সিডনী শনিবার, ৬ই মার্চ ২০২১, ২২শে ফাল্গুন ১৪২৭

ধ্রুবপুত্র (পর্ব সাতাশ) : অমর মিত্র


প্রকাশিত:
২২ ফেব্রুয়ারি ২০২১ ১৩:০৪

আপডেট:
২২ ফেব্রুয়ারি ২০২১ ১৫:০৬

ছবিঃ অমর মিত্র

 

ধ্রুবসখার পুত্রটি ছিল অকৃতজ্ঞ। দুর্বিনীত অহঙ্কারী। এই নগর থেকে সে নির্বাসিত। ধ্রুবপুত্রের অপরাধের কোনো সীমা নেই। সেই অপরাধীর হয়ে কথা বলতে এল নাকি ধ্রুবের বয়স্য শিবনাথ? ফিরে আসতে চায় নাকি সেই যুবক? দেবদত্তার অনুরাগী সেই জ্ঞানান্বেষী? যে নির্বাসনে গেছে, ফিরে এলে তার স্থান হবে কারাগারে। শ্রেষ্ঠী শিবনাথকে দেখতে দেখতে ক্রুদ্ধ হয়ে উঠতে লাগলেন। মনে পড়ে গেল সব। ধ্রুবপুত্র কি জানত না শ্রেষ্ঠীর মন কোথায় পড়ে আছে? গণিকা দেবদত্তার জন্য সুভগ দত্ত তাঁর এত বছরে অর্জিত সর্বস্ব ত্যাগ করে একবস্ত্রে গিয়ে দাঁড়াতে পারেন তাঁর সমুখে। কী সুন্দর সে। দেবদত্তার মুখখানি মনে পড়লে তাঁর সর্বাঙ্গ রোমাঞ্চিত হয়ে ওঠে সেই সুন্দরীর অত নীরবতাতেও। পরামর্শদাতারা তাঁকে বলেছে অপেক্ষা করতে। শ্রেষ্ঠী নিজেও জানেন অপেক্ষার কোনো বিকল্প নেই। দেবদত্তা একদিন তাঁর প্রেমের মূল্য বুঝতে পেরে তাঁর কাছে এসে দাঁড়াবে ভালবাসা নিয়ে। 

শিবনাথ তাঁর সামনে হাঁটুমুড়ে বসল। শ্রেষ্টা ঈষৎ উত্তেজিত হয়ে উঠেছেন। কী বলতে এসেছে ধ্রুবের বয়স্য? জেনে রাখুন, সে এলে তাকে হত্যা করা হবে। একটি মানুষকে নিশ্চিহ্ন করে দিতে আর কত শক্তি  লাগে? ধ্রুবপুত্রকে তিনি নিজেই পাঠিয়েছিলেন ওই গণিকার কাছে চৌষট্টি কলার পাঠ নিতে। শিখে নিক বীণ-বাদনের রহস্য, শিখে নিক নৃত্যের মুদ্রা, চিনে নিক শত পুষ্প, আকাশের কয়েকটি তারা, শিখে নিক কামকলা, স্ত্রী-পুরুষের মিলনের সূত্রগুলি। দেবদত্তার মায়ের কাছে রাজা ভর্তৃহরির শিক্ষা। এই সমস্ত কলাবিদ্যায়  আগ্রহ ছিল ধ্রুবপুত্রের। ধ্রুবপুত্রের মাধ্যমেই গণিকা দেবদত্তার সঙ্গে সম্পর্ক স্থাপিত হচ্ছিল। ওই দলে উপঢৌকন পাঠিয়ে নিজের অনুরাগ প্রকাশ করছিলেন শ্ৰেষ্ঠী। কী আগ্রহেই না তিনি দেবদত্তার সমস্ত সংবাদ ধ্রুবপুত্রর কাছ থেকে সংগ্রহ করতেন। কিন্তু কী অকৃতজ্ঞই না ছিল সে?

সুভগ দত্ত জিজ্ঞেস করলেন, সে কোথায়?

