সিডনী বুধবার, ৩রা মার্চ ২০২১, ১৮ই ফাল্গুন ১৪২৭

ডিজিটাল : সাহিদা বেগম


প্রকাশিত:
২৫ জানুয়ারী ২০২১ ১৪:২৩

আপডেট:
২৫ জানুয়ারী ২০২১ ১৪:৪৮

 

লাঞ্চ শেষ করে পরিপাটি করে পাতা বিছানায় গড়িয়ে পরেন আফসানা বেগম। গরম লেপটা সারা গায়ে জড়িয়ে নেন। লেপটাকে পৌষ মাসের তপ্ত রোদ থেকে তুলে আনা হয়েছে। উম-উম উষ্ণতা।

লাঞ্চের পর কিছুক্ষণের বিশ্রাম দীর্ঘদিনের অভ্যাস। যখন চাকুরিতে ছিলেন দুপুরে লাঞ্চব্রেকে চেয়ারেই গা এলিয়ে একটুক্ষণ চোখ বন্ধ করে থাকতেন। এক ঘন্টার খাবার লাঞ্চব্রেক। ওয়াসরুমে যাওয়া, শরীরের এপ্রোন খোলা, মুখ থেকে মাস্ক খুলে রেখে ভালো করে হাত মুখ ধুয়ে হালকা একটু লাঞ্চ করে সামান্য সময়ের বিশ্রাম নিতে নিতেই ওয়েটিং রুমে রোগীদের ভীর লেগে যেতো। টানা পঁচিশ বছর ঢাকা মেডিক্যাল কলেজের গাইনী বিভাগের ডাক্তার এবং প্রফেসর ছিলেন আফসানা বেগম।

রিটায়ারের পর আর বেশী ব্যস্ত রাখেন না নিজেকে। মোটামুটি বিশ্রামই। তার এখন চৌষট্টি বছর বয়স চলছে।

সারা দিন রোগী, ওটি, অপারেশন, চেম্বার, হাসপাতাল এসব কিছু থেকে নিজেকে মোটামুটি গুটিয়ে বিশ্রামে অবসর জীবন উৎজ্জাপন করছেন। ছেলে-মেয়ে দু’জনেই বিদেশে সেটেল্ড। মেডিসিনের ডাক্তার স্বামী আসরাফ স্ত্রী-সন্তানের জন্য প্রচুর টাকা জমিয়ে রেখে গত হয়েছেন সাত বছর আগে। একক জীবনে আর কোন ব্যস্ততায় জড়িত থাকতে চান না। এখন দুপুরে মধ্যান্যভোজন করেন। মাছ-মাংস, ভাত, শাক-সবজি দিয়ে পেট পুড়ে আহার করেন। তারপর বিছানায় শোন দীর্ঘ সময়ের জন্য। তবে ভাত ঘুম দেন না। শুয়ে একটু গড়াগড়ি দেন। শোবার সময়ই মোবাইল ফোনটা সাথে নিয়ে শোন। তিনি প্রযুক্তিতে খুব বেশী বিদ্যান নন, যত অভিজ্ঞতা আর নাম ডাক ছিল তাঁর ঢাকা শহরে গাইনীর ভালো ডাক্তার হিসেবে।

তিনি বলেন, আমরা এ্যানালগাস যুগের মানুষ, তোমাদের ডিজিটাল প্রযুক্তিতে অত বেশী পারদর্শী হওয়ার প্রয়োজন নেই আমার এই বয়েসে। বাঁচবো আর ক’দিন। এখন আর ওয়ার্সআপ, গগুল, টুইটার, ম্যাসেঞ্জার, ইমো, ভাইবার এসব শিখে জীবনে কাজে লাগবো কখন? আমাদের সময়ে যদি মেডিক্যালের এমন অত্যাধুনিক প্রযুক্তি আবিষ্কার হতো তবে মাতৃমৃত্যুর সংখ্যা অনেক কম হতো। কিছু কিছু মৃত্যু আমাদের অসহায়ভাবে চেয়ে চেয়ে দেখতে হতো। আর এখন সবকিছু আগাম ম্যাসিনই বলে দিচ্ছে। এই একাকী জীবনে মোবাইল ফোন তাঁর অনেক প্রিয় একটি জিনিস। অবসর সময়গুলি বেশ কাটে। ফেসবুকে বন্ধুদের নানা কমেন্টস্ পড়েন। মাঝে মাঝে নিজেও কমেন্টস্ লেখেন। ইউটিউবে রাজনৈতিক টকশো শোনেন। সময় কাটানোর ভালো একটা মাধ্যম। দুনিয়াজোড়া বন্ধু ছড়ানো। কেউ কাউকে চিনি না, আবার প্রত্যেকে প্রত্যেকের কত চেনা, কত আপন!

