সিডনী রবিবার, ৯ই মে ২০২১, ২৫শে বৈশাখ ১৪২৮

সংসার : সায়মা আরজু


প্রকাশিত:
১২ এপ্রিল ২০২১ ১৩:১৭

আপডেট:
৯ মে ২০২১ ০৪:২১

 

কথাটা শুরু হয়েছিলো ডাল রান্না নিয়ে। কাইল্লা'র আজ বউয়ের রান্না স্বাদ লাগনি, তা কথাটা তার বউকে বললেই হত, হয়তো দু-একটা মুখ ঝামটা দিয়ে বিশ্ব'র মা একথা ভুলে গিয়ে আবার পরের বেলার রান্নার যোগাড় যন্ত্র করতো, কিন্তু না কাইল্লা ঠিক গিয়ে নালিশ করলো তার বড় ভাবি মিনতি'র মা'র কাছে।মিনতির মা আর বিশ্ব'র মা এক মায়ের পেটের দুই বোন,বিয়েও হয়েছে আবার দুই সহোদর, সনাতন আর কাইল্লা 'র সাথে। সনাতন লেইছ, ফিতে, চুড়ি, সস্তা ইমিটেশনের গহনা আশে পাশের গ্রামে ফেরী করে বেড়ায়। তাদের তিন ছেলে মেয়ে, মিনতি,বাসন্তী আর কোলেরটি ছেলে, লক্ষন। কোলের টির নাম বলতে সবসময়ই মিনতি'র মায়ের গলায় যেন আহ্লাদ গলে পড়ে। ওদিকে কাইল্লা'র দুই ছেলে কার্তিক আর বিশ্ব। কাইল্লা রিক্সা চালায়, সুযোগ পেলেই দেশী মদ গলায় ঢেলে বউকে ইচ্ছে মত পিটায়। তার কোন জন্মের কত রাগ যে বউ এর উপর তা কে জানে!

বাবা ঠাকুরদা'র থেকে পাওয়া একটুকরো জমিতে পাশাপাশি দু'খানা বেড়ার ঘর তাদের, একপাশে কলতলা, পায়খানা, আর সামনের সরকারি রাস্তার ধার ঘেঁষে তাদের সব্জির বাগান, বাগানের বাঁশের বেড়ার সাথে সারি সারি ঘুটে রোদে দেয়া থাকে সারা বছর।সরকারি রাস্তা তাদের বসত ভিটার উপর দিয়েই গেছে এজন্য রাস্তাটির উপরে অধিকারবোধও তাদের বেশী। যখনই প্রয়োজন পরে এটা ওটা শুকোতে দেয়া, বাচ্চাদের ডাঙ্গুলি খেলা, বউয়েরা - ঝিয়েরা উঁকুন বাছতে বাছতে গল্প করা, শীতকালে ছেলের স্নান  সবই চলে রাস্তার উপর।

মিনতির মা রোজ সন্ধ্যায় নিয়ম করে আরতি দেয়, আরাধ্য দেবীর কাছে তার প্রতিদিন ছোটখাটো অনেক বায়না থাকে,তবে মা সুখে রাখ, শান্তিতে রাখ, এ বায়না রোজকার। কিন্তু সুখ শান্তি কতটুকু আসন পেতেছে তাদের সংসারে সেটা বোঝা না গেলেও অভাব যে তাদের নিত্য সঙ্গী সেটা স্পষ্ট।অভাবের সাথে লতাপাতার মত জড়িয়ে অবশ্য কিছু বঞ্চনা আর ঈর্ষা বাস করে তাদের মনের ঘরে আর সেটা তাদের জীবন যাপন দু -একদিন খেয়াল করলেই বোঝা যায়। নেশায় চুড় হয়ে থাকা কাইল্লা প্রায়ই খিস্তি পারে পিসতুতো ভাই অতীশের উদ্দেশ্যে। তার দাবী পিসির ছেলে তার ঠাকুর্দার জমিতে জোর করে দোতালা বাড়ি বানিয়েছে। তাদের ঠাকুর্দার নয় ছেলেমেয়ের মধ্যে তাদের বাবা আর পিসিই বেঁচে ছিল বাকীরা সব ছোট বেলাতেই মারা যায়। ঠাকুর্দা নিজেই দুই সন্তানের মধ্যে ভিটে ভাগ করে রেজিষ্ট্রি করে দিয়ে গেছেন। সে যাই হোক, কাইল্লা মনে করে বাপের ধন বেটায় পাবে, এতে বেটির আবার ভাগ কিসের! রাত যত বাড়ে কাইল্লা'র খিস্তি খেউরও বাড়তে থাকে, বাড়তে থাকে অতীশের ঘরে চলতে থাকা হিন্দি ফিল্মের ভলিয়্যুম, তারপর একসময় কাইল্লা ক্লান্ত হয়ে ঘুমিয়ে পড়লে সমস্ত পাড়া জুড়ে নিস্তব্ধতা নেমে আসে।

