সিডনী রবিবার, ৭ই মার্চ ২০২১, ২৩শে ফাল্গুন ১৪২৭

বাংলায় মুসলিম শাসনের সূচনায় সিলেট অঞ্চল : মুহম্মদ সায়েদুর রহমান তালুকদার


প্রকাশিত:
২১ জানুয়ারী ২০২১ ১৫:১২

আপডেট:
২১ জানুয়ারী ২০২১ ১৫:৪৬

ছবিঃ মুহম্মদ সায়েদুর রহমান তালুকদার

 

ত্রয়োদশ শতকের প্রথমেই বাংলায় মুসলিম শাসনের সূচনা হয়। প্রথমে যে বীর বাংলা আক্রমণ করে সেখানে মুসলিম শাসন প্রতিষ্ঠা করেন, তিনি ইখতিয়ার উদ্দিন মুহাম্মদ বখতিয়ার খলজী। তুর্কী খলজী গোত্রভুক্ত বখতিয়ার ভাগ্যান্বেষণে ভারতে এসে প্রথমে গজনীতে মুহাম্মদ ঘোরীর সৈন্যবাহিনীতে চাকুরী প্রার্থী হয়ে ব্যর্থ হন। খাট আকৃতি ও অস্বাভাবিক দীর্ঘ হস্ত বিশিষ্ট বিদ্ঘুটে চেহারার অধিকারী এ জোয়ান এরপরে দিল্লীতে কুতুব উদ্দিন আইবকের দরবারেও ব্যর্থ হয়ে অযোধ্যার শাসনকর্তা মালিক হুসাম উদ্দিনের সৈন্য বাহিনীতে যোগ দেন। কিছু দিনের মধ্যেই তিনি স্বীয় যোগ্যতাবলে হুসাম উদ্দিনের কাছ থেকে তৎকালীন মুসলিম শাসনাধীন পূর্ব সীমান্তবর্তী ভিউলী ও ভাগত নামে দুটি পরগণার জায়গীর লাভ করেন।

এই ভিউলী এবং ভাগত পরগণা থেকেই বখতিয়ার খলজী তাঁর সাহসিকতা, দূরদর্শীতা এবং উচ্চাশার সিঁড়ি বেয়ে সম্মুখপানে এগুতে থাকেন। বাংলায় তখন সেন বংশের রাজত্ব। এর রাজধানী বিক্রমপুরে। রাজা ছিলেন লক্ষণ সেন। সে সময়ে তিনি পূণ্য  লাভের আশা কিংবা বিদ্রোহ দমনার্থ গঙ্গা তীরবর্তী নদীয়ায় অবস্থান করছিলেন। এ সময়েই অত্যন্ত কৌশলী সেনানায়ক বখতিয়ার খলজী তাঁর অধীনস্ত সেনাবাহিনীর অগ্রবর্তী দলের মাত্র সতের জন সৈন্য নিয়ে অসম্ভব সাহসিকতার সাথে লক্ষণ সেনের প্রাসাদ আক্রমণ করেন। এই অতর্কিত আক্রমণে দিকবিদিক জ্ঞানশূণ্য হয়ে লক্ষণ সেন কোন প্রকার প্রতিরোধের চেষ্টা না করেই পেছনের দরজা দিয়ে পালিয়ে রাজধানী বিক্রমপুরে পৌঁছেন। অপরদিকে  বিজয়ী বখতিয়ার খলজী তিন দিন নদীয়া অবস্থান করে বিপুল পরিমাণ ধনরত্নসহ গৌড় (উত্তর বঙ্গ) অধিকার করেন। গৌড় তখন লক্ষণাবতী নামে পরিচিত ছিল। সেখানেই রাজধানী স্থাপন করে বখতিয়ার খলজী বাংলার একাংশে প্রথম মুসলিম রাজত্বের সূচনা করেন। পরবর্তীতে আবিষ্কৃত বখতিয়ার খলজী জারীকৃত মুদ্রার ভিত্তিতে গবেষকগণ তাঁর নদীয়া বিজয়ের কাল ধরেছেন ১২০৪-০৫ খ্রিঃ।১

