সিডনী শনিবার, ৬ই মার্চ ২০২১, ২২শে ফাল্গুন ১৪২৭

দু' বাংলার নবান্ন উৎসবের গুরুত্ব ও তাৎপর্য : ডঃ সুবীর মণ্ডল


প্রকাশিত:
২০ ফেব্রুয়ারি ২০২১ ১৩:৪৮

আপডেট:
২০ ফেব্রুয়ারি ২০২১ ১৩:৫৪

 

এপার বাংলা ও ওপার বাংলার ঐতিহ্যবাহী শস্যোৎসব নবান্ন। পালিত হয় অগ্রহায়ন মাসেই। বাংলার কৃষি সমাজে শস্য উৎপাদনের বিভিন্ন পর্যায়ে যে সকল আচার-অনুষ্ঠান ও উৎসব পালিত হয়, নবান্ন তার মধ্যে অন্যতম। "নবান্ন" শব্দের অর্থ "নতুন অন্ন"। নবান্ন উৎসব হল নতুন আমন ধান কাটার পর সেই ধান থেকে প্রস্তুত চালের প্রথম রান্না উপলক্ষে আয়োজিত উৎসব। সাধারণত অগ্রহায়ণ মাসে আমন ধান পাকার পর এই উৎসব অনুষ্ঠিত হয়। কোথাও কোথাও মাঘ মাসেও নবান্ন উদযাপনের প্রথা রয়েছে। নবান্ন অনুষ্ঠানে নতুন গুড় সহ নতুন অন্ন নতুন চালের তৈরি খাবার বানিয়ে প্রতিবেশী ও আত্মীয়দের, সেই সঙ্গে কাক-কে দেওয়া নবান্নের অঙ্গ একটি বিশেষ লৌকিক প্রথা। লোক বিশ্বাস অনুযায়ী, কাকের মাধ্যমে ওই খাদ্য পূর্ব-পুরুষদের কাছে পৌঁছে যায়। এই নৈবেদ্যকে বলে "কাকবলী"। অতীতে পৌষ সংক্রান্তির দিনও গৃহ দেবতাকে নবান্ন নিবেদন করার প্রথা ছিল।

নবান্ন উৎসব হিন্দুদের একটি প্রাচীন প্রথা। হিন্দুশাস্ত্রে নবান্নের উল্লেখ ও তার রীতি নির্দিষ্ট করে বর্ণিত করা রয়েছে। হিন্দু বিশ্বাস অনুযায়ী, নতুন ধান উৎপাদনের সময় পিতৃ-পুরুষ অন্ন প্রার্থনা করে থাকেন। এই কারণে হিন্দু বিধি অনুযায়ে নবান্নে শ্রাদ্ধানুষ্ঠান করে থাকেন। শাস্ত্রমতে, নবান্ন শ্রাদ্ধ না করে নতুন অন্ন গ্রহণ করলে পাপের ভাগী হতে হয়। একদা অত্যন্ত সাড়ম্বরে নবান্ন উৎসব উদযাপন হত, সকল মানুষের সবচেয়ে অসাম্প্রদায়িক উৎসব হিসেবে নবান্ন উৎসব সমাদৃত ছিল। কালের বিবর্তনে গ্রাম বাংলার ঐতিহ্যবাহী এই নবান্ন উৎসব বিলুপ্তপ্রায়। তবে এখনও বাংলাদেশ ও পশ্চিমবঙ্গের কিছু কিছু এলাকায় নবান্ন উৎসব অত্যন্ত উৎসব মুখর পরিবেশে উদযাপিত হয়। বাংলাদেশের বেশ কয়েকটি গ্রামে নবান্ন উৎসব উদযাপিত হয়। পশ্চিমবঙ্গের মুর্শিদাবাদ,বীরভূম, বর্ধমান সহ বিভিন্ন স্থানে আনুষ্ঠানিক ভাবে এই উৎসব আবহমানকাল ধরে উৎসব মুখর পরিবেশে উদযাপিত হয়ে আসছে।

এই উৎসবে নতুন ধানের চাল দিয়ে তৈরি করা হয় পিঠা পায়েস, ক্ষীর-সহ নানা রকম খাবার। সুস্বাদু খাবারের গন্ধে ভরে ওঠে চারপাশ। সোনালী ধানের প্রাচুর্য আর বাঙালির বিশেষ অংশ নবান্ন ঘিরে অনেক কবি-সাহিত্যিকের লেখায় উঠে এসেছে প্রকৃতির চিত্র। এই উৎসব উপলক্ষ্যে ঘরে ঘরে তৈরি হয় নতুন চালের পিঠা, ক্ষীর- পায়েসসহ নানা উপাদান। হেমন্তে নতুন ফসল ঘরে তোলার সময় এই উৎসব পালন করা হয়। হাজার বছরের পুরনো এই উৎসবটি যুগ যুগ ধরে একইভাবে পালন হয়ে আসছে। নবান্ন উৎসবে গ্রামগঞ্জে আয়োজন করা হয় বাংলাদেশের বগুড়া জেলার আদমদীঘি উপজেলার শালগ্রাম সহ আশেপাশের বেশ কয়েকটি গ্রামে আবহমানকাল ধরে নবান্ন উৎসব, অত্যন্ত উৎসব মুখর পরিবেশে উদযাপিত হয়ে আসছে। এপার বাংলার মুর্শিদাবাদ , বীরভূম, বর্ধমান, বাঁকুড়া সহ বিভিন্ন স্থানে আনুষ্ঠানিক নবান্ন উৎসব উদযাপিত হয় আজও।

