সিডনী রবিবার, ৭ই মার্চ ২০২১, ২৩শে ফাল্গুন ১৪২৭

নিমন্ত্রণ : সায়মা আরজু


প্রকাশিত:
১৮ জানুয়ারী ২০২১ ১২:৩৪

আপডেট:
৭ মার্চ ২০২১ ২১:২৬

ছবিঃ সায়মা আরজু

 

এক ফেসবুক বন্ধুর পোস্ট পড়ে উদাস হয়ে বসেছিলাম, টিচার্স রুমে। আমার বসার জায়গাটা থেকে রুমের একমাত্র জানালাটা একটু দূরে,  তাই নারগিস আপার চেয়ারে বসলাম। নারগিস আপার এখন পরপর দুটো ক্লাস, অন্ততঃ আগামী  দেড় ঘন্টা সময় তিনি রুমে আসছেন না। ভেবেছিলাম পরীক্ষার  কয়েকটা খাতা দেখব, কিন্তু তা আর হলো কই, জানালা দিয়ে  মাঠ পেরিয়ে, শহীদ মিনার ছাড়িয়ে  দূরের যে কয়েকটি বাড়ি দেখা যায়  সেদিকে তাকিয়ে  আছি। এদিকটাতে স্কুলের বাউন্ডারি নেই। ছেলেদের স্কুল, তাও আবার মফস্বল জেলা শহরে,  এখানে বাউন্ডারি বা প্রাইভেসির কেউ তেমন ধার ধারেনা। মাঠের ওপারে মধ্যবৃত্ত গৃহস্হালি চলছে। এইমাত্র একটি মেয়ে মাঠের ঘাসের উপরে শাড়ি শুকাতে মেলে দিল,  সে নিজেও লাল, সবুজ, হলুদ ছাপার শাড়ি পড়ে আছে। একটু পরেই মেয়েটি এক বালতি জল রোদে রেখে গেল। খানিক্ষন কোন মানুষ জন নেই কেবল একটা লাল আর একটা কালো কুকুর একে অন্যের পিছে দৌড়ে বেড়ালো।পাশেই একটা গরু আপন মনে ঘাস খেয়ে যাচ্ছে। এরপর হেলে দুলে কয়েকটি হাঁস পাশের পুকুরের দিকে হেঁটে গেল। পুকুর ঘাটটা এখান থেকে দেখা যায়না কেবল পুকুরের একটা পাশের কিছু টেপাপোনা সবুজ গালিচার মত চোখে পড়ে। আবার সেই মেয়েটি এল, এবার দেড় দুই বছরের একটা  শিশু তার কোলে। গোসলের আগে তেল মালিশ করছে কিন্তু দুরন্ত শিশুটি তার মাকে সেটা সহজে করতে দিলে তো! এই ছুট তো ঐ ছুট!

এরই মধ্যে লাবনী কখন রুমে এসেছে তা খেয়াল করিনি। লাবনীর কথাতেই  ঘোর ভাঙ্গল।
- 'কি এত ভাবছ, রেবা আপা'?
- নারে তেমন কিছু না। একটা পোষ্ট পড়ছিলাম, সেটা নিয়েই..
- কি পোস্ট?

- একজন লিখেছে তার এক পরিচিতা সপ্তাহে মাত্র একদিন  মানে শনিবার চা খায়। কারন কি জানিস?  সে চাকুরির কারনে পরিবার থেকে দূরে থাকে। তাই যদি পেটে গ্যাস জমে,যদি বিপি বেড়ে যায়,  যদি  অসুস্থ  হয়ে পড়ে! ওর বাড়িতেই একটা চায়ের নিমন্ত্রনের ছবি শেয়ার করেছে পোস্টের সাথে। আমরা নিজেদের কতটা অসহায় ভাবি,না রে? ব্যাপারটা ভেবে খুব উদাস লাগছে জানিস!এই যে এখানে পড়...