কার কথা বলছেন প্রভু?  শিবনাথ পট্টবস্ত্রের ভিতর থেকে রেশম পেটিকা বের করে সামনে উপুড় করে দিয়ে বলল, আমি বিপন্ন, হে শ্রেষ্ঠী আমাকে রক্ষা করুন।

শ্রেষ্ঠী শিবনাথের কথা শোনেন নি। তিনি অবাক হয়ে দেখলেন ওই রেশম পেটিকা তার চেনা। ঝপ করে তিনি পেটিকা টেনে নিতেই অলঙ্কারগুলি ছড়িয়ে গেল অনেকখানি জায়গায়। চমকে উঠে শ্রেষ্ঠী পিছনে তাকালেন। কেন কে জানে? সব অলঙ্কার তার চেনা। এই নগরে যে কী হচ্ছে এখন তার কোনো হিসেব নেই। শ্রেষ্ঠীর মনে হচ্ছিল তার ঠিক পিছনেই যেন আছে সেই নির্বাসিত যুবক। দেবদত্তাকে অঘ্রান পূর্ণিমায় দেওয়া উপহার না হলে এইভাবে ফিরে আসে? 

ঘরে স্বল্প আলো ছিল দিনের। গবাক্ষটি ততো প্রশস্ত নয়। আরো আলোর জন্য বড় একটি প্রদীপ জ্বালানো ছিল একধারে। প্রদীপের স্বর্ণবর্ণের আলোয় মহালতা, চন্দ্রহার, বাজুবন্ধ, স্বর্ণতিলক, নূপুর, স্বর্ণবলয়--সমস্ত সোনার অলঙ্কার যেন দীপ শিখার মতো জ্বলে উঠল। আলোয় ঘর ভরে উঠল। আগুন যেন অলঙ্কারের গা থেকে ঠিকরে বেরোতে লাগল। সেই আগুন শ্রেষ্ঠীর মুখমণ্ডল স্পর্শ করল। তাঁর চোখ জ্বলে উঠল। ক্রোধ হয়ে উঠল আগুনের মতো। কী অপমান! এভাবে কেউ গণিকার কাছে প্রত্যাখ্যাত হয়? এর কারণ ওই ধ্রুবপুত্র। ধ্রুবপুত্র যদি দেবদত্তার জীবনে প্রবেশ না করত তবে তো তাঁর জয় হতো নিশ্চয়। তিনি যৌবনের কাছে হেরে গেছেন। দেবদত্তা রাজ-অনুরাগিনী, আবার ওই যুবকেরও। যুবক নিশ্চয় লুকিয়ে আছে এই নগরে। তার সঙ্গে যোগাযোগ আছে দেবদত্তার। না হলে এই অলঙ্কার শিবনাথের হাতে পৌঁছল কী করে? 

সুভগ দত্ত জিজ্ঞেস করলেন আবার, সে কোথায়? 

কে, কার কথা বলছেন ভদ্র?

কার কথা বলছি বুঝতে পারছ না? ধ্রুবপুত্র, সেই দূরাচারী পাষণ্ড, সে তো তোমাকে বিপন্নই করেছে, এই অলঙ্কার চুরির দায়ে তোমাকে কারাগারে যেতে হবে।  

শিবনাথ ভয়ে মাথা ঠুকতে থাকে কর্কশ পাথুরে মেঝেয়। কাঁদতে কাঁদতে বলে, হে প্রভু রাজসত্রী দিয়েছে, ধ্রুবপুত্র কোথায় তা জানিনা, অবধান করুন ভদ্র, আমি এক সৈনিকের পিতা, আমার পুত্র নিরুদ্দেশে, যুদ্ধ থেকে ফেরেনি, হূণ বিজয় হলো, উৎসব হলো কিন্তু তার কোনো খবর নেই, আমার পৌত্রী গন্ধবতী সৈনিক কার্তিককুমারের পুত্রী, হে প্রভু আমার কথা শুনুন। 

শুনতে শুনতে সুভগ দত্ত আবার জিজ্ঞেস করলেন, কিন্তু সেই পাষণ্ড কোথায়, অকৃতজ্ঞ? 

সে তো অবন্তী দেশেই নেই। 

তুমি তার কাছ থেকে আসনি?

না ভদ্র। মুখ তুলল শিবনাথ। পট্টবস্ত্রের কোণ দিয়ে চোখ মুছতে থাকে। 

গণিকা পাঠিয়েছে, দেবদত্তা?