অতীশের কাঠের দোতালা ঘর, টিনের ছাউনি,তার নিজের একটা রিক্সার গ্যারেজ আছে,বউ জেলা ফ্যামিলি প্লানিং অফিসের আয়া। তাদের একমাত্র মেয়ে কমলা ক্লাস এইটে পড়ে। এবাড়ির বাকী ছেলে মেয়েরা যেখানে কেউই ক্লাস ফাইভ ডিঙ্গাতে পরেনি সেখানে কমলা ক্লাস এইটে প্রোমোশন পেয়ে উঠেছে সেটা এক বিশাল ব্যাপার, এজন্য কমলার মায়ের ও বেশ বড় গলা। বাড়ির বাকী দুই বউ একপেঁচে শাড়ি পড়লেও কমলার মা কুঁচি দিয়ে ছাপার শাড়ি পড়ে, চুলে তেল দিয়ে আঁচড়ে পরিপাটি খোঁপা করে রাখে। তার হাতে শাখা পলার পাশে একজোড়া সোনার ঢালাই দেয়া ব্রঞ্জের চুড়ি শোভা পায়।তবে সে প্রায়ই আড়চোখে মিনতির মায়ের দিকে তাকিয়ে থাকে , মনে মনে বলে, এত সুন্দর ঢলোঢলো প্রতিমার মত মুখ, কোন পাপের প্রায়শ্চিত্ত করতে এই হাঘরে ওর বিয়ে হয়েছিল তা কেবল উপরওয়ালাই জানেন। তবে স্বভাবে একটু কুঁদুলে হলেও কমলার মায়ের মনটা ততটা কঠিন নয়। আবার নিজে আয় রোজগার করলেও বাড়ির অন্য বউদের থেকে তার ভাগ্যও খুব একটা এদিক ওদিক নয়, তারও মা বাবার দেয়া আসল নামটা কমলা'র মা নামের অন্তরালে ডুবে গেছে অনেক বছর!বাড়ির কোনা কাঞ্চিতে অযত্নে বেড়ে ওঠা বুনো লতাপাতার মতই তাদের জন্ম, বেড়ে ওঠা, একটা গোটা জীবন।

তা আজ সকালে কল তলায় বাসন মাজতে মাজতে মিনতির মা বিশ্ব'র মাকে বলল-

- আইজ নাকি ডাইল স্বাদ হয় নাই
- তোমারে কেডা কইলো
- বিশ্বর বাপ। ভাত নাকি খাইতে পারে নাই
- ভাত খাইতে পারে নাই কেডা কইছে, সইজনার ডাঁডা দিয়া পাতলা কইরা ডাইল রানছি,থানকুনি পাতার বড়া বানাইয়া দিছি। দেহ গিয়া ডাইল পাতিলের তলায় একটু পইরা রইছে। একপাতিল ডাইল গেল কই? স্বাদ হয় নাই!
- হইছে পুরুষ পোলায় খাইবেও বেশী আর কতাও কইবে বেশী
- অমন প্যাডে আগুন দেই। ঘরে বাজার নাই হেই খবর নাই - আইছে ডাইল স্বাদ হয় নাই
- থাউক রান্ধন খরাপ ভাল হইতেই পারে, এক হাতের রান্ধন কি রোজ সমান হয়
- সমান না হউক রান্ধন খারাপ হয় নাই, মিছা কথা কইছে, মিথ্যুক কোথাকার, অসুর একটা....

