সিডনী মঙ্গলবার, ২৬শে জানুয়ারী ২০২১, ১৩ই মাঘ ১৪২৭

চৌকাঠে কালো ছায়া : শরীফ উদ্দীন


প্রকাশিত:
২৬ নভেম্বর ২০২০ ১৬:১৩

আপডেট:
২৬ জানুয়ারী ২০২১ ০৮:২৬

 

কিছুক্ষণ আগের বৃষ্টির কারণে শীতকালের স্যাঁতসেঁতে বিকেল। ছুটির দিনে এমন আবহাওয়ায় কারও বাইরে বের হতে ইচ্ছে করে না। যেখানে যাওয়ার উদ্দেশে বাড়ি থেকে বের হতে হয়েছে সেখানে না পাঠিয়ে মা বরং আমাকে ফাঁসিকাষ্ঠে যেতে বললে হয়তবা এতটা ইতস্তত বোধ করতাম না।

শীতের দিনের এমন আবহাওয়ায় মটর সাইকেল নিয়ে বের হতে ইচ্ছে করল না। সবে সাড়ে তিনটা কিন্তু বৃষ্টি ছাড়লেও মোড়ে তেমন অটোরিকশা দেখছি না। যে দুতিনটি আছে কেউ যেতে রাজী হল না। একটি খালি অটোরিকশা এদিকে আসছে দেখে হাত তুলে ইশারা করলাম। দত্তপাড়া এখান থেকে আট-দশ কিলোমিটারের রাস্তা। ভাড়া মিটিয়ে উঠা ভালো। আমি গন্তব্য স্থানের নাম বলে ভাড়া জিজ্ঞাসা করতেই রিকশাচালক উত্তর দিল, ‘একদিকে শীত, তার উপর আকাশের অবস্থা দেখে মনে হচ্ছে আবার বৃষ্টি শুরু হতে পারে। দ্বিগুণ ভাড়া দিলেও কোনো রিকশাচালক অতদূরে যাবে কি-না সন্দেহ। আজ আর রিকশা চালাবো না। দত্তপাড়া আমার বাড়ির পথে পড়ে। আমার রিকশায় গেলে পথে রেলওয়ে মসজিদের সামনে আপনাকে রিকশায় বসে কয়েক মিনিট অপেক্ষা করতে হবে। ছোটো একটি কাজ আছে। ভাড়া আপনার বিবেক-বিবেচনা মতো দিলেই চলবে।’

রিকশাচালক ভাড়ার বিষয়ে আমার বিবেকের দোহাই দেওয়ায় ক্ষণিকের জন্য নিজেকে ব্যঙ্গ করে বুকের ভিতরে হাসি পেল। মনে মনে বললাম, ‘এই তপু উকিলের বিবেকবোধের উপর মানুষের থুতুর আস্তরণের খবর যদি জানতে তুমি!’

এমন দিনে রিকশা পেয়েছি সেটাই অনেক। উঠে পড়লাম। আমাকে এখন নামে অনেকেই চিনে। রিকশাচালকও সেই অনেকের মধ্যে একজন হলেও হতে পারে। রিকশা চলতে শুরু করলে বললাম, ‘আমি জায়গাটা ঠিক চিনি না। আপনি আমাকে দত্তপাড়ার নিমতলাতে নামিয়ে দিবেন। সেখানে নেমে আবেদ আলির বাড়ি বললেই না-কি সবাই দেখিয়ে দিবে?’

আমার কথা শুনে রিকশাচালক মন্তব্য করল, ‘আবেদ আলি চাচাকে আশেপাশের মহল্লারও সবাই চিনে। ভাইজান, চাচার বাড়ি যাচ্ছেন যখন তাহলে নিশ্চয় সেই ঘটনা আপনারও জানা? বিবাদী পক্ষের উকিলের উল্টা-পাল্টা প্রশ্ন শুনে, কষ্টে মাথা খারাপের জোগাড় না হলে কোনো মেয়ে কাঠগড়ায় দাঁড়িয়ে নিজের সম্পর্কে অমন কথা বলে? আবেদ আলি চাচার মেয়ের কথা বলছি।’

আমিই যে বিবাদী পক্ষের সেই উকিল, বেচারার স্বপ্নেও তা কল্পনা করার কথা নয়। কয়েক মিনিট না যেতেই আমাকে নিয়ে তার অভিপ্রায়ের কথা জানাল, ‘উকিলটার মুখ চেনা থাকলে ভালো হতো। জীবনে কখনও আমার রিকশায় পেলে সামনে বাস-ট্রাক দেখলে হ্যান্ডেলটা সামান্য ডানে ঘুরিয়ে রিকশা থেকে দিতাম লাফ। সোজা বাস-ট্রাকের তলে গিয়ে মর এবারে! এমন মানুষ মরার আনন্দে রিকশার শোক ভুলে যেতাম।’

আমি ছোটো। বোন দুজন বড়। দুজনেরই বিয়ে হয়ে গেছে। এক মামা ছাড়া আমার আত্মীয়-স্বজন সব ইন্ডিয়ায়। কলেজে পড়ার সময় ক্যান্সারে বাবার অকাল মৃত্যু হলে অভাব কী জিনিষ তা হাড়ে হাড়ে টের পেয়েছি। বিথী বয়সে বছর তিনেকের ছোটো ছিল। আমার অনার্স তৃতীয় বর্ষ । বিথীর সাথে সম্পর্কের বিষয়টি জানাজানি হয়ে গেল। অভাবী ঘরের ছেলে হয়ে অবস্থাসম্পন্ন পরিবারের মেয়ের দিকে হাত বাড়ানোর জন্য বিথীর ঠিকাদার বাবার আমাকে রাস্তায় দাঁড় করিয়ে রাগে সবার সামনে কান মলে দেওয়ার ঘটনাটা এখনও যন্ত্রণা দেয়।

লোকে ভাবে, টাকার প্রতি আমার লোভ কিন্তু আমি জানি, এটা আমার জেদ। শিক্ষিত হলেও অভাবী হওয়ায় ভালোবাসার মানুষকে একদিন হারাতে হয়েছিল। ওকালতি পেশার শুরুতেই মাথায় ঢুকিয়ে নিয়েছিলাম, অপরাধীকে শাস্তি দেওয়ার জন্য মানুষ যতটা চেষ্টা করে, অপরাধী শাস্তির হাত থেকে বাঁচার জন্য তার চেয়ে হাজারগুণ বেশি মরিয়া হয়ে উঠে, টাকা খরচ করতে দ্বিধা করে না। এ পেশায় অর্থ-বিত্ত করতে হলে বাদী নয়, বিবাদীর হয়ে মামলা লড়তে হবে। সিনিয়রের অধীনে বেশি দিন কাজ করার ধৈর্য আমার ছিল না।

আরেকটি বিষয়ে সজাগ থাকতাম, মামলার বাদীদের সিন্ডিকেট নেই কিন্তু বেশ কিছু মামলার বিবাদীরা সিন্ডিকেটের সদস্য। মাদক, জালটাকা, মানবপাচার মামলার আসামিদের জামিন করাতে পারলে একদিকে টাকা যেমন বেশি তেমনি তাদের মাধ্যমে হাতে সিন্ডিকেটের অন্যান্য সদস্যদের মামলাও আসে।

