সিডনী মঙ্গলবার, ১৩ই এপ্রিল ২০২১, ৩০শে চৈত্র ১৪২৭

ধ্রুবপুত্র (পর্ব ত্রিশ) : অমর মিত্র


প্রকাশিত:
৪ মার্চ ২০২১ ১২:৩৫

আপডেট:
১৩ এপ্রিল ২০২১ ০৭:৪৪

ছবিঃ অমর মিত্র

 

গম্ভীরায় প্রবেশ করে তাম্রধ্বজ বলল, আমি নদী থেকে ঘুরে আসি, আপনি এক গৃহে ফিরুন, যা জেনেছি তা আমি বলব না গন্ধবতী বা রেবা মাকে, ওঁরা কষ্ট পাবেন।

শিবনাথ মুগ্ধ হলো। যুবকটি বড় বিবেচক। সত্যিই তো, ওরা যদি জানতে পারে শিবনাথকে শ্রেষ্ঠীর দাসের সমুখে  হাঁটু মুড়ে বসে প্রভু সম্বোধন করতে হয়েছে, নিঃশব্দ কান্নায় ভেসে যাবে রাত্রি। ওরা যদি টের পায় উদ্ধবের অনাচারের কথা জেনেছে তাম্রধ্বজ, তাতেও দুঃখ পাবে। নিজেদের অপমানের কথা কে জানাতে চায় কাকে? বলার পর কীভাবে নিষেধ করবে তাম্রধ্বজকে তা ভেবে উঠতে পারছিল না শিবনাথ। মনে হচ্ছিল কথাগুলো না বললেই হতো। কিন্তু না বলেই বা সে পারে কী করে? নিজের কথা কাউকে না কাউকে তো বলতে হয়। অসহায় মানুষ কারোর না কারোর সাহায্য তো নেয়ই। তাম্রধ্বজের সাহায্য দরকার এখন। 

তাম্রধ্বজের সাহায্য প্রয়োজন, কেন না সে যুবক। বয়সই তার শক্তি। তাম্রধ্বজ জ্ঞানী। জ্ঞানই তার শৌর্য। উদ্ধবনারায়ণও যুবক, কিন্তু জ্ঞানী নয়। উদ্ধবনারায়ণ রাজকর্মচারী। তার শক্তি হলো রাজার শক্তি। রাজ-শক্তির বিরুদ্ধে দাঁড়াতে পারে জ্ঞানীরাই। একথা বলত ধ্রুবপুত্র।

তাম্রধ্বজ একা গেল নদীর দিকে। এই গ্রামে সে যতবার এসেছে, নদীটিকে দেখে গেছে। নদী হলো মায়ের মতো, তেমনই মনে হয় তাম্রধ্বজের। তার মা বেঁচে নেই। অনেকদিন আগে বেত্রবতীর ধারের শ্মশানে দাহনের পর জলে দেহভস্ম ভাসিয়ে দেওয়ার সময়, মনে হয়েছিল সমস্ত নদীর জলই যেন মায়ের চোখ। চেয়ে আছে মা। শিপ্রা, গন্ধবতী, রেবা, বেত্রবতী আর গম্ভীরা বা বিদিশার সন্নিকটে নীচৈঃ পাহাড়ের কাছ দিয়ে বয়ে যাওয়া বননদীটি—সর্বত্র যেন সে তার মায়ের সজল চোখ দুটি দ্যাখে। দুটি চোখ মিলেমিশে নদীর মতো ব্যাপ্ত হয়ে গেছে বোধহয়।

তাম্রধ্বজ ভেবে রেখেছিল আর আসবে না গম্ভীরায়। সেই মাঘের সন্ধ্যার কথা মনে পড়ে, শীতের বাতাসে উথলে ওঠা দুধের গন্ধ ভাসছে আঙিনায়, গন্ধবতীর মুখখানিতে ধ্রুবনক্ষত্রের আলো, সে তাকে শুনিয়েছিল আকাশে যত মেঘ আসে সব মেঘের পরিচয়। সব মিলেমিশে যে কী হয়ে গিয়েছিল! গণনা তার শেষ হয়নি। গণনা শেষ হবে কী করে, যাঁকে নির্ভর করে সে কথা দিয়েছিল সেই আচার্য বৃষভানুই তো কেমন জবুথুবু হয়ে যাচ্ছেন। গতরাতে আকাশে তাকিয়ে ঘুমিয়ে পড়েছিলেন সন্ধ্যাবেলাতে। যারা নিরুদ্দিষ্ট, তারা যদি বেঁচে থাকে, জীবনের টানেই ফিরে আসবে প্রিয়জনের কাছে। এই সত্য তাম্রধ্বজ জানে। অগস্ত্য নক্ষত্র যেমন ফেরে ফাল্গুনের আকাশে তেমনি ফিরবে। আগস্ত্য নক্ষত্র যেমন জ্যৈষ্ঠে আকাশ থেকে অন্তর্হিত হয়, তেমনি হয়ত অদৃশ্য হয়ে আছে ধ্রুপুত্র।