গৌড় বিজয়ের পর বখতিয়ার খলজী সুলতান মুহাম্মদ ঘোরীর সার্বভৌমত্ব স্বীকার করে ঘোরীর নামে মুদ্রা জারী করেন। অতঃপর বিশাল সাম্রাজ্য প্রতিষ্ঠার আকাঙ্খা নিয়ে পার্বত্য তিব্বতে অভিযান পরিচালনা করেন। সেখানে প্রকৃতিগত কারণে মারাত্মক বিপর্যয়ের সম্মুখীন হয়ে তিনি ১২০৬ খ্রিস্টাব্দে মৃত্যুবরণ করেন। এক্তিয়ার উদ্দিন মুহাম্মদ বখতিয়ার খলজীর মাধ্যমে এ অঞ্চলে সূচিত মুসলিম শাসন ব্যবস্থায় যিনিই ক্ষমতাসীন হয়েছেন তিনিই রাজ্য বিস্তারে মনোযোগী হয়েছেন। গিয়াস উদ্দিন ইউজ খলজী লখনৌতির সিংহাসন আরোহণের পরে ১২২৭ খ্রিস্টাব্দে পূর্ববঙ্গে অভিযান পরিচালনা করেন। এ অভিযানের সময়ে মুসলমানদের দ্বারা শ্রীহট্ট অঞ্চল প্রথম আক্রান্ত হয়েছিল বলে জানা যায়।২

লখনৌতির গভর্ণর মালিক ইখতিয়ার উদ্দিন ইয়াজবেগ৩ সুলতান মুগীশ উদ্দিন ইয়াজবেগ উপাধি নিয়ে সিংহাসন আরোহণ করার সময় শ্রীহট্ট অঞ্চল ক্ষুদ্র ক্ষুদ্র রাজ্যে বিভক্ত ছিল। তাঁর উড়িষ্যা অভিযানের পরবর্তীকালে তিনি শ্রীহট্টের কোনো কোনো ক্ষুদ্র রাজ্য অধিকার পূর্বক অনেক সম্পদ করতলগত করেছিলেন বলে প্রমাণ পাওয়া যায়। জানা যায়, তিনি উড়িষ্যার ভূপতির সাথেও ভীষণ যুদ্ধে লিপ্ত হয়েছিলেন। সে যুদ্ধের প্রথম দিকে তিনি কিছুটা সফল হলেও তৃতীয় যুদ্ধে পরাজিত হয়ে পলায়ন করতে বাধ্য হন। তাই আর দক্ষিণ দিকে অগ্রসর হবার কোনো সুযোগ না দেখে পরবৎসর শ্রীহট্টাভিমুখে যাত্রা করেন।৪

এ অভিযানের বিষয়ে স্টুয়ার্ট লিখেছেন, In the following year, he invaded the territorrios of the Raja of Asmurdan and took the capital of that prince, with all his treasures and elephants. After overrunning that country for some months, he returned, loaded with plunder and Captives to Lucknowty.৫