১৯৯৮ সাল থেকে বাংলাদেশের রাজধানী ঢাকা শহরে আনুষ্ঠানিকভাবে নবান্ন উৎসব উদযাপন শুরু হয়েছে। জাতীয় নবান্নোৎসব উদযাপন পর্ষদ প্রতিবছর পহেলা অগ্রহায়ণ তারিখে নবান্ন উৎসব উদযাপন করে।উৎসব বাংলা -৩ দিন ব্যাপি নবান্ন উৎসব আয়োজন করে আসছে রমনা বট মূলে। এ ছাড়া সাংকৃতিক সংগঠন শোবিজ এন্টারটেইনমেন্ট রাজধানীর ধানমন্ডি রবীন্দ্র সরোবর বিগত ১২ বছর যাবত ৩ দিন ব্যাপি নবান্ন উৎসব ও পিঠা মেলা আয়োজন করে আসছে । এ উৎসবের ৩৩ টি স্টলে ২০০ ধরনের পিঠা থাকে । এ ছাড়া উৎসব প্রাঙ্গণের উন্মুক্ত মঞ্চে প্রতিদিন সকাল ৭ টা থেকে রাত ৮টা পর্যন্ত আয়োজন করা হয় নবান্নের নাচ, নবান্নের গান, লোকগীতি, লালন গীতি ,বাউল গান,সাপ খেলা বানর খেলা, লাঠি খেলা, নাগর দোলা, পুতুল নাচ, পালকি, পথ নাটকসহ বিভিন্ন সাংস্কৃতিক পরিবেশনা। এই নবান্ন উৎসবের সমাপনী দিনে সেরা পিঠা শিল্পীদের পুরস্কার প্রদান করা হয় ।

ঋতুবৈচিত্র্যে হেমন্ত আসে শীতের আগেই। কার্তিক আর অগ্রহায়ণ মাস নিয়ে হেমন্ত ঋতু। অগ্রহায়ণের নবান্ন নিয়ে আসে খুশির বার্তা। নতুন ধান ঘরে তোলার কাজে ব্যস্ত থাকে কৃষাণ কৃষাণীরা। আর ধান ঘরে উঠলে পিঠে পায়েস খাওয়ার ধুম পড়ে যায়। পাড়ায়- পাড়ায় চলে নবান্ন উৎসব। গ্রাম -বাংলায় নতুন এক আবহের সৃষ্টি হয়। নবান্ন উৎসবের সাথে মিশে আছে বাঙালিয়ানার হাজার বছরের ইতিহাস, ঐতিহ্য আর সংস্কৃতির নানা বর্ণময় দিক। প্রাচীনকাল থেকেই বাঙালি জাতি ধর্ম -বর্ণকে উপেক্ষা করে নবান্নকে কেন্দ্র করে উৎসবে মেতে ওঠে। একে অন্যের মধ্যে তৈরি হয় এক সামাজিক মেলবন্ধনের।