আফসানা বেগমের মাঝে মাঝে মনে হয় আগামী পৃথিবী আর কত আগাবে। আর কী আবিষ্কার করবে? সব বিস্ময়পূর্ণ আবিষ্কারতো গত তিনশত বছরে অর্থাৎ তিন শতাব্দিতে হয়েই গেছে। প্লেন আবিষ্কারের ফলে সারা পৃথিবী ভ্রমণ এখন কত সহজ হয়েছে। হাজার হাজার মাইল উড়ে যাওয়া এখন কয়েক ঘন্টার ব্যাপার। আর আগের মানুষ হজ্ব করতে যেতো পায়ে হেঁটে, জলপথে জীবনের সকল মায়া ত্যাগ করে, আপনজনের সম্পর্ক শেষ করে। ফিরে কী কেউ আসতো?

আজকেও মধ্যান্যভোজের পর তিনি বিছানায় শুয়েছেন মোবাইল ফোন নিয়ে। ফেসবুক দেখতে দেখতে হঠাৎ একজনের স্টেটাসে এসে খুব সাধারন কতুহলে পড়া শুরু করলেন। জনৈক ফেসবুক বন্ধু মারুফুল ইসলাম স্টেটাসে লিখেছে, “আমার রুমে আজ কে যেন দরজার লক ভেঙ্গে ঘরে ঢুকে আমার মোবাইল ফোন, টাকা পয়সা সব চুরি করে নিয়ে গেছে। কিন্তুু দুর্ভাগ্যবশত বেচারা তার মোবাইলটি আমার টেবিলের উপরে রেখে গেছে। এতো কষ্টের মধ্যও হাসছি। কারন, আমি জানি সে কে! কিন্তুু লজ্জায় কিছু বলতেও পারছি না। আমি তার ফেসবুক আইডির লিঙ্কসহ দিলাম। সবাই লিংকে ক্লিক করবেন! মাথায় আকাশ ভেঙ্গে পরতে পারে। আপনারা সবাই তাকে চেনেন। তারপর লিঙ্ক। এবং ভাঙ্গা লকের ছবি লিঙ্কে ক্লিক করে সত্যি সত্যি আকাশ ভেঙ্গে পড়লো আফসানা বেগমের মাথায়। প্রায় নির্ভুল বানানে, প্রাঞ্জল ভাষায় এমন একটা লিংক! নিশ্চয় কোন ইতর ছেলের কাজ নয়। শিক্ষিত এবং মার্জিত ছেলের লেখা স্টেটাস। এটাতো সত্যি না হয়ে যায়ই না। কিন্তুু এটা সত্যি হয় কী করে? আমি কখন কার দরজার লক ভাংলাম? কী করে? কখন? কার?

আফসানা বেগম শোয়া থেকে উঠে বসলেন বিছানায়। উত্তেজনায় শুয়ে থাকা আর সম্ভব হলো তাঁর। লিঙ্কে তার নিজের আইডি দেখে তাঁর মাথা ঘুড়ছে। শরীর কাঁপছে।

নিশ্চয় এটা করো শত্রæতা! কেউ শত্রæতা করে এ কাজটি করেছে! তাঁর সুনাম নষ্ট করতে চায়। সমাজের চোখে তাঁকে হেয় করতে চাইছে। কিন্তুু কেন? এবং কে?

