সিডনী মঙ্গলবার, ৭ই ডিসেম্বর ২০২১, ২২শে অগ্রহায়ণ ১৪২৮

নেতা যে রাতে নিহত হলেন : ইমদাদুল হক মিলন


প্রকাশিত:
১২ মে ২০২১ ১৫:৩৯

আপডেট:
৩০ আগস্ট ২০২১ ১১:৩২

ছবিঃ ইমদাদুল হক মিলন

 

দুজন পুলিশের একজন বলল, আমার খুব সন্দেহ হচ্ছিল।

অপরজন সঙ্গে সঙ্গে বলল, আমারও স্যার। লোকটার চালচলন আচার আচরণ খুবই সন্দেহজনক। নেতার বাড়ির আশপাশে ঘুরঘুর করছিল।

নেতার কথা শুনে পুলিশ অফিসার বেশ ধাক্কা খেলেন। গা এলানো ভাব মুহূর্তে কেটে গেল তাঁর। চেয়ারে সোজা হয়ে বসলেন। টেবিলের ওপর, হাতের কাছে ছিল পুলিশি টুপি। টুপি নিয়ে যত্ন করে মাথায় পরলেন। যেন এইমাত্র দায়িত্বে বহাল হলেন। এতক্ষণ যেন ছুটি কাটাচ্ছিলেন।

হাতের সিগ্রেট অ্যাশট্রেতে গুঁজে দিয়ে তীক্ষè চোখ তুলে লোকটির দিকে তাকালেন অফিসার। আকাশি রঙের ঝুল পকেটঅলা শার্ট পরা। ডোরাকাটা লুঙি বেশ খানিকটা উঁচু করে পরেছে। যেন নিচু করে পরলে ধুলোময়লা লেগে যাবে। লোকটির খালি পা এবং মুখের রঙ প্রায় একই রকম। রোদে পোড়া, নিরেট কালো। মাথার ঘন কালো চুল কদমছাঁট দেওয়া। দাড়িগোঁফ দুয়েকদিন আগে কামিয়েছে। থানার ভেতরকার উজ্জ্বল আলোয় অফিসার দেখতে পেলেন, লোকটির গালের শক্ত চামড়া ভেদ করে ধারালো দাড়িগোঁফ মাথাচাড়া দিচ্ছে।


লোকটির ঠোঁট পুরু। নাক থ্যাবরা। পরিশ্রমী, পেশিবহুল শরীর। চোখ দুটি বেশ কৌতূহলী। বুকের কাছে জীর্ণ কাপড়ের একটি পুঁটলি শক্ত করে আঁকড়ে ধরে রেখেছে।
অফিসার গম্ভীর গলায় বললেন, নাম কী?

প্রশ্ন কাকে করা হয়েছে বুঝতে পারল না লোকটি। সঙ্গের পুলিশ দুজনের দিকে তাকাল।
একজন বলল, আমাদের না, তোমার নাম জানতে চেয়েছেন।

অপরজন বলল, আমাদের নাম স্যারে জানেন। তোমার নাম বলো।

লোকটি সামান্য গলা খাঁকারি দিল। তারপর অমায়িক মুখ করে বলল, আমার নাম সাহেব রতন। রতন মাঝি।

কী করো?

দুজন পুলিশের একজনের স্বভাব হচ্ছে কথা একটু বেশি বলা। আসলে অফিসারকে তোয়াজ করা। সে হাসি হাসি মুখ করে বলল, নামের শেষে যখন মাঝি আছে নিশ্চয় নৌকা বায় স্যার।

সঙ্গে সঙ্গে রতন নামের লোকটি হা হা করে উঠল। না না সাহেব, নৌকা বাই না। নৌকার মাঝি না আমি। আমার বাপ দাদায় আছিল মাঝি। সেই থেকে আমাদের পদবি হয়েছে মাঝি।

অফিসার আগের মতোই গম্ভীর গলায় বললেন, তাহলে কী করো তুমি?