গম্ভীরার তীরের শরবন এখন প্রায় নিশ্চিহ্ন। আকাশ খা খা করছে। কত পাখি না ওড়ে আকাশে, একটিও নেই। বহু উঁচুতে চক্রাকারে ঘুরছে গৃধিনীর দল। ওই যে জল জল করে আকাশ ভেদ করে গেল চাতক। কোথায় চকোর, চকোরী? তাম্রধ্বজ পাখি খুঁজে বেড়াচ্ছিল আকাশে। পাখি আর মেঘ। মেঘও তো পাখি, তবে ও পাখির ডানা নেই। ডানা নেই তবু উড়ে যায়। তাম্ৰধ্বজ দেখছিল নদীর বুক শুকনো। বালি উড়ছে হু হু বাতাসে। নদীর এই ধারে তিরতিরে স্রোত। কতটুকু আর জল! সে তাকিয়েছিল নদীর বুকে। মায়ের চোখটি এখানেও ঘুমিয়ে আছে। তাম্ৰধ্বজের নিজের চোখ ছলছল করে ওঠে।

বেলা পড়ে এল। তাম্ৰধ্বজ ফিরবে এবার গন্ধবতীর আঙিনায়। কেন যে ঘুরে ঘুরে গন্ধবতীর নামটি মনের ভিতরে উচ্চারিত হচ্ছে! তাম্ৰধ্বজ ধীরে ধীরে ফিরছিল। নদীতীরে, পথের উপরে যখন সন্ধ্যা নেমে আসে হৃদয় দিশাহারা হয়। তা সে নদী বেত্রবতী হোক, শিপ্রা বা গম্ভীরা হোক। আচার্য বলেন, উত্তর ভূম্যর্ধ হোক আর দক্ষিণ ভূম্যর্ধ হোক, সূর্য অস্ত গেলে দিন প্রবেশ করে রাত্রির ভিতরে। আর সূর্যোদয় হলে রাত্রি জলমধ্যে আবিষ্ট হয়। রাত্রি জলের ভিতরে ডুবে যায় বলে দিনমানে জল রাত্রির বর্ণ ধারণ করে, তাম্রভাব থাকে তাতে, অথবা নীলবরণ। আর রাত্রিমধ্যে দিন প্রবেশ করে বলে রাত্রিকালে জল শাদা ভাস্বরাকারে দেখায়। আচার্য কি জানেন যদি পৃথিবী জলশূন্য হয়ে যায় তবে দিনমানে রাত্রি কোথায় যায়? আর রাত্রিকালেই বা দিন যায় কোথায়?

তাম্ৰধ্বজের জন্যই যেন অপেক্ষা করছিল মা-মেয়ে। শিবনাথ বিশ্রাম নিচ্ছে দাওয়ায়। সমস্তদিন হেঁটে এখন শরীর ছেড়ে দিয়েছে। ক্লান্তিতে দু’চোখ বুজে এসেছে গন্ধবতীর পিতামহর। মা-মেয়ে জানত না তাম্ৰধ্বজ এসেছে গম্ভীরায়। শিবনাথ কিছুই বলেনি তাদের। তবু তারা যেন তাম্ৰধ্বজের জন্যই অপেক্ষা করছিল। আজ যেন তার আসার কথা।

রেবা বলল, এস, কষ্ট হলো খুব।
না মা, এই তো পথ, কতটা আর।

রেবা অবাক হয়ে গোধূলি আলোয় দাঁড়ানো মধ্যম উচ্চতার যুবকটিকে দেখছে। দেখে তো মনেই  হয় দশার্ণ দেশীয় এই যুবকটিকে পৌরুষ ঘিরে আছে । আজ এর কথাই মনে পড়ছিল সমস্তদিন। বিপদের দিনে যার কথা মনে পড়ে, তাকেই যেন নির্ভর করে মানুষ। রেবা দেখল গন্ধবতী জলচৌকি এনে দিল। ঘটিভরা জল দিল। এই জল গম্ভীরার বালি খুঁড়ে আনা। তাম্ৰধ্বজ বসল। জলের ঘটি তুলে এক ঢোক জল খেয়ে বলল, অনেকদিন তো আসিনি, আজ হঠাৎ মনে পড়ল।

