? প্রশ্ন করে শিল্পী

উত্তরের পরিবর্তে হাল্কা মিষ্টি একটা হাসি ফিরিয়ে দেয় বসন্তবৌরি। আর একবার ফুলগুলোর সুবাস নিয়ে জানলার কাছে গিয়ে সন্ধে নামা দ্যাখে। ফিসফিস করে বলে- শিলিগুড়ির কথা মনে পড়ে।

 

সঙ্গীত ভবন থেকে যখন একা বেরিয়ে আসে বসন্তবৌরি তখন হাতঘড়িতে  এগারোটা বাজতে পাঁচ। আজ অনেক সকাল থেকে ক্লাস শুরু হয়েছে কিন্তু একটা ক্লাসও মন দিয়ে করতে পারছেনা ও। মাথাটা দপদপ করছে তীব্র যন্ত্রণায়, সেই সঙ্গে গা গোলানি। বাকি ক্লাস ফেলে রেখে মেসে ফিরে আসে ও। ডাকবাক্সের সামনে দাঁড়ায়। খালি  বাক্স। চমকে ওঠে বুক। তার মানে এখনো ফুল দিতে আসেনি সে! বসন্তবৌরি যেন হঠাৎই শুনতে পেল ওর নিজের হৃদপিণ্ডের শব্দ, যেন বুকের বাঁ দিক থেকে উঠে এসে কানের  খুব কাছ থেকে ধুকপুক শব্দ তুলে জানান দিচ্ছে তার অস্তিত্ব।   আর এক মুহূর্তও না দাঁড়িয়ে মেসের ভেতর  ঢুকে যায় ও। দৌড়ে  ওপরে উঠে সমস্ত জানলা বন্ধ করে দেয়। শুধু বাইরের গেটের দিকের জানলাটা খুব সরু করে খুলে রাখে। সেখানে চোখ রেখে ঠায় দাঁড়িয়ে থাকে ও। নড়াচড়া ভুলে যায়।

সময় নিজের ছন্দে বয়ে চলে...  এক ঘণ্টা অতিক্রম হয়ে যায়...

শেষে বসন্তবৌরি যা দ্যাখে তাতে ওর বিস্ময়ে চোখের পলক পড়েনা। চোখ কচলে নেয়- ঠিক দেখছে তো! পা শিথিল হয়ে যায়। ধপ করে মাটিতে বসে পড়ে ও। অন্ধকার ঘরে হাতড়াতে থাকে উত্তর।

 

ক্লাস থেকে ফিরে চৈতি আর শিল্পী দ্যাখে অকাতরে ঘুমোচ্ছে বসন্তবৌরি। দু একবার ডেকে সাড়া পায়না ওরা।

বিকেলে ছোটু চা নিয়ে এলে ধীরে ধীরে উঠে বসে বসন্তবৌরি। চায়ের কাপটা হাত বাড়িয়ে নিতে গিয়ে খপাত করে ছোটুর হাত চেপে ধরে বসন্তবৌরি। ছোটু ভীষণ চমকে ওর বড় বড় চোখ তুলে তাকায়।

আমাকে ফুল দিস কেন রোজ? নিক জোনাস ভাবিস নাকি নিজেকে? আমাকে কি তোর প্রিয়াঙ্কা  চোপড়া লাগে?  বল? শিগগির বল? চুপ করে আছিস কেন? চোখ দিয়ে আগুন ঝরে পড়ে বসন্তবৌরির। রাগে গলার শিরা ফুলে ওঠে ওর।

ঘাবড়ে গিয়ে কেঁদে ফ্যালে ছোটু। শিল্পী আর চৈতি বিস্ময়ে থ।

উত্তর দে। না হলে কিন্তু তোর শঙ্কর কাকুকে সব বলে দেব। খুব পেকেছিস তুই, না রে? জানিস আমি তোর চেয়ে কত বড়?

কাঁদতে কাঁদতে হেঁচকি  তুলতে তুলতে ছোটু বলল- আমার দিদিটা গত বছর নদীতে চান করতি গিয়ে বানের জলে ভাসি গিয়েছে। দিদিটা আমাকে খুবোই ভালবাসত। এক্কিবারে তোমার মতো দেখতি ছিল ওরে। নাকের পাশে ঠিক অমন একটা তিল, চুলগুলা ঠিক অমনি কুচকানো, মোটা ঠোঁট আর এক্কিবারে তোমার মতন হাসে আর কথা বলে। দিদিটা বকুল ফুল ভালবাসত। আমাকে তুলি আনি দেতে হত।  আমাকে ক্ষমা করি দাও গো, আর কক্ষনো করব নিকো, এই কান ধরি বলছি...

এক নাগাড়ে ফুঁপিয়ে হেঁচকি তুলে কথা গুলো বলে হাঁপিয়ে গেল ছোটু।

কিছুক্ষণ কোন কথা বলতে পারল না বসন্তবৌরি। তারপর সম্বিৎ ফিরতে  খুব আদর মাখানো গলায় জিজ্ঞেস করল- লুকিয়ে দিতিস কেন?

আমি তো গরীব। চায়ের দুকানে কাজ করি। যদি তুমি আমার ফুল না নাও, সেই জন্যি।

বসন্তবৌরি দু হাতে জড়িয়ে ধরল ছোটুকে।

 

 সুতপা ধর  চট্টোপাধ্যায়
সোদপুর, কলকাতা-১১০

 

এই লেখকের অন্যান্য লেখা



আপনার মূল্যবান মতামত দিন:


Top