অগ্রহায়ণের শুরুতেই আমাদের গ্রাম-বাংলায় চলে নানা উৎসব, নানা আয়োজন। নতুন ধান কাটা আর সেই সাথে প্রথম ধানের অন্ন খাওয়াকে কেন্দ্র করে পালিত হয় এই উৎসব। বাঙালির বার মাসে তের পাবর্ণ- এ যেন সত্যি হৃদয়ের বন্ধনকে আরো গাঢ় করার উৎসব। হেমন্ত এলেই দিগন্তজোড়া ফসলের মাঠ ছেয়ে যায় হলুদ রঙে। এই শোভা দেখে কৃষকের মন আনন্দে নেচে ওঠে। নতুন ফসল ঘরে ওঠার আনন্দ। প্রাচীনকাল থেকেই বাঙালির জীবনে অগ্রহায়ণ কৃষকের নতুন বার্তা নিয়ে আগমন ঘটে। নবান্ন হচ্ছে হেমন্তের প্রাণ। নতুন ধানের চাল দিয়ে তৈরি করা হয় পিঠা পায়েস, ক্ষীরসহ হরেক নানা রকম খাবার। সুস্বাদু খাবারের গন্ধে ভরে ওঠে চারপাশ। সোনালি ধানের প্রাচুর্য আর বাঙালির বিশেষ অংশ নবান্ন ঘিরে অনেক কবি-সাহিত্যিকের লেখায় উঠে এসেছে প্রকৃতির চিত্র। কবি জীবনানন্দ দাশ তার কবিতায় লিখেছেন- আবার আসিব ফিরে ধান সিঁড়িটির তীরেএই বাংলায়/মানুষ নয়- হয়তো বা শঙ্কচিল শালিখের বেশে/ হয়তো ভোরের কাক হয়ে এই কার্তিকের নবান্নের দেশে/কুয়াশার বুকে ভেসে একদিন আসিব এ কাঁঠাল ছায়ায়। কবির কবিতার লাইনের মতোই নবান্নে চিরায়ত বাংলার রূপ।'ঘ্রাণেভরা অঘ্রাণে শুভ নবান্ন।"(রবীন্দ্রনাথ),কবি যতীন্দ্রনাথ সেনগুপ্তর ভাবনায়" ক্ষমাকর সখা বন্ধ করিনু তুচ্ছ ধানের গল্প।"(নবান্ন,মরুমায়া)।ওপার বাংলার জনপ্রিয় কবি আবু জাফরের 'নবান্ন' কবিতায়--"সবুজ ঘাসে শিশির হাসে,মুক্তার সাজে/মৌমাছি গাইছে গান,গুনগুন সুরে বাজে/সোনালী ধান নবান্ন ঘ্রাণ ভরে যায় মন/কৃষকের মন-প্রাণ,ধনে-ধান্য পরিপূর্ণ। /খালেবিলে অতিথি পাখি বসছে ঝাঁকেঝাঁকে/সন্ধ্যা হলে ডানা মেলে কিচির-মিচির ডাকে/ঝিলের জলে ছেলে মেয়ে শাপল-শালুক ফুটে/ পালাগানের উৎসবে মাতি হাসি আর ঠোঁটে।'

অগ্রহায়ণ এলেই কৃষকের মাঠজুড়ে ধানকাটার ধুম পড়ে যায়। অত্যন্ত ব্যস্ত সময় কাটান এ সময়ে কৃষাণ-কৃষাণীরা। ধান ভাঙার গান ভেসে বেড়ায় বাতাসে, ঢেঁকির তালে মুখর হয় বাড়ির আঙিনা। অবশ্য যান্ত্রিকতার ছোঁয়ায় এখন আর ঢেঁকিতে ধান ভানার শব্দ খুব একটা শোনা যায় না। অথচ খুব বেশি দিন আগের কথা নয়, ঢেঁকি ছাঁটা চাল দিয়েই হতো ভাত খাওয়া। তার পরও নতুন চালের ভাত নানা ব্যঞ্জনে মুখে দেয়া হয় আনন্দঘন পরিবেশ। তৈরি হয় নতুন চালের পিঠা, ক্ষীর- পায়েসসহ নানা উপাদান। দেশের কোনো কোনো অঞ্চলে নবান্ন উৎসবকে কেন্দ্র করে চলে খাওয়া দাওয়ার ধুম।

নবান্ন আর পিঠেপুলির উৎসবে আনন্দে মাতোয়ারা হয় সবাই। তাই অগ্রহায়ণ এলেই সর্বত্র বেজে ওঠে নতুন ধ্বনি। যেহেতু নবান্ন ঋতুকেন্দ্রিক একটি উৎসব তাই প্রতি বছর ঘুরেফিরে আসে নবান্ন উৎসব। হেমন্তে নতুন ফসল ঘরে তোলার সময় এই উৎসব পালন করা হয়। হাজার বছরের পুরনো এই উৎসবটি যুগ যুগ ধরে একইভাবে পালন হয়ে আসছে। নবান্ন উৎসবে গ্রামগঞ্জে আয়োজন করা হয় গ্রামীণ মেলার। এসব মেলায় শিশু-কিশোর থেকে শুরু করে সব শ্রেণী-পেশার মানুষের ঢল নামে। আনন্দ দেখা যায় ছোটবড় সব বয়সের মানুষের মধ্যে। গ্রামের খেটে খাওয়া মানুষ এই উৎসব ভিন্নভাবে পালন করে। মেলার এককোণে রাতভর চলে গানের উৎসব। এই উৎসবে উপস্থিত থাকেন নবীন প্রবীণ সবাই। হরেক রকমের বাহারি সব খাবারের দোকানের পসরা দিয়ে বসানো হয় গ্রামীণ মেলা। তবে গ্রামীণ মেলা এখন আর শুধু গ্রামেই হয় না, শহরের মানুষও এখন নবান্নের স্বাদ নিয়ে থাকে।

ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়ের চারুকলা অনুষদ বেশ ঘটা করেই পালন করে নবান্ন উৎসব। বর্ণিল আয়োজনের মধ্য দিয়ে তিন দিনব্যাপী অনুষ্ঠানে রাজধানীবাসী উপভোগ করে থাকে। নানা রকমের পিঠাপুলির আয়োজন থাকে নবান্ন উৎসবে। আমাদের দুই দেশে নবান্ন উৎসবে অঞ্চলভেদে চলে জারি, সারি, মুর্শিদি, লালন, পালা ও বিচার গান। আর মেলায় পাওয়া যায় নানা স্বাদের খাবার। ছোটদের বাড়তি আনন্দ দিতে মেলায় আসে নাগরদোলা, পুতুল নাচ, সার্কাস, বায়োস্কোপ। তখন হয়তো মনে পড়ে যায় ফেলে আসা দূর অতীতের কথা যেখানে মা বাবা ভাই সকলের মিলেমিশে একাকার হয়ে যাওয়া স্বপ্নিল ছবি। দু'বাংলার নানা জেলায় নবান্ন অনুষ্ঠানের ছবি ভিন্নতর হলেও ভাবনা এক।সমগ্র বিশ্বে এই ধরনের অসাম্প্রদায়িক লোকোৎসব বিরল ।পশ্চিমবঙ্গের অন্যতম একটি জেলা বাঁকুড়া। এখানকার নবান্ন উৎসব রূপে-রসে এবং আঙ্গিকে অনন্য,সেই সাথে বর্ণময়। নবান্ন উৎসব 'লয়া খাওয়া 'নামে পরিচিত। মাঠে ধান পাকলে এই লোকাচারটি দক্ষিণ বাঁকুড়ার কৃষিসমাজ পালন করেন পরম মমতায়। পঞ্জিকার শুভদিন দেখে (বিশেষ করে বৃহস্পতিবার বেছে নেন)।বৃহস্পতিবার দিনে বিকেল বেলায় কৃষক পরিবারের কোন একজন সদস্য একটি ধারালো অস্ত্র নিয়ে (কাস্তে) মাঠের ঈশাণ কোণ থেকে তিন গুচ্ছ ধান কেটে আঁটি বাঁধেন।তারপর ওই আঁটি বাঁধা ধানের দেশগুলোকে মাথার ওপর রেখে, কোমরে গামছা বেঁধে বাড়ি ফেরেন। ফেরার সময় রাস্তায় কারোর সাথে কথা বলেন না। পরিবারের মেয়েরা লক্ষীদেবীর আগমন ভেবে শাঁখ বাজান। তারপর আঁটির ধান থেকে চাল বের করে দুধ,মধু,ঘি,গুড়,আদা সহ প্রায় তিন কেজির মত মণ্ড তৈরি করেন। বিভিন্ন উপকরণে তৈরি প্রসাদ মা-লক্ষীদেবীর উদ্দেশ্যে নিবেদন করে বাড়ির সকলের মধ্যে বিতরণ করা হয়। তারপর মাঠের ধান কাটা শুরু হয়, একদিন বিশ্রাম নেওয়ার পর। পশ্চিমবঙ্গের অন্যান্য জেলায় নবান্ন উৎসবকে কেন্দ্র করে আমিষ খাদ্যের আয়োজন করা হয়। কিন্তু দক্ষিণ বাঁকুড়ায় নবান্ন উৎসব আমিষ খাওয়া বিশেষ ভাবে নিষিদ্ধ। সেই কারণেই দক্ষিণ বাঁকুড়ায় নবান্ন পুরোপুরিই নিরামিষ। 

শেষ কথা: সময়ের পরিবর্তনে বাংলার জনপ্রিয় এই লোকাচার ও লোকোৎসবে অনেক খানি ভাঁটা পড়েছে। মূলত ভিন্ন মানসিকতা ও নগরায়ণের কারণে এই লোকসংস্কৃতি আজ সংকটের মুখোমুখি। অনেক জেলায় নবান্ন অনুষ্ঠান লুপ্তপ্রায়। তবু কৃষিসমাজ বুক দিয়ে আগলে রেখেছে আজও। বেঁচে থাক এই প্রাণের গ্রাম-বাংলার উৎসব ও পুরানো বর্ণময় ঐতিহ্য । একে বাঁচিয়ে রাখা আগামী প্রজন্মের গুরুদায়িত্ব। 

 

ডঃসুবীর মণ্ডল
লোকগবেষক, প্রাবন্ধিক, অণুগল্প ও ছোটগল্প এবং ভ্রমণকাহিনীর লেখক

 

এই লেখকের অন্যান্য লেখা



আপনার মূল্যবান মতামত দিন:


Top