আমরাও তোমার কথা ভাবছিলাম। রেবা বলল।

গন্ধবতী নিশ্চুপ। সে তার জিজ্ঞাসাগুলি মনের ভিতরে সাজিয়ে নিচ্ছিল। আজই জেনে নিতে হবে ধ্রুবপুত্রর খবর দিতে পারবে কিনা তাম্রধ্বজ। না হলে অন্য কোথাও যেতে হবে। কোথায় এক নেড়ি সন্ন্যাসিনী, যোগিনী এসেছে নাকি, ভূত ভবিষ্যৎ সব তার কাছে জলের মতো--সেখানে যেতে হবে  মাকে নিয়ে।

গন্ধবতী বলল, আপনার কাজটা কি আপনি ভুলে গেলেন?

না। স্মিত হাসল তাম্রধ্বজ। পরিপূর্ণ চোখে তাকায় গন্ধবতীর দিকে। মাথার চুল চুড়ো করে বাঁধা। সেই চুড়ো ঘিরে বনফুলের মালা। গন্ধবতীর গলায়ও সেই মালা। এর আগে কখনো ফুল-অলঙ্কার দ্যাখেনি  তাম্ৰধ্বজ গন্ধবতীর গায়ে। গতকাল এইসময় এসেছিল সেই দুর্বৃত্ত। আজ কার জন্য সেজেছে ধ্রুবপুত্রের অনুরাগিণী?

গন্ধবতী বলল, আপনি যে আসবেন তা জানতাম।
কে বলেছিল?
কেউ না।
তবে কী করে বুঝলে, তুমি কি গণনা জানো?
গন্ধবতী বলল, ধ্রুবপুত্র যে ঘর ছেড়ে চলে যাবে তাও আমি জানতাম। 
সে কি বলেছিল?
না তার দুয়ার তো বন্ধ ছিল সমস্ত দিন, কামদেবের মন্দির থেকে ফিরলাম সে দুয়ার খোলেনি, আপনি জানেন না সেদিনের কথা?
আগের দিন কথা তো অসম্পূর্ণ ছিল।

হ্যাঁ তাই। গন্ধবতী অস্ফূট স্বরে বলল। তার মা এখন কাছে নেই। ওই যে বসে আছে দাওয়ার অন্য ধারে। প্রদীপ জ্বালছে চকমকি ঠুকে। গন্ধবতী যেন নিশ্চিন্ত হলো। কেন কে জানে? ধ্রুবপুত্রের অন্তর্ধানের কথা বলবে তাই? সে কথা তো মাও জানে। জানে কিন্তু ব্যাখ্যা করতে পারে না কেন চলে গেল ধ্ৰুবপুত্র পূর্ব দিগন্তের দিকে? এখনো তার চোখের সামনে দৃশ্যটি ভাসে। হেঁটে যাচ্ছে ধ্রুবপুত্র জ্যোৎস্নাময় নদীতীর  ধরে। গন্ধবতী অবাক হয়ে তাকিয়েছিল তার গমনপথে। যেন সে অন্য কাউকে দেখেছিল। অচেনা কেউ। অবন্তী দেশ ছেড়ে চলে যাচ্ছে আরো অচেনা কোনোখানে।

তাম্ৰধ্বজ বলল, ধ্রুবপুত্রের সব খবর যদি না জানি, কী করে গণনা সম্পূর্ণ করব?
গন্ধবতী বলল, সে কথা বলা যাবে, তার আগে পূর্বদিনের কথা শেষ হোক।
কোন কথা অসম্পূর্ণ ছিল?
মেঘের পরিচয়।
কোন পর্যন্ত বলেছিলাম?
হেমকূট পর্বত যেন কোথায়? গন্ধবতী জিজ্ঞেস করে।
তুমি মনে করো।
গন্ধবতী বলল, হিমালয়ের উত্তরে, সুমেরুর দক্ষিণে...।
তাম্ৰধ্বজ বলল, শীত ঋতুর বৃষ্টির কথা বলেছিলাম, শোনো গন্ধবতী মেঘের যে পরিচয় পেয়েছি। তাইই সত্য, আমি এবার বৃষ্টির কথা বলি। দেশ অগ্নিময় হয়ে উঠেছে, কোথাও জলের চিহ্ন নেই প্রায়, এখন বৃষ্টির কথা না জানলে জীবন আরো শুকিয়ে যাবে।