কে এই মারুফুল ইসলাম? তাকে কী আমি চিনি? বা চিনতাম কখনো? কখনো দেখা হয়েছে? কেন সে আমার সম্মান নষ্ট করতে সচেষ্ট হবে? মারুফুল ইসলাম কেন আমার এতোবড়ো শত্রæ হবে? হবে, হবে, হবে। পেয়েছি-পেয়েছি-পেয়েছি। হিরণ! হিরণ এ কাজটা করেছে। ও নিজের নাম দেয়নি। ওরই কোন সাঙ্গ-পাঙ্গ দিয়ে করিয়েছে। মালিবাগের ফ্লাটের ভাড়াটিয়া হিরণ। দেড় মাস আগে, মানে গত মাসের আগের মাসে আফসানা বেগমের মালিবাগের দোতলার ফ্লাটটি হিরণ ভাড়া নিয়েছে আইটি অফিস খুলবে বলে। অনলাইনে কনজুমার্স প্রডাক্ট বিক্রি করবে। কী উৎসাহ উদ্দিপনা নিয়ে দুই তরুন হিরণ আর ওর বন্ধু আইটি ইঞ্জিনিয়ার খোকন অফিসের যাত্রা শুরু করলো। সাত দিনের ভেতর নতুন নতুন চেয়ার, টেবিল, কম্পউটার কিনে এগারশ স্কয়ার ফিটের ফ্লাট সাজিয়ে ফেললো। কনজুমার্স প্রডাক্ট-বাচ্চাদের জামা-কাপড়, জিন্সের পেন্ট, তেল সাবান, মরিচের গুড়া, হলুদের হুড়াসহ বিভিন্ন মসল্যাপাতিতে ঘরে ম-ম-গন্ধ। তিনটা মেয়েকে এ্যাপয়েন্টম্যান্ট দিয়ে নতুন চকচকে তিনটা কম্পিউটারে বসিয়ে দিল। এক রুমে এ্যাপায়টেন্ট মেয়েরা বসে। কম্পিউটারে কী কাজে ব্যস্ত তারাই জানাই। হিরণ আর খোকন অন্য রুমে। সামনে কম্পিউটার, কানে আইফোন লাগিয়ে মহা ব্যস্ত ব্যবসায়ি আলাপ-আলোচনা নিয়ে।

আফসানা বেগম দু-তিন দিন ওদের দেখতে গেছেন ফ্লাটটি ভাড়া দেয়ার পর। ওদের কর্ম ব্যস্ততা দেখে ভালোই লেগেছে। যাক ছেলেগুলি বেশ করিৎকর্মা। মাত্র ক’ দিনে কেমন জমিয়ে ফেলেছে ব্যবসা। তিনিও নিশ্চিন্ত হলেন, মাস গেলোই বিশ হাজার টাকা নিশ্চিত ভাড়া পাবেন। ফ্লাটটা গত একটা মাস খালী পরেছিল। যুতসই ভাড়াটিয়া পাওয়া যাচ্ছিল না। যাক নিশ্চিন্ত হওয়া গেল।

এক মাস পরেই হিরণ বলে, ওরা আর থাকবে না। করোনার কারনে ব্যবসা জমাতে পারছে না। আফসানা বেগম গত সপ্তাহে ফ্লাটে গিয়ে দেখেন, মেয়ে তিনটাও বিদেয় হয়েছে। ঘরে ঘরে তিনটা কম্পিউটারের জায়গায় একটা কম্পিউটার নিয়ে এক ঘরে বসে ঝিমুচ্ছে হিরণ আর খোকন।

তিন দিন আগে আবার গেলেন আফসানা বেগম মালিবাগ। হিরণ এসে পা জড়িয়ে ধরলো আফসানা বেগমের। আফসানা বেগম সোফায় বসেছিলেন। প্রথমে ভ্যাবাচ্যাকা খেয়ে যান। কী হয়েছে? জিজ্ঞেস করতে বলে হিরণ-আন্টি আমরা চালাতে পাচ্ছি না। আমরা আপনার বাসা ছেড়ে দেবো এ মাসে।