উক্ত রাজ্যের রাজার নাম কি ছিল তা জানা যায় না। তবে উক্ত "আজমর্দন" যে বর্তমান হবিগঞ্জ জেলাধীন আজমিরিগঞ্জ তার স্বপক্ষে অনেক প্রমাণ বিদ্যমান। স্টুয়ার্ট, ক্যাপ্টেন ফিশার, মার্শম্যানের উদ্ধৃতি দিয়ে অচ্যুতচরণ চৌধুরী তত্ত¡নিধি, শামসুল আলম প্রমুখ এ বিষয়ে গুরুত্বপূর্ণ আলোচনা করেছেন। দার্শনিক দেওয়ান মোহাম্মদ আজরফ এ ব্যাপারে লিখেছেন, সম্প্রতি গবেষণার ফলে বর্তমান জলসুখা বা আজমিরিগঞ্জ এলাকায়ও মুসলিমদের বাস ছিল বলে প্রমাণ পাওয়া যাচ্ছে। তাতে দেখা যায় ১২০৪ সালে  (মতান্তরে ১২০১ সালে) ইখতিয়ার উদ্দীন মুহাম্মদ বিন বখতিয়ার খিলজি কর্তৃক মরূবঙ্গ বিজয়ের পরে মুসলিম সৈন্যাধ্যক্ষগণ গৌড়রাজ্যের পশ্চিম দিকে অগ্রসর না হয়ে গৌড় থেকে পূর্বদিকে সৈন্য চালনা করে কামরূপ রাজ্য অধিকার করার জন্য অগ্রসর হয়েছিলেন। তারা তাদের এ অভিযানকালে আজমুরদান বা আজমিরিগঞ্জের দিকে অগ্রসর হওয়ার দশ বছর পরে তাদের সঙ্গীয় সৈন্যদের মধ্যে কতকগুলো লোক বানিয়াচুঙ্গের দিকে অগ্রসর হয়ে সে রাজ্যও জয় করেন এবং সে অঞ্চলের লোকদের সঙ্গে যুদ্ধ করার পরে সে অঞ্চলে স্থায়ীভাবে বাস করেন। ০৬

সুলতান মুগীস উদ্দীন ইয়াজবেগের মৃত্যুর পর লখনৌতি আবার দিল্লির অধীন প্রদেশে পরিণত হয়। ১৩০০ খ্রিস্টাব্দ পর্যন্ত ছিল সুলতান রুকন উদ্দীন কায়কাউসের রাজত্ব কাল। এরপরে সুলতান শামসুদ্দীন ফিরোজ শাহ এর রাজত্ব কাল। তাঁর সময়েই হযরত শাহজালাল (রঃ) কর্তৃক শ্রীহট্ট বিজয় সম্পন্ন হয়। ১৩০৫ খ্রিস্টাব্দেউৎকীর্ণ সোনারগাঁও টাকশাল থেকে জারীকৃত তাঁর আমলের মুদ্রার ভিত্তিতে অনুমান করা হয় যে, তিনি তাঁর রাজত্বের প্রথমেই সোনারগাঁও জয় করেছিলেন।৭

এ সময়ে সিলেট অঞ্চল গৌড়, লাউড়, জয়ন্তিয়া, রাজপুর (তরফ) প্রভৃতি খন্ড খন্ড রাজ্যে বিভক্ত ছিল। মূলত এ সময়েই সিলেট অঞ্চলের ইতিহাস কিছুটা স্পষ্ট হয়। এর পূর্ববর্তী ইতিহাস প্রধানত বিচ্ছিন্ন কয়েকটি প্রত্ন সামগ্রী ও লোক কাহিনীর উপরই নির্ভরশীল ছিল। শ্রীহট্ট বিজয় কালে মুসলিম বাহিনীর বিরুদ্ধে কোনো সংঘবদ্ধ প্রতিরোধ গড়ে উঠতে দেখা যায় না। গৌড় গোবিন্দের প্রতিরোধ সমগ্র শ্রীহট্ট অঞ্চলের প্রতিরোধ ছিল না। তার রাজ্য গৌড়ের সীমানা তখন বর্তমান মৌলভীবাজার ও সিলেট জেলার সম্পূর্ণ অংশ ব্যাপীও ছিলনা। ইটা ও প্রতাপ গড় রাজ্যও মুসলিম বিজয়ের পর হতে গৌড়ের অংশভুক্ত হয়েছে।৮