না প্রভু, আমি সামান্য মানুষ, গণিকা চিনিনা।

তবে এ অলঙ্কার কে দিল? অবিশ্বাসী চোখে তাকিয়ে আছেন সুভগ দত্ত শিবনাথের দিকে। তিনি বুঝতে পারছেন না কীভাবে দেবদত্তাকে দেওয়া উপহার ধ্রুবপুত্রের পালকপিতার হাতে গিয়ে পৌঁছয়। গণিকা এতই নিষ্ঠুর, অলঙ্কার তাঁরই কাছে এভাবে ফেরত পাঠিয়ে দিয়েছে। শিবনাথের কথা শুনছিলেন শ্ৰেষ্ঠী। সত্রী উদ্ধবনারায়ণের কথা শুনলেন। বিশ্বাস করলেন না। গম্ভীর গলায় বললেন, রাজকর্মচারীর নামে মিথ্যা রটনা করলে পরিণাম ভাল হয় না, জিভ ছিঁড়ে নেবে সে।  

না প্রভু, এইই সত্য, উদ্ধবনারায়ণ বলপূর্বক অধিকার করতে চায় গন্ধবতীকে, সে যুবতী হয়ে উঠেছে  সবে, অন্যের অনুরাগিণী, সে যদি না ফিরে আসে অনূঢ়া থেকে যাবে হয়ত। 

উদ্ধবনারায়ণ এই অলঙ্কার পেয়েছে কীভাবে?

জানি না প্রভু, গত অপরাহ্নে মত্ত উদ্ধব আমার গৃহ প্রাঙ্গণে প্রবেশ করে ওই গহনা দিয়ে বিবাহ প্রস্তাব রেখে গেছে, সে অতিশয় দুর্বৃত্ত প্রকৃতির, আমি কার কাছে যাব ভদ্র, কে আমাদের রক্ষা করবে?

শুনতে শুনতে সুভগ দত্ত লক্ষ্য করছিলেন শিবনাথ তাঁকে প্রভু সম্বোধনে সম্মানিত করছে। শিবনাথের বাচনভঙ্গী অতি নম্র। শ্রেষ্ঠী মানুষ চেনেন। মানুষটি যে অসত্য বলছে তা মনে হচ্ছে না। এই ধরনের মানুষ অসত্য বলতে ভয় পায়। অসত্য কথা তো তৈরি করতে হয়। সে ক্ষমতা এর আছে বলে মনে হয় না। তবু তিনি জিজ্ঞেস করলেন, সত্য বলছ?

হ্যাঁ, প্রভু সত্য।

ধ্রুবপুত্রের সঙ্গে যোগাযোগ হয়নি তো? 

না প্রভু, আমার পৌত্রী তার অপেক্ষায় বসে আছে। 

অবাক হলেন শ্ৰেষ্ঠী। সদ্য বালিকা বয়স অতিক্রান্ত একটি কন্যার ভিতরে প্রেমের উন্মেষ হয়েছে ধ্রুবপুত্রকে ঘিরে। ধ্রুবপুত্র গণিকায় আসক্ত। গণিকা রাজ-অনুরাগিণী।  রাজা চান রানী তাঁর কথাই ভাবুন। তাঁর সন্তান ধারণ করুন। রাজার দিকে ফিরেও তাকান না রানী ভানুমতী। তিনি কুমার বিক্রমে মুগ্ধা। এর ভিতরে শ্রেষ্ঠী, তিনি কে? তিনি গণিকার প্রেমে বিভোর। গণিকা তাঁকে চিনতেই পারে না বোধহয়। তাঁর মুখখানি মনেও রাখেনি দেবদত্তা। এত ধনসম্পদ তাঁর। হিরা, মুক্তা, সোনা, রূপা, কোনো কিছুরই অভাব নেই, কিন্তু তাঁর জন্য কি কেউ বিনিদ্র রজনী যাপন করে এই নগরে? এই অবন্তী দেশে?

সত্য বলছ এসব অলঙ্কার উদ্ধবনারায়ণ দিয়েছে? 

হ্যাঁ প্রভু, গন্ধবতীকে সে অপহরণ করবে বলে গেছে, এই গহনাতেই নাকি তার প্রস্তাব পাকা হয়ে গেছে, আমরা কী করব প্রভু, ওই দুর্বৃত্ত কি ফুলের মতো কন্যাটিকে অপহরণ করবে? অবন্তী দেশে এমন হয়েছে কখনো? 