এদেশের বিচার ব্যবস্থার ফাঁক-ফোঁকর ভালো মতো রপ্ত করা থাকলে ঝুঁকি নেওয়া সহজ হয়। একগুণের জায়গায় তিনগুণ টাকা ফেঁড়ে নেওয়ার জন্য ফন্দি-ফিকির করা যায়। জামিন পাওয়ার আনন্দে মক্কেলও হাসি মুখে দিয়ে দিত। জামিন আজ না হোক, কাল হবেই। আসামির পরিবার আমার ফিসের কথা জিজ্ঞাসা করলে আস্থা অর্জনের জন্য মামলা বুঝে অভয় দিতাম, ‘জামিন করাতে পারলে টাকা নয়তবা নয়। কাজ করতে সফল না হলে আমি টাকা নিই না।’

অনেকেরই ভুল ধারণা, জামিন মানেই মামলার দায় থেকে অর্ধেক বেরিয়ে আসা। জামিনের দিনেই ধান্দা অনেকটাই পুরো করে নিতাম।

প্রতিটি থানায় সোর্স হিসাবে কিছু লোক কাজ করে। এরাও ছোটোখাট অপরাধী। কার নামে, কবে, কী মামলা হলো এদের কাছে সেই সংবাদ সংগ্রহ করা মামুলি বিষয়। থানার এসব সোর্সদের অনেকের সাথেই নিয়মিত যোগাযোগ রাখতাম। ভারি মামলার আসামীকে মক্কেল হিসাবে নিয়ে এলে তাদের বখসিসটাও ভারি হতো। বখসিস হাতে পেয়ে আনন্দে আসামির পকেটের ওজন সম্পর্কে ধারণা দিতে দেরি করত না। সোর্সদের ক্ষেত্রে আরেকটি সুবিধা, এদের মাধ্যমে কোন তদন্ত কর্মকর্তার নিজের ইউনিফর্মের প্রতি শ্রদ্ধাবোধ কতটা অটুট সেই খবরও পাওয়া যায়।

পঁচিশ বছর আট মাস বয়সে কোর্টের বারান্দায় প্রথম পা রাখি। সরল পদ্ধতির ধারে-কাছে না গিয়ে বাঁকা কৌশল বেছে নেওয়ার জন্য মাত্র সাত-আট বছরের ওকালতি জীবনে যতটাকা আয় করেছি সোজা পথের অনেক জ্ঞানী-গুণী আইনজীবী চৌদ্দ বছরেও ততটাকা আয় করতে পারেননি। এমন ধরণের অভিজ্ঞতাও আছে, জালটাকার আসামিকে খালি হাতে জামিন করে দিয়েছি। সেই আসামি জেল থেকে বের হয়ে পুনরায় জালটাকার ধান্দা করে আমাকে দুহাত ভরে সাদাটাকা দিয়ে গেছে।

অনেক বিজ্ঞ সিনিয়র মাঝে মাঝে উপদেশের ছলে আমাকে এমন কৌশল থেকে বের হয়ে আসার তাগিদও দিয়েছেন কিন্তু এক কান দিয়ে ঢুকিয়ে আরেক কান দিয়ে বের করে দিয়েছি। মামলায় জিততে হলে অনেক পড়তে হয়। এই পড়ার বিষয়ে আমার কোনো গাফিলতি নেই। দেশ-বিদেশের অনেক কেস স্টাডি আমার মুখস্ত।

বহুল আলোচিত ঘটনা। সামাজিক মিডিয়ায় ভাইরাল হয়েছিল। আমার জ্ঞানী-গুণী অনেক সিনিয়র বিবাদী পক্ষকে ফিরিয়ে দিয়েছেন। মামলা হাতে নেননি। আমি যেন ওঁৎ পেতে ছিলাম। সুযোগ পেতেই খপ করে ধরে ফেললাম। গণধর্ষণ মামলার আসামি পক্ষের আইনজীবী। পেপারে পড়েছিলাম, ‘মেয়ের মুখ না-কি বাবার কাছে ইরানি মেয়েদের মতো সুন্দর লাগায় বাবা আদর করে বাদীনির নাম রেখেছিলেন ইরানি। কতিপয় পিশাচ সেই মেয়ের জীবনটাই অসুন্দর করে দিল….।’

কয়েক মাস আগে অন্য একটি মামলার শুনানি শেষে আদালত মূলতবী হওয়ার পর জেলা জজ সাহেব আমাকে বললেন, ‘অ্যাডভোকেট সাহেব, দেশের স্বার্থও একটু দেখতে হয়।’

মৃদু হাসি দিয়ে উত্তরে মন্তব্য করলাম, ‘কি করব, স্যার? আমাকে যে আবার মক্কেলের স্বার্থও দেখতে হয়।’

মামলা হাতে নিলে এজাহার-তদন্ত রিপোর্ট-বিপরীত পক্ষের সবার বয়ান খুঁটিয়ে খুঁটিয়ে বিশ্লেষণ করা ছাড়াও আমি আরও দুটি কাজ নিয়মিত করতাম। সরেজমিনে ঘটনাস্থল পরিদর্শন আর বিপরীত পক্ষ ও তাদের সাক্ষীদের লাইফ হিস্ট্রি স্টাডি করা। এই বিষয়গুলি কখনও কখনও কাজে লাগে। জীবনে কোনো নেগেটিভ ঘটনা থাকলে জেরার সময় যেভাবেই হোক সেটা তুলে এনে অপ্রস্তুত করে ফেলার চেষ্টা করা সহজ হয়। জেরার শুরুতেই নার্ভাস করে দিতে সক্ষম হলে অনেকেই ঠিক মতো গুছিয়ে উত্তর দিতে পারে না। বিশ্ববিদ্যালয় জীবনে ডিবেটিং ক্লাবের সদস্য ছিলাম। তদন্ত রিপোর্ট কিংবা এজাহারের সাথে বিপরীত পক্ষের সাক্ষীদের বয়ানের সামান্য পার্থক্য পেলে উপস্থিত বুদ্ধির উপর জেরা করে সেটাকে সাগর সমান ব্যবধানে নিয়ে যাওয়ার সুনাম কিংবা দুর্নাম অর্জন করতে বেশি দিন সময় লাগেনি।

ঘটনার সত্যতা নিয়ে বিচারকের মনে কোনো সন্দেহ না থাকলেও লাভ নেই। এজাহার, তদন্ত রিপোর্ট আর সাক্ষীদের বয়ানের মধ্যে কতটা সামঞ্জস্য আছে মামলা টিকে তার উপর ভিত্তি করে। আমার চেষ্টা থাকত এই তিনটির মধ্যে সামঞ্জস্য নেই তা প্রমাণ করা।

গণধর্ষণ মামলার এক নম্বর আসামির নাম সিরফাত আহসান। জেলগেটে আমার সামনে সিরফাতের স্বীকারোক্তি, ‘নেশার ঝুলে হয়ে গেছে। বাড়িতে মানুষ বলতে বাবা-মা আর আমি। বাবা-মা চট্রগ্রামে বোনের কাছে যাওয়ায় বাড়ি ফাঁকা। সকালের নাস্তা করা হয়ে গেলে দুপুরে বাইরে খাব বলে কাজের মেয়েকে বিদায় করে দিই। ফোন দিয়ে দুবন্ধুকে ডেকে নিলাম। সকাল এগারোটা থেকে তিন বন্ধু আমার ঘরে বসে ইয়াবা খেতে শুরু করি। তখন সাড়ে বারোটার মতো হবে। কলিং বেল বেজে উঠল। নিজের ঘরের দরজাটা ভিড়িয়ে দিয়ে আমি বাইরের দরজা খুলে দেখি, আমারই সমবয়সী চব্বিশ-পঁচিশ বছরের একটি সুন্দরী মেয়ে।’