এ অভিযানকালে গৌড়ের সহযোগিতায় যেমন কেহ আসেনি তেমনি রাজপুরের আচক নারায়ণের সহযোগিতায়ও আসেনি। এ থেকে অনুমান করা যায় যে, উক্ত অঞ্চলে ত্রিপুরা রাজ্যের সংশ্লিষ্টতা থাকলেও তাতে প্রভাব বা সহমর্মিতার সংশ্রব ছিল না কিংবা ত্রিপুররাজ মুসলিম সৈন্য বাহিনীর সাথে সমরে সাহস সঞ্চয় করতে পারেননি। তবে অনুমান করা যায় যে, সেখানকার ক্ষুদ্র ক্ষুদ্র রাজ্যে বিভক্ত আঞ্চলিক প্রধান বা রাজাগণ প্রত্যেকে প্রায় স্বাধীনভাবেই শাসন পরিচালনা করতেন। অপর দিকে এ সময়ে কামরূপেরও কোনো কর্তৃত্ব এ অঞ্চলে ছিল বলে মনে হয় না। কারণ এর কিছুকাল পূর্বে সুলতান মুগীস উদ্দীন ইউজবকের কামরূপ অভিযান কালে সেখানে বারভূঁঞা নামধারী বেশ ক’জন শাসক ছিলেন। তবকাত-ই-নাসিরীর মতে কামরূপের ভূঁঞারা ঐক্যবদ্ধ হয়ে তাদের একজন নেতা নির্বাচন করতেন যাকে ‘রায়’ বলা হত।৯ শ্রীহট্ট অঞ্চলের সাথে ঐ অঞ্চলের কোন সংশ্রব থাকলে সংঘবদ্ধ প্রতিরোধ অবশই লক্ষ করা যেতো।

সুলতান শামস্উদ্দিন ফিরোজ শাহ এর শ্রীহট্ট অভিযানের কারণ হিসেবে জানা যায়, সেখানে যে রাজদন্ড প্রচলিত ছিল তার শাসক ছিলেন গোবিন্দ নামের জনৈক ব্যক্তি। তাঁর রাজ্যের নামও ছিল গৌড়। তাই ইতিহাসে তিনি গৌড়গোবিন্দ নামে পরিচিতি পান। সে সময় তার রাজধানীর টুলটিকর নামক স্থানে বুরহান উদ্দিন নামে এক মুসলমান সপরিবারে বসবাস করতেন। তিনি তার সদ্যজাত পুত্রের আকিকা উপলক্ষে একটি গরু জবাই করেছিলেন। দুর্ভাগ্যবশত একটি চিল বা অন্য কোনো উপায়ে উক্ত গরুর এক টুকরা মাংস রাজমন্দির বা কোনো ব্রা‏হ্মণের বাড়িতে নিক্ষিপ্ত হয়। এ অপরাধে রাজা গোবিন্দের নির্দেশে বুরহান উদ্দিনের হাত কর্তন এবং সংশি¬ষ্ট শিশুটিকে হত্যা করা হয়। এই নিষ্ঠুরতার প্রতিকারের জন্য বুরহান উদ্দিন প্রতিবেশী মুসলিম শাসক সুলতান শামস্ উদ্দিন ফিরোজ শাহের দরবারে ফরিয়াদ পেশ করেন। সুলতান এই মুসলিম বিদ্বেষী অত্যাচারী শাসক গৌড়গোবিন্দকে শায়েস্তা করার জন্য স্বীয় ভাগিনেয় এবং অন্যতম সেনাপতি সিকান্দর খানের নেতৃত্বে এক বাহিনী প্রেরণ করেন। উক্ত বাহিনী গৌড়গোবিন্দের রাজ্যের দক্ষিণ সীমাস্থিত বর্তমান নবীগঞ্জের নিকটবর্তী চৌকি পরগণা হয়ে গৌড় বা শ্রীহট্টের দিকে অগ্রসর হয়।১০