- ঠিক আছে। না পারলে কী আর করা। তবে এক মাস থাকলে সে এক মাসের ভাড়া দিয়ে যাও।

- পারবো না আন্টি। আমরা একেবারে নিঃস্ব হয়ে গেছি। এতো কিছু কিনলাম। আমাদের হাতে কোন টাকা নেই। আমরাতো আপনার বাসা এক মাস মাত্র ব্যবহার করেছি। এ মাস গেলে দু-মাস হবে। দু মাসের ভাড়া আমাদের মাফ করে দেন আন্টি। আপনি আমার মায়ের মতো। মায়ের মতো কী বলছি, মা-ই।

প্রথম দিন থেকেই ওদের দু’বন্ধুর মধ্যে এই ছেলেটিকে একটু টাউট প্রকৃতির মনে হয়েছিল আফসানা বেগমের। আজ নিশ্চিত হলেন। আসলেই এ টাউট। প্রায় দু’মাস ব্যবসা করলো। ভাড়ার কথা বললে দেই-দিচ্ছি বলে সময় কাটালো। এখন বলছে টাকা নেই। ভাড়া দিতে পারবো না। মাফ করে দ্যান। পা জড়িয়ে ধরছে। খুব অল্পতেই যারা অন্যের পা জড়িয়ে ধরতে পারে সে মানুষগুলি আসলেই অমানুষ হয় নয়তো টাউট হয়। এ টাউটকে কীভাবে শায়েস্তা করতে লাগে আফসানা বেগম তা জানেন। তিনি ক্লান্ত স্বরে বললেন-পা ছাড়ো, উঠে বসো। তোমরা ব্যবসা না করতে পারলেতো আমি তোমাদের থাকতে জোর করবো না। তবে ভাড়া তোমাদের দিয়ে যেতে হবে। তোমরা চেষ্টা করো ভাড়া যোগার করার।

- জ্বী, আন্টি, আমরা চেষ্টা করবো।
এ ফ্ল্যাটের তিনটা বেডরুমের মধ্যে মাষ্টার বেডরুমটা ভাড়ার আওতার বাইরে রেখেছেন আফসানা বেগম। মাঝে মধ্যে এসে নিজের মতো করে বিশ্রাম নেয়ার জন্যে। বসার জন্যে। রুমটি চেয়ার টেবিল-বিছানাপত্র দিয়ে সুন্দর করে সাজানো।
খোকন বললো, আন্টি কী আজ থাকবেন এখানে?
- সম্ভবত।
- আমরা আজ চলে যাই।
- যাও, তবে আগামীকাল ভাড়ার টাকা নিয়ে এসো।
- চেষ্টা করবো আন্টি।
আফসানা বেগম বুঝলেন এটা ভেক কথা। ভাড়া ওরা দেবে না।
ওরা চলে গেলে তিনি ড্রাইভারকে দোতলায় ডেকে বললেন-কালাম, ওদের দু’জনের ঘরের সব জিনিসপত্তর আমার ঘরে ঢোকা।
- জিনিসপত্তর কী?
- চেয়ার, টেবিল, কম্পিউটার। কাপড়-চোপড়, রাউটার সব খুলে আমার ঘরে রাখ।
- কেন ম্যাডাম?
- ভাড়া দেবে না।

এ কথা শুনে কালাম মহা উৎসাহে লেগে গেল সব কালেকশন খুলতে। কাপড়ের কার্টুনগুলি নিতে নিতে বললো, আপনার ঘরেতো জায়গা হবে না ম্যাডাম।
- গাদাগাদি করে রাখ চেয়ার-টেবিল। একটার উপর একটা তুলে। আর কম্পিউটারটা আমার বিছানার উপর রাখ।
মনে মনে আফসানা বেগম হিসেব করলেন, ভাড়া না দিলে কম্পিউটারটা বিক্রি করে পুশিয়ে নেবেন। আমিতো এখানে থাকি না। ওরা যদি এসব মালামাল নিয়ে চলে যায় তবে সবই গেল। ভাড়ার টাকাও গেল, মালামালও গেল।

মালামাল নিজের ঘরে রেখে ঘর তালাবদ্ধ করে বাসায় ফিরে হিরণ আর খোকনকে ফোন করে বললেন, আমি তোমাদের মালামাল আমার ঘরে তালাবদ্ধ করে রেখে এসেছি। তোমরা ভাড়ার টাকা পরিশোধ করে মালামাল নিয়ে যাবে। বলে টেলিফোন কেটে দিলেন আফসানা বেগম। পরের দিন অর্থাৎ গতকাল কেউ আর কাউকে ফোন করেনি। আফসানা বেগমও নিরব।