এক মনে সিরফাতের কথা শুনে যাচ্ছি। সিরফাত সময় নিতেই আমি বললাম, ‘থামার দরকার নেই। যেটা সত্য সেটা বলে যাও। আমার সামনে মিথ্যা বললে আমি তোমাদেরকে সাহায্য করতে পারব না।’

সিরফাত আবার কথা শুরু করল, ‘বাংলাদেশের ইন্টারনেট ইউজারদের উপর একটি কোম্পানি না-কি জরিপ করছে। মেয়েটির অনুরোধ, আমি যদি তাকে তথ্য দিয়ে সহায়তা করি? ড্রইং রুমে বসতে দিয়ে নিজের ঘরে ঢুকে বন্ধুদের মেয়েটির কথা জানালাম। তিন জনই নেশায় বুদ হয়ে আছি। ইয়াবা সেবনের পর সাময়িকভাবে অনেকের মধ্যে কিছুটা কার্তিক মাসের কুকুরের লক্ষন ভর করে। তুহিন চোখ টিপ মারতেই বদ মতলব মাথায় ঢুকে গেল। আবাসিক এলাকা। সম্ভ্রান্তদের বাস। বাসায় কোনো মেয়ে মানুষ নেই এটা কল্পনাও করতে পারেনি। আমি মেয়েটির প্রশ্নের উত্তর দিয়ে যাচ্ছি। মিতুল মেয়েটিকে এমন বিনয়ী কণ্ঠে সালাম দিয়ে ড্রইং রুমে ঢুকল যে, মেয়েটির পক্ষে কোনো কিছু আঁচ করা সম্ভব ছিল না। তুহিন ঘরে ঢুকে মেয়েটি কোনো কিছু অনুমান করার আগেই হঠাৎ মুখ চেপে ধরল। তারপর তিন জনে মিলে চ্যাংদোলা করে আমার ঘরে নিয়ে আসি। ভেবেছিলাম, নিজের মান-সম্মানের কথা ভেবে চেপে যাবে কিন্তু আমাদের হাত থেকে ছাড়া পেয়ে গেটে গিয়ে বুক ফাটিয়ে আর্তনাদ-চিৎকার- চেঁচামেচি শুরু করল। অবস্থা খারাপ বুঝে বাসায় তালা দিয়ে পিছনের সীমানা প্রাচীর ডিঙিয়ে পালিয়ে যাই। মামলা-মোকদ্দমার মধ্যে গেলে নেটে ছেড়ে দেওয়ার ভয় দেখিয়ে মিতুল কয়েক সেকেন্ডের ভিডিও করে রেখেছিল। পরে ভয়ে মিতুল না-কি সেটা ডিলিট করে দিয়েছে কিন্তু ডিলিটের কথা বিশ্বাস করতে না পেরে ভিডিওটি উদ্ধারের জন্য রিমান্ডে মিতুলকে খুব মেরেছে। সামান্য তথ্য সংগ্রহকারির কাজ করা দেখে, মেয়েটি এতটা শিক্ষিত ভাবতে পারিনি।’


স্পর্শকাতর মামলা। দ্রুত নিষ্পত্তির জন্য কয়েক মাসের মধ্যেই মামলার শুনানি শুরু হলো।

 

তিন আসামিই রিমাণ্ডে স্বীকারোক্তিমূলক জবানবন্দী দিয়েছে। মেডিকেল রিপোর্টেও জোরালো আলামতও মিলেছে। শাস্তি থেকে রেহাই পাওয়ার উপায় নেই। চেষ্টা এখন, গুরু শাস্তির বদলে লঘু শাস্তির। এজন্য আমাকে প্রমাণ করতে হবে, ঘটনাটি ধর্ষণ নয়, ব্যাভিচার। যা হয়েছে মামলার বাদীনি ইরানি মেয়েটির সম্মতিতেই হয়েছে।

মুখে কাপড় ঢুকিয়ে দিয়ে দুজনে হাত-পা চেপে ধরে আছে আর তৃতীয় জন সর্বস্ব লুটে নিচ্ছে এমন বিভৎস দৃশ্য চোখের সামনে ভেসে উঠলেই গণধর্ষণের শিকার কোনো মেয়ের মাথা এলোমেলো হয়ে যাওয়া স্বাভাবিক। ব্রেইনের উপর প্রচণ্ড মানসিক চাপ পড়লে অনেক সময় কথাবার্তায় অসংলগ্নতা চলে আসে। পরের দিন ইরানিকে জেরা করার শুরুতেই এই কাজটি কীভাবে করব তার একটি ছক কষে নিলাম।

আলোচিত মামলা। আদালতে বিভিন্ন মিডিয়ার সাংবাদিকদের ভিড়। এজলাস কক্ষে মাননীয় বিচারক এলেন সাড়ে দশটার সময়। বিচারকের মাধ্যমে কাঠগড়ায় ডেকে নিয়ে ইরানির চোখের দিকে তাকিয়ে কথা শুরু করলাম, ‘দেখুন, বিবাদী পক্ষের আইনজীবী বলে আমি আপনার বিপক্ষে এমনটি ভাববেন না। আমরা যারা আইন পেশায় আছি তাঁদের কাজ হলো, ঘটনার সত্যতা প্রতিষ্ঠা করা। সেই সাথে মিথ্যা মামলার জেরে কোনো নির্দোষী যেন সাজা না পায় সে বিষয়ে সজাগ থাকা। মিথ্যা কথা দশবার বললে দশ রকম শোনায় কিন্তু সত্য কথা হাজার বার বললেও একই রকম থাকে। সেদিন কি ঘটেছিল মাহামান্য আদালতের সামনে দয়া করে সেটা আরেকবার বলুন।’



আমার কথা শেষ হতেই দেখলাম, ইরানির মুখ ফ্যাকাসে হতে শুরু করেছে। এতগুলি মানুষের সামনে নিজের অন্তর্বাস খুলে নেয়ার ঘটনার বর্ণনা দেয়া কোনো মেয়ের জন্য ভীষণ কঠিন কাজ। সেখানে ইরানিকে তাঁর গোপনাঙ্গ তিন আসামি কীভাবে ব্যবহার করেছে সেটা বলার অনুরোধ করেছি— হতবিহব্বল হয়ে না পড়ে যাবে কোথায়! ইরানি অসহায় দৃষ্টিতে মাননীয় বিচারকের দিকে তাকিয়ে আছে।

 

বাদী পক্ষের উকিল আমার কথার বিরোধীতা করলেন কিন্তু লাভ হলো না। ইরানি আড়ষ্ঠ স্বরে ঘটনার বর্ণনা দেয়ার চেষ্টা করতে লাগল।

 

আমার উদ্দেশ্য ছিল ইরানিকে বিব্রত করা। পুরো ঘটনা বলতে দেয়ার সুযোগই দেয়া যাবে না। স্বয়ং ইরানির মুখ থেকে ঘটনার পুরো বিবরণ শুনলে উপস্থিত ব্যাক্তিদের মনে বরং আমার তিন মক্কেলকে পিটিয়ে মেরে ফেলার বাসনা জেগে যেতে পারে। আমি ইরানিকে থামিয়ে দিয়ে অপর কাঠগড়ায় দাঁড়ানো তিন আসামিকে দেখিয়ে প্রশ্ন করলাম, ‘এই তিনজনের মধ্যে আপনার অন্তর্বাস কে খুলে নিয়েছিল তা মনে আছে?’