গন্ধবতী অবাক হয়ে তাম্ৰধ্বজের মুখের দিকে চেয়ে আছে। চোখ দুটিতে আকাশের অচেনা দুই তারা। দূরে প্রদীপ জ্বালিয়ে মা রেবা বসে আছে। রেবা শুনছে তাম্ৰধ্বজ আর গন্ধবতীর কথোপকথন। তাম্ৰধ্বজ বলছে, সূর্যই প্রকৃতপক্ষে বৃষ্টির স্রষ্টা, সূর্য থেকেই বর্ষণ, আর বাতাসে সেই বর্ষণের বিরতি। সূর্যের তাপ সমুদ্র, নদী, সরোবর থেকে জল আকর্ষণ করে। জল তখন ধোঁয়া হয়ে আকাশে ওঠে। তাতেই মেঘের উৎপত্তি।

গন্ধবতী বলল, জানি, কে না জানে।
মেঘের জল জগতের মঙ্গলের জন্য আকাশ থেকে নীচে নেমে আসে।
জানি, আপনি সূর্যের কথা বলুন, অগ্নির কথা।
মেঘের জন্য জল শোষণ করে অগ্নিই তো বৃষ্টির সূচনা করেন।
জানি, অগ্নির পরিচয় কী? গন্ধবতী জিজ্ঞেস করে।

তখন তাম্ৰধ্বজ অন্ধকারে তাকিয়ে থাকল। অনেকক্ষণ চুপচাপ। তারপর এক সময় তাম্ৰধ্বজ বলতে থাকে সেই মহারাত্রির কথা। গভীর অন্ধকারে সর্বলোক তখন আচ্ছন্ন। সৃষ্টিকাল আরম্ভই হয়নি যে সময়, তখনই অগ্নির আত্মপ্রকাশ। আলো হয়ে এল আগুন। সেই অগ্নি পার্থিব অগ্নি। যে আগুন সূর্যে আছে, সূর্যের তাপ যে আগুনের দ্বারা সৃষ্টি হয়, সেই আগুন শুচি অগ্নি। এই অগ্নিই বৈদ্যুৎঅগ্নি। অগ্নি সবসময় জলগর্ভ। যে আগুনে অবন্তী দেশ পুড়ছে, সেই আগুনও জলগর্ভ।

গন্ধবতী বলল, জলগর্ভই যদি হবে আগুনে এত কষ্ট কেন, জল তো শীতল।
তাম্রধ্বজ বলল, তাহলে শোনো অগ্নির আসল রূপ কী, অগ্নি সহস্রপাদ, কুম্ভের মতো, বৃত্তাকার। অগ্নির শতসহস্র রশ্মি। সেই রশ্মি দিয়ে চারদিক থেকে, সমুদ্র, নদী সরোবার, কূপ, গাছ-গাছালি, প্রাণ সমস্ত কিছু থেকেই জল শুষে নেয়, যত জল গ্রহণ করে অগ্নি, তার শত শত গুণ গ্রহণের ক্ষমতা ধারণ করে  সে--জলগর্ভ  কেন বুঝলে?

রেবা অবাক। এ কার কথা শুনছে? গন্ধবতী কার সঙ্গে আলাপে বসেছে? এমন দৃশ্য তো তার চেনা। খুব চেনা। রেবা অন্ধকারে তাকিয়ে নিজের বিভ্ৰম-দূর করতে চায়। এসে গেছে নাকি ধ্রুবপুত্র?  ধ্রুবপুত্রের সঙ্গে গন্ধবতীর এই আলাপ কত কালের! কত জন্মেরও বা। হায় ধ্রুবপুত্র। সবই ভুলে গেলি তুই!