তাঁর মনোভাব, আমার যা করার ছিল করে দিয়েছি। এখন তোমরা আমার পেছন ঘোড়। না হলেতো তোমাদের পেছনে আমার ঘুড়তে হতো ভাড়ার টাকার জন্যে।
বোঝ মজা এখন। আমার সঙ্গে চালাকি!
কিন্তুু এখন দেখছেন, চালাকিতে তিনি-ই বোধ হয় হেরে গেলেন। হয় ওরা মালিবাগের বাসার লক ভেঙ্গে নিজেদের সব জিনিসপত্তর নিয়ে গিয়ে এখন সেই ভাঙ্গা লকের ছবি দিয়ে ফেসবুকে এই পোষ্ট দিয়েছে হিরণ বা খোকন নিজেদের কারো নাম দেয়নি। দিয়েছে অন্য নামে। মারুফুল এ হয়তো ওদেরই কোন সাকরেদ টাকরেদ, ইয়ার বন্ধু হবে।
এখন চুরির দায় যে আফসানা বেগমের ওপর ফেলেছে! এখন কী করবেন তিনি? কী করা উচিত এখন তার? চুপচাপ বসে থাকবেন?
না! চুপচাপ বসে থাকবেন না। এদের উচিত শিক্ষা দিতে হবে! এদের বিরুদ্ধে মামলা করতে হবে। জেল খাটাতে হবে। চৌদ্দ শিকে ভরতে হবে। ভাড়া না দিয়ে বেঁচে যাওয়ার কত রকম ফন্দি ফিকির আটছে এই ছোট লোকের বাচ্চারা। আফসানা বেগম সংবাদপত্রে পড়েছিলেন, তথ্য প্রযুক্তি আইন খুব কড়া। কেউ কারো বিরুদ্ধে মিথ্যে কিছু প্রচার করলে বা লিখলে তার সাত বছর থেকে চৌদ্দ বছর কারাদন্ড হবে। প্রযুক্তি সংক্রান্ত অপরাধ দমনের জন্যে এমন কঠোর আইন করেছে সরকার।
তিনি তাঁর বান্ধবী এডভোকেট ফাতিমা বশিরকে ফোন করলেন। পড়ে শোনালেন তার আইডিতে লেখা স্টেটাস।
ফাতেমা পরামর্শ দিল- স্টেটাস সেভ করে রাখ। নয়তো এ ছেলে আবার ফেসবুকে থেকে উইড্রো করে নিতে পারে। কিন্তুু এর মধ্যে তোমার যা ক্ষতি করার তাতো করেই নিল। একে ছাড়া যাবে না, মামলা করলে ব্যাটা তখন বুঝবে।
- কতদিন লাগবে ব্যাটাকে জেলে ভরতে?
- আরে থানায় মামলা নিলে, এজাহার দায়ের পর পরই পুলিশ ছুটবে ওদের এ্যারেষ্ট করতে।
- এটাই আমি চাই।
- তুমি চলে আস। তোমাকে নিয়ে থানায় যাবো। সঙ্গে কিন্তুু তোমার এই আইডির মোবাইল আনতে ভুলো না।
- কেমন খরচ লাগবে? তুমিতো আমার বন্ধু! আমার কাছে তুমি কিছু গোপন করবে না।
- প্রাথমিকভাবে হাজার বিশেকতো লাগবেই। এটা মনে করো মামলার খরচ।
- ঠিক আছে, ফাতেমা আমি একটু আমার ছেলের সঙ্গে পরার্মশ করে-নি।
- তোমার ছেলে কোন দেশে যেন থাকে?
- কানাডা।
- ও, ও আমার বোনও তো থাকে। কোন সিটিতে থাকে তোমার ছেলে?
- টরেন্টো।