ইরানি আঙুল তুলে মামলার এক নম্বর আসামি সিরফাতকে নির্দেশ করার সাথে সাথে আমি তীব্র কণ্ঠে বিরোধিতা করলাম, ‘আপনি মিথ্যা বলছেন। ধর্ষণের আলামত হিসাবে আপনার যেসব পোশাক জব্দ করা হয়েছে তার মধ্যে কোনো অন্তর্বাস নেই। ধর্ষণ মামলার আলামত হিসাবে পোশাকের মধ্যে ফরেনসিক টেস্টের জন্য ধর্ষিতার অন্তর্বাসকে সব চেয়ে বেশি গুরুত্ব দেয়া হয়। মামলার এজাহার ও তদন্ত কর্মকর্তার রিপোর্টের কোথাও আমার মক্কেল সিরফাতের বিরুদ্ধে বাদীনির অন্তর্বাস খুলে নেওয়ার অভিযোগ নেই। অভিযোগ থাকবে কী করে সেদিন আপনি অন্তর্বাসই পরেননি। না-কি ঘটনার এতো দিন পর আজ মিথ্যা দাবি করবেন, অন্তর্বাসের কথা সেদিন আপনার মনে পড়েনি?’

 

আমার ব্যঙ্গাত্বক প্রশ্নে কিংকর্তব্যবিমুড় হয়ে পড়ায় উত্তরে ইরানি কী বলবে সেটার ভাষা খুঁজে পাচ্ছে না।

 

সিরফাতের আমাকে বলতে ছুটে গিয়েছিল। দুই নম্বর আসামি তুহিনের ভাষ্য অনুযায়ী, তাড়াহুড়ো করে পোশাক পরার সময় ইরানি সিরফাতের ঘরেই তার অন্তর্বাস ফেলে আসে। বাসা থেকে পালানোর সময় তুহিন সেটা পকেটে নিয়ে বের হয়ে রাস্তার পাশের ড্রেনে ফেলে দেয়।

আমি এবারে মাননীয় বিচারকের উদ্দেশে কথা শুরু করলাম, ‘দেখলেন, হুজুর, বাদীনি ভরা এজলাসে আপনার সামনে আঙুল তুলে দেখিয়ে দিয়ে কীভাবে আমার মক্কেলের বিরুদ্ধে অন্তর্বাস খুলে নেয়ার মিথ্যা অভিযোগ করলেন? অথচ এজাহারে অন্তর্বাসের উল্লেখই নেই। আসলে পুরো মামলাটাই সাজানো। সেদিন যেটা হয়েছে সেটা হলো, বাদীনির প্ররোচনায় ব্যাভিচারের ঘটনা ঘটেছে। ব্যাভিচারে লিপ্ত হয়ে সামাজিক ও ধর্মীয় রীতি-নীতি ভঙ্গের দায়ে শাস্তি হলে প্ররোচনাকারি হিসাবে সবার আগে বাদীনির শাস্তি হওয়া উচিত। হুজুর, বাদীনির বাসাকে কেন্দ্র করে চারিদিকে পাঁচ কিলোমিটারের পরিধির মধ্যে অর্ধ-লক্ষাধিক মানুষের বসবাস। প্রকৃত উদ্দেশ্য জরিপ কাজের ইন্টারভিউ হলে পাঁচ কিলোমিটার পথ ছাড়িয়ে বাদীনির আমার মক্কেল সিরফাতের বাসায় আসার দরকারই পড়ত না। বাদীনির বাসার দুএক কিলোমিটারের পরিধির মধ্যেই তথ্য সংগ্রহের কাজ শেষ হয়ে যেত। মামলার তিন অভিযুক্তই ধনী পরিবারের সন্তান। আমার মক্কেল সিরফাতের বাবা এই শহরের সব চেয়ে বড় স্বর্ণ ব্যবসায়ী। সিরফাত জুয়েলারির নাম শুনেনি এই শহরে এমন কোনো ব্যাক্তি আছে কি-না সন্দেহ। অভিযুক্ত তুহিনের বাবা তিনটি কোল্ডস্টোরেজের মালিক। তৃতীয় জনের বাবার রয়েছে টাইলস ফ্যাক্টরী। বাদীনি আসলে বড় কোনো সিন্ডিকেটের সদস্য— যাদের কাজই হচ্ছে ধনী পরিবারের সন্তানদের টার্গেট করে ফাঁদে ফেলে অর্থ দাবি করা আর অর্থ না পেলে ষড়যন্ত্রমূলক মামলা দিয়ে সম্ভ্রান্ত পরিবারের মান-সম্মানের হানি ঘটানো। শেষে যেটা হয়, ফাঁদে পা দিয়ে দেয়া সন্তানের ভবিষ্যতের কথা ভেবে ভুক্তভোগী পরিবারগুলি ষড়যন্ত্রকারিদের প্রস্তাব মতো মোটা টাকা গচ্চা দিয়ে আপোষ-মিমাংশা করে নিলে বাদী পক্ষ মামলা তুলে নেয়।’

আমার কথা শেষ হতেই এজলাস কক্ষে মৃদু গুঞ্জন উঠল। ইরানির পক্ষের আইনজীবী এরই মধ্যে তিনবার উঠে দাঁড়িয়ে আমার কথার বিরুদ্ধে আপত্তি জানালে আমার একই কথা, ‘মহামান্য আদালত, আপনার মাধ্যমে আমার সিনিয়র বন্ধুবর বাদী পক্ষের আইনজীবীর কাছে অনুরোধ আমাকে যেন কথা শেষ করার সুযোগ দেয়া হয়। তারপর উনার যত ইচ্ছে কথা বলবেন। বার বার উঠে দাঁড়িয়ে কথার মধ্যে কথা ভরে দিয়ে বিঘ্ন ঘটানোটা দুঃখজনক।’

মুখ দেখে বুঝতে পারছি, জজ সাহেব বিস্মিত হয়ে আমার কথা মনোযোগ দিয়ে শুনছেন। সেই সাথে আমাকে কথা বলতে মানা না করে, পেশাগত অবস্থানের কারণে যে মেধাটা আইনের সেবাতে ব্যয় করতে পারতাম, টাকার লোভে সেই মেধাটা নিচে নামতে নামতে কতটা গভীরে পৌঁছেছে তা পরিমাপের চেষ্টা করছেন। এটা নিয়ে আমার কোনো অস্বস্তি নেই। আসামিরা আমার জেরায় সন্তষ্ট হলেই আমি খুশি। যত বেশি সন্তষ্টি, নোটের বান্ডিল তত বেশি মোটা।