কথিত আছে, গৌড়গোবিন্দের বাহিনীর সাথে প্রথম সংঘর্ষে মুসলিম বাহিনী পরাজিত হয়। ইতিহাসে এই প্রথম সংঘর্ষের স্থান সম্পর্কে বিতর্ক আছে। এ. জেড. এম. শামসুল আলম বলেন, ‘দিনারপুর পরগণার চৌকি নামক স্থানেই মুসলিম বাহিনীকে আক্রমণ করা গোবিন্দ সুবিধা জনক মনে করলেন। ১৩০৩ খ্রিস্টাব্দে চৌকিতে মুসলিম এবং গৌড় গোবিন্দের বাহিনীর প্রথম সম্মুখ সমর সংঘটিত হয়।’১১ অনেকের মতে উক্ত সংঘর্ষ ব্রহ্মপুত্র নদীর তীরে সংঘটিত হয়েছিল। কিন্তু ব্র‏হ্মপুত্র নদীর তীরস্থ কোন্ অঞ্চলে তা সংঘটিত হয়, এ বিষয়ে কেউই কোনো উল্লেখ করেননি। কারো কারো মতে সংশ্লি¬ষ্ট স্থানে একাধিকবার যুদ্ধ হয় এবং মুসলিম বাহিনী পরাজয় বরণ করে।

সিকান্দর খান গাজীর পরাজয়ে নিরাশ হয়ে বুরহান উদ্দিন হজ্বের উদ্দেশ্যে আরবের পথে যাত্রা করলে পথিমধ্যে হযরত শাহজালাল (রঃ) এর সাথে তাঁর সাক্ষাৎ হয়। হযরত তাঁকে সঙ্গে নিয়ে শ্রীহট্টের উদ্দেশ্যে অগ্রসর হন। এদিকে সিকান্দর খান গাজীর সাহায্যার্থে সুলতান অন্যতম সেনাপতি সৈয়দ নাসির উদ্দিনের নেতৃত্বে এক সহস্র অশ্বারোহী ও তিন সহস্র পদাতিক সৈন্য প্রেরণ করেন। সৈয়দ নাসির উদ্দিনের সাথে পথিমধ্যে হযরত শাহজালাল (রঃ) এর সাক্ষাৎ ও পরিচয় হলে নাসির উদ্দিন হযরতের শিষ্যত্ব গ্রহণ করে তাঁর আধ্যাত্মিক নেতৃত্বে শ্রীহট্টের দিকে অগ্রসর হন। এতে অতি সহজেই শ্রীহট্ট বিজয় সম্পন্ন হয়। উক্ত সম্মিলিত বাহিনীর সামরিক নেতৃত্ব সৈয়দ নাসির উদ্দিনের উপর ছিল বলে অনেকেই উল্লে¬খ করেছেন। কিন্তু ঐতিহাসিক তথ্যে দেখা যায়, হযরত শাহজালাল (রঃ) গৌড়গোবিন্দের পরাজয়ের পর বিজিত অঞ্চলের শাসন কর্তৃত্ব প্রদান করেছেন সিকান্দর খান গাজীকে।১২  সিলেটে প্রাপ্ত ১৫১২ খ্রিস্টাব্দে অঙ্কিত হোসেন শাহী আমলের একটি শিলালিপিতেও সিকান্দর খান গাজীর নেতৃত্বের কথা বলা হয়েছে। এ থেকে অনুমিত হয় যে, সংশ্লি¬ষ্ট মুসলিম বাহিনীর মূল নেতৃত্ব সৈয়দ নাসির উদ্দিন নয় বরং সিকান্দর খান গাজীর উপরই ন্যস্ত ছিল। সৈয়দ নাসির উদ্দিন তখন সহযোগী সেনাপতি ছিলেন।