গন্ধবতী বলল, তারপর? কথা তো শেষ হয়নি।
তাম্ৰধ্বজ বলল, সূর্য হিরন্ময়। সূর্যের জন্যই জগতের যত উষ্ণতা, যত শৈত্য, যত বর্ষণ। সূর্য তার কিরণ দিয়ে পৃথিবীকে তাপিত করে, শীতার্ত করে, বর্ষণে প্লাবিত করে। সূর্যকিরণের সংখ্যা সহস্র, অগ্নি তাই সহপাদ।
গন্ধবতী মুগ্ধ হয়ে চেয়ে আছে তাম্রধ্বজের দিকে। তার দৃষ্টি শূন্য হয়ে গেছে। সে যেন অনুভব করছে এই পৃথিবীতে কোনো কিছু ফুরানোর নয়। এমনই কথা তো শোনা যেত ধ্রুবপুত্রের মুখে। কী আশ্চর্য, এসব কথা ধ্রুবপুত্রই তো জানে। এই মানুষটা জানল কীভাবে?
তাম্ৰধ্বজ বলল, শোনো গন্ধবতী, কথা এখনো শেষ হয়নি।
গন্ধবতী মনে মনে বলল, কথা শেষ হওয়ার কথা নয় সখা।

তাম্রধ্বজ বলল, সূর্য, অগ্নি, মেঘ, জল, এই ভুমণ্ডলের মতোই ব্যাপ্ত, এদের সম্বন্ধে একদিনে, দুইদিনে সব জানা যায় না, সমস্ত জীবন ধরে সূর্য, অগ্নি এবং মেঘের কথা বললেও তা অসম্পূর্ণ থেকে যাবে, তবু বলি, সূর্যের সহস্রকিরণের মধ্যে হিমবর্ষী কিরণ তিনশ, এই কিরণগুলি পীতাভ, এদের প্রসিদ্ধি মেধা, বাহ্য, হ্লাদন, চন্দ্র এইসব নামে। আবার শুক্ল বর্ণের যে তিনশ কিরণ বর্ষণ করেন সূর্য তা থেকেই উত্তপ্ত হয় জগৎ। উষ্ণতা সঞ্চারী এইসব কিরণ বিশ্বভূত, ককুভ, শুক্ল--ইত্যাদি নামে খ্যাত। শুক্লবর্ণের এই কিরণ দিয়ে সূর্য পিতৃলোক, দেবলোক এবং মনুষ্যলোককে লালন করেন। সূর্যকিরণ পিতৃলোকে  জল বর্ষণে তাঁদের তৃষ্ণা নিবারণ করে যেমন, দেবলোকে অমৃত দান করে, আর মনুষ্যলোকে ওষধি, এইভাবে তাপিত হয় সর্বলোক।

গন্ধবতী মনে মনে বলল, এত জান সখা তুমি, তোমার কথাও তো ফুরোবে না সমস্ত জীবনে, যেমন ফুরোয় না মেঘ আর অগ্নি আর সূর্যের পরিচয়।
তাম্ৰধ্বজ বলল, আরো আছে গন্ধবতী, এবার বলি বর্ষার কথা, চারশ বিচিত্র বর্ণের কিরণ দিয়ে সূর্য পৃথিবীকে প্লাবিত করেন বর্ষণে। বর্ষণকারী সেই সমস্ত সূর্যকিরণের নাম বন্দন, বন্দ্য, ঋতশ, নূতন, অমৃত এইসব।
গন্ধবতী বলল, সেইসব কিরণ কোথায় বন্দন, ঋতশ...?
তা যদি জানা যেত অবন্তী, দশার্ণ, দেশ কি তাপিতই হতো শুধু, সূর্য বসন্ত ও গ্রীষ্মকালে তিনশ কিরণে উত্তাপ বর্ষণ করেন, বর্ষা ও শরতে চারশ কিরণে জল দেন, হেমন্ত ও শিশিরকালে তিনশ কিরণে হিমবর্ষণ করেন।
গন্ধবতী বলল, আপনাকে কি দুধ দেব, আপনি ক্ষুধার্ত নন?
না তুমি স্থির হও।
গন্ধবতী মাথা নিচু করে বসে আছে। গতকাল সন্ধ্যায়, এই সময়ে দুর্বৃত্ত উদ্ধব এই আঙিনায় দাপিয়ে বেড়াচ্ছিল। ভয়ে মা ও মেয়ে কুঁকড়ে গিয়েছিল। পিতামহ-ই বা কেমন হয়ে গিয়েছিল। অথচ আজ কি না তাঁরা অনুমান করলেও আসেনি সেই দুর্বৃত্ত। বদলে এসেছে যে সে যেন এই খরার দিনে মেঘের মতো। কী শীতল, মোহময় তাম্রধ্বজের উপস্থিতি! গন্ধবতী ফিসফিস করল তুমি যেন ঠিক সেই ধ্রুবসখার মতো।
কানে গেল কি তাম্রধ্বজের? সে বলল, তুমি এবার ধ্রুবপুত্রের অন্তর্ধানের কথাটি বলো।
গন্ধবতী ফিসফিস করল, কী আর বলি, কতবার আর বলি, আমি আর পারিনা বলতে, তুমি সখা শুনে নিও মায়ের কাছে।