ইরানির দিকে তাকাতেই মানসিক তৃপ্তি পেলাম। চোখ বলছে, মাননীয় বিচারকের উদ্দেশে বলা আমার কথাগুলি শুনে ইরানির হিতাহিত জ্ঞান শূন্য হবার পথে। আমি ইরানির কাঠগড়ার একেবারে কাছকাছি গিয়ে পুনরায় শুরু করলাম, ‘আমার মক্কেলরা ফাঁদে পড়ে যাওয়ার পরও আপনার চাহিদা মতো টাকা না দেয়ায় তিনটি নামি-দামি পরিবারে সম্মান নিয়ে ছিনিমিনি খেলতে শুরু করে দিলেন? সাক্ষীর তালিকায় আবু রায়হান নামের একজনের নাম দেখলাম, আমার মক্কেলের নিকট-প্রতিবেশি অথচ আপনার পক্ষের এক নম্বর সাক্ষী। এরা কি আপনার দলের লোক? সিরফাতের মা-বাবা চট্টগামে যাওয়ায় বাসা ফাঁকা, এই সংবাদ নিশ্চয় আপনার পক্ষের সেই এক নম্বর সাক্ষী আবু রায়হান আপনাদেরকে দিয়েছিলেন? ধনী ও অভিজাত পরিবারের যেসব সহজ-সরল ছেলেকে ফাঁদে ফেলে ফাঁসানো যাবে আবু রায়হানরা তাদেরকে টার্গেট করে আপনার হাতে তুলে দেয়, তাই না? একটি মেয়ে এমন খারাপ…

 

যা ঘটল তা শুধু আমার কেন উপস্থিত সকলের কল্পনারও বাইরে। আমার সৃষ্ট মানসিক চাপ ইরানির সহ্য সীমার বাইরে চলে যাওয়ায় রাগে কাঁপতে কাঁপতে বুকের গভীরে জমে থাকা সবটুকু ক্ষোভ তীক্ষ্ন কণ্ঠে প্রকাশ করতে লাগল, ‘হ্যাঁ, আমি খারাপ। খুব খারাপ। শরীর দেখিয়ে মানুষকে প্রলুব্ধ করি। তিনজন পশুর আমার চরম সর্বনাশ করার বিচার চাইতে এসে এখন কি-না উল্টে আমাকেই? সেই ঘটনার পর থেকে সবার একই প্রশ্ন, আমি কেন তথ্য সংগ্রহ করতে সেই বাড়িতে গিয়েছিলাম? যেন আমার দোষেই সব ঘটেছে! আজ আবার উকিল সাহেবের আমাকে নিয়ে এসব কী উল্টা-পাল্টা মন্তব্য! মানসিক চাপ আর সহ্য করতে পারছি না। চাই না আমি বিচার।’



মা আব্দার পূরণে অসম্মতি জানালে কোনো শিশু যেমন এক পা মাটিতে ঠুকতে ঠুকতে জেদ প্রকাশ করে ঠিক তেমনইভাবে ইরানি ডান পা বার বার কাঠগড়ার পাটাতনে ঠুকছে আর কাঁদতে কাঁদতে করুণ বিলাপে একই কথা বলে যাচ্ছে, ‘চাই না আমি বিচার। আমারই দোষ।। আমিই খারাপ।’

আমার এমন অনুভূতি কখনও হয়নি।। কয়েক মিনিট আগে আমার মেধার নিচে নামার গভীরতা জজ সাহেব মাপতে পেরেছিলেন কি-না জানি না কিন্তু আমি পারছি। পাটাতনের উপর ইরানির প্রতিটি লাথি যেন আমার বুকে এসে পড়ছে আর বিবেকের উপর চাপা দেওয়া একেকটি পাথর গুড়িয়ে গিয়ে ছাতুতে পরিণত হচ্ছে।

 

জজ সাহেবের ইশারায় দুজন মহিলা কনস্টেবল গিয়ে ইরানিকে শান্ত করল।

 

ঘটনার আকস্মিকতায় এজলাস কক্ষে উপস্থিত সবাই হতভম্ব। পিন পতনের শব্দ নেই। কিছুক্ষণ নিরব থেকে জজ সাহেব আমার নাম ধরে কথা শুরু করলেন, ‘বিবাদী পক্ষের আইনজীবীকে এই মর্মে সতর্ক করা হচ্ছে যে, তিনি যেন ভবিষ্যতে মামলার বাদী-বিবাদী কিংবা সাক্ষীকে জেরা করার সময় তাদের উপর মানসিক চাপ পড়ছে কি-না তা খেয়াল রাখেন। আদালতে আবেগ নিয়ন্ত্রণে রাখতে হয়। বাদীনির এরূপ আচরণ-লাথালাথি আদালত অবমাননার শামিল। বাদীনির মানসিক স্বাস্থ্য ভেঙে পড়ায় আদালত উদ্বিগ্ন। সেজন্য নিতান্তই মানবিক কারণে এ আদালত বাদীনিকে এবারের মতো ক্ষমা করছে। বাদীনি মানসিকভাবে অস্থির থাকায় এ মামলার কার্যক্রম আজকের মতো মূলতবী ঘোষণা করা হলো।’

 

একেই বলে আগুনে ঘি পড়া। ইলেকট্রনিক মিডিয়ার যুগ। এজলাসের ঘটনাটি বিস্তারিতভাবে খবরে এসেছে। টিভিতে ‘গণধর্ষণ মামলার বিবাদী পক্ষের আইনজীবীর জেরার নামে কাঠগড়ায় চরিত্রহীনা প্রমাণের অপচেষ্টায় মানসিক চাপে বিক্ষুব্ধ হয়ে মামলা চালাতে ধর্ষিতার অনিচ্ছা প্রকাশ’ শিরোনামে ব্রেকিং নিউজ প্রচারিত হচ্ছে। প্রতিটি টিভি চ্যানেলে প্রায় একই রকম শিরোনাম। কাঠগড়ায় দাঁড়িয়ে ইরানির আর্তনাদের দুঘণ্টা পার না হতেই বিষয়টি ইউটিউব-ফেসবুকে ব্যাপকহারে ভাইরাল হতে শুরু করল। লাঞ্চের পর আমার দুটি মক্কেলের হাজিরা ছিল। কাছের একজন আইনজীবীকে সেই ভার দিয়ে সহকারিকে কোর্টে উপস্থিত থাকতে বলে বের হয়ে গেলাম।

 

অনুশোচনার আগুনে ভিতরটা পুড়ে যেতে শুরু করল। এতোক্ষণে মায়েরও সব কিছু জেনে যাবার কথা। অসময়ে ফিরতে দেখলে মায়ের দুশ্চিন্তা হতে পারে ভেবে নিরিবিলি কয়েক ঘণ্টা কাটানোর জন্য আমার মক্কেল নয়নতারা আবাসিক হোটেলের মালিককে ফোন করলাম।

 

প্রতিদিন বাসায় ফিরতেই মায়ের অভিযোগ, ‘আমার বয়েস হয়েছে। কারও জন্য রান্না করে খাবার বেড়ে অপেক্ষা করা ধৈর্যে কুলোয় না। বিয়ে-শাদি করে আমাকে মুক্তি দেয়া হোক।’



যা ভেবেছিলাম সেটাই। মায়ের মুখটা শুকনো দেখাচ্ছে। গর্ভের সন্তানকে শত শত মানুষ ধিক্কার জানালে কষ্ট হওয়াটা স্বাভাবিক। খাওয়া শেষ করে নিজের ঘরে ঢুকব এমন সময় মা আমাকে শুনিয়ে বলল, ‘সন্ধ্যার পর আমাকে কিছুক্ষণের জন্য বাইরে যেতে হবে।’