রতন বলল, আমি সাহেব ভাগচাষি।

বেশি কথা বলা পুলিশটি বলল, চাষি বুঝি কিন্তু ভাগচাষি তো বুঝি না। ভাগচাষি জিনিসটা কী?

অফিসার এবার রেগে গেলেন। আঙুল তুলে বললেন, তুমি চুপ করো। আমি যতক্ষণ কথা বলব, আমার সামনে একটিও কথা বলবে না। একদম পাথরের মতো দাঁড়িয়ে থাকবে।

জি আচ্ছা স্যার।

আবার কথা! তোমাকে না বললাম একদম চুপ। একদম পাথর।
লোকটি যেন সত্যি সত্যি পাথর হয়ে গেল।

অফিসার আবার রতনের দিকে তাকালেন, বলো।

রতন বলল, কী বলব সাহেব?

কী করো তুমি?

ওই যে বললাম, ভাগচাষি। নিজের জমি নাই। পরের জমি আধাআধি ভাগে চাষ করি।
বাড়ি কোথায়?

তা অনেক দূর সাহেব। পদ্মার ওপার গিয়ে তিন-চার ঘণ্টা একটানা হাঁটতে হয়। গ্রামের নাম উদয়পুর।

এখানে এলে কী করে?

এখানে তো সাহেব আপনার লোকজন ধরে নিয়ে এল!

অফিসার বিরক্ত হলেন। তাঁর স্বভাব হচ্ছে একটু একটু করে অনেকক্ষণ ধরে রাগেন। তারপর একসময় ফেটে পড়েন। রাগের প্রাথমিক পর্যায় শুরু হয়ে গেছে। গম্ভীর গলায় বললেন, এখানে মানে আমি শহরের কথা বলেছি।

রতন সরল ভঙ্গিতে হাসল। শহরে সাহেব লঞ্চে করে এসেছি। পদ্মার পার থেকে সকালবেলা চড়েছি, শেষবিকালে শহরে এসে নামলাম। বাড়ি থেকে বেরিয়েছি কাল দুপুররাতে। ওই যে বললাম, তিন-চার ঘণ্টা হেঁটে নদীতীর, তবে লঞ্চঘাট।


তুমি কি কথা একটু বেশি বলো?

রতন খুবই লজ্জা পেল। জে-না সাহেব। আপনে জিজ্ঞেস করলেন তাই বললাম।

শহরে তুমি আগে কখনো এসেছ?

জে-না।

এই প্রথম?

জে।

কেন এসেছ?

বললে সাহেব আপনে অন্যকিছু ভাববেন না তো?

বলো, তবে সত্য কথা বলবে। মিথ্যে বললে কঠিন শাস্তি হবে।

আমি সাহেব নেতাকে দেখতে আসছি।

অফিসার চমকে উঠলেন। পাথর হয়ে থাকা সেই দুজন পুলিশ এই প্রথম মুখ ঘুরিয়ে দুজন দুজনার চোখের দিকে তাকাল। তারপর আগের ভঙ্গিতে ফিরে আবার পাথর হয়ে গেল।

অফিসার নড়েচড়ে উঠলেন। নেতাকে দেখতে এসেছ মানে কী? নেতাকে তুমি চেনো? নেতা তোমাকে চেনেন?

রতন অমায়িক মুখ করে বলল, নেতাকে কে না চেনে সাহেব! তারে চিনব না এ হয় নাকি? নেতাও তো দেশের সব মানুষকেই চেনেন। মুখখানা দেখলে আমাকেও চিনবেন। আমিও তো দেশের মানুষ!

তুমি যে নেতার বাড়ির পাশে ঘুরঘুর করছিলে, বাড়ি তুমি চিনলে কী করে?
লঞ্চ থেকে নেমে লোকজনকে জিজ্ঞেস করতে করতে চলে গেছি। ম্যালা রাত হয়ে গেছে। এত রাতে তো নেতাকে আর দেখতে পাব না। ভাবছিলাম তাঁর বাড়ির সামনের রাস্তায় বসে থাকব। দিনেরবেলা তিনি। যখন বেরোবেন দুচোখ ভরে তাঁকে একবার দেখব। পোঁটলাটা নামিয়ে রাখব তাঁর পায়ের কাছে।

অফিসার হাসলেন। মাথায় ছিট আছে তোমার?