সুভগ দত্ত বিষণ্ণ। তিনি চুপ করে ভাবছিলেন যে-ই দিক, অলঙ্কার দেবদত্তা রাখেনি নিজের কাছে। দেবদত্তাকে কেন তিনি অঘ্রান পূর্ণিমায় এত অলঙ্কারে সাজিয়ে দিয়েছিলেন তা কি সে জানে না? জানে না কি কেন তাঁর অত রোষ ধ্রুবপুত্রর প্রতি? ধ্রুবপুত্র তার মুগ্ধতা প্রকাশ করেছিল। প্রেম-বিভোরতা জানিয়েছিল, তাই। দেবদত্তা রাজ অনুরাগিনী, যেন সেই কারণেই রাজার প্রতি তাঁর বিদ্বেষ বাড়ছে। রাজা তো গণিকার আমন্ত্রণ প্রত্যাখ্যান করেছেন কতবার, রাজা দেবদত্তাতে মুগ্ধ নন এতটুকু, তবু কি সেই পরমাসুন্দরী রাজার জন্যই বসে থাকে? উদ্ধবনারায়ণকে রাজসভায় তিনিই সুযোগ করে দিয়েছেন। উদ্ধব ছিল তাঁর অনুগ্রহ প্রার্থী। এখনো তাই। সেই উদ্ধব কি দেবদত্তার গৃহে যায়? এত স্পর্ধা তার? গণিকা কি শেষ পর্যন্ত উদ্ধবের কাছে নিজেকে সমর্পণ করেছে। অতিবড় সুন্দরী সে, যোগ্য পুরুষের অভাব ঘটল এই নগরে? বিষণ্ণ শ্রেষ্ঠী মাথা নিচু করে বসেছিলেন। 

শিবনাথ ডাকল, প্রভু আপনি যদি সতর্ক করেন, উদ্ধব থামবে।

বিবাহ তো হতেই পারে, রাজকর্মচারী, কত শক্তি ধরে, ক্রমশ উচ্চপদে উঠে যাবে সে, প্রস্তাব তো  খারাপ নয়।

না প্রভু, সে যে ধ্রুবপুত্রের জন্য বসে আছে।

সে কি ফিরবে এ দেশে?

ফিরবে না? আর্তনাদ করে উঠল যেন শিবনাথ।

ফিরলে তো কারাগারে যাবে, ওই উদ্ধব সেই ব্যবস্থা করবে। 

ভদ্র, আপনি তাকে ক্ষমা করে দিন, তরুণ বয়স, এই বয়স তো ভুল করার, ভুল করেছিল সে, বুঝতে পেরে উজ্জয়িনী ছেড়ে চলে গেছে। 

সে কি তাহলে ফিরেছে গম্ভীরায়?

না, না।

তবে কেন এসব কথা বলছ?

ফেরেনি, ফিরবে নিশ্চয়। 

বলে গেছে? মনে মনে যেন উদ্বিগ্ন হয়ে উঠেছিলেন সুভগ দত্ত। অথচ ধ্রুবপুত্র যদি ফেরেও, তাঁর কী ক্ষতি হবে? ধ্রুবপুত্রের অবর্তমানে দেবদত্তা কি তাঁকে গ্রহণ করেছে? কোনো অনুরাগ প্রকাশ করেছে? তবুও তিনি ধ্রুবপুত্রকে এই নগরে পা রাখতে দেবেন না। অবন্তী দেশ চিরকালের মতো ত্যাগ করেছে তাকে। অবন্তীতে ফিরলেই তার স্থান হবে অন্ধকূপে। প্রয়োজনে তার দক্ষিণ হস্ত ছিন্ন করে দেওয়া হবে। হিংসায় তাঁর দুই চোখ আরো রক্তবর্ণ হয়ে উঠল। তাকে আশ্রয় দিয়েছিলেন তিনি। তার শিক্ষার ব্যবস্থা করেছিলেন। অথচ সে-ই কি না তাঁর সবচেয়ে দুর্বল জায়গায় আঁচড় কেটে দিল।

ধ্রুবপুত্র তো অনাচারী, গণিকায় আসক্ত, তার কাছে কেন কন্যা সম্প্রদান করবে?