নিচে চেম্বার, উপরে আমরা মা-ছেলে থাকি। সহকারিকে চেম্বার খুলতে মানা করা ছিল। রাত দশটা বেজে গেছে। মক্কেল আসার সম্ভাবনা নেই। মা ফিরে এলে আমি চেম্বারে গিয়ে বসলাম। অনেক হয়েছে, আর নয়। আমার মতো কতিপয় ব্যাক্তির কারণে আইনজীবীদের প্রতি মানুষের শ্রদ্ধাবোধ কমে যাচ্ছে। চেয়ারে হেলান দিয়ে চোখ বন্ধ করে ভাবছি, কোন কোন মামলাগুলি ছেড়ে দিব। এমন সময় পায়ের সাড়া পেয়ে চোখ খুলে দেখি মা। আমি জোর করে প্রফুল্ল থাকার ভান করে মাকে উদ্দেশ্য করে অভয় দিলাম, ‘তুমি খামোখা আমার জন্য চিন্তা করছো। এক সময় সব ঠিক হয়ে যাবে।’

মাথায় বাজ পড়লেও এতটা অবাক হতাম না। এক দৃষ্টিতে কিছুক্ষণ আমার দিকে তাকিয়ে থেকে আমাকে হতবাক করে দিয়ে মা বলল, ‘তোকে গর্ভে ধরে আমি অনেক বড় পাপ করেছি, তপু।’

আমাকে কোনও কিছু বলার সুযোগ না দিয়ে মা কান্না সম্বরণের চেষ্টা করতে করতে চেম্বার থেকে বের হয়ে উপরে উঠে গেল। ধর্ষণ মামলার বাদীনিকে জেরার সময় বিব্রতকর পরিস্থিতিতে ফেলে দেয়ার জন্য মায়ের দেয়া এই শাস্তির চেয়ে বিচারক শাস্তি দিলে ঢের ভালো হতো। বুকের ভিতরটা মুহূ্র্তের মধ্যে আরও বেশি ফাঁকা হয়ে গেল।

হাতে যে কয়েকটি ধর্ষণ আর মাদক মামলা ছিল কয়েক দিনের মধ্যে সবগুলি ছেড়ে দিলাম কিন্তু মায়ের পক্ষ থেকে আমার সাথে সম্পর্কের ব্যবধানটা কমলো না।

আমার মামলা ছেড়ে দেয়ার তিন মাসের মাথায় ইরানির মামলার রায় বের হলো। তিনজন আসামিরই যাবজ্জীবন কারাদণ্ড হয়েছে। রায় শুনে মায়ের মুখটা সেদিন উজ্বল হতে দেখেছিলাম। রাতের খাওয়া। অনেকদিন পর মা আমার সাথে খেতে বসেছে। খাওয়ার শেষের দিকে জিজ্ঞাসা করল, ‘তপু, কাল আমার কুড়ি হাজারের মতো টাকা দরকার। দিতে পারবি? একশ টাকার নোট হলে ভালো হয়।’

 

তিন মাস পর মা আমাকে নাম ধরে ডাকল। আনন্দে ভিতর থেকে কান্না ঠেলে আসছে। কোনো রকমে নিজেকে সামলে নিয়ে বললাম, ‘তুমি চাইলে আরও অনেক বেশি হবে, মা।’

সবগুলি একশ টাকার নোটের কথা শুনে, টাকা কি করবে জানতে কৌতুহল জেগেছিল কিন্তু প্রশ্ন করলে পাছে মা অভিমান করে টাকা নিতে অস্বীকৃতি জানাতে পারে ভেবে চুপ থাকলাম। ঘুমাতে যাবার আগে সহকারিকে ফোন দিয়ে বললাম, ব্যাংকে যেতে হবে, পরদিন সকালে যেন সাড়ে নয়টার মধ্যে বাড়ি আসে।

 

কোর্টের শীতকালীন ছুটি চলছে। আমার প্রতি মায়ের অভিমান ভাঙার দিন পনেরো পরে দুপুরের খাবার খেয়ে ভাতঘুমের উদ্দেশে বিছানায় গা এলিয়ে দিতেই পর্দার ওপার থেকে আমার নাম ধরে ডাক দিয়ে ঘরে ঢুকে মা এসে পাশে বসল। আমি উঠে বসতেই মা বলল, ‘তোর উঠার দরকার নেই। তোকে কিছু কথা বলব শুধু শুনে যা। পরে মতামত দিস।’



আমাকে দেওয়ালের দিকে মুখ ফিরিয়ে শুতে বলে মা আমার মাথায় হাত বুলিয়ে দিতে দিতে কথা তুলল, ‘কাঠগড়ায় তোর মন্তব্য শুনে ইরানি খুব কষ্ট পেয়েছিল। তপু, কাল বিকেলে তুই একবার ইরানিদের বাসায় যাবি?’

আমি দেওয়ালের দিকে মুখ রেখেই মন্তব্য করলাম, ‘কোন মুখ নিয়ে যাব, মা? ওরা কী আমার সাথে কথা বলবে? তবুও তুমি যখন যেতে বলছো, আমি অবশ্যই যাব।’

আমাকে আরও কিছু কথা বলে মা উঠে গেল। বুঝতে পারছি, ঘুম হবে না। অনেক দিন পর আইনের বইয়ের বাইরে গিয়ে বহুবারের পড়া ম্যাক্সিম গোর্কির মা উপন্যাসটি মাথার কাছের সেলফ থেকে…

চিন্তায় ছেদ পড়ল। রিকশাচালকের কথায় সম্বিৎ ফিরে পেলাম, ‘ভাইজানের কী কিছু হয়েছে? অন্যমনস্ক দেখাচ্ছে। দুতিন মিনিট আগে রিকশা থামিয়েছি। তবুও নামছেন না? এটাই নিমতলা। রাস্তার ওপারের আশা অফিসের পাশের বড় গলিতে আবেদ আলী চাচার বাড়ি।’

সারাদিন সূর্যের মুখ দেখা যায়নি। আকাশে মেঘ জমে আছে। মনে হচ্ছে, চারিদিকে সন্ধ্যা নেমে গেছে।

কলিং বেলে চাপ দেয়ার কয়েক মুহূর্তের মধ্যে বাইরের ঘরের দরজা খুলে আমাকে দেখে বিস্মিত কণ্ঠে বলল, ‘আপনি! একটু দাঁড়ান, আমি বারান্দার গ্রীলের তালার চাবি নিয়ে আসছি।’

 

প্রচণ্ড ইতস্তত বোধ করছি। কীভাবে কথা শুরু করব বুঝতে পারছি না।

 

আমার অবস্থা টের পেয়ে সহজ করার জন্য ইরানি নিজের পরিবারের কথা দিয়ে শুরু করল, ‘তিন ভাই-বোনের মধ্যে আমি বড়। ছোটো দুজন ভাই। যমজ। মা আছেন তবে বিছানা থেকে উঠতে পারেন না। আমার সেই ঘটনার কয়েক দিনের মাথায় মায়ের বড় ধরনের স্ট্রোক হয়। বাবা প্রায় ষোল বছর ধরে কাতারে। দুবছর পর পর দুএক মাসের জন্য দেশে আসেন। আমার কথা শুনে শেষের বারে যখন আসেন শুধু সেবারে প্রায় তিন মাস ছিলেন।

সংকোচ কাটিয়ে অনুতপ্ত কণ্ঠে বললাম, ‘সেদিনের ঘটনার জন্য আমি অনুতপ্ত। আমার এখন…


আমাকে থামিয়ে দিয়ে ইরানি বলে উঠল, ‘যা হবার হয়ে গেছে। সেদিনের কথা তোলার দরকার নেই। তাছাড়া মা আমাকে পুষিয়ে দিয়েছেন।’

 

বিস্মিত কণ্ঠে আমার প্রশ্ন, ‘মা?’