লাবনী আমার মোবাইল থেকেই পোস্টটা পড়লো।

- জানিস লাবনী আমি এরকম একটা চায়ের নিমন্ত্রণ পেয়েছিলাম। কি আন্তরিক সে আতিথেয়তা! যদিও চা'য়ের নিমন্ত্রণ ছিল, আমরা গিয়েছিলাম বেলা তিনটা কি সাড়ে তিনটায়। আমাদেরই এক পরিচিত বৃদ্ধা মা, মেয়ে দু'জনের সংসার,  দু'জনই বিধবা। বাসায় ঢুকে অবাক হয়ে গিয়েছিলাম!  না কোন জৌলুস নেই,কিন্তু বাড়ির  প্রতিটি কোনায় চেয়ে থাকবার মত, কি পরিচ্ছন্ন, পবিত্রতা!

 ছোট্ট দোতলা টিনের ঘর, সামনের একফালি উঠোন নিকানো, সাদা। ঘরের দরজা ধরে দুই পাশে গাঁদা ফুলের সারি। উঠোনের একপাশে একটা বিশাল করমচা গাছ, গাছ থেকে পদ্মগুরুচের লতা ঝুলছে। বাড়ির সীমানা ধরে বাঁশের বেড়া,তারই কোল ঘেঁষে বেড়ে ওঠা ঝুমকো লতা, আর রক্তজবায় ডুবে থাকতে হবে অনেকক্ষণ, চোখ ফেরানো মুশকিল।পাতাবাহার ও আছে, অনেক রকম। কিন্তু সবই একদম পরিস্কার, ঝকঝকে, মা'মেয়ের পড়নের সাদা শাড়ির মতন, হালকা নীল দেয়া, পাটভাঙা। কেমন যেন একটু পুরানো, একটু পরিচিত , একটু নতুন।

-তারপর? আবার দেখি ভাবতে বসলে!
- ওহ! অনেক কিছু খেয়েছিলাম সেদিন, জানিসতো যত্নটা এমন ছিল! পোলাও এর চালের খুঁদের  পোলাউ করেছিল,  পোলাউ এর মধ্যে উঁকি দিচ্ছিল আলু, মটর, মিস্টি কুমড়া আর পনিরের টুকরা।  কোনটাই জানিস এতটুকু ভাঙ্গেনি, কি অবাক কান্ড বল, কুমড়াও না। সাথে ছিল বেগুন ভাজা আর কাঁচাকলার কাটলেট,সেগুলো ও অমৃত। তারপর চা, ঘন গরুর দুধের!  এখনও জিভে লেগে আছে।

অনেক্ক্ষণ পরে খেয়াল করলাম, আমি যে চেয়ারে বসে আছি তার পিছনটা ধরে দাঁড়িয়ে রয়েছে লাবনী। জিজ্ঞেস করলাম
- কি রে কিছু বলবি? নাকি এবার তুই ও?

একটু লাজুক হেসে লাবনী আমাকে অবাক করে দিয়ে  বলল.

- জানো আপা,আমিও তো সপ্তাহে দুই দিন কেবল আয়েশ করে চা খাই
- তাই! দুই দিনই শুধু?কেন?
- তুমিতো জান, বাবা গত হয়েছে গত বছর। এরপর মায়ের চিকিৎসা,  ছোট ভাই বোন দুটোর লেখাপড়া,  সংসার খরচ সব শেষে নিজের জন্য একটু খরচই বাড়তি মনে হয়। জানো আপা, আমাদের পাশেই আমার এক পিসির মেয়ে থাকে। তারও ঐ ঘরটুকু ছাড়া কেউ নেই।বাড়ির সামনে পাঁচ ইঞ্চি দেয়াল তুলে একটা ছোট লন্ড্রীর দোকান ভাড়া দেয়া হয়েছে আর ও মোয়া বানিয়ে সাপ্লাই দেয়, তাতে আর কত আয় হয় বল?  মাসের শেষদিকে তার ঘড়ে বাজার চলেনা, বলতো, ওকে ছাড়া তখন আমারা কি করে খাই! এসব করতে গিয়ে  নিয়ম করে দিয়েছি সপ্তাহে  শুধু দুই দিন দুধ চা।