ফোন রেখে আফসানা বেগম ভাবতে থাকেন, ছেলেকে না জানিয়ে মামলা-মোকদ্দমায় জড়ানো যাবে না। টরেন্টোতে এখন গভীর রাত। রিফাত ঘুমুচ্ছে। এখন ফোন করাই ঠিক হবে। ফোন কী ও ধরবে! এতো কিছু ভাবলেতো চলবে না। ফোন ওকে ধরতেই হবে। মামলা করার আগে কথা বলতেই হবে রিফাতের সঙ্গে। ফোনটা হাতে নিয়ে আবার পড়লেন তিনি স্টেটাসটা। ক্লিক করে নিজের আইডিটা আবার পরখ করলেন। যতবার ক্লিক করছেন তাঁর নিজের প্রফাইলই বেরুচ্ছে। কোন ভুল নেই।

ভাইবার ক্লিক করলেন রিফাতের আইডিতে। রিং হচ্ছে। একবার, দু’বার, তিনবার, রিং যেন মোবাইলে বাজছে না, রিং বেজে চলেছে আফসানা বেগমের কলিজার ভেতর।

গভীর ঘুম ভাঙ্গা ভয়ার্ত গলায় ‘হ্যালো মা’ বলতে আফসানা বেগম ছেলেকে আস্বস্থ করে বললেন - ভয় পাস না বাবা, তোকে এতো রাতে ফোন করায়। ভয়ের কিছু না। আমি ভালো আছি। ছোট একটা ঘটনা ঘটেছে। একটা কাজ করতে হবে এবং সেটা আজ-ই তোকে জানানো প্রয়োজন তাই এতো রাতে ফোন করলাম।

তারপরও রিফাতের সংশয় কমে না। সংশয়ভরা কন্ঠে বলে - বল মা।

আফসানা বেগম সব খুলে বললেন পুত্রের কাছে। মায়ের কাছে সব শুনে শান্ত গলায় রিফাত বলল-আমি দেখছি মা। আমি দেখে নিয়ে তোমাকে রিং দিচ্ছি। তুমি রাখ মা এখন। কেটে দিল সংযোগ রিফাত।

আফসানা বেগম আবার ক্লিক করেন সেই লিংকে। আবারো স্কিনে ভেসে ওঠে নিজের প্রফাইল। উত্তেজনায় মন কাঁপে, আমার সারা জীবনের অর্জন, তিল-তিল করে গড়ে ওঠা মান সম্মান এই একটা ক্লিকে ধূলিসাৎ হয়ে গেল! চোর হয়ে গেলাম আমি! আমি চোর! তাও আবার কার না কার ঘরের দরজার লক ভেঙ্গে চুরি করেছি! তাও আবার কী চুরি করেছি, ওর মোবাইল আর টাকা। ই-স্! এতোই আমার টাকার অভাব, মানুষের ঘরের তালা ভেঙ্গে টাকা চুরি করবো! আবার আমার মোবাইলটা নাকি ওর ঘরের টেবিলে রেখে এসেছি! কই? আমার মোবাইল তো আমার হাতেই।

খোকনতো নাকি আইটিতে পড়াশোনা করেছে। নিশ্চয় খোকনের কারসাজিতে এই চুরির নাটক তৈরি করে সেই অপবাদ আমার ঘরে চাপিয়ে জনসম্মুখে আমাকে হেয় করতে এ কাজ করেছে। কিছুতেই এদের ছাড়া যাবে না। চৌদ্দ শিকের ভেতর ঢুকিয়ে জেলের ঘানি টানিয়ে তবে ক্ষান্ত হবেন আফসানা বেগম!

আমার নামও আফসানা বেগম! কিশোরী বয়সেই মুক্তিযুদ্ধ করেছি। সেই বয়েস থাকলে আজ মামলায় যাওয়া লাগতো না। তোদের মতো দুই-চারটাকে নিজেই ফেলে দিতাম। হারামজাদারা!