শিবনাথ বলল, ভুল করছে সে, প্রভু গন্ধবতীকে  উদ্ধবের হাত থেকে রক্ষা করুন, মদিরা পান করে সেই গৃহস্থের আঙিনায় ঢুকে যুবতী কন্যাকে আকর্ষণ করতে চায়, অবন্তী দেশে এ ঘটনা কখনো ঘটেনা, ঘটেনি আগে।

নরম হলেন বোধহয় সুভগ দত্ত। আবার বিষণ্ণ হলেন। উদ্ধব যদি ও ঘটনা ঘটিয়ে থাকে তবে তো অন্যায় নিশ্চয়। রাজকর্মচারীই যদি দুর্বৃত্ত হয়ে ওঠে, তবে মানুষ কার কাছে গিয়ে প্রতিবিধান চাইবে? রাজশক্তির বিরুদ্ধে সাধারণ নাগরিক কীভাবে দাঁড়াবে? রাজা যদি দুর্বল হন, এমন ঘটে থাকে। মন্দিরে ধর্ষিতা হয় দেবদাসী, গৃহস্থের আঙিনায় প্রবেশ করে দুর্বৃত্ত। দুর্বৃত্ত তো নিশ্চয়, না হলে গণিকা দেবদত্তার অলঙ্কার আত্মসাৎ করে সে কিনা আর একজনকে উপঢৌকন দেয়? সে ওই অলঙ্কার গ্রহণ করার সময় কি খোঁজ নেয়নি কে দিয়েছিল তা গণিকাকে? নিশ্চয়ই জেনেছে সে। ভাবতেই পারেনি অলঙ্কার নিয়ে এই মানুষটি চলে আসবে শ্রেষ্ঠীর কাছে প্রতিবিধান চাইতে।

প্রভু সুভগ দত্ত। ডেকে উঠল শিবনাথ।

সুভগ দত্ত বললেন, ধ্রুবপুত্র তোমার পৌত্রীকে গ্রহণ করবে?

করবে প্রভু। 

তাহলে সে কেন গণিকায় মজেছিল? 

গ্রহের ফের, সে নেই বলেই এই সমস্ত ঘটনা ঘটছে।

হয়ত! অস্ফুট উচ্চারণ করলেন শ্ৰেষ্ঠী। ধ্রুবপুত্র যদি থাকত এবং গণিকায় মুগ্ধ না হতো তাহলে উদ্ধব নিশ্চয় এমন সাহসী হয়ে উঠতে পারত না। ক্রুদ্ধ হয়ে উঠলেন সুভগ দত্ত। উদ্ধব কিনা গণিকা  দেবদত্তার সঙ্গে সম্পর্ক রাখে! এত সাহস তার! সব বদলে যাচ্ছে। প্রকৃতি, মানুষ সব। উদ্ধব ছিল  তাঁর কৃপাপ্রার্থী। উদ্ধব এখনো তাঁর কৃপা প্রার্থনা করে। ওসব তাহলে ছল। খুব চাতুরী শিখেছে রাজসভায় ঢুকে। অথচ এই উদ্ধবই না খবর দিয়েছিল দেবদত্তা আর ধ্রুবপুত্র প্রেমে মজেছে। অর্গল রুদ্ধ করে বসে থাকে। ধ্রুবপুত্রকে সামনে বসিয়ে রেখে বীণায় নতুন সুর তোলে রসমঞ্জরীর কন্যা। নৃত্যের নতুন মুদ্রা সৃষ্টি করছে সে ধ্রুবপুত্রের জন্য। শৃঙ্গার কাব্য পাঠ হয় দু’জনে। তরুণ ধ্রুবপত্রকে নিয়ে শৃঙ্গারে মেতেছে গণিকা । ধ্রুবপুত্রকে সে শেখাচ্ছে কামকলা, শৃঙ্গারের রীতি, কৌশল। শুনে অগ্নিগর্ভ হয়ে উঠেছিলেন সুভগ দত্ত। ধ্রুবপুত্রকে জিজ্ঞাসা করায় সে তার মুগ্ধতা প্রকাশ করেছিল। প্রেম বিহ্বলতা জানিয়েছিল পিতৃসখাকে। 

এখন মনে হচ্ছে দেবদত্তা চায় নতুন পৌরুষ। অনাঘ্রাত পুরুষ ধ্রুবপুত্রকে সে মোহমুগ্ধ করেছিল, এখন করেছে সামান্য রাজকর্মচারী উদ্ধবনারায়ণকে। শরীর আর মন যখন চায়, প্রভু ভৃত্যে ভেদ থাকে না।

প্রভু আমি কী করব?