কৌতুহল নিয়ে  জিজ্ঞেস করি,
- তা তোর বোনের কেউ  নেই মানে কি? বিয়ে থা করেনি?
- গ্রামে বড় হয়েছে, ক্লাস নাইনে উঠতেই ওর বাবা গ্রামের এক গৃহস্থ ঘরে বিয়ে ঠিক করে। ও বিয়ে করতে চাইছিল না। কেউ পাত্তা দেয়নি। অভিমানে আত্মহত্যা করতে গেছিলো, সেটাও পারেনি। কিন্তু ওর বাবা ভীষন কড়া মেয়েকে হসপিটাল থেকে আর বাড়ি ফিরিয়ে  নিতে চাইলেন না। তখন বাবা ওকে আমাদের বাড়িতে নিয়ে এল। কিন্তু বেঁকে বসল মা। মা কিছুতেই ওকে আমাদের বাসায় জায়গা দিতে চাইলেন না। তখনও দিদিমা বেঁচে  ছিলেন।  তাই বাবা অনেকটা বাধ্য হয়ে আমাদের ঘরের পাশে আলাদা ঘর করে দিলেন দিদিমা আর পলাশ মানে আমার ঐ বোনের জন্য।  বাবা যখন অসুস্হ ছিলো পলাশ সারাদিনই পরে থাকতো বাবার কাছে। মা ইচ্ছে হলে দুটো খেতে দিত নইলে না। কিন্তু জানো,  বাবা চলে  যাবার পর মা ওকে চোখে হারায়! কি অদ্ভুত মানুষের আচরন, না?

- তা পলাশের প্রতি মাসিমার রাগ কিসের?
- আমার পিসি ,মা এর বান্ধবী।  পলাশের বাবা আমার পিসিকে হুমকি দিয়েছিলেন পলাশকে যে জায়গা দিবে তার সাথে সে সম্পর্ক রাখবেনা। খুব একরোখা মানুষ। পাছে পিসির সাথে আমাদের সম্পর্ক খারাপ হয়, মা এই ভয় পেতেন। তাছাড়া আমাদের গ্রামের জমিজমা সব ঐ ফুপাই দেখাশুনা করতেন, সেগুলো হারানোর ভয় ও থকতে পারে।
- এখন সেগুলো কে দেখে?
- এখন আর বিশেষ কিছু নেই। বাবা অনেকটাই বিক্রি করে দিয়েছিলেন।
- আচ্ছা
একটু দম নিয়ে আবার বলতে থাকে লাবনী,
"আমাদের জীবনের গল্প গুলো কেমন একইরকম, একঘেঁয়ে, কেন আপা? " তারপর শুষ্ক চোখে জানালায় চেয়ে থাকে অনেকক্ষন। বলে,
-তুমি কি ঐ আপার মত আমার বাড়িতে আসবে চা খেতে একদিন? অতকিছু করতে পারবো না, কিন্তু যদি আস...
- তুই চাস আমি আসি?
- খুব খুশী হব, আপা।
- সাথে বর্নাকেও নিয়ে  আসব
- আচ্ছা। এই বৃহস্পতিবারেই আস।
রাজি হলাম এই বৃহস্পতিবারেই যাব। বারান্দায়  সজোড়ে ঘন্টা বাজে।

সন্ধ্যায় বাসার বারান্দায়  প্রিয় বেতের চেয়ারটাতে চা এর কাপ হাতে নিয়ে বসে ভাবছিলাম সারাদিন ধরে  ঘটে যাওয়া টুকরো টুকরো ঘটনা। পশলা বৃষ্টির মত চোখও ভিজে উঠল বার ক'য়েক। লাবনী, পলাশ, বৌটা, বার বার হানা দিতে থাকলো চিন্তায়। বাইরে অন্ধকারে চেয়ে থাকি। এ বাড়িটার তিনতলায় আমি থাকি। একটা কথা মনে পড়ে বেশ হাসি পেল। কথিত আছে সব বাড়ির তিন তলায় বাড়ি ওয়ালারাই থাকে। কিন্তু  আমি মোটেই বাড়িওয়ালা নই, আমাদের বাড়িওয়ালা নীচ তলাতে থাকেন,ওনার হাঁটুতে আর্থারাইটিসের ব্যাথা তাই সিঁড়ি বাইতে পারেনা। বাড়িওয়ালা চাচীর কথা মনে হতেই বাড়ির সামনের জলপাই গাছটা আর তার লাগোয়া বারমাসি বেল  গাছটা খুঁজি। জলপাই গাছটাতে ষ্ট্রিট লাইট পরে পাতাগুলো  চিকচিক করছে,রাস্তায় সাইকেল রিক্সার টুংটাং ঘন্টা।ভিতরের রুম থেকে আমার মেয়ে বর্নার ডাক শোনা যায়,

- মা, ফোন বাজছে, অনেকক্ষণ ধরে...