ছেলের ফোন বেজে উঠলো - মা,
- হ্যা বাবা, বল।
- দেখলাম। ওরা কারা? তুমি কী চেন ওদের।
- যেই ছেলে পোষ্টটা দিয়েছে তাকে চিনি না। তবে ওর সাঙ্গ-পাঙ্গদের চিনি। আমার মালিবাগের বাসার ভাড়াটিয়া। প্রায় দু’মাস আগে মালিবাগের বাসাটা ভাড়া নিয়েছিল আইটি অফিস করার জন্যে। এখন ভাড়া দিচ্ছে না। ওদের অফিসের কম্পিউটার আটকিয়েছি জন্যে এ কাজ করেছে ওরাই।
- মা, তোমার মান-সম্মান সব ধূলায় লুটিয়ে দিল। তুমি দেশে মুখ দেখাবে কী করে? বাংলাদেশের প্রায় সব মানুষ তোমাকে চেনে। তুমি এতো এতো টকশো করো বিভিন্ন চ্যানেলে। মানুষতো সবাই তোমাকে চেনেই। কী করলে মা তুমি এটা?

এবার আফসানা বেগম ভ্যাঁ করে কেঁেদ ফেললেন-
- তোর কী বিশ্বাস হয়, আমি কারো ঘরে গিয়ে চুরি করেছি?
- তা তো হয় না মা। কিন্তুু মানুষকে বিশ্বাস করাবে কী করে তুমি? ক’জনকে বলে বলে বিশ্বাস করাবে? অলরেডিতো দেখলাম পঁচাত্তরজন তোমার ফেসবুক ফ্রেন্ড লিংকটা দেখে ফেলেছে। এখন তুমি কী করবে মা? কী করতে চাও?
- মামলা করবো। তথ্য-প্রযুক্তি আইনে মামলা করবো, মানহানীর মামলা করবো! আমার বান্ধবী ফাতেমা খালার কথা মনে আছে? ওতো হাইকোর্টের ল’ইয়ার। ও মামলা করে দেবে।
- এদের ছাড়া যাবে না। মামলা করো মা। তা তোমার বান্ধবী ফাতেমা খালা কী টাকা-পয়সা নেবে? না বিনে পয়সায় মামলা করে দেবে?
- ও আমার বান্ধবী না। বেশী টাকা নেবে না, শুধু খরচের টাকাটা দিলেই চলবে বলেছে।
- তা খরচের কত টাকা?
- আপাতত বিশ হাজার টাকা নিয়ে যেতে বলেছে।
রিফাত হা-হা-হা করে ভূবন ফাটানো হাসিতে ফেটে পড়ে। ওর সেই স্বভাবসুলভ অট্ট হাসি। আফসানা বেগম থতমতো খেয়ে যান। মনে দ্বিধা খাড়া হয় মাথা তুলে-মায়ের এমন বিপদে আমার নিজের ছেলে অমন অট্ট হাসি হাসছে কেন?
- হাসিস কেন? ধমকে ওঠেন আফসানা বেগম।
হাসি হাসি কন্ঠেই রিফাত বলে মাকে-টাকাটা তুমি আমাকে পাঠিয়ে দাও। আমি তোমার সকল বিপদ আসান করে দেই। তুমিতো বিশ হাজার টাকা দিতেই চাচ্ছ তোমার ল’ইয়ার বান্ধবীকে। টাকাটা আমাকে দেও মা, কাজে লাগাই।
- তোর কি টাকার অভাব পড়েছে বড়ো?
- টাকার অভাব কার না মা!
ছেলের অমন রশিকতাপূর্ন কথাবার্তায় আফসানা বেগমের মনের রাগ ভয় কমার হাওয়া লাগে। তিনি ছেলেকে ধমক লাগান- এ্যাই রিফাত, ফাজলামো রাখ। কী হয়েছে, বল। রিফাত পূর্ববৎ হাসি হাসি কন্ঠেই বলে-অল্পবিদ্যা ভয়ঙ্কারি বলে একটা কথা আছে না! তাই হয়েছে।
- কী তাই হয়েছে।
- তোমার ‘অল্প বিদ্যা’ ছোট একটি সামান্য বিষয়কে মহাবিষয় করে তুলেছে।
- কী বলিস? ছোট বিষয়?
- শুধু ছোট বিষয় না মা, সিলি বিষয়। তুমি আর কাউকে বলোনিতো?
- না,
- গুড!