শ্রীহট্ট বিজয়ের যে কারণ ইতিপূর্বে উল্লে¬খ করা হয়েছে, সমসাময়িক কালে অনুরূপ আর একটি ঘটনা তরফেও সংঘটিত হয়েছিল। তখন শ্রীহট্ট অঞ্চলে গৌড়, লাউড় ও জয়ন্তিয়ার মত ‘তুঙ্গাচল’ বা ‘রাজপুর’ নামেও একটি রাজ্য ছিল। উক্ত রাজ্যটি ত্রিপুরার করদ বা সামন্ত রাজ্য ছিল বলে জানা যায়। বিভিন্ন বর্ণনা থেকে জানা যায় যে, মুসলিম বিজয়ের কাল থেকে ইহা ‘তরফ’ নামে পরিচিতি পায়। সে সময় উক্ত তরফের রাজা ছিলেন আচক নারায়ণ। তিনি তার রাজ্যের মুসলিম অধিবাসী কাজী নূরউদ্দিন নামক জনৈক সম্ভ্রান্ত ব্যক্তিকে তাঁর পুত্রের বিবাহে গরু জবাইয়ের অপরাধে প্রাণদণ্ড দিয়ে হত্যা করেন। ধর্মীয় বিদ্বেষজনিত কারণে সংঘটিত এ হত্যাকান্ডে তাঁর পরিবার সীমাহীন অসহায়ত্বের মধ্য দিয়ে কালাতিপাত করতে থাকে। এমনি সময়ে শ্রীহট্ট বিজয় সম্পন্ন হয়। এই সংবাদ অবগত হয়ে কাজী নূর উদ্দিনের পরিবার হযরত শাহজালাল (রঃ) এর কাছে ফরিয়াদ জানালে তিনি তাঁর শিষ্য বার জন আউলিয়াসহ সৈয়দ নাসির উদ্দিনকে সিপাহশালার করে তরফে এক বাহিনী প্রেরণ করেন। উক্ত বাহিনী নৌপথে হবিগঞ্জ সদর উপজেলার রাজিউড়া ইউনিয়নস্থ ‘উচাইল’ হয়ে তরফে প্রবেশ করে। 

আচক নারায়ণ গৌড়গোবিন্দের ঘনিষ্ট আত্মীয় ছিলেন। তিনি গোবিন্দের পরাজয় বার্তা অবগত হয়ে চরম দুশ্চিন্তায় প্রহর গুনছিলেন। এরই মধ্যে মুসলিম বাহিনীর আগমন বার্তা জেনে তিনি প্রাণভয়ে ত্রিপুরায় পলায়ন করেন। বিনা রক্তপাতে তরফ বিজয় সম্পন্ন হয়। তরফ বিজিত হলে হযরত শাহজালাল (রঃ) এর নির্দেশে সৈয়দ নাসির উদ্দিন সেখানকার শাসন পরিচালনা করেন। অনুমান করা হয় যে, ১৩০৩ থেকে ১৩০৮ খ্রি. (৭০৩ থেকে ৭০৮ হিজরী) পর্যন্ত সময়ের মধ্যে তরফ বিজয় সম্পন্ন হয়েছিল।

সিপাহশালার সৈয়দ নাসির উদ্দিনের শাসনকালে তরফের রাজ্যসীমা অনেকটা প্রসারিত হয়েছিল। অচ্যুতচরণ চৌধুরীর মতে, ‘তরফ তখন একটি বিস্তৃত রাজ্য ছিল: সরাইল-সতর খণ্ডল ও জোয়ানশাহী প্রভৃতি পরগণা তখন তরফের সামিল ছিল। এই বিস্তৃত ভূখণ্ডের প্রথম মুসলমান শাসনকর্ত্তা সৈয়দ নাসির উদ্দিন সিপা-ই-সালার।’১৩