সত্যিইতো আটটা মিসড কল, টিচার্স ট্রেনিং কলেজের বান্ধবী, মালা? ব্যস্তহাতে মালার নম্বর টাইপ করি। রিং বাজতেই ওপাশ থেকে মালা'র বাজখাই গলা শোনা যায়,

- কিরে বাসায় আছিস তো?
- হ্যাঁ, আছি
- তোর বাসায় আসছি...এখনও বাসে। ভাবলাম গিয়ে সারপ্রাইজ দেব। এখন এত দেরী হচ্ছে যে নিজেই সারপ্রাইজড, হা হা। শোন, বাসায়  টমেটো  আছে?  টেংরা মাছ?
- আছে, কেন, কি করবি?
- আমি না , তুই করবি। তোর সেই টমেটোর  সুপটা কর না প্লিজ।ইস এখুনি খেতে ইচ্ছে  করছে। অসুবিধা হবে নাতো রে
- কোন ও অসুবিধা নাই। আর এমন কি বা করতে বলেছিস , টমেটোর স্যুপ ই তো, নারগিসি কোপ্তা তো আর না
- হা হা হা । সেই নারগিসি কোফতা ?

মালার কথায় এখনো লজ্জায় আমার গাল লাল হয়ে উঠলো মনে হয়। তখন টিচার্স ট্রেনিং কলেজের হলে থাকি। ওয়ান ডিশ পার্টি হবে পহেলা বৈশাখ অনুষ্ঠানে, আমার ভাগে পড়লো নারগিসি কোফতা। এর আগে দু-একবার এই কোফতা খেয়েছি মায়ের করা, কিন্তু নিজে কখনো বানাই নি ।কিন্তু কোফতা বানাতে যে এত ফিরিঙ্গি তা কে জানতো? হলে কারো কাছে কোনও রান্নার বইও ছিলনা। সেই প্রথম সিদ্দিকা কবির’স রেসিপি’র খুব অভাব অনূভব করলাম। তারপর যা বানালাম, সে আর না-ই বলি। মালা বলতে থাকে-

- তারপর কিন্তু ভাত খাব
- আচ্ছা, তুই আয় আগে...

এখন আর বসে থাকলে চলবেনা, স্যুপের ব্যবস্হা করতে হবে। মালার কথা মনে পড়তেই একটা গান মনে পড়ল, গুনগুন করতে করতে গিয়ে পি সি তে চালিয়ে দিলাম। সারা ঘরে তখন বাজছে, " মন বলছে আজ সন্ধ্যায় কিছু বলতে তুমি আসবে কি..."

মালা আর আমি বাটিতে ছোট টেংরা মাছ,অল্প আলু আর অনেক ধনে পাতা দেয়া ঝাল ঝাল  টমেটোর স্যুপ নিয়ে মাত্র বসেছি।বর্না এসে টিভি অন করল । তারপর দৌড়ে এসে জিজ্ঞেস করল,
- মা চা খাবে?
মালার দিকে তাকিয়ে সশব্দে হেসে উঠি। মালা বর্নাকে  একটা ইলেক্ট্রিক কেটলি গিফট  করেছে আজ।তাই তার চা বানানোর এত আগ্রহ। এতক্ষন ধরে ওটা নিয়েই পরে ছিল।

এদিকে  এক চামচ স্যুপ মুখে পুরে মালা চোখ বন্ধ করে বসে আছে। ভাবলাম কাঁচা মরিচ ছিলো না বলে সামান্য বোম্বাই মরিচ দিয়েছিলাম, খুব কি ঝাল হলো? চোখ খুলতেই আমি চোখে ইশারা করে মালাকে জিজ্ঞেস করি,
- কি রে কেমন?
মালা হেসে বলে
- জব্বর

সমাপ্ত

 

এই লেখকের অন্যান্য লেখা



আপনার মূল্যবান মতামত দিন:


Top