তাম্রধ্বজ স্থির চোখে গন্ধবতীকে দেখছিল। তখন দীপ হাতে এগিয়ে এল রেবা। দীপদান সমেত দীপটি রাখল গন্ধবতী আর তাম্রধ্বজের মধ্যে। গন্ধবতী উঠে দাঁড়াল, বলল, মা তুমি এঁকে সেই চৈত্র পূর্ণিমার কথা বলো।
মা বলল, তুই না বললে কথা সম্পূর্ণ হবে না।
গন্ধবতীর সমস্ত শরীরে ছেয়ে আসছে আশ্চর্য এক অনুরণন। তাম্রধ্বজ না এ অন্য কেউ? সে কেঁপে উঠল। মনে মনে উচ্চারণ করল, হায় ধ্রুবপুত্র তুমি এ কোন বেশে এলে? গন্ধবতী তাম্রধ্বজের ভিতরে ধ্রুবপুত্রকে দেখতে পেল। নিরুদ্দিষ্ট ধ্রবপুত্রকে তাহলে ফিরিয়ে আনল দশার্ণ দেশের জ্যোতিবিদ?
গন্ধবতী ফিসফিস করল, ধ্রুবপুত্র!
তাম্রধ্বজ আকাশে তাকিয়ে আছে। দু’টি চোখে তারার আলো প্রতিবিম্বিত। তাম্রধ্বজকে স্পর্শ করল গন্ধবতী। তাম্রধ্বজ মাথা নামায়। ঘুরে তাকায়। দু’জনে পরস্পরকে চিনে নিচ্ছে, যেন অভিশপ্ত হয়েছিল  তারা এতদিনে। পরস্পরকে বিস্মৃত হয়েছিল বহুযুগ।
তাম্রধ্বজ জিজ্ঞেস করল, বর্ষার কথা মনে পড়ে?
পড়ে।
মেঘের কথা?
হ্যাঁ।
কদম্ববন?
হ্যাঁ।
গম্ভীরা নদী, বেতস বন?
হ্যাঁ সখা। গন্ধবতীর দু’চোখ দিয়ে জল ঝরে যাচ্ছে। অন্ধকারে নিঃশব্দ অশ্রুপাত দেখছে তাম্ৰধ্বজ।

চলবে

 

ধ্রুবপুত্র (পর্ব এক)
ধ্রুবপুত্র (পর্ব দুই)
ধ্রুবপুত্র (পর্ব তিন)
ধ্রুবপুত্র (পর্ব চার)
ধ্রুবপুত্র (পর্ব পাঁচ)
ধ্রুবপুত্র (পর্ব ছয়)
ধ্রুবপুত্র (পর্ব সাত)
ধ্রুবপুত্র (পর্ব আট)
ধ্রুবপুত্র (পর্ব নয়)
ধ্রুবপুত্র (পর্ব দশ)
ধ্রুবপুত্র (পর্ব এগার)
ধ্রুবপুত্র (পর্ব বারো)
ধ্রুবপুত্র (পর্ব তের)
ধ্রুবপুত্র (পর্ব চৌদ্দ)
ধ্রুবপুত্র (পর্ব পনের)
ধ্রুবপুত্র (পর্ব ষোল)
ধ্রুবপুত্র (পর্ব সতের)
ধ্রুবপুত্র (পর্ব আঠারো)
ধ্রুবপুত্র (পর্ব উনিশ)
ধ্রুবপুত্র (পর্ব কুড়ি)
ধ্রুবপুত্র (পর্ব একুশ)
ধ্রুবপুত্র (পর্ব বাইশ)
ধ্রুবপুত্র (পর্ব তেইশ)
ধ্রুবপুত্র (পর্ব চব্বিশ)
ধ্রুবপুত্র (পর্ব পঁচিশ)
ধ্রুবপুত্র (পর্ব ছাব্বিশ)
ধ্রুবপুত্র (পর্ব সাতাশ)
ধ্রুবপুত্র (পর্ব আটাশ)

 

এই লেখকের অন্যান্য লেখা



আপনার মূল্যবান মতামত দিন:


Top