সুলতান শামস উদ্দিন ফিরোজ শাহ কামরূপের কিছু অংশও জয় করেছিলেন বলে জানা যায়। তাঁর মৃত্যুর পর পুত্র সিকান্দর শাহ সিংহাসনে আরোহণ করেন। তাঁর রাজত্বকালে ‘ইকলিম মুয়াজ্জমাবাদ’ নামে একটি নতুন বিভাগ বা প্রশাসনিক ইউনিটের পত্তন হয়েছিল। এটি ছিল তৎকালে প্রশাসনের সর্বোচ্চ ইউনিট। আধুনিক ঢাকা ও ময়মনসিংহের কিয়দংশ, সিলেট, কুমিল্লা ও নোয়াখালী অঞ্চল নিয়ে ইকলিম মুয়াজ্জমাবাদ গঠিত হয়েছিল। এ নতুন বিভাগের সদর দপ্তর কারো কারো মতে কিশোরগঞ্জের মুয়াজ্জমাবাদ আবার কারো কারো মতে সোনারগাঁওয়ের অদূরে মুয়াজ্জমপুরে অবস্থিত ছিল। জামাল খান নামে এক ব্যক্তি ইকলিম মুয়াজ্জমাবাদের প্রথম শাসনকর্তা ছিলেন। অতঃপর শাসনকর্তা হিসেবে জুলকদর খান, উজিয়াল খান, খোয়াস খাঁ প্রমূখের নাম জানা যায়। সুলতান সিকান্দর শাহের রাজত্বকালে ইকলিম মুয়াজ্জমাবাদে রাজস্ব আদায়ের সর্বনিম্ন ইউনিট হিসেবে ‘মহাল’ বা মৌজার পত্তন হয়। কয়েকটি মহালের সমন্বয়ে ‘শিক’ নামে একটি প্রশাসনিক ও রাজস্ব ইউনিট ছিল। শিকের শাসনকর্তার পদবী ছিল শিকদার।১৪

চতুর্দশ শতকের মাঝামাঝি থেকে ষোল শতকের মাঝামাঝি সময়ের মধ্যে প্রাপ্ত শিলালিপি ও মুদ্রা সাক্ষ্যে প্রতীয়মান হয় যে, সিলেট সোনারগাঁওয়ের অন্তর্গত ছিল। ৮৮৯ হিজরীর এক শিলালিপিতে সিলেটকে ইকলিম মুয়াজ্জমাবাদের অন্তর্গত একটি থানা বলে উল্লে¬খ করা হয়েছে। পরবর্তীকালে সিলেটকে একটি আরসাহর (প্রশাসনিক বিভাগ) মর্যাদা দেওয়া হয়। আরসাহ বিভাগের ভারপ্রাপ্ত কর্মকর্তাদের উপাধি ছিল উজির সার-ই-লস্কর, জমাদার-ই-গায়রী মহলী। তারা কখনো কখনো লস্কর বলেও অভিহিত হতেন। আরসাহ বিভাগীয় প্রধানগণ তার এলাকার প্রশাসন ও সেনাবাহিনীর প্রধান ছিলেন।১৫

১৪৮৪ খ্রিষ্টাব্দের এক শিলালিপিতে দেখা যায় থানার ভারপ্রাপ্ত কর্মকর্তাদেরও ‘আরসাহ’র ভারপ্রাপ্ত কর্মকর্তাদের মতো উপাধি ছিল। জালাল উদ্দিন ফতেহ শাহ্ এর শাসনকালের উক্ত শিলালিপিতে বলা হয়েছে, 'Muqarrabuddowla Malikuddin Sultani Jamadar Ghair Mahli wa Sare Lashkar wa Wazir Iqlim Muazzamabad wa nez Mashhur Mahmudabad wa Sare Lashkar Thana Laur.'১৬

-----

 