কমলার মা জানালায় দাঁড়িয়ে শুনছিল দুই জা এর কথোপকথন। একটু বাদেই দেখলো কাইল্লা বিড়ি ফুঁকতে ফুঁকতে ঘরে ঢুকছে, একটু অবাক হয়ে ভাবলো এসময়ে পুরুষ মানুষ বাসায় কেন, কেমন যেন একটা ঈর্ষার স্রোত বয়ে গেল তার মনে। গলা বাড়িয়ে বলল,

- কাইল্লা তোর বউয়ের গলাবাজি'র চোডে তো আর থাহা গেলনা রে।
- কেন কি হইছে
- এত দেমাগ, সকালেই কলতলায় বিচার বসাইছে
- কার বিচার
- তোর, তুই নাকি মিথ্যুক! অসুর!

কাইল্লা কথা আর বাড়তে দিলনা, হনহন করে কলতলার দিকে হেঁটে গেল। এমনিতেই মেজাজ খারাপ ছিল, দুই দিন ধরে কোন রোজগার নাই, সকালে বাজারের দিকে গিয়েছিল, খাসির মাথা দিয়ে মুগডাল খেতে ইচ্ছা করছিল খুউব। কসাইকে এত করে বলল কাল টাকা দিয়ে দেব দুটো মাথা দাও, দিলনা। বাকীতে আজকাল কেউ কিছু দিতে চায় না,একটু ভাল-মন্দ খাবে তার উপায় কই। কলতলাতেই আচ্ছামত লাথি ঘুঁষি মারতে লাগল বউয়ের গায়ে।ধোয়া হাড়ি, পাতিল,থালা মাটিতে গড়াগড়ি খেতে খেতে বউয়ের সাথে বিলাপে সামিল হল। মিনতির মা কয়েকবার ছাড়াতে গিয়ে ও পারলোনা। ঘড়ের দরজায় দাঁড়িয়ে ছিল মিনতি পাশেই লক্ষন মার্বেল খেলছিল, খেলা ছেড়ে বাচ্চাটা একদৌড়ে মিনতির কোলের মধ্যে ঢুকে ভয়ার্ত চোখে কলতলার দিকে চেয়ে রইল। মিনতির মায়ের গলা শোনা গেল," আর কত মাইর খাবি,কবে জানি কইলজা ফাইট্টা বুইনডা আমার মইরা যায়... ভগবান চোকখেও দেখেনা..."। কমলার মা ঝামেলা এড়িয়ে অফিসের পথ ধরে।

দুই দিন টানা হরতাল চলছে। রিক্সা ,ভ্যান রাস্তায় নামানো যাচ্ছেনা পিকেটারদের ভয়ে,এজন্য গ্যারেজেও কাজ নাই তেমন। ক্যাশে বসে ঝিমাচ্ছিলো অতীশ। নাহ্ এভাবে চলেনা! বেলা একটা। অতীশ ভাবলো, যাই গিয়া সিনেমা দেখি। ফেরার পথে বাসার সামনের রাস্তাতেই উৎসবের আমেজ টের পেল অতীশ। পাশের মুসলমান পাড়ার ও কয়েকটি বাচ্চাকে দেখতে পেল রাস্তায় তার ভাইপোদের সাথে ডাঙ্গুলী খেলতে। ঘরে বাইরে সকালের সেই ঘটনার রেশ মাত্র নেই, নিত্য নৈমাত্তিক অন্য সব ছোটখাট ব্যাপারের মত কখন তা সবাই ভুলে গিয়ে যে যার কাজে ডুব দিয়েছে! অতীশকে দেখে বিশ্ব দৌড়ে এসে খবর দিল, "জেঠা, দুইডা খাসি কচ্ছপ ধরছে বড় মায়! অনেক মাংস হইছে!" বিশ্ব'র সারা মুখে খুশির হাসি। অতিশের মনটাও চনমনে হয়ে ওঠে। এমনিতে সে কাইল্লাকে খুব একটা পাত্তা টাত্তা দেয় না কিন্তু আজ একটু আগ বাড়িয়ে ই কাইল্লাকে ডাক দিল,জিজ্ঞেস করল ঘড়ে মাল আছে নাকি কিছু? কাইল্লা তার ইঙ্গিত বুঝতে পারে বলে,"না, নাই।টাহা দাও লইয়া আই, ভাবি মাংস রানতাছে!" কাইল্লার চোখ লোভে চকচক করে।