জে-না সাহেব।

পোঁটলায় কী?

চিড়ে। খুব ভালো চিড়ে সাহেব। বাড়ির নামায় একচিলতে জায়গায় শালিজিরে ধান হয়েছিল। খুব অল্প হয়েছিল। পোনে দু সেরের মতো চিড়ে হয়েছে। চিড়েটা সাহেব নেতার জন্যে নিয়ে এসেছি। নেতা একমুঠ মুখে দিলে জীবন ধন্য হয়ে যাবে আমার। আমি সাহেব নেতাকে বড় ভালোবাসি। গরিবের ভালোবাসা, নেতাকে কেমন করে জানাব! ম্যালা দিনের স্বপ্ন ছিল তাঁরে একবার সামনাসামনি দেখব। পায়ের কাছে চিড়ের পোঁটলাটা নামিয়ে রেখে পা দুখানা একবার ছুঁয়ে দেখব।

রতন একটা দীর্ঘশ্বাস ফেলল। সে আর হলো কই! আপনার লোকজন ধরে নিয়ে এল।
ঠিকই করেছে। তুমি আসলে বদমাস।

জে?

হ্যাঁ, তুমি বদ মতলবে নেতার বাড়ির সামনে ঘুরঘুর করছিলে। এতক্ষণ ধরে যা বললে সবই মিথ্যে। বানোয়াট। তোমার মতো লোকের এত পয়সা ব্যয় করে, এত পরিশ্রম করে, এতদূর থেকে শুধু নেতাকে একপলক দেখতে আসার কথা না। চিড়াটা বিক্রি করলে ভালো পয়সা পেতে। তুমি এসেছ নিশ্চয় অন্য কোনো মতলবে। ভালোবাসা দেখাতে না।
এতক্ষণের হাসিমুখ মুহূর্তে চুন হয়ে গেল রতনের। একেবারেই স্তব্ধ হয়ে গেল সে। কাতর গলায় বলল, না সাহেব, না। আমি একটাও মিথ্যা বলি নাই। আমরা মিথ্যা বলি না। মানুষ গরিব হতে পারি সাহেব কিন্তু ভালোবাসাটা খাঁটি। আমাদের মতো গরিব মানুষরাই নেতাকে বেশি ভালোবাসে। আল্লার কসম খেয়ে বলছি, আমি নেতাকে দেখতে আসছি। এ আমার ম্যালা দিনের স্বপ্ন। আপনে বিশ্বাস করেন।

একটু একটু করে অনেকক্ষণ ধরে জমে ওঠা রাগটা এবার ফাটল অফিসারের। প্রচণ্ড একটা ধমক দিলেন তিনি। চোপ! সেই ধমকে রতন তো বটেই পাথর হয়ে থাকা পুলিশ দুজনও কেঁপে ওঠল। পুলিশ দুজনের দিকে তাকিয়ে অফিসার বললেন, পোঁটলাটা নাও। খুলে দেখো ভেতরে কী আছে।

সঙ্গে সঙ্গে রতনের বুক থেকে চিড়ার পোঁটলা ছিনিয়ে নিল একজন। থানার মেঝেতে ফেলে খুলল। চিড়াগুলো ছড়িয়ে গেল চারদিকে। চিড়াড় তাজা, মিষ্টি গন্ধে থানার গুমোট পরিবেশ ম ম করে উঠল।