আমার বিস্ময় দেখে ইরানি উত্তর দিল, ‘আমি আপনার মায়ের কথা বলছি। কেন, আপনি কিছু জানেন না? যেদিন আপনি আমাকে জেরা করেন সেদিন সন্ধ্যার পর মা এ বাসায় এসেছিলেন। সেদিনের পর থেকে প্রতি সপ্তাহে অন্তত দুদিন আসেনই। প্রতি বেলায় নিয়মিত মোবাইলে আমার খোঁজ নিতেন। মা গত তিন মাসে আমাকে প্রচণ্ড মানসিক সাপোর্ট দিয়ে গেছেন। এখনও তাই-ই। মায়ের না-কি মানত ছিল। রায়ের পর দিন আমাকে সাথে নিয়ে দরগায় গিয়ে যেই হাত পেতেছে তাকেই একটি করে একশ টাকার নোট ধরিয়ে দিয়েছেন। আমার ছোটো দুভাই মায়ের ভীষণ ভক্ত। আমার মানা শুনলেন না। দরগা থেকে ফেরার পথে ওদের দুজনের জন্য নতুন ক্রিকেট সেট কিনলেন। মা আমাদের দেখভালের কথা বলে সাহস না দিলে আব্বার বোধ হয় আর কাতারেই যাওয়া হতো না। মায়ের এমন আপনজনের মতো আচরণে আমরা সবাই অবাক।’



সব শুনে আমি কৃত্রিম অভিযোগের সুরে বললাম, ‘তাহলে এদিকে ছেলে-মেয়ে পেয়ে যাওয়ার জন্য মা আমাকে গত তিন মাস নাম ধরে ডাকেনি!’

সত্যি কথা বলতে কী, ইরানির মামলাকে কেন্দ্র করে রায় না হওয়া অবধি আমার সাথে মায়ের ব্যবহারের পরিবর্তনে আমিও কম অবাক হইনি। তখনও আমি কিংবা ইরানি ভাবতেই পারিনি কিছুক্ষণের মধ্যে আমাদের জন্য সামনে কতটা বিস্ময় অপেক্ষা করছে।

নাস্তা করার আগে আমি উঠে গিয়ে ইরানির আম্মার ঘরে ঢুকে দেখে এলাম। ইরানির ছোটো দুভাই পাশের বাড়িতে প্রাইভেট পড়তে চলে গেলে আমিও ফেরার জন্য উঠে দাঁড়ালাম কিন্তু ইরানি বাধা দিল, ‘মা আমার সামনে যেসব কথা বলেন তাতে মনে হয় না, আপনি আমাকে যেটুকু বললেন মা শুধু সেই কথা বলার জন্য আপনাকে পাঠিয়েছেন।’

ইরানি ঠিক ধরেছে। তবে মা আমাকে যে বিষয়ে ইরানির মতামত জানতে পাঠিয়েছে সেই বিষয়টি আমি কোনোদিনই ইরানির সামনে উপস্থাপন করতে পাবর না।

আমাকে নিরব থাকতে দেখে ইরানি আবার কথা শুরু করল, ‘মা প্রায় বলেন, আপনার বাবার সাথে মায়ের বয়সের পার্থক্য দশ বছরের। তাতে মায়ের সংসারে কখনও সুখের অভাব হয় নি। এটা কেন বলেন আমি বুঝি। আপনার সাথে আমার বয়সের পার্থক্য আট বছরের।’

কিছুক্ষণ চুপ থেকে ইরানি আমাকে প্রশ্ন করে উত্তরের অপেক্ষা না করেই নিজের কথা বলে গেল, ‘আপনি আমার একটি উপকার করবেন? আমার কেন জানি না মনে হয়, মায়ের ধারণা-- আপনি ধর্ষকদের পক্ষে আমার মামলাটি নিয়ে পাপ করেছিলেন। মা চান, আমাকে বিয়ে করে আপনি আপনার সেই পাপের প্রায়শ্চিত্ত করুন। দেখুন, আমাকে বিয়ে করা মানে পাপের প্রায়শ্চিত্ত করা এমনটা ভাবা আমার জন্য চরম অসম্মানের কিন্তু মা দুঃখ পাবেন বলে কিছু বলতে পারি না। আমার হয়ে আপনি যদি মাকে আমার এই কথাগুলি বুঝিয়ে বলতেন?’

ইরানির কথার কী উত্তর দিব ভাবছি। হঠাৎ মায়ের ফোন, ‘ইরানিকে যেটা বলতে বলেছিলাম সেটার উত্তরে তোকে কী বলল?’


আমি ঘর ছেড়ে বারান্দার গ্রিলের দরজা খুলে রাস্তায় নেমে দাঁড়ালাম যাতে ইরানি আমাদের কথা শুনতে না পায়।

 

আমাকে বলতে হয়নি, ইরানি নিজেই সেকথা তুলেছে সেটা চেপে গিয়ে ইরানি মাকে যে কথাটি তার হয়ে জানাতে বলেছে, উদ্ধৃতি আকারে হুবহু ইরানির ভাষায় বলতেই মা হুকুম করল, ‘বেশি অর্ধেক রাস্তা পার হয়ে এসেছি। আমি না পৌঁছানো অবধি তুই বের হবি না।’

ফিরে এসে দেখি ইরানি ঘরে নেই। আমি সোফায় বসে পিছনে হেলান দিয়ে চোখ বন্ধ করে মায়ের আসার কথা ভাবছি। আমারও নিজের কাছে, মায়ের ইচ্ছাটাকে বাড়াবাড়ি মনে হচ্ছে।

ইরানির কণ্ঠ শুনে চোখ খুললাম। আমার সামনে কাপ এগিয়ে দিয়ে মন্তব্য করল, ‘বড্ড শীত-শীত লাগছে। কফি খেয়ে শরীর গরম করুন।’



আমি সিঙ্গেল সোফায়, ইরানি আমার মখোমুখি ডাবল শোফায় বসল। কফি খাওয়া শেষ হতে না হতেই হুড়মুড় করে ঘরে ঢুকে ইরানির পাশে বসে মুখটা নিজের দিকে ঘুরিয়ে নিয়ে দুই কাঁধ শক্ত করে ধরে ঝাঁকাতে ঝাঁকাতে রাগত কণ্ঠে বলতে লাগল, ‘তপুর সামনে তুই কী বলেছিস! বল কী বলেছিস? তোর এতো বড় সাহস? তোকে-আমাকে নিয়ে সংসার করা মানে পাপের প্রায়শ্চিত্ত করা? পাপের প্রায়শ্চিত্ত হয় দোজখ-নরকে। আমাদেরকে নিয়ে সংসার করা মানে দোজখ-নরকে বসবাস করা? এমন কথা তোকে কে বলেছে?’