কমলার মা ও আজ একটু আগে ভাগে বাসায় ফিরেছে। চৈত্র মাস, তীব্র গরম, অফিস থেকে হেঁটে বাসায় ফিরে গরমে হাসফাস করতে করতে ফ্যানের নীচে বসে, এক গ্লাস পানি খায়। এমন সময় মিনতির মা ঢাকা দেয়া একটা বাটি নিয়ে ঢোকে। কমলার মায়ের মুখে হাসি ফোটে। মিনতির মা'কে বসতে বলে দুটো ক্রীম বিস্কুট হাতে গুঁজে দেয়। মিনতির মা বিস্কুট দুটো আঁচলে বাধেঁ লক্ষনকে দেবে বলে, মুখে বলে," চান কইরা ভাত খামু দিদি, এহন বসমু না"। মিনতির মা চলে যেতেই অতীশ দোতালার কাঠের সিঁড়ি বেয়ে নেমে আসে, পিছনে কাইল্লা মাঝ সিঁড়িতে দাঁড়িয়ে থাকে। অতীশ কমলার মায়ের হাত থেকে বাটিটি একরকম ছিনিয়ে নিয়ে আঙ্গুল ঝোলে ডুবিয়ে দেয় তারপর সেটা চেটে মুখে চুকচুক আওয়াজ করে। অতীশের হাতটা ধরতে ধরতে কমলার মা আর্তনাদ করে, "কমলার জন্য একটু রাখ"।অতীশের কানে সে আর্তনাদ পৌঁছায় না,কমলার মাকে একটা ধাক্কা দিয়ে সরিয়ে দেয়। কমলার মা টাল সামলাতে পারে না, খুঁটিতে ধাক্কা খেয়ে পরে যেতে যেতে অতীশের জবা ফুলের মত লাল হয়ে থাকা চোখ দুটোর দিকে এক নজর তাকায়। "যাহ হাতটাতে লাগছে,ভাঙ্গছে নাকি, মাগো... ", নিজেকে সামলে উঠে হাতটাকে পানি দিয়ে ডলতে থাকে, চোখে অশ্রু জমে ঘৃনা, ব্যাথা আর অসহায় মাতৃত্বের।

সন্ধ্যা নামি নামি করছে, আর একটু পরেই পাশের বাড়িতে শীতলা দেবীর আরতি শুরু হবে। বাতাসে ধূপ ধুনোর ঘ্রান। কমলার মা বাগান থেকে কয়েকটা সাদা বেগুন তোলে রাতের রান্নার জন্য। বিশ্ব'র মা আসে ঘুঁটে নিতে, কমলার মায়ের সাথে হাসি বিনিময় হয়। কমলার মায়ের সকাল বেলার কথা মনে পড়ে, বিশ্বর মায়ের ঠোঁটের কোনে কালসিটে দাগটা তার চোখ এড়ায় না, নিজেকেই ধিক্কার দেয়, কি দরকার ছিল কাইল্লাকে বলার! হাতটা টনটন করে উঠে ব্যাথাটা জানান দেয়। কমলার মায়ের শঙ্কা হয়, তাহলে কি বিশ্বর মা'র অভিশাপ লাগল! মা রক্ষা কর, কমলার মা দ্রুত ঘরে ফেরে। সন্ধ্যা দিয়ে শীতলা দেবীর আরতিতে যেতে হবে। মনে মনে কাঁসি, ঢোল বাজে.... কমলার মায়ের মন ভক্তিভরে গেয়ে ওঠে...ওরে ডাক দে ডাক দে ডাক দে রে.....

 

এই লেখকের অন্যান্য লেখা



আপনার মূল্যবান মতামত দিন:


Top