ফিরে নাও।

উদ্ধবনারায়ণ?

আমি দেখছি। বিষণ্ণ সুভগ দত্ত মাথা নামালেন।

শিবনাথ চলে গেল। শ্রেষ্ঠী এবার একা হলেন। মেঝেয় পড়ে আছে মহালতা, চন্দ্রহার, বাজুবন্ধ, স্বর্ণতিলক। এই অলঙ্কারে সেজে কী সুন্দর হয়েছিল দেবদত্তা। স্বর্ণকারকে নির্দেশ দিয়ে গড়ানো হয়েছিল প্রতিটি । শ্রেষ্ঠী গবাক্ষপথে আকাশ দেখছেন। আকাশ রোদ ঝাঁ ঝাঁ হয়ে কেমন বক্রভাব ধারণ করেছে। বহু উঁচুতে গৃধিনীর যূথ চক্রাকারে উড়ছে। সুভগ দত্ত সরে এলেন। আচমকা হেঁকে উঠলেন, উতঙ্ক, উতঙ্ক হে।  

শ্রেষ্ঠীর কণ্ঠস্বর ঘর থেকে অলিন্দে পৌঁছল। অলিন্দ থেকে সেই ডাক বয়ে নিয়ে চলল ত্রস্ত পায়ের দাসী। উতঙ্ক, উতঙ্ক হে, বাপ উতঙ্ক, প্রভু ডাকেন তোমাকে। ডাক শুনে প্রাঙ্গণ থেকে উতঙ্ক দ্রুত পায়ে হেঁটে আসে। প্রভুর ডাকে কীভাব জড়িয়ে আছে তা দাসীর কণ্ঠস্বরেই টের পাওয়া যায়। উদ্বিগ্ন উতঙ্ক ছুটে যায় অলিন্দ বেয়ে। অলিন্দে তখন চলে ফিসফাস, প্রভু ক্রুদ্ধ হয়েছেন, ওই যে প্রভুর ডাক শোনা যায় আবার, গর্জন করছেন শ্রেষ্ঠী, উতঙ্ক আয়, মাগীটাকে আজ দেখে নেব, রাজা বাঁচাবে না ওকে, আয় উতঙ্ক।

চলবে

 

ধ্রুবপুত্র (পর্ব এক)
ধ্রুবপুত্র (পর্ব দুই)
ধ্রুবপুত্র (পর্ব তিন)
ধ্রুবপুত্র (পর্ব চার)
ধ্রুবপুত্র (পর্ব পাঁচ)
ধ্রুবপুত্র (পর্ব ছয়)
ধ্রুবপুত্র (পর্ব সাত)
ধ্রুবপুত্র (পর্ব আট)
ধ্রুবপুত্র (পর্ব নয়)
ধ্রুবপুত্র (পর্ব দশ)
ধ্রুবপুত্র (পর্ব এগার)
ধ্রুবপুত্র (পর্ব বারো)
ধ্রুবপুত্র (পর্ব তের)
ধ্রুবপুত্র (পর্ব চৌদ্দ)
ধ্রুবপুত্র (পর্ব পনের)
ধ্রুবপুত্র (পর্ব ষোল)
ধ্রুবপুত্র (পর্ব সতের)
ধ্রুবপুত্র (পর্ব আঠারো)
ধ্রুবপুত্র (পর্ব উনিশ)
ধ্রুবপুত্র (পর্ব কুড়ি)
ধ্রুবপুত্র (পর্ব একুশ)
ধ্রুবপুত্র (পর্ব বাইশ)
ধ্রুবপুত্র (পর্ব তেইশ)
ধ্রুবপুত্র (পর্ব চব্বিশ)
ধ্রুবপুত্র (পর্ব পঁচিশ)

 

এই লেখকের অন্যান্য লেখা



আপনার মূল্যবান মতামত দিন:


Top