অফিসারের কথা শুনে রতনের তখন মনে হচ্ছে, প্রচণ্ড খরায় চষা জমির মাটির ঢেলা যখন পাথরের মতো হয়ে ওঠে, সেই ঢেলা ভাঙবার জন্যে চাষি যে ইটামুগুর ব্যবহার করে, সে রকম ইটামুগুর দিয়ে হঠাৎ করেই কেউ তার বুকে প্রচণ্ড জোরে আঘাত করেছে। ও রকম আঘাতে দম বন্ধ হয়ে যায় মানুষের। চোখ ঠিকরে বেরোয়। মানুষ কোনো শব্দ। করতে পারে না।

রতনও কোনো শব্দ করতে পারল না।

অফিসার বললেন, এই চিড়া কেমিক্যাল টেস্টে পাঠাও আর বদমাসটাকে লকআপে ভরো।

বেশি কথা বলা পুলিশটি বলল, একটা কথা বলব স্যার?

অফিসার রাগী চোখে তাকালেন। কী?

চিড়ার গন্ধটা বড় ভালো।

তাতে কী হয়েছে? বলছিলাম কী একটু মুখে দিয়ে দেখব?

অফিসার প্রচণ্ড রাগলেন। যদি তোমার কোনো অ্যাকসিডেন্ট হয়? যা বললাম তা-ই করো। টেস্টে পাঠাও।

রতন তারপর আর একটিও কথা বলে নি। একেবারেই পাথর হয়ে গিয়েছিল। থানা হাজতের দেয়ালে হেলান দিয়ে সারা রাত বসে থেকেছে। একজন টহলদার পুলিশ পাঁচ মিনিট পর পর গরাদের সামনে দিয়ে টহল দিয়ে গেছে। রতন তার দিকে ফিরেও তাকায় নি।

ভোরবেলা কী রকম একটা গুঞ্জন উঠল থানায়। কী রকম একটা ছুটোছুটি, চাপা ফিসফাস। খানিকপর সেই দুজন পুলিশ এসে লকআপ খুলল। রতন মাঝি, বেরোও।
কথা বেশি বলা পুলিশটির প্যান্টের দু পকেট বেশ ফোলা। রতন নিঃশব্দে লকআপ থেকে বেরোল। পুলিশ দুজন ঠেলে ঠেলে তাকে এনে দাঁড়া করাল সেই অফিসারের সামনে।

অফিসার কী রকম দুঃখী মুখ করে চেয়ারে বসে আছেন। চোখে উদাসীনতা কিংবা অন্য কিছু। রতনকে দেখে তার দিকে তাকালেন। গভীর দুঃখের গলায় বললেন, নেতা কাল রাতে নিহত হয়েছেন। আমরা খবর পেয়েছি তাঁর খুব ঘনিষ্ঠ লোকজন, নেতার আদর্শে বিশ্বাসী, একই রাজনীতি দীর্ঘদিন করেছে, তারা ষড়যন্ত্র করে নেতাকে হত্যা করেছে। তোমার ওপর আমি অবিচার করেছি ভাই। যাও, বাড়ি যাও তুমি।

বেশি কথা বলা পুলিশটি তখন তার প্যান্টের পকেট থেকে চিড়া বের করে অবিরাম মুখে পুরছে। রতন বুঝে গেল এই সেই চিড়া। ভালোবেসে নেতার জন্যে নিয়ে এসেছিল সে। কালিজিরা ধান কত যে যত্নে বুনেছিল বাড়ির নামায়! সেই ধান শুকিয়ে কত যে যত্নে চিড়াটা কুটে দিয়েছিল তার কৃষাণি!


এসব ভেবে চোখ ভরে আসার কথা রতনের কিন্তু হলো উল্টো। চোখ দুটো কী রকম জ্বলে উঠল তার। অফিসারের দিকে তাকিয়ে শীতল গম্ভীর গলায় রতন বলল, আমাকে ছেড়ে দেওয়া ঠিক হবে না সাহেব। আমাকে হাজতেই রাখুন। ছেড়ে দিলে নেতা হত্যার প্রতিশোধ নেব আমি।

সমাপ্ত

 

ইমদাদুল হক মিলন
লেখক, কথা সাহিত্যিক



আপনার মূল্যবান মতামত দিন:


Top