 

মায়ের কণ্ঠটা ক্রমেই কান্নাজড়িত হয়ে যাচ্ছে। সময় লাগল না। ভেঙে পড়ল। ইরানির বুকের মাঝখানে নিজের কপাল ঘুষতে ঘুষতে ফুঁপিয়ে কাঁদতে কাঁদতে মা বলে যেতে থাকল, ‘তুই তবুও বিচার চাইতে পেরেছিস কিন্তু আমি? বাড়ির সবাই বড় ননদের ছেলের খৎনার দাওয়াত খেতে গেছে। সকালে কলতলার পিচ্ছিলে পড়ে গিয়ে পা মচকে যাওয়ায় হাঁটতে পারছিলাম না বলে আমার যাওয়া হলো না। দুপুর তিনটের মতো হবে। ভাসুর বাইরে থেকে ডাক দিয়ে ঘরে ঢুকে হাতে দুটো ট্যাবলেট দিলেন। একটি ব্যথার, আরেকটি না-কি গ্যাসের। পানির জন্য নামতে গেলে বাধা দিয়ে নিজেই পানি এনে দিলেন। ট্যাবলেট দুটি খাওয়ার কয়েক মিনিট না যেতেই আমার চোখের পাতা ভারি হতে শুরু করল। প্রচণ্ড ঘুম পাচ্ছে। মনে হচ্ছে, শরীরে কোনো শক্তি নেই। ভাসুরের বিয়ের পাত্রী দেখতে গিয়ে তপুর বাবা নিজের জন্য আমাকে পছন্দ করে ফেলেছিল। বড় ভাইয়ের বিয়ের আগেই ছোটো ভাইয়ের বিয়েতে শ্বশুরও আপত্তি করেননি। ছোটোভাইয়ের প্রতি মনের ভিতরে পুষে রাখা সেই রাগে ভাসুর যে এতো নিচে নামতে পারেন তা ভাবতে পারিনি। পরে শুনেছিলাম, ভাসুর আমাকে ব্যথার ঔষধের নামে ঘুমের কড়া ট্যাবলেট দিয়েছিলেন। গভীর ঘুমে তলিয়ে গেছি এমন সময় ভাসুর ঘরে ঢুকে আমার উপর ঝাঁপিয়ে পড়লেন। প্রাচীর ঘেরা বাড়ি। আমার ডাকাডাকি কারও কানে পৌঁছালো না। আতঙ্কে সেদিন কেন জানি না, কণ্ঠের স্বরও যেন বসে গিয়েছিল। হাতের মেহেদীর রঙ মিলিয়ে যাওয়ার আগেই বিয়ের মাত্র আঠারো দিনের মাথায় ভাসুরের দ্বারা ধর্ষিত হলাম। কাঁদতে কাঁদতে কখন ঘুমিয়ে গেছি বুঝতে পারিনি। তপুর বাবা ফিরে এসে আমাকে ঘুম থেকে ডেকে তোলে। আমার মুখে সব শুনে শ্বশুরকে আমাদের ঘরে ডেকে নিয়ে এলো কিন্তু উল্টো ফল হলো। শ্বশুর কসম কাটলেন, পরিবারের মান সম্মানের বিষয়। আমরা লোক জানাজানি কিংবা থানা-পুলিশ করলে তিনি ট্রেনের তলে মাথা দিবেন। ঘটনা ঘটিয়ে ভাসুর লাপাত্তা। পরদিন সকালেই বাবার বাড়ি চলে আসি। আমারই মতো ভীষণ আঘাত পেয়েছিলেন। পরিবার-সমাজ-দেশ সব কিছুর উপরেও যেন তপুর বাবার অভিমান হয়েছিল। আমার বড় মামা আগেই বাংলাদেশে চলে এসেছিলেন। মালদা বাজারে তপুর বাবার কাপড়ের ব্যবসা ছিল। কয়েকদিনের মধ্যে দোকানটা বিক্রি করে দিল। বেড়ানোর নাম করে গিয়ে ছোটোমামার নিকট থেকে কথায় কথায় বড় মামার ঠিকানা জেনে নিয়েছিলাম। পঁয়ত্রিশ-ছত্রিশ বছর আগের কথা। তখন সীমান্তে কাঁটা তারের বেড়া পড়েনি। দালাল ধরে বাংলাদেশের হিন্দুরা সহজেই ইন্ডিয়ায় আবার পশ্চিমবঙ্গের মুসলমানরা বাংলাদেশে পাড়ি দিতে পারত। আমার মা-বাবা মত দিবেন না জানতাম। তপুর বাবার কথা শুনে আমারও ভয় হতো, এপারে চলে না এলে সুযোগ পেলেই ভাসুরকে খুন করে ফেলতে পারে। দালালের সাথে কোথায় দেখা হবে ঠিক করা ছিল। বিয়ের এক মাস পূর্ণ না হতেই কাউকে কিছু না বলে একদিন ভোরের আলো ফুটবার আগেই চোরাপথে এদেশে আসার উদ্দেশ্যে স্বামী-স্ত্রী রওনা দিলাম। অপরাধীর বিচার চাওয়ার পরিবর্তে নিজের জায়গা ছেড়ে দিয়ে এক প্রকার পালিয়ে আসা। তপুর বাবা কিংবা আমি একেবারে অশিক্ষিত ছিলাম না। অথচ এ দেশে এসে তপুর বাবা প্রথমে বাজারের ফুটপাতে বসে কাপড় বিক্রির মাধ্যমে ব্যবসা শুরু করে। ইরানি, তোর কথা মতো আমি কী তাহলে তপুর বাবার জীবনে…



কথা শেষ করতে না দেয়ার জন্য ইরানি নিজের ডান হাতের তালুর নিচে মায়ের মুখটা ঢাকা দিয়ে দুপা শোফার উপরে তুলে হাঁটু ভেঙে বসে মাথাটা আরও কাছে টেনে নিয়ে মাকে বুকের সাথে শক্ত করে চেপে ধরল।

দেখলাম, মায়ের কথা শুনে ইরানির দুচোখের কোণা দিয়ে অশ্রু গড়াতে শুরু করেছে।

আমি উঠে দাঁড়িয়ে ইরানিকে বললাম, ‘মাকে আপনার বিছানায় নিয়ে গিয়ে শুইয়ে দিন। আমি সিএনজির ব্যবস্থা করে রাত দশটার দিকে এসে নিয়ে যাব।’

আবহাওয়ার কারণে রাস্তা প্রায় ফাঁকা। কোনো অটোরিকশা চোখে পড়ছে না। রাস্তায় রিকশা পেলে তখন উঠে পড়া যাবে। আমি বাড়ির পথে হাঁটা দিলাম। অনেক কষ্টে চোখের পানি ধরে রেখেছিলাম কিন্তু এখন আর পারছি না। শুনেছি, অতিরিক্ত মদ খাওয়ার কারণে অনেক আগেই চাচা মারা গেছেন। তবুও মনে হচ্ছে, সীমান্ত পাড়ি দিয়ে কবর থেকে চাচার কঙ্কাল টেনে তুলে হাতুড়ি পিটিয়ে হাড়গুলি গুড়ো করতে পারলে শান্তি পেতাম।


শীত উপেক্ষা করে বড় রাস্তার বাম পাশ ধরে উন্মাদের মতো হেঁটে চলেছি। আশেপাশের কোনোদিকে খেয়াল নেই। বেশ জোরের সাথে টিপ টিপ বৃষ্টি পড়তে শুরু করল। এতে ঠাণ্ডায় কাঁপুনি ধরলেও একদিক দিয়ে ভালোই হলো। বৃষ্টির পানির নিচে আমার চোখের পানি ঢাকা পড়ে যেতে সুবিধা হবে।

ছবিঃ ইন্টারনেট থেকে

সমাপ্ত

 

শরীফ উদ্দীন
সহকারি অধ্যাপক, অর্থনীতি,
অগ্রণী বিদ্যালয় ও মহাবিদ্যালয়,
রুয়েট চত্বর, রাজশাহী।

 

এই লেখকের অন্যান্য লেখা



আপনার মূল্যবান মতামত দিন:


Top