তথ্যসূত্র:
১।   বাংলার ইতিহাস (১২০০-১৮৫৭), প্রফেসর ডঃ আবদুল করিম। বড়াল প্রকাশনী। পৃষ্ঠা ২০
২।   শ্রীহট্টের ইতিবৃত্ত-পূর্বাংশ, দ্বিতীয়ভাগ, অচ্যুতচরণ চৌধুরী তত্ত¡নিধি, উৎস সংস্করণ। পৃষ্ঠা ৪৮
৩।  তিনি ইউজবক তুগরল খান বা মুগীসুদ্দীন ইউজবক শাহ হিসাবেও পরিচিত ছিলেন। ইউজবক, উজবেগ,ইজ্ববেক, ইউজবকী ইত্যাদি বিভিন্ন ভাবে তাঁর নাম লিখা হয়েছে।
৪।   শ্রীহট্টের ইতিবৃত্ত পূর্বাংশ, দ্বিতীয় ভাগ-প্রথম খন্ড। পৃষ্ঠা ৪৯
৫।  প্রাগুক্ত। পৃষ্ঠা ৪৯
৬।  স্বাধিকার -২৫বছর পূর্তি সংখ্যা। পৃষ্ঠা-২৭ (প্রবন্ধঃ সিলেট বিভাগের পরিচয়- ইতিহাস ও ঐতিহ্য, দেওয়ান মোহাম্মদ আজরফ)।
৭।   বাংলার ইতিহাস, ডঃ আবদুল করিম। পৃষ্ঠা ৪৯
৮।  শ্রীহট্টের ইতিবৃত্ত-পূর্বাংশ, দ্বিতীয় ভাগ-দ্বিতীয় খন্ড। পৃষ্ঠা ৩
৯।   বাংলার ইতিহাস, ডঃ আব্দুল করিম। পৃষ্ঠা ৩৭
১০।  হজরত শাহ্ জালাল ও সিলেটের ইতিহাস, সৈয়দ মুর্তাজা আলী, এ,বি, বুক ষ্টোর্স। পৃষ্ঠা ১৩
১১।  হযরত শাহ্জালাল (রহ.), এ. জেড. এম. শামসুল আলম। ইসলামিক ফাউন্ডেশন বাংলাদেশ। পৃষ্ঠা ৯৯
১২।  ক. হযরত শাহ্জালাল (রহ.), এ. জেড. এম. শামসুল আলম। পৃষ্ঠা ৯৯। খ. তারিখে জালালি, বাংলা অনুঃ মোস্তাক আহমদ দীন। উৎস প্রকাশন ২০০৩। পৃষ্ঠা ৩৫-৩৬
১৩।  শ্রীহট্টের ইতিবৃও পূর্বাংশ, দ্বিতীয় ভাগ-দ্বিতীয় খন্ড। পৃষ্ঠা ৬২
১৪।  ফেনীর ইতিহাস,  জমির আহমেদ। পৃষ্ঠা ৫৮
১৫।  সিলেট : ইতিহাস ও ঐতিহ্য, সম্পাঃ শরীফ উদ্দিন আহমেদ, বাংলাদেশ ইতিহাস সমিতি। পৃষ্ঠা ২১৩। অন্য বর্ণনায় শ্রীহট্টের লাউড়কে ইকলিম মুয়াজ্জমাবাদের থানা হিসেবে             উল্লেখ করা হয়েছে। সোনারগায়ের ইতিহাস উৎস ও উপাদান। পৃষ্ঠা ৫৪৮
১৬।  Bangladesh District Gezetteer's Sylhet , S.N.H.Rizvi. P. 58

 

মুহম্মদ সায়েদুর রহমান তালুকদার
হবিগঞ্জ জেলার ইতিহাস, হাওরের ইতিবৃত্ত, প্রসঙ্গ: মুক্তিযুদ্ধে হবিগঞ্জ, মুক্তিযুদ্ধে মাধবপুর প্রভৃতি গ্রন্থ প্রণেতা। সমন্বয়ক (হবিগঞ্জ জেলা): এনসাইক্লোপিডিয়া অব বাংলাদেশ ওয়ার অব লিবারেশন, বাংলাদেশ এশিয়াটিক সোসাইটি।

 

এই লেখকের অন্যান্য লেখা



আপনার মূল্যবান মতামত দিন:


Top