- অল্পবিদ্যার কী হলো এখানে? আমি কি মূর্খ? আফসানা বেগমের কন্ঠে ক্ষুদ্ধ অভিমান ঝড়ে পড়ে।
- মা, তুমিইতো বলো এবং স্বীকার করো, আইটিতে তুমি মূর্খ।
- হ্যাঁ! যেটা আমি ভালো জানি না। সেটা স্বীকার করতে দোষ কী? সব মানুষ সব বিষয়ে পারদর্শী হতে পারে না।
- আমিও তো সেটাই বলছি মা। আর সব বয়সে সব সাজেও না। এই যে কত বছর ধরে তোমাকে বলে আসছি আমাদের কাছে চলে এসো। দেশের সব বাড়ি-ঘর বিষয় সম্পত্তি বেচে-বুচে কানাডা চলে এসো। ঐ টাকায় এখানে দু’টো বড়ো বাড়ি কিনে, একটা ভাড়া দেবে, আর একটায় থাকবে। দিব্বি আরামসে চলে যাবে তোমার। তুমি আমাদের কাছেও থাকলে। আমরাও তোমাকে কাছে পেলাম। ঐ বাড়ি ঘরগুলি ছাড়া দেশে তোমার আছেটা কী, বলো তুমি।
- তোর বাবার কবর। সেটাই তো আমার সব। আমি প্রতি বৃহষ্পতিবার গিয়ে কবর জিয়ারত করি। দোয়া দরুদ পড়ে তোর বাবাকে বক্রে দেই।
- মা, এটা তুমি এখানে বসেও করতে পারো। কবরের কাছে গিয়ে করতে হবে এমন কোন কথা নেই। বাবা কী শুনতে পান? তুমি পৃথিবীর যেখানে বসেই বাবার জন্যে দোয়া করবে আল্লা সেখান থেকেই তোমার দোয়া কবুল করবেন।
আমরা কী বাবার জন্যে দোয়া করি না এখানে বসে? আফসানা বেগম অস্থির কন্ঠে বলেন - এখন ওসব কথা রাখ, আসল কথা বল। আমার ফাতেমার চেম্বারে যেতে হবে মামলা করার জন্যে।
- মা শোন, তোমার কোথাও যেতে হবে না। তুমিতো সারা দিন পড়ে থাকো ফেসবুক আর ইউটিউব নিয়ে।
আফসানা বেগম ক্ষুদ্ধ কন্ঠেই উত্তর দেন - তো কী করবো? তোরাতো আমাকে রোগীও দেখতে দিস না। আর চাকরি করতে বারন করিল। কী করে সময় কাটবে আমার। সারা দিনে তোদের সাথে ভাইভারে একটু কথা বলি। তাও আবার তোদের সবসময় সময় হয় না কথা বলার।
- কী করবো মা, বিদেশের জীবনটাই এমন। তাইতো বলি, তুমিও চলে আস আমাদের কাছে।
- সে পরে দেখা যাবে। এখন আসল কথা কী, বল।
- আসল কথা কিছু না মা, এটা-একটা সিলি বিষয়। কোন দুষ্ট ছেলে যে তোমার ফেসবুক ফ্রেন্ড সে দুষ্টুমি করে এমন একটা ভেক আইডি দিয়ে মজা করেছে। তোমার ভাষায় মসকরা করেছে তোমাদের সাথে।
- তোমাদের সাথে মানে?
তোমাদের ফেসবুক বন্ধু যে-ই ওর সঙ্গে লিংক আছে; সে-ই যদি ঐ লিংকে ক্লিক করে তবে প্রত্যেকে নিজের নিজের প্রফাইল-ই দেখতে পাবে। প্রত্যেকে নিজেকে চোর মনে করবে। মনে করবে ‘আমাকে’ চোর বলেছে।
আবার রিফাতের সেই অট্ট হাসি - মা, তোমাদের ভারি বোকা বানালো ছেলেটি।
ছেলের প্রাণখোলা অট্ট হাসিতে আফসানা বেগমের শরীর আর মন থেকে ম্যালেরিয়া জ্বরের উত্তেজনা আস্তে আস্তে উড়ে যেতে থাকে। 

   

সাহিদা বেগম
গবেষক ও সহকারী অ্যাটর্নি জেনারেল,
বাংলাদেশ



আপনার মূল্যবান মতামত দিন:


Top